ব্যাকরণ রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
সাত
ঘুরঘুট্টে অন্ধকার হয়ে গেল ওরা চলে যেতেই। দয়া করে একটা মাদুর বিছিয়ে দিয়েছে, এই যা। পিঠমোড়া করে দু’হাত বাঁধা, পা-দুটো বাঁধা। কাত হতে গেলে কষ্ট। চিত হতেও কষ্ট। অতএব উপুড় হয়ে আছি। ঘরটায় অদ্ভুত সব শব্দ। মাঝে-মাঝে কী সুড়সুড়ি দিচ্ছে। গায়ে চলাফেরা করছে। শেষে বুঝলুম, আরশোলা আর ইঁদুরের রাজত্ব ঘরের ভেতর। সাপ থাকাও অসম্ভব নয়। ওদের টর্চের আলোয় মেঝেয় প্রচুর গর্ত দেখেছি।
দরজা-জানলা বন্ধ এয়ারকন্ডিশন্ডু ঘর এ-রাতে আশা করেছিলুম। তার বদলে এই সাঙ্ঘাতিক উপহার। আমার নামে কি জোড়া নম্বর থ্রি আছে? পুরো নাম জয়ন্তকুমার চৌধুরী। তা হলে দশ ব্যঞ্জন-মুরারিবাবুর হিসেবে। তিন-তিরেক্তে নয়, হাতে রইল এক।… নাঃ। …তিন দশে তিরিশ, তিনের পাশে জিরো। জিরো নম্বর নয়–মুরারিবাবুর মতে। তা হলে স্রেফ তিন হয়। কিন্তু তিন তো পয়া নম্বর।
মুরারিবাবুর মতোই ঘিলু ফেঁসে যাবে। ঘুমনোর চেষ্টা বৃথা। অনবরত আরশোলার সুড়সুড়ি। ইঁদুরের হপ-স্টেপ-জাম্প রেস। র্যাটরেস আর কি! মনে-মনে গত রাতে কর্নেলের উপদেশ স্মরণ করে তিন-শিঙে ছাগলের পাল কল্পনা করে গুনতে শুরু করলুম। হঠাৎ মনে পড়ল, ছাগলটা ‘একাশি’ বলে এবং তিনকড়িচন্দ্র ‘একাশিদেব’ বলল। বড় গোলমেলে ব্যাপার।
তারপর চমকে উঠলুম। কী একটা লম্বা লিকলিকে প্রাণী আমার পিঠের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে। সেটা যে সাপ, তাতে সন্দেহ নেই। দম বন্ধ করে কাঠ হয়ে পড়ে রইলুম। সাপটা সম্ভবত ইঁদুরকে তাড়া করেছে। এরপর আর নড়াচড়া করা ঠিক হবে না। শ্বাসপ্রশ্বাসেও সাবধান হওয়া উচিত। মনে-মনে বাবা একাশিদেবকে ডাকতে থাকলুম।
এতকাল ধরে কর্নেলের সঙ্গে দেশ-বিদেশে কত সব ভয়ঙ্কর অ্যাডভেঞ্চারে গেছি, কিন্তু এমন বিদঘুঁটে ধরনের বিপদে কখনও পড়িনি। এই বিপদটা বেজায় অপমানজনকও বটে। আরশোলার সুড়সুড়ি, ইঁদুরের কাতুকুতু, সাপের বেয়াদপি। বাইরেও সন্দেহজনক কেমন সব শব্দ। শোশো..শনশন…মচমচ…খটখট।
যেন কতকাল ধরে এইরকম নিছক কাঠে পরিণত হয়ে পড়ে আছি। হয়তো গায়ে শ্যাওলা জমেছে। ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে। একসময় অন্ধকার কমে গেছে টের পেলুম। ক্রমশ জানলার ফাঁকে এবং ঘুলঘুলিতে ধূসর আলো, তারপর একটু করে ফিকে লালচে ছটা ফুটে উঠল। এবার ঘরের ভেতরটা পরিষ্কার দেখা গেল। মাদুরে চিবুক ঠেকিয়ে মাথা তুললুম। এবড়োখেবড়ো মেঝে, গর্ত, দেওয়াল ছুঁড়ে শেকড়বাকড়। ফাটল।
আরও কিছু সময় কাটল। তারপর একটা জানলার পাশে ধুপধুপ, খসখস, কিছু টানা-হেঁচড়ার শব্দ শুনতে পেলুম। অমনি যত জোরে পারি দম নাকে টেনে মুখ দিয়ে বের করলুম। টেপটাও সম্ভবত ঘামে নরম হয়েছিল। ফুটুস শব্দে একটুখানি খসে গেল বাঁ দিকে। গলা শুকিয়ে এমন অবস্থা যে যত জোরে কণ্ঠস্বর বের করলুম, ততটা জোরে বেরোল না। “কে আছ ভাই” কথাটা অদ্ভুত “কঁককাছ-ছ-ভাঁ” হয়ে গেল।
কিন্তু সেই যথেষ্ট। সেই জানলাটার ছিটকিনি মরচে ধরে ভেঙে গেছে। খড়াক করে খুলে গেল এবং একটা মুখ দেখতে পেলুম। বিট্টু!
তার হাতে ঘুড়ি-লাটাই। এই ঘরের ছাদে চড়ে হয়তো ঘুড়ি ওড়ানোর চেষ্টায় ছিল। আমাকে এ অবস্থায় দেখামাত্র সে বড়-বড় চোখে তাকাল। তারপর ফিক করে হেসে উঠল।
তারপর জিভ দেখাল এবং ব্যা-অ্যা করল। সত্যিই বিচ্ছু ছেলে। ধুপ শব্দে লাফিয়ে পড়ে তখনই উধাও হয়ে গেল। কিছু বলার সুযোগই পেলুম না।
রাগে-ক্ষোভে ছটফট করা ছাড়া উপায় নেই। অদ্ভুত ছেলে তো! একটা লোক এমন অবস্থায় পড়ে আছে দেখেও তার সঙ্গে ফকুড়ি করে কেটে পড়ল!
কিছুক্ষণ পরে বাইরে ধুপধুপ শব্দ আবার। তারপর জানলায় এবার মুরারিবাবুর মুখ এবং আমাকে দেখে অবাক হবেন কী, সেই খ্যাক করলেন।
অতিকষ্টে বললুম, “দরজা প্লি-ই-জ!”
মুরারিবাবু সরে গেলেন। দরজার দিকে তার কথা শোনা গেল, “এই রে! তিন-তিরেক্কে করে রেখেছে। বিট্টু! হাতুড়ি! হাতুড়ি! বউদিকে গিয়ে বল, কয়লাভাঙার হাতুড়ি দাও!”
তারপর কড়া টানাটানির বিকট শব্দ এবং দরজার কপাট কাঁপতে থাকল। সেইসঙ্গে মুরারিবাবুর ফেস-ফোঁস, গোঁ-গোঁ। স্তূপের ভেতর গর্তের মুখে পাথর ঠেলে সরানোর সময় যেমনটি শুনেছিলুম।
কিন্তু ক্রমশ উনি যেন রেগে যাচ্ছিলেন। “তবে রে তিন-তিরেক্কে নয়, নয় নয়ে একাশি! মারে জো-হেঁইয়ো!…জোরসে টানো-হেঁইয়ো!…ঔর থোড়া–হেঁইয়ো!” কড়াক শব্দে কড়া উপড়ে গেল এবং দরজাও প্রচণ্ড জোরে খুলে গেল। এত জোরে যে, দেওয়াল থেকে পলেস্তরা খসে পড়ল ঝুরঝুর করে।
মুরারিবাবু ঘরে ঢুকে পুনঃ খ্যাক করলেন। কোমরে দু’হাত রেখে আমাকে দেখতে-দেখতে বললেন, “এই! এই তিন-তিরেক্তের ভয়েই কাল সন্ধ্যাবেলা আপনার সঙ্গে যাইনি। বুঝলেন তো
এবার?… আহা রে! কী অবস্থা করেছে দেখছ? একেবারে নয় নয়ে একাশি… ওদিকে আরও এক তিন-তিরেক্কে। মানিক রিকশাওয়ালাকে ডাকাতরা শুনলুম মেরে ফর্দাই করেছে। মুখে টেপ!…সেই তিন-তিরেকের টেপ! ডিটেকটিভবাবুর মতোই অবস্থা। …আরে! আপনার মুখেও তিন-তিরেক্কে?”
বলে একটু ঝুঁকে টেপটা ওপড়ালেন। যন্ত্রণায় উঁহুহু করে উঠলুম। বাঁধন খুলে দিচ্ছেন না। এখনও। কথা বলতে গলায় যন্ত্রণা। “খু-খুলে দি-দিন” বলে চুপ করলুম।
হঠাৎ মুরারিবাবু এক লাফে পিছিয়ে “বাপ রে, সাপ” বলে একেবারে দরজার বাইরে চলে গেলেন।
অতিকষ্টে মাথা ঘুরিয়ে কোথাও সাপটাকে দেখতে পেলুম না। তবে কোণায় গর্তের পাশে একটা সাপের খোলস দেখা যাচ্ছিল। সেইসময় রমলাবউদির গলা ভেসে এল। “কই? কোথায়! কোথায় ঠাকুরপোকে বেঁধে রেখেছে?”
মুরারিবাবু ঘুরে বললেন, “একেবারে তিন-তিরেকে! তার সঙ্গে সাপ।”
রমলাবউদি দরজায় এসে আমাকে দেখেই “ও মা! এ কী!” বলে ঘরে ঢুকলেন। ওঁর হাতে একটা হাতুড়ি। আমার হাতের এবং পায়ের বাঁধন খুলে দু’হাতে আমাকে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারপর হাতুড়ি তুলে তেড়ে গেলেন মুরারিবাবুর দিকে। “হাঁ করে এতক্ষণ মজা দেখা হচ্ছিল, ভূত কোথাকার।”
মুরারিবাবু নিমেষে উধাও হয়ে গেলেন। রমলাবউদি এসে আমার কাধ ধরে বললেন, “কী সর্বনেশে কাণ্ড! কাল তুমি গেলে বটে, বড্ড ভয় করছিল। পথে কোনো বিপদ-আপদ যেন না ঘটে। চলো, চলো! ইশ! এক রাত্তিরেই কী অবস্থা হয়ে গেছে তোমার!”
বিট্টু নির্বিকার মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ চলে গেল। ছেলেটা আপনভোলা খেয়ালি স্বভাবের। কৃতজ্ঞতা জানানোর জন্য ওকে আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু, কর্নেলের সেই রামধনু প্রজাপতির মতো এই ছটফটে সুন্দর ছেলেটিকে নাগালে পাওয়া কঠিন।
কাল শেষবিকেলে মুরারিবাবুর সঙ্গে এই হানাবাড়ি এলাকা দিয়ে এসেছিলুম। তখন আমি এক মানুষ, এখন আমি আর-এক মানুষ। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে যেন বেতো-রুগিকে। এ দিকটা নিরিবিলি সুনসান। সকালের রোদ্দুর মিটিমিটি হাসছে আমার দশা দেখে, কাল হালদারমশাইয়ের দশা দেখে আমি যেমন হেসেছিলুম, তেমনি হাসি।
গরম দুধ খাইয়ে রমলাবউদি আমাকে চাঙ্গা করে তুললেন। বিরু নাইট ডিউটি করে এসে ঘুমাচ্ছিল। হাই তুলতে-তুলতে এসে আমাকে একবার দেখে গেল। গম্ভীর মুখে বলেও গেল, “চান করে নিন দাদা! বড্ড বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে আপনাকে।” আয়নায় নিজেকে দেখে শিউরে উঠলুম। আমি না অন্য কেউ? প্যান্ট-শার্টে ঝুলকালি, আরশোলার নাদি। চুলে মাকড়সা পর্যন্ত কখন জাল পেতেছিল। রাতারাতি একেবারে আস্ত ভূতে পরিণত হয়েছি।
রমলাবউদির তাড়ায় স্নান করতে হল। বিরুর পাঞ্জাবি-পাজামা পরে আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে গিয়ে দেখলুম, আমি আবার আমাকে ফিরে পেয়েছি। একটু পরে যখন খেতে বসেছি এবং রমলাবউদি সামনে বসে তিনকড়িচন্দ্রের শ্রাদ্ধ করছেন, তখন মুরারিবাবু হন্তদন্ত ফিরলেন। বললেন, “থানায় গিয়েছিলুম। আপনার ব্যাপারটা যে বলব, শুনলে তো? তিন-তিরেকে করতে এল। তবে করালীদাকে শাসিয়ে এসেছি।…অবাক কাণ্ড মশাই! করালীদা বলল, তিনু তো জাহাজে। ওদের জাহাজ এখন প্যাসিফিক ওসেনে ভাসছে। বুঝুন তিন-তিরেক্কের কারবার!”
রমলাবউদি ধমক দিয়ে বললেন, “কবক কোরো না তো! ঠাকুরপোকে খেতে দাও। আর শোনো, ইরিগেশন-বাংলোয় গিয়ে ঠাকুরপোর জিনিসপত্র নিয়ে এসো।”
বললুম, “না বউদি, আমি বাংলোয় ফিরে যাই, কর্নেল এসে আমাকে না দেখে ভাবনায় পড়ে যাবেন।”
রমলাবউদি কড়া মুখে বললেন, “না। সারারাত্তির ঘুমোওনি। খেয়েদেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ো। আর তোমাকে একা বেরোতে দিচ্ছিনে। মুরারি, দেখছ পাগলের কাণ্ড? এই আছে, এই নেই। আস্ত ভূত!”
মুরারিবাবু ততক্ষণে কেটে পড়েছেন। বাংলোয় আমার জিনিসপত্র আনতে যে যাননি, সে-বিষয়ে আমি নিশ্চিত। গেলেও মাধবলাল ওঁকে তা দেবে না। গেট থেকেই ভাগিয়ে দেবে।
স্নান করে চাঙ্গা হয়েছিলুম। কিন্তু পেটে ভাত পড়ার পর চোখ ঢুলুঢুলু হয়ে এল। আর দেরি না করে নকুলবাবুর জাদুঘরে ঢুকলুম। রমলাবউদি বিছানা গুছিয়ে পেতে দিতেই লম্বা হয়ে পড়লুম এবং ঘুমও আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
.
সেই ঘুম ভাঙল যখন, তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। চোখ খুলে প্রথমে একটি চকচকে টাক দেখতে পেলুম। জানলা দিয়ে শেষ রোদ্দুরের ছটা এসে সেই টাকে পড়েছে। টেবিলে টুপি। ধুড়মুড় করে উঠে বসলুম। “কর্নেল!” বলে উল্লাসে হাঁক ছাড়লুম।
প্রাজ্ঞ বৃদ্ধ ঘুরলেন না। টেবিলে একটুকরো ভাঙা কালচে পাথরের ফলক আর নোটবই নিয়ে কী একটা করছেন। একপাশে মুরারিবাবু আর রমলাবউদি গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। একটু পরে মুরারিবাবু বললেন, “তিন-তিরেক্কের হিসেব। দেখুন, মিলে যাবে।”
ব্যা ক র ণ র হ স্য “মিলেছে।” বলে কর্নেল এতক্ষণে আমার দিকে ঘুরলেন। “কী জয়ন্ত? একাশির পাল্লায় তা হলে তুমিও পড়েছিলে? তোমাকে পইপই করে বলেছিলুম, বাংলো ছেড়ে বেরিও না।”
বললুম, “পড়লেও একাশিদেবের নাম জপে বেঁচে গেছি।”
“একাশিদেব?” কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন। “হুঁ, একাশির পাশে দেব যুক্ত করতে পেরেছ, এটাই লাভ। ..না, মুরারিবাবু! তিন যুক্ত দুই পাঁচ করে আর ঝামেলায় পড়বেন না।”
মুরারিবাবু ঝটপট বললেন, “পাঁচে ঝামেলা নেই কর্নেলসায়েব। তিন পাঁচে পনেরো। একের পিঠে পাঁচ। পাঁচ প্লাস এক–ছয়। দুটো নম্বর থ্রি।…মাধবলালের নামের সংখ্যাতত্ত্ব জয়ন্তবাবুই বের করেছিলেন। ওঁর ক্রেডিট পাওনা। কিন্তু কী মিলেছে বলুন এবার?”
কর্নেল বললেন, “ব্যাকরণ রহস্য ফাঁস করে তবে সব বলব। চলুন, বেরনো যাক। জয়ন্ত, ওঠো। রমলা, ফলকটা যেখানে ছিল, রেখে দাও।”
রমলাবউদি পাথরেরর ভাঙা ফলকটা নিয়ে পাশের ঘরে গেলেন। একটু পরে বারান্দা থেকে বললেন, “চায়ের জল চাপানো আছে। চা খেয়ে তবে বেরোবেন বাবামশাই!”
কর্নেল কখন তা হলে রমলাবউদিরও বাবামশাই হয়ে গেছেন! ষষ্ঠীর বাবামশাই ক্রমশ দেখছি, বিশ্বসুদ্ধ লোকের বাবামশাই হয়ে উঠছেন।
চা খেয়ে যখন বেরোলুম, তখন প্রায় সাড়ে-পাঁচটা বাজে। কর্নেল হানাবাড়িগুলোর দিকে চলেছেন। মুরারিবাবু কেন কে জানে, ভীষণ গম্ভীর। কর্নেল আমার বন্দী হওয়ার ঘটনাটা জেনে নিলেন হাঁটতে-হাঁটতে। তারপর আপন মনে বললেন, “ঘুরে-ফিরে সেই ব্যাকরণ রহস্য অথবা ব্যাকরণ রহস্য এসে পড়ছে। এক আর আশি একাশি। সন্ধি প্রকরণ। মুরারিবাবু, আপনি জয়ন্তর সঙ্গে ভাঙা দেউড়ির ওখানে যান। আমি একটু ঘুরপথে যাচ্ছি।” বলে আমার দিকে ঘুরে একটু হাসলেন।”ভয় নেই ডার্লিং! তিনকড়িচন্দ্র এখন ওদিকে পা বাড়াতে সাহস পাবে না। পুলিশ ও পেতে আছে। সে তত বোকা নয়।”
মুরারিবাবু এবার চাঙ্গা হয়ে উঠলেন। বুঝলুম, তিনকড়িচন্দ্রের ভয়ে এ-তল্লাটে আসতে বড় অনিচ্ছা ছিল। তাই অমন গম্ভীর দেখাচ্ছিল ওঁকে। লম্বা পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন। বললেন, “পুলিশ ওত পেতে আছে। আর তিন-তিরেক্তে করে কে? নয় নয়ে একাশি হয়ে যাবে। কিন্তু একাশিদেব কোন্ দেবতা বলুন তো জয়ন্তবাবু?… শোনা-শোনা মনে হচ্ছে। …কার কাছে যেন শুনেছিলুম নামটা। পেটে আসছেন, মুখে আসতেই তিন-তিরেক্কে হয়ে যাচ্ছে।”
কর্নেল ঝোঁপঝাড়-ধ্বংসস্তূপের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই দেউড়ির কাছে পৌঁছে গেলুম। এখনও দিনের আলো আছে। তবু চারদিকে ভয়ে-ভয়ে তাকাচ্ছিলুম। মুরারিবাবুও তাকাচ্ছিলেন। ভুরু কুঁচকে চাপা গলায় বললেন, “পুলিশ ওৎ পেতে আছে! পুলিশ কীভাবে ওৎ পাতে জানেন? কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে.. এক মিনিট! ওই ঝোঁপটা দেখে আসি। স্বচক্ষে না দেখলে মশাই, বুকটা খালি তিন-তিরেকে তিন-তিরেকে করতেই থাকবে।”
এই বলে যেই পা বাড়িয়েছেন, দেউড়ির মাথা থেকে বিদঘুঁটে আওয়াজ এল, “এ-কা-শি!” সেই তিন-শিঙে ছাগলের মুণ্ডু। মুরারিবাবু থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। তারপরই আচমকা খাপ্পা হয়ে একটুকরো আধলা ইট কুড়িয়ে “নিকুচি করেছে তোর একাশির!” বলে ছুঁড়ে মারলেন। ছাগলের মুণ্ডুটা অদৃশ্য হলে গেল দেউড়ির মাথায় ঝোঁপের ভেতর। মুরারিবাবু আবার ইটের টুকরো কুড়িয়ে ছুঁড়লেন। সে একটা দেখার মতো দৃশ্য। ক্রমাগত ঢিল-ছছাড়াছুড়ি করে চলেছেন মুরারিবাবু। ওঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “এ কী করছেন! পুলিশ ওৎ পেতে আছে কোথাও। কারও মাথায় পড়লে কী হবে?”
মুরারিবাবু ক্ষান্ত হলেন সঙ্গে-সঙ্গে। জিভ কেটে বললেন, “সরি, ভেরি সরি!” তারপর চারদিকে করজোড়ে নমস্কার করে অদৃশ্য পুলিশদের উদ্দেশে বললেন, “কিছু মনে করবেন না স্যাররা! একাশির ঠ্যালা। মাথা ঠিক রাখা কঠিন।”
এইসময় দেউড়ির পেছন থেকে কর্নেলের আবির্ভাব ঘটল। মুখে উজ্জ্বল হাসি। কিন্তু হতভম্ব হয়ে দেখলুম, ওঁর হাতে সেই তিন-শিঙে ছাগলটার মুণ্ডু। বললুম, “সর্বনাশ!”
“সর্বনাশ নয়, ডার্লিং! বলিদান-করা মুণ্ডু নয়।” কর্নেল সহাস্যে বললেন। “রক্ত দেখতে পাচ্ছি কি?”
মুরারিবাবু চোখ টেরিয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর সামনে মুণ্ডুটা কর্নেল তুলে ধরে বললেন, “কী মুরারিবাবু? নকল একাশিদেবকে চিনতে পারছেন কি?”
অমনি মুরারিবাবু খ্যাক করে হাসলেন। তারপর মুণ্ডুটা ছিনিয়ে নিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, “কী কাণ্ড! এও দেখছি তিন-তিরেক্কের খেলা। মুখোশ!”
“হ্যাঁ, মুখোশ।” কর্নেল বললেন, “সুড়ঙ্গের মুখে ঝোঁপের আড়ালে ওৎ পেতে ছিলুম। যেই ঝোঁপ ফুঁড়ে উঠেছে, শিং ধরে ফেললুম। মুখোশ উপড়ে এল। আসল প্রাণীটি দুই ঠ্যাঙে দৌড়ে
পালিয়ে গেল।”
“বিট্টু?” প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, “নিশ্চয় বিট্ট এই মুখোশ পরে মুরারিবাবুকে নিয়ে জোক করত!”
মুরারিবাবু মারমুখী হয়ে “তবে রে হতচ্ছাড়া, বিচ্ছু বাঁদর,– বলে ছুটে গেলেন। বিট্টুকে খুঁজে পাবেন কি না সন্দেহ। কর্নেল বললেন, “ওই যাঃ! মুরারিবাবু মুখোশটা নিয়ে চলে গেলেন যে!”
“যাকগে! শিলালিপির পাঠোদ্ধার হয়েছে কি না বলুন।”
“চলো। বাংলোয় ফিরে গিয়ে বলব।”
ঢিবি-এলাকা থেকে হাইওয়েতে নেমে বাংলোর দিকে হাঁটতে-হাঁটতে কর্নেল বললেন, “এও একটা সন্ধিবিচ্ছেদ বা ধড়-মুণ্ডুবিচ্ছেদ হওয়ার ঘটনা বলা চলে, ডার্লিং! তবে এটা নকল। আসলটা ফাস হবে মধ্যরাতে–বারোটা নাগাদ। ফঁদ পেতে এসেছি। দেখা যাক।”
“খুলে বলুন। হেঁয়ালি আর ভাল্লাগে না!”
কর্নেল আমার কথার জবাবই দিলেন না। চোখে বাইনোকুলার রেখে পাখি দেখতে দেখতে চললেন। বাংলোর গেটে মাধবলাল উদ্বিগ্নমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। বলল, “ছোটসাবকে লিয়ে হাম বহত শোচতা থা। রাতভর নিদ নেহি! আজ সারে দিনতকভি শোচতে শোচতে…হা রামজি!”
“জলদি কফি বানাও, মাধবলাল।” বলে কর্নেল বারান্দায় উঠে বেতের চেয়ারে বসলেন। একটু পরেই কফি এল। বারান্দার বাতিটা জ্বালিয়ে দিল মাধবলাল। কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করলেন। সেটা খুলে টেবিলে বিছিয়ে বললেন, “কলকাতা যাব বলে রওনা হয়ে বর্ধমানে পৌঁছে হঠাৎ মনে হল, ডঃ টি সি সিংহের সঙ্গে একবার দেখা করে যাওয়া উচিত। তার কার্ড তিনকড়িচন্দ্র পেল কী করে? তা ছাড়া ডঃ সিংহ একজন পুরাবিদ এবং ভাষাবিজ্ঞানীও। …হঁ, যা ভেবেছিলুম। তিনকড়িচন্দ্র তার কাছে একটা শিলালিপির একটুখানি ভাঙা অংশ নিয়ে গিয়েছিল। উনি সেটা কপি করে রেখে সময় চেয়েছিলেন। লিপিটা দেখে ওঁর অবাক লেগেছিল। তিনকড়িচন্দ্র তার চর মারফত খবর পেয়ে থাকবে, আমি পরের ট্রেনে আসছি। সে বর্ধমান থেকে আমাদের সঙ্গ নিল।”
“কার্ড চুরি করল কী করে?”
“চুরি নয়। চেয়ে নিয়েছিল। নেমকার্ড চাইলে কি দেবেন না” বলে কর্নেল কাগজের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। “এই লিপি খ্রিস্টীয় প্রথম-দ্বিতীয় শতকের কুষান-লিপি। ব্রাহ্মীর রকমফের। কিন্তু মজার ব্যাপার, এর ভেতর বাংলায় কিছু কথা লেখা আছে। সম্ভবত ধাড়াবংশের কোনও বুদ্ধিমান ব্যক্তির কীর্তি।”
বললুম, “কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং!”
কর্নেল হাসলেন। “ব্যাকরণ রহস্য ডার্লিং! ব্যঞ্জনবর্ণ-স্বরবর্ণ সন্ধি করলেই কথাটা বেরিয়ে আসবে। এই দেখো! ত+ও+র+ণ=তোরণ। শ +ই+র+এ=শিরে। গ+উ+প+ত+গ+র+ত=গুপ্ত গর্ত। ম+আ+ঝ+এ=মাঝে। ন+আ+ম+ও=নামো। ব+আ+ম+দ+ই+ক+এ=বাম দিকে। ত+ই+ন+ধ+আ+প=তিন ধাপ।… এরপর শুধু ব’। বাকিটা ভেঙে গেছে এবং সেই ভাঙা অংশটা তিনকড়িচন্দ্র দিয়ে এসেছে ডঃ সিংহকে। তাই মিলিয়ে পুরো গুপ্তবাক্যটি হল :
তোরণশিরে গুপ্তগর্ত মাঝে নামো। বাম দিকে তিন ধাপ। বাম হাতের তর্জনী।
বুঝতে পেরে বললুম, “সত্যিই তিন-তিরেক্কের ব্যাপার। বাস! কিন্তু বাম হাতের তর্জনী মানে?”
“সেখানে দাঁড়ালে হাত বুলিয়ে বাম হাতের তর্জনী যেখানে ঠেকবে, সেখানেই…”
“ঘড়াভর্তি সোনার মোহর?”
“না। একাশিদেব।” বলে কর্নেল চুরুট ধরালেন। তোমার মুখে বাচ্চা ছেলে’ কথার সূত্রে আমার মাথায় আইডিয়াটা আসে। তবে বিট্ট ছেলেটির হাড়ে-হাড়ে বুদ্ধি। নকুলবাবু ওকে তাড়াতেন আর ইতিহাসের গল্প শোনাতেন। শিবের তিন-শিঙে ছাগল-অবতারের গল্প শুনে বিট্টু বাজারের মুখোশ তৈরির দোকানে অর্ডার দিয়েছিল। খোঁজ নিয়ে দেখেছি, এ-অঞ্চলে মুখোশ তৈরির প্রচুর দোকান আছে। ছৌ-নাচের মুখোশ এইসব দোকান থেকেই লোকে কেনে। আসলে মুরারিবাবুকে ভয় দেখাতেই বিট্টুর এই দুষ্টুমি। কিন্তু বাচ্চা ছেলে বলে কুটা তুমিই দিয়েছিলে।”
“একাশিদেব ব্যাপারটা কী?”
“আজ রাত বারোটায় দেখবে। ডঃ সিংহকে বলে এসেছি, তিনকড়িচন্দ্রকে শিলালিপিটার বাকি অংশের কপি দেবেন। যেন উনি বর্ধমান মিউজিয়ামে এর খোঁজ পেয়েছেন! ফঁদটা বুঝলে তো?”
“রাত বারোটা কেন?” উত্তেজনায় চঞ্চল হয়ে বললুম। “আরও আগে নয় কেন?”
“ওই সময় অমাবস্যা পড়ছে। মন্দিরে খুব ভিড় হবে আজ রাতে। কাজেই সবার মন পড়ে থাকবে মন্দিরে। এদিকে নির্বিঘ্নে তিনকড়ি একাশিদেবকে উদ্ধার করবে। তিনপুরুষ ধরে ভাঙা দেউড়ি নিয়ে মামলার আসল কারণটা তো এই।”
একটু ভেবে বললুম, “কিন্তু তিনকড়িচন্দ্র বেঁটে? দেউড়ির মাথায় সুড়ঙ্গে তিন ধাপ নেমে বা হাত বুলিয়ে ওর তর্জনী যেখানে ঠেকবে, মুরারিবাবুর সেখানে ঠেকবে না। একজন বেঁটে, একজন লম্বা।”
কর্নেল হাসলেন। “সেজন্যই অনেক পাথরের ইট ওপড়াতে হবে তিনকড়িচন্দ্রকে। শাবল দিয়ে ইট ওপড়াতে শব্দ হবে। রাত বারোটায় অমাবস্যায় আজ পুজোর ধুম। ঢাক বাজবে প্রচুর। ঢাকের শব্দে শাবলের শব্দ চাপা পড়বে।”
রাত সাড়ে এগারোটায় থানা-পুলিশের জিপ আমাদের হাইওয়ের বটতলায় পৌঁছে দিল। সঙ্গে সেই দত্যিদানোর মতো প্রকাণ্ড মানুষ অফিসার-ইন-চার্জ মিঃ হাটি। পুলিশের দারোগা না হলে হাতিমশাই বলা যেত। তিনি ভূমিকম্প-হাসি হাসছিলেন না। সম্ভবত ডিউটিতে আছেন বলেই। নয়তো খানতিনেক হাসলেই দেউড়ি ধসে পড়ত। কিন্তু রাত বারোটা বাজতেই চায় না। গুমোট গরম আর স্তব্ধতা। এ-রাতে বাতাস বন্ধ। ঝোঁপের আড়ালে আমরা বসে সময় গুনছি, কখন মন্দিরে বলির ঢাক বেজে উঠবে অমাবস্যার লগ্নে। সামনে আকাশের নক্ষত্রের ওপর একটা কালো ছায়া, ওটাই ভাঙা দেউড়ি।
একসময় মন্দিরের দিকে হঠাৎ তুমুল ঢাক বেজে উঠল। ভক্তদের জয়ধ্বনি শোনা গেল। ঝোঁপঝাড়-ধ্বংসস্তূপের ফোকর গলিয়ে মাঝেসাঝে আলোর ঝিলিমিলি। কর্নেল ফিসফিস করে বললেন “মশাল-নৃত্য!”
তারপর চোখে পড়ল কালো তোরণের ওপর কয়েকটা ছায়ামূর্তি নড়াচড়া করছে। মিঃ হাটি ফেস-ফোঁস শব্দে বললেন, “এসে গেছে। কখন আসামি ধরতে হবে, জানিয়ে দেবেন।”
কর্নেল তেমনই চাপা স্বরে বললেন, “মিঃ হাটি, এবার আসুন আমরা সুড়ঙ্গের মুখে গিয়ে অপেক্ষা করি। ওরা কাজে নামুক। বেরনোর সময় মালসুন্ধু আসামি ধরবেন।”
তিনজনে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলুম। মিঃ হাটির পায়ের শব্দ নেই, যেন শূন্যে হাঁটছেন। বুঝলুম পুলিশ ট্রেনিং। আমার পা বারবার শুকনো লতাপাতায় পড়ে মচমচ শব্দ উঠছে। • কর্নেলের এ-তল্লাট নখদর্পণে, এমন করে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন ঘুরঘুট্টে অন্ধকারে। কিছুক্ষণ পরে যেখানে থামতে হল, সেটা একটা ভাঙা বাড়ি। মনে পড়ল, এর মেঝেতে ঝোঁপের ভেতর সুড়ঙ্গের দরজা রয়েছে। হঠাৎ কর্নেল বলে উঠলেন, “এই রে, মুরারিবাবু মনে হচ্ছে!”
একটু দূরে টর্চের আলো জ্বলে উঠতে দেখলুম। পায়ের কাছে আলো ফেলতে ফেলতে কেউ এগিয়ে আসছে এদিকে। মিঃ হাটি বললেন, “পাগলাটাকে সামলানো দরকার।”
কর্নেল বললেন, “উনি তিন-শিঙে ছাগলের মুখোশ পরেছেন দেখা যাচ্ছে। এক মিনিট! আমার মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে। এই নতুন প্ল্যানে মুরারিবাবুকে কাজে লাগাব।”
বলে উনি গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলেন। তারপর মুরারিবাবুর ওপর আচমকা টর্চের আলো ফেললেন। মুরারিবাবু হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু পালালেন না। বিচ্ছিরি, ব্যা-অ্যা’ ডেকে উঠলেন। কর্নেল টর্চ নিভিয়ে চাপা স্বরে বললেন, “চুপ!” বোঝা গেল, মুরারিবাবুর ব্যা-ডাক ভয় দেখাতেই। কিন্তু নিজেই ভয় পেলেন। তাঁর টর্চের আলো কর্নেলের ওপর পড়ল। তারপর খাক করে হেসে টর্চ নেভালেন। মহানন্দে বললেন, “বিট্টুর কাছে সুড়ঙ্গের দরজার খোঁজ পেয়েছি। সোনার মোহরের ঘড়া আনতে যাচ্ছি।”
“চুপ, চুপ! আস্তে!” কর্নেল বললেন, “শুনুন! আপনি সুড়ঙ্গের মুখে ঝোঁপের ভেতর শুধু মুণ্ডটা বের করে বসুন। আপনার তিনকড়িদা দলবল নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকেছেন। ওঁর ফেরার সময়
ব্যা-অ্যা করবেন। খুব শিঙ নাড়বেন কিন্তু!”
মুরারিবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, “নাড়ব মানে? তিন-তিরেকে নয়, নয় নয়ে একাশিবার নাড়ব। আমার ঠাকুর্দার সোনার মোহরভর্তি ঘড়া!”
“আস্তে! থানার বড়বাবু আছেন, এই দেখুন। রেগে যাবেন।”
মুরারিবাবু শ্বাসের সঙ্গে বললেন, “ও! আচ্ছা!” তারপর ঝোঁপঝাড় ঠেলে বাড়ির ভাঙা দেওয়ালের পাশের ঝোঁপ ঠেলে ঢুকে পড়লেন। একবার টর্চ জ্বেলে জায়গাটা শনাক্ত করে নিলেন। সম্ভবত সুড়ঙ্গের মুখে চারঠেঙে প্রাণীর মতোই বসলেন।
কতক্ষণ কেটে গেল। তারপর মুরারিবাবু যেখানে ঢুকেছেন, সেখানে কয়েকবার আবছা টর্চের আলো ঝিলিক দিল। একটু পরে মুরারিবাবুর বিকট ব্যা-অ্যা-অ্যা ডাক শোনা গেল। অমনি কর্নেল বলে উঠলেন, “মিঃ হাটি, জয়ন্তকে নিয়ে আপনি দেউড়ির ওখানে যান। হুইসল বাজিয়ে আপনার লোকেদের ডাকুন গিয়ে।”
মিঃ হাটি এবার ভূমিকম্পের মতো মাটি কাঁপিয়ে হাঁটতে বা দৌড়তে থাকলেন। সেই সঙ্গে হুইসলও বাজতে থাকল। দেউড়ির দিকে ঝলকে ঝলকে টর্চের আলো, পাল্টা হুইসল, দুদ্দাড়, হুলুস্থুল। ঝড়, ভূমিকম্প হয়ে গেছে এমন তাণ্ডব! দেউড়ির মাথায় টর্চের আলো পড়েছে এদিক-ওদিক থেকে। সেই আলোয় দেখলুম, সেই ষণ্ডামার্কা মোটকু আর তার সঙ্গী ঝাঁপ দেবার তাল করছে। কিন্তু পারছে না। হাড়গোড় ভেঙে তো যাবেই, তার ওপর পুলিশের খপ্পরে পড়বে। মিঃ হাটি গর্জন করলেন, “খুলি ফুটো হয়ে যাবে। যেখানে আছ, তেমনই থাকো। কল্যাণবাবু!”
কল্যাণবাবুর সাড়া পাওয়া গেল। ‘ইয়েস স্যার!”
“ওদিকে যান। সুড়ঙ্গের মুখে পাগলাবাবু ওখানে আছে। তিন-শিঙে ছাগলের মুণ্ডু দেখে ভয় পাবেন না যেন।” বলে মিঃ হাটি সেই ভূমিকম্প-হাসি হাসলেন।
টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে কল্যাণবাবু একদল সেপাই নিয়ে ছুটে গেলেন। দেউড়ির মাথায় মোটকু এবং তার সঙ্গী এইসময় গর্তের দিকে ঝুঁকল। তারপরই “ও রে বাবা” বলে পিছিয়ে এসে মরিয়া হয়ে ঝাঁপ দিল। ঝাঁপ দিয়েই আর্তনাদ করে উঠল। ক’জন সেপাই গিয়ে ঘিরে ধরল তাদের। তারা আছাড়ের চোটে কাতরাতে থাকল। বেটনের গুতোও খাচ্ছিল মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। কিন্তু এদিকে আমি উদ্বিগ্ন। সুড়ঙ্গের ভেতর কর্নেল তিনকড়িচন্দ্রের সঙ্গে ট্রেনের কুপেতে যেমন ফিল্মি লড়াই লড়ছিলেন, তেমন কিছু ঘটছে না তো? টর্চের আলো দেউড়ির মাথায় ফেলে ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”
কর্নেলের বদলে বেরোলেন ছাগলাবতাররূপী মুরারিবাবু। বললেন, “একাশি।”
মিঃ হাটি আবার ভূমিকম্প-হাসি হাসতে লাগলেন।
চেঁচিয়ে বললুম, “কর্নেল কোথায় মুরারিবাবু?”
মুরারিবাবু মুখোশ খুলে বললেন, “তিনকড়িদাকে তিন-তিরেক্কে করে ফেলেছেন।” বলেই তারপর গর্তে ঢুকে গেলেন। ব্যাপারটা বোঝা গেল না।
দূরে সুড়ঙ্গের মুখের দিক থেকে ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে টর্চের আলো ফেলতে-ফেলতে কল্যাণবাবুরা আসছেন দেখতে পেলুম। সঙ্গে কর্নেলও আছেন। কল্যাণবাবু তিনকড়িচন্দ্রের জামার কলার ধরে আছেন। সে ল্যাংচাচ্ছে। কাছে এসে কর্নেল বললেন, “একাশি! না–একাশীদেব। তালব্য শ-এ দীর্ঘ ঈ হবে। একটু বানানভুল আর কি!”
ওঁর হাতে একটা ছোট্ট পাথরের মূর্তি। মূর্তিটা তিন-শিঙে ছাগলের। বললুম, “এ কি?”
“ডার্লিং, এটা বিদেশে বেচতে পারলে কোটি টাকা পেতেন তিনকড়িবাবু। তোমাকে বলেছিলুম এক এবং আশি সন্ধি করে একাশি। ব্যাকরণ বা ব্যাকরণ রহস্য।” কর্নেল শিঙ তিনটে দেখিয়ে ব্যাখ্যা করলেন।”একে চন্দ্র-নামতা, জয়ন্ত! শিবের মাথায় চন্দ্র থাকে। মাঝখানেরটা আশী অর্থাৎ সাপ। আশীবিষ পুরো সাপ। এটা আসলে সাপের ফণার প্রতীক। শুধু ফণাটুকু, তাই আশী। ওকে শাস্ত্রে বলে কূটাভাস। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে রাজা শিবসিংহের আমলে শিবের কূটাভাস তিন-শিঙে ছাগলে পরিণত হয়েছিল। পশুপতিদেব কিনা! মহেনজো-দরোর ঐতিহ্য, জয়ন্ত। শিবের মাথায় চন্দ্রকলা এবং মাঝখানে সাপের ফণা। সন্ধি করলে এক গ্লাস আশি সমান একাশি। ব্যাকরণ রহস্য। তবে ব্যাকরণ রহস্যই বলব। কারণ..”।
মুরারিবাবু হাঁফাতে-হাঁফাতে এসে বললেন, “কই, সোনার মোহরভর্তি ঘড়া?”
কর্নেল তাকে একাশীদেবের মূর্তিটা দেখিয়ে শুধু বললেন, “একাশী!”
রাগের চোটে মুরারিবাবু বিকট ব্যা-অ্যা-অ্যা’ করে ভেংচি কেটেই বুঝলেন, থানার বড়বাবু-মেজোবাবুদের সামনে বেয়াদপি হয়ে গেছে। টর্চ জ্বালতে জ্বালতে প্রায় দৌড়ে পালিয়ে গেলেন। ব্যাকরণে আর রহস্য নেই, বুঝতে পেরেছেন মুরারিবাবু।
কর্নেল বললেন, “চলুন। থানায় গিয়ে এবার হালদারমশাইকে উদ্ধার করি।”
