ব্যাকরণ রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

চার

জঙ্গলে ঢাকা একটা ঢিবির কাছে এসে সাইকেল-রিকশাওয়ালা বলল, “আর যাবে না সার। হেঁটি-হেঁটি চলে যান। ম্যালাই লোক যেছে বটেক বাবার ঠেঞে।”

 

ঢিবির জঙ্গল কুঁড়ে টাটকা পায়ে-চলা পথের দাগ চোখে পড়ছিল। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে টিবিটি তদন্ত করে দেখলেন যেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, “হেটি-হেঁট চলেক যাই, ডার্লিং!”

 

সঙ্কীর্ণ নতুন রাস্তাটি করার সময় ঝোঁপঝাড়ও কাটা হয়েছে। কিছুটা এগিয়ে একদঙ্গল লোক যাচ্ছে দেখলুম। একজনের কাঁধে একটা পাঁঠা। তবে দুটো শিং। একটি ঢাকও নিয়ে যাচ্ছে। বললুম, “এ দেশের লোক বড্ড হুজুগে।”

 

কর্নেল বললেন, “সব দেশের লোকই হুজুগে, জয়ন্ত! তবে তফাতটা হল, এ-দেশে এখনও মানুষের হাতে প্রচুর সময়। সেই সময়কে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা কম। আর যদি কুসংস্কারের কথা বলো, সেও সবখানে মানুষের মগজে ঠাসা। মহা-মহা পণ্ডিতের সঙ্গে আমার চেনাজানা হয়েছে। পিদিমের তলায় আঁধারের মতো তাদের এক-একজনের এক-একরকম উদ্ভট কুসংস্কার দেখেছি। ..হঁ, নাস্তিকদেরও কুসংস্কার দেখেছি, জয়ন্ত! আসলে সত্যিকার নাস্তিক হতে গেলে মনের জোর থাকা চাই। খাঁটি নাস্তিক হওয়া সহজ নয়। অবিশ্বাস করাটা শক্ত বিশ্বাস করাটা সহজ। কারণ আজন্ম মানুষ বিশ্বাস ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসই মানুষের সমাজটাকে বেঁধে রেখেছে। ওই রিকশাওয়ালার কথাই ধরো। আমরা তাকে ভাড়া দেব বিশ্বাস করেই আমাদের বয়ে আনল! বিশ্বাস, ডার্লিং, বিশ্বাস জিনিসটা না থাকলে মানুষের বাঁচা কঠিন হত। কিন্তু কিছু বেয়াড়া লোক থাকে। তারা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে। যে বিশ্বাস চালু, তাকে অবিশ্বাস করে। তারপর? চালু-বিশ্বাস যদি বা ভাঙে, আর এক নতুন বিশ্বাসের জন্ম হয়।…”

 

কর্নেলের এই দীর্ঘ দার্শনিক ভাষণের তাৎপর্য বুঝতে পারছিলুম না। ফালি রাস্তার পর ফাঁকা জায়গায় পৌঁছে সামনে ধ্বংসস্তূপ এবং তার পেছনে একটা মন্দিরের চূড়া চোখে পড়ল। চূড়ায় কালচে রঙের ত্রিশুল। কর্নেল বাইনোকুলারে ত্রিশূলটি দেখে নিলেন। বললুম, “রক্তের দাগ দেখতে পাচ্ছেন?”

 

কর্নেল কথায় কান না দিয়ে উদাত্ত কণ্ঠস্বরে বললেন, “বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।”

 

বিরক্ত হয়ে হাঁটতে থাকলুম। উনি সমানে বক্তৃতা চালিয়ে গেলেন। তারপর ঢাক বেজে উঠল। ধ্বংসস্তূপগুলোর পর একটা ভোলা পাথর-বাঁধানো চত্বর। ফাঁকে-ফোকরে উদ্ভিদ গজিয়েছিল। কেটে সাফ করা হয়েছে। একদল লোক বসে আছে এবং প্রত্যেকের হাতে একটা করে নানা সাইজের পাঁঠা। প্রকাণ্ড মন্দিরের সামনে হাড়িকাঠ এবং রক্তে ভেসে যাচ্ছে জায়গাটা। ঢাক-কাঁসি বাজছে। ধেইধেই নাচও চলছে। রক্তারক্তি দেখলে আমার গা গুলোয়। মন্দিরটা দেখতে থাকলুম। কালো পাথরে তৈরি খয়াটে এবং ফাটলধরা প্রাচীন স্থাপত্যের কেমন যেন ভয়াল চেহারা। দেখলেই গা-ছমছম করে। এতক্ষণে লোহার ত্রিশূলে কালচে রক্তের দাগ স্পষ্ট চোখে পড়ল।

 

আমাদের দেখতে পেয়ে কয়েকজন পাণ্ডা ভিড় করল। কারও পরনে গেরুয়া, কারও পট্টবস্ত্র এবং প্রত্যেকের কপালে সম্ভবত রক্তের ফোঁটা। সাজিয়ে শিবের প্রিয় বেলপাতা, জবাফুল। কিছু ধুতরো ফুলও দেখতে পেলুম। কর্নেল প্রত্যেককে একটা করে টাকা বিলোচ্ছেন দেখে অবাক হলুম, কলকাতা থেকে একগুচ্ছের এক টাকার নোট জোগাড় করেই এসেছেন! আমার এই বৃদ্ধ বন্ধুটি সত্যিই ভবিষ্যৎদ্রষ্টা।

 

ঢাকের বাজনার তালে-তালে একজন সন্ন্যাসী চেহারার লোক নেচে-নেচে গাইছে :

 

নাচে পাগলাভোলা গলায় মালা

হাতে লয়ে শূল

প্রমথ প্রমত্ত নাচে

কানে ধুতুরারই ফুল….

 

কর্নেল এক টাকার হরির লুঠ দিয়ে লম্বা পায়ে কেটে পড়লেন। মন্দিরের পেছনে গিয়ে ওঁর নাগাল পেলুম। আবার খানিকটা ভোলা জায়গা এবং সামনে একটা প্রকাণ্ড উঁচু আধখানা দেউড়ি দেখা গেল। পাথরের এমন তোরণ দিল্লির মেহরৌলিতে কুতবমিনারের কাছে দেখেছি।

 

“অসাধারণ স্থাপত্যশৈলী!” কর্নেল মুগ্ধদৃষ্টে তাকিয়ে বলে উঠলেন। “এর মালিকানার জন্য একটা কেন একশোটা কুরুক্ষেত্র বাধা স্বাভাবিক। সত্যিই ডার্লিং! রাজা শিবসিংহের এই উত্তঙ্গ কীর্তির ভগ্নাবশেষ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা লড়ে ফতুর হতে আমারও ইচ্ছে করছে। দুঃখের বিষয়, সরকার দেশের প্রাচীন কীর্তি সম্পর্কে এত অমনোযোগী কেন, ভেবে পাইনে! ফিরে গিয়ে প্রত্ন-দফতরে কড়া করে চিঠি লিখব।”

 

বলে কর্নেল ক্যামেরায় নানা দিক থেকে ছবি তুললেন। তারপর কাছে গিয়ে বললেন, “ওপরটা ভেঙে গেলেও অনুমান করছি, তোরণটা অন্তত পঁয়ত্রিশ ফুট উঁচু ছিল। আর এই দ্যাখো, চওড়ায় কী বিশাল! প্রায় দশ ফুট!”

 

ওদিকে গিয়ে দেখলুম, তোরণ বা দেউড়িটির মাথায় ঘন ঝোঁপ গজিয়ে রয়েছে। আস্ত একটা বেঁটে বটগাছ মাথা তুলেছে এবং সেটার শেকড় সাপের মতো এঁকেবেঁকে নেমে এসেছে গা বেয়ে।

 

হঠাৎ দেউড়ির মাথায় ঝোঁপের ভেতর আওয়াজ হল, “একাশি!”

 

চমকে উঠলুম। ঝোঁপ কুঁড়ে কালো একটা ছাগলের মুখ দেখা যাচ্ছে এবং রীতিমতো আশ্চর্য ঘটনা, তার তিনটে শিং! উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”

 

কর্নেল বাইনোকুলারে দেখছিলেন। ঝটপট ক্যামেরা তাক করে শাটার টিপলেন। ছাগমুণ্ডটি দাড়ি ও তিন শিং নেড়ে ফের বলে উঠল মানুষের ভাষায়, “একাশি!” তারপর বেমালুম নিপাত্তা হয়ে গেল।

 

কর্নেল এবং আমি ভাঙা দেউড়িটার চারদিকে ছোটাছুটি করে তাকে আর খুঁজে পেলুম না। কর্নেল ব্যস্তভাবে পাথরের খাঁজ আঁকড়ে এবং শেকড়বাকড় ধরে ওঠার চেষ্টা করলেন। পারলেন না। তখন বললেন, “তোমার তো মাউন্টেনিয়ারিং-এ ট্রেনিং নেওয়া আছে। দ্যাখো তো চেষ্টা করে। আসলে আমার শরীরটা বেজায় ভারী হয়ে গেছে। নইলে আমিও কিছু পাহাড়ের চূড়োয় উঠেছি একসময়। জয়ন্ত! কুইক!”

 

একটু দোনামনা করে বললুম, “মাউন্টেনিয়ারিংয়ের জন্য বিশেষ জুতো পরা দরকার। এই জুতো পরে ওঠা সম্ভব নয়।”

 

“চেষ্টা করো ডার্লিং!”

 

কর্নেলের তাড়ায় পাথরের খাঁজে পা রেখে বুটের শেকড় আঁকড়ে অনেকটা ওঠা গেল। প্রায় মাঝখানে পৌঁছে হল বিপদ। শেকড়টা এখন বেশ মোটা। খাঁজে গজানো গুল্ম ধরে উঠতে গেলেই উপড়ে যাচ্ছে। নীচে থেকে কর্নেল ক্রমাগত উৎসাহ দিচ্ছেন। এইবার একটা মোটা লোহার আংটা চোখে পড়ল মাথার ওপরে। মরচে-ধরা আংটা। টেনে দেখলুম, ওপড়ানোর চান্স নেই।

 

আংটাটি আঁকড়ে বারের কসরত করে গিরগিটির মতো উঠতেই একটা শক্ত ঝোঁপ বাঁ হাতের নাগালে এসে গেল। এরপর আর ওঠাটা কষ্টকর হল না। ঝোঁপ আঁকড়ে পাথরের খাঁজে পা রেখে-রেখে মাথায় উঠলুম। ফুট-দশেক চওড়া জায়গা জুড়ে ঘন ঝোঁপ। তিন-শিঙে ছাগল যেখানে মুখ বের করেছিল, সেখানে গিয়ে থমকে দাঁড়ালুম। নীচে থেকে কর্নেল বললেন, “গর্ত দেখতে পাচ্ছ কি?”

 

এমনভাবে বললেন, যেন নিজেও একবার উঠে আবিষ্কার করে গেছেন! হাসতে-হাসতে বললুম, “গর্ত নয়। কুয়ো৷”।

 

কর্নেল উত্তেজিতভাবে বললেন, “সিঁড়ি আছে দ্যাখো!”

 

“আছে।”

 

“নির্ভয়ে নেমে যাও।”

 

“পাগল!”

 

“পাগল না ডার্লিং, ছাগল।”

 

“কী যা-তা বলছেন?”

 

“ছাগল নেমে গেছে যখন, তখন তুমিও নামতে পারো। কুইক!”

 

কথাটা মনে ধরল। সিঁড়ি বেয়ে নামতে শুরু করলুম। একটু পরে ঘুরঘুঁটে আঁধার। সেই আঁধারে আবার ব্যা-ডাক শুনতে পেলুম। পকেট থেকে দেশলাই বের করে জ্বেলে দেখলুম সিঁড়ির নীচে সমতল পাথর-বাঁধানো মেঝে। একটা করে দেশলাইকাঠি জ্বালি আর সেই আলোয় ভয়ে-ভয়ে পা ফেলি। তিনকড়িচন্দ্র খুঁড়িয়ে হাঁটছে যখন, তখন এই দুর্গম সুড়ঙ্গপথে তার হামলার আশঙ্কা যে নেই, এটাই আমার দুঃসাহসের কারণ। কিছুটা চলার পর সুড়ঙ্গপথ শেষ হল। বাইরের আলো এসে পড়েছে সামনে। আবার সিঁড়ির ধাপ উঠে গেছে ওপরে। এতক্ষণে অস্বস্তি কেটে গেল।

 

সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলুম। মাথায় ঘন ঝোঁপ ও লতার বুনোট। সম্ভবত তিনশিঙে ছাগলটির যাতায়াতে সবুজ রঙের বুনোটটি ঘেঁদা হয়ে গেছে। সেই ঘেঁদা দিয়ে বেরিয়ে দেখি, একটা ছাদবিহীন ভাঙা ঘরের ভেতর এসে পড়েছি। দু’দিকে ভাঙা উঁচু পাঁচিল, একদিকে ধ্বংসস্তূপ, অন্যদিকটায় জঙ্গল।

 

এইমাত্র কেউ বা কিছু জঙ্গল ভেদ করে চলে গেছে, ঝোঁপগুলো তখনও দুলছে। ছাগলটাই হবে। সুড়ঙ্গের মুখের দিকে তাকালে বোঝবার উপায় নেই কিছু। মনে হবে ওটা নেহাত আরও সব জঙ্গলের মতো জঙ্গল।

 

ছাগলটা যেদিকে গেছে বলে সন্দেহ হল, সেদিকেই পা বাড়ালুম। কিন্তু আর এগোনো কঠিন। গুঁড়ি মেরে অবশ্য ঢোকা যায়, এবং চারঠেঙে জন্তুর পক্ষেই খুদে গড়নের জন্য গলিয়ে যাওয়া সম্ভব। কাজেই সে-চেষ্টা ত্যাগ করে ধ্বংসস্তূপের দিকটায় এগিয়ে গেলুম। তারপর কী কষ্টে যে পাথরের স্ল্যাব, ইট আর ঝোঁপঝাড়লতার ভেতর দিয়ে ভোলা সমতল জায়গায় পৌঁছলুম, বলার নয়।

 

কিন্তু এবার যেদিকে তাকাই, ভাঙাচোরা ঘরবাড়ি আর একই ধ্বংসস্তূপ। শিবমন্দিরের চূড়া বা তোরণটাও দেখা যাচ্ছে না। একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছিলুম। ডাকলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”

 

সঙ্গে-সঙ্গে সাড়া এল, “চলে এসো ডার্লিং! ব্র্যাভো!”

 

দক্ষিণের একটা ভাঙা ঘরের দরজায় প্রাজ্ঞ বন্ধুবর সাদা দাড়ি নেড়ে এবং টুপি খুলে মাথা একটু ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানালেন। “মার্ভেলাস, জয়ন্ত! কনগ্রাচুলেশন! তবে এতখানি নার্ভাস হয়ে পড়ার কারণ ছিল না। এই স্তূপটায় উঠে বাইনোকুলারে মাটি ভেদ করে তোমার উদ্ভিদরূপী অভ্যুত্থান দেখেছি। আমি জানতুম, এটাই ঘটবে।”

 

কর্নেল খোলা জায়গায় নেমে এলেন। বললুম, “জানতেন! কী জানতেন?”

 

“তোমার এভাবেই অভ্যুত্থান ঘটবে।”

 

“তার মানে, আপনি বলতে চাইছেন ওই সুড়ঙ্গপথটার কথা, আপনি জানতেন?”

 

কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “অঙ্ক ডার্লিং! স্রেফ অঙ্ক! পিওর ম্যাথস। তিন তিরেক্কে নয়, নয়-নয়ে একাশি। তবে ব্যাকরণেও অঙ্কের নিয়ম কার্যকর। এক এবং আশি যোগ করলে যেমন একাশি হয়, তেমনি সন্ধি করলেও একাশি হয়। চলো! এবার থানায় গিয়ে হালদারমশাইয়ের খোঁজখবর নেওয়া যাক।”

 

ধ্বংসস্তূপগুলোর ভেতর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে এতক্ষণে দক্ষিণে সেই শিবমন্দিরের ত্রিশূল চোখে পড়ল। হঠাৎ কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন, “তিনকড়িবাবু! তিনকড়িবাবু! আপনার বিছানা স্টেশনে… কী আশ্চর্য!”

 

এক পলকের জন্য দেখলুম, শিবমন্দিরের পেছন দিকে ছড়ি হাতে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে সেই তিনকড়িচন্দ্র উধাও হয়ে গেলেন। কর্নেল অট্টহাসি হেসে বললেন, “না–ওঁর দোষ নেই। আসলে সেকালের লোকেরা বড্ড ধাঁধা ভালোবাসতেন। একালে যে হঠাৎ কুইজের হুজুগ উঠেছে, সেও সেই পুরোনো স্বভাবের পুনরুত্থান। সভ্যতার এই নিয়ম। পুরোনো বাতিক নতুন করে বারবার যুগে-যুগে ফিরে আসে। কিন্তু সমস্যা হল, কিছু লোক আছে, সভ্যতার ব্যাকরণ বোঝে না। ব্যাকরণ মানে না। তারা হাঁসজারুর পেছনে হন্যে হয়।”

 

কর্নেলের পুনঃ দীর্ঘ জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শেষ হল, মন্দির-চত্বর পেরিয়ে ঢিবির জঙ্গলচেরা সঙ্কীর্ণ নতুন রাস্তার নীচে পিচের সড়কে পৌঁছে। এতক্ষণে পুণ্যার্থীদের ভিড় বেড়েছে। সাইকেলরিকশা তখনই পাওয়া গেল।

 

কর্নেল বললেন, “থানেমে লে চলল, ভাই! জলদি যানা পড়ে। বখশিস মিলে গা।” সাইকেলরিকশাওয়ালা ফিক করে হেসে বলল, স্যার, চিনতে পারলেক নাই বটেক। আমিই তো তখন সারদের লইয়ে এলাম বটেক।”

 

কর্নেল বললেন, “তাই বটেক!”

 

আমি বললুম, “ওহে রিকশাওয়ালা, তোমাদের এই বটেকটা কী বলো তো?”

 

রিকশাওয়ালা একগাল হেসে বলল, “উটো একটো কথাই বটেক!”

 

“কথা তো বটেই! কিন্তু…”

 

“স্যার লিজের মুখেই তো বইললেন বটেক।”

 

কর্নেল গম্ভীর মুখে মন্তব্য করলেন, “বুঝলে না? বটে তো বটেই বটেক!”

 

থানার সামনে রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখে আমরা গেট দিয়ে ঢুকলুম। দু’ধারে ফুলে-ফুলে ছয়লাপ। বললাম, “রূপগঞ্জের ব্যাপার! খুব রূপসচেতন। খালি ফুল আর ফুল। থানাতেও ফুল! খুনে-বদমাশ চোর-জোচ্চোরদের ধরে এনে ফুল শোঁকানো হয় মনে হচ্ছে।”

 

থানাঘরে ঢুকতেই একজন পুলিশ-অফিসার কর্নেলকে দেখে চেয়ার ছেড়ে প্রায় লক্ষ্য দিলেন। “হ্যাল্লো কনেলসায়েব, আসুন, আসুন। ও.সি. সায়েব এখনই আপনার কথা বলছিলেন।”

 

অফিসারটি পাশের ঘরে নিয়ে গেলেন। দত্যিদানোর মতো প্রকাণ্ড এবং ফো অফিসার-ইন-চার্জ ভদ্রলোকও অনুরূপ লম্ফ দিয়ে হাত বাড়ালেন। পেল্লায় ধরনের হ্যান্ডশেকের পর বিকট অট্টহাসিতে কানে তালা ধরে গেল। বললেন, “কল্যাণবাবুকে এখনই বলছিলুম, এলে নিশ্চয় ইরিগেশন বাংলোয় উঠবেন। দেখুন তো খোঁজ নিয়ে। কাল ডি. জি-সায়েবের ট্রাকল পেয়েই বুঝে গেছি, সিরিয়াস কে। কাল ট্রেনও দু’ঘণ্টা লেট ছিল। স্টেশনে স্পেশাল ব্রাঞ্চের লোক মোতায়েন ছিল।”

 

বলে বড়বাবু বসলেন। কর্নেল বললেন, “হালদারমশাইয়ের খবর?”

 

বড়বাবু বেজার মুখে বললেন, “ওরা তেমন সন্দেহজনক কাউকে তো দেখতে পায়নি। পাগলাবাবুকে কেউ ফলো করেনি। হালদারবাবুর চেহারার যে বর্ণনা দিয়েছেন ডি. জি-সায়েব, তেমন কাউকে দেখা যায়নি।”

 

আমি বললুম, “ছদ্মবেশ ধরার বাতিক আছে ওঁর।”

 

বড়বাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনিই আশা করি সেই সাংবাদিক জয়ন্ত চৌধুরী? কর্নেলের মুখে আপনার কথা শুনেছি। ভালো, খুব ভালো। কিন্তু আপনি তো ভাবিয়ে তুললেন দেখছি!”

 

কর্নেল বললে, “মিঃ হাটি, মন্দিরের ত্রিশূলের রক্তের দাগ সম্পর্কে ফরেনসিক রিপোর্ট পেয়েছেন কি?”

 

“আজ সকালে পেয়েছি। মানুষেরই রক্ত। তার চেয়ে সমস্যা, নকুলবাবুর ব্লাডগ্রুপের সঙ্গে মিলে গেছে।”

 

শুনেই আঁতকে উঠলাম। বললুম, “তা হলে ওই ত্রিশূলেই নকুলবাবুকে…”

 

আমার কথায় বাধা দিয়ে বড়বাবু মিঃ হাটি বললেন, “ওই ত্রিশূল ওপড়ানোর সাধ্য মানুষের নেই। তবে স্বয়ং মহাদেবের থাকতে পারে।” বলে আবার সেই দানবীয় অট্টহাসি হাসলেন। হাসি তো নয়, মেঘের ডাক। তার আওয়াজে যেন ভূমিকম্পও হচ্ছিল। অন্তত তার শরীরে সেই কাঁপুনি দেখে তাই মনে হয়।

 

কর্নেল বললেন, “মন্দিরটা দেখলুম খুব উঁচু। তা ছাড়া চূড়াটা ছুঁচলো এবং শ্যাওলায় পিছল হয়ে আছে। উঁচু মই ছাড়া ওঠাও অসম্ভব। ত্রিশূলে নকুলবাবুর রক্ত কী করে মাখানো হল?”

 

মিঃ হাটি গুম হয়ে বললেন, “এটাই আশ্চর্য! আমরা ফায়ারব্রিগেড আনিয়ে ত্রিশূল থেকে রক্তের নমুনা নিয়েছিলুম। ফায়ারব্রিগেডের মই ছাড়া চুড়োয় ওঠা যেত না। কল্যাণবাবুও উঠেছিলেন চূড়োর চারদিক পরীক্ষা করতে। সাধারণ মই দিয়ে উঠলে মইয়ের ডগার দাগ পড়ত।”

 

কল্যাণবাবু বললেন, “কোনো দাগ দেখতে পাইনি। তবে এক হতে পারে, লম্বা বাঁশের মাথায় রক্তমাখা তুলো বেঁধে ত্রিশূলে ঘষে দিয়েছিল খুনি। কিন্তু ভালোভাবে পরীক্ষা করেছি, ত্রিশূলে তুলোর আঁশ লেগে নেই। এমনকি, ত্রিশূলের গা বেয়েও রক্তের ফোঁটা গড়িয়ে পড়েনি। চূড়োতেও রক্তের ফোঁটা নেই কোথাও। তন্নতন্ন খুঁজেছি।”

 

আমি বললুম, “ন্যাকড়ায় রক্ত মাখিয়ে…”

 

আবার বাধা পড়ল হাটিবাবুর বিকট অট্টহাস্যে। বললেন, “তা হলে তো মশাই রক্তের ফোঁটায় চূড়ো একাকার হয়ে থাকত। তুলো রক্ত শুষে নেয়। ন্যাকড়া অত শুষতে পারে কি? ভেবে বলুন।”

 

হাবা বনে বসে রইলুম। কর্নেল বললেন, “কিন্তু আমার ভাবনা প্রাইভেট ডিটেকটিভদ্রলোকের জন্য। এই দেখুন।” বলে কর্নেল পকেট থেকে সচ্ছিদ্র চিরকুটটা বড়বাবুর হাতে দিলেন। “বাংলোর গেটের বাইরে একটা কাঁটাঝোপে এটা লটকানো ছিল।”

 

ছড়াটা পড়ে পুনঃ বিকটহাস্যের জন্য রেডি হয়েই বড়বাবু মিঃ হাটির মুখ তুম্বো হয়ে গেল। ভুরু বেজায় কুঁচকে গোঁফ চুলকে বললেন, “মন্দিরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ডি. জি-সায়েবের নির্দেশ দিল সাদা পোশাকের পুলিশ রাখতে, অক্ষরে-অক্ষরে তা পালন করেছি। পাঁঠাগুলোর দিকে লক্ষ রাখতে বলেছিলুম। তিন শিঙে পাঁঠা বলির জোগাড় দেখলেই যেন বমাল আসামি ধরে থানায় পাঠায়। কিন্তু এখনও তেমন কিছু ঘটেনি। নরবলি তো দূরস্থান!”

 

কর্নেল বললেন, “রাতেও আশা করি পুলিশ ছিল?”

 

“আলবাত ছিল,” মিঃ হাটি জোর গলায় বললেন, “নরবলি যে হয়নি, সেটার গ্যারান্টি দিতে পারি। কাজেই এটা স্রেফ হুমকি।”

 

আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “অন্য কোনো মন্দিরেও তো… মানে, ওদিকটা অনেক ভাঙাচোরা মন্দির দেখলুম। যদি হালদারমশাইকে…”

 

বড়বাবুর শেষদফা আটকে-রাখা বিকট হাস্যটির বিস্ফোরণ ঘটল। পরিশেষে প্রকাণ্ড মুণ্ড জোরে নেড়ে বললেন, “এখন পর্যন্ত ওই এরিয়া কেন, কোথাও কোনো ডেডবডির খবর নেই। ডি. জি-র ট্রাঙ্ককল পেয়েই আমরা অ্যালার্ট, রেড সিগন্যাল বোঝেন তো?”

 

কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, “আচ্ছা মিঃ হাটি, তিনকড়িচন্দ্র ধাড়াকে চেনেন?”

 

মিঃ হাটির ভুরু বেশ পুরু। কুঁচকে তাকালেন কল্যাণবাবুর দিকে।

 

কল্যাণবাবু বললেন, “কেন? করালীবাবুর আত্মীয়…সেই স্মাগলার স্যার! জাহাজে চাকরি করে। …সরডিহির রাজবাড়ির মন্দির থেকে সোনার ঠাকুর চুরির কেসের মূল আসামি ছিল। আইনের ফাঁকে ছাড়া পেয়ে নিপাত্তা হয়ে গেল। এক মিনিট। কেসের ফাইলটা খুঁজে আনছি।” কল্যাণবাবু সবেগে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।

 

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনার একটু সাহায্য এখনই চাই মিঃ হাটি!”

 

“অবশ্যই পাবেন। বলুন!”

 

“আমি শিবমন্দিরের ভেতরটা একবার দেখতে চাই। ভক্তদের সেন্টিমেন্টে আঘাত লাগতে পারে। সেজন্যই পুলিশের সাহায্য ছাড়া এ-কাজটা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।”

 

বড়বাবু হাঁকলেন, “কল্যাণবাবু, ফাইল পরে হবে। প্লিজ, চলে আসুন!”..বলে কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন, “মার্ডার কেস! ধম্মকম্ম নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই, কর্নেলসায়েব! ভগবান আছেন, মাথায় থাকুন। আর স্বয়ং ভগবানই বলেছেন কি না যদা যদাহি ধর্মস্য গ্লানি…’ এটসেট্রা এটসেট্রা!”

 

পুনঃ ভূমিকম্পসদৃশ বিকট অট্টহাস্য! বাস! পুলিশকে এমন হাসতে কখনও দেখিনি। এই ভদ্রলোক যদি চোর-জোচ্চোরকে বেটনের গুঁতোর বদলে এই সাঙ্ঘাতিক হাসির গুঁতো মারেন, সঙ্গে-সঙ্গে পেটের কথা উগরে দেবে। মারমুখী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাসের বদলে এঁর লাফিং গ্যাস প্রয়োগ করলে অনেক বেশি কাজ হবে সন্দেহ নেই।

 

কল্যাণবাবু থানার সেকেন্ড অফিসার। সঙ্গে দু’জন সশস্ত্র সেপাই। গেটে রিকশাওয়ালা অপেক্ষা করছিল। কর্নেল এবং আমার সঙ্গে এবার পুলিশ দেখে আঁতকে উঠে সে কেটে পড়তে যাচ্ছিল। কর্নেল মধুর হেসে তার হাতে একটা দশ টাকার নোট দিয়ে সম্ভাষণ করলেন, “এই যে ভাই! ভাড়া আর ওয়েটিং চার্চ তো লিবেই বটেক।”

 

রিকশাওয়ালা ভয়েভয়ে টাকাটা নিয়ে পালিয়ে যেতে এক সেকেন্ড দেরি করল না। একজন সেপাই মুচকি হেসে বলল, “বহত্ কামাতা শিউজিকা কিরপাসে।”

 

পুলিশের জিপে এবার তিন মিনিটেই পৌঁছে গেলুম। জিপ রাস্তায় রইল। কর্নেল বললেন, “একজন কনস্টেবল জিপের কাছে থাক, কল্যাণবাবু!”

 

কল্যাণবাবু বললেন, “কোনো দরকার নেই, কর্নেল! এ আপনার কলকাতা শহর নয়। দেহাতি গঞ্জ। এখানে পুলিশ কেন, পুলিশের জুতোকেও ভয় পায় লোকেরা। রাস্তায় ফেলে গেলেও ছোঁবে না। তা ছাড়া চাবি!” বলে রিঙের চাবিটা নাড়া দিলেন।

 

মন্দিরে বলিদান চলেছে। তেমনি ঢাক বাজছে। এখন ভিড়টা বেশ বেড়েছে। আমাদের দেখে ভিড় থেকে দু’জন তাগড়াই চেহারার লোক বেরিয়ে এল। বুঝলুম, সাদা পোশাকের পুলিশ। কল্যাণবাবু মন্দিরের উঁচু বারান্দায় উঠলেন। পাণ্ডারা এবং তাদের দলপতি গেরুয়াধারী সেই সাধু-সন্ন্যাসী চেহারার লোকটি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। জুতো খুলে রেখে আমরা ভেতরে ঢুকলুম। মন্দিরের ভেতরটা চওড়া। ভাঙাচোরা শিবলিঙ্গে প্রচুর সিঁদুর মাখানো হয়েছে। কর্নেল পকেট থেকে টর্চ জ্বেলে ছাদে আলো ফেললেন। চোখে বাইনোকুলার স্থাপনও করলেন।

 

একটু পরে টর্চ নিবিয়ে এবং বাইনোকুলার নামিয়ে বললেন, “হুঁ! বোঝা গেল।”

 

কল্যাণবাবু বললেন, “কী বোঝা গেল, কর্নেল?”

 

“মই বাইরে ব্যবহার করা যায়নি। কারণ অত উঁচু মই জোগাড়ের সমস্যা ছিল। কিন্তু মন্দিরের মেঝে উঁচু। একটা বিশ ফুট মই যথেষ্ট। বিশেষ করে এই লিঙ্গের বেদিতে যদি মইয়ের গোড়া রাখা যায়, মাত্র ফুট-পনেরো মই হলেই চলে।” বলে বেদির পেছনে টর্চের আলো ফেললেন। পকেট থেকে এবার একটা আতস কাঁচ বের করে ঝুঁকে পড়লেন। তারপর সোজা হয়ে ফের বললেন, “হু, বেদিতেই মইয়ের গোড়া দুটো রাখা হয়েছিল। পাথরে গোল দুটো ধুলোর ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে এখনও। জল ঢেলে মন্দিরের ভেতরটা পরিষ্কার করার তর সয়নি। খুনের পরদিনই তাড়াহুড়ো করে পুজো আর বলির আয়োজন করা হয়েছিল। হিসেবি মাথার কাজ, কল্যাণবাবু! স্টার্ট করে দিলেই পুজো আর বলিদানের মেশিন চলবে, জানা কথা। কিন্তু এটাই আশ্চর্য ব্যাপার, অপরাধী নিজের অজ্ঞাতে কিছু সূত্র রেখে যাবেই।”

 

কল্যাণবাবু হাঁ করে শুনছিলেন। বললেন, “ব্যাপারটা কী, খুলে বলুন তো।”

 

কর্নেল হাসলেন। “আপনিই তো দমকলের মইয়ে চুড়োয় উঠেছিলেন। ত্রিশূলের গোড়ায় গোল লোহার চাকতি আঁটা আছে, কী করে আপনার দৃষ্টি এড়িয়ে গেল?”

 

কল্যাণবাবু যেন একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, “দৃষ্টি এড়াবে কেন? গোল প্রায় সাত-আট ইঞ্চি ব্যাসের লোহার চাকতি আঁটা আছে। তার সেন্টার থেকে ত্রিশূলটা উঠে গেছে।”

 

কর্নেল কৌণিক ছাদের কেন্দ্রে ফের টর্চের আলো ফেলে বললেন, “দেখুন, তলাতেও অমনি একটা লোহার গোল চাকতি আঁটা। চাকতিটা নতুন। মরচে ধরেনি!”

 

“মাই গুডনেস!” নড়ে উঠলেন কল্যাণবাবু। “ওপরের চাকতিটাও মরচে-ধরা ছিল না। কিন্তু…”

 

‘কল্যাণবাবু হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, “তাই তো! আসলে আমি রক্তের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিলুম।”

 

“ঠিক তাই। আপনার দৃষ্টি ছিল তঙ্কালীন উত্তেজক বস্তুর একমাত্র লাল রং, অর্থাৎ রক্তের মতো জিনিসটার দিকেই।” কর্নেল টর্চ নিভিয়ে বললেন। “এমন সুপ্রাচীন মন্দিরের ত্রিশূল মরচে ধরে আস্ত থাকার কথা নয়–যদি না সেটা বিখ্যাত জাহানকোশা তোপ বা কুতুবমিনারের প্রাঙ্গণে স্তম্ভটার মতো বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি লোহা হয়। এ-ত্রিশূল সেই লোহার নয়। বাইনোকুলারে ত্রিশূল এবং ওই চাকতিতে টাটকা পেটাইয়ের দাগ স্পষ্ট। ডগা খুব তীক্ষ্ণ। তবে চাকতি বলছি, জিনিসটা চাকতি নয়। ওটা ঘুড়ির লাটিমের গড়ন সচ্ছিদ্র একটুকরো লোহা। ত্রিশূলটা ভ্রুর মতো ওতে পেঁচিয়ে ঢোকানো আছে। প্রাচীন যুগের বহু মন্দিরে এই পদ্ধতিতে ত্রিশূল আটকানো রয়েছে। কেন জানেন? পাখির বিষ্ঠা বা ময়লা লাগলে খুলে সাফ করার জন্য। তা ছাড়া মরচে ধরলে যাতে বদলানো যায়, সেও একটা কারণ।”

 

কর্নেল বেদির পেছনে মেঝেয় টর্চের আলো ফেললেন। “ওই দেখুন, কত মরচে-ধরা লোহার গুঁড়ো পড়ে আছে। মরচে-ধরা প্রাচীন ত্রিশূল তলা থেকে ভেঙেচুরে টেনে বের করা হয়েছে। তারপর একই পদ্ধতিতে নতুন ত্রিশূল তলা দিয়ে ঢুকিয়ে ওপরকার পাথরের গোলাকার খাঁজে আটকে দেওয়া হয়েছে। যাতে ফোকর গলে পড়ে না যায়, লোহার গোঁজ ঠোকা হয়েছে তলা থেকে। ছাদের ঝুলকালির জন্য গোঁজগুলো সহজে চোখে পড়ে না।”

 

কল্যাণবাবু ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, “কে সে? কার পেটে-পেটে এমন সাঙ্ঘাতিক কুচুটে বুদ্ধি?”

 

কর্নেল বেরিয়ে গিয়ে বললেন, “এলাকার কামারশালাগুলোতে খোঁজ নিন। তবে আমার মাথায় এখন হালদারমশাইয়ের জন্য ভাবনা। কল্যাণবাবু, এখান থেকে সোজা পশ্চিমে হেঁটে গেলে কি নদীর ধারে পৌঁছব?”

 

“হ্যাঁ। এই ঢিবির নীচেই হাইওয়ে, তার নীচে নদী। কি দরকার হাঁটবার? চলুন, জিপে পৌঁছে দিই।”

 

কর্নেল একটু ভেবে বললেন, “হ্যাঁ, তাই চলুন।”

 

জিপের কাছে পৌঁছেই কল্যাণবাবু হঠাৎ মুরারিবাবুর মতোই তিড়িংবিড়িং করে জিপটার চারদিকে চক্কর মেরে হুমড়ি খেয়ে সামনের চাকার কাছে বসলেন। বসেই লাফিয়ে উঠলেন। মস্ত একটা হুঙ্কার ছাড়লেন, “কে সে…শয়তান, আমি তাকে দেখে নেব…এত সাহস!”

 

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, “টায়ার ফাঁসিয়েছে। কারবুরেটর জ্যাম করেছে। ইঞ্জিনের ভেতরকার তার কেটেছে। যাকগে, কল্যাণবাবু, আপাতত বিদায়। আবার দেখা হবে।”

 

কর্নেল আমার হাত ধরে টেনে হনহন করে হাঁটতে থাকলেন। আমি হতবাক। কিছুটা এগিয়ে একটা সাইকেল-রিকশা দাঁড় করিয়ে কর্নেল বললেন, “মহিলার সিংকা গ্যারিজ। তুরন্ত চন্না ভাই।”

 

এই রিকশাওয়ালা বটেক’-এর বদলে বলল, “জরুর, চলিয়ে না, যাঁহাপর যানা।”

 

গ্যারেজে গিয়ে দেখি, শের আলির জিপ রেডি। স্যালুট ঠুকে বলল, “সব ঠিক হ্যায় কর্নিলসাব! মালুম হোতা, কই বদমাশ গ্যাংকা কুছ খতরনাক মতলব হ্যায়। উও আপকো হেঁয়া ঘুমনা পসন্দ নেহি করতা।”

 

অজানা আতঙ্কে বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *