বোরখার আড়ালে (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

দুই 

 

কর্নেলের নির্দেশে পার্ক স্ট্রিট হয়ে চৌরঙ্গির দিকে ড্রাইভ করছিলাম। কর্নেল বলছিলেন, কিছু নিলাম কোম্পানির বিদেশেও শাখা আছে। সিনহা ট্রেডার্সেরও আছে। এদের কেউ-কেউ চোরাই জিনিস কিনে বিদেশি শাখায় পাঠায়। এখন বোঝা যাচ্ছে, এই কোম্পানির বিশ্বজিৎ সিনহা নবাবি পাগড়ির রত্ন দিল্লি থেকে হাতিয়ে এনেছিল। তারপর–যাই হোক, পরের কথা পরে।

 

চৌরঙ্গিতে একটা বিশাল বহুতল বাড়ির পার্কিং জোনে গাড়ি রাখলাম কর্নেলের নির্দেশে। তারপর ওঁকে অনুসরণ করে লিফটে উঠলাম এবং আটতলায় নামলাম। কর্নেল বললেন, এটা সিনহা ট্রেডার্সের অফিস। নিলামঘর ক্যামাক স্ট্রিটে। দেখা যাক্, শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়ায়।

 

কর্মব্যস্ত অফিসঘরে ঢুকে কর্নেল এক ভদ্রলোককে মিঃ অমরজিৎ সিনহার কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি উল্টোদিকে একটা কেবিন দেখিয়ে দিলেন। বেয়ারার হাতে কর্নেলের নেমকার্ড পাঠানোর পর দুমিনিটের মধ্যে ডাক এল। প্রকাণ্ড সেক্রেটারিয়েট টেবিলের ওধারে সাদা ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা সায়েবি চেহারার এক স্মার্ট বৃদ্ধ বসেছিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে বসতে বললেন। তারপর ইংরেজিতে বললেন, বলুন কী করতে পারি আপনাদের জন্য?

 

কর্নেল বললেন, আমার নেমকার্ড কি আপনার পরিচিত মনে হচ্ছে?

 

অমরজিৎ কার্ডটা আবার দেখে দিয়ে বললেন, নাহ্। যাই হোক, বলুন!

 

আপনার ছেলে বিশ্বজিৎ

 

সে বাইরে গেছে।

 

আপনার বউমা চন্দ্রপ্রভা

 

এক মিনিট। দেখুন, আমি কারবারি মানুষ। পারিবারিক বিষয়ে এখানে কথা বলি না।

 

মিঃ সিনহা! সরপেঁচ কালান জমাররুদ কথাটি কি আপনার জানা?

 

অমরজিৎ নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে থাকার পর আস্তে বললেন, আজকের কাগজে খবরটা পড়েছি। আপনারা কি পুলিশ কিংবা সি বি আইয়ের লোক?

 

কর্নেল হাসলেন। না মিঃ সিনহা! আমার কার্ডে যা লেখা আছে, আমি তাই। তবে ঘটনাচক্রে আপনার বউমা চন্দ্রপ্রভার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে।

 

কোথায়?

 

এই কলকাতায়। একটা হোটেলে চন্দ্রপ্রভা আছেন। শ্বশুরবাড়ি ফিরে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কারণ, আপনার ছেলে দিল্লি থেকে ফিরে ওই হোটেলে ওঠার পর নিখোঁজ হয়ে গেছেন।

 

অমরজিৎ নড়ে উঠলেন। অসম্ভব! অবিশ্বাস্য! কী বলতে চান আপনি?

 

আপনার ছেলের কাছে ওই নবাবি রত্ন ছিল। রত্নসমেত উনি নিখোঁজ।

 

অমরজিৎ গলার ভেতর গর্জন করলেন, ওই মেয়েটাকে গুলি করে মারব। কোন হোটেলে আছে সে?

 

মিঃ সিনহা! আপনার ছেলে নিখোঁজ হওয়ার আগে এই চিঠি লিখে গেছেন। দেখুন তো এই হস্তাক্ষর বিশ্বজিতের কি না!

 

কর্নেল পকেট থেকে ভাঁজকরা সেই কাগজটা এগিয়ে দিলেন। অমরজিৎ সেটা তুলে নিয়ে ভাঁজ খুললেন। লক্ষ্য করলাম, তাঁর হাত কাঁপছে। চিঠিটা মিনিট দু-তিন খুঁটিয়ে পড়ার পর তিনি দ্ৰ কুঁচকে বললেন, কিছু বুঝতে পারছি না। বিশ্বজিই লিখেছে। কিন্তু আপনি যে-ই হোন, বিশ্বাস করুন, বিশ্বজিৎকে আমি চোরাই রত্ন কিনতে দিল্লি পাঠাইনি। সে নিজেই গিয়েছিল। তাছাড়া এ ধরনের নোংরা কাজ আমার কোম্পানি করে না।

 

দেখলাম, অমরজিৎ সিনহার স্মার্টনেস ভেঙে যাচ্ছে ক্রমশ। কর্নেল বললেন, আপনার বউমাকে আপনি কেন পছন্দ করেন না মিঃ সিনহা?

 

অমরজিৎ গলার ভেতর বললেন, বিশ্বজিতের নির্বুদ্ধিতা! ওই সর্বনাশী মেয়েটার ফাঁদে পড়েছিল। গোড়া থেকেই ওকে সন্দেহ করেছিলাম, কেউ বা কারা ওকে আমার কারবারের খোঁজখবর যোগাড় করার জন্য বিশ্বজিতের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছে। এখন সন্দেহ হচ্ছে, মেয়েটা আসলে চোর। দিল্লির ন্যাশনাল আর্কাইভে রাখা নবাবি রত্ন হাতানোর জন্যই সে বিশ্বজিৎকে কাজে লাগিয়েছিল।

 

একটু খুলে বলুন মিঃ সিনহা! আর্কাইভে কি বিশ্বজিতের কিংবা আপনার কোম্পানির কোনও চর কর্নেল একটু হেসে বললেন, দুঃখিত। চর না বলে লোক কথাটা বরং ব্যবহার করছি।

 

অমরজিৎ এবার একটু চটে গেলেন। আপনার জানা উচিত, আর্কাইভে গচ্ছিত রাজা-বাদশা-নবাবদের রত্ন নিয়ে অনেক সময় তাদের উত্তরাধিকারীরা মামলা করেন। মামলায় জিতলে সেই রত্ন তারা ফেরত পান এবং নিলামে বিক্রির ব্যবস্থা করেন। তাই আমাদের এদিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। সম্প্রতি ফতেপুরের নবাবের এক বংশধর সুপ্রিমকোর্টে মামলায় জিতেছেন। তাঁর পূর্বপুরুষের পাগড়ির রত্ন শীগগির সরকার তাঁকে ফেরত দিতেন। আজ কাগজে পড়লাম, সেই রত্ন আর্কাইভ থেকে চুরি গেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের তাই নড়ে ওঠারই কথা।

 

হ্যাঁ। কাগজে সেই আভাস আছে।

 

অমরজিৎ আবার স্মার্ট হয়ে উঠলেন। কোন হোটেলে ওই মেয়েটা আছে জানতে চাই কর্নেল সরকার!

 

বলছি। আপনার ছেলের চিঠিটা দয়া করে ফেরত দিন মিঃ সিনহা।

 

এক মিনিট। এটার জেরক্স কপি করিয়ে ফেরত দিচ্ছি। অমরজিৎ টেবিলে সুইচ টিপে একজন বেয়ারাকে ডাকলেন। তাকে চিঠিটার জেরক্স কপির হুকুম দিয়ে বললেন, এবার হোটেলের নাম-ঠিকানা দিন!

 

হোটেল প্যারামাউন্ট। এখান থেকে কাছেই। যতটা জানি, বড় হোটেল নয়। বিদেশি ট্যুরিস্টরাই ওঠে সেখানে।

 

ওই ধরনের হোটেলে বিশ্বজিৎ উঠেছিল। অবিশ্বাস্য! অসম্ভব! ওই মেয়েটাই–

 

কর্নেল তার কথার ওপর বললেন, মিঃ সিনহা! আপনার ছেলে নিখোঁজ হয়েছে। অথচ আমার অবাক লাগছে, আপনি ব্যাপারটা আমল দিচ্ছেন না। এর কি কোনও বিশেষ কারণ আছে?

 

অমরজিৎকে আবার বিব্রত দেখাল। কিন্তু তা সামলে নিয়ে বললেন, আমার ছেলের ব্যাপারে আমার নিজস্ব পথে চলবে। সে নিয়ে আপনার চিন্তার কারণ নেই।

 

বুঝলাম না।

 

সে নিখোঁজ হয়েছে এ কথা আমি বিশ্বাস করি না। ওই শয়তানি মেয়েটা আপনাকে নিশ্চয় একটা গাঁজাখুরি গল্প বলেছে। অমরজিৎ শক্ত মুখে ফের বললেন, চিঠিটা পড়ে মনে হলো বিশ্বজিৎ ওর স্বরূপ জানতে পেরে হোটেল থেকে পালিয়ে গেছে।

 

কিন্তু সে বাড়ি ফেরেনি।

 

অমরজিৎ টেলিফোন তুলে ডায়াল করলেন। তারপর চাপাস্বরে বললেন, মাধব? আমি বলছি। বিশ্বজিৎ কি ফিরেছে?…ঠিক আছে। রাখছি। ফোন রেখে অমরজিৎ কর্নেলকে বললেন, কিছুক্ষণ আগে বিশ্বজিৎ বোম্বে থেকে ফোনে জানিয়েছে, হঠাৎ একটা কাজে তাকে দিল্লি থেকে বোম্বে যেতে হয়েছে। আগামী পরশু বা তার পরের দিন ফিরবে। এবার বলুন, আপনার কী বলার আছে?

 

কর্নেল তুম্বোমুখে বললেন, হ্যাঁ। তাহলে কিছু বলার নেই।

 

এই সময় বেয়ারা সেই চিঠিটার জেরক্স কপি করে নিয়ে এল। অমরজিৎ জেরক্স কপিটা রেখে আসলটা কর্নেলকে ফেরত দিলেন। বাঁকা হেসে বললেন, চিঠিটার তলায় বা ওপরে তারিখ লেখা নেই। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, দিল্লিতে চিঠিটা লিখে রেখে শয়তানি মেয়েটার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে বোম্বে কেটে পড়েছে বিশ্বজিৎ। যাই হোক, আমি হোটেল প্যারামাউন্টে খোঁজ নিচ্ছি। আপনি এবার আসতে পারেন। আমি ব্যস্ত।…

 

নিচে নেমে পার্কিং জোনের দিকে যাবার সময় বললাম, লোকটা সত্যি বদমেজাজি আর কুচুটে। অভদ্র!

 

কর্নেলকে খুব গম্ভীর দেখাচ্ছিল। গাড়িতে ঢুকে বললেন, কুইক জয়ন্ত! প্যারামাউন্টে যেতে হবে। আমি শর্টকাটে যেতে চাই। বাঁদিকের ওই গলিতে ঢোকো।

 

বরাবর দেখে আসছি, কলকাতার নাড়িনক্ষত্র কর্নেলের একেবারে নখদর্পণে। মাঝে মাঝে মুখ তুলে পথের নির্দেশ দিচ্ছিলেন এবং সেই চিঠিটা খুলে এবার আতস কাচ দিয়ে দেখছিলেন উনি। কী অদ্ভুত! কর্নেল পকেটে আতস কাচ নিয়ে ঘোরেন জানতাম না। আবার একটা ঘোরালো গলি দিয়ে এগিয়ে সংকীর্ণ রাস্তায় পৌঁছুলাম। এতক্ষণে উনি চিঠি এবং আতস কাচ পকেটস্থ করে আপনমনে বললেন, গো টু আওয়ার হাউস! কেন? গো টু আওয়ার হোম নয় কেন?

 

বললাম, হাউস যা, হোমও তা-ই।

 

নাহ্ ডার্লিং! হোম, সুইট হোম। স্বামী তার স্ত্রীকে হোমে ফিরে যেতে বলবে, এটাই স্বাভাবিক।

 

চমকে উঠলাম। তার মানে, চিঠিটা বিশ্বজিৎ কি চন্দ্রপ্রভাকে লেখেননি?

 

সম্ভবত। তাছাড়া কোনও সম্বোধনহীন চিঠি।

 

তাহলে অমরজিৎ সিনহার কথা ঠিক। সর্বনাশী মেয়ে। সাংঘাতিক

 

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, ব্যালেনর্তকীরা সাংঘাতিক নাচের কসরত দেখায়। তো–এখানেই গাড়ি রাখো। পার্কিংয়ের মতো জায়গা আর এখানে পাবে না। আমাদের ডাইনে প্যারামাউন্ট হোটেল।

 

সংকীর্ণ রাস্তার ধারে পাঁচতলা একটা পুরনো হোটেল। সায়েব-মেমসায়েবদের আনাগোনা দেখা যাচ্ছিল। কম খরচে অনেক বেশি ঘুরে বেড়াতে ওরা এ ধরনের আস্তানা বেছে নেয় দেখেছি। ছোট্ট রিসেপশন কাউন্টারে ঢুকে কর্নেল বললেন, ৬ নম্বর রুমে মিসেস চন্দ্রপ্রভা সিনহা কি আছেন, না বেরিয়েছেন?

 

রিসেপশনিস্ট অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান তরুণী বলল, ৬ নম্বর? ওঁরা তো একটু আগে চেক আউট করলেন।

 

ওঁরা মানে–মিঃ এবং মিসেস সিনহা দুজনেই?

 

হ্যাঁ।

 

রুমটা কি কেউ বুক করেছেন?

 

তরুণী হাসল। প্যারামাউন্টে কোনও রুম খালি থাকে না।

 

কর্নেল একটু ইতস্তত করে বললেন, মিসেস সিনহার সঙ্গে যিনি চেক আউট করলেন, তিনিই মিঃ সিনহা কি না আপনি নিশ্চিত?

 

রিসেপশনিস্ট তরুণী একটু বিরক্ত হল। অত কিছু জানা আমার কর্তব্য নয়। কারও মুখ আমি মনে রাখি না।

 

কোনায় বসে জিনসব্যাগি শার্টপরা এক তরুণ কানে ওয়াকম্যানের নল খুঁজে মিউজিক শুনছিল এবং কর্নেলকে লক্ষ্য করছিল। কর্নেল ঘুরে পা বাড়িয়েছেন, হঠাৎ সে ওয়াকম্যান খুলে ডাকল, হাই! আপনি কি কোনও কর্নেল? ৬ নম্বরের ভদ্রমহিলা আমাকে আপনার চেহারার বর্ণনা দিয়ে গেছেন। আপনার জন্য একটা মেসেজ আছে।

 

কর্নেল বললেন, আমিই কর্নেল নীলাদ্রি সরকার।

 

সে টেবিলের ড্রয়ার থেকে খামে আঁটা একটা চিঠি বের করে কর্নেলকে দিয়ে বলল, আপনি এলে এটা উনি আপনাকে দিতে বলেছেন।

 

কর্নেল গাড়িতে ঢুকে খামের মুখ ছিঁড়ে চিঠিটা বের করলেন। জিজ্ঞেস করলাম, কী লিখে গেছে?

 

বৃদ্ধ রহস্যভেদী গলার ভেতর আবৃত্তির ভঙ্গিতে বললেন, বিশ্বজিৎ কেম ব্যাক অ্যাট অ্যাবাউট ইলেভেন ওক্লক অ্যান্ড সো উই আর চেকিং আউট ফ্রম প্যারামাউন্ট। থ্যাংক্স।..

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *