চশমার আড়ালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১০
আমার ঘুম ভাঙতে-ভাঙতে সাধারণত একটু দেরি হয়ে যায়। তাও বাসন্তী যতক্ষণ না এসে ঠেলা মেরে তুলে দিচ্ছে, ততক্ষণ আমি বিছানা ছেড়ে উঠি না, ঘুম ভাঙবার পরেও বেশ কিছুক্ষণ মটকা মেরে পড়ে থাকি। আজ ভাদুড়িমশাইও ঠেলাঠেলি করেননি, তবু ভাল করে রাত না পোহাতেই আজ ঘুম ভেঙে গেল। ঘরে একটা জিরো-পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। পাশ ফিরে দেখলুম, ভাদুড়িমশাইয়ের বিছানাটা খালি। বুঝতে অসুবিধে হল না, তিনি বাথরুমে ঢুকেছেন। ঘরের সামনে ছোট বারান্দা। বিছানা থেকে নেমে, চটিতে পা গলিয়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম। চোখ জুড়িয়ে গেল। আকাশে তখন অল্প-অল্প আলো ফুটছে। সেই আলো আর-একটু স্পষ্ট হতেই জলার ওদিকে ঝলমল করে উঠল নীরমহল। একটা পাখি কোথাও ডেকে উঠল। আর সঙ্গে-সঙ্গে সাড়া পড়ে গেল চতুর্দিকে। মনে হল ওই ডাকটার জন্যেই যেন প্রতীক্ষা করছিল হাজার-হাজার পাখি, একইসঙ্গে তারা এবারে সাড়া দিয়ে উঠেছে।
“চলুন, একটু ঘুরে আসা যাক।”
কখন যে ভাদুড়িমশাই আমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন, বুঝতে পারিনি। তাঁর গলা শুনে তাই চমকে উঠেছিলুম। বললুম, “আজ তো আমরা উদয়পুরে যাব, তাই না?”
“সে তো বেলা হলে। চা-জলখাবার না-খেয়ে তো আর বেরুনো হচ্ছে না, তার অনেক আগেই আমরা ফিরে আসতে পারব।”
নীচে নেমে জলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালুম। দেখা গেল, দুটো নৌকো সেখানে খুঁটির সঙ্গে বাঁধা রয়েছে। শিকল দিয়ে তালা লাগানোর ব্যাপার নয়, স্রেফ দড়ি দিয়ে বাঁধা। ভাদুড়িমশাই বললেন, “চলুন, নৌকা যখন রয়েছে, তখন আর ভাবনা কী। কাল যা কাণ্ড হল, তাতে তো জায়গাটা আপনার ভাল করে দেখাই হল না।”
“যাব যে, মাঝি কোথায়?”
“সম্ভবত ঘুমোচ্ছে। এখন যদি তার জন্যে বসে থাকি তো বেলা বেড়ে যাবে। আর তা ছাড়া, মাঝির দরকারই বা কী। লগি যখন রয়েছে, তখন আমিই চালিয়ে নিতে পারব।”
“কিন্তু চৌকিদারকে তো একবার জানিয়ে যাওয়া দরকার।”
“ফিরে এসে জানালেই হবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিন, আর দেরি করবেন না, উঠে পড়ুন।”
পাশাপাশি দুটো নৌকোর একটায় উঠে পড়লুম। তারপর খুঁটির সঙ্গে বাঁধা দড়ি খুলে, লগিটা হাতে নিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “নৌকোটা আমিই চালাচ্ছি। আমি পূর্ববঙ্গের মানুষ, অন্তত এ-কাজটা আপনার চেয়ে আমি বোধহয় ভাল পারব।”
নীরমহলে পৌঁছতে মিনিট কুড়িও লাগল না। নৌকোটা পাড়ে ভিড়িয়ে, একটা পাথরের সঙ্গে নৌকোর দড়ি বেঁধে রেখে খাড়াই পথ ধরে আমরা উপরে উঠে এলুম।
বিশাল বাড়ি। কাল তবু কিছু লোকজন ছিল, আজ মাত্র আমরা দুটি প্রাণী। মনে হচ্ছিল যেন বিশাল একটা প্রাসাদ নয়, ভয়ঙ্কর এক শূন্যতার হাঁয়ের মধ্যে এসে আমরা ঢুকেছি। ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে আমরা উপরতলায় উঠে ‘লুম। তখনও ভাল করে আলো ফোটেনি, বাগানে, বারান্দায়, সিঁড়িতে আর প্রকাণ্ড এক-একটা ঘরের মধ্যে চলেছে রহস্যময় আলো-আঁধারির খেলা। যে-খেলা দেখে, কী জানি কেন, গা-ছমছম করে। কোনও কারণ নেই, তবু এইরকম একটা অনুভূতি ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে যে, আমাদের চোখের আড়ালে, কিন্তু খুব কাছেই, কোনও একটা ষড়যন্ত্র চলেছে। ঘুলঘুলির ভিতর দিয়ে বাতাস বয়ে যাবার শব্দকেও চাপা-গলার কথা বলে মনে হয়। সেইসঙ্গে এমনও একটা আশঙ্কা জেগে ওঠে যে, কিছু একটা ঘটবে, তার আর খুব বেশি দেরি নেই।
প্রাসাদের যে-দিকটা অন্দরমহল, সেই দিকে দিয়ে আমরা দোতলায় উঠেছি। কয়েকটা চাতাল আর ঘর আমাদের দেখাও হয়ে গেছে। এবারে সামনের দিকে যাব। এক-টুকরো লনের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ওদিকে চলে গেছে। ঘর থেকে সেই রাস্তায় নামবার জন্যে পা বাড়াতে যাচ্ছি, হঠাৎ ভাদুড়িমশাই নিঃশব্দে আমাকে বাধা দিলেন। অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে দেখি, তিনি মুখের সামনে একটা আঙুল তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ এখন কথা বলা চলবে না। পরক্ষণেই তাঁর ডান হাতের তর্জনী সামনের দিকে ঘুরে গেল। নির্দেশ মতো সামনের দিকে তাকাতেই ছলাত করে উঠল আমার বুকের রক্ত। বাগানের পাশের পথ ধরে সামনের দিকের যে ঘরটায় যাব বলে পা বাড়িয়েছিলুম, তার ভিতর থেকে একটি লোক বেরিয়ে আসছে। আকাশে আলো ফুটেছে, কিন্তু ওদিকটা এখনও ছায়াচ্ছন্ন। লোকটি যে কে, বুঝতে পারলুম না। ঘর থেকে বেরিয়ে, ডাইনে ঘুরে সে সিঁড়ি ধরে নীচে নেমে গেল।
একটু বাদেই নীচের তলা থেকে জলের শব্দ পাওয়া গেল। মনে হল, এককালে এই রাজবাড়ির অন্দরমহলের যে ঘাটে এসে নৌকো ভিড়ত শব্দটা সেইদিক থেকে আসছে। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেউ নৌকো নিয়ে এখানে এসেছিল, এখন ফিরে যাচ্ছে।”
বললুম, “লোকটাকে চিনতে পারলেন?”
“ভাল করে দেখতে পাইনি। একে তো অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছি, তার উপর ওর মুখটা ওদিকে ফেরানো ছিল তো, তাই দেখা গেল না। তবে হাঁটার ভঙ্গি আর অন্য দু-একটা জিনিস থেকেও কিছুটা আন্দাজ করা যায়।”
“কী আন্দাজ করলেন?”
“আন্দাজটা ঠিক কি না, সেটা আগে বুঝে নিই, তারপরে বলব।”
“লোকটা এখানে কী করতে এসেছিল, সেটা বুঝতে পারলেন?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সে তো শেষ-রাত্তিরে ঘুম থেকে উঠেই বুঝেছি। আপনি যদি আর-একটু আগে শয্যাত্যাগ করতেন, তো আপনিও বুঝতে পারতেন।”
কিছুই বোধগম্য হল না। শুধু এইটুকু বুঝলুম যে, ভাদুড়িমশাই এখন আর এ নিয়ে কোনও কথা বলতে রাজি নন। বললুম “ঠিক আছে, তা হলে এখন ফেরা যাক। নাকি তারও কিছুক্ষণ থাকবেন এখানে?”
“এমনিতে তো থাকবার কোনও কারণ নেই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে এখুনি যদি ফিরি, তো লোকটা বুঝে ফেলবে। আগে ও জলাটা পার হোক।”
আমরা গিয়ে নৌকোয় উঠলুম আরও মিনিট পঁচিশেক বাদে। তখন সূর্য উঠে গেছে, রোদ্দুর পড়ে ঝিকমিক করছে গোটা জলা। টুরিস্ট লজে গিয়ে যখন পৌঁছলুম, তখন সাড়ে ছ’টা বাজে। অথচ, মজার ব্যাপার, আমাদের দলের অনেকেরই তখনও ঘুম ভাঙেনি।
ঘরে ঢুকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যান, আপনি এবারে স্নান করে নিন।”
স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই ঘরে নেই। পাশের ঘরে সস্ত্রীক বঙ্কুবাবু থাকেন। জামাকাপড় পালটে তৈরি হয়ে বঙ্কুবাবুর ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকবার দরকার হল না, দরজা খোলাই ছিল। যা ভেবেছিলুম তা-ই। ভাদুড়িমশাই আর বঙ্কুবাবু সেখানে বসে গল্প করছেন। বঙ্কুবাবুর দৃষ্টিশক্তি যতই দুর্বল হোক, কান সজাগ। পায়ের শব্দে বুঝতে পেরেছিলেন, কেউ ঘরে ঢুকেছে। বললেন, “কে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিরণবাবু।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “আরে আসুন, আসুন।”
এ-ঘরে গোটা দুই বাড়তি চেয়ার রয়েছে। তার একটায় বসে বললুম, “মিসেস ঘোষ কোথায়?”
“তিনি বাথরুমে ঢুকেছেন স্নান সেরে বেরুতে তাঁর সময় লাগবে। তাই চারুকে ডেকে পাঠিয়ে কথা বলছিলুম।”
“আপনার নিশ্চয় স্নান হয়নি এখনও?”
“তা হয়নি, তবে তাড়া তো নেই।”
বললুম, “আমাদের বাথরুমটা তো খালি। ইচ্ছে করলে সেখানে গিয়েও আপনি স্নান সেরে নিতে পারেন।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “তার দরকার হবে না।…..কিন্তু এদিকে একটা মুশকিল হয়েছে।”
“আবার কী মুশকিল হল?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর বলবেন না। এখানে যারা চিংড়িমাছের চাষ করে, তারা বলছে কাল রাত্তিরে কেউ এদিক থেকে একটা নৌকো নিয়ে নীরমহল গিয়েছিল। তা চিংড়িমাছ ধরবার জন্যে এই যে জলের তলায় বাক্স রেখে দেওয়া হয়, তার নিশানা থাকে তো। নৌকো চালাবার সময় সেই নিশানাগুলো বাঁচিয়ে চলতে হয়। তো যে-ই কাল রাত্তিরে নৌকো নিয়ে ওদিকে গিয়ে থাক, নিশানাগুলো সে বাঁচিয়ে চলেনি। নৌকোর ধাক্কা লেগে তা, অনেকগুলো নাকি ভেসে গেছে। ফলে তারা মুশকিল পড়েছে, কোথায় কোথায় বাক্স পুঁজেছিল, নিশান না থাকায় তার হদিশ করতে পারছে না।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “শুনলুম, আজ ভোর না-হতেই আনারা একবার নীরমহলে গিয়েছিলেন। তা-ই?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে তো তোমাকে বললুমই। কিন্তু না, আমি নজর রেখেছিলুম কিরণবাবু ও-সব নিশানার ধারেকাছেও যাননি।”
বঙ্কুবাবু বললেন, “সে তো ওরাও বলছে। ওরা রাত জেগে মাছ পাহারা দেয়। ওরা তোমাদের কথা বলছে না। বলছে, তোমরা ওদিকে যাবার তা প্রায় ঘন্টা দুয়েক আগে একটা নৌকো নিয়ে এদিক থেকে কেউ নীরমহলে গিয়েছিল।”
বলতে যাচ্ছিলুম, যে গিয়েছিল, চিনতে না পারলেও তাকে আমরা দেখেছি। কিন্তু ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাতে তিনি চোখের ইশারায় আমাকে চুপ করে যেতে বললেন। বঙ্কুবাবু বললেন, “কে গিয়েছিল, বুঝতে পারছি না। ওরা বলছে, সে আমাদেরই লোক। কথাটা হয়তো মিথ্যেও নয়। তার কারণ, ট্যুরিস্ট লজে কাল রাত্তিরে শুধু আমরাই ছিলুম।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিশানাগুলো ভেসে যাওয়ায় ওদের খুব ক্ষতি হল।”
বঙ্কুবাবু তাঁর একখানা হাত তুলে মাছি তাড়াবার মতন একটা ভঙ্গি করে বললেন, “তা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। ক্ষতি যখন হয়েছে, তখন ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা কি আর হবে না। যা-ই দাবি করুক, দিয়ে দেব। ইন ফ্যাক্ট, কত টাকা ওদের দিতে হবে, পীতাম্বরকে তা আমি জেনে আসতেও বলেছি। না না, ওটা কোনও ব্যাপার নয়। আমি ভাবছি, মাঝরাত্তিরে এখান থেকে কে ওদিকে গেল, আর সে গেলই বা কেন একে তো রামুর মাথা তাক করে ওখানে ইট ছোড়া হয়েছিল, তার উপরে আবার এই ব্যাপার। না হে চারু, এ-সব আমার একটুও ভাল লাগছে না। শেষে না হিতে বিপরীত হয়।”
“অর্থাৎ?”
“অর্থাৎ আর কী, ভুবনেশ্বরে ফিরে যাব।”
“মিসেস ঘোষের ফিল্মের কী হবে?”
“গুলি মেরে দাও। ফিল্ম হবে না।”
“না হলে কী হবে, সেটা ভেবে দেখেছ?” এমনিতেই নিচু গলায় কথা বলছিলেন ভাদুড়িমশাই। এবারে গলার স্বর আরও নামিয়ে বললেন, “গোটা প্ল্যানটাই তা হলে ব’নচাল হয়ে যাবে। আর তা ছাড়া, ভুবনেশ্বরই কি খুব সেফ জায়গা? সেখানেও যে রামুর উপরে হামলা হয়েছিল, সেটা ভুলে যাচ্ছ কেন?”
“তা বটে।” বঙ্কুবাবু কয়েক মুহূর্তে চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “তা হলে আমাকে কী করতে বলো?”
“আমি বলি, উদয়পুরে চলো। তাতে আমি আরও একটা দিন সময় পাচ্ছি। এর মধ্যে হয়তো আরও দু-একটা ব্যাপার আমার নজরে আসবে। তেমন বুঝলে আমিই তোমাকে ভুবনেশ্বরে ফিরে যেতে বলব। হয়তো আমিও তখন যেতে চাইব তোমার সঙ্গে।”
বাথরুম থেকে জল পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছিল এতক্ষণ। শব্দটা বন্ধ হতেই ভাদুড়িমশাই উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “তা হলে ওই কথাই রইল। তুমি তৈরি হয়ে নাও। আমরা চলি।”
বঙ্কুবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে আমরা নিজেদের ঘরে চলে এলুম।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বললুম, “বঙ্কুবাবু খুব ঘাবড়ে গেছেন মনে হল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এমন অবস্থাতে পড়লে সবাই একটু ঘাবড়ায়। এটা কিছু আশ্চর্য ব্যাপার নয়। একটা ছেলে নিখোঁজ। অন্যটার উপরেও দুমদাম হামলা হচ্ছে। যা সব ঘটছে, তাতে কে না ঘাবড়ায় বলুন।”
“তা বটে।”
“এখন একটা কথা বলুন দেখি। আমি তো আপনার হয়ে খুব সাফাই গাইলুম, কিন্তু জলার ওই নিশানাগুলো ভাসিয়ে দেবার কাজটা আপনার দ্বারাই হয়নি তো?”
“মোটেই নয়।” জোরগলায় বললুম, “হতে পারত, যদি না কাল দুপুরেই আপনি আমাকে জানিয়ে দিতেন যে, ওই নিশানাগুলো দেখেই বুঝে নেওয়া হয়, মাছ ধরবার বাক্সগুলো জলের তলায় ঠিক কোন-কোন জায়গায় রেখে দেওয়া হয়েছে। সে-কথা জানবার পরেও নিশানাগুলোকে ডিসটার্ব করব কি ভাসিয়ে দেব, আমি কি এতই বোকা নাকি?
“অর্থাৎ, এ-কাজটা সে-ই করেছে, আমাদের বেশ খানিকটা আগেই একটা নৌকো নিয়ে যে কিনা এদিক থেকে নীরমহলে গিয়েছিল।”
বললুম, “তা তো বটেই। কিন্তু সে কে?”
“এর উত্তর তো সেই আগের কথাতেই দিতে হয়। তাকে আপনিও দেখেছেন, আমিও দেখেছি। কিন্তু একে তো দূর থেকে দেখেছি, তার উপরে আবার আবছা অন্ধকারের মধ্যে দেখা। তাও লোকটার মুখটা ছিল ফেরানো। মুখটা তাই দেখতে পাইনি। তা হলে আর কী করে বলব যে, সে কে। তবে হ্যাঁ, আন্দাজ একটা করেছি। আন্দাজটা যে আর-একটু আগে ঘুম থেকে উঠলে আপনিও করতে পারতেন, তাও বলেছি আপনাকে। কিন্তু না, স্রেফ আন্দাজের উপরে নির্ভর করে এখুনি তাকে শনাক্ত করাটা ঠিক হবে না। বরং আর-একটু দেখি। লক্ষণগুলো আর-একটু মেলাই।”
ন’টা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করতে নামলুম আমরা। উদয়পুরের পথে রওনা হতে-হতে প্রায় দশটা বাজল। গাড়ির সেই একই ব্যবস্থা। বঙ্কুবাবু, মিসেস ঘোষ, রামু আর পীতাম্বর অ্যাম্বাসাডারে। দীপক, রাজেশ আর আমি মারুতিতে। অ্যাম্বাসাডারটা বিজু চালাবে। মারুতির চালক ভাদুড়িমশাই। অ্যাম্বাসাডার আমাদের আগে রওনা হতেই মারুতি তার পিছু ধরল।
আগরতলা থেকে যে-পথ দিয়ে সিপাইহিজলায় এসেছিলুম, সিপাহিজলা থেকে সাগরমহলে আসার পথের সঙ্গে তার খুব-একটা তফাত চোখে পড়েনি। মাঝে-মাঝে ঢেউ-খেলানো হলেও দুটোই মোটামুটি সমতল। এবারে সাগরমহল থেকে উদয়পুরে যাবার সময় দেখলুম রাস্তার চেহারা ক্রমেই পালটে যাচ্ছে। যা ছিল সমতলভূমি, ক্রমে ক্রমে তার বিস্তার যেন গুটিয়ে যাচ্ছে। এখানে-ওখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াচ্ছে ছোট-বড় সব টিলা। আর একটু বাদেই শুরু হয়ে গেল পাহাড়িয়া পথ। দার্জিলিংয়ের মতো শার্প বেন্ড না-থাকলেও রাস্তাটা একটু ঘোরালোই বটে। ঘুরতে-ঘুরতে কখনও উপরে উঠে যাচ্ছি, কখনও নামছি নীচের দিকে।
দীপক আর রাজেশ এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। এবারে পিছন থেকে দীপকের গলা পাওয়া গেল। “মিঃ চ্যাটার্জি, এই রাস্তাটাকে কাজে লাগাবেন না?”
‘কীভাবে লাগাব?’
“ধরুন সামনের ওই অ্যাম্বাসাডারটায় ভিলেন পালাচ্ছে। আর যে হিরো, সে এই মারুতি চালিয়ে ফলো করছে তাকে। একেবারে ব্রেক-নেক স্পিড। উঃ, পাহাড়ের একটু উপর থেকে কিন্তু দারুণ ছবি তোলা যায়।”
বললুম, “ছবি তো রাজেশের ব্যাপার। …ওহে রাজেশ, তুমি কী বলো?”
রাজেশ কোনও উত্তর দিল না। পিছন ফিরে দেখলুম, সে অকাতরে ঘুমুচ্ছে।
গোমতী নদী পেরিয়ে একটু বাদেই আমরা উদয়পুরে ঢুকলুম। ত্রিপুরার এটা পুরনো রাজধানী এখানে ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর মন্দিরের কাছে একটা রেস্ট-হাউসে আমাদের থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে। সেখানে গিয়ে যে যার ঘরে ঢুকে পড়লুম। আমাদের ঘরে একটা ইজিচেয়ার রয়েছে। ভাদুড়িমশাই তাতে গা ঢেলে দিয়ে বললেন, “রাজেশ কেন ঘুমুচ্ছিল জানেন?”
“কেন?”
ভাদুড়িমশাই রহস্যময় হাসলেন। বললেন, “কাল রাত্তিরে ওর একটুও ঘুম হয়নি।”
