চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১২
ভোর পাঁচটায় ভাদুড়িমশাই আবার ঘুম ভাঙিয়ে দিলেন আমার। বললেন, “চলুন, একটু ঘুরে আসা যাক।”
বললুম, “দেখুন মশাই, কাল মাঝরত্তিরে একবার আপনি আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছেন। এখন আবার সেই এক কান্ড। এ তো দেখছি মহা জ্বালাতনের ব্যাপার হল!”
“সে তো মাত্র পাঁচ-সাত মিনিটের জন্যে ঘুম ভাঙিয়েছিলুম। তারপর ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়েই তো ঘুমিয়ে পড়লেন। নিন নিন, যথেষ্ট ঘুমিয়েছেন, এবারে লক্ষ্মীছেলের মতো উঠে পড়ুন দেখি।”
“বেড-টি না-খেয়েই?”
“বেড-টি এখানে সাতটার আগে দেবে না। ততক্ষণ কি ঘুমোবেন নাকি? চলুন, রাস্তার কোনও দোকান থেকে বরং চা খাওয়া যাবে।”
মুখে-চোখে জল দিয়ে, গেস্ট হাইস থেকে বেরিয়ে এসে অবশ্য মনে হল যে, কাজটা নেহাত খারাপ করিনি। বেরোবার আগে রামুর দরজাটা সামান্য ঠেলে দেখলেন ভাদুড়িমশাই। ভিতর থেকে সেটা বন্ধ। বাইরে ভোরের হাওয়া বইছে। এমন হাওয়া কলকাতায় আমরা পাই না। তার উপরে আবার আমি থাকি শেয়ালদা পাড়ার গলিতে, মানুষজনের নিশ্বাসে আর ডিজেলের ধোঁয়ায় বাতাস সেখানে সর্বক্ষণই গরম হয়ে থাকে। বছর কয়েক আগেও দেখেছি, অন্তত সন্ধের দিকে কলকাতায় একটা গা-জুড়োনো ঠান্ডা হাওয়া বইত। ইদানীং সেটার ছোঁয়াও আর বিশেষ পাই না।
দিঘির পশ্চিম পাড়ের রাস্তা দিয়ে আমরা এগোচ্ছিলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই রকমের আরও কয়েকটা বড়-বড় দিঘি রয়েছে এই উদয়পুরে। সবই রাজাদের আমলের।”
“সিপাহিজলাতেও তো বিশাল একটা দিঘি দেখলুম।”
“তা দেখেছেন। তবে কমলাসাগরটা এখনও দেখা হয়নি।”
“ওটা তো কসবার কালীবাড়ির কাছে। তাই না?”
“রাইট।”
“ওটার কথা শঙ্করের কাছে শুনেছি। কমলাসাগরে কীভাবে জল উঠল, তাই নিয়ে একটা গল্পও শুনেছি শঙ্করের কাছে। তবে দেখা হয়নি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ তো আমরা আগরতলায় ফিরে যাচ্ছি। দেখি যদি ফেরার পথে কমলাসাগরটা আপনাকে দেখিয়ে দেওয়া যায়। জায়গাটা একেবারে বাংলাদেশের বর্ডারে।”
কথা বলতে-বলতে গেস্ট হাউসের সামনের দিঘিটা ত এরা পেরিয়ে এসেছিলুম। তারপরেই আবার আর-একটা দিঘি। সেটাও মস্ত বড়
বললুম, “ব্যাপার কী বলুন তো। কুমিল্লা সম্পর্কে এককালে শুনতুম যে, জায়গাটা নাকি ফেমাস ফর ইটস ব্যাঙ্কস অ্যান্ড ট্যাঙ্কস। তা ত্রিপুরার শহরগুলোও দেখছি, ব্যাঙ্ক না হোক, ট্যাঙ্কের ব্যাপারে মোটেই পিছিয়ে নেই। ওরেব্বাবা, এ তো দিঘির পর দিঘি!”
“তা যা বলেছেন!” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “এখানকার দিঘি সত্যি দেখার মতো।”
“এত দিঘি কেন? জলের কষ্ট মেটাবার জন্য?”
“সেটা অবশ্যই একটা কারণ, তবে আসল কারণ নয়।”
“আসল কারণটা কী?”
“আসল কারণ লোকজনকে কাজে লাগাবার এটাই ছিল একটা মস্ত উপায়। বিশেষ করে অজন্মার বছরে। ফসল ভাল হয়নি, দুর্ভিক্ষের লক্ষণ দেখা দিয়েছে, গাঁ-গঞ্জ ঝেঁটিয়ে লোকজন চলে আসছে রাজধানীতে, এই অবস্থায় রাজকোষ থেকে সাহায্য না-দিয়ে উপায় থাকত না। তো সেই সাহায্য কীভাবে দেওয়া হবে? ভিক্ষে হিসেবে দেওয়া যায়। কিন্তু কারও পক্ষেই সেটা সম্মানের হয় না। না রাজার পক্ষে, না প্রজার পক্ষে। তার চেয়ে বরং কাজের ব্যবস্থা করো। নতুন একটা দিঘি হোক, নতুন একটা রাস্তা হোক। প্রজাদের সেই দিখি কাটাবার কি রাস্তা বানাবার কাজে লাগিয়ে দাও। তারা কাজ করুক, কাজের বিনিময়ে রাজার গোলা থেকে ধান নিয়ে যাক। ওই যাকে টেস্ট রিলিফ বলা হয়, সেই ব্যাপার আর কী। এতে একদিকে যেমন প্রজারা বেঁচে যেত, অন্যদিকে তেমন দেখতে-দেখতে তৈরি হয়ে যেত বিশাল সব দিঘি, কিংবা বিরাট সব রাস্তা।”
বললুম, “রাজতন্ত্রের হয়ে ওকালতি করছেন না তো?”
ভাদুড়ি মশাই ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন। বললেন, “আপনি তা-ই বুঝলেন? বলিহারি বুদ্ধি আপনার। আরে মশাই, রাজতন্ত্র গেছে, আপদ গেছে। কিন্তু তাই বলে আবার এমন কথা ভাববেন না যে, রাজারা সবাই মানুষ হিসেবে ছিলেন অতি পাষন্ড। না মশাই, তাঁদের মধ্যেও বিস্তর ভাল মানুষ ছিলেন। এমন মানুষ, প্রজাদের সুখ-দুঃখের কথাটা যাঁরা ভাবতেন। শুধু ফূর্তিফার্তা করেই তাঁরা সময় কাটাতেন না। বাট দেয়ার রোল হ্যাজ বিন প্লেড আউট। পৃথিবী জুড়ে এখন চলছে মন্ত্রিতন্ত্র। কিন্তু সমস্যা কি তাতে মিটেছে? মন্ত্রীরাই যে সবাই একেবারে নিপাট সজ্জন, তাও কি আমরা বলতে পারছি? বুকে হাত দিয়ে বলুন দেখি, মন্ত্রীরা সবাই খুব অনেস্ট লোক? তাঁরা কি কেউ ঘুষ খান না? তাঁরা কেউ দলের স্বার্থে দেশকে ডোবান না? তাঁরা কেউ আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নেন না? …কী হল, চুপ করে রইলেন কেন?”
বললুম, “আপনার কথাগুলো ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ঠিক আছে, এ-সব কথা তা হলে থাক। মিসেস ঘোষের ফিল্ম নিয়েই বরং আলোচনা করি।”
বললুম, “ফিল্ম যে কী হবে, সে তো বোঝাই যাচ্ছে। ও নিয়ে আর কোনও কথা বলে লাভ নেই। আর বললেই যে মিসেস ঘোষ সে-কথায় কান দেবেন তাও মনে হয় না। ওটাও তাই মুলতুবি থাক। আমি আসলে রামুর কথা ভাবছি।”
“অর্থাৎ মাঝরাতিরে রামু তার ঘর থেকে কোথায় গিয়েছিল, এই তো?”
“হ্যাঁ।”
“প্রশ্নটার উত্তর আমার জানা নেই, তবে জেনে যাব নিশ্চয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে অন্য একটা উত্তরের কিছুটা আভাস পেয়েছি।”
“সে কী?”
“এখন বলব না।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “আগে নিশ্চিত হই যে, উত্তরটা কারেক্ট, তারপর বলব। …কিন্তু না, আর নয়। এবারে ফেরা যাক।”
“রাস্তার কোনও দোকান থেকে আমাকে চা খাওয়াবেন বলেছিলেন।”
“এদিকে তো একটাও দোকান এখনও চোখে পড়ল না। চলুন, গেস্ট হাউসে ফিরে গিয়ে বরং চা খাবেন।”
গেস্ট হাউসে ফিরতে-ফিরতে প্রায় সাতটা বাজল। দেখলুম, সামনের বারান্দায় বসে সবাই গল্প করছেন। আমাদের দেখে দীপক বলল, “আসুন, আসুন! আমাদের এক-রাউন্ড চা ইতিমধ্যে হয়ে গিয়েছে।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “বোসো, চারু। মিঃ চ্যাটার্জি, আপনিও বসুন। …ডলি, আর-এক রাউন্ড চা দিতে বলো।”
দীপক বলল, “দিদি তো একটু আগে ভিতরে চলে গেল।”
“ঠিক আছে, তা হলে তুমিই গিয়ে চায়ের অর্ডারটা দিয়ে এসো। …তারপর চারু, তোমরা কোথায় গিয়েছিলে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিশেষ কোথাও নয়। আসলে অনেক দিনের অব্যেস তো, ভোরবেলায় উঠে মাইল কয়েক হেঁটে না এলে আমার শরীরের জড়তা ঠিক কাটতে চায় না। …তা, কী নিয়ে তোমাদের কথা হচ্ছিল?”
চায়ের অর্ডার দিয়ে দীপক ইতিমধ্যে ফিরে এসেছিল। উত্তরটা সে-ই দিল। বলল, “সাঁতার নিয়ে। কাল সন্ধেয় সাঁতার কেটে খুব ভাল লেগে গিয়েছিল আমাদের। আমি আর রাজেশ মাঝরাত্তিরে তাই আবার গিয়ে দিঘিতে নেমেছিলুম। ভাঞ্জাও সঙ্গে ছিল। ওকে ডাকতে বলল, ‘আমি তো সাঁতার কাটতে জানি না, তবে চলো, সঙ্গে যাচ্ছি তোমাদের, পাড়ে বসে থাকব।’ তা, ভাঞ্জাও খুব এনজয় করেছে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, এ তো খুবই ভাল কথা। আমাদের যদি ডাকতে তো আমরাও গিয়ে নেমে পড়তুম। …তো রামু, আমি বলি কী, তুমিও এবারে সাঁতারটা শিখে নাও। ওর চেয়ে ভাল এক্সারসাইজ আর হয় না।”
রামু লাজুক হাসল। কিছু বলল না।
বঙ্কুবাবু বললেন, “তোমার চারুকাকা ঠিক কথাই বললেন। শুধু পড়াশুনোয় ভাল হলেই হয় না, শরীরটাও মজবুত রাখা চাই।”
চা এসে গিয়েছিল। চটপট খেয়ে ভাদুড়িমশাই উঠে পড়লেন। বললেন, “তোমরা কি আর কিছুক্ষণ “বসবে এখানে?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “একটু বসি। ঘরে গিয়ে আর কী করব, খানিক বাদেই তো ব্রেকফাস্টের ডাক পড়বে। ততক্ষণে বরং দীপক আর রাজেশের সঙ্গে কথা বলা যাক।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা তা হলে টুকিটাকি দু-একটা কাজ সেরে নিই ততক্ষণে। আসুন, কিরণবাবু।”
করিডর দিয়ে আমরা ঘরের দিকে পা বাড়ালুম। ভাদুড়িমশাই কিন্তু ঘরে ঢুকলেন না। বললেন, “আপনি ঢুকে যান, আমি এক্ষুনি আসছি।”
ভাদুড়িমশাই ঘরে ফিরলেন মিনিট খানেকের মধ্যেই। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে নিচু গলায় বললেন, “মিস্টিরিয়াস ব্যাপার।”
বললুম, “কোথায় গিয়েছিলেন?”
“দীপকের ঘরে। মাঝরাত্তিরে যারা জলে নেমেছিল, তাদের সুইমিং ট্রাঙ্ক দুটো তো এর মধ্যেই শুকিয়ে যাবার কথা নয়। কিন্তু ওদের বাথরুমে যে দুটো সুইমিং ট্রাঙ্ক ঝুলছে দেখলুম, সে দুটো একেবারে শুকনো খটখটে। ঘরে কিংবা বাথরুমে অন্য কোনও ভিজে কাপড়ও দেখলুম না!”
“তার মানে?”
“তার মানে মাঝরাত্তিরে ওরা দিঘিতে নামেনি।”
