সেকালের লড়াই – সুকুমার রায়

শেয়ার করুনঃ

Bengali Story Sekaler Lorai Shukumar Ray সেকালের লড়াই গল্প সুকুমার রায়

 

‘সন্দেশে’ তোমরা নানারকম জানোয়ারের লড়াইয়ের কথা পড়েছ। কিন্তু বাস্তবিক লড়াইয়ের মতো লড়াই কাকে বলে যদি জানতে চাও তবে সেকালের জানোয়ারদের খোঁজ নিতে হয়। যে কালের কথা বলছি সে সময়ে মানুষের জন্ম হয়নি—সে প্রায় লাখ লাখ বছরের কথা। সে সময়কার জন্তুরা ত এখন বেঁচে নেই, তাদের খোঁজ নেবে কি করে? খোঁজ নেবার উপায় আছে।

 

যে-সকল পণ্ডিতেরা নানারকম জানোয়ারের শরীর পরীক্ষা করে থাকেন তাঁরা এক একটা জানোয়ারের সামান্য দু-একটা হাড়, দাঁত বা শরীরের কোন টুক্‌রা দেখে সেই জানোয়ার সম্বন্ধে এমন অনেক কথা বলে দিতে পারেন যে শুনলে অবাক হতে হয়। সে আমিষ খায় কি নিরামিষ খায়, জলে থাকে কি ডাঙায় থাকে, দু পায়ে চলে না চার পায়ে চলে, সে কোন জাতীয় জন্তু, এসব কথা শুধু খানিকটা কঙ্কাল পরীক্ষা করে চট্‌ করে বলা যেতে পারে। কিন্তু অনেক সময়ে পাহাড় কাটতে বা মাটি খুঁড়তে গিয়ে এমন সব হাড় পাওয়া যায় যেটা আমাদের জানা কোন জন্তুর হাড় হতেই পারে না। মন কর, একটা পায়ের টুক্‌রা পাওয়া গেল প্রায় পাঁচ হাত লম্বা আর একটা হাতির পায়ের চেয়েও মোটা। সে হাড় আর এখন হাড় নেই, সে কোন্‌কালে পাথর হয়ে গিয়েছে কিন্তু তার চেহারাটা সেইরকমই আছে। এইসব হাড় পরীক্ষা করে সেকালের অদ্ভুত জন্তু সম্বন্ধে অনেক আশ্চর্য কথা জানা গিয়েছে।

 

মনে কর, একটা পাথর কাটতে গিয়ে তার মধ্যে একটা জানোয়ারের কঙ্কাল পাওয়া গেল—সে পাথর এক সময়ে নরম মাটি ছিল—জানোয়ারটা তার মধ্যে মারা যায়। ক্রমে সেই নরম মাটি জমে সেই হাড়গোড়শুদ্ধ পাথর হয়ে গিয়েছে। মাটি জমে পাথর হতে হয়ত কত লাখ বৎসর লেগেছে, তারপরে কত হাজার বৎসর কেউ তার কথা জানতে পারেনি। এতদিন পরে মানুষ আবার জানোয়ারের সন্ধান পেল! পণ্ডিতেরা সেই পাথর পরীক্ষা করে হয়ত বলবেন এটা অমুক যুগের পাথর। তারপর হাড় পরীক্ষা করে জানোয়ারটার সম্বন্ধেও নানা কথা বলবেন। যদি অনেকগুলা হাড় পাওয়া যায় তবে হয়ত জানোয়ারটার একটা মোটামুটি চেহারাও খাড়া করতে পারবেন।

 

এইরকম করে কত অদ্ভুত জানোয়ারের যে খবর পাওয়া গেছে সে কথা ভাবতে গেলে অবাক হতে হয়। …প্লীসিওসরাস (অর্থাৎ ‘প্রায় কুমির জাতীয়’) জানোয়ারটির গলা ছিল সরু আর লম্বায় ২৫/৩০ হাত হলেও এ মোটের উপর নিরীহ ছিল। আরেকটা ছিল ইকথিরোসরাস (‘মাছ কুমির’)। আর দুটো জানোয়ার ছিল মেগালোসরাস আর ইগুয়ানোডন; ইগুয়ানোডন দেখতে ভয়ানক বটে, কিন্তু নিরামিষভোজী, মেগালোসরাস আমিষভোজী। এরা দুজনেই হাতির চেয়ে বড় ছিল। সেকালের কুমিরদের পিছনের পা দুটার গড়ন সাংঘাতিকরকম মজবুত—লড়ায়ের সময় পিছনের পা দুটাই আক্রমণ কিংবা আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করত। এদের নাম টিরানোসরাস অর্থাৎ অত্যাচারী কুমির। এরাও হাতির চেয়ে বড় ছিল।

 

এরকম আরও কত জানোয়ার সেকালে ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। আমরা যদি তখন বেঁচে থাকতাম তাহলে কি মুশকিল হত বল দেখি? এতগুলো হাতির চেয়ে বড় হিংস্র জানোয়ারের মধ্যে আমাদের দশাটা কেমন হত একবার ভেবে দেখ। কয়েক বৎসর আগে অনেকের বিশ্বাস ছিল যে দক্ষিণ আমেরিকার প্যাটাগোনিয়ার জঙ্গলে সেকালের জন্তু এখনও আছে। একজন সাহেব অনেক লোকজন নিয়ে খুঁজতে গিয়েছিলেন; কিন্তু তাদের দেখা পেলেন না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *