চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

টুরিস্ট লজ থেকে জলের উপর দিয়ে নীরমহলে পৌঁছতে আধঘন্টাও লাগল না। একটা নৌকোতেই হয়ে গেছে। দলে আমরা এখন সাতজন। আমি, ভাদুড়িমশাই, মিসেস ঘোষ, রামু, দীপক, পীতাম্বর আর রাজেশ। ভেবেছিলুম, রাজেশ বোধহয় আসবে না। কিন্তু সেও এসেছে দেখলুম। মুখে অবশ্য একটুও হাসি নেই। কথাও বিশেষ বলছে না।

ভিতটা জলের তলায়। সেই ভিতের উপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই রাজপ্রাসাদ। উদয়পুরের লেক-প্যালেস দেখে ত্রিপুরার মহারাদের এই বাড়ি বানাবার শখ হয়েছিল কি না জানি না, তবে এটাও যে একটা তাক-লাগানো ব্যাপার, তাতে আর তার সন্দেহ কী। সামনে আর পিছনে, দু-দিক দিয়েই ঢোকা যায় এই রাজবাড়িতে। রাজার নৌকো সামনের ঘাটে ভেড়ানো হত, আর রানিমা’র নৌকো একটু ঘুরে গিয়ে ভিড়ত অন্দরমহলের সিঁড়ির সামনে। নৌকো থেকে সরাসরি সিঁড়িতে পা রেখে রাজপরিবারের মেয়েরা উপরে উঠে যেতেন।

এখন আর যান না। নীরমহল এখন আর শখের রাজবাড়ি নয়, ত্রিপুরার আর-পাঁচটা টুরিস্ট-স্পটের মতন এটাও একটা টুরিস্ট-স্পট। আজ অবশ্য পর্যটকদের ভিড় নেই। ঘুরে-ঘুরে আমরা সব দেখতে লাগলুম।

দেখলে অবশ্য দুঃখই হয়। ভাদুড়িমশাই বলেছেন যে, এ-বাড়ি খুব বেশিদিনের পুরনো নয় তিরিশের দশকে তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ এর বয়েস কিছুতেই ষাটের বেশি হতে পারে না। অথচ তারই মধ্যে নীরমহলের অবস্থা একেবারে যাচ্ছেতাই হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেওয়ালের পলস্তারা এখানে-ওখানে খসে পড়েছে, পাঁচিলে ফাটল, কার্নিশে অশথগাছ, মেঝে ফুটিফাটা। মেঝের উপরে এককালে নিশ্চয় দামি টালি ছিল, এখন নেই। বাগান একটা আছে ঠিকই, কিন্তু তার অবস্থাও খুব একটা উৎসাহিত হবার মতো নয়। তবে হ্যাঁ, মেরামতির কাজ চলেছে। এখানে-ওখানে জনাকয় মিস্ত্রি আর মজুর আমাদের চোখে পড়ল।

রামু রাজেশ আর দীপক নীরমহলের সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। আমি আর ভাদুড়িমশাইও সেদিকে পা বাড়াতে যাচ্ছিলুম, মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনারা অত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? ওরা ছেলেমানুষ, ওরা ওদের মতো ঘুরে বেড়াক। চলুন, আমরা বরং সামনের ওই বাগানটাতে একটু বসি।” বুঝলুম, অনেকক্ষণ ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে, আর পারা যাবে না। প্লটটা এবারে শুনতেই হবে। বললুম, “বেশ তো।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমারও কি থাকা দরকার?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনি ডিরেক্টর, আপনার মতামতটাই সবচেয়ে জরুরি। তবে আপনাকে তো একবার বলেইছি। এখন উনি শুনুন। শোনানো হয়ে গেলে আমরা একটু আলোচনায় বসব। তখন কিন্তু আপনাকে থাকতেই হবে।”

অর্থাৎ ‘এখন আপনার না থাকলেও চলে’। ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ, আপনারা তা হলে কাজে লেগে যান, আমি একটু ওদিক থেকে ঘুরে আসি। খানিক বাদে এসে আপনাদের সঙ্গে যোগ দেব।”

ভাদুড়িমশাই চলে যাবার পরে মিসেস ঘোষ আর কোনও ভণিতার মধ্যে গেলেন না। ভ্যানিটি ব্যাগের ভিতর থেকে ভাঁজ-করা এক শিট কাগজ বার করে বললেন, “গল্পের আউটলাইনটা আমি এখানে লিখে রেখেছি। বলি?”

“নিশ্চয়।”

বাংলাটা মিসেস ঘোষ বলতে পারেন ভালই, তবে লিখতে পারেন না। আউটলাইনটা তাই ইংরেজিতে লিখে রেখেছেন। সেটা বলতেও শুরু করেছিলেন ইংরেজিতেই।

“দ্য হিরোইন ইজ আ ভিলেজ বেল….শি কামস অব আ ভেরি পুয়োর ফ্যামিলি…..ইন ফ্যাকট হার ফাদার ইজ আ ডেইলি ওয়েজ-আর্নার অ্যান্ড হ্যাজ টু ওয়ার্ক ফ্রম ডন টু ডাস্ক ইন দ্য হাউস অব আ ভেরি রিচ ম্যান……দেন ওয়ান ডে…….”

এই পর্যন্ত বলে মিসেস ঘোষ হঠাৎ কাগজ থেকে মুখ তুলে আমার দিকে তাকালেন। সম্ভবত বুঝে নেবার চেষ্টা করলেন যে, ইংরেজিটা আমার বোধগম্য হচ্ছে কি না। কী বুঝলেন তিনিই জানেন, কিন্তু পরমুহূর্তে যখন আবার মুখ নামিয়ে পড়তে শুরু করলেন কাগজটা, তখন দেখলুম ইংরেজি নয়, বাংলা তর্জমা করে গল্পটা আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

“বাবা তো একদিন জ্বরে পড়ল….খুব জ্বর….কাজে যাবার তাগদ নেই…. অথচ না-গেলে সেদিনকার ওয়েজ মিলবে না….তো কী আর করবে….নিজে না গিয়ে মেয়েটাকে কাজে পাঠাল।…আপনি ফলো করছেন তো?”-

একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলুম। মিসেস ঘোষের কথায় চমকে উঠে বললুম, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ফলো করছিল মেয়েটাকে। খারাপ লোকেদের ওই তো কাজ, সুন্দরী মেয়ে দেখলেই তারা ফলো করে।”

“ও নো,” মিসেস ঘোষ প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, “মেয়েটাকে ফলো করার কথা হচ্ছে না। জিজ্ঞেস করছিলুম যে, যা বলছি, আপনি ফলো করতে পারছেন কি না।”

লজ্জিত হয়ে বললুম, “আইম সরি। আপনি বলে যান।”

মিসেস ঘোষ আবার তাঁর প্লটের খেই ধরলেন। “মেয়েটা তার বাপের বদলে সেই বড়লোকটার বাড়িতে কাজ করতে গেল…..কিন্তু বড়লোকটার ছেলের মতলব খুব খারাপ…..একা পেয়ে হি আউটরেজড দ্য মডেস্টি অব দ্যাট পুয়োর গার্ল!”

এবারে আর অন্যমনস্ক হইনি। বললুম, “বড়লোকের ছেলেরা তো ওই করতেই আছে। তারপরে?”

“মেয়েটা বাড়িতে ফিরল……বাবাকে সব বলল….বাবা গেল ভিলেজ-পঞ্চায়েতের কাছে…. কিন্তু পঞ্চায়েতের যে কর্তা, বড়লোকটা তো তাকে টাকা খাইয়ে রেখেছিল……সে তাই কোনও স্টেপ নিল না…..অ্যান্ড ইন আটার ডেসপেয়ার দ্য পুয়োর ফেলো লিভস দ্য ভিলেজ উইথ হিজ ডটার। গ্রাম থেকে ওরা শহরে গেল…… কাজ খুঁজতে লাগল…..তো একটা কাজ পেয়েও গেল। এক ইয়াং পুলিশ অফিসারের বাড়িতে নোকর আর নোকরানির কাজ। ….ব্যাপারটা ধরতে পারছেন তো?”

আবারও একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলুম। কিন্তু এবারে আর সেটা বুঝতে দিলুম না। বললুম, “চমৎকার এগোচ্ছে। ওই লাস্ট সেনটেন্সটা আর একবার বলুন তো।”

“ইয়াং এক পুলিশ অফিসারের বাড়িতে ওরা নোকর আর নোকরানির কাজ পেয়ে গেল। কিন্তু ওরা যে বাপ আর মেয়ে, পুলিশ অফিসারটিকে তা জানতে দিল না।”

বললুম, “একটা কথা ভাবছি।”

“বলুন।”

“নোকর আর নোকরানির ব্যাপারটা আমার খুব জুতসই ঠেকছে না। তার চেয়ে বরং দীপক যা বলছিল, ওরা স্মাগলার কিংবা ডাকাত হয়ে যাক।

মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনিও তা-ই মনে করেন?”

বললুম, “দীপক তো কিছু খারাপ বলেনি।”

“না, তা বলেনি। ইন ফ্যাক্ট হি হ্যাজ আ পয়েন্ট দেয়ার। তবে আমি ভাবছিলুম যে, এটাকে বিগ ল্যান্ডহোল্ডার আর ল্যান্ডলেস অ্যাগ্রারিয়ান লেবারারদের একটা মুখোমুখি লড়াইয়ের দিকে নিয়ে যাব …মানে এটা তো আর একটা বি-গ্রেড হিন্দি ফিল্ম নয়, বাংলা ছবি। তো বাঙালি দর্শকদের জন্যে কিছু ফুড ফর থট তো দেওয়া চাই। নইলে তারা নেবে কেন? দেয়ার অ্যান এনটায়ারলি ডিফারেন্ট কাইন্ড তাব কাস্টমার্স।”

ভদ্রমহিলা বঙ্কুবাবুকে বিয়ে করেছেন এইটি ওয়ানে। তার মানে দশ বছর হল উনি একজন টাকার কুমিরের ঘরণী। অথচ, বাঙালি দর্শকদের চিন্তার খোরাক জোগাবার জন্যে ওঁর ঘুম হচ্ছে না। এমন একটা ছবি করতে চাইছেন, যাতে গরিবের মেয়ে বড়লোকদের বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে ধর্ষিত হবে, তারপর কিছুকাল কষ্টভোগ করে বড়লোকের বিরুদ্ধে মুখোমুখি লড়াইয়ে নামবে।

আমার হাসি পাচ্ছিল। বললুম, “ঠিক আছে। কিন্তু লড়াইটা হবে কীভাবে? মানে, খবর পেলেই তো পুলিশ ফোর্স এসে হাজির হবে সেখানে!”

“বাট দ্যাট ইয়াং পোলিস-অফিসার উইল বি অন হার সাইড। তার সঙ্গেই তো মেয়েটার মোহব্বত হয়ে গেছে।”

মনের মধ্যে একটা সন্দেহ অনেকক্ষণ ধরেই দানা বাঁধছিল। প্রশ্ন করলুম, “সবই তো হল, কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটবে কোথায়?”

“কেন, ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল।”

“যাচ্চলে, তা হলে ত্রিপুরায় এসে লোকেশান বাছাই করবার দরকার হল কেন?”

“এত সুন্দর একটা জায়গা, এটাকে কাজে লাগাব না?”

“কিন্তু নীরমহল? এটাকে দেখলেই তো লোকে ধরে ফেলবে যে, জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গ নয়।”

মিসেস ঘোষ হাসলেন, “ওটা ম্যানেজ হয়ে যাবে। ডিটেলস তো আপনি লিখবেন। সেখানে দেখিয়ে দেবেন যে, দিন কয়েকের ছুটি নিয়ে ওই পুলিশ-অফিসারটি ত্রিপুরায় বেড়াতে এসেছে।”

“নোকরানিকে সঙ্গে নিয়ে?”

“কেন, নোকরানিকে সঙ্গে নিয়ে কেউ বেড়াতে যায় না?”

“তা হয়তো যায়, কিন্তু ফিল্ম-ক্রিটিকদের আমি চিনি তো, এটা তাদের খাওয়ানো একটু শক্ত হবে। কেন, নীরমহলকে বাদ দিলে কী হয়?”

“না না,” মিসেস ঘোষ প্রায় আঁতকে উঠে বললেন, “নীরমহলকে বাদ দেওয়া চলবে না। সেইসঙ্গে সিপাহিজলার সরকারি রেস্ট-হাউস আর উদয়পুরের ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরকেও এই ছবির মধ্যে রাখতে হবে।”

“কেন?”

“বা রে,” মিসেস ঘোষ সলজ্জ গলায় বললেন, “তিন জায়গায় আমি তিন রকমের ড্রেস পরব যে। সিপাহিজলায় বোটিং করবার সময় পরব সবুজ সালোয়ার আর হলুদ কামিজ, এখানে….. মানে এই নীরমহলে পরব স্টোন-ওয়াশ জিনসের ট্রাউজার্স আর ব্যাগি শার্ট, আর উদয়পুরে ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দিরে পুজো দিতে যাব তো, তাই সেখানে লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরে নেব।”

আমার মুখ দিয়ে কোনও কথাই সরছিল না। অনেক কষ্টে বললুম, “এ ছবির হিরোইনও কি তা হলে আপনিই হচ্ছেন?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “তা ছাড়া আর কে হবে। সুটেবল কাউকেই তো খুঁজে পাচ্ছি না।”

ঢোক গিলে বললুম, “কিন্তু নায়িকার বয়েস তো যদ্দুর বুঝতে পারছি খুবই কম। ভিলেজ-গার্ল, বিয়ে হয়নি, বয়েস তা হলে কতই বা হতে পারে, এই ধরুন সতেরো আঠারো। কি মেরেকেটে কুড়ি। তার বেশি তো হতেই পারে না।”

“ও নিয়ে ভাববেন না।” মিসেস ঘোষ বললেন, “হেমা মালিনী ‘সোলে’ ফিল্মে ভিলেজ-বেল হয়নি? বাট হেমা ইজ আ ক্লোজ ফ্রেন্ড, সো প্লিজ ডোন্ট আসক মি হেমার বয়েস তখন কত ছিল। না না, ও নিয়ে আপনার ভাববার কিছু নেই, ও আমি ম্যানেজ করে নেব। আপনি শুধু একটা অনুরোধ রাখুন।”

“বলুন।”

“আপনাদের বঙ্কু….মানে মিঃ ঘোষকে একটু বুঝিয়ে বলুন যে, গুচ্ছের টাকা ঢেলে বাইরে থেকে কাউকে নেবার দরকার নেই। হিরোইন এবারেও আমাকে করলেই ভাল হয়। তাতে শ্যুটিং নিয়ে যেমন ঝামেলা হবে না, তেমন ঘরের টাকা ঘরেই থাকবে।”

বললুম, “ঠিক আছে। কিন্তু মিঃ ভাদুড়ি তো ডিরেক্টর, তাঁর সঙ্গেও একটু কথা বলে নিলে ভাল হয়।”

উত্তরে মিসেস ঘোষ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু বলা হল না। তার আগেই নীরমহলের সামনের দিক থেকে বিকট একটা চিৎকার ভেসে এল।

মিসেস ঘোষ একেবারে থতমত খেয়ে গিয়েছিলেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার? কে চিৎকার করে উঠল? মনে হল যেন রামুর গলা?”

চিৎকারটা শুনেই আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলুম। বললুম, “কিছুই তো বুঝতে পারছি না। দাঁড়ান, দেখে আসি।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “চলুন, আমিও যাচ্ছি।”

চিৎকারটা সামনের দিক থেকে এসেছিল। খানিকটা এগোতেই চোখে পড়ল, দীপক আর রাজেশ একটা বারান্দা থেকে ঝুঁকে পড়ে কিছু দেখছে। পরক্ষণেই তারা সিঁড়ির দিকে ছুটল।

যেখান থেকে তারা নীচের দিকে ঝুঁকে কিছু দেখছিল, সেইখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে আমি নীচের দিকে তাকালুম। যা দেখলুম, তাতে বুকের মধ্যে ধড়ন করে উঠল আমার। নীচে, মাটির উপরে, একটা লোক সটান শুয়ে রয়েছে। পরক্ষণেই বুঝলুম যে, সে রামু। মিসেস ঘোষ কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন, বলে মনে হল না। বললুম, “তাড়াতাড়ি নীচে চলুন। রামুর কিছু একটা হয়েছে।’

সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে গিয়ে দেখলুম, পীতাম্বর আমার আগে-আগে নামছে। বললুম, “কোথায় যাচ্ছ পীতাম্বর?”

পীতাম্বর বলল, “একটা চিৎকার শুনতে পেলুম। কার চিৎকার জানেন?”

“সম্ভবত রামুর। চলো চলো, আর দাঁড়িয়ে থেকো না।”

একতলায় সামনের দিকটায় গিয়ে যখন পৌঁছলুম, রামু তখন আর শুয়ে নেই, দাঁড়িয়ে উঠে দীপক আর রাজেশকে হাত-পা নেড়ে খুব উত্তেজিতভাবে কিছু বলছে। আমাদের মাঝিটিও সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখলুম। বুঝতে পারলুম, হঠাৎ একটা চিৎকার শুনে সে আর নৌকোর মধ্যে বসে থাকতে পারেনি, নৌকো ছেড়ে সামনের খাড়াই পথটুকু পেরিয়ে নীরাহুলের ল গোয়া জমিতে উঠে এসেছে। ভাদুড়িমশাইকে কিন্তু সেখানেও দেখতে পেলুম না।

দীপক আর রাজেশকে জিজ্ঞেস করলুম, “মিঃ ভাদুড়ি কোথায় জানো?”

“এই তো আমি।”

চমকে উঠে পিছন ফিরে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই প্যালেস থেকে বেরিয়ে আসছেন। কাছে এসে বললেন, “একটা চিৎকার শুনতে পেলুম। কী হয়েছে?”

দীপক বলল, “ভীষণ ব্যাপার। ভাঞ্জাকে কেউ ইট ছুড়ে মেরেছে!”

রামুর পাশেই পড়ে রয়েছে একটা আস্ত ইট। সেইটে দেখিয়ে রাজেশ বলল, “ওটা যদি মাথায় লাগ্ত; তা হলে আর দেখতে হত না, মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যেত।”

মিসেস ঘোষ ছুটে গিয়ে রামুকে জড়িয়ে ধরলেন।

ভাদুড়ি মশাই বললেন, “কী হলে কী হত, সেটা পরে শুনব। কী হয়েছে, সেটা আগে শুনি। কী হয়েছিল রামু?”

রামু বলল, “ভিতরে আমার ভাল লাগছিল না; তাই ভাবছিলুম যে, নৌকোয় বসে আপনাদের জন্যে অপেক্ষা করব। প্যালেস থেকে তাই বেরিয়ে আসি। কিন্তু নৌকোর দিকে কয়েক পা এগিয়েছি কি এগোইনি, এমন সময় উপর থেকে হঠাৎ ওই ইটটা আমার পাশে এসে পড়ে। আমি হকচকিয়ে যাই। কিন্তু তারপরেই মনে হয়, কেউ নিশ্চয় আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে। তক্ষুনি দু’হাতে মাথা আড়াল করে আমি মাটিতে শুয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুদ্ধির কাজ করেছ। উপরে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেয়েছিলে?”

“না।” রামু বলল, “ইটটা এসে আমার পাশে পড়বামাত্র আমি উপরের দিকে তাকিয়েছিলুম। মনে হল, ছাতের কার্নিস থেকে চট করে একটা ছায়া যেন সরে গেল। কিন্তু না, কাউকে দেখতে পাইনি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *