ব্রিফকেস রহস্য (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
এক
টেলিফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল নীতার।
টেলিফোনটা বিদেশি। এর শব্দটা চাপা। কিছুটা জলতরঙ্গের বাজনার মতো। কিন্তু নিঝুম নিশুতি রাতে সেই বাজনা বিরক্তিকর উপদ্রব।
সাড়া না দিলে সব টেলিফোন একসময় থেমে যায়।
কিন্তু থামছে না। ক্রমাগত রিং হচ্ছে। হাত বাড়িয়ে রিসিভার নামিয়ে রাখতে গিয়ে হঠৎ নীতার খেয়াল হল, এই নাম্বারটা প্রাইভেট। খুব ঘনিষ্ঠ ছাড়া আর কারও জানার কথা নয়।
সে মাথার কাছে টেবিল ল্যাম্পের সুইচ টিপল। ঘড়ি দেখল। রাত একটা দশ।
একটু দ্বিধা, একটু অস্বস্তি–তারপর সে রিসিভার তুলে সাড়া দিল।
নীতা সোম?
কোনও পুরুষের কণ্ঠস্বর। চাপা আর কর্কশ। নীতা বলল, হু ইজ ইট?
কাল আপনি আউটডোর শুটিংয়ে যাচ্ছেন। যাবে না।
নীতা প্রায় চেঁচিয়ে উঠল। হোয়াট দ্য হেল আর ইউ টকিং অ্যাবাউট? কে আপনি?
আপনি কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন না? আমি বলছি, আপনি কাল আউটডোর শ্যুটিংয়ে যাবেন না। আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি।
নীতা একটু দমে গেল। কী বলবে ভেবে পেল না। দুঃস্বপ্ন দেখছে কি?
কিন্তু আবার সেই চাপা রুক্ষ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। হ্যালো। আর ইউ দেয়ার?
কে আপনি?
চিনবেন না। আপনার ভালোর জন্য বলছি
আমার এই নাম্বার কোথায় পেলেন?
পেয়েছি। মিস সোম! আপনি কাল আউটডোর শ্যুটিংয়ে চণ্ডীতলা যাবেন না।
ইজ ইট এ থ্রেটনিং?
দ্যাট ডিপেন্ডস। আপনি আপনার ডাইরেক্টরকে লোকেশন চেঞ্জ করতে বলুন।
কানেকশন কেটে গেল। নীতা কয়েকবার হ্যালো বলল। উত্তেজনা আর অস্বস্তিতে অস্থির নীতা সোম রিসিভার মুঠোয় চেপে ধরল। তারপর বিছানা থেকে উঠে বসল।
এয়ারকন্ডিশানের স্নিগ্ধহিম ঘরে আরাম ছড়িয়ে রেখেছিল। সেই আরাম তছনছ করে দিয়েছে মধ্যরাতের একটা অদ্ভুত উপদ্রব। রিসিভারটা বালিশের পাশে রেখে দিল সে, পাছে আবার আততায়ী কণ্ঠস্বর হানা দেয়।…
রাত একটা পঁচিশে নীতা একটা নাম্বার ডায়াল করল। দুবার রিং হওয়ার পর সাড়া এল। অবিনাশের জেগে থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।
নীতা আস্তে বলল, অবিনাশদা। নীতা বলছি।
হাউ স্ট্রেঞ্জ। তুমি এখনও জেগে আছ নাকি?
ঘুম আসছে না। আপনি এখন কী করছেন?
অবিনাশ ঘোষালের হাসির শব্দ ভেসে এল। আমার যা করা উচিত। শুভকে নিয়ে স্ক্রিপ্টটা ফাইনাল করছি। জাস্ট এ টাচ আপ। শুভ অবশ্য ঘুমে ঢুলছে। ওকে বাড়ি ফিরতে দিইনি। জানো? ওর বউ তিনবার রিং করেছিল। তো কী ব্যাপার? তোমার ঘুম আসছে না কেন?
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। তারপর আর ঘুম আসছে না।
ও দুষ্টু মেয়ে। তাই আমাকে–
না অবিনাশদা।
অবিনাশ দ্রুত বললেন, এটা হয়। র্যাদার–এ সাইকোলজিক্যাল প্রব্লেম। তুমি শাইনিং স্টার। তোমার অবচেতনায় একটা অনিশ্চয়তার আশঙ্কা থাকতে বাধ্য। বিশেষ করে এ ধরনের প্রফেশনে তো-না? তুমি তাই বলে ঘুমের বড়ি-টড়ি খেয়ো না।
অবিনাশদা। কাল আমরা কোথায় যেন যাচ্ছি?
বেশি দূরে নয়। তোমাকে তো বলেছি মাত্র ঘণ্টাতিনেকের জার্নি। খুব শান্ত নির্জন জায়গা।
আমরা কাল যাচ্ছি?
কী আশ্চর্য। নীতা, আমি কিছু বুঝতে পারছি না। এত বাঁত্রে হঠাৎ–এনিথিং রং? নীতা। …হ্যালো! হ্যালো! হ্যালো!
অবিনাশদা। আই অ্যাম নট ফিলিং ওয়েল।
কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ করছে?
কেমন যেন একটা আনক্যানি ফিলিং হচ্ছে।
আনক্যানি ফিলিং। তার মানে?
আচ্ছা অবিনাশদা, শ্যুটিং কয়েকটা দিন পিছিয়ে দিতে অসুবিধে কী?
কী অদ্ভুত কথা বলছ তুমি! আজ বিকেলে আমার টিম সেখানে রওনা হয়ে গেছে। আর রাত দুপুরে তুমি বলছ–ওঃ নীতা। প্লিজ পাগলামি করো না। শোনো আমি নিজে দেখে এসেছি। তোমার কোনও অসুবিধে হবে না। কেউ তোমাকে ডিসটার্ব করবে না। তাছাড়া স্টোরিতে ঠিক যেমন একটা বাড়ির কথা ভেবেছিলাম, বনেদি অ্যারিস্টোক্র্যাট ফ্যামিলির বাগানবাড়ি-নদী বা ঝিল, প্রচুর গাছপালা। আরও একটা ফেসিলিটি আছে। ইলেকট্রিসিটি। একটা টেলিফোন পর্যন্ত। আসলে বাড়ির মালিক একজন এক্স এম পি। নাইস ওল্ড ম্যান। অবিনাশ আবার হেসে উঠলেন। না–তিনি ড্রাকুলা নন, সো মাচ আই ক্যান অ্যাসিউর ইউ? ও কে? রাখছি।
অবিনাশদা! বলেই নীতা থেমে গেল। সে জানে, অবিনাশ ঘোষাল জেদি ও খেয়ালি মানুষ। কথাটা শুনলে হয়তো এখনই ছুটে আসবেন। ফিল্মমেকার হিসেবে তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি আছে। প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে। পুলিশ-প্রোটেকশনের ব্যবস্থা করে ফেলবেন। কিন্তু তাতে নীতার অস্বস্তি ঘুচবে না। একটা লোক যেভাবে হোক, তার প্রাইভেট ফোন নাম্বার জেনেছে এবং প্রকারান্তরে তাকে হুমকিই দিয়েছে।
রাত একটা দশে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে কেউ হুমকি দিয়েছে। এটাই অস্বস্তিকর।
হ্যালো… হ্যালো… হ্যালো…! নীতা! কথা বলছ না কেন?
অবিনাশদা, আমরা সকাল আটটায় যাচ্ছি। তাই না?
তোমার উঠতে দেরি হবে। এই তো? ঠিক আছে। মেক ইট নাইন ও ক্লক।
নীতা চুপ করে থাকল। ঠোঁট কামড়ে ধরে আবার সে বোবা হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য।
নীতা হোয়াটস রং?
কিছু না হঠাৎ ঘুম ভেঙে
শোনো। একটু ব্র্যান্ডি খেয়ে নাও। চিয়ার আপ। ছাড়ি?…
নীতা আগের মতো বালিশের পাশে রিসিভার রেখে দিল। তারপর উঠে গিয়ে ব্র্যান্ডির বোতল বের করল।
রাত একটা পঞ্চাশ মিনিটে মাথার ভেতর তীব্র উত্তেজনা তাকে নাড়া দিল। টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোট্ট নোটবই বের করল। তারপর বিছানায় হেলান দিয়ে বসে পাতা ওল্টাতে থাকল। একটা নাম্বার খুঁজছিল অভিনেত্রী নীতা সোম।
তার হাত কাঁপছিল। সেই হাতে নাম্বারটা ডায়াল করল। প্রায় এক মিনিট ধরে রিং হওয়ার পর ঘুমজড়ানো গলায় সাড়া এল। ইয়া?
নীতা বলল, রাত্রি? আমি নীতা বলছি। তোকে ডিসটার্ব করার জন্য দুঃখিত। কিন্তু
কে? নীতা–নীতা কী?
তুই কি জেগেছিস, না ঘুমের মধ্যে কথা বলছিস? আমি নীতা।
ও। তুই? তোর ভয়েস এমন কেন? মাই গুডনেস! দুটো বাজতে চলল। তুই নিশ্চয় কোনও স্টুডিও থেকে ফোন করছিস। রাত্রির হাসির শব্দ ভেসে এল বাহ্। নিজে ঘুমনোর চান্স পাচ্ছে না বলে আমাকে টিজ করার ধান্দা?
রাত্রি! দিস ইজ সিরিয়াস। আমি বাড়ি থেকে বলছি।
সিরিয়াস মানে? কোনও মিসহ্যাপ নাকি?
আগে শোন, যা বলছি। নীতা শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বলল। শোনার পর তুই বলবি আমার কী করা উচিত।
বল। কিন্তু তুই কি অসুস্থ? নাকি কারও পাল্লায় পড়ে ড্রিঙ্ক করেছিস?
একটু ব্র্যান্ডি খেয়েছি।
এতেই? ও কে। বল। …ওয়েট, ওয়েট, তুই কি এখন একা আছিস?
নীতা রেগে গেল। শিট! আই অ্যাম নট এ হোর ইউ নো৷
ঠিক আছে বাবা। মুখখিস্তি করতে হবে না। বল, কী বলবি।
নীতা হঠাৎ শক্ত আর শান্ত হয়ে গেল। ঘটনাটি বলতে থাকল। তার কণ্ঠস্বর অবশ্য মাঝে মাঝে জড়িয়ে যাচ্ছিল। রাত্রির সাড়া না পেলেই তাকে ডাকছিল। কথা বলতে বলতে নীতা টের পাচ্ছিল উত্তেজনার চাপে একটু বেশি ব্র্যান্ডি খেয়ে ফেলেছে। ক্রমে তার স্নায়ু কী এক অবসাদে আচ্ছন্ন হয়ে যাচ্ছিল।
রাত্রি বলল, ও কে। তুই এখন শুয়ে পড়। আর রিসিভারটা নামিয়ে রেখে দে। পরে সময়মতো এক্সচেঞ্জ থেকে নাম্বারটা বদলে নেওয়ার ব্যবস্থা করবি। আমি মর্নিংয়ে–ধর, আটটার পর যাচ্ছি। তখন কথা হবে।
এখনই বল।
শাট আপ। শুয়ে পড় বলছি। আর রিসিভারটা–ডোন্ট ফরগেট।
নীতা রিসিভারটা মেঝেয় ফেলে দিল। কার্পেটে অদ্ভুত শব্দ হল। হাত বাড়িয়ে কয়েকবার চেষ্টার পর সে টেবিলল্যাম্পের সুইচটা খুঁজে পেল এবং অফ করে দিল। ঠিক ঘুম নয়, ঘুমের মতো গাঢ় একটা আচ্ছন্নতা তার চেতনার ওপর চেপে বসছিল।
ভোরের দিকে একবার ঘুম ভেঙেছিল। শীত করছিল। সে চাদরটা টেনে গায়ে চাপাল। এয়ারকন্ডিশনার বন্ধ করে দেবে কি না ভাবছিল। কিন্তু উঠতে ইচ্ছা করল না।
তার শরীর জুড়ে অবসাদ। এ শরীর যেন তার নিজের নয়। আর তার মনও যেন তার নিজের মন নয়।
নীতা সোম অলস দৃষ্টিপাতে নিজের জীবনকে ক্রমশ দূরে সরে যেতে দেখছিল. ..
