বরফ যখন গলে (ভাদুড়ি-গোয়েন্দা) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
আজ বুধবার। ২৩ ফেব্রুয়ারি। দুন এক্সপ্রেসে ফার্স্ট ক্লাসের দুটো বার্থ পেতে কোনও অসুবিধে না-হওয়ায় আজই সকালে বহাল তবিয়তে আমরা দেরাদুনে এসে পৌঁছই। বললুম বটে বহাল তবিয়তে’, তবে সদানন্দবাবুর তবিয়ত ঠিক থাকলেও আমার তবিয়ত বিশেষ ভাল ছিল না, রওনা হবার আগের দিন রাত্তিরে হঠাৎ ঠাণ্ডা লেগে গিয়ে একটু সর্দি-জ্বরের মতন হয়েছিল। কিন্তু সদানন্দবাবুকে সে-কথা জানিয়ে যেই বলেছি যে, পথের মধ্যে জ্বরটা বেড়ে গেলেই তো মুশকিল, অমনি তিনি চোখ পাকিয়ে বললেন, “ধুর মশাই, আপনার কিসসু হয়নি। তবে হ্যাঁ, ওই যাকে হাইপোকনড্রিয়া না কী যেন বলে, সেইটে হয়তো হয়ে থাকতে পারে।” বুঝতে পারলুম, অরুণ সান্যালের মুখে শুনে অবধি শব্দটা তাঁর খুব মনে ধরেছে, ওটা এখন মাঝেমধ্যেই আমাদের শুনতে হবে।
ভাদুড়িমশাইকে দেরাদুন স্টেশনে হাজির থাকতে দেখে অবাক হইনি। তার কারণ, মুসৌরির যে হোটেল থেকে তিনি কলকাতায় ফোন করেন, বুদ্ধি করে বাসন্তী তার ফ্যাক্স-নাম্বারটা নিয়ে রেখেছিল। রিজার্ভেশনের ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ামাত্র আমিও তাই আমার অফিস থেকে সেখানে ফ্যাক্স করে তাঁকে জানিয়ে দিই যে, ২৩ তারিখ দুন এক্সপ্রেসে আমরা দেরাদুনে পৌঁছচ্ছি। ভাদুড়িমশাই ট্যাক্সি নিয়েই এসেছিলেন। সেই ট্যাক্সিতে উঠে শহরের চৌহদ্দি ছাড়াবার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় পাহাড়টাকে চক্কর মেরে উপরে উঠবার পথ।
মুসৌরিতে এই যে আমি প্রথম যাচ্ছি, তা নয়। প্রথম গিয়েছিলুম ১৯৭৭ সনে। তারপর আরও বার দুয়েক সেখানে গিয়েছি। কিন্তু সদানন্দবাবুর কথা আলাদা। ছেলেবেলায় একবার দেওঘরে গিয়েছিলেন, তারপর বছর কয়েক আগে আমাদের সঙ্গে একবার গিরিডি যান। ইতিমধ্যে একবার পুরী থেকেও ঘুরে এসেছেন। যদি বলি যে, এই তিনটে জায়গার কথা বাদ দিলে বঙ্গভূমির বাইরে তিনি এর আগে আর কখনও পদার্পণ করেননি তা হলে খুব কমই বলা হবে। আসলে আমাদের কলকাতা শহরের বাইরেই আর কখনও পা রাখেননি তিনি। ফলে এখানে এসে যা-কিছু দেখছেন, তাতেই যেন অবাক হয়ে যাচ্ছেন।
পাহাড়িয়া পথে ঘুরতে-ঘুরতে গাড়ি যখন উপরে উঠছে, তখন সেটা বলেও ফেললেন তিনি। “হ্যাঁ মশাই, শিলিগুড়ি থেকে ওই যে সবাই দার্জিলিঙে যায়, সেখানেও শুনিচি এই রকমের ঘুরপথে পাহাড়ে উঠতে হয়। সত্যি?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ষোলো-আনার উপরে আঠারো-আনা সত্যি। তবে শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পৌঁছতে যে সময় লাগে, এখানে তার চেয়ে অনেক কম লাগবে। রাস্তা অনেক কম তো।”
“কিন্তু ওদিকে শুনিচি যেমন মোটরগাড়িতে, তেমন রেলগাড়িতে চড়েও পাহাড়ে ওঠা যায়, কিন্তু এদিকে তো শুধু মোটরগাড়িই দেখচি, রেলগাড়ি তো কই দেখচি না।”
“থাকলে তো দেখবেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “রেলগাড়িতে চড়ে পাহাড়ে ওঠার ব্যবস্থা যেমন দার্জিলিঙে, তেমন আরও দু-একটা জায়গায় আছে অবিশ্যি; যেমন ধরুন নীলগিরিতে আছে। এখানে নেই। কিন্তু সে-কথা থাক, জায়গাটা কেমন লাগছে বলুন তো।”
“দারুণ। একেবারে ছবির মতন।” সদানন্দবাবু বললেন, “তা আসবার পথে হরিদ্বার বলে যে একটা ইস্টিশান দেখলুম, ওটাই কি সেই হরিদ্বার নাকি…মানে লোকে যেখানে তিথ্যি করতে যায়?”
“ঠিক ধরেছেন। তা আপনিও যাবেন নাকি? গেলে কিন্তু হরকি পৈরিতে একটা ডুব দিয়ে আসতে পারেন। তবে এখন নয়, কাজটা আগে শেষ হোক, তারপর যাবেন।”
বললুম, “যাঁর কাজ, সেই মাধব মিত্তিরকে তো দেখছি না, তাঁর খবর কী? ভদ্রলোক ভাল আছেন তো? নাকি ইতিমধ্যে ফের হামলা হয়েছে তাঁর উপর?”
“হামলা আর হয়নি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে আগরওয়ালের সেই অ্যাডভান্সের টাকাটা ওঁকে ফেরত দিতে হবে তো। সেটা এখনও জোগাড় করতে পারননি বলে ভদ্রলোক একটু মুশকিলে রয়েছেন। বাগানটা বেচতে চান না, এদিকে আবার দাদনের টাকা খেয়ে বসে আছেন, সেটা যদি না ওগরাতে পারেন তো বাগান শেষ পর্যন্ত বেচতেই হবে, তা ছাড়া উপায় নেই।”
“বেচতে চান না কেন, তা নিয়ে কিছু বললেন?”
“বলেছেন। কিন্তু যা বলেছেন, তাতে চিঁড়ে যদি-বা ভেজে, মারোয়াড়ি বিজনেসম্যানের মন ভিজবে বলে মনে হয় না।”
“কী রকম?”
“বলছেন যে, এমনিতে তো তাঁর বেচতে কোনও আপত্তি ছিল না, কিন্তু মুশকিল হয়েছে অন্য জায়গায়।”
“কীসের মুশকিল?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “বাগানের মধ্যে একটা শিবমন্দির রয়েছে, আর মাধব মিত্তিরের ঠাকুর্দা নাকি স্বপ্নাদেশ পেয়ে সেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তো বাগান ছাড়লে যে মন্দিরটাও ছাড়তে হয়, এইটে ভেবে মাধব মিত্তির এখন পিছিয়ে আসতে চাইছেন। বুঝুন ব্যাপার!”
সদানন্দবাবু যখন দু’ চোখ ভরে বাইরের নিসর্গদৃশ্যে উপভোগ করছিলেন, তখনও যে তাঁর কান ছিল আমাদের আলোচনার দিকে, সেটা তাঁর কথা শুনে বুঝতে পারলুম। ট্যাক্সির জানলার বাইরে চোখ রেখেই তিনি বললেন, “বারাসতের বাগানেও কিন্তু একটা শিবমন্দির আছে, মশাই। এদিকে আবার সেই বাগানটা যে কিনেছে, তার নামও কিন্তু ওঙ্কারমল আগরওয়াল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তার মানে?”
সদানন্দবাবু এবারেও চোখ ফেরালেন না, যেমন বাইরের দৃশ্য দেখছিলেন তেমনি দেখতে-দেখতে বললেন, “উঃ, এত সব দেখা যে ভাগ্যে ছিল, তা তো ভাবতেই পারিনি।…ও কিরণবাবু, বারাসতের ব্যাপারটা আপনিই ভাদুড়িমশাইকে বুঝিয়ে বলুন না।”
বার্তাবহ কাগজে যেটুকু যা বেরিয়েছিল, ভাদুড়িমশাইকে সেটা বলতে-বলতে দেখি ট্যাক্সি এসে মুসৌরির গান্ধী চকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
ভাদুড়িমশাইয়ের হোটেলের নাম যে ‘হোটেল ভ্যালি-ভিউ’, সে-খবর কলকাতায় থাকতেই পেয়েছিলুম, তবে কিনা সেটা যে গান্ধী-চকের এত কাছে, তা ভাবিনি। এর আগের বারে যখন মুসৌরিতে আসি, তখন ছিলুম হোটেল গ্রেস মাউন্ট’-এ। হাঁটাপথে সেটার দুরত্ব এই ‘ভ্যালি-ভিউ’ থেকে মিনিট পাঁচেকের বেশি হবে না।
যেমন ‘গ্রেস মাউন্ট’, তেমনি এই ‘ভ্যালি-ভিউ’ও খুব-একটা চোখ-ধাঁধানো ব্যাপার নয়। মোটামুটি গেরস্ত-পোষানো জায়গা। তবে সামনে বেশ পরিচ্ছন্ন করে ছাঁটা একফালি লন রয়েছে ঠিকই, আর তার চারপাশ ঘিরে বাহারি কিছু ফুলের টবও যে যত্ন করে সাজানো রয়েছে, সেটাও চোখে পড়ল। লাউঞ্জটিও ফিট-দুরস্ত। রিসেপশান কাউন্টারের মাধ্যবয়সিনি মহিলাটি একটা বাঁধানো খাতায় কী যেন টুকে রাখছিলেন, ভাদুড়িমশাইকে দেখে মৃদু হেসে, কি-বোর্ড থেকে দুটো চাবি তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,, “আপনার বন্ধুরা এসে গেছেন, দেখছি।”
“হ্যাঁ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু মিঃ মিত্রর সঙ্গে যে একটু কথা বলবার দরকার ছিল। তিনি কি আজ একবার মুসৌরিতে আসবেন?”
“তা তো জানি না।” ভদ্রমহিলা বললেন, “ইন ফ্যাক্ট তিনি দেরাদুনেও নেই।”
“আপনি দেরাদুনে ফোন করেছিলেন?”
“ঘন্টাখানেক আগেই করেছিলুম। মিউনিসিপ্যালিটি থেকে একটা নোটিস ধরিয়ে দিয়ে গেছে, সেইটে নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলবার দরকার ছিল। তা মিসেস মিত্র ফোন ধরেছিলেন। তিনি বললেন, পরশু সকালে কী একটা কাজে মিঃ মিত্রকে একবার রুরকির ওদিকে যেতে হয়। বলে গিয়েছিলেন যে, সন্ধে নাগাদ ফিরে আসবেন।”
“কিন্তু ফেরেননি, কেমন?”
“না, ফেরেননি। পরশুও না, কালও না।”
“রুরকি থেকে…কিংবা ধরুন রুরকি থেকে যদি অন্য কোথাও গিয়ে থাকেন, তো সেখান থেকে ফোনও করেননি মিসেস মিত্রকে?”
“তা তো জানি না। আপনি যদি মিসেস মিত্রের সঙ্গে কথা বলতে চান তো একটু বসুন, আমি কানেকশন করে দিচ্ছি।”
“থাক,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ফোন একটু পরে করলেও চলবে। আপাতত আমরা ঘরে যাচ্ছি। …আর হ্যাঁ, রুম-সার্ভিসকে বলে দিন ৩০৪ নম্বর ঘরে যেন এক পট চা এখুনি পাঠিয়ে দেয়।”
হোটেলের রেজিস্টার খাতাখানা ভদ্রমহিলা আমাদের সামনে ইতিমধ্যেই এগিয়ে দিয়েছেন। ভাদুড়িমশাই তাতে আমাদের হয়ে সই করে দেবার পরে আমরা সবাই মিলে ঘরে চলে এলুম।
ঘরখানা যে চমৎকার, সেটা বলতেই হবে। পুবদিকের দেওয়াল-জোড়া কাচের উপরে যে পুরু কাপড়ের পর্দা ঝুলছিল, সেটাকে ঠেলে দু’পাশে সরিয়ে দিতেই চোখ জুড়িয়ে গেল। কাচের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যায় যে, সবুজ মখমলে মোড়া পুরো উপত্যকাটা সরাসরি নীচের দিকে নেমে গেছে, চোখ কোথাও আটকে যায় না।
হাওড়া ইস্টিশানে দুন এক্সপ্রেসে উঠেই সদানন্দবাবু সেই যে তাঁর মাঙ্কি ক্যাপটি পরে নিয়েছিলেন, তারপরে আর সেটা এক মিনিটের জন্যেও খোলেননি। ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে ওটা খুলে ফেলুন, সদানন্দবাবু, আপনার মুখখানা একবার দেখতে দিন। নইলে ঠিক আপনার সঙ্গেই কথা বলছি কি না, সেটা বুঝতে পারা একটু শক্ত হয়ে যাচ্ছে।”
বাঁদুরে টুপি খুলতে খুলতে সদানন্দবাবু বললেন, “তা খুলছি। কিন্তু বাইরে বেরুবার আগে আবার পরে নেব। নইলে নির্ঘাত নিমুনিয়া হয়ে যাবে।”
আমাদের সুটকেস দুটো রিসেপশান কাউন্টারের সামনে রেখে এসেছিলুম। একটু বাদে উর্দি-পরা একজন বেয়ারা সে-দুটো আমাদের ঘরের মধ্যে এনে পৌঁছে দিল। তার মিনিটখানেকের মধ্যেই এল চা।
২
চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে সদানন্দবাবু প্রথমে চোখ বুজে বললেন, “আঃ!” তারপর চোখ খুলে বললেন, “যাচ্চলে, একটা কথা তো আপনাকে জিজ্ঞেসই করা হয়নি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলে ফেলুন।”
“অরুণবাবুর বাড়ি থেকে মাধব মিত্তির বেরিয়ে আসবার পর ওই যে আপনি বললেন যে, লোকটা একটা মিথ্যে কথা বলে গেল, সেটা কী?”
“একটা নয়।” ভাদুড়িমশাই হাসতে হাসতে বললেন, “ভদ্রলোক সে-দিন আসলে দু-দুটো মিথ্যে কথা বলেছিলেন।”
“কী রকম?”
“বাড়ি চিনতে কোনও অসুবিধে হয়েছে কি না, জিজ্ঞেস করতে ভদ্রলোক কী বলেছিলেন, মনে নেই? উনি বলেছিলেন যে, তার আগের হপ্তার গোড়ার দিকে উনি যখন ব্যাঙ্গালোরে আমাকে ফোন করেন, তখন আমি ওঁকে বলেছিলুম যে, বাড়িটা হচ্ছে কাঁকুড়গাছির মোড়ের কাছে।…মনে পড়ছে?”
“তা পড়ছে।”
“তা ওটাই হচ্ছে মিথ্যে কথা।”
“তার মানে ব্যাঙ্গালোরে উনি আপনাকে ফোন করেননি?”
“তা কেন করবেন না, করেছিলেন। কিন্তু তখন আমি ওঁকে জাস্ট বাড়ির নম্বরটা আর অরুণের ফ্ল্যাটের নম্বরটা বলেছিলুম। বাড়িটা যে কাঁকুড়গাছির মোড়ের কাছে, তা বলিনি।”
“তা হলে উনি ওটা বললেন কেন?”
“তা আমি জানি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে কিনা মিথ্যে কথাটা বলবার পিছনে মাধব মিত্তিরের যে কোনও মতলব ছিল, এমন না-ও হতে পারে। আমার ধারণা, ছিল না। মিথ্যে বলবার কোনও দরকারই ছিল না হয়তো।”
বললুম, “তাও কখনও হয়?”
“কেন হবে না? মিথ্যে বলাটা অনেকের অভ্যেসে দাঁড়িয়ে যায় যে। দরকার থাক আর না-ই থাক, পাঁচটা সত্যির সঙ্গে অন্তত একটা মিথ্যের ভেজাল তারা মেশাবেই। নইলে তাদের তৃপ্তি হয় না। ভারতচন্দ্রের সেই লাইনটা মনে করুন; সে কহে বিস্তর মিছা যে কহে বিস্তর। লক্ষ করে দেখবেন, যারা বেশি কথা বলে, মোস্ট অভ দেম আর কমপালসিভ লায়ার্স।”
“আমাদের মাধব মিত্তির তা-ই?”
“হতে পারেন, না-ও হতে পারেন।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তবে যা আমি নিশ্চিত জানি, তা এই যে, কাঁকুড়গাছির মোড়ের কাছেই যে অরুণের আস্তানা, এমন কথা আমি ওঁকে বলিনি। আর হ্যাঁ ভদ্রলোক যে কথা একটু বেশি বলেন, তা হয়তো আপনারাও খেয়াল করেছেন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “দ্বিতীয় মিথ্যে কথাটা কী?”
“সেটা আমি বলব না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটু ভেবে দেখুন, তা হলে আপনারা নিজেরাই সেটা ধরতে পারবেন।”
পট থেকে নিজের পেয়ালায় আবার খানিকটা লিকার ঢেলে নিলেন ভাদুড়িমশাই। তাতে দুধ আর চিনি মেশালেন। তারপর পেয়ালার মধ্যে চামচ নাড়তে নাড়তে বললেন, “কথাটা আপনাদের সামনেই বলা হল, অথচ আপনারা মনে হচ্ছে ধরতে পারেননি। এটাও অবিশ্যি এমন একটা মিথ্যে কথা, যা না বললেও ওঁর কোনও ক্ষতি হত বলে মনে হয় না। কিন্তু মুশকিল কী জানেন….”
কথাটা শেষ হল না, তার আগেই টেলিফোন বেজে উঠল। রিসিভারটা তুলে বললুম, “হ্যালো…”
“আমি রিসেপশান থেকে নির্মলা সিনহা কথা বলছি। মিঃ ভাদুড়ি কি ওখানে আছেন?”
“আছেন, তাঁকে দেব?”
“দেবার দরকার নেই। শুধু তাঁকে বলুন যে, মেজর গুপ্ত তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। মিঃ ভাদুড়ি কি লাউঞ্জে এসে তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন, নাকি তাঁকে আপনাদের ঘরে পাঠিয়ে দেব?”
“জাস্ট আ মিনিট।” ফোনের মুখটা ডান হাতের পাতা দিয়ে ঢেকে রেখে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, ‘মেজর গুপ্ত বলে এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। এখানে পাঠিয়ে দিতে বলব?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিষ্ণুচরণ। কাল বিকেলেই তো ওর সঙ্গে কথা হল। …ঠিক আছে, পাঠিয়ে দিতে বলুন। কিছু একটা খবর দেবে মনে হচ্ছে।”
ফোনের মুখ থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে বললুম, “এখানেই পাঠিয়ে দিন।”
মিনিটখানেক বাদে ঘরের দরজায় টোকা পড়ল। ‘কাম ইন’ বলতে যে মধ্যবয়সি মানুষটি এসে ঘরে ঢুকলেন, তাঁর গায়ের রং টকটকে ফর্সা, মাথায় চকচকে টাক, পরনে ট্রাউজার্স আর হাঁটু-ঝুলের অলেস্টার। ঘরে ঢুকে যে-রকম সরু চোখে আমাদের দিকে তাকালেন, তাতে মনে হল, মানুষটি একটু সন্দিগ্ধ প্রকৃতির।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “এসো হে মেজরসাহেব। তা দেরাদুন ছেড়ে হঠাৎ মুসৌরিতে যে? কই, কাল বিকেলে যখন কথা হল তখন তো কিছু বলোনি।”
মেজর গুপ্ত বললেন, “কাল বিকেলে কি ছাই জানতুম যে, আজ এখানে আসতে হবে। হঠাৎ একটা কল পেয়ে আসতে হল। আর্মি থেকে রিটায়ার করলেও আসলে আমি যে বন্দুকবাজ মেজর নই, এম.বি. বি. এস. ডাক্তার সেটা ভুলে যাবেন না। রুগি দেখতে এসেছিলুম।”
“রুগি দেখলে?”
“দেখলুম। সেইসঙ্গে আর-একজনকেও দেখেছি। দেখে মনে হল, দেরাদুন ফেরার আগে খবরটা আপনাকে দেওয়া দরকার।”
“কাকে দেখলে?”
ভাদুড়িমশাই প্রশ্ন করলেন বটে, কিন্তু মেজর গুপ্ত কোনও উত্তর দিলেন না। তার বদলে ফের সেই সরু চোখে এমন বিচ্ছিরিভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে রইলেন যে, বুঝতে পারলুম, যতক্ষণ না আমাদের পরিচয় সম্পর্কে একেবারে নিশ্চিত হচ্ছেন, অন্তত ততক্ষণ তিনি নীরব থাকার পক্ষপাতী।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী হল হে বিষ্টু, চুপ করে রইলে কেন, গো অ্যাহেড।…ও, বুঝতে পেরেছি, এঁদের চেনো না, তাই মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছ। ওরে বাবা, এঁরা আমার বন্ধু। ইনি কিরণ চাটুজ্যে, আর উনি সদানন্দ বসু, এঁদের কথা আগেও তোমাকে বলে থাকব। নাও, যা বলবার জন্য এসেছ, সেটা বলে ফ্যালো দেখি।”
আমি বললুম, “কিন্তু ইনট্রোডাকশনটা তো একতরফা হয়ে গেল ভাদুড়িমশাই।”
“বাঃ, বিষ্টু যে একজন মস্ত ডাক্তার, সে তো ও নিজেই একটু আগে বলল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নামজাদা জি. পি. তা নইলে আর মানুষ মারবার জন্যে দেরাদুন থেকে মুসৌরিতে ডাক পড়ে? … কিন্তু না, আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই। কাকে দেখে সেটা জানাবার জন্যে ছুটে এসেছ বলো তো।”
“মাধব মিত্তিরকে।”
“সে কী!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তিনি তো শুনেছি পরশু থেকেই বেপাত্তা। বাড়িতে একটা খবর পর্যন্ত দেননি। এখানে তিনি কী করছেন?”
“তা তো জানি না।” মেজর গুপ্ত বললেন, “আমার পেশেন্ট থাকে লালবাহাদুর শাস্ত্রী ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ওদিকে। তাকে দেখে প্রেসক্রিপশন লিখে বেরিয়ে এসে নিজের গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় একটা ল্যান্ডরোভার আমার সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে চোখ তুলে তাকিয়েছিলুম। তাকিয়ে ল্যান্ডরোভারে ড্রাইভারের পাশে যাঁকে বসে থাকতে দেখলুম, তিনি মাধব মিত্তির না হয়ে যান না।”
শুনে একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “তুমি কি এখন দেরাদুনে ফিরবে?”
“হ্যাঁ।” মেজর গুপ্ত বললেন, “তবে দেরাদুনে পৌঁছেই যে বাড়ি ফিরব, তা ভাববেন না। ওখানে দুজন পেশেন্টকে আজ একবার না-দেখলেই নয়, তাদের দেখে তারপর বাড়ি ফিরব।”
“ফিরে মাধব মিত্তিরের বাড়িতে একবার ফোন করে জেনে নিয়ো যে, তিনি ফিরেছেন কি না, কিংবা বাড়িতে কোনও খবর দিয়েছেন কি না। তারপর, রাত একটু বেশি হলেও ক্ষতি নেই, সেই খবরটা যদি এখানে ফোন করে আমাকে জানাও তো খুব ভাল হয়।”
“রাত হবে না, সন্ধে নাগাদই ফোন করব।”
মেজর গুপ্ত উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার আগে যেটা পরে নিলেন, সেটা একটা মুখ-ঢাকা মাঙ্কি ক্যাপ। ভদ্রলোককে আমি দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলুম।
ফিরে এসে দেখলুম, ঘরের যে একমাত্র ইজিচেয়ারটি এতক্ষণ আমার দখলে ছিল, সেটি এই ফাঁকে বেহাত হয়েছে। বেশ কায়দা করে সেটাতে বসে আছেন সদানন্দবাবু। আমি এই নিয়ে কোনও প্রতিবাদ করবার আগেই তিনি বললেন, “খুব তো সারাটা পথ হাসাহাসি করছিলেন!”
বললুম, “কী নিয়ে?”
“আমার মাঙ্কি ক্যাপ নিয়ে। এবারে দেখলেন তো?”
“কী দেখব?”
“মেজর গুপ্ত অত বড় একজন ডাক্তার, কিন্তু তিনিও একেবারে আমারই মতন মাঙ্কি-ক্যাপ পরেচেন।”
“দেখলুম।”
দেখুন এবং শিখুন। হিমালয়ে বরফ গলতে শুরু করেচে মশাই, এখন মাঙ্কি-ক্যাপ না পরে উপায় আচে?”
৩
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেলা তো গড়িয়ে এল দেখছি। আপনারা এবারে চান-খাওয়াদাওয়া সেরে নিন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “খাওয়া কি এখানেই?”
“বলেন তো বাইরে কোথাও খেতে পারি, তবে এদের কুকটি ভাল, রান্নাটা নেহাত খারাপ করে না, আমি তো দু’বেলা এখানেই খাচ্ছি।”
“ঝোল-ভাত পাওয়া যাবে?”
“তাও পাবেন, তবে আপনার গিন্নির হাতের রান্না তো আমি খেয়েছি, তেমনটি নিশ্চয় পাবেন না। কিন্তু না, আর দেরি না করে একে-একে আপনারা স্নান সেরে নিন। আমি বরং আমার ঘরে গিয়ে ততক্ষণে খাবারের অর্ডারটা দিয়ে দিচ্ছি।…কিরণবাবু, আমার স্নান তো আমি শেষ রাত্তিরেই সেরে নিয়েছি, ইচ্ছে করলে আমার ঘরের বাথরুমটা আপনি ব্যবহার করতে পারেন।”
বললুম, “আমি স্নানও করব না, খাবও না।”
“তার মানে? আপনার আবার কী হল?”
“কলকাতায় থাকতেই একটু সর্দিজ্বর মতো হয়েছিল। ওই বোধহয় চেঞ্জ অভ সিজনের জন্যে। এখন অবশ্য জ্বর নেই, তবে গা’টা একটু ম্যাজম্যাজ করছে।”
“তা সেটা বিষ্টুকে বললেন না কেন? একটা কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে যেত।”
বললুম, “ওষুধের দরকার হবে না, একটা দিন লঙ্ঘন দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”
“না, না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “উপোস করে থাকাটা ঠিক হবে না, তাতে শরীর আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। আমি বরং আপনার জন্যে গরম এক বাটি চিকেন সুপ আর কড়া-করে সেঁকা দুখানা টোস্ট পাঠিয়ে দিতে বলছি। বাথরুমে গরম জল পাবেন, তাই দিয়ে গা’টাও একটু স্পঞ্জ করে নিন।”
ভাদুড়িমশাইয়ের কথামতো গা-হাত-পা স্পঞ্জ করে দেখলুম, শরীরটা সত্যিই বেশ ঝরঝরে লাগছে। তবে খাবার হিসেবে ওঁদের দু’জনের জন্যে যে দেরাদুনের সরু চালের ভাত আর পাকা পোনার ঝোল এল, তার প্রতি যে আমি একটুও আকর্ষণ বোধ করলুম না, তাতেই বুঝলুম যে, নাড়ি এখনও ভার রয়েছে, জ্বর পুরোপুরি ছাড়েনি।
খাওয়ার পর্ব শেষ হবার পর ঘন্টাখানেক কথাবার্তা হল, কিন্তু যে কাজের সূত্রে ভাদুড়িমশাই এখানে এসেছেন, তার প্রসঙ্গ একবার তুলতে গিয়েছিলুম ঠিকই, কিন্তু তাতে ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ওসব কথা এখন থাক। ধরে নিন যে, একটা সুন্দর জায়গায় দিন-কয়েকের জন্যে ছুটি কাটাতে এসেছেন, তাই যতটা পারা যায় ছুটিটা উপভোগ করুন।”
সদানন্দবাবু যেন এই কথাটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। বললেন, “চলুন তা হলে বেরিয়ে পড়া যাক। রেলগাড়িতে এক ভদ্রলোক বলছিলেন যে, এখানে খুব কাছেই নাকি একটা ফল্স রয়েছে। সেটাও তো দেখে আসতে পারি, কী বলেন কিরণবাবু?”
বললুম, “আমার শরীর এখনও বেজুত। তাই আজকের দিনটা পুরোপুরি রেস্ট নেব, হোটেল ছেড়ে এক পা’ও কোথাও যাব না।”
“ঠিক আছে, আপনি রেস্ট নিন।” সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু ভাদুড়িমশাই, আপনি যাবেন তো?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “যেতুম, কিন্তু মুশকিল হয়েছে কী জানেন, আমিও যেতে পারছি না।”
“কেন?”
“বিষ্ণু যা বলে গেল, তা-ই নিয়ে একটু চিন্তায় পড়ে গেছি। তা ছাড়া, একটু বাদেই আমাকে গোটাকয়েক ফোন করতে হবে। দু-একটা ফোন হয়তো আসতেও পারে আমার জন্য। সেগুলি রিসিভ করবার জন্যেও এখানে থাকা দরকার।”
“তা হলে কি আমি একাই বেরোব?”
“নিশ্চিন্ত চিত্তে বেরিয়ে পড়ুন। কিচ্ছু ভয় নেই।”
“কিন্তু এখানকার রাস্তাঘাট তো আমি চিনি না, মশাই।”
“চিনবার কোনও দরকারও নেই।” আমি বললুম, “দু’পা হাঁটলেই তো গান্ধী চক। সেইটুকু পথ চিনে যেতে পারবেন তো?”
“তা কেন পারব না?”
“বাস বাস, তা হলেই হবে। গান্ধী-মূর্তিকে বাঁয়ে আর ট্যাক্সি-স্ট্যান্ডকে ডাইনে রেখে যদ্দুর যেতে পারেন, এগিয়ে যান। খানিকটা এগোলেই ডাইনে তাকিয়ে ভ্যালিটার যে ভিউ পাবেন, তেমন ভিউ এই হোটেলের ঘরে বসে পাওয়া যায় না।”
“পথে দোকানপাট আচে?”
“আছে বই কী। চায়ের দোকান আছে, কফিখানা আছে, ফোটোর দোকান আছে, তা ছাড়া স্মাগলড গুডসও এখানে বিস্তর আসে তো, রাস্তার উপরেই দেখবেন চট বিছিয়ে সে-সব জিনিসও দেদার বিক্রি হচ্ছে। হংকংয়ের ছাতা, সাউথ কোরিয়ার কাঁচি, তাইওয়ানের চিরুনি, চিনের কলম, কী চাই আপনার?”
ফিরিস্তি শুনে সদানন্দবাবুর চোখ দুটো যে চকচক করে উঠেছে, ভাদুড়িমশাই সেটা দেখতে পেয়েছিলেন। বললেন, “আরে ছি ছি, আপনি ওইসব স্মাগলড জিনিস কিনবেন?”
সদানন্দ বাবু ঢোক গিলে বললেন, “কেন, কিনলে পুলিশে ধরবে?”
“তা হয়তো ধরবে না, কিন্তু আপনি কিনবেন কেন?”
“না…মানে ইয়ে …ভাবছিলুম যে, গিন্নির জন্যে যদি হংকংয়ের একটা লেডিজ ছাতা…”
“কলকাতায় ফিরে গিয়ে মহেন্দ্র দত্তের দোকান থেকে কিনবেন। অনেক টেকসই।”
“তা ছাড়া কমলিটা বলছিল…মানে অঙ্কে ভীষণ কাঁচা তো, যোগ-বিযোগ-গুণ-ভাগে বেজায় ভুল করে…তাই বলছিল যে, সস্তায় যদি একটা ক্যালকুলেটর পাই…”
বললুম, “পেয়ে যাবেন, তবে ব্যাটারি জোগাড় করতে দম বেরিয়ে যাবে, মশাই।”
সদানন্দবাবু বললেন, “ঠিক আছে, ওটাও তা হলে কিনব না। কিন্তু কিছু-না-কিছু তো কিনতেই হবে। বাইরে এসিচি, একেবারে শূন্য হাতে কি ফেরা যায়?”
জামাকাপড় পরাই ছিল, সদানন্দবাবু বেরিয়ে পড়লেন। পরনে ফ্ল্যানেলের ঢোলা ট্রাউজার্স আর অলেস্টার, মাথায় মাঙ্কি-ক্যাপ, হাতে সেই লাঠি, যার মাথায় লোহার বল বসানো
ভাদুড়িমশাইকে জিজ্ঞেস করলুম, “আপনি কাকে ফোন করবেন বলছিলেন না?”
“করব। কিন্তু ফোন করার চেয়ে ফোন পাওয়াটা বেশি জরুরি। না-পেলে অবিশ্যি আমাকেই করতে হবে। কিন্তু সে-কথা থাক, কিরণবাবু। একটু ভেবে বলুন তো বারাসত আর এখানকার ঘটনার মধ্যে কী কী মিল আপনি দেখতে পাচ্ছেন।”
“দুটো মিল তো খুবই স্পষ্ট। ওখানেও একটা ফলের বাগান, এখানেও একটা ফলের বাগান। তা ছাড়া দুটো বাগানেরই ক্রেতার নাম ওঙ্কারমল আগরওয়াল। এখানকার বাগানটা…মানে মাধব মিত্তিরের বাগানটা অবশ্য ওঙ্কারমল এখনও কিনে উঠতে পারেনি। তরে কিনবার জন্যে এখনকার মার্কেট-রেটের চেয়ে আড়াই গুণ বেশি দাম দিতেও সে রাজি। তার জন্যে আড়াই লাখ টাকা অ্যাডভান্সও সে দিয়েছে।”
“আর কোনও মিল নেই?”
“তাও আছে। দুটো বাগানের মধ্যেই আছে শিবমন্দির। বারাসতের বাগানে যে আছে, সেটা বার্তাবহের খবর পড়ে জেনেছিলুম, আর এখানকার বাগানেও যে আছে, সেটা তো দেরাদুন থেকে মুসৌরিতে আসবার পথে আপনিই জানিয়েছেন। তা মন্দিরটা কি খুব ইম্পর্ট্যান্ট?”
“আমার এই কেসের কনটেক্সটে ইম্পট্যান্ট কি না জানি না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “হতে পারে, নাও পারে। তা বারাসতের ওই বাগানটা তো ওঙ্কারমল আগরওয়াল কিনেছে, কার কাছ থেকে কিনেছে, কাগজে তার কোনও উল্লেখ ছিল?”
বললুম, “ছিল বলে মনে পড়ছে না। সম্ভবত ছিল না।”
ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরালেন। চুপচাপ সেটা টানলেন মিনিটখানেক। তারপর সেটাকে অ্যাশট্রেতে পিষে দিয়ে আমাকে বললেন, “টেলিফোনের জিরো ঘোরালেই রিসেপশান কাউন্টারের মিসেস সিনহাকে পেয়ে যাবেন। ওকে একবার ডাকুন তো।”
টেলিফোনের জিরো ডায়াল করে রিসিভারটা ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলুম। ভাদুড়িমশাই বললেন, “কলকাতার একটা নাম্বার দিচ্ছি, এসটিডি করে কাইন্ডলি ডেকে দিন, খুব জরুরি।…হ্যাঁ, আমি ঘরেই আছি, লাইনটা এখান থেকেই নিয়ে নেব।”
যে নম্বরটা দিলেন, সেটা অরুণ সান্যালের ফ্ল্যাটের।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ফোন বেজে উঠল। ভাদুড়িমশাই ফোন তুলে বললেন, “কে?…কৌশিক….আমি মামাবাবু বলছি। যা বলছি, শুনে যা। বারাসতের একটা বাগান নিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারির বার্তাবহে একটা খবর বেরিয়েছিল। বাগানটা কিনেছে ওঙ্কারমহল আগরওয়াল। কবে কিনেছে আর কার কাছ থেকে কিনেছে, জানা দরকার। বাগানে একটা পুরনো শিবমন্দির আছে। কত পুরনো আর কে প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেটাও জানতে চাই।…আরে না না, রেজিস্ট্রি আপিসে যেতে হবে না। আমার ধারণা, বার্তাবহ কাগজের দফতরেই এ-সব খবর পেয়ে যাবি। আসলে ওদের ‘নিজস্ব সংবাদদাতা’র পাঠানো কপিতে হয়তো সব খবরই ছিল, জায়গা কম বলে সবটা ওরা ছাপতে পারেনি, কপি তো চট করে ফেলে দেওয়া হয় না, প্রুফ রিডাররা অন্তত ছ’মাসের কপি জমিয়ে রাখে। তাদের সঙ্গে ভাব জমিয়ে প্রেস-কপিটা যদি দেখে নিতে পারিস, তা হলে হয়তো তারই মধ্যে সব পেয়ে যাবি।…. কী বললি? বার্তাবহের এডিটোরিয়াল ডিপার্টমেন্টে তোর এক বন্ধু কাজ করে? …তবে তো কথাই নেই, গেট ইন টাচ উইথ হিম। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়। … না না…তোকে ফোন করতে হবে না। রাত দশটায় আমিই আবার তোকে ফোন করব। বেস্ট অভ লাক।”
ভাদুড়িমশাই ফোন নামিয়ে রাখলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে, বললেন, “যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দ্যাখো তাই। কেন ছাই ওড়াচ্ছি বলুন তো?”
বললুম, “পাইলে পাইতে পারো অমূল্য রতন।”
ভাদুড়িমশাই একটা দীর্ঘনিশ্বাস মোচন করে বললেন, “আসলে হয়তো ছাই ঘাঁটাই সার হবে।”
৪
চারটে নাগাদ ভাদুড়িমশাই বললেন, “সিগারেট ফুরিয়ে গেছে মশাই।”
বললুম, “বেয়ারাকে ডেকে আনিয়ে নিলেই তো হয়।”
“ওকে দিয়ে হবে না। আমাকেই একবার বেরুতে হবে।”
“সে কী মশাই, হোটেলের সামনেই তো একটা পান-সিগারেটের দোকান রয়েছে। বেয়ারাকে যদি বলে দিই তো সেখান থেকে এনে দিতে পারবে না?”
“আমি যে-সিগারেট খাই, ও-দোকানে সেটা থাকলে তো এনে দেবে। আমি তো খোঁজ করে সেটা পাইনি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এখানে দেখেছি মাত্র একটা দোকানেই সেটা পাওয়া যায়।”
“দোকানটা কি দূরে নাকি?”
“খুব কাছে নয়। সদানন্দবাবু যে-রাস্তা ধরে বেড়াতে বেরিয়েছেন তার গোটা দুয়েক বাঁক পেরিয়ে একটা কফিখানার পাশে। যাই, নিজেই একবার গিয়ে ঘুরে আসি।”
“আমি কি সঙ্গে যাব?”
“না না, ফোন আসতে পারে, একজন কারও থাকা দরকার। আমি এই ধরুন সাড়ে-চারটে থেকে পৌনে পাঁচটার মধ্যেই ফিরে আসছি।”
ভাদুড়িমশাই বেরিয়ে গেলেন।
ফোনটা বাজল তার মিনিট পাঁচেক বাদে। রিসিভার তুলে ‘হ্যালো’ বলতেই নির্মলা সিনহার গলা পাওয়া গেল। “কলকাতার কল, মিঃ ভাদুড়ির সঙ্গে কথা বলতে চান।”
বললুম, “মিঃ ভাদুড়ি এখন নেই, ফোন এলে আমাকেই রিসিভ করতে বলে গেছেন, লাইনটা আমাকে দিন।”
কলকাতার লাইনে কৌশিকের গলা ভেসে উঠল, “কে, মামাবাবু?”
“না রে কৌশিক, আমি কিরণমামা। তোর মামাবাবু একটু বেরিয়েছেন। তা এত তাড়াতাড়ি ফোন করছিস যে? বার্তাবহ কাগজের আপিসে যাসনি?”
“যাবার দরকারই হল না। হঠাৎই মনে পড়ে গেল যে, বার্তাবহে ওই খবরটা যেদিন বার হয়, দৈনিক সমাচার তার পরদিন অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি ওটা ক্যারি করে। প্রথম দিন দিতে পারেনি বলে সেটা কমপেনসেট করবার জন্যে দ্বিতীয় দিন আরও ফলাও করে ছেপেছে ওরা। প্রচুর ডিটেলস, সঙ্গে ছবি। তা দৈনিক সমাচারও তো আমরা রাখি, পুরনো কাগজ ঘেঁটে বিশে ফেব্রুয়ারির কাগজটা বার করেছি। দেখলুম, মামাবাবু যা-যা জানতে চায়, তার সবই তার মধ্যে রয়েছে।”
“এক-এক করে বলে যা, আমি নোট করে রাখছি।”
“মামাবাবু জানতে চেয়েছিল, ওঙ্কারমল আগরওয়াল বারাসতের ওই বাগানটা কবে কার কাছ থেকে কিনেছে। তা লিখে নাও, কিনেছে মাত্র এক বছর আগে। এগজ্যাক্ট ডেট অভ পারচেজ হচ্ছে ২১ জানুয়ারি ১৯৯৩। যে বিক্রি করেছে তার নাম অশোক মল্লিক। এঁর গ্রেট গ্র্যান্ডফাদার অর্থাৎ প্রপিতামহের নাম কুলপতি মল্লিক।”
“গ্রেট গ্র্যান্ডফাদারের নাম দিয়ে কী হবে?”
“বাঃ, মন্দিরটা কে প্রতিষ্ঠা করেছিল, মামাবাবু সেটা জানতে চাইল যে। তো ওই কুলপতি মল্লিকই ইন দি ইয়ার এইট্টিন হ্যানড্রেড নাইনটিথ্রি এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। একটা ব্যাপার খেয়াল করেছ কিরণমামা?”
“কী?”
“মন্দিরটার একশো বছর জাস্ট গত বছর পূর্ণ হয়েছে,আর ওই লাস্ট ইয়ারেই মন্দিরসুদ্ধু বাগানটা বিক্রি হয়ে যায়। গ্রামের মানুষরা এটা ভাল চোখে দেখেনি।”
বললুম, “কিন্তু ওটা তো একটা ডেজার্টেড মন্দির, পুজো-আচ্চা তো আর হচ্ছিল না।”
কৌশিক বলল, “পূজো-আচ্চা না হোক, মন্দিরের সামনে একটা মেলা তো হচ্ছিল। তার উপরে আবার দৈনিক সমাচারের রিপোর্টার লিখেছে যে, সেন্টিনারি উপলক্ষে গত বছর মেলা হয়েছিল খুব জাঁকজমক করে। ওঙ্কারমল তাতেই বোধহয় ভয় পেয়ে গেসল। এ-বছরের গোড়াতেই তাই বাগান ঘিরে পাঁচিল তুলে দেয়। ভয় যে কীসের, তা তো বুঝতেই পারছ। মেলার ছুতো দেখিয়ে গ্রামের মানুষরা সাত বিঘের ওই বাগানটাকে পাবলিক প্রপার্টি হিসেবে দাবি করে বসবে, এইটে ভেবেই ওঙ্কারমল ঘাবড়ে যায়।”
বললুম, “আর কিছু বলবি?”
“বলবার উপায় আছে নাকি?” কৌশিক বলল, “ডাক্তারবাবু …আই মিন আমার বাবা এরই মধ্যে তিন-তিন বার তাগাদা দিয়েছেন কথা শেষ করবার জন্যে।…তা তোমাদের কাজ কেমন এগোচ্ছে?”
“আজই তো এলুম। এখনও সব বুঝে উঠতে পারিনি।”
“ঠিক আছে। মামাবাবুকে বোলো, আমরা সবাই ভাল আছি।”
কৌশিক ফোন নামিয়ে রাখল।
ফোনটা আবার বেজে উঠল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই। মিসেস সিনহা বললেন, “দেরাদুন থেকে মিসেস মিত্র কথা বলতে চান।”
“কার সঙ্গে?”
“মিঃ ভাদুড়ির সঙ্গে। কিন্তু তিনি তো শুনলুম একটু বেরিয়েছেন। আপনি কথা বলবেন?”
“ঠিক আছে, দিন।”
লাইনটা এসে গেল। “মিঃ ভাদুড়ি?”
“তিনি একটু বেরিয়েছেন।”
“কখন ফিরবেন?”
“এতক্ষণে ফিরে আসা উচিত ছিল। আমি তাঁর বন্ধু, কিরণ চ্যাটার্জি।”
“আপনার কথা আমি মিঃ ভাদুড়ির কাছে শুনেছি। ওঁকে কয়েকটা কথা জানাবার ছিল।”
“কোনও মেসেজ থাকলে স্বচ্ছন্দে আমাকে দিতে পারেন। কিংবা ধরুন ঘন্টাখানেক বাদে যদি ফোন করেন…”
“না, না,” ভদ্রমহিলা আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, “যা বলবার আপনাকেই বলছি, আপনি ওঁকে কাইন্ডলি জানিয়ে দেবেন। বলবেন যে, মিঃ মিত্র….মানে আমার হাজব্যান্ড এখনও ফিরে আসেননি, আমাকে কোনও খবরও দেননি।… আর হ্যাঁ, দিস ইজ ভেরি ইম্পট্যান্ট, কাল সকালেই আমি মুসৌরি! গিয়ে মিঃ ভাদুড়ির সঙ্গে দেখা করব। এই ধরুন দশটা নাগাদ।” তারপর সামান্য থেমে, হঠাৎই ভীষণ নিচু গলায়, “যদি অবশ্য ততক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে থাকি।”
ভদ্রমহিলা যে এই শেষের কথাটা বললেন কেন, কিছুই বুঝলুম না। এইটুকুই শুধু বোঝা গেল যে, ফোনটা তিনি নামিয়ে রেখেছেন।
দেরাদুন থেকে মেজর গুপ্তের ফোন এল সওয়া পাঁচটা নাগাদ। ভাদুড়িমশাই তখনও ফেরেননি। মেজর গুপ্তকে সে-কথা জানাতে তিনি বললেন, “সন্ধে নাগাদ ফোন করবার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময়ে একটা ফেয়ারওয়েল পার্টিতে যেতে হবে, তাই যা জানাবার এখনই জানিয়ে দিচ্ছি, ইউ উইল কাইন্ডলি পাস ইট অন টু ভাদুড়িদা। খবর নাম্বার ওয়ান : মাধব মিত্তির বাড়ি ফেরেনি।”
“এখানে তো ওঁকেই দেখেছিলেন, তা-ই না?”
“অফ কোর্স। আমার চোখে এখনও ছানি পড়েনি মশাই, ল্যান্ডরোভারে যে-লোকটা ড্রাইভারের পাশে বসে ছিল, সে যে মাধব মিত্তির, এ আমি হলফ করে বলতে পারি। ভেবেছিলুম, মুসৌরি থেকে স্ট্রেট এখানে ফিরে আসবে। কিন্তু না, ফেরেনি।”
“ফেরেননি যে, একটু আগেই সেটা জানলুম।”
“কার কাছে?”
“মিসেস মিত্রের কাছে।”
“তার মানে সাবিত্রীর কাছে।” মেজর গুপ্ত বললেন, “এই সাবিত্রীকে নিয়েই খবর নাম্বার টু। ভাদুড়িদাকে বলবেন যে, আজ দুপুরে ওদের শোবার ঘরের লাগোয়া বাথরুমের স্কাইলাইটের কাচ ভেঙে বাইরে থেকে কেউ ভিতরে ঢুকবার চেষ্টা করেছিল। শব্দ শুনে সাবিত্রী চেঁচিয়ে ওঠে। ওদের চৌকিদার তক্ষুনি ছুটে এসেছিল, কিন্তু কাউকে দেখতে পায়নি।”
বললুম, “বলেন কী!”
মেজর গুপ্ত বললেন, “আঁতকে ওঠার মতো কিছু নয়। তবে হ্যাঁ, বার্গলারিটা ইদানীং এদিকে বেশ বেড়ে গেছে। আসলে মুশকিল হয়েছে কী জানেন, সাবিত্রী এমনিতেই হার্টের রুগি, তার উপরে এই ঘটনায় দেখলুম টেনশনও বেশ বেড়ে গেছে। তবে ভয়ের কিছু নেই, আমি একটা ওষুধ লিখে দিয়ে এসেছি, ওটা খেলে টেনশন কমে যাবে।”
“ভাদুড়িমশাইকে আর-কিছু বলতে হবে?”
“আপাতত আর-কোনও খবর নেই।” মেজর গুপ্ত হাসলেন, “খবর হলেই ওঁকে জানাব।”
ভাদুড়িমশাই ফিরলেন সাড়ে ছ’টা নাগাদ। বলতে যাচ্ছিলুম, “এই আপনার পৌনে পাঁচটার মধ্যে ফেরা? এক প্যাকেট বিলিতি সিগারেট কিনবার জন্যে কি বিলেত যেতে হয়েছিল?” কিন্তু ভাদুড়িমশাইয়ের পিছনে যিনি প্রায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন তাঁকে দেখে আর আমার বাকস্ফুর্তি হল না। সদানন্দবাবু। মাথায় বিশাল ব্যান্ডেজ বাঁধা।
আমার মুখ দিয়ে যে কথা সরছে না, সেটা লক্ষ করে সদানন্দবাবু বললেন, “আরে না মশাই, ভয়ের কিছু নেই। ব্যান্ডেজের বহর দেখে ঘাবড়ে যাবেন না, আসলে অল্প একটু কেটে গিয়েচে।”
“কী হয়েছিল?”
ভাদুড়িমশাই সদানন্দবাবুকে দেখিয়ে বললেন, “ওঁকেই জিজ্ঞেস করুন।”
সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “আর বলবেন না, পথের মধ্যে দুটো মোদো-মাতাল আমাকে ছুরি উঁচিয়ে অ্যাটাক করেছিল। কিন্তু ছুরি দেখেই আমি চেঁচিয়ে উঠেছিলুম তো, তাইতে লোকজন ছুটে আসায় আর ছুরিটা ঠিকমতো চালাতে পারেনি। এদিকে আবার ভাদুড়িমশাইও তার মিনিট পাঁচেকের মধ্যে সেখানে গিয়ে হাজির। উনিই আমাকে একটা ডাক্তারখানায় নিয়ে গিয়ে ওষুধ-টষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করিয়ে আনলেন। একটা ইঞ্জেকশনও নিতে হল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজটা কি অন্যায় করেছি?”
সদানন্দবাবু দাঁতে জিভ কেটে বললেন, “আরে ছিছি, তা-ই কি আমি বললুম। তবে কিনা এত সবের কোনও দরকার ছিল না, স্রেফ একমুঠো গাঁদা-পাতা হাতে ডলে তার রসটা লাগিয়ে দিলেই হত।”
কথাটা শেষ করে সদানন্দবাবু বাথরুমে ঢুকলেন। ভাদুড়িমশাইকে জিজ্ঞেস করলুম, “কথাটা সত্যি?”
“কোন কথাটা?”
“মাতালের কথাটা।”
“না, সত্যি নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে ওঁকে সেটাই বলেছি। নইলে উনি ভয় পেয়ে যেতে পারতেন।”
“মাতাল যদি না-ই হবে তো ওরা কারা?”
“ভাড়াটে গুণ্ডা। তবে কিনা আমার ধারণা, যাঁকে ছুরি মারতে বলা হয়েছিল, তিনি সদানন্দবাবু নন, ওরা লোক চিনতে ভুল করেছে।”
“কাকে মারতে বলা হয়েছিল তা হলে?”
এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়িমশাই। মৃদু হাসলেন। তারপর বললেন, “আমার মনে হয় মেজর গুপ্তকে। অর্থাৎ আমাদের বিষ্টুকে। ভুলে যাবেন না যে, সদানন্দবাবুর মতনই তারও পরনে ছিল অলেস্টার আর মাথায় ছিল মাঙ্কি ক্যাপ।”
