চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

ঘুম আসতে-আসতে সাড়ে বারোটা বেজে গিয়েছিল। হঠাৎ যেন কার মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। ঘর অন্ধকার। বললুম, “কে?”

“আমি।”

ভাদুড়িমশাইয়ের গলা। বললুম, “কী ব্যাপার? এত রাতে?”

ভাদুড়িমশাই লাইট জ্বেলে দিলেন। বললেন, “রাত কোথায়, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখুন, সাড়ে চারটে বাজে। চটপট উঠে রেডি হয়ে নিন। পাঁচটা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পড়ব।”

“সে কী, ব্রেকফাস্ট না-খেয়ে তো আমরা সাগরমহলের ওদিকে যাচ্ছি না, তা হলে এত তাড়া কীসের?”

পাশ ফিরে ফের ঘুমোবার উপক্রম করছিলুম, ভাদুড়িমশাই একটানে আমার গায়ের চাদরটা উঠিয়ে নিয়ে বললেন, “সাগরমহলে যখন যাব তখন যাব, এখন উঠে পড়ুন দেখি। এমন সুন্দর একটা াকাল এইভাবে ঘুমিয়ে নষ্ট করবেন না। চলুন চিড়িয়াখানার ওদিকটা আপনাকে দেখিয়ে নিয়ে আসি।”

অগত্যা উঠতেই হল।

না-উঠলে যে মস্ত লোকসান হত, সেটা বাইরে বেরিয়ে বুঝতে পারলুম। এমন চমৎকার একটা ভোর সত্যি অনেক কাল দেখা হয়নি। গোটা আকাশ স্লেট-রঙা, কিন্তু তারই মধ্যে পুবের আকাশে হঠাৎ লালচে রঙের ছোপ ধরল। অল্প-অল্প হাওয়া বইতে লাগল। গাছের পাতায় কোনও দৈব শিশু যেন ঝুমঝুমি বাজাতে থাকল। সামনে একটা পুকুর। তার জলেও দেখলুম শিরশিরে একটা কাঁপুনি ধরেছে।

চিড়িয়াখানা এখান থেকে আরও মাইল খানেক দূরে। ওদিকটা সরকারি এলাকা। শুনলুম, চিড়িয়াখানার খুব কাছেই একটা মস্ত ঝিল রয়েছে, আর সেই ঝিলের ধারে রয়েছে সরকারি রেস্ট হাউস

ভাদুড়িমশাই বললেন, “পা চালিয়ে চলুন। এত সকালে তো চিড়িয়াখানায় ঢোকা যাবে না, তবে জায়গাটার একটা আন্দাজ পেয়ে যাবেন। সাতটার মধ্যেই ফিরে আসতে পারব।”

এখানকার চিড়িয়াখানার মস্ত আকর্ষণ নাকি চশমা-পরা বাঁদর। শুনে বললুম, “তাও হয় নাকি? বাঁদরদের তো বই পড়বার বদ-খেয়াল নেই, তা হলে চশমা পরবার দরকার হল কেন?”

ভাদুড়িমশাই হোহো করে হেসে বললেন, “চশমা পরাটা নেহাতই কথার কথা। বাঁদরগুলোর চোখের চারপাশ ঘিরে আসলে একটা সাদা রিঙের মতন থাকে, তাইতে মনে হয় যেন চশমা পরেছে। ভারী লাজুক বাঁদর, কেউ যদি ওদের দিকে তাকিয়েছে তো আর রক্ষে নেই, সঙ্গে-সঙ্গে দু-হাত তুলে মুখ ঢেকে ফ্লেবে।”

চিড়িয়াখানা বন্ধ ছিল, তাই সে-সব আর দেখা হল না। পাশের ঝিলটা অবশ্য চমৎকার। এই ঝিলের জন্যেই গোটা এলাকার নাম দাঁড়িয়েছে সিপাহিজলা। জলার পাশে এককালে যে সিপাইদের একটা ডেরা ছিল, সেটাও আন্দাজ করা গেল। ঝিলের মধ্যে বোটিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে দেখলুম।

সবচেয়ে ভাল লাগল ঝিলের ধারের সরকারি রেস্টহাউসটা দেখে। এটাও দোতলা কাঠের বাড়ি। দুটো তলাতেই বেশ কয়েকটা করে ফার্নিশড ঘর রয়েছে। বাড়ির চারপাশে বাগান। সামনের দিকে ধাপে-ধাপে ঝিলের মধ্যে নেমে গেছে বেশ চওড়া একটা সিঁড়ি। পরিবেশ এমন মনোরম যে, দেখলেই মনে হয় কয়েকটা দিন থেকে যাই।

কিন্তু থাকার তো উপায় নেই। রেস্টহাউসের সামনের বারান্দায় খানিক সময় বসেই আবার আমাদের ফেরার পথ ধরতে হল। হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলুম, “সাতটার মধ্যে ফিরতে পারব তো?”

ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দাড়ি তো কামিয়ে আসেননি দেখছি।”

“সময় পেলুম কোথায়। আপনি যা তাড়া লাগিয়ে দিলেন।”

“তাড়া না-লাগালে কি এই সুন্দর সকালটা আপনার দেখা হত? কিন্তু সে-কথা থাক। ব্রেকফাস্ট তো আটটায়। দাড়ি-ফাড়ি কামিয়ে স্নান করে, পোশাক পালটে ব্রেকফাস্ট টেবিলে আসতে আপনার কতক্ষণ সময় লাগবে?”

“আধ ঘন্টা।”

“ঠিক আছে, তা হলে তাড়াহুড়ো করবার দরকার নেই, সাড়ে সাতটায় ফিরলেই চলবে। ফিরেই বাথরুমে ঢুকে পড়বেন।”

বললুম, “তা নাহয় ঢুকে পড়ব, কিন্তু একটু আগে ফিরলে ক্ষতি কী?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “মস্ত ক্ষতি। মিসেস ঘোষ সম্ভবত তৈরি হয়ে বসে আছেন। যদি বোঝেন যে, আপনার হাতে কিঞ্চিৎ সময় রয়েছে, তা হলে নির্ঘাত তাঁর গল্পের প্লটটা আপনাকে শোনাতে চাইবেন।”

“তা শোনান না।”

‘অতি বিচ্ছিরি প্লট। শুনলে আপনার মেজাজ বিগড়ে যেতে পারে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে যদি বা আপনাকে এখানে আনতে পেরেছি, তখন হয়তো আপনি আগরতলা ছেড়ে পালাতে চাইবেন। না মশাই, এক্ষুনি ও-সব ঝুঁকি নিয়ে লাভ নেই, তার চেয়ে বরং সমস্যাটার কথা বলি।”

বঙ্কুবাবুর সমস্যাটা যে পারিবারিক, এইটে শুনবার পরে আর ও নিয়ে আমি কোনও কৌতূহল দেখাইনি। রুচিতে বাধছিল। ভাবছিলুঃ যে, বলতে হয় তো ভাদুড়িমশাই নিজেই বলবেন, ও-সব ব্যাপারে আমার কোনও প্রশ্ন না-তোলাই ভাল।

আমি চুপ করে আছি দেখে ভাড়মশাই বললেন, “কী ব্যাপার, কথা বলছেন না কেন?”

“কী বলব?”

“কিছুই বলবেন না? তা হলে একটা প্রশ্ন করি। শুধু টাকাপয়সা থাকলেই কি মানুষ সুখী হয়?”

বললুম, “এ তো অতি পুরনো প্রশ্ন। উত্তরটাও পুরনো। হয় না।”

“বঙ্কুও হয়নি।” ভাদুড়িমশাই একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “হতে পারত, যদি ওর প্রথম বউ প্রভা বেঁচে থাকত। ডলি ওর দ্বিতীয় স্ত্রী।”

“সে তো ওঁদের বয়েসের ফারাক দেখলেই বোঝা যায়।”

“বলুন তো বঙ্কুর বয়েস এখন কত?”

বললুম, “সেটা বলা শক্ত হবে কেন? কলেজে আপনার ক্লাস মেট ছিলেন, তাই বয়েসও মোটামুটি আপনার মতোই হবে। এক-আধ বছর কম কিংবা বেশি।”

“না মশাই,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “উত্তরটা ঠিক হল না। বঙ্কু আমার চেয়ে পুরো পাঁচ বছরের বড়। আমার জন্ম নাইনটিন টুয়েন্টিওয়ানে, আর বঙ্কুর জন্ম নাইনটিন-সিক্সটিনে। আমার এখন সত্তর চলছে, আর ওর চলছে পঁচাত্তর। গরিব ঘরের ছেলে, দেরিতে পড়াশুনো আরম্ভ করেছিল। তবে. কিনা একসঙ্গে একই ক্লাসে পড়তুম তো, তাই নাম ধরে ডাকতে কি তুই-তোকারি করতে আটকায় না। বঙ্কুর প্রথম বিয়েটাও অবশ্য বেশ দেরিতেই হয়েছিল। আমরা আই. এ. পাশ করি থার্টি এইটে। আমার বয়েস তখন সতেরো, বঙ্কুর বাইশ। বি. এ. ক্লাসে অ্যাডমিশন না নিয়ে ও ব্যাবসা আরম্ভ করে। ছিটকাপড়ের ব্যাবসা। গরিবঘরের ছেলে, এ ছাড়া তখন ওর উপায় ছিল না। প্রথম-প্রথম খুব যে একটা সুবিধে করতে পারছিল তা নয়, তবে প্রত্যেকের জীবনেই একটা-না-একটা সুযোগ আসে তো, ওর সেই সুযোগটা এসে গেল একচল্লিশ সালে। ঊনচল্লিশে বাধল ওয়ার্লড ওয়ার। সে-সব দিনের কথা আপনি নিশ্চয় ভুলে যাননি?”

“ভোলা কি সম্ভব?”

“তবে তো এটাও আপনার মনে আছে যে, সেই সময়ে একদিকে যখন সর্বনাশের আগুন জ্বলছে, কাতারে কাতারে লোক মরছে, শহরের পর শহর ধ্বংস হচ্ছে, গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে, সাজানো সব সংসারগুলো শ্মশান হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তখন দু’হাতে পয়সা লুঠছে কিছু মানুষ। ফর্টিওয়ানে বঙ্কু তার ছিট-কাপড়ের ব্যাবসা ছেড়ে যুদ্ধের অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজ ধরে। ব্যস, তার পরে আর ওকে ফিরে তাকাতে হয়নি। দেখতে দেখতে বঙ্কু একেবারে লাল হয়ে গেল।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “বঙ্কু অবশ্য তখন বিয়ে করেনি। যুদ্ধ শেষ হল ফর্টিফাইভে। বঙ্কুর বয়েস তখন উনত্রিশ-তিরিশ। আমরা বলতুম, কী রে বঙ্কু, বিয়ে করছিস না কেন? উত্তরে ও বলত, সময় কোথায়? আসলে ও তখন টাকা রোজগারের ধান্ধায় পড়ে গেছে। আরও টাকা চাই, আরও টাকা। হাজারে হবে না, লাখ চাই। লাখে হবে না, কোটি চাই। যুদ্ধের অর্ডার বন্ধ? তা হোক, অন্য পথে টাকা খাটাতে হবে। এমন পথ, যাতে টাকা খাটালে রাতারাতি সে-টাকা ডবল হয়ে যায়। তা তেমন পথও আছে বই কী। বিস্তর আছে। তা নইলে নিশ্চয় বঙ্কু আজ এইখানে এসে পৌঁছত না।”

বললুম, “বিয়েটা উনি কবে করলেন?”

“প্রথম বিয়েটা করে নাইনটিন সিক্সটিসিক্সে। তখন ওর বয়েস পাক্কা পঞ্চাশ। অবাক হচ্ছেন?”

“না, অবাক হচ্ছি না। শুধু ভাবছি যে, বিয়ে না-করে পঞ্চাশ বছরই যখন কাটাতে পারলেন, তখন বাকি জীবনটা কাটাতেই বা আটকাচ্ছিল কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এ-কথা আমিও ওকে জিজ্ঞেস করেছিলুম। কিন্তু ও কোনও উত্তর দেয়নি। য়তবা জিজ্ঞেস করেছি, ততবারই একটু হেসে পাশ কাটিয়ে গেছে।”

“হয়তো ভাবছিলেন, এত যে টাকা করলেন, খাবে কে? হয়তো এই রকমের একটা চিন্তা ওঁর মাথায় ঢুকেছিল। হয়তো মাঝে-মাঝে মনে হচ্ছিল যে, একটা ছেলে কিংবা মেয়ে থাকলে মন্দ হত না।”

“আমার ধারণা, একটা নিঃসঙ্গতা বোধ ক্রমে-ক্রমে বাড়ছিল ওর। বাপ-মা মারা গেছেন, ভাই নেই, থাকবার মধ্যে গুটিকয়েক বোন ছিল, তাদের বিয়ে হয়ে গেছে, ছেলেপুলে নিয়ে মাঝেমধ্যে তারা আসে ঠিকই, এসে থেকেও যায় কিছুদিন, কিন্তু বঙ্কু বুঝতে পারে যে, সেই আসায় কোনও আন্তরিকতার কি মায়ামমতার টান নেই, যা আছে, তা নেহাতই কিছু টাকা হাতিয়ে নেবার ধান্ধা। মায়ের পেটের বোন, অথচ যা তারা বলে আর যেমনভাবে বলে, বঙ্কুর তাতে সন্দেহ হয় যে, এই সবই আসলে মন-রাখা কথা, সম্ভবত ভগ্নিপতিদের শেখানো। বঙ্কু ধীরে-ধীরে দূরে সরে আসতে থাকে।”

“এ সব আপনি কার কাছে শুনলেন?”

“বঙ্কুরই কাছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা ছাড়া আর কে আমাকে বলবে। তো যা বলছিলুম, পঞ্চাশে পৌঁছে ও তো বিয়ে করে ফেলল। সেই বিয়েতে আমি গিয়েছিলুমও। বউ দেখলুম। গরিব ঘরের মেয়ে, বয়েস মনে হল বছর-পঁচিশেক। সুন্দরী নয়, তবে মুখে খানিকটা বুদ্ধির ছাপ রয়েছে, এইটে দেখে ভাল লেগেছিল। তারপর আবার বছর দুয়েক ওর খোঁজ রাখিনি। হঠাৎ সিক্সটি এইটের নভেম্বরে ওর চিঠি পেলুম। ছেলের অন্নপ্রাশন। আমাকে আসতেই হবে। চিঠির সঙ্গে ব্যাঙ্গালোর ক্যালকাটা-ব্যাঙ্গালোরের রাউন্ড-ট্রিপ এয়ার-টিকেট। না এসে পারা যায়?”

“ভুবনেশ্বরের বাড়ি তখনও হয়নি?”

“বাড়ি হয়নি, তবে জমি কেনা হয়ে গিয়েছিল। কয়েক বিঘে জমি। কিন্তু বঙ্কু তখনও কলকাতা থেকে তার ব্যাবসা চালাচ্ছে। তো আসতে হল। এসে দেখি, ছেলে একটা নয়, এক জোড়া। যমজ ছেলে। শখ করে তাদের নাম রেখেছে রাম আর লক্ষ্মণ। যেটা মিনিট কয়েকের বড়, সেটা রাম, ছোটটা লক্ষ্মণ।”

“কাল খাবার টেবিলে মিসেস ঘোষ ‘রামু’ বলে যায় উল্লেখ করলেন, সে-ই কি বঙ্কুবাবুর বড় ছেলে? ওই মানে মাথা ধরেছে বলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে কাল যে ঘুমিয়ে পড়েছিল?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ। তাকে আপনি এখনও দেখেননি। তবে আজ নিশ্চয় দেখতে পাবেন।”

“আর লক্ষ্মণ? সে এখানে আসেনি?”

“তার কথা একটু পরে বলছি। ইতিমধ্যে বঙ্কুর বউয়ের কথা, অর্থাৎ সেই প্রথম বউয়ের কথাটা আপনার জানা দরকার।”

একটা সিগারেট ধরালেন ভাদুড়িমশাই। পোড়া-কাঠিটা ফেলতে গিয়েও ফেললেন না, সন্তর্পণে আবার দেশলাইয়ের বাক্সের মধ্যে গুঁজে রাখলেন। তারপর বললেন, “সেই বউটি বড় ভাল ছিল মশাই। বউভাতের দিন দেখে মনে হয়েছিল বুদ্ধিমতী মেয়ে। পরে দেখলুম, সত্যিই তা-ই। বঙ্কুর চরিত্রে অন্য কোনও দোষ না থাকলেও মদের নেশা ছিল মাত্রাতিরিক্ত। প্রভা সেটা ছাড়িয়ে দেয়। বঙ্কুর জীবনে শৃঙ্খলা বলতে কিছু ছিল না। প্রভা সেটা নিয়ে আসতে পেরেছিল। সবচেয়ে বড় কথা, বঙ্কুকে সে এটা বোঝাতে পেরেছিল যে, দু-হাতে টাকা রোজগার করা ছাড়াও একটা মানুষকে অন্য-কিছু কাজ করতে হয়। সংসার তার কাছে টাকা তো চায়ই, কিন্তু শুধু টাকাই চায় না, আরও কিছু চায়।”

আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “এসব কথাও আমি বঙ্কুর কাছেই শুনেছি। বঙ্কু সত্যি সুখী হয়েছিল। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বয়েসের ফারাক পঁচিশ বছরের তবু যে প্রভা ওকে সুখী করতে পেরেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই সুখ ওর কপালে বেশিদিন সইল না। হঠাৎ মাত্র তিন দিনের জ্বরে প্রভা মারা গেল। কী রকমের জ্বর, কীসের থেকে সেটা হয়েছে, তা বোঝা পর্যন্ত গেল না। এ হল সেভেনটিথ্রির কথা। প্রভার বয়েস তখন কতই বা হবে? এই ধরুন বত্রিশ-তেত্রিশ। আর তার যমজ ছেলে দুটোর বয়স মেরেকেটে পাঁচ বছর। এমনটা যে ঘটবে, বঙ্কু তা কল্পনাও করতে পারেনি। শোকে দুঃখে ও তখন প্রায় পাগল হয়ে যায়। তার বছর দুয়েক আগেই ওর ভুবনেশ্বরের বাড়ি কমপ্লিট হয়েছে। খবর পেয়ে আমি সেখানে ছুটে যাই। গিয়ে বুঝতে পারি যে, সেখানে থাকলে ও সত্যি-সত্যি পাগল হয়ে যাবে। হাউস কিপার তো একজন ছিলই, অন্যান্য সব কাজের লোকজনও সেখানে নেহাত কম ছিল না, তাদের হাতে বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বঙ্কু আর তার দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আমি ব্যাঙ্গালোরে চলে আসি।”

“তারপর?”

“তারপর আর কী, ভেবেছিলুম কয়েকটা মাস আমার কাছেই রেখে দেব, কিন্তু তা আর হল না।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আসলে কাজের লোক তো, কাজকর্ম ফেলে বসে থাকতে কদ্দিন তার ভাল লাগবে। মাস-খানেক যেতে-না-যেতেই বলল, “না রে, চারু ভুবনেশ্বরেই ফিরে যাই।’ তা ফিরে এসে ফের কাজের নেশায় মেতেও উঠল! চিঠি লিখেছিল। পড়ে জানা গেল, ছেলেদের দেখাশুনো করবার জন্যে বিস্তর মাইনে দিয়ে একজন গভর্নেস রেখে দিয়েছে। তার মাস কয়েক বাদে আমাকে একটা তদন্তের কাজে কটক যেতে হয়েছিল। গিয়ে ভাবলুম, ভুবনেশ্বর তো এখান থেকে মাত্র তিরিশ কিলোমিটার, একবার দেখে আসি, বঙ্কু কেমন আছে। তা দেখলুম, গভর্নেসই সেখানে এখন সর্বময়ী কর্ত্রী, বঙ্কু ফের সেই তার আগের জীবনে ফিরে গেছে, সংসারের কোনও ধারই আর সে ধারে না, টাকা রোজগার ছাড়া অন্য কোনও চিন্তাই তার নেই। আর হ্যাঁ, সে আবার মদও খাচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত।”

“সেই গভর্নেসই কি মিসেস ঘোষ?”

“কারেক্ট।”

“প্রভার শোকে পাগল হয়ে গিয়ে তারপর বছর ঘুরতে-না-ঘুরতেই বঙ্কুবাবু এঁকে বিয়ে কে ফেললেন, কেমন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন কিরণবাবু, ইংরেজিতে এই রকমের একটা কথা আছে যে, প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করাটাই হচ্ছে দ্য বেস্ট কমপ্লিমেন্টে দ্যাট এ ম্যান ক্যান পে টু হিজ ফার্স্ট ওয়াইফ। কেননা তার দ্বারা সে প্রমাণ করছে যে, প্রথম বারের দাম্পত্য জীবনে সে সুখী হয়েছিল, নইলে সে আবার নতুন করে ও-পথে পা বাড়াত না। কিন্তু না, বছর না ঘুরতেই বিয়ে করেনি, বিয়ে করেছিল আরও আট বছর বাদে, এইট্টিওয়ানে। বঙ্কুর বয়েস তখন পঁয়ষট্টি।”

“বিয়েটা কি বঙ্কুবাবু করলেন, না করতে বাধ্য হলেন?”

ইঙ্গিতটা ভাদুড়িমশাই ধরতে পেরেছিলেন। তীব্র চোখে আমার দিকে তাকালেন তিনি। যেন বুঝে নিতে চাইলেন আমাকে। তারপরেই তাঁর চাউনি আবার নরম হয়ে এল। বললেন, “ইউ রাইটারস আর এ হোল লট অব ডেঞ্জারাস পিপল। আরে না মশাই, সে-সব কিছু নয়। আর তা ছাড়া, ওকে আমি চিনি তো, ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করিয়ে নেবে, এমন মানুষ এখনও জন্মায়নি। তা নয়, আসলে একটা সময়ে মনে হয়েছিল যে, ডলি তো সবকিছু ছেড়েছুড়ে ওরই সংসার নিয়ে পড়ে রইল, অথচ মাসান্তে মাইনে আর চতুর্দিকে কুৎসা ছাড়া অন্য-কিছুই ওর জুটল না। কুৎসা বঙ্কুর বোনেরাও কিছু কম রটায়নি। বঙ্কুর বাড়িতে তারা মাঝেমধ্যে আসত, থেকেও যেত সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কখনও কখনও মাসের পর মাস, কিন্তু ডলির সঙ্গে পারতপক্ষে কথা বলত না। এমন একটা ভাব দেখাত যেন লিঙ্গরাজ টেম্পলে পুজো দেবার যা-কিছু পুন্যি, ডলির সঙ্গে কথা বললেই সেটা অমনি উবে যাবে। অ্যাজ ফার অ্যাজ দে ওয়্যার কনসার্নড শি ডিড নট এগজিস্ট অ্যাট অল।”

বললুম, “বঙ্কুবাবুর এটা ভাল লাগেনি নিশ্চয়?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মোটেই না। ওর মনে হল, কিছু একটা করা দরকার। কী করবে? ওর যে আবার বিয়ে করবার ইচ্ছে ছিল, তা নয়। তাই এমনও ভেবেছিল যে, ডলিকে কিছু টাকা দিয়ে অন্য-কোথাও কাজ খুঁজে নিতে বলবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, তা হলে ওর সংসার সামলাবে কে? বাচ্চা দুটোকেই বা কে দেখবে? ব্যস, তারপরে আর ডিসিশন নিতে ওঁর দেরি হয়নি। ডলিকে ও বিয়ে করল। ডলির তরফে আপত্তি হতে পারত। কিন্তু হয়নি। তার কারণ ওরও দরকার ছিল একটা স্থায়ী আশ্রয়ের। ওর আগের জীবনে তো সুবিধে করতে পারেনি, দেয়ার শি ওয়জ আ মিজারেবল ফেইলিওর।’

“আগের জীবন মানে?”

“মানে আগে যে কাজ করত। শি ওয়জ অ্যান অ্যাকট্রেস। …না না, হিরোইন-টিরোইন নয়, নায়িকার বান্ধবী কি নায়কের বোন, কি এই রকমের অন্য কোনও আনইম্পর্ট্যান্ট রোল। গোটা দুই-তিন ছবিতে নেমেছিল, আপনি হয়তো দেখেও থাকবেন।”

“তাই বলুম। তাই ওঁর চেহারাটা অমন চেনা-চেনা লাগছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, আপনি তা হলে দেখেছেন। আমি দেখিনি। কিন্তু মজা কী জানেন, বিয়েটা হয়ে যাবার পরেই নাকি ডলির মাথায় সেই ফিলমের নেশা আবার চাগাড় দিয়ে ওঠে। বঙ্কুকে দিয়ে চার-চারটে ছবি করায়। চারটেতেই ও হিরোইন। শুধু তা-ই নয়, ওরই লেখা কাহিনী নিয়ে ছবি। ফলং মড়কম্। চারটেই ফ্লপ। এখন আবার নতুন একটা ছবি করাচ্ছে। তার দেখাশোনা করবার জন্যে কোত্থেকে একটা ভাইকেও এখানে জুটিয়ে এনেছে। ওই যে দীপক……হ্যাঁ, ওর কথা বলছি…. ছোকরার নিজেরও খুব অ্যাকটিং করার শখ। বলে যে, একবার চান্স পেলেই ও বাজার মাত করে দেবে।”

“গল্প তো এবারও মিসেস ঘোষেরই।”

“হ্যাঁ, তবে পাঞ্জাবের মেয়ে, বাংলাটা বলে ভালই, কিন্তু লিখতে তো পারে না। প্লটটা ও আপনাকে বলবে, সেই অনুয়ারী গল্পটা লিখে ফেলে আপনি তার স্ক্রিপট তৈরি করে দেবেন। কী ভাবে করবেন সেটা আপনার ভাবনা, আমার ভাবনাটা অন্যরকম।”

“আপনার ভাবনা তো ডিরেকশন নিয়ে।”

“আরে দুর মশাই,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ডিরেকশান তো একটা ছুতো। আসলে কয়েকটা দিন সঙ্গে-সঙ্গে থেকে সকলের উপরে আমি নজর রাখতে পারব, তাতে আমার কাজের সুবিধে হবে।”

“কাজটা কী?”

“বলছি, বলছি, অত অস্থির হবেন না। আমার কাজ রামুকে প্রোটেকশন দেওয়া।…..ও কী, অমন হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন কেন? যা বলছি, শুনে যান। বছর খানেক আগে লক্ষ্মণ হঠাৎ নিখোঁজ হয়। পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছিল, তারা কোনও হদিশ করতে পারেনি। কাগজে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। তাতেও কোনও সুরাহা হয়নি। বঙ্কু ধরে নিয়েছে, তাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এখন রামুকে নিয়ে ওর ভাবনা। ছোট ছেলেটা তো গেছেই, এখন এটাও না যায়। সেই জন্যেই ডাক পড়েছে আমার। কিন্তু মিসেস ঘোষ তা জানেন না। তাঁকে বলা হয়েছে, আমি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্র-পরিচালক, তবে কিনা বিদেশে কাজ করি তো, তাই এ-দেশে আমার নাম এখনও তেমন. ছড়ায়নি।”

“মিসেস ঘোষ সেটা বিশ্বাসও করেছেন।

“করেছেন। তার কারণ, বঙ্কু যখন ব্যাঙ্গালোরে যায়, ডলিকে সঙ্গে নিয়ে যায় না। আর আমিও বার কয়েক ভুবনেশ্বরে গিয়েছি বটে, কিন্তু ডলিকে তার মধ্যে একবারও ভুবনেশ্বরে দেখিনি। তার উপরে আবার গত পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে একবারও ভুবনেশ্বরে যাওয়া হয়নি আমার।

বললুম, “এই ব্যাপার?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাড়িতে প্রায় পৌঁছে গেছি, এখন আর কোনও কথা নয়। …… কিন্তু কী ব্যাপার, বাড়ির দিক থেকে একটা চিৎকার শোনা গেল না?….আরে, অত হই-হল্লা কীসের?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *