চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
২০
পুবে-দক্ষিণে খোলা হলেও ঘরটায় যে আলো জ্বেলে রাখা হয়ছে, তার কারণ আর কিছুই নয়, পুব আর দক্ষিণ দিকের জানলায় ঝুলছে মোটা কাপড়ের পর্দা। পীতাম্বরও আমার সঙ্গে উপরে উঠে এসেছিল। বলল, “পর্দা সরিয়ে দেব স্যার? বাইরে কিন্তু হাওয়া এখন গরম।”
বললুম, “এই মার্চ মাসে আর কত গরম হবে? পর্দা সরিয়ে অন্তত দক্ষিণের জানালা দুটো খুলেই দাও।”
জানালা খুলে দিতেই দক্ষিণের হাওয়া যেন হুহু করে ছুটে এল। পীতাম্বর বলল, “আপনি বিশ্রাম করুন। যদি কিছু দরকার হয়, বিছানা থেকে আপনাকে উঠতে হবে না, খাটের শিয়রে সুইচ লাগানো আছে, ওটা টিপলেই কেউ-না কেউ এসে যাবে।”
পীতাম্বর চলে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটা কথা মনে হওয়ায় পিছন থেকে তাকে ডেকে বললুম, “সাধারণত এই ঘরটায় কে থাকেন পীতাম্বর?”
“থাকবার কথা তো ছিল বড়দাদাবাবুর। কিন্তু এত হাওয়া তাঁর পছন্দ নয়। বলেন যে, বাতাস বইলেই খাতাপত্তর উড়ে যায়, তাতে তাঁর পড়াশুনোর ব্যাঘাত হয় বড্ড। প্রথম থেকেই তিনি তাই এই দোতলারই পিছন-দিককার একটা ঘরে থাকেন।”
“বড়দাদাবাবু খুব পড়াশুনোর ভক্ত বুঝি?”
“খুব।” পীতাম্বর বলল, “এতগুলো পাশ দিয়েছেন, তবু পড়াশুনোর কামাই নেই। এখনও দিনরাত্তির বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকেন। ছেলেবেলা থেকেই যে চোখ খারাপ, সে তো এইজন্যেই। চশমা ছাড়া এক দন্ড চলে না।”
কথাটা অন্য দিকে ঘুরে যাচ্ছিল। তাই বললুম, “কিন্তু এ-ঘরে তা হলে থাকেন কে?”
“আগে ছোটদাদাবাবু থাকতেন, এখন কেউ থাকে না। ওই মানে আপনাদের মতন কেউ যখন আসেন, তখন এ-ঘর খুলে দেওয়া হয়।”
“বাবু আর গিন্নিমা থাকেন কোথায়?”
“তাঁরা নীচেই থাকেন।”
“এ-বাড়িতে আর কে-কে থাকে?”
“আর যারা থাকে, তারা সবাই কাজের লোক। তা ধরুন, সব মিলিয়ে কাজের লোকও কম নয়, চোদ্দোজন। ড্রাইভারই তো তিনজন। তা ছাড়া মালি আছে, দরোয়ান আছে, রান্নার ঠাকুর আছে, বেয়ারা আছে, বাবুর্চি আছে, সেইসঙ্গে আমরাও আছি। তবে আমরা কেউই রাত্তিরে এই বড়বাড়িতে থাকি না, গেটের পাশে আমাদের আলাদা ঘর আছে। অনেকে আবার কাছেপিঠে থাকে, এখানকার কাজকর্ম সেরে তারা যে-যার বাড়িতে চলে যায়।”
পীতাম্বর চলে গেল। জানালার সামনেই লন। তরপরে গেট। গেটের সামনে রাস্তা। রাস্তার ওদিকে কোনও ঘরবাড়ি কি দোকানপাট নেই। ধুধু মাঠ। এখান থেকে সব স্পষ্ট চোখে পড়ে। হুহু করে ঘরে এসে বাতাস ঢুকছিল। পীতাম্বর যা-ই বলুক, এমন-কিছু গরম বাতাস নয়। গরম হবার কথাও নয়। একে তো এখন বসন্ত কাল, তার উপরে পাশেই নদী, বাতাস তা হলে গরম হবে কেন। ঘরের দেওয়ালে একটা এয়ার কন্ডিশনার যন্ত্র বসানো রয়েছে দেখলুম, কিন্তু সুইচ টিপে সেটা চালাবার কোনও দরকার আছে বলে মনে হল না। জানালা খোলা রেখে বিছানায় এসে শুয়ে পড়লুম।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম জানি না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। ফোন বাজছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম প্রায় ছটা বাজে। ফোন তুলে নিয়ে বললুম, “হ্যালো…”
“মিঃ ভাদুড়ি?”
“মিঃ ভাদুড়ি একটু বাইরে গেছেন, ফিরতে রাত হবে। আপনি কে কথা বলছেন?”
ওদিক থেকে যিনি কথা বলছিলেন, প্রশ্নটার তিনি কোনও জবাব দিলেন না। শুধু বললেন, “ঠিক আছে, রাত দশটার পরে আমি আবার ফোন করব।”
হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে, বোম্বাই থেকে ফোন আসবার কথা আছে। কোড নাম্বারটা মনে ছিল, তাই আর পকেট ডায়েরি খুলে সেটা দেখে নেবার দরকার হল না। বললুম, “কোড নাম্বার ফাইভ জিরো ডাব্ল এইট। কোনও মেসেজ আছে?”
জবাব এল, “এইটুকু জানিয়ে দেবেন যে, দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছি, কিন্তু ওই নামের কাউকে তাঁরা কোচ করেননি। অন্য কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করবার চেষ্টা চলছে। খবর থাকলে জানাব। মেসেজ এন্ডস।”
লাইন কেটে গেল। বুঝলুম, ওদিক থেকে যিনি কথা বলছিলেন, তিনি রিসিভার নামিয়ে রেখেছেন।
খাটের মাথায় সুইচটা টিপতেই বাইরে থেকে দরজার পর্দা সরিয়ে যে ভিতরে এসে ঢুকল, সে পীতাম্বর নয়, অল্পবয়সী এক ছোকরা। বললুম, “চা খাব। চায়ে দুধ-চিনি থাকবে না। শুধু হালকা লিকার।”
লোকটি কোনও কথা বলল না। ঘরে ঢুকে যেমন একবার মাথা নুইয়েছিল, তেমনই আবার মাথা নুইয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে আমি আবার ঘরে ফিরে এলুম। চা এল মিনিট পাঁচেক বাদে। খাটের পাশের টিপয়ের উপরে চায়ের ট্রে নামিয়ে রেখে লোকটি বলল, “বড়বাবু আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান। উপরে আসতে বলব?”
বললুম, “ওঁকে উপরে আসতে হবে না। বলো যে, আমিই একটু বাদে নীচে নামছি।”
এখানে এসে অবধি জামাকাপড় পালটানো হয়নি। চা খেয়ে ওয়ার্ডরোবের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। পশ্চিমের দেওয়ালে জানালা নেই। দু’দিকে দুটো ওয়ার্ডরোব। মাঝখানের জায়গাটা জুড়ে বিশাল একটা কাচের আলমারি। তাতে বই বোঝাই। এতক্ষণ খেয়াল করিনি, এবারে নজর করে দেখলুম যে, প্রায় সবই খেলার বই। ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস, কোনও বিষয়েই বইয়ের কিছু কমতি দেখলুম না। উইজডেনের সঙ্কলনগুলোও একটা তাকে দেখলুম পরপর সাজানো রয়েছে। বইগুলোর প্রায় সবই যে খেলাধুলোর বিষয়ে, এইটে দেখে প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলুম। পরক্ষণেই বিস্ময়টা কেটে গেল। মনে পড়ে গেল যে, এ-ঘরে লক্ষ্মণ থাকত। যা খেলা-পাগল ছেলে, তাতে রাজ্যের খেলার বই দিয়ে আলমারি বোঝাই করবে, এটাই তো স্বাভাভিক।
ওয়ার্ডরোব খুলে জামাকাপড় পালটে নীচে নামতে গিয়ে রামুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কাঁধ থেকে এখনও সেই স্লিং ঝোলানো। এক হাতে একটা বই ধরে সেটা পড়তে-পড়তে অন্যমনস্কভাবে একতলা থেকে দোতলায় উঠে আসছিল, প্রথমটায় আমাকে দেখতে পায়নি। আমিই বললুম, “কী খবর রামু?”
রামু নিশ্চয় বইখানার মধ্যে একেবারে ডুবে গিয়েছিল। নইলে আমার গলা শুনে অমন চমকে উঠত না। পরক্ষণেই হেসে বলল, “আপনারা যে এসেছেন তা জানি। তবে পীতাম্বর বলল, আপনি বিশ্রাম করছেন। তাই আর বিরক্ত করিনি। চারুকাকা কোথায়?”
“তিনি একটু ভুবনেশ্বরে গিয়েছেন। ফিরতে রাত হবে।”
আমার পাশ দিয়ে রামু আবার উপরে উঠতে যাচ্ছিল, বললুম, “একটু দাঁড়াও তো।”
“কিছু বলবেন?”
“মাত্র একটা কথাই বলব। সিপাহিজলায় তুমি যে কেন সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়েছিলে, এখন সেটা বুঝতে পারছি। বই পড়তে-পড়তে কেউ সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করে?”
রামু হাসল। তারপর উপরে উঠে গেল। পীতাম্বর মনে হল ঠিকই বলেছে। বঙ্কুবাবু তো বলতে গেলে চোখেই দেখেন না, এখন পড়তে-পড়তে রামুও না তার চোখের বারোটা বাজায়। বইখানার নাম দেখলুম, ‘মডার্ন মেথডস অব ডাটা প্রসেসিং’। বাবা রে বাবা, সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে-উঠতে ও-সব বই অত মগ্ন হয়ে পড়বার কোনও মানে হয়?
ড্রইংরুমে ঢুকে দেখি, বঙ্কুবাবু সেখানে সস্ত্রীক বসে আছেন। মিসেস ঘোষের ভুরুজোড়া আবার যথাস্থানে ফিরে এসেছে। ভদ্রমহিলা একটা ফিল্ম ম্যাগাজিন পড়ছিলেন। আমাকে দেখে ম্যাগাজিনটা পাশে নামিয়ে রেখে বললেন, “একটা কথা ভাবছি।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “বলো।”
“কথাটা আমি তোমাকে বলিনি, মিঃ চ্যাটার্জিকে বলছি।”
“কিরণবাবু এসে গেছেন নাকি?” ভিতরের দরজার দিকে মুখ ফিরিয়ে বঙ্কুবাবু বললেন, “আরে, আসুন, আসুন। একটু ঘুমিয়ে নিতে পেরেছেন তো?”
বললুম, “একটু কেন, বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছি।”
“তা হলে জলখাবার দিতে বলি?”
“কী যে বলেন! অত বেলায় খেয়েছি, তারপরে আর এখন কিছু খাওয়া সম্ভব? না না, এখন আর কুটোটিও দাঁতে কাটতে পারব না। তবে হ্যাঁ, একটু আগেই যদিও চা খেয়েছি, তবু আর এক কাপ হয়তো চলতে পারে।”
পীতাম্বরকে ডেকে মিসেস ঘোষ চায়ের অর্ডার দিলেন। তারপর বঙ্কুবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার কি আর-কিছু বলার আছে?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “এখন আর-কিছু বলার নেই। আগে উনি চা খান, পরে বরং অন্য বিষয়ে কথা বলা যাবে।”
মিসেস ঘোষ বললেন, “তা হলে আমার কথাটা এবারে বলতে পারি, কেমন?”
“বিলক্ষণ।”
মিসেস ঘোষ বললেন, “দেখুন কিরণবাবু, ভুবনেশ্বর ফিরে অবধি একটা কথা ভাবছি। এখানকার পাহাড়ে ওই যে জাপানি বুদ্ধ মন্দির রয়েছে, ওটাকে আমাদের স্টোরির মধ্যে কোনওভাবে ঢোকানো যায় না? মানে… কী জানেন… লিঙ্গরাজ টেম্পল আর জগন্নাথ টেম্পল তো সবাই দেখেছে, কিন্তু ওই বুদ্ধমন্দির অনেকেরই দেখা হয়নি। চমৎকার আর্কিটেকচার, ভিড়ভাট্টা নেই, শুটিংয়েরও তাই খুব সুবিধে, নানান অ্যাংগল থেকে ছবি তোলা যাবে, তাই ভাবছিলুম…”
বললুম, “এ আর বেশি কথা কী, বলেন তো নীরমহল কি ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দিরের বদলে এখানকার ওই বুদ্ধমন্দিরকেই ঢুকিয়ে দেব।”
মিসেস ঘোষ আমার কথা শুনে এমন আঁতকে উঠলেন যে, পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নিয়ে বললুম, “অবশ্য বদলাবদলিরই বা দরকার কী, সবই থাক না। দ্য মোর দ্য মেরিয়ার। …না না, ও নিয়ে আপনি ভাববেন না।”
চা এসে গিয়েছিল। যতক্ষণ এখানে থাকব, ততক্ষণই যে মিসেস ঘোষের পাগলামির সঙ্গে আমাকে পাল্লা দিতে হবে, সেটা বুঝতে পেরে গিয়েছিলুম বলেই প্রায় জিভ পুড়িয়ে চা খেয়ে উঠে পড়লুম আমি। বললুম, “ ও বেলা স্নান করা হয়নি। আপনারা বসুন, আমি বরং স্নানটা সেরে নিই।”
উপরে চলে এলুম। বাথরুমে ঢুকতে যাচ্ছি, হঠাৎ আবার ফোন বেজে উঠল। ফিরে এসে রিসিভার তুলে বললুম, “হ্যালো?”
“মিঃ ভাদুড়ি কি ফিরেছেন?”
সেই গলা। বুঝতে পারলুম, বোম্বাই থেকে সেই মানুষটিই আবার কথা বলতে চাইছেন। এবারে আর কোড নাম্বার জানাতে একটুও দেরি হল না। বললুম, “কোড নাম্বার ফাইভ জিরো ডাবল এইট। কোনও মেসেজ আছে? থাকলে আমাকে দিতে পারেন।”
“দিস ইজ ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট। মিঃ ভাদুড়ি ফিরবামাত্র তাঁকে মেসেজটা দেবেন। বলবেন যে, উনি যার খোঁজ চান, সে রমাকান্ত আচরেকরের কাছে কোচিং নিত। রেগুলারলি নিত না। ছ-মাস অন্তর অন্তর পনেরো দিনের জন্য বোম্বাইয়ে আসত। আচরেকর তখন তাকে কোচ করতেন। শুনলুম, হি ওয়াজ অ্যান এক্সেপশনালি ব্রাইট ট্রেনি অ্যান্ড ওয়াজ শিওর টু ফাইন্ড ও প্লেস ইন দ্য ইন্ডিয়ান ইলেভেন অ্যাজ অ্যান অলরাউন্ডার। কিন্তু গত মে মাসের গোড়ায় পনেরো দিনের কোচিং নিয়ে সেই যে চলে যায়, তারপরে আর গত ন-মাসের মধ্যে সে আসেনি। ….না, কোনও খবরও দেয়নি। মিঃ আচরেকর তাই নিয়ে খুব আক্ষেপ করছিলেন।….মেসেজ এন্ডস।”
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, আটটা। আর দেরি করা ঠিক হবে না। চটপট বাথরুমে ঢুকে পড়া দরকার, নইলে আবার নীচতলা থেকে ডাক পড়তে পারে। বাথরুমে ঢুকে অনেকক্ষণ ধরে স্নান করলুম। বাথটাবে ঠাণ্ডাজল আর গরমজল মিশিয়ে নিয়েছি, তাই বড় আরাম লাগছিল। শুকনো তোয়ালে দিয়ে গা মুছে একেবারে পরিপার্টি হয়ে যখন বেরিয়ে এলুম, নটা বাজতে তখন আর বিশেষ বাকি নেই।
বাথরুম থেকে বেরিয়েই কিন্তু চমকে উঠতে হল। ভাদুড়িমশাই আরামদারায় গা ঢেলে দিয়ে কাগজ পড়ছেন। আমাকে দেখে কাগজখানা সরিয়ে রেখে বললেন, “স্নান করতে এত সময় লাগে আপনার? বাবা রে, আমার তো ভয় হচ্ছিল যে, আপনি বোধহয় বাথরুমের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছেন!”
বললুম, “সাধারণত এর অর্ধেক সময়ও লাগে না। আজ যে এত সময় লাগল, তার কারণ আর কিছুই নয়, মিসেস ঘোষ। ধৌলি পাহাড়কেও তিনি তাঁর ফিল্মের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু সে-কথা থাক, আপনি মনে হচ্ছে একটু তাড়াতাড়িই ফিরলেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজ তো কমপ্লিট। তা হলে আর ভুবনেশ্বরে বসে থেকে কী করব?”
“বম্বে থেকে ফোন করেছিল। দুবার। একবার ছটার একটু আগে, একবার আটটা নাগাদ। প্রথম মেসেজটা জরুরি নয়, দ্বিতীয়টা জরুরি।’
“বলে ফেলুন।”
“নিশাকর ঘোষ ছ-মাস অন্তর অন্তর বোম্বাইয়ে গিয়ে মিঃ আচরেকরের কাছে পনেরো দিনের জন্যে ক্রিকেটের কোচিং নিত। কিন্তু….
“গত ন-দশ মাসের মধ্যে আর যায়নি। তখন থেকেই সে ভ্যানিশ। কেমন?”
আমি তো তাজ্জব। বললুম, “ কী করে জানলেন?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এতে আর জানাজানির কী আছে। সেভেনটি নাইনের জানুয়ারিতে ওই যে একটা দুপুর আমরা কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে কাটাই, সে সম্পর্ক যতটা আপনার মনে আছে, তা আমি আপনাকে লিখে ফেলতে বলেছিলুম। তো আপনার লেখার মধ্যে দেখলুম অন্য নানা ঘটনার সঙ্গে একটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট ব্যাপার আপনি উল্লেখ করেছেন। লক্ষ্মণকে দিলীপ বেঙ্গসরকর বলেছিল যে, বোম্বাই গেলে লক্ষ্মণের একটা কোচিংয়ের ব্যবস্থা সে করে দেবে। তো সেই কথাটা যে লক্ষ্মণের মনে থাকবে, আর বছর-কয়েক বাদেই সে যে বোম্বাই গিয়ে কোচিং নিতে শুরু করবে, এ তো খুবই স্বাভাবিক।”
“কিন্তু কোচিং নিতে-নিতে সে নিখোঁজ হল কেন?”
“আপনার ওই লেখার মধ্যে কিন্তু এরও একটা উত্তর রয়েছে। ঠিক উত্তর নয়, বরং বলতে পারেন একটা ভাইটাল ক্লু, যা কিনা ওর চরিত্রকে মোটামুটি চিনিয়ে দেয়। আর সেটা যদি চিনতে পারেন, উত্তরটা আন্দাজ করাও তা হলে খুব শক্ত হয় না।”
“একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝতে পারছেন না? শুনুন তা হলে। সেই টেস্ট ম্যাচের ফোর্থ ডে-র শেষের দিকে এমন একটা সময় এসেছিল, ডাবল সেঞ্চুরি করতে গাভাসকরের যখন আর মাত্র আঠারো রান বাকি, অথচ তখনই যদি ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দেওয়া হয়, ইন্ডিয়ার তা হলে জিতে যাবার একটা সম্ভাবনা থাকে। তো লক্ষ্মণ তখন আপনাকে যা বলেছিল, সে তো আপনি নিজেই লিখে রেখেছেন। ও বলেছিল, গাভাসকর আর বেঙ্গসরকর, দুজনেই টিম-ম্যান, দলের স্বার্থেই ইনিংসটা ওরা ডিক্লেয়ার করে দেবে।”
“তা বলেছিল বটে, কিন্তু তাতে কী বোঝা গেল?”
“এইটে বুঝলুম যে, টিম-ম্যানদের যারা শ্রদ্ধা করে, তারা নিজেরাও বড় একটা স্বার্থপর হয় না। আমার ধারণা, লক্ষ্মণ ইজ আ টিম-ম্যান হিমসেলফ, হি হেটস টু লেট দ্য টিম ডাউন।”
ভাদুড়িমশাই খুব মিষ্টি করে হাসলেন। তারপর বললেন, “এবারে বুঝলেন তো?”
কিছুই বুঝিনি। কিন্তু সেটা বলবার অবকাশ পাওয়া গেল না। পর্দা সরিয়ে পীতাম্বর এসে ঘরে ঢুকল। “খেতে দেওয়া হয়েছে। আপনারা আসুন বাবু।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সাড়ে নটা বাজে। চলুন, আর দেরি করা ঠিক হবে না।”
আমরা নীচে নেমে ডাইনিং হলে ঢুলুম।
খেতে-খেতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোমার অফিসটা কোথায় বঙ্কু?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “আউটহাউসের একতলাটাই তো অফিস। কেন, তোমরা দ্যাখোনি?”
“খেয়াল করিনি।”
“না-করাই স্বাভাবিক। আজ তো রবিবার। অফিসে যারা কাজ করে, তারা কেউ আসেনি।”
“কজন কাজ করে ওখানে?”
“ম্যানেজারকে নিয়ে পাঁচজন। ওতেই চলে যায়। কাজ তো আসলে এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। তারা যে-সব চিঠিপত্র লেখে, সেগুলো পড়তে হয়, তার জবাব দিতে হয়। তা ছাড়াও কিছু কাজ আছে অবশ্য। সেগুলো ওরা হ্যান্ডল করে না, তার জন্যে একজন সেক্রেটারি রয়েছে। ….তা তোমার কাজ কেমন চলছে? ভুবনেশ্বরে যেজন্যে গিয়েছিলে, সেটা হল?”
“শুধু ভুবনেশ্বরে কেন, কটকেও গিয়েছিলুম।’
“কটকে কোথায়?”
“র্যাভেনশ কলেজের এক অধ্যাপকের বাড়িতে। লক্ষ্মণ তো ওখানেই বি.এ. পড়ত তাই না?”
“হ্যাঁ।” বঙ্কুবাবু বললেন, “ওখানে গিয়ে হদিশ পেলে কিছুর?”
“অধ্যাপক-ভদ্রলোকের কাছে পাইনি। তবে লক্ষ্মণের সঙ্গে কাদের বঙ্কুত্ব ছিল, ভদ্রলোকের কাছে সেটা জেনে নিয়ে তাদের সঙ্গে দেখা করেছিলুম। তো তাদের কাছে কিছু হদিশ পাওয়া গেল। এই যেমন কটকের কোন রেস্তোরাঁয় লক্ষ্মণ আড্ডা দিত, কি ধরো ভুবনেশ্বরের কোন সেলুনে সে চুল কাটত, এই ধরনের টুকিটাকি কিছু খবর।”
খেতে-খেতে রামু একবার মুখ তুলে তাকাল ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে। কিন্তু কিছু বলল না।
মিসেস ঘোষ বললেন, “ফিল্মটার বিষয়ে কিছু ভাবছেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, ডিরেকশানের দায়িত্ব নিয়েছি, আর ফিল্মের কথাটাই ভাবব না? তাও হয় নাকি? তবে কিনা বঙ্কু তো আমার ছেলেবেলার বঙ্কু তাই তার জীবনে এই যে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে, এটার কথাই বা ভুলে যাই কী করে?”
মিসেস ঘোষ বললেন, “ভুলতে কি আমিই পারছি? আমি ওর মা নই, কিন্তু ছেলেবেলা থেকে নিজের হাতে মানুষ করেছি তো। কোথায় যে গেল ছেলেটা।”
বঙ্কুবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এতগুলো কাগজে বিজ্ঞাপন দিলুম, অথচ কেউ একটা খবর পর্যন্ত দিল না। ও কি আর ফিরবে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখা যাক।”
খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমরা উঠে পড়লুম।
দোতলায় এসে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “আগরতলা থেকে চলে আসবার আগের দিন রাত্তিরে বঙ্কুবাবু আপনাকে একটা অনুরোধ করেছিলেন, মনে আছে তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “মনে থাকবে না কেন, পার্টনারশিপের দলিলে রামু যাতে সই করতে রাজি হয়, তার জন্যে তাকে বলতে হবে। তা বলব বই কী, নিশ্চয় বলব। কিন্তু একটা কথা জেনে রাখুন কিরণবাবু। স্বয়ং ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর মহেশ্বর যদি একসঙ্গে এসে অনুরোধ করেন, তা হলেও রামু ওই দলিলে সই করতে রাজি হবে না। কটকে আর ভুবনেশ্বরে কি আর আমি বেড়াতে গিয়েছিলুম মশাই? যে কাজে গিয়েছিলুম সেটা হয়েছে। আর হ্যাঁ, একটু বাদেই আমরা রামুর ঘরে যাব।”
ভাদুড়িমশাই হাসতে লাগলেন।
আমার মনে হল, ব্যাপারটা যেন ক্রমেই আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
