ব্যাকরণ রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

দুই

ট্রেন, না ছ্যাকরা গাড়ি! স্টেশনেও থামছে, আবার যেখানে স্টেশন নেই, সেখানেও থামছে। আর যখনই থামছে, নড়তেই চায় না। চাকাগুলোর শব্দে বড় অনিচ্ছা বিরক্তির প্রকাশ। আমাদের দু’জনের জন্য রিজার্ভ-করা কুপে-তে কর্নেল এক উটকো যাত্রী ঢুকিয়েছিলেন। বর্ধমান স্টেশনে সন্ধ্যা নাগাদ এঁর হন্তদন্ত আবির্ভাব। যাবেন রূপগঞ্জে। নাদুসনুদুস বেঁটে গড়নের লোক। এক হাতে ফোলিও ব্যাগ, অন্য হাতে খবরের কাগজে জড়ানো চৌকো বোঁচকা, পরে দেখলুম সেটা একটা বিছানা। ট্রেনে কোথাও নাকি পা রাখবার জায়গা নেই। কাকুতি-মিনতি করে কর্নেলকে গলিয়ে জল করে ফেলেছিলেন প্রায়, আমি প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়েছিলুম। তারপর একটি কার্ড আমাকে ধরিয়ে দিলে আমার আপত্তিওঁ গলে জল হল। অর্থাৎ না করতে পারলুম না। কার্ডে ছাপানো আছে, ডঃ টি. সি. সিংহ। তারপর আমার জানা-অজানা দিশি-বিদিশি ডিগ্রির লেজুড়, এই ট্রেনটার মতোই লম্বাটে। কিন্তু আর যা সব লেখা আছে, তাতে বোঝা যায় ইনি মস্ত বিদ্যাবাগীশ পণ্ডিত। প্রত্নবিদ্যা, নৃবিদ্যা, ভাষাবিদ্যা থেকে শুরু করে এমন বিদ্যা নেই, যা এঁর অজানা। তার প্রমাণও পাচ্ছিলুম হাড়ে-হাড়ে। কান ভোর্ভে করছিল। কর্নেল কিন্তু বিরক্ত হওয়া দূরের কথা, মনোযোগী ছাত্রের মতো শুনছেন আর সায় দিচ্ছেন। শুধু সায় দিচ্ছেন বলা ভুল হল, প্রশ্নও করছেন। বার্থে চিত হয়ে শুয়ে পড়েছিলুম। ওদিকের বার্থে জানালার পাশে হেলান দিয়ে কর্নেল বসে আছেন এবং তার পাশে পণ্ডিতমশাই। কানে এল, কর্নেল জিজ্ঞেস করছেন, “আচ্ছা ডঃ সিংহ, ট্রেনের সঙ্গে স্ট্রেইনের কোনো সম্পর্ক আছে কি, মানে ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক?”

 

“আছে। বিলক্ষণ আছে। প্রথমে ধরুন ট্রেন শব্দটা। এর আক্ষরিক অর্থ কিছু টেনে নিয়ে যাওয়া। টে-নে!” ডঃ সিংহ নড়ে বসলেন।”বাংলা টান শব্দটা দেখুন। টেনে নিয়ে যাওয়া। টানাটানি সহজ কাজ নয়, কষ্টকর। স্ট্রেইন শব্দের আক্ষরিক অর্থও কষ্টে টেনে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এ থেকে কী বেরিয়ে এল দেখুন! ইংরেজি ট্রেন আর বাংলা টান একই শব্দের দুটো রূপ। এতেই প্রমাণিত হচ্ছে, আমরা বাঙালিরা এবং ইংরেজরা একই জানো।”

 

কর্নেল প্রশ্ন করলেন, “শিং-এর সঙ্গে সিংহের সম্পর্ক আছে কি?”

 

“অ্যাঁ?” পণ্ডিতমশাই হকচকিয়ে গেলেন। তারপর হোহো করে হেসে বললেন, “আপনার রসবোধ আছে। উগান্ডার বুগান্ডা মিউজিয়ামে যখন ডিরেক্টর ছিলুম, ডঃ হোয়াহুলা হোটিটি প্রায় ঠাট্টা করে বলতেন, সিংহকে আমরা বলি শিম্বা। তোমার পূর্বপুরুষ নিশ্চয় আফ্রিকান ছিলেন। …হ্যাঁ, আপনার প্রশ্নটা ভাববার মতো। শিং এসেছে সংস্কৃত শৃঙ্গ থেকে। যা উঁচুতে থাকে। যেমন পর্বতশৃঙ্গ। পর্বতশৃঙ্গের ছবি দেখবেন, কেমন ছুঁচলো–খোঁচার মতো। আকাশকে যেন তোচ্ছে। তাই না? তবে সিংহ, সিংহের স্থানও জন্তুদের মধ্যে উঁচুতে। তার মানেটা দাঁড়াচ্ছে, দুটো শব্দেই উচ্চতা বোঝাচ্ছে, আবার হিংস্রতাও বোঝাচ্ছে। শৃঙ্গী জন্তু গুতো মারে, আর সিংহ মারে থাবা।”

 

“শিংওয়ালা জন্তুর গুঁতোয় মানুষ মারা পড়ে, শুনেছি।” কর্নেল বললেন। “রূপগঞ্জে নাকি ছাগলের গুঁতোয় একটা মানুষ মারা পড়েছে। শুনে একটু অস্বস্তি হচ্ছে।”

 

ডঃ সিংহ ভুরু কুঁচকে বললেন, “ছা-ছাগল…কথাটা কে বলল বলুন তো? কাগজে তো অন্য খবর পড়েছি। প্রাচীন শিবমন্দিরের ত্রিশূলে…হ্যাঁ, আসল কথাটা তা হলে খুলেই বলি। ওই শিবমন্দিরটা পাথরের, বুঝলেন? গত মাসে একবার গিয়ে দেখে এসেছি। আমার ধারণা, ওটা অন্তত দেড় থেকে দু’হাজার বছরের পুরনো। শৈব রাজাদের রাজধানী ছিল রূপগঞ্জ। নদীর নামটা সেই স্মৃতি বহন করছে–শৈব্যা! জঙ্গলের ভেতর ঢিবি, পাথরের স্তম্ভ। শৈব্যাও অনেক স্মৃতিচিহ্ন গ্রাস করেছে। রাক্ষুসি নদী মশাই, শৈব্যা!”

 

“ব্যা-করণ!” কর্নেল কথাটা বলেই চুরুট জ্বালতে ব্যস্ত হলেন।

 

ডঃ সিংহ বললেন, “কী, কী? ব্যাকরণ…”বলেই আবার একচোট হাসলেন। “আপনার রসবোধ আছে! শৈব্যাতে ব্যা আছে বটে।”

 

“ছাগলও ব্যা করে।” একরাশ চুরুটের ধোঁয়ায় কর্নেলের মুখ আবছা হয়ে গেল।

 

ডঃ সিংহের মুখে কেমন যেন সন্দিগ্ধ ভাব, ফের ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনার এই ছাগলের ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে, ছাগলের কথা কে বলল আপনাকে, মানে, ছাগলের গুঁতোয় মানুষ মারা পড়ার কথা?”

 

কর্নেল বললেন, “হাওড়া স্টেশনে একদল লোক বলাবলি করছিল। আচ্ছা, ডঃ সিংহ, ছাগল এবং পাগলে কোনো ভাষাতাত্ত্বিক সম্পর্ক আছে কি?”

 

ডঃ সিংহ হাসতে গিয়ে হাই তুলে বললেন, “আপনার রসবোধ অতুলনীয়। তো যাদ কাইন্ডলি, অনুমতি দেন, আমি এখানেই একটু গড়িয়ে নিই। এখনও দু’ঘণ্টা থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে। বিচ্ছিরি ঘুম পাচ্ছে।”

 

বলে অনুমতির তোয়াক্কা না করে সেই কাগজে-জড়ানো বোঁচকাটি খুললেন এবং কর্নেলকে আরও কোণঠাসা করে শতরঞ্জি-চাদর-বালিশ সাজিয়ে চিত হলেন। বেঁটে হওয়ার দরুন শোয়াটি বেশ পুরোপুরি হল। কর্নেলের চোখে আমার চোখ পড়ল। কর্নেল মিটিমিটি হাসছেন। একটু পরে বললেন, “ডঃ সিংহ কি ঘুমিয়ে পড়লেন?”

 

“উঃ…হা-না…কী?”

 

“আপনার পুরো নামটি জানতে ইচ্ছে করছে।”

 

“তি-তিনকড়িচন্দ্র সিংহ।” বলে পণ্ডিতপ্রবর নাক ডাকাতে শুরু করলেন। আমি তো থ। এরকম ঘুম কখনও কাউকে ঘুমোতে দেখিনি, এক কর্নেল বাদে।

 

“আবার তিন!” কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন। “তিন তিরেক্কে নয়। নয়-নয়ে একাশি।”

 

নাকডাকা বন্ধ হল। চোখও খুলে গেল। শিবনেত্র হয়ে বললেন, “কী, কী?”

 

“কিছু না। আপনি ঘুমোন।” কর্নেল বললেন। “আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছি।”

 

আবার নাক ডাকতে থাকল।

 

কর্নেল বললেন, “বুঝলে জয়ন্ত, অ্যাস্ট্রোলজি বা জ্যোতিষের মতো সংখ্যাতত্ত্ব বলে একটা শাস্ত্র আছে। না, স্ট্যাটিসটিক্স নয়, নিউমারোলজি। অ্যাস্ট্রোলজির আওতায় পড়ে এটা। সংখ্যারও নাকি শুভাশুভ আছে। নাম, জন্মের সন-মাস-তারিখ, এসব থেকে সংখ্যা বের করে ভূত-ভবিষ্যৎ জানা যায় শুনেছি। তো দ্যাখো, ছাগল আর পাগল, শুধু ব্যঞ্জনবর্ণই ধর্তব্য, তিনটি সংখ্যার শব্দ। এও তিন তিরেক্কে নয়। নয়-নয়ে একাশি, সেই ছাগলীয় একাশি। তারপর ইনি বললেন, রূপগঞ্জের নদীটার নাম শৈব্যা, আমি তো শুনেছিলুম ‘শোভানদী’, রূপগঞ্জের পাশে সুন্দর ফিট করে যায়। কিন্তু ইনি পণ্ডিত মানুষ, বিশেষ করে পুরাতাত্ত্বিক। কাজেই নদীটা নিশ্চয় প্রাচীন যুগে ‘শৈব্যা ছিল। শিবসিংহের রাজধানীর পাশে শৈব্যা নদী ফিট করে যায়। যাই হোক, এখানেও একটা ব্যাকরণঘটিত ব্যাপার দেখা যাচ্ছে। ব্যাকরণ রহস্য, ডার্লিং! ছাগলের আদি-অকৃত্রিম ল্যাঙ্গোয়েজ, ব্যা!”

 

অসহ্য। কাহাতক আর বকবক ভালো লাগে। চোখ বুজেছিলুম। তারপর কখন যেন ঘুমিয়েও পড়েছিলুম। চলমান যানবাহনে মানুষের ঘুম পায় কেন, এ-নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিশ্চয় গবেষণা করে থাকবেন।

 

হঠাৎ কী-সব শব্দ এবং আমার পায়ের ওপরও ভারী কিছু পড়ল। চোখ খুলেই ভীষণ হকচকিয়ে গেলুম। আতঙ্কে মুখ দিয়ে কথা বেরোল না। কী ভয়ঙ্কর দৃশ্য! মারদাঙ্গার ফিল্মে অবিকল যেমনটি দেখা যায়।

 

আমার পায়ের ওপর বসে পণ্ডিতপ্রবর কর্নেলের সঙ্গে হাতাহাতি করছেন। হাতাহাতি কী বলছি! পণ্ডিতের হাতে একটা ছোরা, কর্নেল সেই হাতটা নিজের দু’হাতে ধরে মোচড় দিচ্ছেন।

 

মাত্র এক সেকেন্ডের দৃশ্য। পায়ে বেঁটে গাঁজাগোলা ওজনদার কিছু চাপানো থাকলে ওঠা কঠিন। অগত্যা পা দুটো যথাশক্তি নাড়া দিলুম। একই সঙ্গে ছোরাটাও ঠকাস করে মেঝেয় পড়ে গেল এবং ডঃ তিনকড়িচন্দ্র সিংহ কর্নেলের পেটে ঠিক ছাগলের মতোই ফুঁ মারলেন। কর্নেল তো খেয়ে একটু পিছিয়ে গেছেন, পণ্ডিত হাত বাড়িয়ে নিজের ফোলিও ব্যাগটা নিয়ে খোলা দরজা দিয়ে নীচে ঝাঁপ মারলেন।

 

ট্রেনের গতি খুব কম। দাঁড়ানোর মুখে বলে মনে হচ্ছিল। পায়ে ব্যথার দরুন উঠতে একটু সময় লাগল। কর্নেল ততক্ষণে ছোরাটা কুড়িয়ে নিয়েছেন এবং দরজায় উঁকি দিচ্ছেন। বাইরে বিদ্যুতের আলো। তা হলে কোনো স্টেশন আসছে। মালগাড়ি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে।

 

আমার মুখে কথা নেই। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি। কর্নেল ক্লান্তভাবে একটু হাসলেন, “লোকটা বিছানা ফেলে গেল!” বলে বিছানাটা গুটোতে থাকলেন। “রেডি হও, ডার্লিং! রূপগঞ্জ এসে গেছে।”

 

ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললুম, “কী সাঙ্ঘাতিক!”

 

“হ্যাঁ, সাঙ্ঘাতিক।”কর্নেল আস্তে বললেন। “আমি ঘুমের ভান করে নাক ডাকাচ্ছিলুম। চোখের ফঁক দিয়ে দেখি, লোকটা আসলে ঘুমোয়নি। আমার মতোই ঘুমনোর ভান করছিল। হঠাৎ চোখ খুলে আমাকে আর তোমাকে দেখে নিল। তারপর সাবধানে উঠে ছিটকিনিটা সরিয়ে দরজা হাট করে খুলে দিল। আমার ভুল হল, রিভলভারটা বের করিনি সঙ্গে-সঙ্গে। ও কী করে, দেখতে চেয়েছিলুম। বাঙ্ক থেকে আমার কিটব্যাগ নামিয়ে চেন খুলে তন্নতন্ন করে কী খুঁজল। না পেয়ে রেখে দিল। তারপর স্যুটকেসটা নামাতে যাচ্ছে, তখন মনে হল, আর চুপ করে থাকা ঠিক হচ্ছে না। যেই বলেছি, “ডঃ সিংহ কি কিছু খুঁজছেন” অমনি এই ছোরা বের করে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাগ্যিস, ওই সময় ট্রেন লাইন বদল করছিল! খুব নড়ছিল এই কুপেটা। টাল খেয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। আমি সেই সুযোগে ওর ছোরা-ধরা হাতটা দুহাতে চেপে ধরে ঠেলে দিলুম। লোকটা তোমার পায়ের ওপর পড়ল। কিন্তু গায়ে কী প্রচণ্ড জোর! কুস্তিগির পালোয়ান একেবারে।”

 

উঠে দাঁড়িয়ে দুই ঠ্যাং নাড়া দিয়ে রক্ত-চলাচল ঠিক করে নিয়ে বললুম, “আপনাকে আপত্তি জানিয়েছিলুম, আপনি শুনলেন না। এবার বুঝুন উটকো লোক ঢুকিয়ে কী বিপদ বাধিয়েছিলেন!”

 

কর্নেল চুরুট বের করে জ্বেলে বললেন, “লোকটা জাল ডঃ টি. সি. সিংহ, জয়ন্ত! ডঃ সিংহকে আমি চিনি। তিনি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রধান অধ্যাপক। বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত। এই লোকটাকে কুপেতে জায়গা দেওয়ার কারণ ছিল।…চলো, দেখি ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার কামালসায়েব জিপ পাঠিয়েছেন কি না। নইলে বরাতে কিছু দুর্ভোগ আছে।”

 

ট্রেন রূপগঞ্জ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকছিল। রাত প্রায় একটা বাজে।

 

প্ল্যাটফর্মে নেমে কর্নেল বললেন, “এক মিনিট। তিনকড়িচন্দ্রের বিছানাটা স্টেশনমাস্টারকে জিম্মা দিয়ে আসি। মাইক্রোফোনে ঘোষণা করতেও বলব।”

 

“এ-বদান্যতার মানে হয় না!” আপত্তি জানিয়ে বললুম।”বরং রেল-পুলিশের কাছে জমা দিন। আর সাঙ্ঘাতিক ঘটনাটা ওদের জানান।”

 

কর্নেল আমাকে পাত্তা দিলেন না। এত রাতে যাত্রীর সংখ্যা কম। প্ল্যাটফর্মেও নিঝুম খাঁখাঁ অবস্থা। মাঝারি স্টেশন যেমন হয়। একটু গা-ছমছম করছে। কর্নেল যতক্ষণ না ফিরলেন, এদিকে-ওদিকে মুহুর্মুহু তিনকড়িচন্দ্রকে দেখতে পাচ্ছিলুম। বেঁটে হোঁতকা লোক দেখলেই ঘুসি বাগিয়ে রেডি হচ্ছিলুম। তারপর কর্নেল ফিরে এলেন। মুখে শান্ত হাসি। গেটের কাছে পৌঁছলে একজন গুফো তাগড়াই চেহারার লোক মিলিটারি কায়দায় স্যালুট ঠুকল। কর্নেল সহাস্যে বললেন, “কেমন আছ শের আলি?”

 

শের আলি বিনীতভাবে বলল, “জি, ভালো আছে বান্দা। বহোত ভালো। তো সাব আসতে পারল না। বোলা, কর্নিলসাবকো বোলো, সুবেমে জরুর মিলেঙ্গে। উনির বেটির বুখার হয়েছে, কর্নিলসাব! কুছু অসুবিস্তা হোবে না। বান্দা হাজির আছে, কর্নিলসাব!”

 

কর্নেল আলাপ করিয়ে দিলেন। শের আলি জিপের ড্রাইভার। এক সময় মিলিটারিতে ছিল। তাই কর্নেলসায়েবকে এত খাতির করে। তাকে দেখে এতক্ষণে মনে সাহস ফিরে এল। কর্নেলের কাছে রিভলভার থাকা না-থাকা সমান। গুলি চালিয়ে তিনকড়িচন্দ্রকে খতম করে দেবেন, এটা নিছক দুঃস্বপ্ন। বাইরে জিপের কাছে যেতে-যেতে শুনতে পেলুম, স্টেশনে ঘোষণা করা হচ্ছে, “ডঃ টি. সি. সিন্হা! ডঃ টি. সি. সিন্হা! আপকা বিস্তারা ইহাপর সংরষিত হ্যায়! প্রত্যার্পণকে লিয়ে হমলোগ প্রতীক্ষা কর রহি হ্যায়।” ঘোষিকার কণ্ঠস্বরে আর ভাষায় বিরক্তিকর ভদ্রতা। গা জ্বলে যায়। কিন্তু ভাষাজ্ঞান এসে গেল। যা বিস্তার করা যায়, তাই বিস্তারা। যা বিছানো যায়, তাই বিছানা। বাঃ!

 

জিপে উঠে কর্নেল বললেন, “রূপগঞ্জ পশ্চিমবঙ্গে, কিন্তু নদীর ওপারে বিহার। এখানে দ্বিভাষী লোক দেখে অবাক হোয়া না। অবশ্য শের আলি ইউ. পি-র লোক।”

 

এতক্ষণে কৃষ্ণপক্ষের খয়াটে চাঁদটা চোখে পড়ল। বাঁ দিকে বসতি এলাকা, ডাইনে উঁচু-নিচু মাটি। ঝোঁপ-জঙ্গল ঝুপসিকালো হয়ে রাতের হাওয়ায় নড়াচড়া করছে। এই রাস্তায় আলো নেই। খানিকটা এগিয়ে বাঁ দিকে আঙুল তুলে কর্নেল বললেন, “ওইগুলো পুরোনো রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ। এবার আমরা নদী পেরোব। তারপর চড়াই। ওই যে সামনে উঁচুতে আলো দেখতে পাচ্ছ, ওটাই সেই বাংলো৷ বিহার মুলুক। খুব চমৎকার জায়গায় বাংলোটা তৈরি করা হয়েছে। নীচে বিশাল জলাধার। পাখিদের অভয়ারণ্য বলা চলে। …হা, রেনবো অর্কিড নদীর এপারে। দেখাব’খন। মাথা খারাপ হয়ে যাবে ডার্লিং!”

 

একটা টিলামতো উঁচু জায়গায় সেচ-বাংলো। চৌকিদার আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। শের আলি জানিয়ে গেল, সকাল আটটার মধ্যে সে কর্নেলসারের সেবায় জিপ নিয়ে আসবে এবং ডি.ই. সাবও আসবেন। কর্নেলসারের জন্য এই জিপগাড়িটি বরাদ্দ করা হয়েছে, এ-কথাও জানিয়ে গেল সে।

 

খাওয়ার ব্যবস্থা দেখে তিনকড়িচন্দ্রকে ভুলে গেলুম। চৌকিদার মাধবলালও কর্নেলকে চেনে। কর্নেলকে কে না চেনে? কর্নেলের সবার মন-জয়-করা স্বভাব তো বটেই, উপরন্তু খোলা হাতে বখশিসও একটা কারণ। মাধবলাল খাওয়ার সময় কর্নেলকে প্ররোচিত করতে থাকল ক্রমাগত। …কর্নেলসাব গতবার যে কানে কলম-গোঁজা পাখিটা (সেক্রেটারি-বার্ড) দেখেছিলেন, সেটা ড্যামের অন্য একটা জলটুঙ্গিতে বাসা বেঁধেছে। সামনে এদের ডিম পাড়বার ঋতু। এখন থেকেই তৈরি হচ্ছে। কর্নেলসাব ওদিকের মাঠে যে প্রজাপতি দেখেছিলেন, তারা আছে। মাধবলাল আপনা আঁখসে দেখেছে। সে আঙুল তুলে দেখাল, “তিন রোজ দেখা সাব-এহি ফাঙ্গা!”

 

কর্নেল মুরগির ঠ্যাং কামড়ে বললেন, “তিন! তিন তিরেকে নয়। নয়ে-নয়ে একাশি।”

 

মাধবলাল বুঝতে না পেরে বলল, “হুজৌর?”

 

“শিবমন্দিরের ত্রিশূলে রক্তের দাগ দেখে এসেছ মাধবলাল?”

 

সে অমনি চমকে উঠে করজোড়ে প্রণাম করে বলল, “আই বাপ! শিউজিকা পূজা বন্ধ থা। তো আদমি বলিদান হো গয়া সাব! উও বাঙ্গালি ঠাকুরমশাইভি আচ্ছা আমি নেহি থা। বহোত ঝামেলাবাজ থা। খালি ইসকা-উসকা সাথ টোক্কর লাগাতা। শিউজি উনহিকো বলিদান লে লিয়া।”

 

“মুরারিবাবুকে চেনো?” মাধবলাল খিকখিক করে হাসতে হাসতে ঝুঁকে পড়ল। “পাগলা! সির পাগলা!”

 

কেন পাগলা, জিজ্ঞেস করলে মাধবলাল অনর্গল তার মাতৃভাষায় মুরারিবাবু সম্পর্কে একটা লম্বা বক্তৃতাই দিল। আমাদের খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা একটানা চলল। তার সংক্ষিপ্তসার হল এই :

 

মুরারিবাবুর ঠাকুর্দার আমলে রূপগঞ্জে ওঁদের খুব দাপট ছিল। অমন বড়লোক এ-তল্লাটে আর কেউ ছিল না। প্রচুর জমিজমা, মহাজনি কারবার, বিশাল দালানবাড়ি, একটা মোটরগাড়ি পর্যন্ত ছিল। তারপর যা হয়! সাত শরিকে মামলা-মকদ্দমা, ঝগড়াঝাটি। একটা ভাঙা দেউড়ি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট অবধি আইনের লড়াই তিন পুরুষ ধরে। ততদিনে দেউড়িটার মাত্র আধখানা টিকে আছে। আধখানা দেউড়ির মাথায় জল গজিয়ে গেছে। সাবেকি বাড়ি মুখ থুবড়ে পড়েছে। কড়ি-বরগা, দরজা-জানালা চৌকাঠসুধু যে যখন সুযোগ পেয়েছে, উপড়ে নিয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ওই আধখানা দেউড়ি মুরারিবাবুর হাতছাড়া হয়ে গেল, আর সেই থেকে তার মাথাও খারাপ হয়ে গেল। মামলা এমন জিনিস, বেশিদিন চালিয়ে গেলে মানুষের ঘিলু ফেঁসে যায়। ফলে দেউড়িটা নাকি দেখবার মতো জিনিস। এত উঁচু দেউড়ি সচরাচর দেখা যায় না। মাধবলালের ধারণা, পাশের শিবমন্দিরটার চেয়ে দেউড়িটা উঁচু করে তৈরির জন্যই শিবের কোপ পড়েছিল ধাড়াবাবুদের বংশের ওপর। শিবের চেলারা দেউড়ির মাথায় সারা রাত নাচত, দমাদ্দম লাথি মারত, দাপাদাপি করে বেড়াত। কাজেই যত শক্তই হোক, ওটা ধসে পড়ার কারণ ছিল। তার চেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, পাথরে কখনও উদ্ভিদ গজায়? শিউজির শাপে পাথর ফেটে তাও গজিয়েছিল। তবে মুরারিবাবুর মাথা খারাপ হওয়ার মূল কারণ সম্পর্কে মাধবলাল নিশ্চিত নয়। তার শোনা কথা, মুরারিবাবু ভাঙা দেউড়ির মাথায় নাকি বিকট চেহারার কোনো শিবের চেলার দর্শন পেয়েই আতঙ্কে পাগলা হয়ে যান।…

 

কর্নেল এবং আমার জন্য উত্তর-পূর্ব কোণে একটা বড় ডাবল বেডরুম তৈরি রাখা হয়েছে। উত্তরের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, “এখান থেকে জলাধার দেখলে তোমারও মাথা খারাপ হয়ে যাবে, ডার্লিং! তবে আতঙ্কে নয়, আনন্দে! কী অপূর্ব! কী অলৌকিক সৌন্দর্য। শুক্লপক্ষের জ্যোৎস্নায় এলে তুমি সত্যিই আকাশের পরিদের ঝুঁকে-ঝকে নেমে স্নান করতে দেখতে। কৃষ্ণপক্ষে জ্যোৎস্নাটা তত খোলতাই নয়।”

 

বললুম, “খোলা জানালা দিয়ে তিনকড়িচন্দ্ৰ ছোরা না ছোঁড়ে!”

 

তুমি বড় বেরসিক, জয়ন্ত!” কর্নেল হাসলেন। “তবে নিশ্চিন্ত থাকতে পারো। মাধবলালকে যতই রোগাভোগা দেখাক, ওকে নিরীহ ভেবো না। ও এমন মানুষ, যার ঘুমন্ত অবস্থায় কান দুটো দিব্যি জেগে থাকে।”

 

দরজার পরদার বাইরে থেকে মাধবলালের সাড়া পাওয়া গেল তখনই। “সব ঠিক হ্যায়, সাব?”

 

কর্নেল বললেন, “ঠিক হ্যায়। তুম শো যাও।”

 

বলে দরজা এঁটে দিয়ে এলেন। তারপর জানালার ধারে চেয়ার টেনে বসে চুরুট টানতে থাকলেন। একটু হিমের ছোঁয়া এপ্রিলেও। ফ্যানের হাওয়া এবং পেছনের জলাধারও তার কারণ। চাদর-মুড়ি দিলুম। কর্নেল এয়ারকন্ডিশন্ড রুম একেবারে পছন্দ করেন না। প্রকৃতিবাদীর কারবার! এয়ারকন্ডিশন্ড রুম হলে অন্তত তিনকড়িচন্দ্রের পরোয়া না করে আরামে ঘুমনো যেত।

 

এপাশ-ওপাশ করছিলুম। মশারি নেই, কারণ মশা নেই। কিন্তু মশারি থাকলে খানিকটা নিশ্চিন্ত হওয়া যেত, যদিও ছোরার মশারি ছুঁড়ে ঢোকার ক্ষমতা আছে। শুধু একটা সুবিধে আমার বিছানার পশ্চিমে নিরেট দেওয়াল এবং দক্ষিণে বাথরুম। কর্নেলের বিছানার পাশেই পুবের জানালা, মাথার দিকে উত্তরের জানালা, দুটোই ভোলা। ফ্যানটা দুই বিছানার মাঝামাঝি আস্তে ঘুরছে। ছোরা ছুঁড়লে কর্নেলের বিপদের চান্স নিরানব্বই শতাংশ। দৈবাৎ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ছিটকে এলে তবেই আমার বিপদ এবং সেটার চান্স এক শতাংশ মাত্র।

 

নাঃ, এই হিসেব করেও আতঙ্ক কাটছে না। ঘুমও আসছে না। একটু পরে দেখি, কর্নেল কোনার দিকের টেবিলের কাছে গেলেন। টেবিলবাতি জ্বেলে সেই চাকতিটা বের করলেন। তারপর নোটবইতে কী সব লিখতে শুরু করলেন। ঘড়ির রেডিয়াম-দেওয়া কাটা তিনটের ঘরে, যাকে বলে কাঁটায়-কাঁটায় রাত তিনটে।

 

বিরক্ত হয়ে ইচ্ছে করেই সশব্দে পাশ ফিরলুম। কর্নেল বললেন, “ঘুমের ওষুধ হিসাবে ভেড়ার পাল কল্পনা করে ভেড়া গোনার ব্যবস্থা আছে। এক্ষেত্রে তুমি তিন-শিংওয়ালা ছাগলটিকে কল্পনা করো। ঘুম এসে যাবে। কল্পনা করো, ওটা দৌড়চ্ছে, তুমিও তাকে ধরার জন্য দৌড়চ্ছ এবং ধরতে পারলেই বলি দেবে শিবের মন্দিরে। নাও, স্টার্ট!”

 

রাগ করে বললুম, “আমি কি বাচ্চাছেলে যে…”

 

কর্নেল আমার কথার ওপর বললেন, “কী বললে? কী বললে?”

 

“আমি বাচ্চা ছেলে নই যে এসব বলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে ঘুম পাড়াবেন!”

 

“মাই গুডনেস!” কর্নেল ঘুরে বসলেন আমার দিকে। চোখ দুটো উজ্জ্বল। “কী হল?”

 

কর্নেল চুপ। একটু পরে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি চোখ বুজে ঘুমোতে চেষ্টা করলুম এবং সত্যিই একটি তিন-শিংওয়ালা ছাগল কল্পনা করলুম, যেটা দৌড়চ্ছে। মনে-মনে তার পেছনে দৌড়তে থাকলুম। দৌড়তে দৌড়তে দৌড়তে…

 

“চায়, ছোটাসাব!” তিন-শিংওয়ালা ছাগলটা বলল। “সাব! চায় পিজিয়ে।”

 

চোখ খুলে দেখি তিন-শিংওয়ালা ছাগল নয়, মাধবলাল। ঘরে উজ্জ্বল রোদ্দুরের ছটা ঝলমল করছে। সে বিনীতভাবে বলল, “বড়াসাব বোলকে গেয়া, সাড়ে সাত বাজকো ছোটাসাবকো বেড-টি দেনা।”

 

উঠে বসে চায়ের কাপ-প্লেট নিলুম। জিজ্ঞেস করলুম, “কর্নেলসাব কখন বেরিয়েছেন?”

 

“ছয় বাজকে।” মাধবলাল খিকখিক করে হাসল। “ফারাঙ্গা পাকাড়নে গেয়া, মালুম হোতা। কর্নিলসার ইস দফে জরুর কম-সে-কম একঠো তো পাকড়ায়েগা!…তো হামি বলল, জেরাসা বড়া হোনা চাহিয়ে। কর্নিলসাব বলল, হাঁ, বড়া নেট লেকে আয়া।”

 

‘ফাটরাঙ্গা’ জিনিসটা যে প্রজাপতি, বুঝে গেছি। গরম চা খেয়ে চাঙ্গা হওয়া গেল। তারপর বাথরুম সেরে এসে দেখি, প্রকৃতিবিদ গেটে ঢুকছেন। ঢুকে ফুলে-ফুলে সাজানো সুদৃশ্য লনের ওপর দিয়ে উত্তরের নিচু পাঁচিলের কাছে গেলেন। চোখে বাইনোকুলার স্থাপন করলেন। উত্তরের জানালায় গিয়ে জলাধারটি দেখতে পেলুম। অবিকল চিল্কা হ্রদের মতো। প্রচুর পাখিও দেখা যাচ্ছিল। এদিকে-ওদিকে ছোট্ট দ্বীপের মতো টিলা জঙ্গলে ঢাকা।

 

ভালো করে দেখার জন্য বেরিয়ে গিয়ে বারান্দায় বসলুম। কর্নেলের পাখি দেখা শেষ হল। ঘুরে বারান্দার দিকে আসতে-আসতে সম্ভাষণ করলেন, “গুড মর্নিং, ডার্লিং! আশা করি, ছাগলটি ধরতে পারোনি?”

 

হাসতে-হাসতে বললুম, “আশা করি আপনিও ফাটরাঙ্গা ধরতে পারেননি?”

 

কর্নেল বিমর্ষভাবে বললেন, “নাঃ। বেজায় ধূর্ত।…কী আশ্চর্য!”

 

হঠাৎ তিনি ছড়ির ডগায় আটকানো গুটিয়ে-থাকা সূক্ষ্ম তন্তুর নেটটি ছাতার মতো বোতাম টিপে খুলে দিলেন। তারপর পা টিপে টিপে এগিয়ে গেলেন। একটা ফুলের ঝোঁপের মাথায় প্রজাপতিটাকে এবার দেখতে পেলুম। রোদ্দুরে ডানা ঝিলমিল করছে। কিন্তু তারপরই ওটা উড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে ডানায় অবিকল সাতটা রঙ রামধনুর মতো স্পষ্ট দেখতে পেলুম। কর্নেল বললেন, “যাঃ! একটুর জন্য…”।

 

প্রজাপতিটা নিচু পাঁচিল পেরিয়ে উধাও হয়ে গেল। কর্নেল বিষণ্ণ দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকার পর চলে এলেন। বারান্দায় উঠে বললেন, “যাই হোক, নেটে ধরতে না পারলেও ক্যামেরায় ধরেছি। এটাই একটা সান্ত্বনা। তবে ঠিক-ঠিক রংগুলো আসবে কি না কে জানে।”

 

বললুম, “তিনকড়িচন্দ্রের দেখা পাননি তো?”

 

কর্নেল হাসলেন। “পেয়েছি। নদীর ব্রিজ থেকে বাইনোকুলারে ওপারের ধ্বংসাবশেষ দেখছিলুম। এক মিনিট ধরে দেখলুম, তিনকড়িবাবু ব্যস্তভাবে এদিক-ওদিক করে বেড়াচ্ছেন। ওদিকেই সূর্য। তাই সরাসরি লেন্সে রোদ্দুর পড়ছিল। বাকিটা দেখতে পেলুম না।”

 

কর্নেল কথাগুলো এমন নির্বিকার মুখে বললেন, যেন গতরাতে ট্রেনে আসতে-আসতে তিনকড়িচন্দ্রের সঙ্গে খুব ভাব হয়ে গেছে। হিরো-ভিলেন ফাইটটা নেহাত ফিল্মি ঘটনা, অর্থাৎ স্রেফ অভিনয়! স্বভাবত আমার মুখে রাগ ফুটে বেরিয়েছিল। বারান্দার সাদা রং মাখানো বেতের টেবিলে মাধবলাল ট্রে-তে কফির পট, পেয়ালা রেখে গেল। বুঝলুম, সে কর্নেলের রীতি-নীতি এবং পছন্দ-অপছন্দের সঙ্গে বেশ পরিচিত।

 

আমার মনের ভাব ধুরন্ধর বৃদ্ধের চোখ এড়ায়নি। বললেন, “চলন্ত ট্রেন, তা যত আস্তে চলুক, বেয়াড়া যাত্রীদের পছন্দ করে না। তা ছাড়া নিয়ম হল, গতিশীল যানবাহন থেকে নিরাপদে নামতে হলে যেদিকে গতি, সেইদিকে ঝাঁপ দিতে হয়। উলটো দিকে ঝাঁপ দিলে হাড়গোড় ভাঙা অনিবার্য। সোজাসুজি ঝাঁপ দিলে তার চান্স সামান্য কমে। আমাদের তিনকড়িবাবু এই প্রাকৃতিক নিয়ম জানেন। তিনি গতির দিকেই ঝাঁপ দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই যে বললুম, চলন্ত ট্রেন বেয়াড়া যাত্রীদের পছন্দ করে না। বেচারা একটু ল্যাংচাচ্ছেন। হাতে ছড়ি নিতে হয়েছে। পক্ষান্তরে, তোমার অবস্থা বিবেচনা করো, জয়ন্ত! তুমি অমন ওজনদার মানুষের ধাক্কা সামলে দিব্যি হাঁটাচলা করতে পারছ। একটুও ল্যাংচাচ্ছ না।”

 

বলার ভঙ্গিতে রাগ পড়ে গেল। বললুম, “ছোরার ঘা কিন্তু আপনিই খেতেন। যাকে বেচারা বলে সমবেদনা জানাচ্ছেন, তার ছোরাটা এখন একবার চাক্ষুষ করলে আমার মতোই রেগে যাবেন।”

 

কর্নেল জ্যাকেটের ভেতর-পকেট থেকে যে-জিনিসটা বের করলেন, সেটা ছোরার বাঁট বলে মনে হল। অবাক হয়ে বললুম, “বাঁট আছে, ফলা নেই! ভেঙে গেল কী করে?”

 

কর্নেল বাঁটের একটা জায়গায় চাপ দিতেই ছ-সাত ইঞ্চি ঝকঝকে ফলা গোখরো সাপের ফণার মতো বেরিয়ে পড়ল। বললেন, “ম্প্রিংওয়ালা ছোরা। বিদেশি জিনিস। তবে আফ্রিকার নয়, এবং বুগান্ডা মিউজিয়ামের ডঃ হোয়াহুলা হোটিটি উপহার দেননি, এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। একটু ভিজে দেখাচ্ছে, লক্ষ করো। আবছা সবুজে রঙের মলম মনে হচ্ছে না? ওটা সাপের বিষ থেকে তৈরি। তার মানে, একটু খোঁচা খেলেই ঘা বিষিয়ে যাবে। এমনকি, ক্রমশ রক্ত বিষিয়ে মারা পড়তেও পারো।”

 

ভয়ে বুক ধড়াস করে উঠল। বললুম, “তবু শয়তানটাকে আপনি বেচারা বলছেন!”

 

কর্নেল আবার স্প্রিংয়ের বোতাম টিপে ফলা ঢুকিয়ে মারাত্মক জিনিসটা পকেটে চালান করে দিলেন। বললেন, “এটা আমার জাদুঘরের জন্য একটা চমৎকার স্যুভেনিরও বটে। বছর-দশেক আগে ঠিক এরকম একটি ছোরার সান্নিধ্যে এসেছিলুম, কোকো আইল্যান্ডে। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানকার পুলিশকর্তা সেটি হাতিয়ে নেন। একই ছোরা, একই কোম্পানির তৈরি এবং একই বিষের মলম। তিনকড়িবাবু আমাকে ভাবিয়ে তুলেছেন, জয়ন্ত!”

 

আমরা কফি খেতে খেতে শের আলি জিপ নিয়ে এসে স্যালুট ঠুকল। বলল, “আফসোস কা বাত, কর্নিলসাব! ডি. ই. সাব আসতে পারল না। বেটি কি বুখার বহত বাঢ়ল। তো হাথিয়াগড় মিশনারি হসপিট্যালমে চলিয়ে গেলেন। উনি মাফি মাঙ্গা আপসে।”….

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *