চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১১
এই গেস্ট-হাউসটা একতলা, তবে বেশ ছড়ানো। সামনে-পিছনে অনেকখানি ফাঁকা জায়গা। একটা বাগানও রয়েছে। সেটায় অবশ্য যত্নের ছাপ বিশেষ নেই। ফুলগাছগুলো যে-যার ইচ্ছেমতো ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে;দেখলেই বোঝা যায় যে, যত্ন করে কেউ তাদের ছাঁটে না। এখানে-ওখানে কিছু আগাছাও জন্মেছে। সেগুলো উপড়ে ফেলা দরকার। ঘাসগুলোও সমানভাবে ছাঁটা নয়। একদিকে একটা লন মোয়ার পড়ে রয়েছে। দেখেই বোঝা যায়, অনেক দিন সেটাকে কেউ কাজে লাগায়নি।
ম্যানেজারকে এই নিয়ে প্রশ্ন করেছিলুম। তিনি বললেন, যে-লোকটা মালির কাজ করে, পনেরো দিনের ছুটি নিয়ে সে আগরতলায় গেছে, অথচ এদিকে এক মাস কেটে গেল, তবু ফিরবার নাম নেই। ফলে বাগানের এই হাল। এখন তো তবু বাগান বলে চেনা যাচ্ছে, আর-কিছুদিন যাক, তখন আর জঙ্গলের সঙ্গে এর বিশেষ তফাত থাকবে না।
বাগানের অবস্থা দেখে মন খারাপ হয়েছিল ঠিকই, তবে সামনে তাকিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। রাস্তার একদিকে এই গেস্ট হাউস, অন্যদিকে একটা বিশাল দিঘি। দিঘিতে নামবার জন্যে বাঁধানো ঘাট রয়েছে। টলটলে জলের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এক্ষুনি এই ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে দিঘিতে নেমে যাই।
ভাদুড়িমশাই আমার মনের কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন নিশ্চয়। তাই মৃদু হেসে বললেন, “সম্ভব নয়।”
“নয় কেন?”
“আধ ঘণ্টার মধেই লাঞ্চের ডাক পড়বে। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা লোকেশন বাছাই করতে বেরিয়ে পড়ব।”
“ও হ্যাঁ, ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে যেতে হবে।” হেসে বললুম, “মিসেস ঘোষ যে লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরে, কপালে একটা মস্ত সিঁদুরের টিপ চড়িয়ে পুজোর ডালি হাতে নিয়ে মন্দিরে যাবেন, ছবির এই ভাইটাল দৃশ্যটার কথাই আমার মনে ছিল না।”
“শুধু এই দৃশ্যটা কেন, অনেক কিছুই ইদানীং আপনার মনে থাকছে না। কিন্তু না, শুধু ত্রিপুরেশ্বরীর নন্দির নয়, খুব পুরনো একটা শিবমন্দিরও রয়েছে এখানে। পোড়ামাটির মন্দির। সেটাও দেখতে হবে। আর তা ছাড়া, এমনিতেও এই শহরটা একটু ঘুরে দেখা দরকার।”
“তা হলে কখন দিঘিতে নামব?”
“কেন, বিকেলের দিকে নামলে ক্ষতি কী। নাকি বিকেলে স্নান করলে আপনার শরীর খারাপ হবে?”
“আর ধুর মশাই, আমার শরীর অত পলকা নয়।”
“তা হলে ওই কথাই রইল। এখন চলুন, ঘরে যাওয়া যাক।”
গেস্ট হাউসে তিন-বিছানার ঘর নেই। ঘরগুলো বড়ও নয় বিশেষ। তাই বাড়তি একটা খাটও কোথাও ঢোকানো যাচ্ছে না। বঙ্কুবাবুকে এই কথাটা জানাতে তিনি বলেছিলেন, তার দরকারই বা কী, পাঁচটা ডাবল-বেডের ঘর নিয়ে নিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।”
তা-ই নেওয়া হয়েছে। একটা ঘরে সস্ত্রীক বঙ্কুবাবু থাকবেন, একটা ঘরে ভাদুড়িমশাই আর আমি, একটা ঘরে রাজেশ আর দীপক, একটা ঘরে পীতাম্বর আর বিজু। পঞ্চম ঘরটা একা রামুর দখলে। বঙ্কুবাবু তাতে অবশ্য রাজি হতে চাইছিলেন না। বারবার বলছিলেন, “রামু কেন একা থাকবে। বরং ও আর ডলি একঘরে থাক, আমি একা শোব।” কিন্তু বঙ্কুবাবু চোখে প্রায় দেখতেই পান না, তেষ্টা পেলে নিজে এক গ্লাস জল গড়িয়ে নেবার ক্ষমতাও তাঁর নেই, তাঁকে তাই একা থাকতে দিতে কেউই রাজি নয়। রামু নিজেই বলল, “না না, সেটা ঠিক হবে না। তা ছাড়া, ভুবনেশ্বরের বাড়িতেও তো আমি একাই থাকি, এখানেও থাকতে পারব।”
রামু এমনিতে খুবই কম কথা বলে। সত্যি বলতে কী, সিপাহিজলায় অজ্ঞান হয়ে পড়বার পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে আর নীরমহলের ইট ছোড়ার ব্যাপারটার বিবরণ দিতে গিয়ে সেই যে সে কয়েকটা কথা বলেছিল, তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত তাকে একবারও মুখ খুলতে দেখিনি। ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে অবশ্য শুনেছিলুম যে, সে একটু চাপা স্বভাবের ছেলে। তাই বলে যে এতই চাপা, সেটা ভাবিনি। তার উপরে লক্ষ করলুম, কথা যেমন কালেভদ্রে বলে, তেমন আবার সেটা বলে খুবই নিচু গলায়।
দুপুরের খাওয়া ঢুকে যাবার পরে ঘরে ফিরে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে রামুর বিষয়ে কথা হচ্ছিল। বললুম, “আপনি ঠিকই বলেছিলেন। ছেলেটার স্বভাব সত্যি বড্ড চাপা। পরশু সন্ধে থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত মাত্র দু-বার ওকে মুখ খুলতে দেখলুম। দুপুরবেলায় খাওয়ার কথাই ধরুন না। ঝোলটা নুনে-কাটা, ভাতটা ঠিকমতো সেদ্ধ হয়নি, ডালটাও মনে হয় একটু ধরে গিয়েছিল। তাই নিয়ে সবাই কত কথা বলল, ম্যানেজারকে ডেকে পাঠিয়ে ধমকানো হল পর্যন্ত, অথচ আমরা যে সবাই এত চেঁচামেচি করছি, সেদিকে ওর যেন কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই, নিঃশব্দে খেয়ে উঠে নিজের ঘরে চলে গেল, সামান্য একটা টু-শব্দ পর্যন্ত করেনি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বরাবর কিন্তু এমন ছিল না ছেলেটা। কথা কম বলত ঠিকই, তবে এত কম নয়।”
“পরিবর্তনটা কবে থেকে হল?”
“বছর দুয়েক আগে থেকে। আরও স্পষ্ট করে বলি, ওর বি.কম. পাশ করবার খবর বেরুবার পর থেকে।”
“বি.কম. পাশ করলে কি কম কথা বলতে হয়?” হেসে বললুম, “কই, এমন তো কখনও শুনিনি।”
ভাদুড়িমশাইও হাসলেন। বললেন, “তা নয়, আসলে কী হয়েছিল বলি, গ্র্যাজুয়েট হবার পরেই বঙ্কুর সঙ্গে ওর ঝগড়া বেধে যায়।”
“কীসের ঝগড়া?”
“রামু বিলেত যেতে চেয়েছিল। বঙ্কু যেতে দেয়নি।”
“কেন? ওঁদের তো টাকার অভাব নেই। ইচ্ছে করলে শুধু নিজের ছেলে কেন, পাড়াপড়শির ছেলেদের তো অক্লেশে উনি বিলেত ঘুরিয়ে আনতে পারেন।”
“আরে মশাই, এটা টাকার ব্যাপার নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সবটা আগে শুনুন। নইলে আপনি কিছুই ধরতে পারবেন না। একে তো বঙ্কুর চোখ খারাপ, বিস্তর চিকিচ্ছে করিয়েও নাকি দৃষ্টিশক্তির কিছুমাত্র উন্নতি হয়নি, তার উপরে ওর শরীরও ভেঙে পড়েছে। বঙ্কু তাই কিছুদিন ধরেই ভাবছিল যে, বি-কম পাশ করবামাত্র রামুকে তার কারবারে টেনে নেবে। রামুকে সে-কথা স্পষ্ট করে ও জানিয়েওছিল। বলেছিল, বিলেতে গিয়ে লেখাপড়া করা মানে তো আরও বছর পাঁচেকের ধাক্কা, তদ্দিন ও বাঁচবে কি না তারই ঠিক নেই। ও-সব চলবে না। এম.কম. পড়েই বা কী হাতিঘোড়া হবে, বাপ যদি আই.এ. পাশ করে এতখানি করতে পেরে থাকে তো বুঝতে হবে, হাতে-কলমে যা শেখা যায়, সেটাই আসল শিক্ষা। সুতরাং বিলেতের চিন্তায় গুলি মেরে দিয়ে এক্ষুনি রামু তার বাপের সঙ্গে খাতাপত্তর নিয়ে বসে কাজ-কারবার বুঝে নিক।
“রামু তাতে রাজি হল না, কেমন?”
“তা-ই কখনও হয়? বঙ্কুরই ছেলে তো, সেও সমান জেদি। বিলেতে যাওয়া হল না বটে, কিন্তু এম.কম.ও পড়ল না, কারবারেও ঢুকল না। লাভের মধ্যে একেবারে গুম মেরে গেল। একটু চাপা স্বভাবের তো ছিলই, কম কথা বলত, নিচু গলায় কথা বলত, সবই মেনে নিচ্ছি, তাই বলে এত অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু ওই যে বিলেত যাওয়া আটকে দেওয়া হল, বাস, তারপর থেকেই একেবার মৌনী বাবা হয়ে গেছে।”
বললুম, “বঙ্কুবাবুই বা অমন করলেন কেন? কোনও মানে হয়? ছেলে তো তাঁর একটা নয়, দুটো রামুর ইচ্ছেয় বাধা না-দিয়ে লক্ষ্মণকে তিনি তাঁর কারবারে টেনে নিলেই তো গোল মিটে যেত। বয়েস তো দুজনের একই। তা হলে আটকাচ্ছিল কোথায়?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “লক্ষ্মণকে আপনি ভাল করে দেখেননি তো, তাই অমন কথা বলতে পারলেন। তার দ্বারা অনেক কিছুই হতে পারে, কিন্তু ব্যাবসা হওয়া সম্ভব নয়। তার ধাতে ওটা নেই সে যদি ইন্ডিয়ার টেস্ট-টিমে ঢুকে পড়ে আর ইনিংস ওপেন করতে নেমে রিচার্ড হ্যাডলির প্রথম বলেই ছক্কা মারে, আমি অবাক হব না। সে যদি মোহনবাগানের হয়ে আই.এফ.এ. শিল্ড খেলতে নেমে ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে, আমি বলব, বাঃ, এইরকমই তো হবার কথা ছিল। সে যদি এর পরের এশিয়াডে সাঁতারের ইভেন্ট থেকে গোটা-তিনেক সোনা তুলে আনে, তাতেও আমি বলব, এতে এত অবাক হবার কী আছে। তাই বলে ব্যাবসা? না মশাই, সকলের দ্বারা সব কাজ হয় না, লক্ষ্মণের দ্বারা ব্যাবসা হওয়া সম্ভব নয়। বঙ্কু সে-কথা ভালই জানত। এদিকে রামুও বায়না ধরে বসল, সে বিলেত যাবে।”
“রামুর বিলেত যাবার কথায় কি এইজন্যেই বঙ্কুবাবু অত বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন?”
“এইজন্যেই।”
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর বললেন, “যাক, বঙ্কুর সমস্যাটা তা হলে এতক্ষণে আপনি ধরতে পেরেছেন। লক্ষ্মণ তো ক্রিকেট, টেনিস আর সাঁতার নিয়েই মত্ত। পড়াশুনো নামমাত্র করে, পরীক্ষা দেয়, টেনেটুনে পাশও করে যায়, কিন্তু সেই একেবারে বাচ্চা-বয়েস থেকে দেখেছি, খেলার মাঠ আর সুইমিং পুলই তার ধ্যানজ্ঞান। বঙ্কু বুঝে গিয়েছিল, লক্ষ্মণকে দিয়ে ব্যাবসা চলবে না, জোর করে চালাতে গেলে ব্যাবসা দু-দিনে লাটে উঠবে, সে তাই রামুর উপরে ভরসা করে বসে ছিল। তার ফল কী হয়েছে, সে তো দেখতেই পাচ্ছেন।”
“রাগারাগি না-করে একটু ভাল করে বুঝিয়ে বললে হয়তো কাজ হত। আমার ধারণা, বঙ্কুবাবু সেটা কখনও করেননি।”
“প্রথমটায় করেনি ঠিকই, কিন্তু পরে বিস্তর বুঝিয়েছে। এমনকী, বঙ্কু যখন দেখল যে, কিছুতেই কিছু হবার নয়, তখন একদিন এমনও বলেছিল যে, ঠিক আছে, রামুর কথাই থাক, বিদেশে গিয়ে পড়াশুনো করুক সে, তবে হ্যাঁ, একটা শর্ট কোর্স করে তাড়াতাড়ি তাকে ফিরে আসতে হবে, যাতে ফিরে এসে তার বাপকে সে জীবিত দেখতে পায়। যাতে বাপের জীবদ্দশায় সে ব্যাবসার কাজকর্ম বুঝে নিতে পারে।”
“এটা কবেকার ঘটনা?”
“এও গত অগস্ট মাসের ঘটনা।”
“যে-ভাবে বলছেন, তাতে মনে হয় গত অগস্টে আরও কিছু ঘটেছিল।”
ভাদুড়িমশাই ভর্ৎসনার গলায় বলনে, “আরে হি ছ, কিরণবাবু, আপনার হলটা কী বলুন তো? এককালে আপনার .মনারির আমি কত তারিফ করতুম, কিন্তু ইদানীং দেখছি অনেক-কিছুই আপনি মনে রাখতে পারেন না! কালই রাত্তিরে আপনাকে বললুম যে, ভুবনেশ্বরের বাড়ির ছাতে রামুর উপরে ফার্স্ট অ্যাটাকটা হয় গত অগস্ট মাসে, আর আজই সেটা আপনি ভুলে মেরে দিলেন? আরে ধুর মশাই, এই বয়েসে একেবারে বাঁধাকপি হয়ে যাচ্ছেন দেখছি!”
লজ্জিত গলায় বললুম, “তা হয়তো একটু হয়েছি। বয়েস তো সত্যি নেহাত কম হল না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ বাজে কথা ছাড়ুন তো, বয়েসে আপনি আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট বই বড় নন। আসল কথা, আপনার মনোযোগ কমে যাচ্ছে। এখন যা বলছি শুনুন। দুটো যে শুধু একই মাসের ঘটনা, তা নয়, একই দিনের ঘটনা। সকালবেলায় বঙ্কু বলল, রামুকে বিদেশে পাঠাতে তার আপত্তি নেই, তবে তাড়াতাড়ি দেশে করে এসে তাকে বাপের কাছ থেকে ব্যাবসার কাজকর্ম বুঝে নিতে হবে, আর সন্ধেবেলাতেই বাড়ির ছাতে রামুর গলা টিপে ধরা হল!”
“এর মধ্যে কি কোনও কার্যকরণের যোগ রয়েছে?”
“তা আমি কী করে বলব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে থাকাটা কিছু বিচিত্র নয়। অন্তত সন্দেহ একটা হতেই পারে। সন্দেহটা ারও জোর পাচ্ছে কেন জানেন?”
“কেন?”
“ভেবে দেখুন, কাল খুব ভোরে তো আমরা সিপাহিজলায় একটু ঘুরতে বেরিয়েছিলুম। ফিরে দেখি আপনার ঘরের বাথরুমের সামনে রামু অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। তো আজ ভোরবেলায় আপনি যখন স্নান করবার জন্যে বাথরুমে ঢুকেছেন, তখন আমি বঙ্কুর ঘরে চলে আসি। মিসেস ঘেষ তখন ঘরে ছিলেন না। তিনিও স্নান সেরে নিচ্ছিলেন। আপনি যখন আমার খোঁজে বঙ্কুর ঘরে আসেন, তখনও তিনি বাথরুম থেকে বেরোননি।”
বললুম, “সে তো জানি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “যা জানেন না, সেটা এবারে মন দিয়ে শুনুন। যাতে পরে আবার না ভুলে যান। আপনি আসবার আগে বঙ্কু আমাকে একটা কথা বলে, যে-কথার গুরুত্ব হয়তো বঙ্কু নিজেও জানে না।”
“কী বলেন উনি?”
“বঙ্কু বলে যে, শরীরের এই অবস্থায় সে যে আর খুব বেশিদিন ব্যাবসার কাজকর্ম সামলাতে পারবে, তা তার মনে হয় না। ছোট ছেলে নিখোঁজ, বড় ছেলে উদাসীন, সে এখন বুঝতে পারছে না যে, কী করা উচিত। তাতে আমি বললুম, রামুকে সে আর-একটু ভাল কবে বুঝিয়ে বলুক যে, বাবার কাছ থেকে এবারে তার সবকিছু বুঝে না-নিলেই নয়। তাতে বঙ্কু বলল, ‘মাগের দিনই সিপাহিজলায় বেড-টি খাবার পরে রামুকে ডেকে পাঠিয়ে কথাটা সে বলতে গিয়েছিল, কিন্তু ভাল করে কথাটা সে পাড়তে পর্যন্ত পারেনি। রামুকে যে এবারে ব্যাবসার কাজকর্ম বুঝে নিতে হবে, এই কথাটা বলবামাত্র সে নাকি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়।”
“বঙ্কুবাবু যখন রামুর সঙ্গে কথা বলবার জন্যে তাকে ডেকে পাঠান, তখন সেখানে আর-কেউ ছিল কি না, বঙ্কুবাবুকে তা আপনি জিজ্ঞেস করেছেন?”
“তা করেছি বই কী। বঙ্কু বলল, মিসেস ঘোষ তো ছিলেনই, পীতাম্বরও ছিল।”
“পীতাম্বর লোকটি কেমন!”
“ভিতরে-ভিতরে কেমন জানি না, তবে বাইরে যা দেখেছি, তাতে খারাপ ক্লবার উপায় নেই। কিন্তু ও-কথা একটু পরে ভাবলেও চলবে। আপাতত যা ভাবছি সেটা ই যে, এগরেও সেই একই ঘটনা ঘটল। রামুকে ডেকে বঙ্কু যেদিন বলল যে, তাকে এবারে ব্যাবসার দায়িত্ব বুঝে নিতে হবে, সেইদিনই ফের হামলা হল রামুর উপরে। তাও একবার নয়, দু’দু-বার। প্রথম অ্যাটে সিপাহিজলা, দ্বিতীয অ্যাটেম্৳ নীরমহলে। একই দিনের সকালে আর বিকেলে। …কী মনে হয় আপনার? দুটো ব্যাপার কি আলাদা? মানে, রামুকে ব্যাবসার দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা আর এই মামলা হওয়া, এর মধ্যে কি কোনও যোগ-সম্পর্ক নেই?”
বললুম, “এটা একটা অ্যাকসিডেন্টাল ব্যাপারও তো হতে পারে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা তো হতেই পারে। তবে কিনা ইংরিজিতে এইরকম একটা কথা আছে যে, দ্য রিপিটিশান অব অ্যান অ্যাকসিডেন্ট রস দ্য অ্যাকসিডেন্ট অব্ ইটস অ্যাকসিডেন্টাল ক্যারেক্টার। তখন সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে, এটা কাকতালীয় ব্যাপার নয়, এর মধ্যে একটা কার্যকারণের যোগসম্পর্ক রয়েছে।”
ঘরের বাইরে কার গলা পাওয়া গেল। দরজা খুলে দেখলুম, দীপক দাঁড়িয়ে আছে। বলল, “জিজাজি বললেন, একটু বাদেই সবাই বেরিয়ে পড়ব। আপনারা তৈরি হয়ে নিন।”
বেরোতে বেরোতে চারটে বেজে গেল। প্রথমেই যাওয়া হল ত্রিপুরেশ্বরীর মন্দিরে। পাশের দিঘিটি বিশাল। বিরাট-বিরাট সব মাছ তার ঘাটের কাছে কিলবিল করছে। রুই, কাতলা, মৃগেল। কোনওটার ওজন সের পাঁচ-ছয়ের কম হবে না। ওই যে একরকম ভুড়িওয়ালা হলদেটে মাছ আজকাল কলকাতার বাজারে প্রচুর ওঠে, তাও দেখলুম অগুন্তি। মস্ত একটা কচ্ছপও হঠাৎ ঘাটের রানার কাছে ভুশ করে ভেসে উঠল। এ-সব মাছ কেউ ধরে না, ধরবার নিয়মই নেই। ভক্তজনের ছুড়ে দেওয়া মুড়ি আর ময়দার গুলি এরা কপাকপ গিলছে আর নির্বিবাদে নিজেদের ওজন বাড়িয়ে চলেছে।
মন্দিরে ঢুকতে-ঢুকতে মিসেস ঘোষ হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই যে সিঁড়িটা ধাপে-ধাপে উঠে গেছে, এটা দেখে রাখুন। হাতে পুজোর থালা নিয়ে এই ধাপগুলোতে পা ফেলে-ফেলে আমি যখন মন্দিরের দিকে এগোব, সামনে কোনও উঁচু জায়গা থেকে তখন ক্যামেরা চলবে। ক্যামেরা প্রথমে ধরবে গোটা ক্রাউডটাকে, তারপর ধীরে-ধীরে আমার চারপাশের লোকজনকে ছেঁটে ফেলে শুধু আমাকে। তারপর এক সময় আমার গোটা শরীরটা বাদ দিয়ে শুধু মুখখানা।”
মিসেস ঘোষ আজ লালপেড়ে গরদের শাড়ি পরে আসেননি। তবে মন্দিরে গিয়ে প্রণামটা খুবই ভক্তিভরে করলেন। শানের উপরে মাথা রেখে অনেকক্ষণ যেভাবে স্থির হয়ে রইলেন, তাতে মনে হল, কী জানি, যে-ছবিটা তুলবেন বলে এখানে এসেছেন, সেটা একটা ‘সুপার হিট’ হয়তো হলেও হয়ে যেতে পারে।
স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে অবশ্য এখানকার পুরনো শিবমন্দিরটি অনেক বেশি দ্রষ্টব্য। কয়েক শো বছরের প্রাচীন মন্দির, দেওয়ালে ফাটল ধরেছে, বটের চারাও শিকড় ছড়িয়েছে এখানে-ওখানে, কিন্তু সেই বিধ্বস্ত মহিমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে যেন চোখের পলক পড়তে চায় না। পুরনো এই মন্দিরটি অবশ্য পরিত্যক্ত, তার পাশে একটি নতুন শিবমন্দির তৈরি করে সেখানে পুজোর ব্যবস্থা হয়েছে। ভক্তের ভিড় সেই নতুন মন্দিরেই বেশি, মিসেস ঘোষও সেখানেই পুজো দিতে ঢুকলেন। তারপর খানিক বাদে মন্দির থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে বললেন, “এটিকেও কিন্তু গল্পের মধ্যে ঢোকানো চাই।”
বললুম, “কীভাবে ঢোকাব?”
“সে আর এমন শক্ত কী,” মিসেস ঘোষ বললেন, “একটা স্বপ্নাদেশের ব্যবস্থা করলেই তো হয়। হিরোইন যখন ঘুমোচ্ছে, তখন একটা ড্রিম-সিকোয়েন্স রাখুন। স্বপ্নের মধ্যে মহেশ্বর এসে বলবেন যে, হিরোইন তাঁর পুজো করলেই হিরোর বিপদ কেটে যাবে। আর ঘুম থেকে উঠেই হিরোইন ছুটে আসবে এই মন্দিরে… বাস্, আপনার কাজ হয়ে গেল।”
বললুম, “ঠিক আছে। হয়ে যাবে।”
গেস্ট হাউসে যখন ফিরলুম, বিকেল তখনও ফুরিয়ে যায়নি। সামনের বারান্দায় বসে চা খাওয়া হল সবাই মিলে। রাস্তার ওদিকে বিশাল দিঘি। ঘাটে নেমে স্নান করছে অনেকে। জলের উপর দিয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে ঢেউয়ের বৃত্ত। দেখতে-দেখতে নেশা ধরে যায়। মনে হয়, যাই, খানিক জল ঝাঁপিয়ে আসি।
একই কথা দীপক আর রাজেশেরও মনে হয়েছিল নিশ্চয়। হঠাৎ একইসঙ্গে উঠে দাঁড়াল তারা। দীপক বলল, “আপনারা বসুন, আমি আর রাজেশ একটু সাঁতার কেটে আসি।” তারপর রামুর দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিও যাবে নাকি ভাঞ্জা?”
বঙ্কুবাবু বললেন, “না না, রামুর গিয়ে কাজ নেই। পরশু ওর একটু সর্দিজ্বর-মতো হয়েছিল, গলাও ভেঙেছে, এই অবেলায় স্নান করলে ফের জ্বর বাধিয়ে বসবে। তা ছাড়া ও তো সাঁতারই জানে না।”
দীপক বলল, “তাই তো, আমার খেয়ালই ছিল না। ভাঞ্জা তা হলে আপনাদের সঙ্গে কথা বলুক, আমরা যাই।”
রাজেশকে নিয়ে নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেল দীপক। খানিক বাদে দু’জনে যখন ফের বেরিয়ে এল, তাদের পরনে তখন সুইমিং ট্রাঙ্ক। গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে তারা দিঘির দিকে চলে গেল।
ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “আমরাও ওদের সঙ্গে গেলে পারতুম।”
ভাদুড়িমাশাই বললেন, “থাক গে, এখন আর ইচ্ছে করছে না।”
কিছুক্ষণ চুপচাপ কাটল। তারপর বঙ্কুবাবু একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “জানো চারু, এইসব সময়েই যেন লক্ষ্মণের কথাটা আরও বেশি করে মনে পড়ে যায়। ছেলেটা দারুণ সাঁতার কাটত।”
আমরা চুপ করে রইলুম। রামু একবার মুখ তুলে তাকাল বাবার দিকে, কিন্তু পরক্ষণেই আবার মুখ নামিয়ে নিল। কিছু বলল না।
ভাদুড়িমশাই সম্ভবত লক্ষ্মণের প্রসঙ্গটাকে চাপা দিতে চাইছিলেন। সম্ভবত তিনি চাইছিলেন না যে, যে-ছেলে হারিয়ে গেছে, যাকে আর ফিরে পাবার কোনও সম্ভাবনাই হয়তো নেই, তার কথা ভেবে-ভেবে বঙ্কুবাবু আরও মন খারাপ করুন। বললেন, “চলো বঙ্কু, ঘরে যাওয়া যাক।”
বারান্দা থেকে সবাই আমরা যে-যার ঘরে চলে এলুম।
সুরটা একটু কেটে গিয়েছিল, তাই ঘরে ফিরেও আর কথাবার্তা বিশেষ জমল না। ভাদুড়িমশাই তাঁর সুটকেস থেকে একটা ফাইল বার করে নিয়ে চুপচাপ তার কাগজপত্রগুলো পরীক্ষা করতে লাগলেন।
একটা ব্যাপার দেখে একটু অবাকই হয়েছিলুম। রাম আর লক্ষ্মণ, এদের কেউই মিসেস ঘোষের নিজের ছেলে নয়। কিন্তু তা না-ই হোক, পাঁচ বছর বয়েস থেকে তিনি যে এদের কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন, সেটা তো অস্বীকার করা যাচ্ছে না। সেই ছেলে দুটোর মধ্যে একটা নিখোঁজ, আর অন্যটার উপরেও ক্রমাগত হামলা হচ্ছে, মিসেস ঘোষ তবু নির্বিকার, তা নিয়ে যেন কোনও ভাবনাই তাঁর নেই। ভদ্রমহিলার একমাত্র ভাবনা দেখছি নিজেকে নিয়ে। কী করে তিনি হিরোইনের রোলটা পাবেন, কোন্ দৃশ্যে কী পোশাক পরবেন, কোত্থেকে তাঁর মুখের উপর ক্যামেরা চার্জ করতে হবে, বাস্, এসে অবধি দেখছি যে, স্রেফ এই নিয়েই তিনি মত্ত। দেখে যে শুধু অবাক হচ্ছিলুম তা নয়, ব্যাপারটা ঘোর বিসদৃশও লাগছিল। ভেবেছিলুম, ভাদুড়িমশাইকে যখন একা পাওয়া গেছে, তখন এই নিয়ে দু-একটা কথা বলব। কিন্তু যে-রকম একমনে তিনি তাঁর ফাইল দেখছেন, তাতে আর কিছু বলা গেল না। কলকাতা এয়ারপোর্ট থেকে কয়েকটা নিউজ-ম্যাগাজিন কিনে এনেছিলুম, এখনও সেগুলোর উপরে চোখ বুলোনো হয়নি। হ্যান্ডব্যাগ থেকে তারই একটা বার করে নিয়ে অন্যমনস্কভাবে তার পাতা ওলটাতে লাগলুম।
রাত্তিরের খাওয়ার ডাক পড়ল সাড়ে-নটায়। রান্না এবেলাও সুবিধের হয়নি। বঙ্কুবাবু তা নিয়ে দু-একটা মন্তব্যও করলেন। তা ছাড়া আর খাওয়ার টেবিলে বিশেষ কোনও কথা হল না।
খাওয়া শেষ হতে-হতে দশটা। ভেবেছিলুম, এবারে হয়তো ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে দু-একটা কথা বলা যাবে, কিন্তু তাও বলা গেল না। ঘরে ফিরেই আবার তিনি তাঁর ফাইল টেনে নিয়ে পড়তে বসে গেলেন।
বললুম, “ওটা শেষ হতে আর কতক্ষণ লাগবে?”
ফাইল থেকে চোখ না-তুলেই ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার দেরি হবে। আপনি শুয়ে পড়ুন। কাল আবার সকাল-সকাল উঠতে হবে।”
অগত্যা শুয়ে পড়লুম। ঘুমে চোখ বুজে এল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই। কতক্ষণ ঘু?য়েছিলুম, জানি না, হঠাৎ একটা মৃদু ধাক্কায় ঘুম ভেঙে গেল। বললুম, “কে?”
“আমি চারু। একটু উঠুন তো।”
ধড়মড় করে উঠে বললুম, “কী ব্যাপার?”
“আস্তে কথা বলুন। একটু বাইরে যেতে হবে।”
নিজেদের ঘর থেকে নিঃশব্দে বারান্দায় বেরিয়ে আমরা রামুর ঘরের সামনে গিয়ে থামলুম। সামান্য ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। ভিতরে ঢুকে ভাদুড়িমশাই তাঁর পেনসিল-টর্চ জ্বাললেন। রামুর বিছানা খালি। অ্যাটাচ্ড বাথরুমটায় টর্চ ফেলে দেখা গেল, সেখানেও কেউ নেই।
কোথায় গেল ছেলেটা? জিজ্ঞাসু চোখে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাতে তিনি ঠোঁটে আঙুল তুলে আমাকে কথা বলতে নিষেধ করলেন। টর্চ ঘুরিয়ে গোটা ঘরটা দেখে নিলেন কয়েকবার। টেবিলের উপরে অ্যাকাউন্টেন্সির একটা বই আর একজোড়া চশমা পড়ে রয়েছে। বই আর চশমাটা তুলে নিয়ে ভাদুড়িমশাই দেখলেন। আমাকে দেখালেন। তারপর আবার যথাস্থানে রেখে দিয়ে চাপা গলায় বললেন, “চলুন, ঘরে যাওয়া যাক।”
রামুর ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা ফের আগের মতোই ভেজিয়ে রেখে আমরা নিজেদের ঘরে ফিরে এলুম।
