বোরখার আড়ালে (কর্নেল সিরিজ) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
এক
সরপেঁচ কালান জমাররুদ ওয়া কানবাল্ আলমাস্ বা আওয়াইজে-ই-জমাররুদ।
কর্নেল নীলাদ্রি সরকার একটা গাব্দা বইয়ের পাতা থেকে হঠাৎ মুখ তুলে এই কথাগুলি উচ্চারণ করলেন। স্বীকার করা উচিত, কথাগুলি তৎকালে আমার বোধগম্য হয়নি। পরে কৌতূহলবশে আমার রিপোর্টারস নোটবইতে টুকে নিয়েছিলাম। তো প্রথম একটু অবাক হয়ে বললাম, কী ভাষা ওটা?
আমার বৃদ্ধ বন্ধু বইটা টেবিলে রেখে বললেন, মোটমাট ৫১০ ক্যারাটের ৩০টি পান্না আর ৯০ ক্যারাটের হীরা। ৯ কোটি টাকা দাম।
অলঙ্কার?
হু। অলঙ্কার বলতে পারো। তবে পুরুষমানুষের!
ওঃ কর্নেল! একটু খুলে বলবেন?
কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, সেকালের নবাবদের সরচে অর্থাৎ পাগড়িতে এই অলঙ্কার শোভা পেত।
হাসতে হাসতে বললাম, পাগড়ির কাপড় অনেকটা লম্বা হয় দেখেছি। কিন্তু নামটা দেখছি শুধু লম্বা নয়, ওজনদারও বটে!
কর্নেল হাসলেন না। তাকে গম্ভীর দেখাচ্ছিল। বললেন, আরবি-ফার্সি নাম। তবে আভিজাত্যের ব্যাপারে সব ভাষাতেই এই বাগাড়ম্বর তুমি লক্ষ্য করবে জয়ন্ত!
কিন্তু আজ সক্কালবেলা হঠাৎ নবাবি অলঙ্কারের বই নিয়ে বসলেন কেন? নিশ্চয় কোনও গোলমেলে ঘটনা কোথাও বেধেছে?
কর্নেল আমার কথার জবাব না দিয়ে কিছুক্ষণ চোখ বুজে কিছু ভেবে নিলেন। তারপর স্বগতোক্তি করলেন, ৯ কোটি টাকা দামের ঐতিহাসিক অলঙ্কার যেমন-তেমন একটা জুতোর প্যাকেটে ভরে দিল্লি থেকে প্লেনে কলকাতা! বোকামি, নাকি অতিবুদ্ধি, নাকি
তার কথার ওপর ডোরবেল বাজল এবং কর্নেল যথারীতি হাঁক দিলেন, ষষ্ঠী। তারপর কর্নেলের জাদুঘরসদৃশ ড্রয়িংরুমকে ঝলমলিয়ে দিয়ে এক বিশ্বসুন্দরীর আবির্ভাব ঘটল।
বিশ্বসুন্দরীই বলছি। কারণ, আমার সাংবাদিক পেশার কারণে সম্প্রতি এক বিশ্বসুন্দরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছি। নিমেষে আমার মাথায় এই শব্দটাই এসে গিয়েছিল। কিন্তু এই যুবতীর চেহারায় ঈষৎ বিষাদ ছিল, যা পরক্ষণে আবিষ্কার করলাম। তার সঙ্গে ছিল যুগপৎ উত্তেজনা আর আর্তিরও আভাস। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম।
কর্নেল বললেন, বসুন মিসেস সিনহা! আলাপ করিয়ে দিই। আমার তরুণ বন্ধু জয়ন্ত চৌধুরি। দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার রিপোর্টার। আর জয়ন্ত! ইনি মিসেস চন্দ্রপ্রভা সিনহা। বাকি পরিচয় ক্রমশ জানতে পারবে।
বিশ্বসুন্দরী আমাকে নমস্কার করে শান্তভাবে সোফায় বসলেন। কিন্তু মিসেস শুনেই আমার কেমন যেন লাগল। এই সুন্দরী যুবতীর স্বামী থাকাটা যেন মানায় না। এতে যেন সৌন্দর্যেরই অবমাননা ঘটেছে।
চন্দ্রপ্রভা মৃদুস্বরে বললেন, খবরের কাগজকে আমি এখনও কিছু জানাইনি। পুলিশকেও না। আপনাকে টেলিফোনে বলেছি, আমি ঘটনাটা কেন গোপান রাখতে চাই।
কর্নেল একটু হেসে বললেন, জয়ন্ত খবরের কাগজে চাকরি করলেও নিজে খবরের কাগজ নয়। ওর সামনে সবকিছু আপনি খুলে বলতে পারেন। কারণ, আমার যা কিছু জানা হয়ে যায়, তা জয়ন্তেরও অজানা থাকে না। যাই হোক, বলুন!
চন্দ্রপ্রভা আমাকে একবার দেখে নিয়ে আস্তে বললেন, আমি বুঝতে পারছি না বিশ্বজিৎ এমন কেন করল? নবাবি জুয়েলস সে তো নিজেই নিলামে কিনেছে। নিজেই পার্টি ঠিক করেছে বিক্রির জন্য। অথচ হঠাৎ হোটেল থেকে উধাও হয়ে গেল! আমার ভয় হচ্ছে কর্নেল সরকার! বিশ্বজিৎ হয়তো কারও ফাঁদে পা দিয়েছে!
কর্নেল বললেন, মিঃ সিনহার চিঠিটা কি এনেছেন?
চন্দ্রপ্রভা হ্যান্ডব্যাগ খুলে একটা ভাজকরা কাগজ দিলেন। কর্নেল সেটা খুললেন। লক্ষ্য করলাম ছাপানো লেটারহেডের প্যাড থেকে ছেঁড়া একটা চিঠি। কর্নেল বিড়বিড় করে পড়ছিলেন, প্লিজ ডোন্ট বি ওয়ারিড। চেক আউট ফ্রম দি হোটেল অ্যান্ড গো টু আওয়ার হাউস। বি সিনহা। পড়ার পর জিজ্ঞেস করলেন, আপনার স্বামীর হাতের লেখা এটা?
হ্যাঁ।
দিল্লি থেকে প্লেনে কলকাতা ফিরে কেন আপনারা বাড়ি যাননি–হোটেলে উঠেছিলেন?
বিশ্বজিৎ বলেছিল, হোটেলে ওর পার্টি আসবে। যত শীগগির হয়, জিনিসটা বেচে দিতে পারলে আর ঝুঁকি থাকবে না।
কিসের ঝুঁকি?
চন্দ্রপ্রভা চাপা শ্বাস ছেড়ে বললেন, জিনিসটার দাম নাকি কয়েক কোটি টাকা।
দিল্লির নিলামঘরে আপনি উপস্থিত ছিলেন না?
না। বিশ্বজিৎ আমাকে একটা হোটেলে রেখে গিয়েছিল।
জুয়েলসটি আপনি দেখেছেন?
চন্দ্রপ্রভা তাকালেন। একটু পরে বললেন, না। ওসব ব্যাপার আমি বুঝি না।
ওটা সাধারণ জুতোর বাক্সে ভরার প্ল্যান–
না। আমার প্ল্যান নয়। চন্দ্রপ্রভা দ্রুত বললেন। ওটা দেখেই আমার ভয় করছিল। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মেছি। ঘটনাচক্রে বিশ্বজিতের মতো কোটিপতির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে।
কতদিন আগে আপনাদের বিয়ে হয়েছে?
প্রায় দুমাস।
আপনি কী করতেন?
একটা ব্যালে ট্রুপে ছিলাম। ছোটবেলা থেকে ওয়েস্টার্ন ড্যান্স আমার প্রিয়।
কর্নেল হাসলেন। ব্যালেতে প্রচুর শারীরিক কসরত করতে হয়। যাই হোক, আপনি আপনাদের বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন না। হোটেলেই আছেন। কেন?
চন্দ্ৰপ্ৰভা শ্বাসপ্রশ্বাসের মধ্যে বললেন, আমি একা বাড়ি ফিরতে সাহস পাচ্ছি না। আমার শ্বশুরমশাই অমরজিৎ সিনহা আমাকে পছন্দ করেন না। উনি আমাকে বিপদে ফেলতে পারেন। তবে আমি টেলিফোনে ওবাড়িতে যোগাযোগ করেছি। বিশ্বজিৎ আজ সকালেও বাড়ি ফেরেনি।
আপনি নিজের পরিচয় দেননি নিশ্চয়?
না। কে ফোন ধরেছিল, জানি না। বেশি কথা বলতেও সাহস পাইনি।
আপনার বাবার বাড়িতে–
আমার বাবার বাড়ি বোম্বে। আমি বোম্বেতে জন্মেছি। সেখানেই বড় হয়েছি।
কলকাতায় আপনার পরিচিত আর কেউ নেই?
না। বিয়ের পর ব্যবসার কাজে বিশ্বজিৎ বেশির ভাগ সময় বোম্বেতেই কাটিয়েছে।
আমার নেমকার্ড আপনি মিঃ সিনহার কাছে পেয়েছিলেন?
হ্যাঁ। সে তো আপনাকে গতরাত্রে বলেছি। বিশ্বজিৎ প্লেনে আসার সময় বলেছিল, তার কোনো বিপদ হলে আমি যেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করি।
কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে বললেন, তাহলে দেখা যাচ্ছে সত্যি একটা বিপদ হল!
কর্নেল সরকার! আমাকে সাহায্য করুন! চন্দ্রপ্রভার চোখে জল এল। দ্রুত রুমাল বের করে চোখ মুছে ফের বললেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস; ও কারও ফাঁদে পা দিয়েছে।
চিন্তা করবেন না। আমার যথাসাধ্য চেষ্টা আমি করব। কর্নেল তার সাদা দাড়িতে হাত বুলিয়ে ঘড়ি দেখে নিলেন। তারপর বললেন, গতকাল আপনারা দমদম এারপোর্ট থেকে ট্যাক্সি চেপে হোটেল প্যরামাউন্টে পৌঁছেছিলেন?
হ্যাঁ। বিশ্বজিৎ দালাল ধরে ট্যাক্সির ব্যবস্থা করায় অবাক হয়েছিলাম। ওখানে আমাদের গাড়ি থাকার কথা ছিল।
হোটেলে লাঞ্চের পর আপনি ঘুমিয়ে পড়েন?
হ্যাঁ। ঘুম ভেঙে দেখি রাত পৌনে নটা বাজে। আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল। কিছুক্ষণ পরে দেখি, টেবিলে ওই কাগজটা রাখা আছে। রাত সাড়ে দশটায় আপনাকে ফোন করলাম। আপনি রিসেপশনে খোঁজ নিতে বলেছিলেন। তারা কিছু বলতে পারল না।
আপনার কি সন্দেহ যে মিঃ সিনহা আপনাকে ঘুমের বড়ি খাইয়ে দিয়েছিলেন?
চন্দ্রপ্রভা চমকে উঠলেন। কেন সে তা করবে?
কর্নেল চুপচাপ চুরুট শেষ করে অ্যাশট্রেতে নেভালেন। তারপর বললেন, এক পেয়ালা কফি খান মিসেস সিনহা। কফি নার্ভ চাঙ্গা করে।
ধন্যবাদ। আমাকে এখনই হোটেলে ফিরতে হবে। যদি বিশ্বজিৎ ফাঁদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে ফিরে আসে?
বেশ তো! এলে নিশ্চয় আমাকে ফোন করবেন উনি। কারণ উনি আমাকে চেনেন। অবশ্য আমার মনে পড়ছে না ওঁকে আমি চিনি কি না কিংবা এঁকে আমার নেমকার্ড দিয়েছিলাম কি না! আপনি কফি খান! বলে কর্নেল হাঁকলেন, ষষ্ঠী!
কিন্তু চন্দ্রপ্রভা উঠে দাঁড়ালেন। ব্যস্তভাবে বললেন, প্লিজ কর্নেল সরকার! আমার এখন কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। আমি হোটেলে ফিরতে চাই। হোটেল প্যারামাউন্টের ঠিকানা-ফোন নাম্বার আমি দিচ্ছি।
কর্নেল হাত তুলে বললেন, আমি জানি।
চন্দ্রপ্রভা বেরিয়ে গেলেন। এতক্ষণে টের পেলাম ঘর সুগন্ধে ভরে আছে। একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখছিলাম যেন। অথচ এটা স্বপ্ন নয়। ঘর থেকে সৌন্দর্যটি চলে গেলেও সৌরভ রেখে গেছে। একটু পরে এ-ও মনে পড়ল, শুধু সৌন্দর্যদর্শন করিনি, স্মার্ট ইংরেজিতে কথোপকথনও শুনছিলাম।
জয়ন্ত! আমার প্রাজ্ঞ বন্ধু সহাস্যে বললেন, তুমি কাগজের লোক হয়েও কাগজ পড়ো না। তাই মজাটা মিস্ করলে। দিল্লির ন্যাশনাল আর্কাইভে রাখা ফতেপুরের নবাবের পাগড়ি থেকে ৯ কোটি টাকা দামের রত্ন চুরি যাওয়ার খবর বেরিয়েছে আজ। তবে–না! মাথা ঠাণ্ডা রেখে ধীরে এগোতে চাই।
আমি হতভম্ব হয়ে বসে রইলাম।…
