চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১৭
ঘরের মধ্যে চেয়ার যদিও দুটো, আর্মচেয়ার মাত্র একটাই। ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ সেটা দখল করে রেখেছিলেন। বঙ্কুবাবুকে সঙ্গে নিয়ে পীতাম্বর আমাদের ঘরে ঢুকতেই ভাদুড়িমশাই এগিয়ে গিয়ে বঙ্কুবাবুকে নিয়ে এসে সেই আর্মচেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললেন, “এবারে তুমি যেতে পারো, পীতাম্বর। তবে বাইরে দাঁড়িয়ে থেকো না, নিজের ঘরে চলে যাও।”
পীতাম্বর চলে যাচ্ছিল। ভাদুড়িমশাই তাকে উদ্দেশ করে বললেন, “ও হ্যাঁ, ঘরে গিয়ে কিন্তু ঘুমিয়ে পোড়া না। ঘন্টাখানেক বাদে এসে তোমার বাবুকে আবার তাঁর ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “দরকার হবে না। পাশের ঘরেই তো থাকি। ও আমি একাই ঠিক চলে যেতে পারব।”
পীতাম্বর বেরিয়ে গেল। ভাদুড়িমশাই গিয়ে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিয়ে এলেন। তারপর ফিরে আসতে-আসতে বললেন, “তোমার গিন্নিকে ওই কথাই বলে এসেছ তো?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “হ্যাঁ, বললুম যে, ডিরেকশান আর স্ক্রিপ্ট-রাইটিংয়ের পেমেন্ট নিয়ে কথাবার্তাটা চুকিয়ে ফেলা দরকার। তা ছাড়া কিছু আগামও দিয়ে রাখতে হবে। ডলিও আসতে চাইছিল। তাতে বললুম, না না, খুবই ডেলিকেট ব্যাপার তো, তুমি থাকলে ওঁরা অস্বস্তি বোধ করতে পারেন, আমার তাই একা যাওয়াই ভাল। …তো তোমার কী সব জিজ্ঞেস করবার আছে বলছিলে না?”
“হ্যাঁ, কিন্তু তার আগে একটা কথা বলো তো। কাল যে আমরা কলকাতায় যাচ্ছি, এটা একেবারে পাক্কা?”
“অ্যাবসলিউটলি।” বঙ্কুবাবু বললেন, “হোটেলে পৌঁছেই আমার লোককে… মানে আমার সেই এজেন্টকে ফোন করেছিলুম। সে বলল, ফ্লাইট কনফার্মড। কাল বিকেলের ফ্লাইটে। বিকেল মানে আড়াইটেয় টেক অফ্। দেড়টার মধ্যে আমাদের এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে।”
ভাদুড়িমশাই তক্ষুনি কিছু বললেন না। একটা সিগারেট ধরিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “দ্যাখো বঙ্কু, তোমার সমস্যা আসলে একটা নয়, দুটো। এক নম্বর সমস্যা, গত বছর মে মাস থেকে তোমার ছোট ছেলে নিরুদ্দেশ। তার খোঁজ পাবার জন্যে যা যা করা দরকার, তুমি করেছ। পুলিশে যেমন রিপোর্ট করেছ, বড়-বড় প্রতিটি কাগজে তেমন বিজ্ঞাপনও দিয়েছ। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হয়নি। অন্তত এখনও পর্যন্ত হয়নি। কী, ঠিক বলছি তো?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “ঠিকই বলছ। কোনও খবরই তো পাওয়া গেল না। এমন কী, কেউ যে ওকে টাকার লোভে কিডন্যাপ করেছে, তাও মনে হয় না। সেটা করলে তা অনেক আগেই তারা র্যানসম বাবদে যা-হোক একটা অ্যামাউন্ট চেয়ে চিঠি দিত। নাঃ, তাও কেউ দেয়নি।”
“এবারে তোমার দু-নম্বর সমস্যাটার কথায় আসা যাক।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “দু-নম্বর সমস্যা তোমার বড় ছেলেকে নিয়ে। বি.কম. পাশ করে সে বিলেতে যেতে চেয়েছিল। তুমি যেতে দাওনি। তোমার ইচ্ছে সে ব্যাবসার কাজকর্ম বুঝে নিক। তা সে নেয়নি। তোমার কাছে আছে বটে, কিন্তু সেটা না-থাকারই মতো। এমনিতেই চাপা স্বভাবের ছেলে, কথাবার্তা বরাবরই কম বলত, এখন যে তাও বলছে না, সেটাও এই ক’দিন লক্ষ করেছি। তার উপরে আবার ওকে নিয়ে দেখছি মাঝে-মাঝেই একটা-না-একটা মিস্টিরিয়াস ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। ভুবনেশ্বরে তোমার বাড়ির ছাতে যা ঘটেছিল, সেটার কথা তোমার কাছে শুনেছি। তার পরে সিপাহিজলা আর নীরমহলে যা ঘটল, সে তো স্বচক্ষে দেখলুম। আজ আবার শুনছি সিঁড়ির থেকে পড়ে গিয়ে বাঁ হাতটা মচকে গেছে। এর মধ্যে শুধু এই সিঁড়ির থেকে পড়ে যাবার ব্যাপারটাকেই একটা অ্যাক্সিডেন্ট বলে ধরে নেওয়া যায়। অন্য ঘনটাগুলোকে কিন্তু অ্যাকসিডেন্ট বলা যাচ্ছে না।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “তা তো যাচ্ছেই না। ভুবনেশ্বরের বাড়ির ছাতে ওর গলা টিপে ধরা হয়েছিল। সিপাহিজলায় ওকে বাথরুমের ভিতর থেকে কেউ ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। নীরমহলেও কেউ উপর থেকে ওর মাথা তাক করে ইট ছুড়ে মেরেছিল। এ তো বোঝাই যাচ্ছে যে, কেউ ওকে খুন করতে চায়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “চায় হয়তো, কিন্তু পারছে না। আমি ভাবছি, পারছে না কেন?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “পারছে না সে ওর কপাল। কিন্তু কপাল ওকে কতদিন বাঁচাতে পারবে? সত্যি বলতে কী, এইজন্যেই এখন আমি চাইছি যে, বরং ও বিদেশেই যাক। গিয়ে একটা শর্ট কোর্স করে ফিরে আসুক। তাতে আর-কিছু না হোক, ছেলেটা প্রাণে তো বাঁচবে। কিন্তু তাতেও তো ও রাজি হচ্ছে না। এই অবস্থায় আমি কী করব?”
রীতিমত বিচলিত দেখাচ্ছিল বঙ্কুবাবুকে। ভাদুড়িমশাই সেটা লক্ষও করেছিলেন। তিনি বললেন, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, অত ব্যস্ত হলে চলে? আমাকে আর-একটু সময় দাও।”
“তুমি কিছু হদিস করতে পারলে?”
“কিসের হদিস?”
“এই মানে কে ওর উপরে হামলা করছে, কেনই বা করছে, সে-সবের কিছু আঁচ করতে পারছ?”
“এখনও পারিনি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু পারব নিশ্চয়। তবে একটা কথা এখনই বলতে পারি। লক্ষ্মণের নিরুদ্দেশ হওয়া আর রামুর উপরে এই হামলা হওয়া, এ দুটো ব্যাপারকে একেবারে আলাদা করে দেখাটা সম্ভবত ঠিক হচ্ছে না। আচ্ছা, লক্ষণ যে-দিন নিরুদ্দেশ হয়, তার আগের কয়েকটা দিনের কথা তোমার মনে আছে?”
“মোটামুটি মনে আছে। অনেকদিন হয়ে গেল তো, খুঁটিনাটি সব কথা হয়তো বলতে পারব না, তবে বড়-বড় ঘটনাগুলোর কথা যদি জিজ্ঞেস করো, তা হলে ঠিকই বলতে পারব।”
“খুটিনাটি ব্যাপারের কথা আমি জিজ্ঞেসও করছি না। আমি শুধু এমন ঘটনার কথাই জানতে চাইব, যা তোমার মনে থাকা সম্ভব।”
“বেশ তো, কী জানতে চাও বলো।”
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ সেটা টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “লক্ষ্মণ নিখোঁজ হবার আগে কয়েকটা দিনের মধ্যে কি কোনও ব্যাপারে তাকে তুমি খুব বকাঝকা করেছিলে?”
“কী ব্যাপারে বকব?”
“এই ধরো পড়াশুনোর ব্যাপারে। তোমারই কাছে শুনেছি যে, পড়াশুনোয় তার একটুও মন ছিল না। মানে বুদ্ধি ছিল না, তা নয়, কিন্তু মহা ফাঁকিবাজ। আজ যদি কটকে ফুটবল খেলতে যাচ্ছে, তো কাল যাচ্ছে ভদ্রকে। আর ক্রিকেট-সিজন এলে তো কথাই নেই, কখনও-কখনও টানা পাঁচ-সাত দিনের জন্যে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যেত। এসব কথা তুমিই আমাকে বলেছ। তা এই নিয়ে তাকে বকাঝকা করোনি তো?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “দ্যাখো চারু, লক্ষ্মণ যে বুদ্ধিমান ছেলে, সেটা মিথ্যে নয়। হয়তো অনেকের চেয়েই বেশি বুদ্ধিমান। এদিকে পড়াশুনোয় যে ঘোর অমনোযোগী, সেটাও ঠিক। তার জন্যে বকুনিও আমার কাছে কিছু কম খেত না। কিন্তু বকুনি খেয়ে যে কখনও মুখ ভার করে বসে থাকত, তাও নয়। বকলে বলত, ‘পড়াশুনো করি না তো কী হয়েছে? পাশ তো ঠিকই করে যাচ্ছি।’ তা সেটা যে করত, তা-ই বা কী করে অস্বীকার করি? কিন্তু না, পড়াশুনো করে না বলে বকতুম বটে, কিন্তু ওকে নিয়ে আমার আসল ভয়টা ছিল তার জন্যে নয়। আমি দেখতে পাচ্ছিলুম যে, যতই বুদ্ধিমান হোক, দিনে-দিনে ও অস্থিরমতি, অবিবেচক হয়ে উঠছে। ছেলেবেলা থেকেই ও একটু চঞ্চল। কিন্তু বয়স বাড়লে তো চঞ্চলতা ধীরে-ধীরে কমে যায়। অথচ ওর ক্ষেত্রে দিনে-দিনে সেটা যেন আরও বেড়েই যাচ্ছে। তা ছাড়া যেমন উড়নচন্ডে স্বভাব, তেমনি খামখেয়ালি। ইদানীং আবার কখনও-কখনও তা ধরো পনেরো-বিশ দিনের জন্যে বাড়ি থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছিল। যাবার আগে বলে যেত অবশ্য, তবে কোথায় যাচ্ছে, সেটা বলত না, কেমন যেন এড়িয়ে যেত। এটা নিয়ে প্রায়ই আমি ওকে বকাঝকা করতুম, কিন্তু ও তা গ্রাহ্যই করত না। এখন তুমিই বলো, এমন ছেলের হাতে কি একটা ব্যাবসার দায়িত্ব তুলে দেওয়া যায়?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও সব কথা পরে হবে। লেট্স কাম টু দ্য পয়েন্ট। আমি তোমাকে যা জিজ্ঞেস করেছিলুম, তার স্পষ্ট জবাব দাও। আমার প্রশ্নটা ছিল, ও যে-দিন থেকে নিখোঁজ হয়, অর্থাৎ যে-দিন ভুবেনেশ্বরের বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফিরে আসেনি, সেই দিন কিংবা তার আগের কয়েক দিনের মধ্যে তোমার সঙ্গে ওর বড় রকমের কোনও বিরোধ হয়েছিল কি না, আর সেইজন্যেই তুমি ওকে একটু বেশি মাত্রায় বকাঝকা করেছিলে কি না।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “না, সেদিন কোনও বিরোধও ঘটেনি, বকাঝকাও করিনি।”
“তার আগের কয়েক দিনের মধ্যে?”
দু-দিকে মাথা নেড়ে বঙ্কুবাবু বললেন, “তার তো কোনও প্রশ্নই উঠছে না।”
“কেন?”
“আগের কয়েক দিন কি ও ভুবনেশ্বরে ছিল যে, তার মধ্যে আমার সঙ্গে ওর বিরোধ ঘটবে, কি তাই নিয়ে আমি ওকে বকাঝকা করব?”
“সে কী,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আগের কয়েকদিন ভুবনেশ্বরেই ছিল না লক্ষ্মণ? তা হলে কোথায় ছিল?”
“তা তো জানি না। হয়তো ফুটবল কি হকি খেলবার ডাক পেয়ে কোথাও গিয়েছিল। এমন তো মাঝে-মাঝেই যেত। মোট কথা, যেখানেই গিয়ে থাক, সেইদিনই সকালবেলায় ও ভুবনেশ্বরে ফিরে আসে।”
“সেইদিনই… মানে ২০ মে’র সকালবেলায়, এই তো?”
“হ্যাঁ, ২০ মে’র সকালবেলায়।” বঙ্কুবাবু বললেন, “সকালে বাড়ি ফিরল। জলখাবার খেল। বাড়ির পাশেই নদী। সেখানে গিয়ে সাঁতার কেটে এল। তারপর বারোটার মধ্যে দুপুরের খাওয়া সেরে নিয়ে একা স্যুটকেস হাতে করে সেই যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল, আর ফেরেনি।”
“সেদিনও কোনও ব্যাপার নিয়ে তুমি বকোনি ওকে?”
“দেখা হলে তো বকব, দেখাই হয়নি। আমি ছিলুম আমার অফিস ঘরে। আগ্রা থেকে একজন ব্যবসায়ী তার আগের দিন মানে ১৯ মে তারিখে ভুবনেশ্বরে এসেছিল। একটা লোনের ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলছিলুম। আমার বাড়িতে ছিল। সেইদিনই রাত্তিরে পুরী এক্সপ্রেস ধরে তার কলকাতা যাবার কথা। সেখান থেকে দিল্লির ফ্লাইট ধরবে। তো তারই সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কত পার্সেন্ট সুদ দেবে, কী কী মর্টগেজ রাখবে, সেই সব কথা। তা এর মধ্যে লক্ষ্মণ কখন বাড়ি ফিরেছে, তারপর কখন আবার বেরিয়ে গেছে, কিছুই আমি জানতুম না।”
“কখন জানলে?”
“বিকেলবেলায়। পীতাম্বর ওই সময় আমাকে নিয়ে একটু বেড়াতে বেরোয়। বেড়ানো মানে বাড়ির মধ্যে লনের চারপাশে একটু হাঁটি আর কি। তো হাঁটতে-হাঁটতে পীতাম্বরকে জিজ্ঞেস করেছিলুম যে, হ্যাঁ রে, তোদের ছোটদাদাবাবু কবে বাড়ি ফিরবে, কিছু জানিস? তাতে পীতাম্বর বলল, তিনি তো সকালবেলাতেই ফিরেছিলেন। ফিরে জলখাবার খেয়ে, নদীতে চান করে এসে, দুপুরের খাওয়া সেরে তারপরে আবার স্যুটকেস হাতে নিয়ে বেরিয়েও গেছেন। …শুনেই আমার খটকা লাগল। খালিই মনে হতে লাগল যে, এর মধ্যে কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল রয়েছে।”
“কেন, হঠাৎ অমন কথা মনে হল কেন?”
তক্ষুনি এই প্রশ্নের জবাব দিলেন না বঙ্কুবাবু। তাঁর চোখের চাউনি এমনিতে ভাবলেশহীন। সেই চোখেই ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এমনিতে তো কিছু মনে হওয়ার কথা নয়। ও তো নোঙর ফেলতে জানে না, বাড়ির উপরে বিশেষ টানও নেই, হঠাৎ-হঠাৎ আসত, আবার হঠাৎ-হঠাৎ চলেও যেত। তা হলে আর এই হঠাৎ এসে আবার হঠাৎ চলে যাওয়ায় আমার খটকা লাগবে কেন? তবু লেগেছিল। কেন লেগেছিল জানো? এর আগে যখনই কোথাও গিয়েছে, কিংবা বাইরে দু-চার দিন কাটিয়ে আবার বাড়ি ফিরেছে, আমাকে সেটা জানাতে ওর একবারও ভুল হয়নি। এই প্রথম দেখলুম যে, ছেলেটা বাড়িতে ফিরল, আবার ঘন্টাখানেক বাদে বাড়ি থেকে চলেও গেল, কিন্তু আমাকে সে-কথা জানাল না।”
“তুমি কি সেইদিনই পুলিশে খবর দিয়েছিলে?”
“না। ভাবলুম, হয়তো তাড়া ছিল, তাই খবরটা আমাকে দেয়নি। কিংবা এমনও হতে পারে যে, বাইরের লোকের সঙ্গে অফিস-ঘরে বসে আমি ব্যাবসার কথা বলছি শুনে আমাকে বিরক্ত করতে চায়নি। তো ঠিক আছে, যেমন মাঝে-মাঝেই যায়, এবারও তেমন কয়েকটা দিনের জন্যে কোথাও গেছে হয়তো। তখন অন্তত তা-ই ভেবেছিলুম। কিন্তু সাত-সাতটা দিন কেটে গেল, লক্ষ্মণ তবু ফিরল না। তখন মনে হল, তাই তো, আমাকে না-জানিয়ে চলে গেল কেন? এমন তো কখনও হয় না।”
“তখন তুমি পুলিশে খবর দিলে, কেমন?”
“হ্যাঁ। সেইসঙ্গে কলকাতা, দিল্লি, বোম্বাই, মাদ্রাজ আর বাঙ্গালোরের বড়-বড় সব কাগজগুলোতে নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনও পাঠিয়ে দিলুম। সঙ্গে লক্ষণের ফোটোগ্রাফ। ফোন করে জেনে নিয়েছিলুম, কোন্ কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে কত টাকা লাগবে। বিজ্ঞাপনের সঙ্গে চেকও পাঠিয়ে দিই। ছেপে বেরুতে তাই দেরিও হয়নি।”
“পুলিশ কোনও হদিশ করতে পারেনি, কেমন?”
“কিচ্ছু না। সে তো তোমাকে কলকাতাতেই বলেছি। বিজ্ঞাপন দিয়েও লাভ হল না। একজনও এমন কোনও খবর দিল না, যার সূত্র ধরে এগোনো যায়। তাও বলেছি তোমাকে।”
“বলেছ। কিন্তু তখন তাড়াহুড়োর মধ্যে সব শুনেছি তো। তাই ভাবছিলুম যে, উই শুড গো ওভার অল দ্যাট ওয়ান্স এগেন। আর তা ছাড়া, কিরণবাবু তো সবটা জানেন না। ডিটেলগুলো ওঁরও জেনে নেওয়া ভাল।”
এতক্ষণ আমি একটাও কথা বলিনি। চুপ করে সব শুনে যাচ্ছিলুম। এবারে বললুম, “লক্ষ্মণ এই যে নিখোঁজ হয়ে গেল, এত দিনের মধ্যেও ওর যে একটা খবর পাওয়া গেল না, রামু এটাকে কীভাবে নিয়েছে?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “কী করে বলব। ও তো আমার সঙ্গে কথাই বলতে চায় না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা ঠিক কবে থেকে হয়েছে?”
“এইট্রিনাইন থেকে। রামু সেই বছর বি.কম. পাশ করে, লক্ষ্মণ বি.এ.। রামু ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছিল। রেজাল্ট বেরোবার পরেই বায়না ধরে বসে, বিলেত যাবে। আমি রাজি হইনি।”
রাজি না হবার কারণটা আমি ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে শুনেছিলুম। তবু বললুম, “কেন?”
বঙ্কুবাবু করুণ হেসে বললেন, “আমার অবস্থা তো দেখছেন। চোখে দেখতে পাই না, স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছে। লক্ষ্মণ যে ব্যাবসার কাজকর্ম দেখবে, সে-আশা কোনও দিনই ছিল না। যা-কিছু ভরসা ওই রামু। তো সেই রামুও বিলেত যেতে চাইছে, কবে ফিরবে কে জানে, ততদিন আমি বাঁচব কি না, তারও ঠিক নেই। আমি তাই চাইছিলুম যে, বাপ বেঁচে থাকতে-থাকতে ব্যাবসার দায়িত্ব ও বুঝে নিক। …কী করে রাজি হব বলুন?”
“বাস্, সেই থেকে এই অবস্থা?”
“সেই থেকে এই অবস্থা। এমনিতেই ও অবশ্য কম কথা বলে। তবে ওই যে ওর বিলেত যাওয়া আটকে দিলুম, তখন থেকে আর কথাই বলতে চায় না। কিছু জিজ্ঞেস করলে হাঁ-হুঁ করে উত্তর দেয়, এই পর্যন্ত।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝলুম। এবারে একটা কথা জিজ্ঞেস করি। লক্ষ্মণ যেদিন নিখোঁজ হয়, সেদিন বাড়ি থেকে বেরুবার আগে কি রামুকে কিছু বলে গিয়েছিল?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “রামু তখন বাড়িতে থাকলে বলত নিশ্চয়। কিন্তু রামু তো তখন বাড়িতেই ছিল না।”
“কোথায় গিয়েছিল?”
“শহরে। …মানে আমাদের বাড়িটা যে ঠিক ভুবনেশ্বর-শহরে নয়, সেখানে থেকে মাইল কয়েক দূরে, তা তো তুমি জানোই। তো রোজ না-হলেও মাঝে-মাঝেই রামু সকালবেলার জলখাবার খেয়ে ভুবনেশ্বরে চলে যায়, আবার ফিরেও আসে দুপুর একটা-দেড়টার মধ্যেই। সেদিনও গিয়েছিল।”
“কীসে করে যায়? সেদিনই বা কীসে করে গিয়েছিল?”
“কেন, বাড়ির গাড়িতেই। বাড়িতে তো তিনটে গাড়ি। একটা আমার, আর দুটো ওদের দুই ভাইয়ের। দুজনেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে। নিজেরাই চালায়।”
“ঠিক আছে, কিন্তু ভুবনেশ্বরে কেন যায়, সেটা কখনও জিজ্ঞেস করেছ?”
“তা করেছি বই কী। বলে যে, বঙ্কুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করতে যায়। তা ছাড়া, লাইব্রেরিতেও যায় মাঝে-মধ্যে। তো যা বলছিলুম। রামু সেদিন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাবার খানিক বাদে লক্ষ্মণ আসে। ফলে তখন দু-ভাইয়ের দেখা হয়নি। আবার, ভুবনেশ্বর থেকে সেদিন রামু যখন ফেরে, লক্ষ্মণ তার খানিক আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে। ফলে তখনও দেখা হয়নি দু-ভাইয়ের।”
“এসব কথা তোমাকে কে বলেছে?”
“পীতাম্বর। ওর কাছে কথাটা শুনে যে আমি রামুকে ডেকে পাঠাইনি, তা নয়। ডেকে পাঠিয়েছিলুম। জিজ্ঞেসও করেছিলুম যে, হ্যাঁ রে, তোর ভাই তো আজ এসেছিল, তার সঙ্গে তোর দেখা হয়নি? তো রামু বললল, না।”
একটুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর বঙ্কুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আর-কিছু জানতে চাও?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখন তোমার কী করা উচিত, সেটা কিছু ভেবেছ?”
বঙ্কুবাবু হাত উলটে বললেন, “কী যে করব সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না। রামুকে তো বারবার বলছি, ঠিক আছে, যা বাবা, এতই যখন ইচ্ছে, তখন যা বিলেতে। তবে তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস। তা তাতেও তো এখন রাজি হচ্ছে না। এর মধ্যে আবার ঠিক করেছিলুম যে, গোটা ব্যাবসাটা আমার নিজের নামে না-রেখে ওর সঙ্গে একটা পার্টনারশিপের ব্যবস্থা করিয়ে নেব। তার দলিলপত্রও একজন ছুঁদে লইয়ারকে দিয়ে তৈরি করিয়ে ফেলেছিলুম। কিন্তু ও তাতে সই করল না।”
“তুমি নিজে ওকে সই করতে বলেছিলে?”
“প্রথমে পীতাম্বরের হাতে কাগজপত্র দিয়ে সই করিয়ে আনতে বলেছিলুম। তো পীতাম্বর ফিরে এসে বলল, বড়দাদাবাবু বলে দিয়েছেন যে, আগে ছোটভাই ফিরে আসুক, তখন ও-সব সই-টইয়ের কথা ভাবা যাবে, তার আগে নয়।”
“তখন তুমি নিজেই সই করাতে গেলে?”
“তা যেতে হল বই কী।” বঙ্কুবাবু বললেন, “কিন্তু তাতে কি কোনও কাজ হল? হল না হে চারু, কিছুই হল না। রামু আমার সঙ্গে একটা কথা পর্যন্ত বলল না। কিন্তু আমি আর কতদিন বাঁচব? তুমি একবার বলে দ্যাখো না। আর কিছু না, একটা সই করে দিক। তোমাকে তো খুব মান্যি করে। আমার কথা রাখেনি, কিন্তু তোমার কথাটা নিশ্চয় রাখবে। একবার অনুরোধ করে দ্যাখো ভাই।”
“ঠিক আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এককালে ওরা দুজনেই আমার কথা শুনত। কিন্তু সে তো আজকের ব্যাপার নয়। ওদের শেষ দেখেছি পাঁচ-সাত বছর আগে। তখন শুনত। কিন্তু এই পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে তো ওদের নিয়ে একবারও তুমি ব্যাঙ্গালোরে আমার বাড়িতে আসোনি, আর আমারও যাওয়া হয়নি ভুবনেশ্বরে। ফলে ইতিমধ্যে ওরা পালটে গেছে, কি না, তাও আমার জানা নেই। কিন্তু ঠিক আছে, এত করে তুমি যখন বলছ, তখন রামুকে আমি একবার অনুরোধ করে দেখব নিশ্চয়ই। তা যাতে সই করাতে হবে, সেই কাগজপত্রগুলো তোমার সঙ্গে আছে তো?”
“তা তো সঙ্গে করে নিয়ে আসিনি। সেগুলো ভুবনেশ্বরে রয়েছে।”
“তা হলে তো আমাকেও ভুবনেশ্বরে যেতে হয়।”
“আবার কবে ভুবনেশ্বরে যাবে তুমি? দেরি হয়ে যাবে না?”
‘কিচ্ছু দেরি হবে না। কাল তো আমরা কলকাতায় ফিরছি। তোমরা সেখান থেকে ভুবনেশ্বরে কবে যাচ্ছ?”
“কালই জগন্নাথ এক্সপ্রেস ধরছি। অর্থাৎ পরশু ভোরে পৌঁছব।”
“ঠিক আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমিও পরশুই পৌঁছচ্ছি। তবে ভোরে নয়, দুপুরে। এই ধরো দুটো নাগাদ। …কী হল? এতে অত অবাক হবার কী আছে? …নাও, এখন ঘরে যাও, আপাতত আমার আর-কিছু জানবার নেই। …কিরণবাবু, ওকে ওর ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসুন।”
