বরফ যখন গলে (ভাদুড়ি-গোয়েন্দা) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

রাত্তিরের খাওয়ার পাট চুকে গেল সাড়ে আটটার মধ্যেই। ভাদুড়িমশাইয়ের ঘর আমাদেরটার ঠিক পাশেই। ঘরের নম্বর ৩০৩। সেখানে বসে খানিকক্ষণ গল্পগুজব হল। সদানন্দবাবুর চোখ দুটো যে ঘুমে জড়িয়ে আসছে, সেটা লক্ষ করেছিলুম। দু’রাত ট্রেন জার্নির পরে সেটা অস্বাভাবিকও নয়। তা ছাড়া ভদ্রলোকের উপর দিয়ে ধকলও আজ নেহাত কম যায়নি। মুখে অবশ্য বলছেন যে, ও কিছু না, অমন তো হতেই পারে, কিন্তু রাস্তার উপরে হঠাৎ ওইভাবে হামলা হওয়ায় মনের উপরে যে মস্ত একটা ধাক্কা খেয়েছেন, তাতে সন্দেহ নেই। বললুম, “ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন সদানন্দবাবু, আজ আর রাত জাগবেন না। আপনার এখন রেস্ট দরকার।”

 

“আপনি যাবেন না?”

 

“আমি একটু বাদেই যাচ্ছি।…আর হ্যাঁ, জানলা বন্ধ রয়েছে বটে, কিন্তু পাল্লা তো কাচের, তাতে শীত আটকায় না, পর্দাটা পুরোপুরি টেনে দেবেন, নইলে ঠান্ডা লেগে যেতে পারে।”

 

সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন সদানন্দবাবু। ঘর থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিলেন। কিন্তু গেলেন না। দরজা পর্যন্ত গিয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “একটা কথা বলব?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বলুন।”

 

“এই হোটেলে লোক এত কম কেন? মানে এ-বেলা তো আমরা ডাইনিং হলে গিয়ে খেলুম, কিন্তু কই, সেখানেও তো দেখলুম আমরা ছাড়া আর-কেউ নেই, হল একদম ফাঁকা।”

 

“শুধু এই হোটেল বলে কথা নেই,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “মুসৌরির প্রায় সব হোটেলই এখন ফাঁকা যাচ্ছে।”

 

“কেন?”

 

“বাঃ, এখন স্ন্যাক সিজন না? নেহাত আমাদের মতো পাগল ছাড়া কেউ কি এই সময়ে হিল রিজর্টে আসে নাকি? অবিশ্যি স্ল্যাক সিজন বলে হোটেলের চার্জও এখন অনেক কম, তা ধরুন প্রায় অর্ধেক। অন্য সময়ে এলে পুরো চার্জ দিয়েও ঘর পাওয়া শক্ত হত।”

 

“অ, তা-ই বলুন। লোকজন কম দেখে আমার আবার অন্য কথা মনে হয়েছিল।”

 

কী কথা মনে হয়েছিল, সেটা আর ভেঙে বললেন না সদানন্দবাবু। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ সেটা টানলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “স্ন্যাক সিজন বলে পয়সাকড়ির দিক থেকে একটু সুবিধেই হয়েছে। বেশি টাকাকড়ি তো সঙ্গে নিয়ে আসিনি।”

 

“তার মানে?” জিজ্ঞেস করলুম, “হোটেলের খর্চা মাধব মিত্তির দিচ্ছেন না?”

 

“দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আমি নিইনি।”

 

“কেন?”

 

“কয়েকটা ব্যাপারে আমার একটু খটকা আছে। সেটা না-মেটা পর্যন্ত ওঁর কেসটা আমি নিচ্ছি না। সেটা যে ওঁকে এখানে এসেই বলে দিইনি, তাও নয়।”

 

“উনি তাতে কী বললেন?”

 

“কিছুই বললেন না, শুধু একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন।”

 

“এটা একটু আনএথিক্যাল ব্যাপার হয়ে গেল না? মানে উনি যখন ব্যাঙ্গালোরে ফোন করেন, তখন তো আপনি কেসটা অ্যাকসেপট করেছিলেন।”

 

“সেটা উনি বলছেন। কিন্তু ভুল বলছেন। আসলে ব্যাঙ্গালোরে উনি যখন ফোন করেন, তখন ওঁকে যা বলেছিলুম, এখনও ঠিক তা-ই বলছি।”

 

“কী বলেছিলেন ওঁকে?”

 

“বলেছিলুম যে ঠিক আছে, ব্যাপারটা বুঝে দেখবার জন্যে আমি দেরাদুনে যাব। তা সেটা দেখছি তো। দেরাদুনেও দেখছি, মুসৌরিতেও দেখছি। তাতে কি ওঁর কেস অ্যাকসেপট করা হল?”

 

“পরে আর এ নিয়ে কোনও কথা হয়নি?”

 

“কী করে হবে? দু’দিন ধরে তো ওঁর কোনও পাত্তাই নেই।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের সিগারেট ফুরিয়ে গিয়েছিল। সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে তিনি ফের নতুন একটা সিগারেট ধরালেন। এক গলা ধোঁয়া টেনে নিয়ে, ঠোঁট গোল করে, ধোঁয়াটা আস্তে-আস্তে ছাড়তে-ছাড়তে গোটা কয়েক রিং বানালেন। তারপর বললেন, “আপনারও তো ট্রেনে নিশ্চয় ভাল ঘুম হয়নি। যান, আপনিও শুয়ে পড়ুন গিয়ে।”

 

বললুম, “মাত্র তো ন’টা বাজে, এখন ঘুম আসবে না। তা ছাড়া, আর দু’একটা কথা জিজ্ঞেস করবার ছিল।”

 

“করুন।”

 

“আপনি তো আমাদের কয়েকটা দিন আগেই কলকাতা ছেড়েছেন। এখানে এসে যদ্দুর যা দেখেছেন, তার থেকে একটা আইডিয়াও ইতিমধ্যে হয়েছে নিশ্চয়। তাতে কী মনে হচ্ছে?”

 

“কীসের কী মনে হবে?”

 

“মাধব মিত্তির মানুষটি ঠিক বিশ্বাসযোগ্য কি না।… মানে কেসটা আপনি নেবেন কি না, সেটা তো তারই উপরে নির্ভর করছে।”

 

“পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য যে নন, সে তো বলেইছি। অলরেডি দু-দুটো মিথ্যে উনি বলেছেন।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “সে দুটোর একটারও অবিশ্যি তেমন কিছু গুরুত্ব নেই। কিন্তু তার ফলে কী মুশকিল হয়েছে জানেন, ওঁর কোন কথাটা যে বিশ্বাস করব আর কোনটা করব না, সেটাই ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।”

 

“তার মানে সেটা নিচ্ছেন না, কেমন?”

 

“তা কিন্তু এখনও আমি বলিনি। তবে একটু ধাঁধায় যে পড়ে গেছি, সেটা ঠিক।”

 

“কেসটা নেবার জন্যে উনি কি আপনাকে সরাসরি অ্যাপ্রোচ করেছিলেন?”

 

“না না, চিনলে তো সরাসরি অ্যাপ্রোচ করতেন, উনি আমাকে চিনতেনই না। হি কেম গ্লু বিষ্টু। বিষ্টুই প্রথম দেরাদুন থেকে আমাকে ফোন করে ওঁর কথা জানায়, তারপর বিষ্টুর রেফারেন্স দিয়ে উনি আমাকে ফোন করেন। তো সেই হয়েছে আর-এক জ্বালা।”

 

“মেজর গুপ্তকে…আই মিন আপনার এই বিষ্ণুচরণকে আপনি অনেক দিন ধরেই চেনেন বলে মনে হচ্ছে। ভুল বললুম?”

 

“না না, ঠিকই ধরেছেন। বিষ্টুকে ওর ছেলেবেলা থেকেই চিনি আমি। ব্যাঙ্গালোরের ছেলে। গত বছর তো আপনি ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে অসুখ বাধিয়ে বসেছিলেন। তখন আমার ডাক্তার-বন্ধু অচ্যুত গুপ্তকে কল দিতে হয়েছিল, তাঁকে মনে আছে?”

 

বললুম, “তা কেন থাকবে না! বছর ষাটেক বয়েস, হাসিখুশি মানুষ, দারুণ ফর্সা, মাথায় মস্ত টাক।”

 

“বাস, বিষ্টু হচ্ছে সেই অচ্যুত গুপ্তের ছোট ভাই। টাকটা ওদের একটা পারিবারিক ব্যাধির মতন। ইট’স ইন দ্য ফ্যামিলি। বিষ্টকে যখন প্রথম দেখি, তখন ও সবে আই.এসসি. পাশ করে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছে। কিন্তু তখনই যে ওর মাথার সামনের দিকের চুল হালকা হতে শুরু করেছিল, এটা ভুলিনি।”

 

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “টাক থাকলে কী হয়, ওরা সবক’টা ভাই-ই কিন্তু ভারী হ্যান্ডসাম। কিন্তু এদিকে আবার এত হ্যান্ডসাম হলে কী হয়, অচ্যুতের কাছেই শুনেছি যে, তার এই কনিষ্ঠ ভ্রাতাটির দাম্পত্য জীবন একটুও সুখের হয়নি।”

 

“কী রকম?”

 

“তা হলে শুনুন।” ভাদুড়িমশাই ফের একটা সিগারেট ধরালেন, তারপর দেশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠিটাকে শূন্যে নাড়িয়ে নিবিয়ে দিয়ে সেটাকে অ্যাশট্রের মধ্যে নিক্ষেপ করে, একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “শুনেছি বিষ্ণু যখন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র, তখনই একগাদা মেয়ে ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। তো, তাদেরই একজনের সঙ্গে বিয়েও হয়ে যায় ওর। মেয়েটি মরাঠি, আর্মির এক রিটায়ার্ড ব্রিগেডিয়ারের একমাত্র সন্তান। বিষ্টু তখনও পাশ করে বেরোয়নি। পাশ করবার বছর দুয়েক বাদে আর্মির ডাক্তারের চাকরি নিয়ে ও আলমোড়ায় চলে যায়। আর দুর্ঘটনা ঘটে সেই আলমোড়াতেই।”

 

“কীসের দুর্ঘটনা?”

 

“স্টোভ ফাটার। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে শকুন্তলা…মানে সেই মরাঠি মেয়েটি বেড-টি বানাবার জন্যে স্টোভ ধরিয়েছিল। হঠাৎ স্টোভ ফেটে সে মারা যায়।”

 

“ভেরি স্যাড। মেজর গুপ্ত তারপরে আর বিয়ে করেননি?”

 

“করেছিল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “শকুন্তলার বাপ-মা যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন করেনি। তারপরে করেছিল। তা সেও তো বছর পাঁচ-ছয় পরের ঘটনা।”

 

“এ বিয়েটাও সুখের হয়নি?”

 

“না, এটাও সুখের হল না। শুনেছি এবারে বিয়ে করেছিল একটা পঞ্জাবি মেয়েকে। বিষ্টু তখন আম্বালায় স্টেশনড। সেখানেই এই পাঞ্জাবি এয়ারেসের সঙ্গে ওর পরিচয় হয়।”

 

“এয়ারেস বলছেন কেন? অনেক টাকাকড়ির মালিক?”

 

“তা অন্তত লাখ পঞ্চাশেক তো হবেই।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা ছাড়া জমিজমাও শুনেছি কম ছিল না। বাপ-মা মরা মেয়ে, দাদামশাইয়ের কাছে মানুষ হয়েছে, হয়তো সেই জন্যেই একটু স্পয়লট চাইল্ড গোছের হয়ে গিয়েছিল। আর হয়তো সেইজন্যেই বিধুর সঙ্গে বয়েসের বেশ কিছুটা পার্থক্য সত্ত্বেও যখন গোঁ ধরে বলল যে, ওকে ছাড়া আর কাউকে সে বিয়ে করতে রাজি নয়, দাদামশাই তখন আর “না” বলতে পারলেন না। বিষ্টুর বয়স তখন প্রায় পঁয়ত্রিশ আর মেয়েটির এই ধরুন সতেরে-আঠারো।”

 

“তারপর?”

 

“তারপর আর কী, হনিমুন করতে ওরা কাশ্মিরে গেল আর—টু কাট আ লং স্টোরি শর্ট—মেয়েটি সেইখানে মারা গেল।”

 

“কী করে?”

 

“পহেলগাঁওয়ের ওদিকে গিয়েছিল, সেখানে ব্লিজার্ডে তাঁবু উড়ে যায়, ঠান্ডা লেগে দু’জনে নিউমোনিয়া বাধিয়ে বসে। শ্রীনগরে ফিরিয়ে এনে বোথ অভ দেম হ্যাড টু বি হসপিটালাইজড। বিষ্টু বেঁচে যায়, মেয়েটা বাঁচেনি।”

 

এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “কত বছর বয়েস পর্যন্ত বিয়ে করা চলে মশাই?”

 

হেসে বললুম, “কোনও এজ-বার আছে বলে তো শুনিনি। একুশ থেকে একাশি, যখন খুশি বিয়ে করতে পারেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু বিষ্ট আর ও-পথ মাড়াল না। অচ্যুত গুপ্তের কাছে শুনেছি, দ্বিতীয় বউ মারা যাবার বছরখানেক পর থেকেই ওরা বিষ্টুকে ফের বিয়ের কথা বলতে শুরু করেছিল। কিন্তু যতবারই বিয়ের কথা উঠেছে, ততবারই পাশ কাটিয়ে গেছে বিষ্টু। হেসে বলেছে, কেন আমাকে আবার বিয়ে করতে বলছ তোমরা, দু-দু’বার তো বিয়ে করলুম, কিন্তু একটাও কি টিকল?”

 

“আপনি কখনও এ নিয়ে ওকে কিছু বলেছেন?”

 

“একবারই বলেছিলুম। এ হল বছর দশেক আগের কথা। তখন আমি ব্যাঙ্গালোরের যে-পাড়ায় থাকতুম, সেখানে আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির কাছাকাছি এক মধ্যবিত্ত বাঙালি ভদ্রলোক থাকতেন। তাঁর বড় মেয়ে ঊর্মিলার বয়েস তখন বছর তিরিশেক। সুন্দরী না হোক, সুশ্রী চেহারা, কিন্তু পয়সার অভাবে ভদ্রলোক শুনলুম তার বিয়ে দিতে পারছেন না। তা বিষ্টু সেবারে পুজোর ছুটি কাটাতে দাদার কাছে গিয়েছিল। তখনই একদিন তাকে বলি যে, মেয়েটাকে বিয়ে করে ফ্যাল। তোরও বছর-চল্লিশেক বয়েস হল, মেয়েটারও বছর-তিরিশ, দিব্যি মানিয়ে যাবে।” আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িশাই। তারপর বললেন, “দুই পরিবারের উদ্যোগে দু’জনের দেখাসাক্ষাও করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। দেখাসাক্ষাৎ মানে দুটো সিনেমার টিকিট কেটে বিষ্টর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলা হল, যাও, বইটা বেশ ভাল হয়েছে, দু’জনে গিয়ে দেখে এসো। শুনেছি, সিনেমা দেখে দু’জনে একটা হোটেলে গিয়ে ডিনারও খায়। কিন্তু ওই পর্যন্ত। কাজের কাজ কিছু হল না।”

 

“মেজর গুপ্ত কী বললেন?”

 

“ওই একই কথা বলল। ‘মেয়েটাকে কেন মেরে ফেলতে চাইছেন দাদা, জানেনই তো যে, আমার কপালে বউ টেকে না। আহা, বিয়ে না হোক, দিব্যি বেঁচে তো আছে, ওকে বেঁচে থাকতে দিন।’ বুঝুন ব্যাপার!”

 

“মেয়েটার কী হল?”

 

“কী আর হবে। যখন বুঝল যে, তার বিয়ে আর হবার নয়, তখন নার্সিংয়ের ট্রেনিং নিয়ে কুয়েত চলে যায়। শুনেছি সেখানেই একটা হাসপাতালে চাকরি করছে।”

 

বললুম, “মেজর গুপ্তের বয়েসও তো এদিকে পঞ্চাশ হল। তা-ই না?”

 

“এক-আধ বছর কম-বেশি হতে পারে।”

 

“দেখে কিন্তু অনেক কম বলে মনে হয়। আমি তো ভেবেছিলুম চল্লিশ বেয়াল্লিশের বেশি হবে না।”

 

“ওদের সব ক’টা ভাইকেই বয়েসের তুলনায় অনেক কম দেখায়। অচ্যুতের বয়েস তো ষাট হল, কিন্তু দেখলে মনে হয় পঞ্চাশ।…তো যা বলছিলুম, বিষ্টুকে ওর ছাত্র-জীবন থেকে চিনি, অচ্যুতের ছোট ভাই বলে স্নেহও করি যথেষ্ট। ইদানীং অবশ্য কালেভদ্রে দেখা হয়, কিন্তু তা হোক, মাধব মিত্তির যখন বিষ্ণুর রেফারেন্স দিলেন, তখন আর এক কথায় ‘না’ বলে দিতে পারলুম না। বললুম যে, ঠিক আছে, সরেজমিনে এসে এই নিয়ে যা খোঁজখবর করবার, তা আমি করব। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, কেসটা আমি নিয়েছি।”

 

কৌশিক, মিসেস মিত্র আর মেজর গুপ্তের সঙ্গে ফোনে যে কথা হয়, তা আমি ডিনারের আগেই ভাদুড়িমশাইকে জানিয়ে রেখেছিলুম। এখন সেই প্রসঙ্গটা আবার ইচ্ছে করেই তুললুম আমি। তাতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কৌশিককে আমি ইতিমধ্যে একবার ফোন করেছি। তাতে ওকে বলে দিয়েছি যে, বারাসতের বাগানটা নিয়ে আর-একটু খোঁজ-খবর করতে হবে। আর কিছু না হোক, বাগানটা যিনি বিক্রি করলেন, সেই অশোক মল্লিক ওখানকারই বাসিন্দা না বাইরে থাকেন, সেটা অন্তত জানা দরকার।”

 

“আর মিসেস মিত্রের ব্যাপারটা?”

 

“উনি তো কাল সকালেই আসছেন, তখন ওঁরই কাছে পুরো ব্যাপারটা শোনা যাবে। এখন আর ও নিয়ে ভেবে কোনও লাভ নেই।…কিন্তু না, আর নয়, দশটা বাজে, এবারে আপনি ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন।”

 

সদানন্দবাবুর ঘুম ইদানীং গ্রীষ্মকালে ভোর সাড়ে চারটেয় ভাঙে আর শীতকালে পাঁচটায়। কাল অবশ্য আমাকে বলেছিলেন যে, এই হাড় কাঁপানো শীতের দেশে যে ক’টা দিন আছেন, অন্তত সেই ক’টা দিন তিনি ছ’টার আগে শয্যাত্যাগ করবেন না। আমার কথা সেক্ষেত্রে যত কম বলা যায়, ততই ভাল। সাতটার আগে কোনও কালেই ঘুম ভাঙে না বলে জীবনে আমি সূর্যোদয় খুব কমই দেখেছি।

 

আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে আমাদের দুজনের ঘুম অবশ্য একেবারে একই সময়ে ভাঙল। চোখ খুলবার আগেই শুনতে পেয়েছিলুম, ডোর বেল বাজছে। আলোর সুইচ টিপে দরজা খুলে দেখলুম, ভাদুড়িমশাই। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম পৌনে ছ’টা। জানলার পর্দা সরিয়ে দিলুম বটে, কিন্তু ঘরের আলো তাতে একটুও বাড়ল না। বাইরে একেবারে মিশকালো অন্ধকার।

 

ভাদুড়িমশাই ঘরে ঢুকে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়েছিলেন। জিজ্ঞেস করলুম, “কী ব্যাপার?” সদানন্দবাবু আপাদমস্তক লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। লেপের তলা থেকেই বললেন, “না মশাই, আজ আর আমি মর্নিং ওয়াক করতে পারব না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মর্নিং ওয়াকের ব্যাপার নয়, তাড়াতাড়ি উঠে মুখ-হাত ধুয়ে তৈরি হয়ে নিন, আলো ফুটলেই আমরা দেরাদুনের পথে রওনা হব।”

 

বললুম, “সে কী?”

 

“হ্যাঁ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল রাত বারোটা নাগাদ দেরাদুন থেকে মিসেস মিত্র ফোন করেছিলেন। বললেন, আজ সকালেই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হওয়া দরকার, সি হ্যাজ আ হোল লট অভ থিংস টু টেল মি।”

 

“যাচ্চলে, তাঁরই তো আজ সকালে এখানে আসবার কথা। বিকেলে যখন ফোন করেন, তখন তো সেই কথাই বললেন।”

 

“না, উনি আসছেন না, আমাকেই যেতে হবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিন, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিন। চটপট পৌঁছোনো দরকার।…সদানন্দবাবু, আপনার কপালে তো সামান্য একটুখানি ছড়ে গেছে, তা হলে আর ওই ব্যান্ডেজ বেঁধে বেরুবার দরকার নেই, ওখানে এটা লাগিয়ে নিন।”

 

সদানন্দবাবুর হাতে একটা ব্যান্ড-এড ধরিয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। হোটেল থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়েও অবশ্য ন’টার আগে মাধব মিত্তিরের বাড়িতে পৌঁছনো গেল না। বাড়িটা যে দেরাদুন শহরের একেবারে মাঝমধ্যিখানে তা নয়, শহর ছাড়িয়ে রাস্তাটা যেখানে ছোট ছোট কয়েকটা পাহাড়ি ঘাটের ভিতর দিয়ে ধাপে-ধাপে নেমে এসে দিল্লির দিকে চলে গেছে, তার ধারে। রাস্তার পাশেই পাঁচিলে ঘেরা বিশাল কম্পাউন্ড। কম্পাউন্ডে ঢুকে মোরাম-বিছানো ড্রাইভ পেরিয়ে উঁচু-ভিতের একতলা বাংলো বাড়ি। সামনের চওড়া বারান্দার একদিকে একটা গোল সেন্টার-টেবিল ঘিরে গোটাকয় বেতের চেয়ার। তারই একটায় যে ভদ্রমহিলা বসে ছিলেন, এবং বাড়ির কাছাকাছি গিয়ে আমরা পৌঁছবামাত্র যিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের নমস্কার করে বললেন, ‘আসুন আসুন,’ তাঁর বয়স মনে হল বছর-চল্লিশ। ভদ্রমহিলা যে এককালে ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। এখন অবশ্য সেই সৌন্দর্যের একটা আন্দাজই শুধু পাওয়া যায়। চুলে সামান্য পাক ধরেছে। মুখে-চোখে প্রসাধনের কোনও চিহ্ন দেখলুম না। পরনে সাদা খোলের আটপৌরে শাড়ি। রোগা চেহারা, চোখের কোলে কালি পড়েছে, দেখলেই বোঝা যায় যে, ইনি সুস্থ নন। আমাকে ও সদানন্দবাবুকে দেখে যে এঁর চোখে কোনও বিস্ময় ফুটল না, তাতে অনুমান করলুম যে, কাল রাত্তিরে যখন ইনি ফোন করেছিলেন, ভাদুড়িমশাই তখনই আমাদের পরিচয় এঁকে দিয়ে থাকবেন।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী ব্যাপার মিসেস মিত্র, আমাদের এমন দৌড় করিয়ে নিয়ে এলেন কেন?”

 

মিসেস মিত্র তক্ষুনি এ-কথার জবাব দিলেন না, মৃদু গলায় বললেন, “আপনাদের নাস্তা হয়েছে?”

 

“ও নিয়ে ভাববেন না, পথের মধ্যেই এক জায়গায় ট্যাক্সি থামিয়ে কিছু খেয়ে নিয়েছি।”

 

“তা হলে ভিতরে আসুন, ড্রইং রুমে বসে কথা হবে।”

 

ড্রইং রুমটি বেশ বড়। মেঝের পুরোটাই পুরু কার্পেটে মোড়া। দুই দেওয়ালে গুম্ফবান দুই বৃদ্ধের অয়েলপেন্টিং। একজনের ঊর্ধ্বাঙ্গে নকশা-কাটা বালাপোশ, অন্যজনের জামেয়ার। দু’জনেরই চাপা ঠোট, টিকোলো নাক ও ধারালো দৃষ্টিতে এমন একটা ব্যক্তিত্বের ছাপ রয়েছে যে, দেখবামাত্র সম্ভ্রমের উদয় হয়। ঘরের মধ্যে আসবাবপত্রের কোনও বাহুল্য নেই। একদিকে নিচু-পায়ার বিশাল খাটের উপরে জাজিম পাতা, অন্যদিকে গ্লাস-টপ সেন্টার-টেবিল ঘিরে খানকয় সোফা আর গদি-আঁটা চেয়ার।

 

আমার চোখ যে বারে বারে দেওয়ালের অয়েল পেন্টিং দুটির দিকে চলে যাচ্ছে, মিসেস মিত্র সেটা লক্ষ করেছিলেন। বললেন, “ডানদিকের দেওয়ালে যাঁর তসবির দেখছেন, তিনি আমার পিতাজি আর বাঁদিকের দেওয়ালে আমার গ্র্যান্ডফাদার।”

 

সদানন্দবাবু চাপা গলায় বললেন, “ব্লুব্লাড!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার সমস্যাটা কী মিসেস মিত্র?”

 

“আপনি…আপনি কি সেটা…” কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন মিসেস মিত্র। কিন্তু কীভাবে বলবেন, সেটা ঠিক করতে না পেরে কথাটা আর শেষ করলেন না, বাক্যটাকে অসমাপ্ত রেখেই চুপ করে গেলেন।

 

“হ্যাঁ, অন্তত একটা সমস্যার কথা বুঝতে পেরেছি।” মৃদু হেসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার হাতে খুব-বেশি সময় নেই, আর সেইজন্যেই খুব তাড়াতাড়ি দু-একটা কথা আপনি আমাকে বলতে চান। তাড়াতাড়ি মানে কেউ এসে পড়বার আগে। কী, ঠিক বলছি তো?”

 

মিসেস মিত্র মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। মাথা না তুলেই বললেন, “ঠিক”

 

“কিন্তু সেই কেউটা কে?”

 

এতক্ষণে মুখ তুললেন মিসেস মিত্র। সরাসরি ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমার স্বামী। কাল রাত্তিরে আপনাকে ফোন করার একটু আগে তাঁর ফোন পাই। এখন সাড়ে ন’টা বাজে। আর মাত্র দেড় ঘন্টা বাদে অর্থাৎ এগারোটা নাগাদ তিনি বাড়িতে এসে পৌঁছবেন।”

 

“তরশু থেকে তিনি নিখোঁজ। কোথায় ছিলেন এই তিনটে দিন?”

 

“জানি না। ফোনেও তা নিয়ে কিছু বলেননি। আপনার সঙ্গে তো আজকালের মধ্যে তাঁর নিশ্চয় দেখা হবে, তখন জেনে নেবেন। কিন্তু আমি আমার স্বামীর কথা বলতে আপনাকে ডেকে আনিনি। আমি আমার কথা বলতে চাই।”

 

“আপনার কথা মানে ওই যেটা হতে পারেনি সেই বার্গলারির কথা?”

 

“এটা আপনি কোথায় জানলেন?”

 

“মেজর গুপ্তের কাছে।”

 

শুনে এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন মিসেস মিত্র। তারপর বললেন, ‘কিন্তু ওটা অ্যাটমটেড বার্গলারি নয়, অ্যাটেমটেড মার্ডারের ব্যাপার। মিঃ ভাদুড়ি, আমাকে খুন করবার চেষ্টা হচ্ছে। গত তিন-চার মাস ধরেই হচ্ছে। যাকে আপনারা বার্গলার ভাবছেন, মানে বাথরুমের স্কাইলাইটের কাচ ভেঙে যে-লোকটা আমার বেডরুমে ঢুকবার চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি, হোয়াই ডোন্ট য়ু আন্ডারস্ট্যান্ড উসকো ভি একহি মতলব থা, হি কেম টু মার্ডার মি।”

 

একে তো ভদ্রমহিলা অসুস্থ, তার উপরে তাঁর কথা বলার ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছিল যে, তিনি রীতিমত উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন, কিন্তু ভাদুড়িমশাই যে সেজন্য বিশেষ উদ্বিগ্ন, এমন মনে হল না। নির্বিকার গলায় তিনি বললেন, “সোনার গয়না-টয়না কি আপনারা বাড়িতেই রাখেন? কিংবা অন্য কোনও ভ্যালুয়েবল জিনিসপত্র?”

 

“না, সে-সব ব্যাঙ্কের লকারে থাকে।”

 

“তা হলে বাড়িতে ঢুকে কেউ আপনাকে মার্ডার করবে কেন? তাতে তার লাভ কী?”

 

“কেয়া মালুম!” মিসেস মিত্র বললেন, “কিন্তু আমি জানি যে, লোকটা আমাকে মার্ডার করতেই এসেছিল।”

 

“হালে যা ঘটেছে, তার কথা তো মোটামুটি বললেন। এবারে আগে যা ঘটেছে, তার কথা বলুন।”

 

“প্রথম ঘটনাটা ঘটে লাস্ট নভেম্বরে। কিছু কেনাকাটা করবার ছিল, তার জন্য ডাউনটাউনে যাই। তারপর মার্কেটিং শেষ করে ব্লাড প্রেশারটা চেক আপ করাবার জন্য যাই মেজর গুপ্তের চেম্বারে। চেম্বারটা কোথায় আপনি জানেন তো?”

 

“জানি। মুসৌরির রাস্তাটা যেখানে থেকে শুরু হয়েছে, তদ্দুর যেতে হয় না, তার একটু আগে।”

 

“রাইট। প্রেশার চেক করিয়ে চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসি, তারপর রাস্তা পার হয়ে চাবি লাগিয়ে আমার গাড়ির দরজা খুলতে যাচ্ছি, এমন সময়…”

 

মিসেস মিত্রকে বাধা দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি কি নিজেই ড্রাইভ করেন?”

 

“হ্যাঁ। তো রাস্তার উলটো দিকে গাড়িটা পার্ক করেছিলুম, চটপট রাস্তা পার হয়ে গাড়ির দরজা খুলতে যাচ্ছি, এমন সময় দারুণ স্পিডে একটা স্কুটার এসে আমাকে ধাক্কা মারে। ধাক্কা মেরে আর দাঁড়ায়নি, সঙ্গে-সঙ্গে পালিয়ে যায়।”

 

“বড়রকমের ইনজুরি হয়েছিল?”

 

“না, কোমর আর পায়ের দু-এক জায়গায় সামান্য ছড়ে গিয়েছিল মাত্র। মেজর গুপ্তের চেম্বারে ফিরে গিয়ে তক্ষুনি সে-সব জায়গায় ডেটল লাগিয়ে আসি। সেইসঙ্গে অবশ্য একটা এ. টি. এস. ইঞ্জেকশনও তিনি দিয়ে দেন। তারপর নিজেই গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরি, কোনও অসুবিধে হয়নি।”

 

“এটা জাস্ট একটা অ্যাক্সিডেন্টও তো হতে পারে, তাই না?”

 

“আমিও তা-ই ভেবেছিলুম।” মিসেস মিত্র বিষণ্ণ হাসলেন। “চওড়া ফাঁকা রাস্তা; এমনকি বৃষ্টি হয়নি বলে পিছলও নয়, তার মধ্যে হঠাৎ সোয়ার্ড করে ওইভাবে এসে আমাকে ধাক্কা মারার কোনও কারণই ছিল না, তবু ভেবেছিলুম যে, ড্রাইভারটা আনাড়ি, ব্যালান্স সামলাতে না-পেরে হঠাৎ ধাক্কা লাগিয়েছে, এটা একটা অ্যাকসিডেন্টই বটে। কিন্তু এখন আর তা ভাবতে পারছি না।”

 

“কেন?”

 

“যেহেতু ডিসেম্বরেও ওই একই ব্যাপার ঘটল। অ্যান্ড ইন দ্য সেম প্লেস। মেজর গুপ্তের চেম্বারের সামনে রাস্তা পেরোবার সময় আবারও সেই একইভাবে একটা স্কুটারের ধাক্কা খেলুম, আর রং দেখে মনে হল এটা সেই একই স্কুটার। আপনিই বলনু মিঃ ভাদুড়ি, এরপরেও কি ভাবা যায় যে, ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট?”

 

প্রশ্নটার উত্তর না-দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “থানায় গিয়ে ডায়েরি করিয়েছিলেন?”

 

“প্রথমবার করাইনি, দ্বিতীয়বার করিয়েছিলুম। ইন ফ্যাক্ট মেজর গুপ্তই বলেন যে, আমার থানায় যাওয়া উচিত।”

 

“এটা কতই ডিসেম্বরের ঘটনা?”

 

“বাইশে ডিসেম্বরের।”

 

“তারপরে তো দু’মাস কেটে গেল। পুলিশ কোনও হদিশ করতে পেরেছে?”

 

“না। তবে তার জন্যে পুলিশকে আমি দোষ দেব না।” মিসেস মিত্র বললেন, “পুলিশকে তো কোনও নম্বরই আমি দিতে পারিনি। মানে ধাক্কাটা লাগাতে আমি ভীষণ হকচকিয়ে যাই তো, স্কুটারের নম্বরটা যে টুকে রাখা দরকার, সেটাই তখন আমার খেয়াল ছিল না।”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “নম্বরটা টুকে রাখলেই যে খুব সুবিধে হত, তাও হয়তো নয়। মানে সত্যিই এটা যদি একটা জেনুইন অ্যাক্সিডেন্ট না হয়, তা হলে হয়তো দেখা যেত যে, লোকটা তার স্কুটারে একটা ফল্স নাম্বার-প্লেট লাগিয়ে তারপর আপনাকে ধাক্কা মেরেছে। যা-ই হোক, আর কিছু ঘটেছে ইতিমধ্যে?”

 

“জানুয়ারিতে ঘটেনি। অবশ্য জানুয়ারি মাসের বেশ কয়েকটা দিন দেরাদুনে আমি ছিলামও না।”

 

“কোথায় গিয়েছিলেন?”

 

“দিল্লিতে, আমার দাদার কাছে।” মিসেস মিত্র বললেন, “পারিবারিক কয়েকটা ব্যাপারে কিছু কথাবার্তা বলবার ছিল। তার মধ্যে একটা হল দাদার মেয়ের বিয়ে। এপ্রিল মাসের শেষে বিয়ে, অথচ টাকাপয়সার জোগাড়যন্তর হয়নি। তাই দিল্লি থেকে দাদা আমাকে ডেকে পাঠায়।”

 

‘কেন? টু হেলপ হিম আউট?”

 

“হ্যাঁ, তবে সরাসরি টাকাপয়সা দিয়ে নয়।” মিসেস মিত্র একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর সামান্য দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বললেন, “মিঃ ভাদুড়ি, আপনাকে বোধহয় কথাটা আর-একটু খুলে বলার দরকার। আমার বাবা মোটামুটি পরিণত বয়সেই মারা যান, তবে একেবারে হঠাৎ মারা গিয়েছিলেন বলে উইল করে যেতে পারেননি।”

 

“একেবারে হঠাৎই মারা গিয়েছিলেন মানে?”

 

“না না, কোনও ফাউল প্লের ব্যাপার নয়। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, ডাক্তার আসার আগেই সব শেষ। তো যা বলছিলুম। উইল করে যেতে পারেননি বলে তাঁর তাবৎ সম্পত্তির অর্ধেক মালিকানা আমার উপরে বর্তায়।”

 

“অর্ধেক কেন? আপনার বাবার আর কোনও ইস্যু নেই?”

 

“না। জাস্ট দাদা আর আমি। অবশ্য মা বেঁচে থাকলে তাঁরও একটা অংশ থাকত। কিন্তু মা আমার খুব ছেলেবেলাতেই মারা যান, তাঁর কথা আমার বিশেষ মনে পড়ে না। ওই আবছা-আবছা স্মৃতি বলতে যা বোঝায়, তার বেশি কিছু নয়।”

 

“সম্পত্তি নিয়ে কখনও কোনও বিরোধ ঘটেনি?”

 

‘কেন ঘটবে?” মিসেস মিত্র বললেন, “একে তো আমার কোনও অভাব নেই। তার উপরে আবার আমি খুব ভালই জানি যে, বাবা যদি উইল করবার সময় পেতেন, তা হলে দাদাকেই সব দিয়ে যেতেন, আমাকে একটা পাইপয়সাও দিতেন না।”

 

“কী করে জানলেন?”

 

সঙ্গে-সঙ্গে উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন মিসেস মিত্র। তারপর যখন মুখ তুললেন, তখন মনে হল, ভদ্রমহিলার যে মুখখানিকে এতক্ষণ খুবই শীর্ণ ও পাণ্ডুর দেখাচ্ছিল, হঠাৎ যেন তাতে একটু রক্তের ছোঁয়া লেগেছে। বললেন, “আমার বয়েস এখন আটতিরিশ। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে আমি মিঃ মিত্রকে বিয়ে করি।”

 

‘পালাবার দরকার হয়েছিল কেন?” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন। “বাবার মত ছিল না?”

 

“মত ছিল না বললে খুব কমই বলা হয়। একে তো বাবা চাননি যে, আমি একজন উইডোয়ারকে বিয়ে করি, তার উপরে…”

 

মিসেস মিত্রকে বাধা দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “দাঁড়ান, দাঁড়ান, আগের কথাটা আগে ঠিকমতো বুঝে নিই। আপনার সঙ্গে বিয়ের আগেও মিঃ মিত্রের একবার বিয়ে হয়েছিল?”

 

“হ্যাঁ, সেই স্ত্রী বিয়ের বছর দশেক বাদে মারা যান।”

 

“আপনাকে মিঃ মিত্র সে-কথা বলেছিলেন?”

 

“বলবার দরকার হয়নি। কথাটা সবাই জানত। দিল্লির রাজিন্দর নগরের কাছে আমরা একই রাস্তায় থাকতুম। পাড়ায় রটে যায় যে, বউটিকে বিষ খাইয়ে মারা হয়েছে। কে বিষ খাইয়েছে? না ওর স্বামী। আমার বাবা সে-কথা বিশ্বাসও করেছিলেন। সেই মানুষকে আমি বিয়ে করতে চাই শুনে বাবা খেপে যান।”

 

“যাওয়াই স্বাভাবিক। যার নামে অমন কথা রটেছে…”

 

“কিন্তু ওটা তো মিথ্যে রটনা।” মিসেস মিত্র বললেন, “কুড়ি বছর ওঁকে নিয়ে ঘর করছি। তাই বলতে পারি যে, মিঃ মিত্রের আর যত দোষই থাক, হি ইজ আ ভেরি অ্যাফেকশনেট ম্যান। হি কান্ট হার্ট আ ফ্লাই, মাচ লেস কিল আ হিউম্যান বিয়িং। অথচ বাবা সে-কথা বিশ্বাস করলেন। বাবার খেপে যাবার অবশ্য আরও একটা কারণ ছিল।”

 

“কী?”

 

“বয়েসের পার্থক্য। আমার বয়েস তখন আঠারো আর ওঁর বয়েস চল্লিশ। বাইশ বছরের ফারাক। বিশেষ করে আরও সেইজন্যেই তিনি খেপে যান। ফলে বাড়ি থেকে না-পালিয়ে আমার উপায় ছিল না।”

 

“বিয়ের পরে বাবার সঙ্গে দেখা করবার চেষ্টা করেছিলেন?”

 

“অনেকবার করেছি।” মিসেস মিত্র ম্লান হাসলেন। তারপর বললেন, “প্রতিবার একই উত্তর পেয়েছি। তিনি আমার মুখদর্শন করতে চান না।”

 

“উত্তরটা কি তিনি সরাসরি নিজেই দিতেন, নাকি কারও মারফত পাওয়া যেত?”

 

“দাদার মারফত বাবার কাছে বলে পাঠাতুম, জবাবও আসত দাদার মুখেই। তো সে-কথা থাক। যা বলছিলুম মিঃ ভাদুড়ি, একটা কথা আমি ভালই জানি। সেটা এই যে, বাবা যদি উইল করবার সময় পেতেন তো দাদাকেই সব দিয়ে যেতেন। বেঁচে থাকতে যে-মেয়ের মুখদর্শন করেননি, তাঁকে তিনি একটা কানাকড়িও দিয়ে যেতেন না। তা হলে আর তিনি যে উইল করে যেতে পারেননি, এই ব্যাপারটার সুযোগ আমি নিতে যাব কেন?”

 

“ভাল কথা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু আইনের চোখে তো আপনি অর্ধেক সম্পত্তির মালিক। দাদাকে যদি সেই অর্ধেক আপনি ছেড়ে দিতে চান, তো সেটাও তো নেহাত মুখে বললে হবে না, আইনত লিখে দিতে হবে। সেটা আপনি দিয়েছেন?”

 

“তা কেন দেব না।” মিসেস মিত্র বললেন, “বাবা যা কিছু সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন, তাঁর মৃত্যুর পরে-পরেই দাদা তার একটা ইনভেন্টরি তৈরি করে ফেলে।”

 

সদানন্দবাবু এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি। কিন্তু এবারে আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বললেন, “সেটা আবার কী?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিষয়সম্পত্তির লিস্টি। মানে তালিকা, ফর্দ, ফিরিস্তি।…হ্যাঁ, মিসেস মিত্র, তারপর?”

 

“আমার যা বলবার, তা তো দাদাকে আমি আগেই বলে দিয়েছিলুম। সেই অনুয়ারী দাদাও লিখিয়ে এনেছিল যে, ইনভেন্টরিতে যে-যে সম্পত্তির উল্লেখ করা হয়েছে, তাতে আমার অধিকার আমার দাদার অনুকূলে আমি ছেড়ে দিচ্ছি। বাস, সেই লেখার তলায় আমি সই করে দিই।”

 

“তা হলে তো ল্যাঠা মিটেই গেল।”

 

“না, মিঃ ভাদুড়ি, মিটল না। বছর পাঁচেক আগে আমার ঠাকুর্দার বাবার আমলে কেনা এমন একটা সম্পত্তির খোঁজ পাওয়া গেল, যেটা ওই ইনভেন্টরিতে ঢোকানো হয়নি। দাদার বড় মেয়ের তখন বিয়ের কথা চলছে, এদিকে দাদা তার তাবৎ সম্পত্তি বেচে দিয়ে সেই টাকা ব্যাবসায় ঢেলে বসে আছে, মেয়ের বিয়ে ধুমধাম করে দিতে চায়, অথচ হাতে তেমন-কিছু নেই, তাই আমাকে এসে বলল যে, এটার স্বত্বও যদি আমি ছেড়ে দিই তো প্রপার্টিটা বিক্রি করে সে মেয়ের বিয়ে দিতে পারে।”

 

“আপনিও তক্ষুনি স্বত্বত্যাগ করে সই করে দিলেন, কেমন?”

 

“তা দিলুম বই কী। যে বাবা মেয়ের মুখদর্শন করতে রাজি হননি, তাঁর সম্পত্তিতে যে আমার কোনও স্বত্ব থাকতে পারে, এটাই তো আমি মানি না।”

 

“তারপর? আর কোনও প্রপার্টির খোঁজ ইতিমধ্যে পাওয়া গেছে, যার উল্লেখ ওই ইনভেন্টরিতে নেই?”

 

কথাটা যে ব্যঙ্গ করে বলা, মিসেস মিত্র সেটা ধরতে পারলেন না। চোখ বড় করে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি জানলেন কী করে?”

 

“জানি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “অনুমান করছি মাত্র।”

 

“ঠিকই অনুমান করেছেন। এটাও আসলে আমার ঠাকুর্দার বাবার আমলে কেনা একটা অচার্ড। বাবার লাইব্রেরি-ঘরে পুরনো পাতা-ছেঁড়া একখানা মহাভারতের মধ্যে এর টাইটল-ডিডটা পাওয়া গেছে।”

 

“এদিকে আবার আপনার দাদার দ্বিতীয় মেয়ের বিয়ের কথা চলছে, তাই আপনার ডাক পড়েছিল, তাই দিল্লিতে গিয়ে ফের আপনি সই করে দিয়ে এসেছেন, কেমন?”

 

“না।” মৃদুস্বরে মিসেস মিত্র বললেন, “দাদা সই করতে বলেছিল। কিন্তু আমি করিনি।”

 

“কেন?”

 

“উনি…মানে মিঃ মিত্র চান না যে, আমি সই করি। আগেরবার অর্থাৎ দাদা যে বারে ইনভেন্টরি তৈরি করে এনেছিল সেবারে অবশ্য উনি কোনও আপত্তি করেননি। কিন্তু পরের দু’ধারেই উনি আপত্তি করেন। প্রথমবারে আমি শুনিনি, কিন্তু এবারে মনে হচ্ছে সই করলে উনি ভীষণ চটে যাবেন।”

 

“কী বলেন মিঃ মিত্র?”

 

“বলেন যে, যে-দাদা শুধু নিজের নামে সম্পত্তি লিখিয়ে নেবার জন্যে বোনকে ডেকে পাঠায় সে কেমন দাদা? তা ছাড়া, বাবা যে আমাকে কিছু দিতে চাননি, এটাও উনি বিশ্বাস করেন না। ওঁর ধারণা, তিনি আমার উপরে রেগে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার জন্যে যদি আমাকে পুরোপুরি ডিসইনহেরিট করতেই চাইতেন তো পুরো সম্পত্তি দাদাকেই লিখে দিয়ে যেতেন। উনি সে-কথা বলেনও। বারবার বলেন যে, ইচ্ছে করেই বাবা উইল করেননি। আসলে তিনি নাকি চেয়েছিলেন, সম্পত্তির উপর আমার অধিকারটাও বজায় থাক। উইল না-করার সেটাই নাকি কারণ। তো আপনিই বলুন, এর চেয়ে তাজ্জব কথা কিছু হতে পারে?”

 

“আপনি এটাকে যতটা তাজ্জব বলে ভাবছেন, আমি কিন্তু ততটা তাজ্জব বলে ভাবছি না, মিসেস মিত্র। ইন ফ্যাক্ট ইয়োর হ্যাজব্যান্ড হ্যাজ এ পয়ন্ট দেয়ার। এ ভেরি ভ্যালিড পন্ট। কিন্তু সে-কথা থাক, এবারে বরং আগের কথায় ফিরে যাই। জানুয়ারি মাসে তো আপনার উপর কোনও হামলা হয়নি। তা হলে ফেব্রুয়ারি মাসের…”

 

“সাত তারিখে…”

 

“সাত তারিখে কী হয়েছিল?”

 

“উনি সেদিন বাড়িতে ছিলেন না, টুরে গিয়েছিলেন।” মিসেস মিত্র বললেন, “আমি একাই একটা নেমন্তন্ন রাখতে যাই। ফিরতে-ফিরতে রাত ন’টা সাড়ে ন’টা বাজে। গাড়ি গারাজ করে বাড়িতে ঢুকি। চৌকিদার তার ঘরে ছিল। তাকে ডাকিনি। শোবার ঘরে ঢুকে আলোর সুইচ টিপতেই প্ৰচণ্ড শক খাই। ব্যাগ থেকে টর্চ বার করে জ্বালতে দেখি, আলোর সুইচের ঢাকনা নেই, তারটা এক্সপোজড হয়ে আছে। কী বলবেন আপনি? এটাও একটা অ্যাক্সিডেন্ট?”

 

ভাদুড়িমশাই প্রশ্নটার কোনও উত্তর দিলেন না। বললেন, “আমাকে আপনি ডেকেছেন কেন? স্রেফ এই ঘটনাগুলোর কথা শোনাতে?”

 

মিসেস মিত্র বললেন, “আমার স্বামী যে তাঁর ব্যাপারটা নিয়ে ইনভেস্টিগেট করবার জন্য আপনাকে এখানে আনিয়েছেন, তা আমি জানি। কিন্তু আমি চাই যে, আমার উপরে এই যে বারবার হামলা হচ্ছে, এটার তদন্তও আপনিই করুন। শুধু একটা অনুরোধ। আমি যে এ-সব কথা আপনাকে বলেছি, আমার স্বামীকে তা জানানো চলবে না!”

 

“কেন? জানাতে অসুবিধে কোথায়?”

 

“তাও বুঝতে পারছেন না?” মিসেস মিত্র উত্তেজিত গলায় বললেন, “ঠিক আপনারই মতন তিনিও মনে করেন যে, এর কোনওটা স্রেফ অ্যাক্সিডেন্ট, আর কোনওটা আমি বানিয়ে বলছি। তাঁর ধারণা আমি নিউরোসিসের রুগি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার কেসটা নিতে আমার অসুবিধে আছে। তবে আপনি যে নিউরোসিসের রুগি, তা কিন্তু আমি মনে করি না।”

 

“তা হলে? তা হলে আমার কেসটা আপনি নেবেন না কেন?”

 

বাইরে একটা গাড়ির শব্দ পাওয়া গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “সম্ভবত আপনার স্বামী। এগারোটায় ফিরবার কথা, আমার ঘড়িতে কিন্তু সাড়ে দশটাও বাজেনি।”

 

মিসেস মিত্র ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে-বলতেই সামনের বারান্দা থেকে মাধব মিত্র ঘরে এসে ঢুকলেন। হাতের ব্যাগটা একটা টেবিলের উপরে রেখে ধপ করে একটা সোফার উপরে বসে বললেন, “আরে কী কাণ্ড! সাবিত্রীর কাছে শুনলুম যে, আপনারা এখানে, আর আমি কিনা আপনাদের খোঁজে হোটেলে গিয়ে শুনি আপনারা সেখানে নেই। তাই ভাবছিলুম যে, হয়তো কোথাও বেড়াতে বেরিয়েছেন। স্রেফ আমারই এখানে চলে এসেছেন তা তো কল্পনাও করিনি। তারপর মিঃ ভাদুড়ি খবর কী বলুন।”

 

“খবর তো আপনি দেবেন। তিন-তিনটে দিন আপনার কোনও পাত্তা নেই। কোথায় ছিলেন?”

 

“সব বলছি।” মিঃ মিত্র বললেন, “কিন্তু সাবিত্রী, তার আগে এক গেলাস জল খাওয়াও দেখি।” মিসেস মিত্র সোফা ছেড়ে উঠতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই একটা ট্রে’র উপরে জলের বোতল আর একটা গ্লাস নিয়ে যে-মেয়েটি ঘরে এসে ঢুকল, বুঝলুম যে, সে এই বাড়ির পরিচারিকা। গাড়োয়ালি মেয়ে, বয়েস মনে হল বছর পঁচিশ-তিরিশ। সেন্টার টেবিলের উপরে ট্রেটা নামিয়ে রেখে মেয়েটি আবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

 

বোতল থেকে গ্লাসে জল ঢালতে ঢালতে মাধব মিত্র বললেন, “তারপর সাবিত্রী, এর মধ্যে আবার তোমার উপরে ফের অ্যাটক-ফ্যাটাক হয়েছিল নাকি?”

 

কথাটা এমন লঘুস্বরে বললেন যে, তাতেই বুঝলুম, মিসেস মিত্র মিথ্যে বলেননি। তাঁর স্ত্রীকে যে সত্যিই কেউ মারবার চেষ্টা করতে পারে, মাধব মিত্র তা বিশ্বাস করেন না।

 

মিসেস মিত্র বললেন, “আমার কথা তোমার না-ভাবলেও চলবে। তুমি কোথায় ছিলে বলো। অন্তত একটা খবর তো দিতে হয়, কাল রাত্তিরের আগে পর্যন্ত তাও তো দাওনি।”

 

“ওটা অন্যায় হয়ে গেছে।” মাধব মিত্র মাথা চুলকে বললেন, “তবে কিনা এমন অন্যায় যে এই প্রথম হল, তা তো নয়, তাই ভাবছিলুম যে, তুমি নিশ্চয় খুব একটা চিন্তা-টিন্তা করবে না।”

 

সাবিত্রী বিষণ্ণ হাসলেন। “সত্যি তুমি পারো বটে। তা কোথায় ছিলে এই ক’টা দিন?”

 

“বাঃ, কাল রাত্তিরে যখন ফোন করি, তখন সে-সব কথা বলিনি?”

 

“কোথায় আর বললে। আজ এগারোটা নাগাদ বাড়িতে এসে পৌঁছচ্ছ স্রেফ এইটুকু বলেই তো লাইন কেটে দিলে দেখলুম।”

 

“এঃ হে, এটা তো তক্ষুনি বলে দেওয়া যেত।” মাধব মিত্র অপরাধীর মতন কুণ্ঠিত গলায় বললেন, “না না, খুব অন্যায় হয়ে গেছে। আসলে কী হয়েছিল জানো, অনেক রাত্তিরে ফোন করেছিলুম তো, ভাবলুম যে, তোমার শরীর খারাপ, এখন আর বকর বকর করে তোমাকে জাগিয়ে রাখা ঠিক হবে না, তাই আর কথা বাড়াইনি।”

 

সাবিত্রী হাসলেন। শুকনো হাসি। মনে হল, স্বামীর কথাটা তিনি বিশ্বাস করেননি। বললেন, “বাব্বা, আমাকে নিয়েও তা হলে ভাবছ আজকাল?”

 

“বাঃ, তোমার শরীর খারাপ, আর আমি ভাবব না?”

 

“একটু-আধটু ভাবলে তো ভালই হয়।” সাবিত্রী বললেন, “কিন্তু ও-কথা থাক, গিয়েছিলে কোথায়?”

 

“আরে সেই কথাই তো বলছি।” কিন্তু-কিন্তু ভাবটা কেটে গিয়ে এতক্ষণে আবার মাধব মিত্রের মুখে হাসি ফুটল। “প্রথমে গিয়েছিলুম রুরকিতে। তারপর যাই মজফ্ফরনগরে। তারপর সেখান থেকে দিল্লিতে।”

 

বলতে-বলতে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে মুখ ফেরালেন মাধবানন্দ। একগাল হেসে বললেন, “একটা ভাল খবর দিই মিঃ ভাদুড়ি। টাকার সমস্যাটা মিটেছে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইউ মিন সেই আড়াই লাখ টাকা?”

 

মাধব মিত্র বললেন, “রাইট। পরশু রাতেই দিল্লি থেকে টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। কাল সকালে মুসৌরিতে পৌঁছই। ওঙ্কারমল মুসৌরিতেই ছিল। তার গদিতে গিয়ে আড়াই লাখ টাকা ফেরত দিই। প্লাস এই ক’দিন টাকাটা যে আমাদের কাছে ছিল, তার ইন্টারেস্ট বাবদে আরও দশ হাজার। ওটা হচ্ছে অ্যাডভান্স নিয়েও বাগান না-বেচার খেসারত। এগ্রিমেন্টে ওইরকমই লেখা ছিল। ব্যাটা এক পয়সাও ছাড়ল না।”

 

“কাল সকালে যে মুসৌরিতে এলেন, ওখানে উঠেছিলেন কোথায়?”

 

“কোথাও না। বিস্তর কাজ ছিল তো, তাই আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে একটা ল্যান্ডরোভার নিয়ে সারাটা দিন স্রেফ এখানে-ওখানে দৌড়ে বেরিয়েছি। তার মধ্যে আবার মিউনিসিপ্যালিটি একটা ঝঞ্ঝাট বাধিয়ে রেখেছে, ফলে ওখানকার এক কমিশনারের বাড়িতেও যেতে হয়েছিল। বাড়িটা শাস্ত্রী টেনিং ইনস্টিটিউটের ওদিকে। সেখানে গিয়ে বিস্তর তেল মাখাতে হল।”

 

সাবিত্রী বললেন, “কেন?”

 

মাধব মিত্র বললেন, “বাঃ, তাও বুঝিয়ে বলতে হবে? জাস্ট টু কিপ দ্যাট ওলড ফ্রগ ইন গুড হিউমার।”

 

শুনে আমরা হাসলুম বটে, কিন্তু সাবিত্রী হাসলেন না। কঠিন গলায় বললেন, “ও-সব ছেঁদো কথা বাদ দিয়ে, কী হয়েছিল সেটা সাফ সাফ বাতাও।”

 

মাধব মিত্র একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। পকেট থেকে একটা ডিবে বার করে তার ভিতর থেকে রুপোলি তবকে মোড়া গুটিকয় এলাচদানা বার করে নিয়ে মুখের মধ্যে পুরে দিলেন সেগুলো, তারপর বললেন, “শুনলে তুমি রেগে যাবে সাবিত্রী। কিন্তু এ ছাড়া কোনও উপায় তো ছিল না। সিনেমা হলটার রেনোভেশন করতে গিয়ে…ওই দ্যাখো, যা বলেছি, তুমি ঠিক রেগে যাচ্ছ।”

 

কথাটা যে মিথ্যে নয়, সাবিত্রী দেবীর মুখচোখ দেখেই সেটা বোঝা যাচ্ছিল। একটু আগেই ভদ্রমহিলাকে যতটা শান্ত নিরীহ ও কোমল বলে মনে হয়েছিল, এখন সন্দেহ হল, তা তিনি নন। বেশ ঝাঁঝালো কঠিন গলায় বললেন, “প্লিজ কাম টু দ্য পয়ন্ট, অমন ইধার উধার কোরো না। ফের তুমি আইন ভেঙেছ, কেমন?”

 

“ওয়েল, ইউ ক্যান সে দ্যাট। বাট ইটস আ মাইনর ম্যাটার। এ-রকম আকছার হচ্ছে। তাই নিয়ে এত ফাস করবার…”

 

কথাটা শেষ হল না। স্বামীকে বাধা দিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, “হোটেলের ব্যাপারে যা হয়েছিল, দেখা যাচ্ছে যে, তাতেও তোমার শিক্ষা হয়নি। তোমার বিবেচনায় সেটাও ছিল একটা মাইনর ম্যাটার। অন্তত তখন তুমি তাই-ই বলেছিলে। অথচ তার জন্য নর্মালি যা ফাইন হবার কথা, তার তিনগুণ ফাইন যখন ধরা হল, তখন তুমি কিছুই করতে পারলে না। উই হ্যাড টু পে গ্লু আওয়ার নোজ।”

 

“না না, এবারে এটা সত্যি খুব সামান্য একটা ব্যাপার।” যেন আমরা তাঁকে নিশ্চয়ই সমর্থন করব, এই ভরসায় তাঁর স্ত্রীর দিক থেকে আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে মাধব মিত্র বললেন, “বিনা লাইসেন্সে হোটেলের মধ্যে হার্ড ড্রিংকস পরিবেশন করা…মানে লাইসেন্সটা তখনও পাইনি ঠিকই, তবে দু-একদিনের মধ্যেই পেয়ে যাব এইরকম একটা অ্যাসুরেন্স পেয়েছিলুম…তো ওটা আর এটা কি এক ব্যাপার হল?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এটা যে কী ব্যাপার, তা তো এখনও শুনিইনি।”

 

“বলছি, বলছি।” মাধব মিত্র বললেন, “সিনেমা হলটার রেনোভেশনের সময় অল্প কিছু রিস্ট্রাকচারিংয়ের দরকার হয়। তার জন্যে একটা প্ল্যানও আমরা সাবমিট করেছিলুম। মিউনিসিপ্যালিটির বিলডিং কমিটি সেটা অ্যাপ্রুভও করে। বাট অফ কোর্স উইথ সাম মাইনর চেঞ্জেস। কিন্তু আমার ম্যাসনরির কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল তো…”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে কী, প্ল্যান অ্যাপ্রুভড হয়ে আসার আগেই রাজমিস্ত্রির কাজ শেষ হয়ে গেল?”

 

সাবিত্রী মিত্র বললেন, “তা হলেই বুঝুন, উনি কী রকমের মানুষ। উনি যা-ই করেন, এইরকম হুটহাট করে করেন। পরে তার জন্যে পস্তাতে হয়। আমার কথা, যা বেআইনি কাজ, তা তুমি করবে কেন?”

 

মাধব মিত্র বললেন, “না করে উপায় কী। কবে প্ল্যান অ্যাপ্রুভড হয়ে আসবে, তার জন্যে কি সব কাজ ফেলে রাখা হবে? ফেলে রাখা সম্ভব? না মশাই ও ভাবে কাজ করা যায় না…আই মিন একা আমি নই, সকলেই এ-রকম করে থাকে…না করে উপায় নেই।”

 

সাবিত্রী দেবী বললেন, “কিন্তু মিউনিসিপ্যালিটি এখন বলছে যে, তারা যে-সব অদল-বদলের কথা বলেছিল তুমি সেগুলো করোনি বলে রিস্ট্রাকচারিংয়ের কাজ যেটুকু যা হয়েছে, তা ভেঙে ফেলতে হবে, এই তো?”

 

মাধব মিত্র হেসে বললেন, “মামার বাড়ি আর কি। তারাও বলল আর আমিও ভেঙে ফেললুম। আরে না না, ভাঙছি না। ভাঙতে হলে আর কমিশনার চৌবেজির বাড়িতে যাব কেন? তাঁর কাছ থেকে কথা আদায় করে ছেড়েছি যে, ভাঙতে যাতে না হয়, তিনি সেটা দেখবেন।”

 

সাবিত্রী দেবী তাঁর স্বামীকে একেবারে স্থির দৃষ্টিতে বিদ্ধ করে রেখেছিলেন। চোখ একটুও না-সরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কত দিতে হল?”

 

“কাকে?”

 

“তোমার বে-আইনি কনস্ট্রাকশন যাতে ভাঙতে না হয়, সেটা যিনি দেখবেন বলে কথা দিয়েছেন তাঁকে। …ও কী, অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছ কেন, তাঁকে কিছু দিতে হয়নি?”

 

মাধবানন্দ আমতা-আমরা করে বললেন, “চৌবেজির কথা বলছ তো?”

 

“তা ছাড়া আর কোন মহাপুরুষের কথা বলব। তাঁকে কত দিলে?”

 

মাধব মিত্তির একেবারে নিভে গিয়েছিলেন। বললেন, “দশ হাজার, প্লাস এক বোতল প্রিমিয়াম স্কচ। ব্যাটা দু’ বোতল চেয়েছিল, অনেক কষ্টে এক বোতলে রফা করেছি। তা ছাড়া আরও দু’চারজনকে দু’তিন হাজার করে দিতে হল। কিছু আউটস্ট্যান্ডিং বিলও অবশ্য মিটিয়ে দিয়েছি। ফলে .এখন মোট আর দু’লাখ সাত হাজার হাতে রইল।”

 

“আউট অব…?” প্রশ্নটা সাবিত্রী দেবীর।

 

“আউট অব পাঁচ লাখ।”

 

“ওটা কোত্থেকে জোগাড় হল? ধার?”

 

“না না, ধার করিনি।” মাধব মিত্র বললেন, “দিল্লিতে আমাদের পুরনো বাড়িটায় তো এখন আর কেউ থাকে না, তাই ঠিক করেছিলুম যে, ওর যে-অংশটা আমার, সেটা বেচে দেব। যার সঙ্গে কথা হল, সে পাঁচ লাখ অ্যাডভান্স করেছে, বাকি পাঁচ লাখ টাইটেল ট্রান্সফারের সময় দেবে।”

 

“মাত্র দশ লাখ? দিল্লিতে? তাও প্যাটেল-নগরের মতো জায়গায়? ওখানে রিয়্যাল প্রপার্টির দাম তো এখন হুহু করে বাড়ছে!”

 

“কী করব বলো। একটু সময় দিতে পারলে নিশ্চয় আরও লাখ-পাঁচেক পাওয়া যেত। কিন্তু সময় আমি পাচ্ছি কোথায় সাবিত্রী। ওঙ্কারমল তো আমায় প্রায় পাগল করে তুলেছিল!”

 

“কাকে বিক্রি করলে?”

 

“সেটাই হচ্ছে মজার ব্যাপার। শ্যামনন্দন শেঠিয়াকে। লোকটা প্রথমে দশ লাখও দিতে চাইছিল না। বুঝে গিয়েছিল যে, এটা ড্রিসট্রেস সেল, টাকাটা আমার এক্ষুনি চাই, চাপ দিলে আমি হয়তো সাত লাখেই রাজি হয়ে যাব। কিন্তু যেই শুনল ওঙ্কারমলের প্যাঁচ থেকে বেরিয়ে আসবার জন্যে আমি বাড়ি বিক্রি করছি, অমনি দশ-লাখে উঠে বলল, ‘পাঁচ লাখ অ্যাডভান্স লিয়ে যান মিত্ৰাসাব, ওই বদমাসটাকে থোড়াসা শিক্ষা দিয়ে দিন।” ভাবা যায়?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা কেন যাবে না। বিজনেসের ব্যাপারে শ্যামনন্দন আর ওঙ্কারমলের মধ্যে নিশ্চয় কোনও পুরনো রাইভ্যালরির ব্যাপার আছে। ওঙ্কারমলের কাছে ও হয়তো কখনও কোনও চোট খেয়ে থাকবে। এবারে ওঙ্কারমলের বাগান কেনা ভেস্তে দিয়ে তার শোধ তুলল। কিন্তু কেন যে লোকটা আড়াই গুণ দাম দিয়ে বাগানটা কিনতে চাইছিল, সেটাই তো বুঝতে পারছি না।”

 

সাবিত্রী মিত্র বললেন, “অনেক বেলা হল। দুপুরের খাওয়াটা আপনারা আজ বরং এখানেই সেরে যান।”

 

ভাদুড়িমশাই দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “ধন্যবাদ। কিন্তু নেমন্তন্নটা আজ রাখতে পারছি না, একটু কাজ রয়েছে, দুপুরের মধ্যে মুসৌরিতে ফিরতেই হবে। একটা ট্যাক্সি ডেকে দেওয়া সম্ভব?”

 

মাধবানন্দ বললেন, “ট্যাক্সির দরকার হবে না। আমাদের ড্রাইভার বির্জ এক হপ্তার ছুটি নিয়ে তার গাঁয়ের বাড়িতে গিয়েছিল, সে ফিরে এসেছে দেখছি। ও-ই আমাদের গাড়িতে করে আপনাদের মুসৌরিতে ছেড়ে দিয়ে আসবে।”

 

সাবিত্রী মিত্র বললেন, “এক কাজ করা যাক। মেজর গুপ্তের চেম্বার তো পথেই পড়বে, আমাকে যদি সেখানে ছেড়ে দেন তো প্রেশারটা একবার দেখিয়ে নিতে পারি। ক’দিন ধরেই মাথাটা খুব ঘুরছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেখান থেকে আপনি আবার ফিরে আসবেন কী করে? বলেন তো আমরাই আবার আপনাকে এখানে পৌঁছে দিতে পারি।”

 

“ও নিয়ে ভাববেন না।” সাবিত্রী হেসে বললেন, “এখন তো মোটে সাড়ে এগারোটা বাজে। ওঁর চেম্বার মোটামুটি সাড়ে বারোটায় বন্ধ হয়। সেই সময়ে উনি বাড়িতে খেতে আসেন। আমরা তো একই পাড়ার বাসিন্দা, ওঁরই গাড়িতে তাই ফিরে আসতে পারব।”

 

মাধবানন্দ বললেন, “তা হলে তো ভালই হয়।”

 

সাবিত্রী বললেন, “যাই, তা হলে কাপড়টা পালটে আসি। আপনারা কথা বলুন, আমার তিন মিনিটের বেশি লাগবে না।”

 

কথাটা বলতে-বলতে তিনি ফের বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলেন।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জানবার আছে মিঃ মিত্র।…অফ কোর্স ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।”

 

“না না, মাইন্ড করবার কী আছে।” মাধবানন্দ বললেন, “কী জানতে চান বলুন।”

 

“কাল রাত্তিরে আপনি কোথায় ছিলেন?”

 

“কেন, আমার হোটেলে। মানে আপনারা যেখানে আছেন, সেই ভ্যালি-ভিউতেই।” মাধবানন্দ বললেন, “তবে হ্যাঁ, মুসৌরিতে কাজ তো নেহাত কম ছিল না, সে-সব মিটিয়ে হোটেলে ফিরতে-ফিরতে তা ধরুন রাত প্রায় বারোটা বেজে যায়। ভাবলুম, আপনারা নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছেন, তাই আর ডিসটার্ব করিনি।”

 

বিজুকে খবর পাঠনো হয়েছিল। সাদা রঙের একটা অ্যাম্বাসাডার গাড়ি নিয়ে সে বারান্দার সামনে ড্রাইভওয়েতে এসে দাঁড়াল। সাবিত্রী মিত্রও বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ইতিমধ্যে। শাড়ি-ব্লাউজ পালটে এসেছেন। সামান্য প্রসাধনও করে থাকবেন। কেননা, চোখের কোলে যে কালি দেখে ভদ্রমহিলাকে এতক্ষণ খুবই রুগ্ন বলে মনে হচ্ছিল, এখন দেখলুম সেটা নেই। যতই হালকা করে হোক, ঠোটেও যে এরই মধ্যে একটু লিপস্টিক বুলিয়ে নিয়েছেন, সেটাও আমার নজর এড়াল না। গাড়িতে উঠতে-উঠতে স্বামীকে বললেন, “মারুতিটা রইল। ওর সেলফটা একটু ট্রাবল দিচ্ছে। একজন মেকানিককে ডাকিয়ে এনে যদি একটু দেখিয়ে নাও তো বড্ড ভাল হয়।”

 

ফাঁকা রাস্তা। মেজর গুপ্তের চেম্বারে পৌঁছতে দশ মিনিটের বেশি লাগল না। তারই মধ্যে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে সাবিত্রী দেবীর যে কথা হয়, তা এখানে জানিয়ে রাখি:

 

ভাদুড়িমশাই : আপনাদের ড্রয়িং রুমে যে দুটি পোরট্রেট দেখলুম, তার একটি তো আপনি বললেন আপনার বাবার, আর অন্যটি আপনার ঠাকুর্দার।

 

সাবিত্রী : হ্যাঁ। দু’জনেই খুব দাপুটে লোক ছিলেন।

 

ভাদুড়ি :সে তো ওঁদের ছবি দেখেই বোঝা যায়। তা ওঁদের নামটা তখন বলেননি।

 

সাবিত্রী : আমার পিতাজির নাম সুরপতি মালিক আর দাদাজির নাম সীতাপতি মালিক।

 

ভাদুড়ি : মালিক?…মানে ওই যিনি ইউ.পি.-র গবর্নর হয়েছিলেন, আপনারা কি সেই বিধুভূষণ মালিকের আত্মীয় নাকি?

 

সাবিত্রী : না না, ওঁরা হচ্ছেন বসু-মালিক।

 

ভাদুড়ি : আর আপনারা?

 

সাবিত্রী : আমাদের ফ্যামিলি-নেম আসলে দত্ত। তবে হ্যাঁ, আমাদের টাইটেলও মালিক। পিতাজির কাছে শুনেছি যে, টাইটেলটা আমরা মোগল আমলে পেয়েছিলুম।

 

গাড়ি এসে মেজর গুপ্তের চেম্বারের সামনে দাঁড়াতেই সাবিত্রী দেবী বাঁ দিকের দরজা খুলে রাস্তায় নেমে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন। ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “হ্যাঁ।” ভদ্রমহিলা রাস্তা পার হয়ে চেম্বারে ঢুকলেন। আমরা মুসৌরির পথ ধরলুম। সারাটা পথ সেই দু’দিকের নিসর্গ-চিত্র দেখতে দেখতেই কেটে গেল। কোনও কথা হল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *