চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
২
মালপত্রের ঝামেলা নেই, যা পরে আছি তা ছাড়া আমার হ্যান্ডব্যাগের মধ্যে রয়েছে গোটা-দুই ট্রাউজার্স আর শার্ট। বেশি দিনের জন্যে তো আর আসিনি। কেন এসেছি তার আঁচ না পেলেও এটুকু আন্দাজ করে নিয়েছি যে, দু-তিন দিনের বেশি আমাকে এখানে থাকতে হবে না, ওতেই অতএব চলে যাবে। হ্যান্ডব্যাগটা হাতে ঝুলিয়ে আমরা এয়াপোর্টের বাইরে এসে দাঁড়ালুম।
জিজাজি অর্থাৎ এর জামাইবাবু লোকটি যে কে, তা এখনও জানা হয়নি। তবে এটা বোঝা গেল যে, তিনি আমাকে চেনেন। তা নইলে আর এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে নিয়ে যাবার জন্যে গাড়ি পাঠিয়ে দেবেন কেন
ওদিকে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকটি আম্বাসাডার আর প্রিমিয়ার গাড়ি। লাল রঙের একটা মারুতিও দেখলুম। আমাদের দেখে মারুতি গাড়িটা এগিয়ে এল। ছেলেটি তার পিছনের দরজা খুলে দিয়ে বলল, “উঠুন।”
গাড়িতে ঢুকে হ্যান্ডবাগটা পিছনের লাগেজ-স্পেসে নামিয়ে রাখলুম। ভেবেছিলুম, ছেলেটি আমার পাশে এসে বসবে। সে কিন্তু সামনের দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসল। তারপর আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, “এর আগে আপনি কভি আগরতলায় এসেছেন?”
বললুম, “না।…..কিন্তু আপনার নামটাই তো এখনও জানা হয়নি।”
“দীপক মালহোত্রা। আপনি আমাকে দীপক বলবেন।”
ড্রাইভার বলল, “তা হলে কি শহরটা ওঁকে একটু দেখিয়ে নিয়ে তারপর সিপাহিজলার দিকে যাব?”
দীপক তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, “মোটে তো সাড়ে-তিনটে বাজে। জিজাজির কথা শুনে যা মালুম করলুম, সাগরমহল থেকে তাঁর বন্ধুকে নিম্নে সাতটা সাড়ে সাতটার আগে তিনি সিপাহিজলায় লোটবেন না। তব তো এখন ঘন্টা দুয়েক আমরা আগরতলায় কাটাতে পারি। অবশ্য এখানে দেখবার মতো কিছু নাই।….ঠিক আছে, চলো, সময়টা তো যা হোক করে কাটাতে হবে।”
গাড়ি চলতে শুরু করল।
দীপক যে বাঙালি নয়, সেটা তার নাম জানবার আগেই বুঝতে পেরেছিলুম। হিন্দির মিশেল দিয়ে বাংলা মোটামুটি ভালই বলে, কিন্তু উচ্চারণ একটু ভাঙা-ভাঙা।
বললুম, “তোমার নাম তো জানা গেল, কিন্তু তোমার জিজাজির পরিচয় এখনও পাইনি।”
সামনের সিট থেকে আবার মুখ ঘোরাল দীপক। বলল, “সে কী, জিজাজিকে আপনি চিনেন না?”
“না।”
“বাট আই থট হি ওয়জ এ ক্লোজ ফ্রেন্ড অব ইয়োর্স। বঙ্কু ঘোষের নাম আপনি শুনেন নাই?”
বললুম, “বঙ্কুবিহারী ঘোষ? ওই মানে যাঁকে একালের এক ফিনানসিয়াল উইজার্ড বলা হয়, তিনি তো?”
“হাঁ, হাঁ, উইজার্ড।” দীপক হেসে বলল, “টেক্সটাইল, ট্রান্সপোর্ট, কেমিক্যালস, হর কিসিমের বিজনেসে তাঁর টাকা খাটছে। তা ছাড়া রয়েছে তিন-তিনটা সিনেমা হল। গোটা চার-পাঁচ ফিল্ম ভি প্রোডিউস করেছেন। তার মধ্যে তিনটেই হিট।”
হেসে বললুম, “তাঁকে কেন চিনব না? তবে তিনিই যে তোমার জিজাজি, তা কী করে জানব? তা ছাড়া আমি নাহয় তাঁকে চিনলুম, কিন্তু আমার মতো সামান্য লোককে তো তাঁর চিনবার কথা নয়। তাতেই একটু অবাক হচ্ছি।”
দীপক বলল, “ও নো, মিঃ চ্যাটার্জি, ইউ আর আন্ডার এস্টিমেটিং ইয়োরসেলফ।
“কী করে বুঝলে?”
“আপনি তো একজন রাইটার, তাই না?”
“ওই একটু লেখালেখি করি।”
“বাস,” দীপক হেসে বলল, “ওরই জন্য জিজাজি আপনাকে চিনেন, আর ওরই জন্যে তিনি আপনাকে ক্লকাতা থেকে এখানে আনিয়েছেন।”
বললুম, “কেন, লেখক দিয়ে তাঁর কী কাজ হবে?”
“বা রে, নতুন যে ফিল্মটা তিনি করবেন, তার কহানির স্ক্রিপট লিখাতে হবে না?”
“তা তো হবেই।”
“তো সেটা আপনি লিখবেন। হা হা।”
জীবনে কখনও ফিল্মের স্ক্রিপট লিখিনি। অথচ, আর-কিছু নয়, স্রেফ স্ক্রিপট লেখাবার জন্য আমাকে কিনা কলকাতা থেকে আগরতলায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিশ্বাস হল না।
দীপক সম্ভবত ভেবেছিল যে, কথাটা শুনে আমি খুব উল্লসিত হব। উল্লাসের লক্ষণ না-দেখে বলল, “কী হল মিঃ চ্যাটার্জি, কিছু বলছেন না যে?”
“কী বলব?”
“বাঃ, গল্পটা কী, কার লিখা, কাস্টের কথা কী ভাবা হচ্ছে, কে হিরো কে হিরোইন, লোকেশন-শুটিং কোথায় চলবে, কিচ্ছু জানবেন না?”
শুকনো গলায় বললুম, “জেনে তো লাভ নেই, স্ক্রিপট যে লিখব তার সময় কোথায়? কলকাতায় আমি বিস্তর কাজ ফেলে এসেছি, যত তাড়াতাড়ি পারি এখান থেকে আমাকে ফিরে যেতে হবে।”
কথাটাকে আমলই দিল না দীপক। বলল, “আরে, সাত দিনের তো মামলা। আমার দিদির লিখা কহানি, তাঁর সঙ্গে বসবেন, এক হপ্তার মধ্যে আপনাকে স্ক্রিপট লিখার কাজ খতম হয়ে যাবে। ব্যস, আপনার ছুট্টি।”
বুঝলুম, পাগলের পাল্লায় পড়েছি, প্রতিবাদ করে কোনও লাভ হবে না। ‘ঠিক আছে’ বলে তাই জানলায় চোখ রেখে বাইরের দৃশ্য দেখতে লাগলুম।
এর আগে আর কখনও আমার আগরতলায় আসা হয়নি। তবে অনেক বছর আগে একবার আগরতলার মাটি ছুঁয়েছিলুম বটে। এদিকে তখন এয়ারবাস চলত না, বোয়িংও না। সেই সময়ে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের ফকার ফ্রেন্ডশিপ প্লেনে একবার শিলচর যেতে হয়েছিল। সে-প্লেন দমদম থেকে আকাশে উঠে প্রথমে নামত আগরতলায়, তারপর আধ-ঘন্টাটাক সেখানে থেমে থেকে তারপর যেত শিলচর। যাঁরা শিলচরের যাত্রী, প্লেন থেকে তাঁদের আগরতলায় নামতে দেওয়া হত না। কিন্তু নেমেছিলুম। জানলা থেকে দেখেই জায়গাটা আমার এত ভাল লেগে যায় যে, পাইলটের অনুমতি নিয়ে টার্মিনাল বিল্ডিং থেকে ঘুরে এসে আমি আবার প্লেনে উঠি।
দীপক বলছিল এখানে দেখবার মতো কিছু নেই। ও কিছু জানে না। আসলে দেখবার মতো কিছু কোথাও আছে কি না, তা নির্ভর করে কে কী দেখতে চায়, তার উপরে। যদ্দুর বুঝতে পারছি, এই ত্রিপুরায় ও বোম্বাইয়ের মেরিন-ড্রাইভের মতন একটা তেল-চুকচুকে রাস্তা দেখতে চায়, রাস্তার ধারে সারি-সারি ফাস্ট-ফুডের দোকান আর ভিডিও গেমের পার্লার দেখতে চায়। সে-সব দেখছে না বলেই ও বেজার হয়ে জানিয়ে দিচ্ছে যে, এখানে দেখবার মতো কিছু নেই।
কিন্তু ওর বয়েস আর আমার বয়েসের মাঝখানে তো বিস্তর ফারাক। দু’দিকে তাকিয়ে আমার তাই দিব্যি লাগছিল। পথটা একটু ঢেউ-খেলানো, কিন্তু কোথাও খানাখন্দ নেই। দু’দিকে মস্ত-মস্ত দালানকোঠার জঙ্গল নেই, বরং ফাঁকা জমিজায়গা রয়েছে প্রচুর। অনেক বাড়িতেই কাঠের বেড়া, টিনের চাল। ঢেউ-খেলানো চালগুলো রং করা, তাতে বেশ বাহার খুলেছে। গাছপালাও বিস্তর। শহরের এলাকায় ঢুকতে গাছপালা খানিকটা কমে গেল বটে, কিন্তু রাস্তায় যে তেমন ভিড়ভাট্টা নেই, এইটে দেখে খুব আরাম পাওয়া গেল।
ড্রাইভারটির বয়স মোটামুটি বছর তিরিশেক। গাড়ি চালাতে চালাতেই আমাকে সে সব চিনিয়ে দিচ্ছিল। ….এই হল লাটসাহেবের বাড়ি। আর ও-পাশে ওই যে বাগানটা দেখছেন, ওটা হয়েছে রবিঠাকুরের নামে। বাগানের একদিকে একটা খেলনা-ঘর রয়েছে, সেখানে আছে নানান জায়গার পুতুল। পারেন তো একদিন এসে দেখে যাবেন স্যার। বাগানের সামনে, রাস্তাটা দেখছেন তো, ওই রাস্তার ডান দিকে পড়ছে সার্কিট হাউস। এ দিকে দেখুন গান্ধীজির স্ট্যাচু। বাগানের মধ্যে রবিঠাকুরেরও একটা খুব সুন্দর স্ট্যাচু রয়েছে।….
ত্রিপুরার রাজবাড়িটা চমৎকার। এখন অবশ্য আর রাজবাড়ি নয়, বিধানসভা। রাজবাড়ির লোকেরা তা হলে এখন কোথায় থাকেন? ড্রাইভার বলল, “রানিমা তো এখানকার একজন মন্ত্রী, তাঁরা থাকেন পিছন-দিকের আর-একটা বাড়িতে। তবে সেটা এর চেয়ে অনেক ছোট।”
রাজবাড়ির চৌহদ্দি ছাড়িয়ে আমরা ইতিমধ্যে আর-একটা পথ ধরে এগোচ্ছিলুম। এক জায়গায় দেখলুম বেশ ভিড়। আগরতলায় আসা ইস্তক কোথাও এইরকম মানুষজন আর যানবাহনের ঠেলাঠেলি দেখিনি, তাই জিজ্ঞেস করলুম, “ব্যাপার কী? এখানে এত ভিড় কেন?”
দীপক বলল, “নিশ্চয় গুরুজির কোনও বই রিলিজ হচ্ছে।”
তাতে আমি আরও অবাক হয়ে বললুম, “গুরুজি! তিনি আবার কে?”
ড্রাইভারটিকে এতক্ষণ হাসতে দেখিনি। এবারে সে হোহো করে হেসে উঠল। তারপর হাসি থামিয়ে বলল, “দীপকবাবুর গুরুজি হচ্ছেন অমিতাভ বচ্চন। কিন্তু না স্যার, ওটা সিনেমা হলের ভিড় নয়, ওখানে বইমেলা চলছে। ভিতরে গিয়ে দেখবেন?”
যাবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু দীপকের দেখলুম তার গুরুজির বই নিয়ে যত উৎসাহ, বইমেলা নিয়ে উৎসাহ তার সিকির সিকিও নয়। বলল, “না না, অত সময় নেই। পাঁচটা বেজে গেছে। বরং কোনও হোটেলে নিয়ে চলো, সেখানে কিছু খেয়ে নিয়ে তারপর সিপাহিজলার দিকে রওনা হওয়া যাক। মিঃ চ্যাটার্জির নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে।”
প্লেনে কিছুই খাইনি। একটু-একটু খিদে যে পাচ্ছিল না, তা নয়, কিন্তু কী জানি কেন, কিছুই খেতে ইচ্ছে করছিল না। বললুম, “তোমাদের যদি খিদে পেয়ে থাকে তো খেয়ে নাও, আমার জন্যে ভাবতে হবে না, আপাতত আমার এক কাপ চা পেলেই চলবে।”
যেমন কলকাতা, তেমনি আগরতলাও একটা পুরো রাজ্যের রাজধানী বটে, কিন্তু কলকাতার গা থেকে যেমন গ্রামীণ সৌরভ একেবারে নিঃশেষে মুছে গেছে, আগরতলায় সেটা হয়নি। লোকজনের কথাবার্তা আর আচার-আচরণে এখনও সারল্য আর আন্তরিকতার ছোঁয়া মেলে, মস্ত কোনও শহরে যেটা আশাই করা চলে না। তার একটা কারণ হয়তো এই যে, আগরতলায় এখনও শিল্পের বিশেষ প্রসার ঘটেনি; সেটা যখন ঘটবে, কল-কারখানার দাপটে এই সারল্য আর আন্তরিকতাও যে তখন শুকিয়ে যাবে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু তার এখনও অনেক দেরি। আগরতলা এখনও সুখী, শান্ত, ছোট্ট একটি শহর, তার চৌহদ্দি ছাড়াবামাত্র আপনি নির্ভেজাল কোনও গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়বেন। এমন গ্রাম, যার চাষের জমির উপরে এখনও ইটখোলা তার থাবা বসায়নি।
শহরের পাশেই বাংলাদেশের বর্ডার। ইতিমধ্যে সেখান থেকেও ঘুরে এসেছি। দেখেছি, যেমন এদিকে তেমন ওদিকেও ঘন-ঘন সাইকেল রিকশা এসে থামছে, তারপর মাঝখানের জমি হেঁটে পার হচ্ছে মানুষজন। যাতায়াতের বিরাম নেই। দীপক খানিকক্ষণ আমার সঙ্গে ছিল না, আড়ালে গিয়ে সিগারেট খাচ্ছিল বোধহয়। ড্রাইভারটির নাম শঙ্কর। পূর্ববঙ্গের ছেলে। একাত্তরে যখন খান-সেনাদের অত্যাচার একেবারে চরমে ওঠে, তখন ওরা বর্ডার পেরিয়ে আগরতলায় এসে ঢুকেছিল, তারপরে আর ফিরে যায়নি। শঙ্করই আমাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাচ্ছিল। বলল “এখান দিয়ে বর্ডার পেরোতে হলে তো কাগজপত্র লাগে, ওদিকে ও-সবের দরকার হয় না।”
“ওদিকে মানে?”
“কসবার কালীবাড়ির দিকে। আজ তো আমরা সিপাহিজলায় যাচ্ছি। কাল কালীবাড়ি দেখবেন চলুন। ওইসঙ্গে কালীবাড়ির পাশে কমলাসাগরও দেখা হয়ে যাবে।”
“সাগর মানে? মস্ত বড় দিঘি?”
“মস্ত বড়। তবে উদয়পুরের দিঘির মতন অত বড় নয়। কমলাসাগরে জল আসা নিয়ে অবিশ্যি একটা গল্প আছে।”
শঙ্করের সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগছিল। বললুম, “কী গল্প? স্বপ্নাদেশের?”
অবাক হয়ে শঙ্কর খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপব বলল, “ঠিক ধরেছেন। আপনি জানেন?”
হেসে বললুম, “না, জানি না।”
“তা হলে বললেন কী করে?
“পুরনো সবকিছু নিয়েই একটা-না-একটা গল্প থাকে তো, তাই আন্দাজ করেছিলুম। যা-ই হোক, তোমার কমলাসাগরের গল্পটা তুমি বলো।”
শঙ্কর বলল, “রাজা তো মন্দিরের কাছে দিঘি কাটালেন, কিন্তু দিঘিতে কিছুতেই জল আসে না। ব্যাপার দেখে সকলের মাথায় হাত। তো শেষপর্যন্ত মা-কালী এসে রাজাকে স্বপ্নে দেখা দিলেন। বললেন, রানিকে এসে নিজের হাতে এক কোদাল মাটি কাটতে হবে, তা নইলে এই দিঘিতে জল আসবে না।”
“তা রানি-মা এসে কোদাল চালালেন?”
“না চালিয়ে উপায় আছে? বাপ রে!”
“জলও উঠল?”
শঙ্কর একগাল হেসে বলল, “উঠল বলে উঠল। রানি-মা এসে যেই না এক-কোদাল মাটি কেটেছেন, পাতাল ফুঁড়ে অমনি এমন তোড়ে জল বেরোতে লাগল যে, দেখতে না দেখতে দিঘি ভরাট।”
দীপকের সিগারেট খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। আড়াল থেকে সে এই সময়ে সামনে এসে পড়ায় গল্পটা আর এগোয়নি। এখন আমরা মোটামুটি ভদ্র-গোছের একটা হোটেলে বসে চা খাচ্ছি। চা খাওয়া শেষ হলেই আমরা সিপাহিজলার দিকে রওনা হব।
রওনা হতে-হতে তা প্রায় ছ’টা। সবে মার্চ মাস শুরু হয়েছে, কলকাতায় এই সময়ে গরম পড়ে যায়, কিন্তু এখানে মোটামুটি ঠান্ডাই চলতে থাকে শুনেছি, কিন্তু হোটেলের মধ্যে একটু-একটু গরম বোধ হচ্ছিল। বাইরে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তার কারণটা বোঝা গেল। দিব্যি মেঘ জমেছে। হঠাৎ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া ছুটে এল, সঙ্গে-সঙ্গে উড়তে লাগল ধুলো। যে গাছপালাগুলো এতক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তারাও অমনি এমনভাবে মাথা ঝাঁকাতে শুরু করল যে, মনে হল প্রকৃতির রাজ্যে একটা-কিছু সর্বনাশের ঘটনা ঘটে গেছে।
দীপককে বললুম, “ঝড় উঠেছে দেখছি, এর মধ্যে গাড়ি চালানো ঠিক হবে?”
দীপক হেসে বলল, “ও নিয়ে আপনি ভাববেন না। শঙ্কর খুব এক্সপার্ট ড্রাইভার। ও ঠিকই চালাতে পারবে, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।”
ঝড় থামতেই শুরু হল বৃষ্টি। গেড়ায় ফোঁটায় ফোঁটায়। তারপর একেবারে মুষলধারে।
তারই মধ্যে হেডলাইট জ্বেলে গাড়ি ছুটছে। বৃষ্টির ছাট থেকে বাঁচবার জন্যে জানলায় কাচ তুলে দেওয়া হয়েছে। সারাক্ষণ ওয়াইপার চালিয়ে সামনের উইন্ডস্ক্রিন থেকে জল সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু কাচের ভিতরের দিকটা বাষ্পে কারবার ঢাকা পড়ে যাওয়ায় পথঘাটের প্রায় কিছুই আমার চোখে পড়ছিল না।
ঘন্টা দেড়েক গাড়ি চলবার পরে বুঝতে পারলুম যে, বৃষ্টি এবারে ধরেছে। আমার দু’পাশের জানলার কাচ দুটো নামিয়ে নিলুম। চারদিকে একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার। তবে মাঝে-মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। তাতে বুঝলুম যার উপর দিয়ে চলছি, সেটা মসৃণ একটা রাস্তাই বটে।
হাতঘড়ির রেডিয়াম লাগানো ডায়ালের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, আটটা দশ।
গাড়ির গতি ইতিমধ্যে অনেক কমে গিয়েছিল। বললুম, “আর কত দূর দীপক?”
দীপক বলল, “আমরা এসে গেছি।”
গাড়ি থামল। হেডলাইটের আলোয় সামনে যা আমার চোখে পড়ল, সেটা একটা বে। বড় মাপের দোতলা কাঠের বাড়ি। ভিতরে ইলেকট্রিক আলো জ্বলছে।
হর্ন বাজাতে হল না। গাড়ির শব্দ পেয়েই বাড়ির ভিতর থেকে যিনি বেরিয়ে এলেন, তিনি আমার চেনা মানুষ। আমাকে দেখে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে চারু ভাদুড়ি বললেন, “ওয়েলকাম টু সিপাহিজলা।”
