চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

এইখানে এই পরিবেশে, এমনভাবে যে ভাদুড়িমশাইয়ের দেখা পেয়ে যাব, তা আমি ভাবিনি। ভাদুড়িমশাই সাত-সকালে জগিং করতে বেরিয়ে নিরুদ্দেশ হলেন, আর সেইদিনই রাত্তিরে ফোন করে আমাকে বলা হল যে, পরদিন আমাকে আগরতলা যেতে হবে, এ দুটো ঘটনার মধ্যে যে একটা যোগসূত্র রয়েছে, তা আমি আন্দাজ করেছিলুম ঠিকই, কিন্তু আজই যে তাঁর দেখা পেয়ে যাব, তা আমার কল্পনাতেও ছিল না।

আনন্দে আমার মুখ দিয়ে যেন কথাই সরছিল না। আবার একইসঙ্গে রাগও হচ্ছিল খুব। রাগটাই প্রথমে প্রকাশ পেল। বললুম, “আপনি তো আচ্ছা লোক মশাই। এইখানে এই জঙ্গলে এসে লুকিয়ে রয়েছেন, আর ওদিকে কলকাতায় সকলের নাওয়া-খাওয়া বন্ধ!”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এটা জঙ্গল হবে কেন, অতি চমৎকার জায়গা : রাত্তির বলে বুঝতে পারছেন না, সকাল হলে বুঝবেন।…..আর হ্যাঁ, কারও নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হবারও তো কিছু নেই। কাউকে কিছু না-বলে কাল আগরতলায় চলে আসতে হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এখানে পৌঁছেই তো দীপককে দিয়ে কলকাতায় ফোন করানো হয়। কেন, মালতী কোনও ফোন পায়নি?”

দীপক এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবারে বলল, “আপনি তো কলকাতার দুটো নম্বর আমাকে দিলেন। একটা বালিগঞ্জের, একটা ধর্মতলার। বালিগঞ্জের নাম্বারটা লাগতে পারিনি।”

আমি বললুম, “কী করে লাগবে, মালতীদের বাড়ির নাম্বারটা কাল সকাল সাড়ে-দশটার পর থেকেই খারাপ।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাই?” তারপর দীপকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আর ধর্মতলার চেম্বারের নাম্বারটা?”

দীপক বলল, “সেটাও প্রথম দিকে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক চেষ্টা করে রাত আটটা নাগাদ পাওয়া গেল।”

“ডাক্তারবাবুকে পেয়েছিলে?”

“তা পেয়েছিলুম। কিন্তু আপনি যে ভাল আছেন, আর মিঃ চ্যাটার্জিকে যে আজ দুপুরের ফ্লাইটে আগরতলা আসতে হবে, এর বেশি আর কিছুই বলতে পারিনি। লাইন কেটে গেল।”

“তা হলে আজ সকালে আবার ফোন করলে না কেন? কাল থেকে আজ বিকেল পর্যন্ত তো তুমি আগরতলাতেই ছিণে। অনায়াসেই আজ একটা ফোন করে ডিটেলস জানাতে পারতে।”

আমি বললুম, “ফোন করে কোনও লাভ হত না। চেম্বার বন্ধ। অরুণের মায়ের খুব অসুখ। ওরা তাই বেহালার বাড়িতে চলে গেছে।”

“আপনাকে যে এখানে আসতে হবে, এ-কথা আপনাকে কে জানাল? অরুণ?”

“না। ওঁদের এক প্রতিবেশী। নাম বললেন, প্রমোদ সেন। তা ছাড়া অরুণের চিঠি নিয়ে শশাঙ্ক….মানে অরুণের চেম্বারের রিসেপশনিস্ট আজ সকালে আমাদের বাড়িতে এসেছিল। অরুণের চিঠি পড়ে শুধু এইটুকু জানা গেল যে, ‘আজই আমাকে এখানে আসতে হবে। আপনি যে ভাল আছেন, চিঠিতে তারও উল্লেখ ছিল। কিন্তু কোথায় আছেন, কাদের কাছে আছেন, কেনই বা জগিং করতে গিয়ে হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে গেলেন, সে-সব কিছু জানায়নি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিজে জানলে তো আপনাকে জানাবে। দীপকের কথা তো শুনলেন, অরুণকে সব কথা খুলে বলবার সুযোগই ও পায়নি, তার আগেই লাইন কেটে যায়।”

দীপক বলল, “লাইনে খুব ডিলটারব্যান্সও হচ্ছিল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাক, ও সব কথা পরে হবে। অরুণদের বেহালার বাড়ির ফোন-নাম্বারটা আমার কাছে আছে। তুমি বরং কাল সকালেই একবার আগরতলা গিয়ে বেহালায় একটা ফোন করে সব জানাও। অরুণের মা এখন কেমন আছেন, সেই সময়ে সেটাও জেনে নিয়ো।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই, ভিতরে চলুন। ওঁরা অপেক্ষা করছেন।”

একেবারে যে ভিতরে ঢুকলুম তা নয়। একতলার সামনের বারান্দাটা দেখলুম বেশ চওড়া, তার উপরে সোফা সেটি দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো। মেঝেতে দড়ির কার্পেট। চারদিকে কাচের দেওয়াল। কাঠের চৌকো চৌকো ফ্রেমের মধ্যে কাচগুলিকে বসানো হয়েছে, বাইরের দৃশ্য যাতে সহজেই চোখে পড়ে, চোখ আটকে না যায়। বাইরে অবশ্য এখন অন্ধকার, তাই কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। বারান্দার একদিক থেকে একটা কাঠের সিঁড়ি দোতলায় উঠে গেছে। বুঝলুম এই বারান্দাটাকেই বসবার ঘর হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

মাঝখানের সোফাটায় যিনি বসে ছিলেন, কাগজে তাঁর ছবি আমি দেখেছি, তাই চিনতে অসুবিধে হল না। বঙ্কুবিহারী ঘোষ। একমাথা সাদা চুল, মুখ নিচু করে তিনি কিছু ভাবছিলেন। আমরা এসে ঢুকতে তিনি মুখ তুললেন, কিন্তু সোফা ছেড়ে উঠলেন না। যেমন বসে ছিলেন, তেমন বসে থেকেই জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার বঙ্কু এসেছেন চারু?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ। হঠাৎ ঝড়বৃষ্টি আরম্ভ হল তো, তাই পৌঁছতে একটু দেরি হয়ে গেল।”

লক্ষ করলুম, প্রশ্নটা ভদ্রলোক ভাদুড়িমশাইকে করলেও তাঁর চোখ দুটি ছিল আমার দিকে। এবারে ভাদুড়িমশাইয়ের গলা শুনে তিনি তাঁর দিকে চোখ ফেরালেন। বললেন, “চা আনতে বলি। তোমার বন্ধুর তো ধকল নেহাত কম হয়নি। রাতটা উনি বিশ্রাম নিন, কাজের কথা কাল সকালে হবে। এখন চা খাও। আমিও তোমাদের সঙ্গে এক কাপ খাব।”

গাড়ির শব্দ পেয়েই সম্ভবত উনুনে চায়ের জল চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বঙ্কুবাবুকে তাই আর কাউকে ডেকে চায়ের কথা বলতে হল না, ট্রের উপরে চায়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে ভিতরের দিকের দরজার পর্দা সরিয়ে উর্দি পরা একজন বেয়ারা এসে ঘরে ঢুকল। তার পিছন-পিছন এলেন একজন মহিলাও। বেয়ারাকে বললেন, “এখন তুমি যাও, দরকার হলে আমি ডাকব।”

ভদ্রমহিলার বয়স মনে হল বছর চল্লিশ। প্রসাধন একটু উগ্র রকমের। ঠোঁটে পুরু লিপস্টিক। ভুরু একেবারে ধনুকের মতো বাঁকানো। ওটা যে স্বাভাবিক ভুরু নয়, প্লাক করে ওকে ওই আকৃতি দেওয়া হয়েছে, দেখবামাত্র সেটা বোঝা যায়। পরনে স্লিভলেস ব্লাউস, শিফনের শাড়ি। পায়ে মখমলের চটি। বয়স যা-ই হোক, চেহারায় একটা খুকি খুকি ভাব অনেকেই বজায় রাখতে চান। ইনিও সম্ভবত তা-ই চাইছেন। মুখটা চেনা-চেনা মনে হল, কিন্তু কোথায় দেখেছি, তক্ষুনি তা মনে করতে পারলুম না।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বসুন মিসেস ঘোষ। একটা ভাল খবর দিচ্ছি। কাজটার জন্যে আমরা যাঁকে চাইছিলুম তিনি এসে গেছেন।”

ভদ্রমহিলা পট থেকে পেয়ালায় চা ঢালছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে সামান্য হেসে মাথাটা একটু নোয়ালেন। তারপর আবার পেয়ালার দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, “ওঁরটা তো জানি, আপনারটাও এই দু’দিনে জেনে নিয়েছি, মিঃ চ্যাটার্জির কতটা দুধ-চিনি লাগবে?”

বললুম, “দুধ চিনি লাগবে না। আমি স্রেফ লিকার খাই।’

মিসেস ঘোষ আবার সামান্য হাসলেন। বললেন, “বাঃ, একেবারে আমারই মতন।”

কাপে কাপে চা ঢালা হয়ে গিয়েছিল। সোফা থেকে উঠে গিয়ে আমি আর ভাদুড়িমশাই আমাদের কাপ দুটো নিয়ে এলুম। ভদ্রমহিলা তাঁর স্বামীর দিকে একটা কাপ এগিয়ে দিয়ে বললেন, “তোমারটা নাও।”

লক্ষ করলুম বঙ্কুবাবু হাত বাড়িয়ে দিলেন বটে, কিন্তু ঠিক যে কাপটার দিকেই, তা নয়। ফলে মিসেস ঘোষ তাঁর সোফা থেকে উঠে গিয়ে স্বামীর হাতে কাপটা ধরিয়ে দিলেন। বললেন, “খাওয়া হয়ে গেলে নিজেই যেন আবার কাপটা নামিয়ে রাখতে যেয়ো না। আমাকে বোলো, আমি নামিয়ে রাখব।”

যা সন্দেহ করেছিলুম, সেটাই তা হলে ঠিক। বঙ্কুবাবু হয় আদৌ কিছু দেখতে পান না, অথবা খুবই কম দেখতে পান।

ভাদুড়িমশাইয়ের চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সাইড টেবিলে কাপ-প্লেট নামিয়ে রেখে তিনি বললেন, “মিঃ চ্যাটার্জি তো এসেই গিয়েছেন, কিন্তু আমি বলি কী,কাজের কথাটা আজ না হয়ে কাল হলেও ক্ষতি নেই।

আমি বললুম, “কাজ তো একটা স্ক্রিপট লেখা, তাই না?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে তো দেখছি জানেনই। কিন্তু কথাটা আপনাকে কে বলল?”

হেসে বললুম, “আপনি অবশ্যই বলেননি।

“তা হলে?”

“দীপক বলেছে। ওর কাছেই শুনলুম যে, সেইজন্যই আমাকে তলব করা হয়েছে এখানে।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আহা-হা, ব্যাপারটা ওভাবে নিচ্ছেন কেন? আপনি একজন বিখ্যাত লেখক, আর আমরা নেহাতই ব্যাবসা করে খাই। আমরা কি আপনাকে তলব করতে পারি? ও নো নো, কাইগুলি এটাকে ওভাবে নেবেন না। আমরা আপনার সাহায্য চাই, আর আপনি আমাদের সাহায্য করতে কষ্ট করে এখানে এসেছেন। তার জন্যে আমরা কৃতজ্ঞ।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “অ্যান্ড অ্যাজ এ টোকেন অব আওয়ার গ্র্যাটিচিউড, উই শ্যাল পে ইউ হ্যান্ডসামলি।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আহা-হা ডলি, ইউ হ্যাভ এ টেনডেনসি অব সেয়িং দি রং থিং অ্যাট দি রং মোমেন্ট। এখুনি পেমেন্টের কথা তুলছ কেন? দয়া করে আগে উনি রাজি হোন, ও-সব কথা তার পরে উঠবে।”

আমি বললুম, “কী করে রাজি হব? আমি লিখি বটে, কিন্তু সব লেখাই কি এক গোত্রের? স্ক্রিপট লেখার একটা আলাদা টেকনিক আছে। আমি সে-সব জানি না। তা হলে আমি কী করে স্ক্রিপট লিখব?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “সে কী, আপনি কখনও ফিল্মের গল্পের স্ক্রিপট লেখেননি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিনয় খুবই ভাল জিনিস, কিরণবাবু, কিন্তু সেটা একটা মাত্রার মধ্যে থাকা চাই। আপনার বিনয় দেখছি মাত্র। হাড়িয়ে যাচ্ছে। ……ওহে বঙ্কু, আমার এই বন্ধুটির কথা বিশ্বাস কোরো না।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “আরে আমি কেন বিশ্বাস করতে যাব? আমি মাল বেচে খাই, লোক চিনতে আমার ভুল হয় না। মিঃ চ্যাটার্জি যে সাচ্চা লোক, সে আমি ওঁর কথা শুনেই বুঝেছি। এখন তুমি ওঁকে রাজি করাও চারু।”

ঢোক গিলে বললুম, “কিন্তু……”

কথাটা শেষ করতে পারলুম না। ভাদুড়িমশাই একেবারে গর্জন করে উঠে বললেন, “ঢের হয়েছে, কিরণবাবু, আর কিন্তু-কিন্তু করবেন না। কী ভেবেছেন আপনি বলুন তো? ইতালিয়ান গবর্নমেন্টের হয়ে গোটা কয়েক ডকুমেন্টারি করবার প্রোজেক্ট নিয়ে যেহেতু গত কয়েক বছর আমি বিদেশে ছিলুম তাই দেশের কোনও খববই আমি রাখি না, কেমন? এই যে ভেনিসের ফিল্ম ফেস্টিভালে ‘প্রদীপের নীচে’ ফিল্মটা স্পেশ্যাল অ্যাওয়ার্ড পেল, তার চিত্রনাট্য তো আপনারই লেখা। তা হলে?”

ভাদুড়িমশাই গত কয়েক বছর বিদেশে ছিলেন? তাও আবার ডকুমেন্টারি করবার জন্যে? কই, আমি তো কিছুই জানি না। হ্যাঁ, মেয়ে-জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করবার জন্যে গত সেপ্টেম্বরে আমেরিকায় গিয়েছিলেন বটে, কিন্তু সেখানে মাত্র মাসখানেক কাটিয়ে তারপর অক্টোবরেই তো দেশে ফিরে আসেন। আর এই ‘প্রদীপের নীচে’! ও-রকম কোনও ফিল্মের নামই আমি শুনিনি, চিত্রনাট্য লেখা তো দূরের কথা।

আমি একেবারে থ হয়ে গেলুম। বলতে যাচ্ছিলুম, ব্যাপার কী বলুন তো, আমি কি অ্যালিসের সেই আজব জগতে এসে পড়লুম নাকি, কোনও কিছুরই তো মাথামুণ্ডু আমি বুঝতে পারছি না। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, ভাদুড়িমশাই তো আবোল-তাবোল কথা বলবার লোক নন, নিশ্চয়ই কিছু একটা ব্যাপার আছে এর মধ্যে। তাই, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের কিছু বলে অবস্থাটার আপাতত সামাল দেওয়াই ভাল।

আমতা আমতা করে বললুম, “ওটা…মানে ওই স্ক্রিপটটা তো? ওটা তো বছর কয়েক আগে লেখা, আসলে ওরাই বইটা তুলতে একটু দেরি করে ফেলল। কিন্তু ওটার স্ক্রিপট লিখতে পেরেছি বলেই যে এটারও পারব, তার তো কোনও মানে নেই। গল্পটাই তো এখনও দেখিনি।”

ভাদুড়িমশাই বঙ্কুবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী হে বঙ্কু, ঠিক বলেছিলুম কি না? না না, ও নিয়ে তুমি ভেবো না। কিরণবাবুকে যখন পেয়েছি, তখন আওয়ার প্রবলেম ইজ সল্ভড।” তারপর আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে, “আরে মশাই, গল্প নিয়ে ভাববেন না। গল্প মিসেস ঘোষেরই। তবে প্লটটা আমাকে শুনিয়েছেন মাত্র, এখনও লিখে ফেলতে পারেননি। দারুণ প্লট। স্রেফ ওরই জন্যে ফিল্মটা নির্ঘাত হিট হবে।”

মিসেস ঘোষ বললেন, “প্লটটা আপনার বন্ধুকে বলব?”

“না, না, এখন নয়, এখন নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল তো আমরা লোকেশন ঠিক করতে সাগরমহল যাচ্ছি। সারাটা দিন ওখানে থাকব। রাত্তিরটাও ওখানেই কাটাবার ইচ্ছে। সুতরাং বিস্তর সময় তখন পাওয়া যাচ্ছে।”

আমি বললুম, “বলেন তো এখনও শুনতে পারি। আমার কোনও আপত্তি নেই।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “থাক, ডলি, আজ উনি খুব ক্লান্ত, সারাটা দিন জার্নির ধকল গেছে, আজ উনি তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়ুন। উই শুড়নট রাশ হিম। কী বলো চা, ঠিক বলিনি?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তুমি তো এ পর্যন্ত বেঠিক কিছু বলোনি। এটাও ঠিকই বলেছ।”

মিসেস ঘোষ উঠে পড়লেন। বললেন, “আপনারা মুখ-হাত ধুয়ে নিন, আমি ওদিকে যাই। কিন্তু দীপক কোথায় গেল?”

ড্রইং রুমের লাগোয়া ঘরেই ছিল দীপক। সম্ভবত সেখানে থেকে কথা শুনছিল আমাদের। বেরিয়ে এসে বলল, “আমাকে কিছু বলবে?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “তুইও মুখ-হাত ধুয়ে নে। একটু বাদে খেতে দেব। আর হ্যাঁ, শঙ্কর কোথায়? তাকে দেখছি না যে? আগরতলায় ফিরে যায়নি তো?”

“ফিরে যেতে চেয়েছিল। আমি যেতে দিইনি। কাল তো তোমরা সবাই সাগরমহলে যাচ্ছ, তার জন্যে অন্তত দুটো গাড়ি লাগবে। শঙ্করকে তাই আটকে রেখেছি।”

“ঠিক করেছিস।”

কথাটা বলে মিসেস ঘোষ ভিতরে চলে গেলেন।

দীপক আর পাশের ঘরে ঢুকল না। আমার পাশের সোফাটায় বসে পড়ে বলল, “আমি তো কাল আবার আগরতলায় যাচ্ছি, আপনাদের সব ঠিক আছে তো?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “অ্যাবসলিউটলি। মিঃ চ্যাটার্জি প্রথমটায় রাজি হচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছেন। নইলে খুব মুশকিলে পড়তুম।”

বঙ্কুবাবু বললেন, “লেখক মানুষ তো, খুব সাবধানে তাই হ্যান্ডল করতে হয়। তোমার দিদি সেটা বোঝেন না। টাকার কথা তুলে এক্ষুনি সব ভণ্ডুল করে দিচ্ছিলেন। আরে বাবা, টাকা তো আমরা দেবই কিন্তু শুধু টাকা ঢাললেই কি মনের মতো কাজ পাওয়া যায়? নাকি টাকার লোভ দেখিয়ে রাজি করানো যায় সবাইকে?” এমনভাবে কথাটা বললেন বঙ্কুবাবু, যেন ব্যাপারটা তাঁর মতন আর কেউ বোঝে না। যেন সারা জীবন শুধু লেখক হ্যান্ডল করেই তিনি কাটিয়েছেন।

খানিকটা সময় গল্প করে কাটল। সিনেমার গল্প নয়, ত্রিপুরার মানুষজন আর বন-জঙ্গল পাহাড়-নদীর গল্প। শুনলুম বাইরে থেকে এখন যতটা শান্ত দেখাচ্ছে, এই অঞ্চল বরাবর ঠিক ততটাই শান্ত ছিল না। অশান্তির আগুন যে এখনও মাঝে-মাঝে জ্বলে ওঠে না, তা নয়, তবে তার মূলে রয়েছে সেই রকমের ইন্ধন, যা শুধু রাজনীতিকরাই জুগিয়ে থাকেন। সেটা যে কোথায় তাঁরা জোগান না বলা শক্ত। দেশের আর-পাঁচটা জায়গায় যে আগুন জ্বলছে, তার ইন্ধন তো তাঁরাই জোগাচ্ছেন। এ ব্যাপারে ত্রিপুরাকে অতএব আলাদা করে দেখবার জো নেই।

বেয়ারা একটু আগে এসে কাপ-প্লেট তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এবারে ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনারা আসুন, খেতে দেওয়া হয়েছে। ….মি চ্যাটার্জি, বেয়ারা আপনার হ্যান্ডব্যাগটা উপরে তুলে দিয়েছে, ওই মানে উপরে যে ঘরটায় আপনি থাকবেন। ইচ্ছে করলে আগনি জামাকাপড় পালটে আসতে পারেন।”

বললুম, “দরকার হবে না। খাওয়া শেষ করে তারপর উপরে যাব।”

দীপক বলল, “ভাঞ্জা কোথায়? তাকে দেখছি না যে?”

মিসেস ঘোষ বললেন, “রামু? ওর একটু মাথা ধরেছিল, তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়েছে।”

ভিতরে ডাইনিং হল। আমরা গিয়ে খেতে বসলুম। খেতে-খেতেই লক্ষ করলুম যে, মিসেস ঘোষকে একটু গম্ভীর দেখাচ্ছে। কারণটা হয়তো এই যে, এখনও তিনি তাঁর গল্পের প্লটটা আমাকে শুনিয়ে দেবার সুযোগ পাননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *