চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
৪
দোতলায় পাশাপাশি দুটো ঘর। ঘরের সামনে, ঠিক একতলারই মতন, চওড়া ঘেরা-বারান্দা। যে-ঘরটায় আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছে, তার লাগোয়া খানিকটা ফাঁকা জায়গা। ছাদ। দোতলায় সবখানি জায়গা জুড়ে ঘর তোলা হয়নি বলে ওই ছাদের সুবিধেটা পাওয়া যাচ্ছে। ছাদটা রেলিং দিয়ে ঘেরা।
একটা ঘরে ভাদুড়িমশাই থাকবেন, একটা ঘরে আমি। দুটো ঘরে দুটো সিঙ্গল খাট। তাতে পরিপাটি করে বিছানা পাতা। ঘরের সঙ্গে অ্যাটাচড বাথরুম। উঁকি মেরে দেখলুম, তাতে শাওয়ার ওয়াশ-বেসিন ইত্যাদি সবই রয়েছে। অর্থাৎ ব্যবস্থার কোনও ত্রুটি নেই।
একতলার মতন দোতলার ঘেরা বারান্দাটাও সোফা সেটি দিয়ে সাজানো। ভাদুড়িমশাই সেখানে বসে সিগারেট খাচ্ছিলেন। জামাকাপড় পালটে আমি তাঁর পাশের সোফায় এসে বসলুম। বললুম, “এবারে একটু খুলে বলুন তো ব্যাপারটা কী।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমন কিছু জটিল ব্যাপার নয়। সকালে লেকে গিয়েছিলুম জগিং করতে। সেখানে বঙ্কুর সঙ্গে দেখা হয়। বঙ্কু আমার কলেজ-জীবনের বন্ধু। ছাত্র ভাল ছিল, কিন্তু গরিব-ঘরের ছেলে, পয়সার অভাবে পড়াটা চালিয়ে যেতে পারেনি, আই. এ. পাশ করবার পরে সব ছেড়েছুড়ে দিয়ে ছোটোখাটো একটা ব্যাবসা শুরু করে। প্রথমটায় খুব সুবিধে হয়নি, পরে সেকেন্ড ওয়ার্লড ওয়রের সময় ওর কপাল খুলে যায়। ধুলোমুঠি সোনা বলে একটা কথা আছে না? একেবারে সেই ব্যাপার। কয়লা, লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, যা ধরে, তা-ই সোনা। আপনি খবরের কাগজে কাজ করেন, ওর এখনকার অবস্থা তো আপনার না-জানবার কথা নয়।”
“জানি বই কী, কিন্তু ওঁর জোরটা আসলে কোথায়?”
“আসল জোর হার্ড-ক্যাশ। ও তো ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট নয়, ট্রেডার। কিন্তু এমন কোনও ট্রেড নেই, যার থেকে ও কোটি-কোটি টাকা আদায় করে নিচ্ছে না। ওই হার্ড-ক্যাশের জন্যেই। অনেক ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টকেও এসে বঙ্কুর কাছে হাত পাততে হয়। দুকোটি টাকা দরকার, এক্ষুনি চাই। কে দেবে? বঙ্কু দেয়। কত পার্সেন্ট ইন্টারেস্টে দেয়, শুনলে আপনি আঁতকে উঠবেন। অথচ ওকে দেখুন, ওর কথাবার্তা শুনুন, ওর চালচলন খেয়াল করুন, কিচ্ছুটি আপনি বুঝতে পারবেন না।”
“কলেজ জীবন শেষ হবার পরেও আপনি ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন?”
“তা রেখেছিলুম বই কী।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সকলের সঙ্গেই আমি যোগাযোগ রাখি, বঙ্কুর সঙ্গেও রেখেছি। তাই বলে কি আর প্রায়ই ওর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হয়? তা হয় না। তবে ওর ব্যাবসার জাল তো সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। ব্যাঙ্গালোরেও বছরে একবার-দুবার যায়। তখন খবর দেয়, দেখা করে। ইতিমধ্যে আবার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের একটা মালটিস্টোরিড বিল্ডিংয়ে দুটো ফ্ল্যাট কিনেছে। সেই সূত্রে কলকাতায় এসেছিল। ফলে লেকের ধারে দেখা হয়ে গেল। নইলে আবার কবে দেখা হত, কে জানে।”
“সাধারণত উনি থাকেন কোথায়?”
“ভুবনেশ্বরে। তবে শহরের মধ্যে নয়। শহর থেকে মাইল কয়েক দূরে। ওই যে হাইওয়েটা ভুবনেশ্বর থেকে পুরীর দিকে চলে গিয়েছে, তার ধারে বাড়ি করেছে। বিশাল বাড়ি।”
বললুম, “সেখান থেকেই ওঁর অন্যান্য জায়গার সব অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন।”
চারু ভাদুড়ি হেসে বললেন, “অন্যান্য জায়গায় তো ওর কোনও অফিস নেই। অফিস তো ওর এজেন্ট আর সাব-এজেন্টদের। বছরে ও একবার দুবার তাদের কাছে যায়, পাওনাগণ্ডা বুঝে নিয়ে চলে আসে।”
অবাক হয়ে বললুম, “শুনেছি ওঁর বিশাল কারবার। তা হলে অন্য কোথাও অফিস খোলেন না কেন? খরচের ভয়ে?”
ভাদুড়িমশাই আবার হাসলেন। বললেন, “খর্চার ভয়ে নয়, ঝামেলার ভয়ে। বঙ্কু বলে, একগাদা অফিস খোলা মানেই একগাদা ঝামেলায় জড়িয়ে যাওয়া।”
“কিন্তু এজেন্টরা তো ওঁকে ঠকাতে পারে।”
“কেউ যে কখনও ঠকাবার চেষ্টা করেনি, তা নয়। কেউ ভুল-হিসেব দেখিয়ে ওকে কম টাকা দিয়েছে, কেউ টাকা ধার নিয়ে শোধ করেনি। তার ফল কী হয়েছে, জানেন?”
“কী হয়েছে?”
“বঙ্কু হ্যাজ সিম্পলি ড্রিভন দেম আউট অব দেয়ার বিজনেস। ব্যবসায়ী মহলে ওর ক্লাউটের কথা তো শুনলেন। একবার যদি কাউকে ও ব্লা্যকলিস্ট করে, তো তার হয়ে গেল, অন্য কোনও ব্যবসায়ী তাকে আর চিমটে দিয়েও ছুঁয়ে দেখবে না। ওভারনাইট হি বিকামস এ পারিয়া। অ্যান আউটকাস্ট।”
খানিকক্ষণ চুপচাপ কাটল। ফাল্গুন মাস। খানিক আগে ঝড়বৃষ্টি হয়ে গেছে। বাতাসে ঠাণ্ডার আমেজ। বেশ শীত-শীত করছিল। ঘরে গিয়ে একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে ফিরে এসে বললুম, “আসল কথাটা এখনও কিন্তু জিজ্ঞেস করিনি।”
ভাদুড়িমশাই ইতিমধ্যে আর-একটা সিগারেট ধরিয়েছিলেন। এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “হঠাৎ কাউকে কিছু না-বলে কেন বঙ্কুর সঙ্গে এখানে চলে এলুম এই তো?…..আসলে এমনটা যে হবে, তা আমিও জানতুম না। কী হল জানেন, লেক থেকে বঙ্কু আমাকে তার সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটে নিয়ে যায়। যে-লোকটা ওর ফ্ল্যাটের দেখাশোনা করে, একমাত্র সে ছাড়া আর কেউ সেখানে ছিল না। সে-ই বঙ্কুকে লেকের ধারে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। সে-ই আমাদের সঙ্গে আবার ফ্ল্যাটে ফিরে আসে।”
“কেন, ওঁর স্ত্রী সেখানে ছিলেন না?”
“না। ওর স্ত্রীকে আপনি দেখেছেন। শালাকেও দেখেছেন। তবে ওর বড়ছেলে রামু তো ঘুমিয়ে পড়েছিল, তাকে তাই দেখেননি। তিনজনকে নিয়েই ও ভুবনেশ্বর থেকে কলকাতায় এসেছিল। ভেবেছিল, সবাই মিলে আগরতলায় যাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত সেটা হয়নি। ব্যাবসার একটা কাজে ও বাড়তি একটা দিনের জন্যে কলকাতায় আটকে যায়। ফলে, ওর বউ ছেলে আর শালা পরশুদিন আগরতলায় এসেছে আর আমরা এসেছি কাল।”
“তা তো বুঝলুম, কিন্তু আপনাকে আসতে হল কেন?”
“না এসে উপায় ছিল না যে!” ভাদুড়িমশাই হাসলেন। “কিন্তু সবটা আগে শুনুন। ওর জীবনে কয়েকটা প্রবলেম দেখা দিয়েছে। তাই নিয়ে কথা বলতে-বলতে সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। তখন ও উঠে দাঁড়িয়ে বলে, চলি রে, সাড়ে বারোটার মধ্যে আমাকে এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে। তুই আমার সঙ্গে গেলে বড় ভাল হত।”
“ব্যস, অমনি আপনি ওঁর সঙ্গে আগরতলায় চলে এলেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওর প্রবলেম যে কী, তা আপনি জানেন না কিরণবাবু। জানলে সম্ভবত আপনিও বলতেন যে, আসাটাই ঠিক হয়েছে, না এলে অন্যায় হত। …একেবারে একবস্ত্রে চলে এসেছিলুম। এখানে এসে রেডিমেড একজোড়া ট্রাউজার্স, দুটো শার্ট আর ওই কিছু আন্ডারগার্মেন্টস কিনে নিয়েছি।”
“কিন্তু মালতীকে একটা খবর না দিয়েই চলে এলেন কেন?”
“সাড়ে এগারোটায় ডিসিশন নিই যে, আমি আসব। তৎক্ষণাৎ মালতীকে ফোন করি। একবার নয়, তিন-চার বার। কিন্তু প্রত্যেকবারই এনগেজড টোন আসতে থাকে। তখন ঠিক করি, এয়ারপোর্টে তো মোটামুটি সাড়ে-বারোটার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি, সেখান থেকে ফোন করব। তা যে করিনি, তাও নয়। কিন্তু সেই একই ব্যাপার, এনগেজড।”
বললুম, “সাড়ে দশটার পরেই ওদের বাড়ির ফোনটা বিগড়ে গিয়েছিল যে!”
“সে তো এখন আপনার কাছে শুনছি। এদিকে সিকিউরিটি চেকের জন্যে বারবার ডাক পড়ছিল। তাই মনে হল, ঠিক আছে, আগরতলা থেকে ফোন করব। আসলে ওদের ফোনটাই যে বিগড়ে গিয়েছে তা তো আর তখন জানতুম না। তাই ভাগ্যিস বুদ্ধি করে অরুণের চেম্বারের নম্বরটা দীপককে দিয়েছিলুম। নইলে হয়তো আপনারা একটা হুলুস্থুলু বাধিয়ে দিতেন। মালতীদের বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে যেত, আর খবর না-পেয়ে আপনিও ভাবতেন যে, আমি গুমখুন হয়েছি।”
হেসে বললুম, “সত্যি বলতে কী, খবরটা পেয়েও আমি বিশেষ নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। সারাটা পথ দুশ্চিন্তায় কেটেছে।”
চারদিকের গাছপালার ভিতর দিয়ে ঝরঝর করে হাওয়া বইছে। সামনে বাগান। তার মধ্যে এখানে-ওখানে কয়েকটা ল্যাম্পপোস্ট। নীচের লন আর কয়েকটা ফ্লাওয়ার বেডের উপরে তার আলো পড়েছে। ডালপালার নড়াচড়া ছাড়া আর কোথাও কোনও শব্দ নেই। চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে রইলুম আমরা। তারপর ভাদুড়িমশাই-ই প্রথম কথা বললেন।
“এই যে হঠাৎ আপনি চলে এলেন, এতে আপনার কাজের কোনও ক্ষতি হবে না তো?”
বললুম, “না।”
“অফিসকে জানিয়ে এসেছেন, আশা করি।”
“তা জানিয়েছি।”
“কয়েকটা দিন কিন্তু এখানে থাকতে হতে পারে।”
“দরকার হলে থাকব। কিন্তু স্ক্রিপট লেখার ব্যাপারটা কী বলুন তো?”
“ওটা আপনাকে এখানে নিয়ে আসার একটা ফিকির মাত্র। ভয় নেই, আপনাকে ও-সব চিত্রনাট্য-ফাট্য লিখতে হবে না। তবে হ্যাঁ, লিখবার একটা ভান অবশ্যই করতে হবে।”
“আর আপনি কী করবেন?”
“শুনলেন তো,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বিদেশে গত কয়েক বছর ধরে আমি ফিল্ম তুলে বেড়িয়েছি, আর এখানে একটা ফিল্ম তুলতে পারব না? যে ছবির জন্যে এখানে লোকেশন বাছাই করতে আসা হয়েছে, আমি তার পরিচালক।”
“ব্যাপারটা কী বলুন তো? চেষ্টা করলে আমি যে একটা স্ক্রিপট লিখে দিতে পারব না, তা নয়, কিন্তু আপনার ব্যাপারটা তো ডাহা মিথ্যে। গত কয়েক বছর মোটেই আপনি বিদেশে ছিলেন না।”
“ঠিক। ওই লাস্ট ইয়ারে একবার বস্টনে গিয়েছিলুম। তাও মাত্র মাসখানেকের জন্যে।”
“ফিল্মের ব্যাপারেও ইউ নো নেক্সট টু নাথিং। যতই খারাপ হোক, কেঁদে ককিয়ে একটা স্ক্রিপট আমি ঠিকই খাড়া করতে পারব, কিন্তু ডিরেকশন? ওর তো আপনি অ-আ-ক-খও জানেন না।”
হাত উলটে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বোঝো ঠ্যালা। আরে বাবা, আপনাকে কি আমি বলেছি যে, ও-সব আমি জানি। জানি না মশাই, কিচ্ছুটি আমি জানি না। হল তো?”
“তা হলে এ-সব মিথ্যে কথা এদের বলছেন কেন। এঁরা তো ভাবছেন, আপনি একজন ত্রুফো কিংবা গোদার। ধরা পড়লে যে হাতে হাতকড়ি পড়ে যাবে মশাই। আপনি তো মারা পড়বেনই, আমিও রেহাই পাব না!”
সম্ভবত আমার গলাটা একটু উঁচুতে উঠে গিয়েছিল, ভাদুড়িমশাই বললেন, “অত উত্তেজিত হবেন না, যা বলবার আস্তে বলুন। একটা কথা আপনাকে মনে রাখতে বলি। এখানে যাঁদের দেখছেন, তাঁদের কাউকেই আমি শত্রু ভাবছি না, অন্তত ভাববার কোনও কারণ এখনও ঘটেনি; তবে কিনা, যার কথায় আমি আগরতলায় এসেছি, একমাত্র সেই বঙ্কুকেই আমি বিশ্বাস করছি, আর কাউকে নয়।”
“বঙ্কুবাবুকে তা হলে মিথ্যে-পরিচয় দিচ্ছেন কেন?”
“ওকে কেন মিথ্যে-পরিচয় দেব?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও সব জানে।”
আমি তো অবাক। অনেক কষ্টে বলতে পারলুম, “বলেন কী!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিকই বলছি। সমস্যাটা ওর, যা-কিছু টাকা ঢালবার তা ও-ই ঢালছে আর ও কিছু জানবে না? তা কি হয় কিরণবাবু? তা হয় না। এই যে অরুণ আপনার টিকিট কেটে দিয়েছে, তার টাকাও বঙ্কু রিইমবার্স করে দেবে, তার অর্ডার হয়তো কলকাতার কোনও এজেন্টকে ইতিমধ্যে পাঠানোও হয়েছে, দীপক যে কাল বিকেল থেকে আজ আপনি এসে পৌঁছনো পর্যন্ত আগরতলায় ছিল, তার মধ্যেই যদি অর্ডারটা পাঠানো না হয়ে থাকে, তো বলব, বঙ্কুকে আমি চিনি না। ওকে তো অনেক কাল ধরে দেখছি। তাই জানি যে, নিজের প্রাপ্যটা ও যেমন গলায় গামছা বেঁধে আদায় করে নেয়, অন্যের পাওনা মেটাবার ব্যাপারেও ওর তেমন তর সয় না। ও যে একেবারে স্ক্র্যাচ থেকে এখানে উঠে এসেছে, এটাও তার একটা মস্ত কারণ।”
ভাদুড়িমশাই আবার একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর তাতে মস্ত একটা টান দিয়ে গলগল করে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “বঙ্কুর আর-একটা মস্ত গুণ, ওয়ান ক্যান টেক হিম ইনটু ওয়ান’স কনফিডেন্স। অতিবড় সন্দিগ্ধ ব্যবসায়ীও তার দু’নম্বর খাতা দেখিয়ে ওর কাছে লোন চায় শুনেছি। কথাটা বঙ্কুই আমাকে বলেছে, যদিও ব্যবসায়ীর নামটা জানায়নি।”
“আপনি জানতে চেয়েছিলেন?”
“চেয়েছিলুম।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “জেনে তো আমার লাভ নেই, তবু যে জানতে চেয়েছিলুমৃ তার কারণ আর কিছুই নয়, স্রেফ ওকে পরীক্ষা করা। তা দেখলুম, যতবার প্রসঙ্গটা তুলি, ততবারই ও কায়দা করে এড়িয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বলল, ‘দ্যাখো ভাই, তুমি তো ওর কম্পিটিটর নও, ব্যাবসা-জগতের লোকই নও তুমি, তাই আমি খুব ভালই জানি যে, নামটা তোমাকে বললেও আমার এই পার্টির কোনও ক্ষতি হবে না। তবু বলব না কেন জানো? বললে সেটা বিশ্বাসের খেলাপ হবে, নিজের কাছে আমি ছোট হয়ে যাব। কিরণবাবু, আমার প্ল্যানের কথা সাধারণত আমার ক্লায়েন্টকে আমি বলি না। কিন্তু বঙ্কুকে বলেছি। তার একটা কারণ, বঙ্কুকে বিশ্বাস করা যায়।”
“অর্থাৎ আরও কারণ আছে?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আছে। ফিল্ম তোলার নাম করে যে ছকটা আমি সাজিয়েছি, বঙ্কুর খুব কাছের অন্তত তিনজন মানুষ তাতে ইনভলভড।”
“অর্থাৎ ওঁর স্ত্রী, ছেলে আর শালা। মানে দীপক। এই তো?”
“কারেক্ট। তবে, ফিল্মের সূত্রেই যে ছক সাজালুম, তার কারণ কিন্তু মিসেস ঘোষ। ভদ্রমহিলার খুব ইচ্ছে, তাঁর গল্প নিয়ে এবারে একটা বাংলা ছবি হোক।”
“তার মানে এর আগেও ওঁর গল্প নিয়ে ফিল্ম হয়েছে নাকি?”
“হয়েছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বঙ্কু এর আগেও চারটে ফিল্ম প্রোডিউস করেছে। সব ক’টাই হিন্দি, আর সব ক’টারই স্টোরি মিসেস ঘোষের।”
হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আগরতলায় দীপকই এই ফিল্ম প্রোডাকশানের কথাটা প্রথম আমাকে জানিয়েছিল। বলেছিল যে, তার জিজাজি চার-পাঁচটা ফিল্ম প্রোডিউস করেছেন। বললুম, “দীপক বলছিল, তার তিনটেই নাকি হিট-ছবি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সব ক’টাই সুপার ফ্লপ। তবে বঙ্কুর তাতে কিছু আসে যায় না। ও ধরেই নিয়েছে, তরুণী ভার্যাটিকে খুশি রাখবার জন্যে মাঝে-মাঝে এইভাবে কিছু টাকা জলে ঢালতে হবে।”
“ছকটার কথা পরে হবে, আগে সমস্যাটার কথা শুনি। বঙ্কুবাবুর সমস্যাটা কী ধরনের? ব্যবসায়িক?”
“না, পারিবারিক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সমস্যার কথা পরে বলব। অল ইন গুড টাইম। আগে অন্য একটা কথা শুনুন।”
শোনা হল না। বাতাসে একটা মৃদু সুবাস ছড়িয়ে গিয়েছিল। পিছন ফিরে দেখলুম, মিসেস ঘোষ সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখাচোখি হতে মৃদু হেসে বললেন, “আপনারা এখনও শুয়ে পড়েননি?”
বললুম, “ঘুম আসছে না। তাই দুজনে বসে গল্প করছিলুম।”
মিসেস ঘোষ বললেন, “তা হলে কি প্লটটা এখন বলব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, না, আর রাত জাগাটা আপনার ঠিক হবে না। কাল তো ব্রেকফাস্টের পরেই আমরা বেরিয়ে পড়ছি, সকালে আপনার বিস্তর খাটাখাটনি রয়েছে, এখন আপনি শুয়ে পড়ুন।”
মিসেস ঘোষের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। আর একটিও কথা না বলে পিছন ফিরে তিনি সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালেন।
