ব্রিফকেস রহস্য (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ 

 

সৌম্য গাড়ি নিয়ে চণ্ডীতলা বাসস্টপে অপেক্ষা করছিল। এক্সপ্রেস বাসটা এল পাঁচ মিনিট দেরিতে। সকাল নটায় পৌঁছুনোর কথা। বারীন্দ্রনাথ চেহারার বর্ণনা দিয়েছিলেন। তাই চিনে নিতে দেরি হল না। মাথায় টুপি, সাদা গোঁফ দাড়ি লম্বা-চওড়া মানুষ। গলায় বাইনোকুলার ও ক্যামেরা ঝুলছে। পিঠে আটকানো একটা ব্যাগ। ব্যাগের কোনা দিয়ে ছড়ি বা ছাতার বাঁটের মতো কী একটা উঁচিয়ে আছে। গায়ে ছাইরঙা ফুলহাতা শার্ট। পরনে ব্রিচেসের মতো আঁটো প্যান্ট এবং পায়ে হান্টিং বুট। হঠাৎ দেখলে সায়েব ট্যুরিস্ট মনে হয়।

 

সৌম্য এগিয়ে গিয়ে নমস্কার করে বলল, কর্নেল নীলাদ্রি সরকার? আমি সৌম্য ব্যানার্জি। বারীন্দ্রনাথ রায়চৌধুরী আমার মামা। কাল রাতে আমি আপনাকে ট্রাঙ্ককল করেছিলাম।

 

কর্নেল নিঃসঙ্কোচে তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, তোমার বাবা অশোক ব্যানার্জিকে আমি চিনতাম। তুম কী করো?

 

বাবার অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিটা চালিয়ে যাচ্ছি। সৌম্য গাড়ির দরজা খুলে দিল। মামাবাবুর কাছে আপনার পরিচয় পেলাম। আপনি ওঁর বাগানবাড়িতে নাকি অনেকবার এসেছেন। আমি জানতাম না।

 

কর্নেল গাড়িতে ঢুকে বললেন, তোমার মা-ও আমার পরিচিত।

 

সৌম্য স্টার্ট দিয়ে বলল, মা আপনার কথা বলছিল। আপনি নাকি ঘন্টায় ঘণ্টায় কফি খান।

 

এবং চুরুট। কর্নেল বাইনোকুলার তুলে বললেন, চণ্ডীতলার পর থেকে বসন্তপুর পর্যন্ত প্রায় কুড়ি কিলোমিটার লো ল্যান্ড! একসময় প্রায় সবটাই ছিল জলা আর-মার্শল্যান্ড। আর কত পাখি।

 

সৌম্য বলল, জায়গাটা আমার ভাল লাগে। কিন্তু হঠাৎ একটা সাংঘাতিক মিসহ্যাপ হয়ে গেল।

 

তুমি বলছিলে এ ভেরি মিসটিরিয়াস মার্ডার।

 

হ্যাঁ। অরিত্র সেন নামে আমার এক বন্ধু

 

গোড়া থেকে বলো। মেক ইট ব্রিফ। আর গাড়ি আস্তে চালাও। আমার পাখি দেখার সুবিধে হবে।

 

সৌম্য স্পিড কমাল। তারপর আগাগোড়া ঘটনার বিবরণ দিতে থাকল। কর্নেলের চোখে বাইনোকুলার। শুনছেন কি না বুঝতে পারছিল না সে।

 

বাগানবাড়ি প্রায় আধকিলোমিটার দূর থেকে হাইওয়ের চড়াই শুরু হয়েছে। সে থেমে গেলে কর্নেল বললেন, পুলিশ কি কাকেও অ্যারেস্ট করেছে?

 

অবিনাশদার টিমের ম্যানেজার বটুক দত্তকে ধরে নিয়ে গেছে। সৌম্য উত্তেজিতভাবে বলল, অ্যাবসার্ড। বটুকদা সন্ধ্যা থেকে ড্রাঙ্ক অবস্থায় থাকেন। পুলিস বলছে, মদ খেয়ে মারামারি। আউটহাউসের করিডরে রান্নার জন্য কিছু কাঠ ছিল। ঘাটের পাশে রক্তমাখা এক কাঠও পড়ে ছিল। কিন্তু বটুকদা জলি টাইপ মানুষ। আসলে উনিই প্রথমে ঘাটের দিকের দরজা খোলা দেখতে পান। পুলিশ এই পয়েন্টটাকে গুরুত্ব দিয়েছে।

 

ওঁরা কি এখনও আছেন?

 

ভোরে অবিনাশদা আর রমেশ ভার্মা চণ্ডীতলা গেছেন। আমার ধারণা হায়ার অথরিটির সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমি ওঁদের ফিরতে দেখিনি। অবিনাশদার খ্যাতি-প্রতিপত্তি আছে। রমেশ ভার্মাও নাকি বিগ গাই–অরিত্র আমাকে বলেছিল।

 

তোমার কী ধারণা?

 

কী ব্যাপারে?

 

আবাউট দিস ভেরি মিসটিরিয়াস মার্ডার?

 

আপনাকে বলেছিলাম। অরিত্র এই শ্যুটিংয়ের ব্যাপারে একটা গোপন কথা আমাকে পরে বলবে বলেছিল।

 

হু। কিন্তু বলার সুযোগ পেল না। ইজ ইট?

 

এখন আমার মনে হচ্ছে, অরিত্র কোনও সাংঘাতিক কথা জানতে পেরেছিল বলেই তার মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

 

বাট হু ক্যান ডু দ্যাট, ইউ থিঙ্ক?

 

বুঝতে পারছি না। মে বি, অরিত্র তার মার্ডারারকে ব্ল্যাকমেল করার জন্য চুপিচুপি ঘাটে ডেকেছিল। কিংবা তার মার্ডারারই রফা করার ছলে তাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। আসলেস্তখন কারেন্ট ছিল না। এমার্জেন্সি লাইটের সামনে বসে অবিনাশদা স্ক্রিপ্ট পড়ছিলেন–বটুকদা রাতের রান্নার ব্যবস্থা করতে বেরিয়েছিলেন। তখন ওঁর ড্রাঙ্ক অবস্থা।

 

এখন কি পুলিস আছে ওখানে?

 

একজন এস আই এবং জনাচার কনস্টেবল আছে।

 

হু। পুলিসভ্যান দেখতে পাচ্ছি।

 

অদ্ভুত ব্যাপার। পোর্টিকোর পাশে টেলিফোন বসের তার কেউ টেনে ছিঁড়ে রেখেছিল। রাতেই অবশ্য জোড়া দিয়েছি।

 

পুলিশ দেখেছিল কি?

 

হ্যাঁ। ও সি নরেশবাবু আমাকে জোড়া দিতে বলেছিলেন। এ থেকে আমার ধারণা, মার্ডারার অরিত্রর বডি কোথাও লুকিয়ে ফেলার জন্য সময় চেয়েছিল। আই মিন, মার্ডারের আগেই এটা করেছিল সে।

 

কেন তা করবে সে?

 

পুলিস আসতে দেরি হবে। প্রায় ছ কিলোমিটার দূরে থানায় খবর দিতে যেতে হবে এবং তারপর পুলিস সেখান থেকে আসবে। এক ঘণ্টার বেশি সময় লেগে যাবে। তা ছাড়া রাফ ওয়েদার।

 

বুদ্ধিমানের মতো কথা বলেছ।

 

সৌম্য প্রাইভেট রোডে গাড়ি ঢোকাল। দুধারে গভীর খাদ। জলে শালুক ফুটে আছে। রাস্তাটা এবড়োখেবড়ো এবং কাল বিকেলের বৃষ্টির জল এখনও গর্তে জমে আছে। সৌম্য সাবধানে ড্রাইভ করছিল। ফটকের কাছাকাছি পৌঁছে বলল, আর একটা ব্যাপার। ঘাটে রোয়িং বোটের দড়ির ফাঁস ঢিলে হয়ে ছিল। আমি পুলিসকে বলেছিলাম। ওঁরা বললেন, ঝোড়ো হাওয়া বইছিল। কাজেই ওটা কিছু নয়। কিন্তু আমি নিজে কাল ভোরে শক্ত করে বেঁধে রেখেছিলাম। আমার ধারণা, অরিত্রের বডি বোটে চাপিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল মার্ডারার। উত্তরে ঘন কাশবন আছে। পরে সময়মতো গিয়ে পুঁতে ফেলা যেত। ওখানে মাটিটা খুব নরম।

 

খোঁড়ার জন্য একটা কোদাল বা কিছু দরকার হত।

 

ঠিক এটাই বলতে চাইছিলাম। বাবুরাম মালীর কাছে উনুন খোঁড়ার জন্য বটুকদার লোকেরা একটা কোদাল চেয়ে নিয়েছিল। আজ ভোরে বাবুরাম বলল, কোদালটা খুঁজে পাওয়া গেল না।

 

রামবাহাদুর ফটক খুলে দিয়ে সেলাম ঠুকল। গাড়ি ভেতরে ঢোকার পর কর্নেল বললেন, কাল অবিনাশবাবু যখন আসেন, তখন ওঁর সঙ্গে কারা ছিলেন?

 

হিরোইন নীতা সোম, তার ফিল্মজার্নালিস্ট বন্ধু রাত্রি সেন, ক্যামেরাম্যান শুভময় ঘোষ আর এক ভদ্রলোক আমি চিনি না। ছবির প্রোডিউসারও হতে পারেন।

 

উত্তরে ঘুরে গাড়ি পুবের পোর্টিকোর তলায় পৌঁছুল। কর্নেল নেমে বাইনোকুলারে আউটহাউসটা দেখে নিয়ে বারান্দায় উঠলেন। সুদক্ষিণা হন্তদন্ত এসে প্রণাম করলেন। কর্নেল একটু হেসে বললেন, সৌম্য, তুমি কি জানো তোমার মায়ের নাম পুপু? তো পুপু। আগে কফি।

 

সৌম্য কর্নেলকে ওপরে নিয়ে গেল। সিঁড়ির মাথায় বারীন্দ্রনাথ হুইলচেয়ারে বসে অপেক্ষা করছিলেন। কর্নেল হাত বাড়িয়ে বললেন, মর্নিং মিঃ রায়চৌধুরী।

 

বারীন্দ্র দু হাতে ওঁর হাতটা চেপে ধরে বললেন, মর্নিং কর্নেল সরকার। বাধ্য হয়ে আপনাকে কষ্ট দিলাম। তবে আমি জানতাম, আপনি আসবেন। আসুন।

 

সৌম্য বলল, আমার থাকার কি দরকার আছে মামাবাবু?

 

না। রাত্রি সেন তোমাকে খুঁজছিল। তাকে একটু আগে আউটহাউসের দিকে যেতে দেখলাম।

 

সৌম্য চলে গেল। বারীন্দ্রনাথ কর্নেলকে পুবের বারান্দায় তার ঘরের সামনে নিয়ে গেলেন। দক্ষিণের বারান্দা থেকে জনির গরগর গর্জন শোনা যাচ্ছিল। রাবীন্দ্র বললেন, বারান্দায় বসা যাক। কাজ ভোরবেলা থেকে হাওয়া আছে। কদিন যা গুমোট গরম গেল। বসুন।

 

কর্নেল পিঠে আটকানো ব্যাগটা খুলে পায়ের কাছে রাখলেন। ক্যামেরা এবং বাইনোকুলার টেবিলে রেখে টুপি খুললেন। অভ্যাসমতো টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, ভেরি মিসটিরিয়াস মার্ডার ঘটিয়ে ফেলেছেন!

 

বারীন্দ্রনাথ আস্তে বললেন, দ্য ব্রিফকেস মার্ডার।

 

কর্নেল তাকালেন। একটু পরে বললেন, আই সি।

 

ঊর্মি রায়কে এতদিনে খুঁজে পেয়েছি। ইউ নো দ্য ট্র্যাজিক এপিসোড।

 

হু। বলুন।

 

তাকে এখানে আনা হয়েছে। তার নাম এখন নীতা সোম। ফিল্মস্টার।

 

আর ইউ সিওর?

 

অফকোর্স। তাকে ডেকে গোপনে সব কথা খুলে বলেছি। প্রথমে এড়িয়ে যেতে চাইছিল। তারপর ক্রমশ ভেঙে পড়ল।

 

সৌম্যের কাছে একটা ভার্সান শুনেছি। এবার আপনারটা শোনা যাক।

 

বারীন্দ্রনাথ সিগারেট ধরিয়ে শুরু করলেন। কিছুক্ষণ পরে রুক্মিণী কফি এবং কিছু স্ন্যাক্স আনল। বারীন্দ্রনাথ তাকে বললেন, দ্বারিককে বলেছি। উত্তর-পশ্চিম কোণের ঘরটা কর্নেলসায়েবের জন্য সাফ করে গুছিয়ে রাখে যেন। তুই গিয়ে দ্যাখ কী করছে।

 

কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, হু। বলুন।

 

বারীন্দ্রনাথ আবার শুরু করলেন। শেষে বললেন, একটু আগে থানায় ফোন করেছিলাম। ও সি নরেশ ভদ্র বললেন, মর্গের ফাইন্যাল রিপোর্ট এখনও পাননি। তবে তার ধারণা নাকি সঠিক। ডেডবডির স্টমাকে প্রচুর অ্যালকোহলিক সাবট্যান্স পাওয়া গেছে।

 

অরিত্র সেনের জিনিসপত্র কি পুলিস নিয়ে গেছে?

 

জানি না। পুলিসের সার্চ করার কথা। তবে কয়েকটা হুইস্কির বোতল আর গ্লাস নিয়ে গেছে শুনেছি। আপনি তো জানেন, পুলিস ঝপট একটা কেস সাজিয়ে ফেলে।

 

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে একটু হেসে বললেন, আপনি একজন এক্স এম পি। পুলিস একটু বেশি অ্যাকটিভ হতেই পারে। যাই হোক, এই ঘটনায় দুটো পয়েন্ট খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। প্রথমটা হল, নীতা সোমকে এখানে আসতে নিষেধ করে কেউ হুমকি দিয়েছিল। দ্বিতীয়টা হল, ফিল্ম ম্যাগাজিন।

 

সৌম্য আমাকে দিয়েছিল পত্রিকাটা।

 

আপনি কি ফিল্ম ম্যাগাজিন নিয়মিত পড়েন?

 

নাহ্। ওসব ট্র্যাশ পড়তে আমার ভাল লাগে না। কিন্তু সৌম্য বলল, এখানে যে হিরোইন আসছে, ওতে তার ছবি আছে। তাই একটু কৌতূহল হয়েছিল। দেখাচ্ছি। বলে বারীন্দ্রনাথ হুইলচেয়ার গাড়িয়ে তার ঘরে ঢুকলেন।

 

কর্নেল বাইনোকুলারে ঝিল দেখতে থাকলেন। উত্তরের বাউন্ডারি ওয়ালের নীচে ঝিলের খানিকটা অংশ দেখা যাচ্ছিল। একজন মধ্যবয়সি পুরুষ এবং যুবতী রোয়িং করছিল। বোটটা দ্রুত দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল। কর্নেল বললেন, আপনার বোটটা এখনও আছে দেখছি।

 

আছে। মাঝেমাঝে সৌম্য এসে রোয়িং করে।

 

সৌম্য নয়, অন্য কারা রোয়িং করছে দেখলাম।

 

তা হলে ফিল্মের লোকেরা। বারীন্দ্রনাথ বেরিয়ে এলেন। পত্রিকা এবং সেই ফোটোটা কর্নেলকে দিয়ে বললেন, মিলিয়ে দেখে নিন।

 

কর্নেল পকেট থেকে আতশ কাঁচ বের করে কিছুক্ষণ মনোযাগ দিয়ে দেখার পর বললেন, হ্যাঁ। মিল আছে। তবে–

 

তবে কী?

 

কর্নেল পত্রিকাটি খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে বললেন, আজকাল প্রিন্টিং টেকনোলজি দারুণ উন্নত। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কত উঁইফোড় পত্রিকা বেরুচ্ছে। এটা নতুন পত্রিকা। একেবারে প্রথম সংখ্যা। প্রচণ্ড উৎসাহ-উদ্দীপনা আছে। এত সব ফুল পেজ কালার ফোটোগ্রাফি!

 

বারীন্দ্রনাথ কর্নেলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বললেন, এবার নীতা সোমকে ডেকে পাঠাচ্ছি। মুখোমুখি দেখুন। কথা বলুন।

 

কর্নেল হাসলেন। নীতা সোমকেই রোয়িং করতে দেখলাম।

 

সে কী! ওকে আমি নিষেধ করেছিলাম আপনি না আসা পর্যন্ত যেন বাইরে না বেরোয়।

 

বোঝা যাচ্ছে, ব্ল্যাক ক্যাট এসকর্ট সার্ভিসের রাত্রি সেনের ওপর ওর আস্থা বেশি।

 

কলকাতার প্রাইভেট ডিটেকটিভদের সঙ্গে আপনার চেনাজানা আছে। রাত্রি সেনকে চেনেন?

 

না। তবে শুনেছি, ব্ল্যাট ক্যাট সিনেমা মহলেই গোয়েন্দাগিরি করে-টরে। আজকাল যেখানেই টাকাকড়ির লেন-দেন, সেখানে এক পক্ষ অপর পক্ষের গোপন তথ্য জানতে চায়। প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন। আমি সৌম্যের সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।

 

ওকে ডেকে পাঠাচ্ছি।

 

নাহ। আমি আউটহাউসে গিয়ে অবস্থাটা দেখি।..

 

আউটহাউসের সামনে একটা লিমুজিন এবং একটা ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। লিমুজিনের ভেতরে দুটো লোক পা তুলে শুয়ে আছে। পুলিসের ছোট্ট দলটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে টহল দেওয়ার ভঙ্গি করছে। কর্নেল চওড়া করিডরে ঢুকে দেখলেন, বাঁদিকের বড় ঘরের মেঝেয় সতরঞ্জি বিছানো এবং একদঙ্গল নানা বয়সি লোক শুয়ে ও বসে ঝিমোচ্ছে। ঘাটের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সৌম্যের সঙ্গে দেখা হল। তার পাশে জিনস্-শার্ট পরা গাঁট্টাগোট্ট চেহারার একটি মেয়ে। এই তাহলে রাত্রি সেন। সে ধমক দেওয়ার ভঙ্গিতে ডাকছে, নীতা! দ্যাটস এনাফ। চলে এস। নীতা বোকামি কোরো না।

 

সৌম্য গম্ভীর মুখে বলল সি দ্যা ফান!

 

কর্নেল বললেন, ওরা এঞ্জয় করছে। তারপর রাত্রির দিকে তাকালেন।

 

রাত্রি তার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে আবার ডাকল, নীতা! কাম ব্যাক!

 

কর্নেল সৌম্যকে বললেন, ওই ভদ্রলোক কে?

 

সৌম্য খাপ্পা হয়ে বলল, জানি না। কোনও চামচা-টামচা হবে। ইউ নো দ্য টার্ম!

 

রাত্রি বলল, চামচা বলবেন না। প্রতুলবাবুই নীতাকে লাইমলাইটে এনেছেন। কিন্তু প্রব্লেম হল, নীতা রোয়িং জানে না।

 

সৌম্য বলল, ওই ভদ্রলোক তো জানেন।

 

রাত্রি বলল, নীতা দুষ্টুমি করছে দেখছেন না? একটা অ্যাসিডেন্ট ঘটে গেলে কী হবে?

 

সৌম্য বলল, জোঁকে রক্ত চুষে এক মিনিট মড়া করে ফেলবে।

 

কর্নেল সৌম্যের কাঁধে হাত রেখে বললেন, লেট দেম এঞ্জয়। এস।

 

করিডরে ঢুকে সৌম্য বলল, বোটটা তুলে রাখা উচিত ছিল। আমাকে না জানিয়ে কেউ বোট ব্যবহার করলে আমার বড় খারাপ লাগে।

 

বাগানের মাঝামাঝি গিয়ে একটা অশোক গাছের তলায় কর্নেল দাঁড়ালেন। বললেন, একটা প্রশ্ন করব। আশা করি ঠিকঠাক জবাব পাব।

 

সৌম্য একটু অবাক হল। বলুন!

 

তুমি যে ম্যাগাজিনটা তোমার মামাবাবুকে দিয়েছিলে, ওটা কোথায় কিনেছ?

 

ওটা আমার কেনা নয়। অবিনাশদার শ্যুটিং টিমের কেউ এনেছিল। সন্ধ্যায় ওরা এল। আমি ওদের আউটহাউসের ঘরে থাকার ব্যবস্থা করছিলাম। তখন দেখি, করিডরে ওটা পড়ে আছে। করিডরের সামনে একটা বেশি পাওয়ারের বা জ্বালানো হয়েছিল। তা না হলে ওটা চোখে পড়ত না। তারপর পাতা উল্টে দেখি। নীতা সোমের ছবি।

 

তোমার মামাবাবুকে পত্রিকাটা দিতে গেলে কেন?

 

সৌম্য আরও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকার পর বলল, মামাবাবুকে–মাই-গুডনেস! এসব পত্রিকা মামাবাবুকে আমি দেব কেন? কোন সাহসে দেব? আশ্চর্য তো।

 

কিন্তু তুমি দিয়েছিলে। ওঁকে বলেছিলে, যে হিরোইন আসবে, এতে তার ছবি আছে।

 

এক মিনিট! আমাকে ভাবতে দিন। আসলে তখন অবিনাশদার টিম এসে গেছে। আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। যে বলছিল, তখনই তা করছিলাম। মে বি, সামবডি টোল্ড মি সামথিং টু ইম্প্রেস হিম। বাটু হু? সৌম্য স্মরণ করার চেষ্টা করছিল। হ্যাঁ। আমি যখন ম্যাগাজিনটার পাতা উল্টে নীতা সোমের ছবি দেখছি, তখন কেউ আমাকে প্রোভোক করে থাকবে। ঠিক মনে করতে পারছি না। নাহ। অরিত্র নয়। নিশ্চয় অন্য কেউ আমাকে বলেছিল কিছু। তা না হলে আমি নিজে থেকেইম্পসিব! কাল ভোরে মা বলছিলেন, নীতা সোমকে নাকি মামাবাবুর চেনা মনে হয়েছে। আমি ওঁর কাছে চলে গেলাম। ঠিক তখনই কিন্তু কথাটা মাথায় একবার এসেছিল। ভীষণ বিব্রতবোধ করছিলাম।

 

কর্নেল বাইনোকুলার তুলে একটা পাখি দেখতে দেখতে বললেন, যদি তোমার কথা ঠিক হয়, তাহলে বলতে হবে, প্ল্যানটা মোটামুটি সফল হয়েছে।

 

কিসের প্ল্যান?

 

টু ইম্প্রেস মিঃ রায়চৌধুরি। যাই হোক, তুমি গিয়ে তোমার বোটটা উদ্ধার করো। বলে কর্নেল বাইনোকুলারে চোখ রেখে দক্ষিণে বাগানের ভেতর ঢুকে গেলেন। ওদিকটা জঙ্গল হয়ে আছে।

 

সৌম্য একটু দাঁড়িয়ে থাকার পর আউটহাউসের দিকে চলে গেল।…

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *