চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১৬
সিপাহিজলা থেকে আগরতলায় যাবার পথে বাঁ-দিকে টার্ন নিয়ে, যে রাস্তা দিয়ে কসবার কালীবাড়ি যেতে হয়, সেই রাস্তা পেরিয়ে কখন যে আবার বড় রাস্তায় ফিরে এসেছি, কিছুই জানি না। বারো বছর আগেকার এক শীতের দিনের স্মৃতির মধ্যেই আমি ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। গাড়িটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে যেতেই আমার ভাবনার সুতোটাও সেইসঙ্গে ছিঁড়ে গেল। বললুম, “কী ব্যাপার, থেমে গেলেন যে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু চা খাবার ইচ্ছে হল।”
রাস্তার পাশেই চায়ের দোকান। দোকানের সামনে বটগাছ। বটগাছের তলায় বেঞ্চি পাতা। বেঞ্চিতে বসে দু’ গেলাস চায়ের অর্ডার দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেই উদয়পুর থেকে বলতে গেলে একরকম নন্-স্টপ গাড়িটা দৌড়চ্ছে। এখন ওর একটু বিশ্রাম পাওয়া দরকার।”
বললুম, “আপনিও তো নন-স্টপ গাড়ি চালাচ্ছেন। এবারে না হয় স্টিয়ারিং হুইলটা আমিই ধরি।”
“মাথা খারাপ?” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “একটু বাদেই তো আগরতলার মধ্যে ঢুকব, সেখানকার পথঘাট আপনি কিছুই চেনেন না, ফলে পাশে বসে ক্রমাগত আমাকে বলতে হবে, এবারে ডাইনে ঘুরুন, এবারে বাঁয়ে। তার চেয়ে বরং এতটা যখন চালিয়ে এসেছি, তখন বাকি পথটুকুও আমিই চালাই।”
বললুম, “অর্থাৎ কিনা সুখের চেয়ে সোয়াস্তি ভাল, এই তো?”
“তা যা বলেছেন। কিন্তু এতক্ষণ কী ভাবছিলেন বলুন তো? সারাক্ষণ তো দেখলুম চুপ করে বসে রইলেন। কোনও জরুরি কথা?”
চা দিয়ে গিয়েছিল। আমার গেলাসটার একটা চুমুক দিয়ে বললুম, “কী ভাবছিলুম, আপনি জানেন না? আচ্ছা লোক মশাই আপনি!”
“আমি আপনাকে বিজ্ঞাপনের ছবিটা খুব ভাল করে দেখতে বলেছিলুম। সেইসঙ্গে বলেছিলুম ইন্ডিয়া ভার্সাস ওয়েস্ট ইন্ডিজের একটা ক্রিকেট-টেস্টের কথা ভাবতে। খেলাটা বারো বছর আগেকার। হয়েছিল কলকাতায়। ক্লাব হাউসে বসে এই টেস্ট-ম্যাচের ফোর্থ ডে’র খেলাটা আমরা দেখেছিলুম। আপনি, আমি, আর…”
বাধা দিয়ে বললুম, “থাক্, থাক্, আর বলতে হবে না। আরে মশাই, নাইনটিন সেভেনটি নাইনের সেই দিনটার কথাই তো ভাবছিলুম এতক্ষণ।”
“কিছু মনে পড়ল? … মানে আমার সঙ্গে যে ছেলেটা ছিল, তার সম্পর্কে?”
“বিস্তর কথা মনে পড়েছে। বলব?”
“এখন বলতে হবে না। একটা কাজ করুন। একটু বাদেই তো আমরা হোটেলে পৌঁছে যাচ্ছি। সেখানে পৌঁছে আর সময় নষ্ট করবেন না, ছেলেটা সম্পর্কে যা-যা আপনার মনে পড়েছে, সব একটা কাগজে লিখে ফেলবেন। ঠিক আছে?”
“ঠিক আছে। কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞেস করি।”
“করুন।”
“আপনার সঙ্গে ওই যে বাচ্চা ছেলেটি সেদিন ইডেনে গিয়েছিল, তার কথা যতই ভাবছি, ততই আমার চোখ চলে যাচ্ছে বিজ্ঞাপনের সঙ্গে ছাপা এই ছবিটার দিকে। দুজনের মুখের খুব মিল।”
“তা হতেই পারে।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আপনার দশ-বারো বছর বয়েসের ছবির সঙ্গে আপনার একুশ-বাইশ বছরের ছবির মিল থাকবে না? পুরোপুরি মিল না থাক, একটা আদল… সেটা তো থাকবেই।”
চমকে উঠে বললুম, “সে-ই তা হলে….
ভাদুড়িমশাই বললেন, “লক্ষ্মণ। বঙ্কুর ছোট ছেলে। মানে যমজদের মধ্যে যেটা ছোট।”
“কিন্তু যদ্দুর মনে করতে পারছি, আপনি তো সেদিন বলেছিলেন যে, বাঙ্গালোর থেকে আপনার বঙ্কুপুত্রটি আপনার সঙ্গে কলকাতায় এসেছে। তাই না?”
“তা-ই তো এসেছিল। আসলে দুই ছেলেকে নিয়ে বঙ্কু গিয়েছিল ব্যাঙ্গালোরে। আমার বাড়িতেই উঠেছিল। তখন হঠাৎ আমার কলকাতায় আসবার দরকার হয়। শুনে লক্ষ্মণ বলল, কলকাতায় টেস্ট-ম্যাচ চলছে, আমিও তোমার সঙ্গে যাব। তো কী আর করব। ব্যাটাকে নিয়ে আসতে হল। ….কিন্তু না, এখন আর কোনও কথা নয়, ওটা বোধহয় বঙ্কুর গাড়ি আসছে।”
বলতে-না-বলতে দু’দুটো অ্যাম্বাসাডার গাড়ি আমাদের সামনে এসে ব্রেক কষে পরপর রাস্তার উপরে দাড়িয়ে গেল। প্রথম গাড়িটায় পিছনের সিটে বঙ্কুবাবু আর মিসেস ঘোষ, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে পীতাম্বর। দ্বিতীয় গাড়িটার পিছনের সিটে দীপক আর রামু, সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে রাজেশ। প্রথম গাড়িটা বিজু চালাচ্ছে, দ্বিতীয় গাড়িটা শঙ্কর।
কোনও গাড়িরই দরজা খুলবার লক্ষণ দেখা গেল না। আমরা এগিয়ে যেতে সামনের গাড়ির পিছনের সিটের জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনারা এখানে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই একটু চা খেয়ে নেবার ইচ্ছে হল।”
মিসেস ঘোষের পাশ থেকে বঙ্কুবাবু বললেন, “তবু ভাল, তোমাদের গাড়িটা এখানে দাঁড়িয়ে আছে শুনে আমি ভাবলুম, কলকব্জা বিগড়ে গিয়ে থাকবে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে না না, ও-সব কিছু নয়, তোমরা এগোও, আমরা তোমাদের ফলো করছি।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “আমরাও তো এখানে এক কাপ করে চা খেয়ে নিতে পারি।”
মিসেস ঘোষ বললেন, “বলো কী, আবার চা? তা ছাড়া রাস্তার ধারের এ-সব দোকানে চা দেয়, না কীসের পাতা সেদ্ধ করে দেয় কে বলবে। চলো চলো, ঘেমে-নেয়ে তো সবাই একশা হয়ে আছি, এখন আর গাড়ি থামাবার দরকার নেই, একেবারে হোটেলে গিয়ে চা খাব।”
বঙ্কুবাবুর মুখ দেখে বুঝলুম, মিসেস ঘোষের কথায় তিনি অস্বস্তি বোধ করছেন। একটু রেগে ও গেছেন হয়তো। কিন্তু কিছু বললেন না।
গাড়ি দুটো চলে গেল।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিছু বুঝলেন?”
হেসে বললুম, “একটা কথাই বুঝলুম। বৃদ্ধ বয়েসে দারপরিগ্রহ না করাই ভাল।”
“কিছু দেখলেন?”
“কী দেখব?”
“তার মানে দেখেননি। দ্বিতীয় গাড়ির পিছনের সিটে রামুর গলায় একটা স্লিং বাঁধা রয়েছে দেখলুম। যে-দিক থেকে পৈতে গলায় দেওয়া হয়, তার উলটো-দিক থেকে স্লিংটা পরানো। অর্থাৎ কিনা গলার ডান দিকে থেকে। তার মানে বাঁ হাতে কিছু হয়েছে।”
“তেমন সিরিয়াস কিছু নিশ্চয় নয়। একটা বই পড়ছিল দেখলুম।”
“বইটা ডান-হাতে ধরা। গাড়িতে বসে যখন কেউ বই পড়ে, তখন বইটা সাধারণত কোলের উপরে না রেখে একটু উঁচু করে ধরতে হয়। গাড়িতে একটু-না-একটু ঝাঁকুনি থাকেই, তা ছাড়া বাতাসে বইয়ের পাতা উড়তে থাকে, সেটা সামলাবার জন্যে বইটাকে দু-হাতে না-ধরে উপায় থাকে না। ও কিন্তু একটা-হাতে বইটা ধরেছিল। ডান হাতে। বাঁ হাতটা জখম হয়েছে কি না, ভাবছি।”
“ওর উপরে আবার কোনও অ্যাটেম্ট হল না তো?”
“কী জানি।” চিন্তিতভাবে ভাদুড়িমশাই বলেলেন, “হতেও পারে। …কিন্তু আর নয়, চলুন এবারে রওনা হওয়া যাক।”
চায়ের দাম মিটিয়ে আমরা গাড়িতে গিয়ে উঠলুম।
গাড়ি স্টার্ট দেবার পরে কিছুক্ষণ কোনও কথা হল না। বুঝতে পারছিলুম, ভাদুড়িমশাই একটু অন্যমনস্ক। কিছু ভাবছেন। হঠাৎ এক সময়ে বললেন, “কেসটা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, কিরণবাবু।”
বললুম, “নতুন আবার কী হল? …ও হ্যাঁ, রামুর উপরে সম্ভবত আবার হামলা হয়েছে। কী জানেন, ওকে প্রোটেকশন দেবার জন্যেই তো আপনার এখানে আসা। সিপাহিজলায় ওকে ফেলে রেখে তাই আমাদের চলে আসা উচিত হয়নি। এ-যাত্রায় না হয় কমলাসাগর আর কসবার কালীবাড়ি না-ই দেখতুম। পরেও নিশ্চয় ত্রিপুরায় আসা হবে আবার। এখনকার মতো ব্যাপারটা মলতুবি রাখলেও কিছু ক্ষতি ছিল না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দূর মশাই, আপনার বড্ড ওয়ান-ট্রাক মাইন্ড। আমি রামুর কথা ভাবছি না। খালি অ্যাটেম্ট-অ্যাটেম্ফ্ট করছেন কেন? হঠাৎ কোথাও বেমক্কা পড়ে গিয়েও হাত ভেঙে থাকতে পারে। তা কি কেউ পড়ে না নাকি?”
ঢোক গিলে বললুম, “তাও কিছু বিচিত্র নয়। যাই-ই হোক, ঠিক কী যে হয়েছে, হোটেলে না পৌঁছনো পর্যন্ত সেটা বোঝা যাচ্ছে না।”
“এই এতক্ষণে আপনি একটা বুদ্ধিমানের মতো কথা বললেন। যতক্ষণ না হোটেলে পৌঁছচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত রামুকে নিয়ে ভেবে কোনও লাভ নেই।”
“তা হলে কার কথা ভাবব?”
পিছন থেকে একটা বাস ক্রমাগত হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছিল। রাস্তার বাঁ দিকে সরে গিয়ে সেটাকে ‘পাস’ দিলেন ভাদুড়িমশাই, তারপর বললেন, “যে ছেলেটা নিখোঁজ হয়ে গেছে, তার কথাও তো একটু-আধটু ভাবতে হবে। আমি লক্ষ্মণের কথা ভাবছি। ও হ্যাঁ, লক্ষ্মণের সম্পর্কে আপনাকে যা বলেছি, মনে আছে তো?”
“হ্যাঁ। হোটেলে পৌঁছেই সব লিখে ফেলব। সব কথা অবশ্য আমার মনে নেই।”
যেটুকু মনে আছে, সেটুকু অন্তত লিখে ফেলুন। কিছু বাদ দেবেন না।”
রাস্তার উপরে গাড়িঘোড়া আর মানুষজনের সংখ্যা ইতিমধ্যে বেশ বেড়ে গিয়েছিল। মনে হল, আগরতলার কাছাকাছি এসে পড়েছি। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি বললেন, “সামনে একটা নদী পড়বে। শুনে অবাক হবেন না, এখানে যেমন কসবা বলে একটা জায়গা আছে, তেমনি আবার হাওড়া বলে একটা নদী আছে। নদী পেরুলেই আগরতলা শহর।”
খানিক বাদেই নদীর উপরকার ব্রিজ পেরিয়ে আমরা আগরতলায় ঢুকলুম। নদীর ধারে শ্মশানঘাট। শ্মশান ছাড়িয়ে বাজার। সেই ঘিঞ্জি এলাকাও পার হয়ে আসা গেল। পথ এখন আবার মোটামুটি ফাঁকা। হোটেলের নাম জানাই ছিল। নিশানাটাও বঙ্কুবাবু জানিয়ে দিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও গাড়ি থামিয়ে রাস্তার পাশের একটা ওষুধের দোকান থেকে জেনে নিলুম যে, ঠিক কোন রাস্তা ধরে আমাদের এগোতে হবে।
হোটেলে এসে যখন পৌঁছলুম, তখন সাড়ে ছ’টা বাজে।
রিসেপশান-কাউন্টারের সামনে প্রশস্ত জায়গাটা বেশ সাজানো-গোছানো। বঙ্কুবাবু সেখানে একটা সোফায় চুপচাপ বসে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে পীতাম্বর। আমাদের ঢুকতে দেখে পীতাম্বর তার মনিবকে বলল, “বাবুরা এসে গেছেন।” শুনে বঙ্কুবাবু তাঁর সোফা থেকে উঠে, সামনের দিকে তাকিয়ে, বললেন, “এসো চারু… আসুন কিরণবাবু।” আমরা যে ইতিমধ্যে তাঁর একবারে পাশে চলে এসেছি, সেটা তিনি বুঝতে পারেননি।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “চেক-ইন করা হয়েছে?”
“অনেকক্ষণ। ওরা যে যার ঘরে রয়েছে। …ও হ্যাঁ, পাঁচটা ঘরই তিনতলায়।”
পীতাম্বর একটা চাবি আমার হাতে তুলে দিয়ে বলল, “আপনাদের ঘরটা বাবুর ঘরের ঠিক পাশে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা বঙ্কু, তুমি আবার নীচে নেমে আসতে গেলে কেন? আবার তো কষ্ট করে উপরে উঠতে হবে।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “না হে, চিন্তা কোরো না, এখানে লিফ্ট রয়েছে।”
সবাই মিলে লিফটে করে উপরে উঠে এলুম। বঙ্কুবাবু নিজের ঘরে না গিয়ে আমাদের ঘরে এসে ঢুকলেন। তরপর পীতাম্বরকে বললেন, “তুই একটু বাইরে যা, মিনিট পনেরো বাদে আসবি, বাবুদের সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।”
পীতাম্বর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বঙ্কুবাবু বললেন, “বলো কী বলবে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে-সব কথা তো পনেরো মিনিটে শেষ হবে না, অনেক সময় লাগবে। ওটা বরং রাত্তিরেই খাওয়ার পরে হবে। এখন একটা কথা জিজ্ঞেস করি। রামুর উপরে কি ইতিমধ্যে ফের হামলা হয়েছিল?”
“না, না হামলা নয়। ছোট্ট একটা অ্যাকসিডেন্ট। কিন্তু তুমি সে-কথা জানলে কী করে?”
“গাড়িতে ওকে দেখলুম তো। মনে হল যেন গলায় একটা স্লিং বাঁধা।”
“আর বোলো না,” বঙ্কুবাবু বললেন, “এখানে আসা অবধি একটা-না-একটা লেগেই আছে। সিপাহিজলায় দুপুরের খাওয়ার খানিক বাদে একটু রেস্ট নেবার জন্যে দোতলায় যাচ্ছিল। তা সিঁড়ির কয়েকটা ধাপ উঠতে-না-উঠতেই পা হড়কে পড়ে যায়।”
“তাতে বাঁ-হাতটা জখম হয়েছে?”
“ওই মানে ঠিক জখম নয়, একটু মচকে গিয়েছে আর কি।”
“ও তো দেখছি একতলায় থাকে। রেস্ট নেবার জন্যে হঠাৎ দোতলায় উঠতে গেল কেন?”
“কথাটা যে আমি জিজ্ঞেস করিনি, তা নয়,” বঙ্কুবাবু বললেন, “তাতে বলল যে, দোতলাটা অনেক খোলামেলা, হাওয়াও অনেক বেশি। তা সেই হাওয়া খেতে গিয়ে কী কান্ড বাধিয়ে বসল দ্যাখো। আসল ব্যাপারটা কী জানো চারু, সেই যে ওর বিলেত যাওয়ায় বাধা দিয়েছিলুম, তার পর থেকেই ও যেন কেমন হয়ে গেছে। একে তো আমার সঙ্গে কথাই বলতে চায় না, তার উপরে দারুণ একগুঁয়ে। আমি যেটা বলব, তার বিরুদ্ধে ওর যাওয়াই চাই। যেন তাতেই ওর শান্তি।”
কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ কাটল। তারপর ভাদুড়িমশাই বললেন, “হাতটা যে মচকে গেল, ডাক্তার ডেকেছিলে? …মানে ছড়ে-টড়ে যায়নি তো? তা হলে কিন্তু একটা অ্যান্টি-টিটেনাস সিরাম নিলে ভাল হত।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “আরে না না, ছড়ে-টড়ে যায়নি। আর তা গেলেই বা এখানে এ.টি.এস. ইঞ্জেকশন কে দিত? ধারে কাছে ডাক্তারই নেই। না না, ও-সব কিছু নয়, জাস্ট একটু মচকে গিয়েছে। হাতটা অবশ্য নাড়াতে পারছিল না, খুব ব্যথাও করছিল নাকি। তো ডলির সঙ্গে এক বান্ডিল ব্যান্ডেজের কাপড় ছিল তো, দীপক তাই দিয়ে তক্ষুনি-তক্ষুনি একটা স্লিংয়ের ব্যবস্থা করে দিল।”
“ব্যথাটা কি এখনও আছে?”
“কী ব্যাপার বলো তো?” বঙ্কুবাবু বললেন, “হাতটা সামান্য একটু মচকে গেছে বই তো নয়, আমরা তো ছেলেবেলায় স্রেফ চুন-হলুদ লাগিয়ে দিতুম। এখন অবশ্য সাতশো রকমের মলম হয়েছে। তার একটা লাগিয়েও দিয়েছে দীপক। তো তাই নিয়ে তুমি এত ব্যস্ত হচ্ছ কেন?”
“ব্যস্ত হবার কারণ আছে বলেই হচ্ছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্যাখো বঙ্কু, ব্যথা যখন কমে না, তখন অনেক সময় দেখা যায় যে, একটা হাড় হয়তো ভেঙেছে। কিংবা না-ও যদি ভেঙে থাকে, তাতে চিড় ধরেছে। সত্যিই তেমন কিছু যে হয়েছে, তা কিন্তু আমি বলছি না। শুধু বলছি যে, ওকে একবার জিজ্ঞেস করা দরকার ব্যথাটা কমেছে কি না। যদি কমে গিয়ে থাকে, তো ল্যাঠা চুকে গেল। না কমে থাকলে কিন্তু আমি একটা এক্স-রে করিয়ে নিতে বলব। তা ব্যথাটা কমেছে কি না, এখানে এসে তা কি তুমি ওকে জিজ্ঞেস করেছিলে?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “আমি জিজ্ঞেস করব? আমার সঙ্গে তো ও কথাই বলতে চায় না। ঠিক আছে, ডলিকে দিয়ে বরং জিজ্ঞেস করাচ্ছি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাক, কাউকে দিয়ে জিজ্ঞেস করাতে হবে না। খানিক বাদে তো ডাইনিং হলে ওর সঙ্গে দেখা হচ্ছে, তখন আমিই জিজ্ঞেস করব তখন।”
“আর কিছু বলবে আমাকে?”
“এখন নয়। রাত্তিরের খাওয়ার পাট চুকে যাবার পরে তো তুমি ঘন্টা-খানেকের জন্যে আমাদের ঘরে আসছ, তখন কথা হবে। এখন তুমি ঘরে যাও। … কিরণবাবু, পীতাম্বর সম্ভবত দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ওকে ডেকে দিন।”
পীতাম্বর সত্যি দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে এসে বঙ্কুবাবুকে তাঁর ঘরে পৌঁছে দিল। দরজা বন্ধ করে ফিরে আসছি, ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু বাদেই খাওয়ার ডাক পড়বে। স্নান করে জামাকাপড় পালটে নিন। আপনি বেরুলে আমি বাথরুমে ঢুকব।”
খাবার ডাক পড়ল সাড়ে আটটা নাগাদ। আমার একটু মাথা ধরেছিল, তাই ভাবছিলুম যে, রুম সার্ভিস যখন রয়েছে, ফোন করে খাবারটা ঘরে আনিয়ে নেব। ভাদুড়িমশাই বললেন, “আরে না, অত অল্পে কাতর হয়ে পড়বেন না তো, সবাই মিলে যখন একতলায় ডাইনিং হলে যাওয়া হচ্ছে, তখন আপনিও চলুন। আর তা ছাড়া, ঘরে বসে ডিনার খাবেন বলে আপনাকে এখানে আনানো হয়েছে নাকি? চারদিকে নজর রাখতে হবে না?”
অগত্যা নীচে যেতেই হলে। ডাইনিং হলটা বেশ বড়। জানলার ধারে দুটো টেবিল জোড়া লাগিয়ে আমাদের বসবার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আমরা যখন গিয়ে পৌঁছলুম, মিসেস ঘোষ সদ্য তখন ওয়েটারকে খাবারের অর্ডার দিতে শুরু করেছেন। আমাদের দেখে বললেন, “এখানে সব রকমের খাবারই পাওয়া যায়। আমরা চাইনিজ নিচ্ছি। আপনারা কী নেবেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দ্য সেম অ্যাজ ইয়োর্স।”
টেবিলের অন্য দিকে রামু বসে আছে। বাঁ হাতটা স্লিংয়ে ঝোলানো। বললুম, “হাতটা শুনলুম মচকে গেছে। এখন কেমন আছ?”
রামু মৃদু হাসল। কিছু বলল না।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এখনও ব্যথা করছে নাকি?”
রামু এবারেও মুখে কিছু বলল না। দু-দিকে মাথা নাড়ল শুধু।
বঙ্কুবাবু মাথা-নাড়াটা দেখতে পাননি। উদ্বেগের গলায় বললনে, “কী রে, তোর আলের কথার জবাব দিচ্ছিস না কেন?”
মিসেস ঘোষ বললেন, “দিয়েছে। বলছে, যে, এখন আর ব্যথা নেই।”
সুপ এসে গিয়েছে। ভাদুড়িমশাই চামচ দিয়ে অল্প-একটু মুখে তুলে মিসেস ঘোষের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ক্র্যাব অ্যান্ড অ্যাসপ্যারাগাস। আমার প্রিয় সুপ। আপনার অবশ্য জানবার কথা নয়।”
মিসেস ঘোষ বললেন, “জানব না কেন, আপনার বঙ্কুই বলেছে। এটাও শুনেছি যে, কলেজে পড়বার সময় প্রায়ই নাকি নানকিংয়ে যেতেন আপনারা। সত্যি?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “আমার কি আর তখন নানকিংয়ে যাওয়ার মতন অবস্থা? চারুই আমাকে ধরে নিয়ে যেত। তা চারুও কেন যেত জানো? স্রেফ ওই ক্র্যাব অ্যান্ড অ্যাসপ্যারাগাস সুপের জন্যে।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আর-কিছু খাবার মতো পয়সা কি তখন আমারই ছিল? তবে একটা কথা বলব। কলকাতায় তো তখন আরও গোটাকয় চিনে রেস্তোরাঁ ছিল, পরে অবশ্য আরও অনেক হয়েছে, কিন্তু নানকিংয়ের মতন আর একটাও হল না। বঙ্কুর হয়তো মনে থাকতে পারে, পকেট-মানি জমিয়ে-জমিয়ে একদিন একটা ম্যান্ডারিন ফিশও ওখানে খেয়েছিলুম। উঃ, তার স্বাদ যেন এখনও মুখে লেগে আছে।”
ডাইনিং হলে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত স্রেফ খাওয়া নিয়েই কথাবার্তা হতে লাগল। অন্য প্রসঙ্গে একটাও কথা হল না। খাওয়া শেষ হতে-হতে সাড়ে নটা। নীচে আর কোনও কাজ ছিল না। আমরা উপরে এসে যে যার ঘরে এসে ঢুকলুম।
তারপর খানিক বাদে, রাত দশটা নাগাদ, আমাদের দরজায় টোকা পড়ল।
