বোরখার আড়ালে (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

তিন 

 

কিছুক্ষণ পরে দেখি ক্যামাক স্ট্রিটে পৌঁছেছি। কিন্তু প্রচণ্ড জ্যাম। সব গাড়ি জট বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। কর্নেল গম্ভীর এবং চোখ বুজে চুরুট টানছে। পাশেই এক ট্যাকসিচালকের অতিশয় ক্ষুব্ধ বাক্যালাপ থেকে বুঝলাম, পার্ক স্ট্রিটে কোনও ভি ভি আই পি-র কনভয় পাস না করা পর্যন্ত রাস্তা খুলবে না। আমিও খাপ্পা হয়ে বলে উঠলাম, আমরাও ফেঁসে গেলাম তাহলে?

 

কর্নেল চোখ খুলে আমার দিকে একবার তাকালেন মাত্র। মুখে তেমনই গাম্ভীর্য জমজমাট। কতক্ষণ পরে গাড়িগুলোর চাকা আবার গড়াতে শুরু করেছিল, হিসেব করিনি। একখানে পৌঁছে কর্নেল সোজা হয়ে বসে বললেন, বাঁপাশে গাড়ি রাখো জয়ন্ত! এসে গেছি।

 

অনেক ঝামেলার পর ফুটপাত ঘেঁষে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললাম, এখানে কোথায় যাবেন?

 

ব্রাইট অকশন হাউস। এই দেখ, সিনহা ট্রেডার্সের নিলামঘর। বলে কর্নেল নেমে দাঁড়ালেন।

 

কোনও কথা না বলে ওঁকে অনুসরণ করলাম। সেকেলে বিশাল দোতলা বাড়ি। সিঁড়ির ধাপের মাথায় চওড়া দরজা। টুলে বসেছিল উর্দিপরা বন্দুকধারী একজন গার্ড। আমাদের দেখে সে বলে উঠল, আজ অকশন ডে নেহি সাব! কাল দশ বাজে আইয়ে!

 

কর্নেল বললেন, ম্যানেজারসাবকা সাথ অ্যাপয়েন্টমেন্ট হ্যায়।

 

তো যাইয়ে।

 

সম্ভবত কর্নেলের সায়েবি চেহারা, তাগড়াই গড়ন, দাড়ি ও টুপি দেখে তার ভক্তি হয়েছিল। একটু পরে হলঘরের পাশের একটা কেবিনে ম্যানেজারসায়েবকে পাওয়া গেল। তিনি বাঙালি। নেমপ্লেটে লেখা ছিল পি কে দত্ত। কর্নেল সটান ঢুকতেই তিনি অবাক হয়ে তাকালেন। কর্নেল বাংলায় বললেন, মিঃ বিশ্বজিৎ সিনহার সঙ্গে এখানে আমার অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।

 

ম্যানেজার বললেন, জুনিয়র মিঃ সিনহার সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট? আপনি নিশ্চয় তারিখ ভুল করেছেন স্যার!

 

না তো! আজ পৌনে বারোটা থেকে বারোটার মধ্যে

 

কিন্তু উনি তো কাল বিকেলে দিল্লি থেকে ফিরে এখানে এসেছিলেন। তারপর নিউ আলিপুরে ওঁদের বাড়ি চলে যান। আজ সকালে ফোন করে জানলাম উনি বোম্বাই চলে গেছেন।

 

কর্নেল একটু ইতস্তত করে বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ! আমার একটু ভুল হয়েছে। উনি বলেছিলেন, যদি দৈবাৎ ওঁকে না পাই, ওঁর এক বন্ধুকী যেন নামটা তার এখানে থাকার কথা। তার সঙ্গে কথা বললেও চলবে বলেছিলেন।

 

ম্যানেজার হাসলেন। বুঝেছি। আপনি মিঃ দেববর্মনের কথা বলছেন। আমাদের কোম্পানির হংকং ব্রাঞ্চের ম্যানেজার!

 

কর্নেলও হাসলেন। ঠিক, ঠিক। মিঃ দেববর্মন। আসলে বয়স মানুষের স্মৃতি গোলমাল করে দেয়। তো উনি কি আছে?

 

মিঃ দেববর্মন আছেন। জাস্ট এ মিনিট। বলে ম্যানেজার টেলিফোন তুলে ডায়াল করলেন। একটু পরে বললেন, রিং হচ্ছে। কেউ ধরছে না। হয়তো উনি বাথরুমে আছেন।

 

ঠিক আছে। আমরা অপেক্ষা করছি।

 

ফোন রেখে ম্যানেজার বললেন, আপনারা ওপরে গিয়েও অপেক্ষা করতে পারেন। দোতলায় কোম্পানির গেস্ট হাউস। হল থেকে বেরিয়ে পাশের করিডরে ঢুকলে সিঁড়ি দেখতে পাবেন।

 

আর একটা কথা মিঃ দত্ত! মিসেস চন্দ্রপ্রভা সিনহা আমার পরিচিত। তারও এখানে থাকার কথা ছিল। তিনি কি মিঃ সিনহার সঙ্গে চলে গেছেন?

 

না মিসেস সিনহা কিছুক্ষণ আগে এসেছিলেন। মিঃ সিনহার সঙ্গে ওঁর দেখা হয়নি।

 

উনি কি দোতলার গেস্ট হাউসে আছেন?

 

না। এইমাত্র চলে গেলেন। মিনিট দশেক আগে এলে ওঁর দেখা পেতেন। ম্যানেজার অমায়িক হাসলেন। মিঃ সিনহার বড় ভুলো মন। তাছাড়া ব্যস্ত মানুষ। নিজের কিছু দামি জিনিসপত্র আমাকে রাখতে দিয়ে গেছেন। তার সঙ্গে ভুল করে স্ত্রীর জুতোর বাক্সওতো মিসেস সিনহা জুতোর বাক্স খুঁজতে এসেছিলেন। দিল্লিতে কেনা দামি বিদেশি জুতো। হাউ ফানি! মিসেস সিনহা রেগে আগুন। জুতো ফেরত পেয়ে তবে শান্ত হলেন।

 

কর্নেল ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। জুতোর বাক্স নিতে এসেছিলেন মিসেস সিনহা? এদিকে আমাকে ফোন করে বলেছিলেন, ব্রাইট অকশন হাউসে মিঃ সিনহার সঙ্গে থাকবেন। এস জয়ন্ত! আমরা মিঃ দেববর্মনের সঙ্গে দেখা করি।

 

কর্নেল হন্তদন্ত হেঁটে হলঘর থেকে বেরিয়ে পাশের করিডরে ঢুকলেন। কাঠের সিঁড়িতে বিবর্ণ কার্পেট বিছানো আছে। হতবাক হয়ে ওঁকে অনুসরণ করছিলাম। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এসব বাড়ির ছাদ খুব উঁচু। দোতলায় চওড়া করিডরের একপাশে একটা ঘরের দরজায় পর্দা ঝুলছে। পর্দা সরিয়ে কর্নেল কপাট ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। সুসজ্জিত ড্রয়িং রুমে ঢুকে উনি থমকে দাঁড়ালেন। আপনমনে আবৃত্তি করলেন, প্লিজ ডোন্ট বি ওয়ারিড। চেক আউট ফ্রম দি হোটেল অ্যান্ড গো টু আওয়ার হাউস। হ্যাঁ–হাউস মানে অকশন হাউস। তারপর উনি এগিয়ে গিয়ে বাঁদিকের দরজার পর্দা তুলে কপাট ঠেললেন। উঁকি মেরেই বলে উঠলেন, ও মাই গড!

 

চমকে উঠে বললাম, কী ব্যাপার?

 

কড়িকাঠ থেকে কেউ ঝুলছে!

 

আঁতকে উঠে উঁকি দিলাম। অনেক উঁচুতে লোহার বিম থেকে গলায় শাড়ির ফাসবাঁধা একটা দেহ ঝুলছে। দেহটা একজন পুরুষের। পরনে প্যান্ট-শার্ট। দেখামাত্র পিছিয়ে এসে বললাম, সুইসাইড!

 

কর্নেল তখনই দরজা আটকে দিলেন। বললেন, সুইসাইড নয় জয়ন্ত! একজন ব্যালেনর্তকী অনেক শারীরিক কসরত জানে। যাই হোক। কুইক! নিচে গিয়ে মিঃ দত্তকে পুলিশে খবর দিতে বলি। চলে এসো।…

 

কিন্তু আরও অদ্ভুত এবং বিস্ময়কর ঘটনা দেখতে তখনও বাকি ছিল আমার। ব্রাইট অকশন হাউসের ম্যানেজার মিঃ দত্ত কর্নেলের মুখে কথাটা শুনেই পুলিশে খবর দিয়েছিলেন। তবে কর্নেল ওঁকে হইচই বাধাতে এবং কাউকে জানাতে নিষেধ করেছিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এসেছিল। কিন্তু দোতলার সেই ঘরে ঝুলন্ত এবং গলায় শাড়ির ফাঁস আটকানো দেববর্মনকে পাওয়া যায়নি। ম্যাজিকের মতো তার লাশ কিংবা তিনি অদৃশ্য হয়েছিলেন।

 

অর্থাৎ আত্মহত্যা বা ঝুলন্ত লাশ নেহাত সাজানো। দোতলার গেস্ট হাউসের সবগুলিই ফ্রেঞ্চ জানালা। গরাদহীন এবং কাচের জানালার ওপর পুরু পর্দা ঝোলানো। জানালা গলিয়ে হাত তিনেক দূরে পাইপ আঁকড়ে নিয়ে নেমে যাওয়া সহজ। নিচে একটা মোটর গ্যারাজের করোগেটেড শিটের ছাউনি ছিল। কাজেই দেববর্মনের পালিয়ে যেতে একটুও অসুবিধে হয়নি।

 

কিন্তু ওইভাবে সাজানো লাশের কারচুপির কারণ কী? কর্নেল বলেছিলেন, নবাবি রত্ন বাটপাড়ি করে চন্দ্রপ্রভা যাতে কলকাতা ছেড়ে নির্বিবাদে পালিয়ে যেতে পারে, তার জন্য সময়ের দরকার ছিল। ঝুলন্ত লাশ নিয়ে আমি ব্যস্ত হব এবং মাথা ঘামাব। এতে চন্দ্রপ্রভা যথেষ্ট সময় পাবে।

 

তাহলে দেখা যাচ্ছে দেববর্মন চন্দ্রপ্রভার জুটি।

 

তা আর বলতে? বিশ্বজিৎ নিশ্চয় চন্দ্রপ্রভাকে সন্দেহ করেছিলেন কোনও কারণে। কিন্তু তার পক্ষে দেববর্মনকে বিশ্বাস করার যুক্তি আছে। এই লোকটি তাদের কর্মচারী। তাদের হংকং ব্রাঞ্চের ম্যানেজার। যাই হোক, বিশ্বজিৎকে মুখোমুখি পেলে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে।

 

কর্নেল পুলিশ এবং কাস্টমসকে এয়ারপোর্ট, রেলস্টেশন, হাইওয়ে সর্বত্র নজর রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু সন্ধ্যা অব্দি না চন্দ্রপ্রভা, না দেববর্মন কারও পাত্তা মেলেনি। বুঝতে পারছিলাম, অন্তত চন্দ্রপ্রভা কলকাতা থেকে পালানোর। যথেষ্ট সময় পেয়েছিল।

 

কিংবা কলকাতার মতো বড় শহরে কোথাও হয়তো দুজনে গা-ঢাকা দিয়ে আছে। আমার মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন শেষাবধি উত্ত্যক্ত করছিল। কেন চন্দ্রপ্রভা কর্নেলের শরণাপন্ন হয়েছিল এবং সে কর্নেলকে চিনল কী ভাবে?

 

কর্নেল বলেছিলেন, বিশ্বজিৎ সিনহাই এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন। দেখা যা।…

 

পরদিন সকালে আমার সল্টলেকের ফ্ল্যাটে টেলিফোনে কর্নেলের জরুরি তলব পেয়ে তাঁর ইলিয়ট রোডের তিনতলার অ্যাপার্টমেন্টে হাজির হলাম। তখন প্রায় দশটা বাজে। তার ড্রয়িং রুমে ঢুকে দেখি, অমরজিৎ সিনহা এবং আমার বয়সী এক রোগাটে চেহারার যুবক বসে আছে। তাকে ঝোড়ো কাকের মতো দেখাচ্ছিল।

 

অমরজিৎ আমাকে দেখেই বললেন, আপনি রিপোর্টার। কর্নেল সরকারকেও অনুরোধ করেছি। আপনাকেও করছি, প্লিজ আপনার কাগজে এমন কিছু লিখবেন না, যাতে আমার কারবারের বদনাম হয়। আমার এই নির্বোধ পুত্রের জন্যই এমন একটা কদর্য ঘটনা ঘটে গেছে। রমেশ দেববর্মন যে এমন সাংঘাতিক লোক জানতাম না। তারই পরামর্শে বিশ্বজিৎ চোরাই নবাবি রত্ন কিনতে দিল্লি গিয়েছিল। আর ওই সর্বনাশী মেয়েটা

 

কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে একটু হেসে বললেন, আপনি প্রবীণ, অভিজ্ঞ মানুষ। আপনার পুত্র যুবক। একজন সুন্দরী ব্যালেনর্তকীর প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করে ফেলা এ বয়সে খুবই স্বাভাবিক।

 

বিশ্বজিৎ কুণ্ঠিতভাবে বললেন, আমি বুঝতে পারিনি দেববর্মনই আমাকে কাঁদে ফেলেছিল। চন্দ্রপ্রভাকে আমি বিয়ে করেছিলাম বটে, কিন্তু দেববর্মনই বোম্বেতে তার সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল। তো চন্দ্রপ্রভাকে আমি চোরাই মালের কথা জানাইনি। জানত শুধু দেববর্মন। কারণ আমাকে সে-ই ওটা কিনিয়েছিল। প্যারামাউন্টে ওঠাও তারই পরামর্শে। ওখানে নাকি বিদেশি খদ্দের সে যোগাড় করে দেবে।

 

জিজ্ঞেস করলাম, চন্দ্রপ্রভাকে বিপদের কথা বলে কর্নেলের কার্ড দিয়ে আপনি

 

বিশ্বজিৎ দ্রুত বললেন, নাহ্ মিঃ চৌধুরি। ঘটনাটা হল, প্যারামাউন্টে ওঠার পর বাথরুমে গিয়েছিলাম। তারপর বেরিয়ে এসেই দেখি, চন্দ্রপ্রভা জুতোর বাক্স খুলেছিল। সদ্য বন্ধ করছে। ওপরে লেডিস জুতো ছিল। বলল, আমার জন্য এই জুতো কিনেছ। আমাকে দেখাওনি কেন? কিন্তু তার মুখ দেখে বুঝলাম, সে জেনে গেছে ভেতরে কী আছে। একটু পরে হঠাৎ তার চেহারা বদলে গেল। সে আমাকে ব্ল্যাকমেলের হুমকি দিতে থাকল। তাকে বুঝিয়ে শান্ত করলাম। দেববর্মন ছিল ৫ নম্বর রুমে। বেগতিক দেখে তাকে ডাকব ভাবছি, সেই সময় চন্দ্রপ্রভা বাথরুমে ঢুকল। সুযোগ পেয়ে আমার প্যাডে দেববর্মনকে একটা চিঠি লিখে ফেললাম। কিন্তু লেখার পর হঠাৎ মনে হলো, দেববর্মনও যদি রত্নের লোভে আমাকে ব্ল্যাকমেল করে? আমার মাথার ঠিক ছিল না। জুতোর বাক্স আর আমার ব্রিফকেসটা নিয়ে তখনই হোটেল থেকে কেটে পড়লাম।

 

কর্নেল বললেন, চন্দ্রপ্রভা আপনার চিঠিটা কাজে লাগাতে চেয়েছিল। বোঝা যাচ্ছে, দেববর্মনের সঙ্গে পরামর্শ করেছিল সে। এরপর দেববর্মন আপনাদের অকশন হাউসে চলে যায়। কাল সকালে সে প্যারামাউন্ট থেকে চন্দ্রপ্রভাকে নিয়ে আসে অকশন হাউসে। চন্দ্রপ্রভা ম্যানেজার মিঃ দত্তের কাছে জুতোর বাক্সের কথা জিজ্ঞেস করে। এটা স্বাভাবিক। অকশন হাউসেই চোরাই মাল রাখা আপনার পক্ষে নিরাপদ, তা সে জানত।

 

হ্যাঁ। অকশন হাউস সম্পর্কে তাকে বোকার মতো অনেক গোপন কথা কত সময় বলেছি!

 

অমরজিৎ ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, তুমি একটা প্রকাণ্ড মূর্খ।

 

কর্নেল হাসলেন। স্ত্রীর কাছে স্বামীর কোনও কথা গোপন থাকে না। বিশেষ করে স্ত্রী যদি বেশি কৌতূহলী হয়। তা চন্দ্রপ্রভার উদ্দেশ্যই ছিল চোরাই নবাবি রত্ন হাতানো। তবে মিঃ দত্তের দোষ নেই। জুতোর বাক্সতে কী আছে উনি কেমন করে জানবেন?

 

অমরজিৎ বললেন, যা হবার হয়ে গেছে। এখন কর্নেলসায়েবকে অনুরোধ করছি, আমার এই নির্বোধ পুত্রের জন্য আমি যাতে ফেঁসে না যাই। আপনি আমাকে বাঁচান! কারণ আমার ধারণা, পুলিশ বা অন্য কেউ ভেতরকার ঘটনাটা এখনও জানে না।

 

কর্নেল বললেন, চেষ্টা করব। তবে আপনি আপনার ছেলেকে সতর্ক করে দিন।

 

অবশ্যই। অমরজিৎ পুত্রের উদ্দেশে কিছুক্ষণ কটুক্তি বর্ষণ করে বিদায় নিলেন।

 

বললাম, সবই বোঝা গেল। শুধু বোঝা গেল না চন্দ্রপ্রভা আপনার শরণাপন্ন হলো কেন? আপনার পরিচয়ই বা পেল কোথায়?

 

কর্নেল বললেন, সে চোরাই নবাবি রত্ন উদ্ধার করতে চেয়েছিল।

 

অবাক হয়ে বললাম, তার মানে?

 

কারণ তার শরীরে ফতেগঞ্জের নবাবি রক্ত আছে। চন্দ্রপ্রভার আসল নাম জিনাত বেগম। চন্দ্রপ্রভা নাম সে ব্যালেনর্তকী হিসেবে নিয়েছিল। কাল রাত্রে টেলিফোনে সে আমাকে সব কথা খুলে বলেছে। দেববর্মন তার প্রেমিক। বাকিটা তুমি নিজেই বুঝতে পারবে।

 

কিন্তু ওই নবাবি রত্ন তো কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পদ হয়ে গেছে!

 

ভুলে যাচ্ছ ফতেপুরের নবাববংশীয়রা সুপ্রিম কোর্টে মামলায় জিতেছেন। কাজেই সব নবাবি জুয়েলস সরকার এবার তাদের ফেরত দিতে বাধ্য। বলে কর্নেল ঘড়ি দেখলেন। হারি আপ জয়ন্ত! বারোটা পঁয়ত্রিশে হাওড়া স্টেশনে আমাকে উপস্থিত থাকতে হবে। এগারোটা বেজে গেছে। উঠে পড়ো!..

 

প্রচণ্ড জ্যাম সারা পথ। ৯ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢোকার গেটে যখন দুজনে পৌঁছুলাম, তখন বারোটা বাজে। কিছুক্ষণ পরে গেটের কাছে বোরখাপরা এক মুসলিম মহিলা এসে থমকে দাঁড়ালেন। মুখের ওপর ঝোলানো সূক্ষ্ম পর্দার জাল তুলে কর্নেলকে আদাব দিতেই চমকে উঠলাম। সেই বিশ্বসুন্দরী!

 

তার এক হাতে ছোট্ট লাগেজ, অন্য হাতে একটা জুতোর বাক্স।

 

কর্নেল মৃদুস্বরে বললেন, কাস্টমস অফিসার মিঃ দুবে সদলবলে আপনাকে অনুসরণ করছেন কিন্তু!

 

দিল্লিতে পৌঁছে আমি সোজা ন্যাশনাল আর্কাইভে চলে যাব। আমার পূর্বপুরুষের রত্ন ফেরত দেব।

 

মিঃ দেববর্মনের খবর কী?

 

বিশ্বসুন্দরী হাসলেন। প্লেনে কালই চলে গেছে সে। অবশ্য তাকে দাড়ি কামাতে হয়েছে।

 

কিন্তু আমার শেষ প্রশ্নের জবাব দিয়ে যান জিনাত!

 

কর্নেলসায়েব! আপনি ভুলে গেছেন আমার চাচা মির্জা আব্বাস আলি বেগ আপনার পরিচিত। ফতেগঞ্জে আমাদের বাড়িতে আপনি একবার অতিথি ছিলেন।

 

মাই গুডনেস! কর্নেল চঞ্চল হয়ে উঠলেন।

 

সেই সময় বোরখার মুখের জালি নামিয়ে নবাবনন্দিনী দ্রুত চলে গেলেন। প্ল্যাটফর্মের ভেতরে। দেখলাম, কর্নেল টুপি খুলে টাক চুলকোচ্ছেন। মুখটা বেজায় গম্ভীর। বললাম, আর কী? চলুন, ফেরা যাক।

 

কর্নেল মৃদুস্বরে শুধু বললেন, হ্যাঁ। চলো!..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *