ব্রিফকেস রহস্য (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

ছয়

 

কর্নেলকে দেখে বারীন্দ্রনাথ বললেন, আপনার ব্রেকফাস্টের দেরি হয়ে গেল। ভাবছিলাম সেবারকার মত কোন পাখির পেছনে পাঁচিল ডিঙিয়ে উধাও হলেন নাকি! কিংবা একঝক প্রজাপতির সামনে ধ্যানস্থ!

 

বারীন্দ্রনাথ হেসে উঠলেন। কর্নেল বললেন, নীচে পুপু ওত পেতে ছিল। প্রচুর খাইয়ে দিল আতঙ্কে ওর দিশেহারা অবস্থা। সৌম্যকে ফিল্মওয়ালাদের হাত থেকে যেন বাঁচাই। ওকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, সিনেমার পর্দায় যারা খুনোখুনি করে, বাস্তবে তারা নিরীহ ভীতু মানুষ। পুপু মানতে চায় না। বলে কী, এই তো চোখের সামনে সদ্য খুনোখুনি হল।

 

টেলিফোন বাজল। বারীন্দ্রনাথ হুইলচেয়ার গড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন। জনি এখন পোর্টিকোর খোলা ছাদে রেলিংয়ে বাঁধা আছে। মুখ ঘুরিয়ে ধমক দিল।

 

কর্নেল টেবিলে টুপি রেখে চুরুট ধরালেন। তারপর বাইনোকুলারে আউটহাউস দেখতে থাকলেন। একই দৃশ্য। এখনও কী নীতা সোম এবং তার প্রোমোটার প্রতুলবাবু ঝিলের জলে ভেসে আছেন? এতক্ষণে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা একটু অস্বাভাবিক যেন বা।

 

বারীন্দ্রনাথ বেরিয়ে এলেন। মুখে উত্তেজনার ছাপ। বললেন, ও সি নরেশবাবুর ফোন। মর্গের ফাইন্যান্ রিপোর্ট অন্য কথা বলছে। ভিকটিমের মাথার পেছনে রিভরের নল ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে। গুলিটা হাড়ের খাঁজে আটকে ছিল। গুলি করার পর জ্বালানি কাঠ দিয়ে মাথার পেছনটা থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। সদরে সি আই ডি-তে যোগাযোগ করা হচ্ছে। বলে হাঁক দিলেন, রুক্মিণী!

 

দক্ষিণের বারান্দা থেকে রুক্মিণী ছুটে এল। জি বড়োসাব!

 

দ্বারিককে ডাক। শিগগির আসে যেন!

 

রুক্মিণী চলে গেল। কর্নেল বললেন, সৌম্য বলছিল, ডাইরেক্টর এবং রমেশ ভার্মা নামে এক ভদ্রলোক ভোরে বেরিয়ে গেছেন। তারা কিন্তু এখনও ফেরেননি!

 

পুলিস ওঁদের যেতে দিচ্ছিল না। অবিনাশবাবু এসে আমাকে অনুরোধ করলেন, ওঁর টিমের ম্যানেজার বটুকবাবু গোবেচারা মানুষ। একটুখানি ড্রিঙ্ক করলেই নাকি মাতাল হয়ে যান। উনি থানায় গিয়ে ও সি-কে বুঝিয়ে বলবেন। তো আমি এস আই বক্সিবাবুকে ডেকে বলে দিলাম। আফটার অল, অবিনাশবাবু একজন বিখ্যাত ফিল্ম ডাইরেক্টর।

 

কর্নেল দাড়ি থেকে চুরুটের ছাই ঝেড়ে বললেন, সৌম্য একটা পয়েন্ট তুলেছে। রমেশ ভার্মা ওয়েস্টে ওরিয়েন্টাল ফিল্ম মার্কেটে দালালি করেন। তিনি লোকেশনে কেন?

 

পয়েন্টটা অরিত্রের কাছে কাল আমিও তুলেছিলাম। যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা পাইনি।

 

দ্বারিক এল। বারীন্দ্রনাথ বললেন, রামবাহাদুরকে গিয়ে বল, গেটে যেন তালা আটকে দেয়। ভেতর থেকে কেউ যেন বেরুতে না পারে। থানা থেকে আরও পুলিস আসছে। তারা এলে কাকে বেরুতে দেবে বা না দেবে, তারা বুঝবে। আর শোন, নীচে কোথায় বসিবাবু আছে, তাকে একটু লক্ষ্য রাখতে বলবি। সাব-ইন্সপেক্টর বসিবাবুকে তুই তো ভাল চিনিস। তোর দেশের লোক বলছিলি।

 

আজ্ঞে! বলে মূর্তিমান দৈত্যটি চলে গেল।

 

নীচে গাড়ির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। একটু পরে গাড়িটা দেখা গেল। বারীন্দ্রনাথ আস্তে বললেন, অবিনাশবাবুর গাড়ি। বলছিলাম না, বিখ্যাত ফিল্ম ডাইরেক্টর? কেরিয়ার নষ্ট হোক, এমন কিছু করার মানুষ নন।

 

গাড়িটা আউটহাউসের সামনে গিয়ে থামল। কর্নেল ফিল্ম ম্যাগাজিনটার পাতা উল্টে বললেন, সৌম্য এটা নিজে থেকে আপনাকে দেয়নি। কেউ আপনাকে নীতা সোমের ছবি দেখানোর জন্য আগ্রহী ছিল। সে সৌম্যকে কাজে লাগিয়েছিল।

 

বলেন কী!

 

এই পত্রিকার সম্পাদক লীনা বসু। প্রকাশক প্রতুল বসু। প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা। কর্নেল হাসলেন। নীতা সোমকে জনৈক প্রতুলবাবু নাকি লাইমলাইটে এনেছেন। ঝিলের জলে নীতার সঙ্গে তাকে রোয়িং করতে দেখলাম। কিন্তু সৌম্য তাকে চেনে না। তার অজান্তে বোট ব্যবহার করার জন্য সৌম্য তার ওপর খাপ্পা। যাই হোক, এ একটা ওয়েল-প্ল্যানড গেম। সৌম্যের ফিল্মে নামার লোভ এবং সরলতাকে এক্সপ্লয়েট করা হয়েছে।

 

বারীন্দ্রনাথ সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়ার রিং বানাতে থাকলেন। দৃষ্টি রিংয়ের দিকে। কিন্তু হাওয়া এসে দুষ্টুমি করে রিংগুলো ভাঙচুর করছিল।

 

মিঃ রায়চৌধুরী।

 

বলুন।

 

নাও দ্য ভাইটাল কোয়েশ্চেন। এস. কে. রায়ের ব্রিফকেসে নিলামে কেনা দামি ঐতিহাসিক গয়নার কথা সম্প্রতি কেউ বা কারা জেনে গেছে। বাট হাউ? আপনি কি কাকেও

 

নো, নো! নেভার! বারীন্দ্রনাথ জোরে মাথা দোলালেন। পুপুকেও বলিনি। কারণ তার পেটে কথা থাকে না। জানি শুধু আমি এবং আপনি।

 

আপনাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম, বিজ্ঞাপন দেওয়া ঠিক হচ্ছে না। বরং কাস্টমস্ ডিপার্টমেন্টের হাতে ব্রিফকেসটা তুলে দিন। ঝুঁকি নেবেন না।

 

মাই গুডনেস্! বারীন্দ্রনাথ সোজা হয়ে বসলেন। গত জুলাই মাসে কাস্টমসে রেজিস্টার্ড এ ডি পোস্টে ডিটেল্স জানিয়ে একটা চিঠি লিখেছিলাম। অ্যানলেজমেন্ট রিসিটটা ফিরে এল। কিন্তু কোনও জবাব নেই। অগাস্টের গোড়ায় আবার একটা রিমাইন্ডার পাঠিয়েছিলাম। রেজিস্টার্ড পোস্টে। নো রিপ্লাই। আপনাদের দেখাচ্ছি।

 

বারীন্দ্রনাথ ব্যস্তভাবে হুইলচেয়ার গড়িয়ে ঘরে ঢুকলেন। কর্নেল বাইনোকুলারে দেখছিলেন, সৌম্যের সঙ্গে নীতা সোম আর রাত্রি সেন আউটহাউস থেকে ফিরে আসছে। বারীন্দ্রনাথ বেরিয়ে এসে বললেন, এই দেখুন। চণ্ডীতলা পোস্ট অফিসের দুটো রিসিট। আর এইটে অ্যাকনলেজমেন্ট রিসিট।

 

বাইনোকুলার নামিয়ে কর্নেল সেগুলো দেখলেন। তারপর বললেন, কাকে পোস্ট করতে পাঠিয়েছিলেন?

 

আমার পি এ অক্ষয়কে। তাকে আপনি দেখেছেন। লোকসভায় আমার টার্ম শেষ হওয়ার পরও তাকে ছাড়িয়ে দিইনি। অনেক খুচরো বৈষয়িক কাজকর্মের জন্য একজন লোক আমার দরকার ছিল।

 

অক্ষয়বাবু কি এখনও আছেন?

 

না। সেপ্টেম্বরে চলে গেছে। কোথায় ভাল মাইনেতে কাজ পেয়েছে বলল। আমি আপত্তি করিনি। দেখলাম সুদক্ষিণা আছে। অসুবিধে হবে না।

 

কর্নেল রিসিটগুলো ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, কাস্টমস ডিপার্টমেন্টের ঠিকানায় একটা অন্য খামে ভরে একটা সাদা কাগজ পাঠিয়ে দিলেও পোস্ট অফিস আপনাকে রিসিট দেবে। কাস্টমসের ছাপ দেওয়া অ্যাকনলেজমেন্ট রিসিটও ফিরে আসবে।

 

বারীন্দ্রনাথ চমকে উঠেছিলেন। আস্তে বললেন, নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড। কিন্তু অক্ষয়ের এত সাহস হবে?

 

হয়েছে। সে আপনার পি. এ. ছিল। এতদিন পরে কাস্টমসে আপনার চিঠি লেখায় তার কৌতূহল হতেই পারে। কর্নেল চোখ বুজে হেলান দিয়ে ফের বললেন, কিন্তু অক্ষয়বাবু ঊর্মির ফোটোগ্রাফ

 

বারীন্দ্রনাথ গম্ভীর মুখে বললেন, ছেড়ে দিন। ওটা আলাদা ব্যাপার। ঈশ্বরের ইচ্ছায় এতদিনে যেভাবে হোক ঊর্মিকে যখন পেয়েছি, তখন তার হাতে তার বাবার ব্রিফকেস তুলে দিলেই আমার শান্তি।

 

কর্নেল হাসলেন। কিন্তু ঊর্মিকে আপনি পাননি মিঃ রায়চৌধুরী।

 

পাইনি?

 

নাহ। ইটস্ ও ওয়েল্‌-প্ল্যান্ড গেম। আপনি আসলে অকারণ একটা অপরাধবোধে ভুগছেন। তাই টাইম-ফ্যাক্টর আপনার মাথায় নেই। ব্রিফকেসের ফোটোটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট।

 

সো হোয়াট?

 

ফোটোগ্রাফটা পুরনো। আর এই পত্রিকার ছবিটা এ মাসেই তুলে ছাপানো হয়েছে।

 

আমি মুখোমুখি ওকে খুঁটিয়ে দেখেছি।

 

চিনা লণ্ঠনের আলোয় দেখেছেন। মেকআপ তার মুখ। অ্যান্ড শি ইজ অ্যান অ্যাকট্রেস। কর্নেল চাপা স্বরে ফের বললেন, নীতা সোম দিনের আলোয় আপনার মুখোমুখি হবে না।

 

আমি ওকে ডাকছি। রুক্মিণী!

 

তখনই সারা এল। জি বড়াসাব!

 

নীচে গিয়ে সৌম্যকে বল, নীতাকে নিয়ে আসবে। নীতা নামটা মনে থাকবে?

 

জি বড়াসাব! উনিই তো সেনিমার হিরোইন আছে। রুক্মিণী মুচকি হেসে চলে গেল।

 

একটু পরে সৌম্য ওল। তার মুখ বেজায় গম্ভীর। বলল, নীতা রোয়িং করে টায়ার্ড। তাছাড়া অবিনাশদা এসে ওকে খুব বকাবকি করেছেন।

 

কর্নেল বললেন, বসো সৌম্য! বলো, এতক্ষণে আউটহাউসে কী সব হল?

 

সৌম্য হাসল। তারপর বলল, কী হবে? অবিনাশদা ফিরলেন। রমেশ ভার্মা নাকি চণ্ডীতলা বাজারে সিগারেট কিনতে গিয়ে উধাও হয়েছে। আপনি তখন জিজ্ঞেস করছিলেন, কে আমাকে পত্রিকাটা মামাবাবুকে দিতে বলেছিল। এখন আমার মনে হচ্ছে, ওই লোকটাই বলে থাকবে।

 

কেন মনে হচ্ছে?

 

পত্রিকাটা ওর হাতে একবার দেখেছিলাম। গুটানো অবস্থায় মুঠোয় ধরে গাড়ি থেকে নেমেছিল। এই তো। এখনও দেখে বোঝা যাচ্ছে। তাই না?

 

কর্নেল একটু হেসে বললেন, তোমার বোটটা কি তুলে রেখে এলে?

 

নীতার প্রোমোটার প্রতুল বোস নীতাকে নামিয়ে দিয়ে এখনও রোয়িং করছে। অবিনাশদা ওকে খাতির করেন। বললেন, ওকে চটিও না। কী করব? অবিনাশদা না করা যায় না।

 

কর্নেল বাইনোকুলার তুলে ঝিলের দিকটা দেখতে দেখতে বললেন, সৌম্য। তোমার বোট ঝিলের ওপারে চলে গেছে। প্রতুল বোসকে দেখতে পাচ্ছি না। এখনই গিয়ে পুলিসের এস আই বসিবাবুকে খবর দাও। রমেশ ভার্মার মত প্রতুল বোসও মনে হচ্ছে উধাও হয়ে গেছেন।

 

সৌম্য তখনই ছুটে গেল। জনি গরগর করতে থাকল।

 

বারীন্দ্রনাথ গুম হয়ে বসে ছিলেন। গলার ভেতর বললেন, আই ওয়াজ সো ফুলিশ! ঊর্মির ফোটোগ্রাফটা নষ্ট হয়ে যাবে ভেবে গত মাসে অক্ষয়কে দিয়ে তিনটে কপি করিয়ে রেখেছিলাম। কলকাতার কোন স্টুডিয়ো থেকে কপি করে এনেছিল অক্ষয়। ও জিজ্ঞেস করেছিল। আমি ওকে শুধু বলেছিলাম, প্লেনক্র্যাশের পর আমার যে সহযাত্রী তুষার খাদে তলিয়ে যান, এটা তাঁর ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ। অক্ষয়ের কাছে অন্তত এটুকু গোপন করার অর্থ হয় না।

 

কর্নেল বললেন, কাস্টমসকে লেখা আপনার গোপন চিঠি এবং এস কে রায়ের ফ্যামিলি ফোটো। অক্ষয়বাবু চান্সটা ছাড়তে চাননি। কিন্তু তাঁর দুর্বুদ্ধি। যাদের সাহায্য নিতে গেলেন, তারাই তাকে ল্যাং মেরেছে।

 

নীতা সোমকে তা হলে ওই বজ্জাতটাই ফোনে গ্রেটন করেছিল।

 

আবার কে? কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। অবিনাশবাবুর সঙ্গে আলাপ করে আসি।

 

বারীন্দ্রনাথ রুষ্ট মুখে বললেন, নীতা সোমকে মিসপার্সোনিফিকেশনের দায়ে ধরিয়ে দেব।

 

মিঃ রায়চৌধুরী! সৌম্যের মত নীতা এই দাবার চালে একটা খুঁটি মাত্র। কেরিয়ারের স্বার্থে সে ঊর্মির রোলে অভিনয় করেছে মাত্র। আফটার অল সে একজন অভিনেত্রী। তার কথা ভুলে যান। তাছাড়া মিঃ রায়ের ব্রিফকেস পুলিসের হাতে যাক, এটা আমি উচিত মনে করি না। চিন্তা করুন। চীনের প্রাচীন মি রাজবংশের এক রাজকুমারীর জড়োয়া নেকলেস। এই অলঙ্কারের একটা অসাধারণ ঐতিহাসিক মর্যাদা আছে। আপাতত প্লিজ কিপ ইট ইন ইওর কাস্টডি। যথাসময়ে আমি বলব এবার আপনাকে কী করা উচিত।

 

বারীন্দ্রনাথ আবার সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়ার রিংগুলো নিয়ে আবার হাওয়ার দুষ্টুমি শুরু হল। কিছুক্ষণ পরে লক্ষ্য করলেন কর্নেল নীচের রাস্তায় আউটহাউসের দিকে হেঁটে যেতে যেতে হঠাৎ বাইনোকুলার তুলে থমকে দাঁড়ালেন। তারপর ডানদিকে বাগানের ভেতর অদৃশ্য হলেন। ওঁর এই অদ্ভুত বাতিক।

 

এই সময় জনি মুখ ঘুরিয়ে গরগর করতে থাকল। বারীন্দ্রনাথ ঘুরে দেখলেন, নীতা সোম আসছে। তার পেছনে ব্ল্যাক ক্যাট। নীতা এসে খুব আস্তে বলল, আমি ক্ষমা চাইতে এসেছি।

 

বারীন্দ্রনাথ শান্তভাবে বললেন, বসো।…

 

নীতা সোম বসল না। সে বারীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ল এবং হু হু করে কেঁদে ফেলল। বিশ্বাস করুন! আপনাকে আমি প্রতারণা করতে চাইনি। আমি জানতাম না, ব্রিফকেসের মধ্যে কী আছে। আমি শুধু কেরিয়ারের স্বার্থে প্রতুল বোসের কথায় রাজি হয়েছিলাম।

 

বারীন্দ্র একটু হাসলেন। তুমি দক্ষ অভিনেত্রী!

 

নীতা কান্নাজড়ানো গলায় বলল, আমি অভিনয় করছি না! আপনি যখন আমাকে ঊর্মির কথা বলছিলেন, তখন আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। ঊর্মির জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের এত মিল! আমার বাবাও অ্যাকসিডেন্টে মারা যান। আমার মা এক লোফারের সঙ্গে চলে গিয়েছিল আমাকে ফেলে। তারপর মা সুইসাইড করেছিল। আমার বিধবা মাসি আমাকে আশ্রয় দেন। তারপর

 

সে কান্না সামলে চোখ মুছল। বারীন্দ্রনাথ বললেন, ওঠ। সামনে বসে কথা বলো!

 

নীতা উঠে দাঁড়ালে রাত্রি তাকে বারীন্দ্রনাথের মুখোমুখি একটা চেয়ারে জোর করে বসিয়ে দিল। সে ক্ষুব্ধভাবে বলল, নীতাকে আমি স্কুলজীবন থেকে চিনি। ও আমার বন্ধু। অথচ এখানে আসবার সময় আসল কথাটা খুলে বলেনি। শুধু বলেছিল, উড়োফোনে কে ওকে হুমকি দিয়েছে।

 

নীতা বলল, আমি তখনও কিছু জানতাম না। এখানে আসবার পর প্রতুলদা আমাকে গোপনে ঊর্মি নামে একটি মেয়ের কাহিনী বলল। তারপর বলল সৌম্যের মামাবাবুর কাছে একটা ব্রিফকেস আছে। ঊর্মি হয়ে আমাকে ওটা নিতে হবে। তারপর হঠাৎ যখন অরিত্র খুন হয়ে গেল, আমি ভয় পেলাম। প্রতুলদাকে বললাম, আমি ঊর্মি হয়ে ব্রিফকেস হাতাতে পারব না। তখন রোয়িংয়ের ছলে প্রতুলদা। আমাকে ঝিলের জলে নিয়ে গিয়ে হুমকি দিতে থাকল। কেরি সারের স্বার্থে প্রাণের ভয়ে আমি রাজি হলাম।

 

বারীন্দ্রনাথ বললেন, তুমি অক্ষয় সাঁতরা নামে কাকেও চেনো?

 

নীতা চমকে উঠে তাকাল। একটু পরে বলল, হ্যাঁ। স্টুডিয়োমহলে ওঁকে দেখেছিলাম। গায়ে পড়ে আমার সঙ্গে আলাপ করতে আসতেন। তারপর প্রতুলদার সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়েছিল। আমি দেখতাম, আমাকে লক্ষ্য করে দুজনে কী সব আলোচনা করছেন। এখানে আসবার কদিন আগে প্রতুলদার সঙ্গে খুব ঝগড়া হচ্ছিল। আমার সামনেই প্রতুলদা দুজন মস্তানটাইপ ছেলেকে ডেকে ওঁকে মারতে মারতে বের করে দিয়েছিলেন স্টুডিয়ো থেকে।

 

বারীন্দ্রনাথ আবার সিগারেট ধরিয়ে বললেন, হু। অক্ষয় একসময় ছিল আমার পি এ।

 

রাত্রি বলল, সত্যি বলতে কী, প্রতুল বোস যখন নীতাকে ঝিলের জলে রোয়িংয়ের ছলে নিয়ে গেছে, তখন আমার খুব ভয় করছিল। আমার মনে হচ্ছিল, নৌকো যেভাবে ইচ্ছে করে সে দোলাচ্ছে, নীতা যে-কোনো মুহূর্তে টাল খেয়ে জলে পড়ে যাবে।

 

জনি গরগর করে উঠল। সিঁড়ির মাথায় কর্নেলকে দেখা গেল। বারীন্দ্রনাথ ধোঁয়ার রিং বানিয়ে বললেন, পাখিটাকে নিশ্চয় হারিয়ে ফেলে ফিরে এলেন?

 

কর্নেল হাসলেন। নাহ্! আপনার প্রাক্তন পি এ অক্ষয়বাবু বাগানের দক্ষিণ-পশ্চিমকোণের ভাঙা পাঁচিলের কাছে গুঁড়ি মেরে বসে ছিলেন। বাইনোকুলারে তাকে দেখেই ছুটে গিয়েছিলাম।

 

বারীন্দ্রনাথ উত্তেজিতভাবে বললেন, তারপর? তারপর?

 

পেছন থেকে ঝাঁপ দিয়ে ভদ্রলোককে ধরে ফেললাম। আপনি তো জানেন, সামরিক জীবনে গেরিলা হামলার ট্রেনিং আমার রপ্ত। তখনও অবশ্য জানি না, উনি অক্ষয় সাঁতরা। প্রাণের দায়ে ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন, স্যারকে কিছু গোপন কথা বলার জন্য লুকিয়ে এসেছি। যাই হোক, ওঁকে পুলিশের জিম্মায় দিয়ে এলাম। কর্নেল বসে নীতা সোমের দিকে তাকালেন। তোমার ভিজে চোখ দেখে বুঝতে পারছি–হ্যাঁ, এই কান্নার জলটা গ্লিসারিন নয়। খাঁটি অঞ। তবে অবিনাশ ঘোষালের কাছে তোমার জীবনকাহিনী শুনে এলাম। ঊর্মির জীবনের সঙ্গেও তোমার মিল আছে। মিঃ রায়চৌধুরী! আপনাকে বলে গিয়েছিলাম, নীতা সৌম্যের মতোই দাবার চালে একটা খুঁটি মাত্র। চিয়ার আপ নীতা! অবিনাশ ঘোষাল তোমার পাশে। প্রতুল বোস ধরা পড়বে। তার জেল হবে। কিন্তু অবিনাশ ঘোষাল তোমাকে জিইয়ে তুলবেন। মিঃ রায়চৌধুরী! এবার কফিপার্টির আয়োজন করা হোক। অক্ষয় আমার আঙুলে কামড়ে দিয়েছে।

 

বারীন্দ্রনাথ এবং অন্যেরা হেসে উঠলেন। তারপর বারীন্দ্রনাথ হাঁকলেন, রুক্মিণী! কফি আনো।…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *