অশ্লীল (উপন্যাস) – সমরেশ বসু

শেয়ার করুনঃ

সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠবার আগেই, অনেকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। ভজু, সন্তোষ, হিরা (মেড সারভেন্ট), জানকী (ঠাকুর), ইদ্রিস (বাবুর্চি), বৈদ্যনাথ (খানসামা), মতিয়া (বড়বউদির বাচ্চার জন্য এক সময়ে ওকে আয়া হিসাবে নেওয়া হয়েছিল, তারপরে আর বড়দা–যার নাম ঘোঁতন–তাঁর নিজের বাড়িতে আর যায়নি, এখানেই থেকে গিয়েছে।) সকলেই কপালে হাত ঠেকিয়ে আমাকে নমস্কার করল, কেবল সন্তোষ আর হিরা পায়ে হাত দিয়ে করল, কারণ ওরা ছোট বলে বোধ হয়, কিন্তু আমার খুব অস্বস্তি লাগে, এবং ওদের সকলের চোখেই, নাথুর মতো কেমন একটা অবাক, আরআর ইনকুজিটিভ লুক। যেন নতুন আর অদ্ভুত একটা লোককে দেখছে। কেন তা কে জানে! ওরা সবাই কেমন আছে, এবং ভাল আছে জেনে আমি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলাম, আর মনে হল যেন, আমি ওদের মুখে হাত চাপা হাসির শব্দ শুনতে পেলাম।

দোতলার সাউথ ফেসিং বড় বারান্দায় পা দিয়েই আমি থ–থমকে দাঁড়ালাম। মিটার বক্সের নীচেই, দেওয়াল ঘেঁষে এক জন অচেনা ম-মহিলা মানে, একটি মেয়ে বললে যা বোঝায়, সেই রকম, তবু আমি মহিলাই বলতে চাই, দাঁড়িয়ে আছেন, এবং দু হাত কপালে ঠেকিয়ে বললেন, নমস্কার, আসুন। আমার নাম রজনী।

আমার মুখ দিয়ে কোনও রকমে বেরোতে পারল, রজনী?

মহিলার গলার স্বরটা, কী বলব, বেশ টানটান–মানে তার টেনে বাঁধলে যে রকম বাজে, অনেকটা যেন সেই রকম; বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু অন্ধ নই, দেখতেই পাচ্ছেন।

তার চোখ–আমি ডেসক্রাইব করতে পারি না, মনে হয় খুব বড় না, অথচ বড়, আর দৃষ্টিটা যেন ডিপ অথচ–অথচ ঝলকানো। অবাক হয়ে উচ্চারণ করলাম, অন্ধ?

রজনী তার সেই স্বরে বললেন, হ্যাঁ, বঙ্কিমচন্দ্রের রজনী তো অন্ধই ছিল।

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, ওহ, হ্যাঁ, কিন্তু আপনি তো–।

সেই রজনী না৷ রজনী বলে উঠলেন।

উনি আমাকে ভুল ভাবছেন, বললাম, না, তা বলিনি, আমি বলছিলাম, আপনি তো মোটেই অন্ধ নন।

রজনী বললেন, অন্তত চক্ষে।

বলে তিনি ঠোঁট টিপে হাসলেন। ওঁকে রোগা মোটা কিছুই বলা যায় না, শর্ট বা টল, তাও না, এবং ফরসা বা কালো, তাও বলা যায় না, কিন্তু ওঁর নাক টিকোলো, ঠোঁট-ঠোঁটকী জানি, সব মিলিয়ে একটা ধারালো ধারালো, অথচ–অথচ, হ্যাঁ সুইট লাগছে। পরেছেন একটা সামান্য শাড়ি, লাল পাড়, হলুদ রঙের, জামাটাও হলুদ, আর ওটাকে কী বলে, উনি বেশ হেলদি। তার মানে পেশি ফোলানো না, হেলদি। সুদীপ্তা চ্যাটার্জি বা আরও অনেকের মতো ধাক্কা দেওয়া শরীর ঠিক না, কিন্তু কী যেন আছে, বলা যায়–শি ইজ চার্মিং। বয়স অবিশ্যি আমি বুঝি না, তবে ফুচকির (আমার ছোট বোন।) বয়সি হবেন বোধ হয়। কোনও অরনামেন্টসই ওঁর গায়ে নেই, মাথায় ওটাকে বলে হর্সটেল, টেনে পিছন দিকে সেই রকম বাঁধা। বললেন, অবিশ্যি আপনি আমাকে তিতির বলেও ডাকতে পারেন।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন?

রজনী বললেন, কেন আবার, তিতির আমার ডাকনাম।

ওহ্, আমি ভাবলাম, আপনি বুঝি এমনি এমনি পাখির নাম নিয়ে ডাকতে বললেন।

রজনী–মানে তিতির হেসে উঠলেন, আমি তার সাদা ঝকঝকে দাঁত দেখতে পেলাম, বললেন, এমনি এমনি কেউ পাখির নামে ডাকতে বলে নাকি? আমার ডাকনামটাই আপনাকে বললাম, আর এও বলে রাখছি, দয়া করে, তুমি বলবেন, আমি ফুচকির থেকে এক বছরের বড়। এখন আপনাদের গলগ্রহ।

আমাদের গলগ্রহ? আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

রজনী-মানে তিতির এ বার দেওয়ালের কাছ থেকে এক পা সরে এসে বললেন, হ্যাঁ, কিন্তু সে সব কথা পরে হবে, এখন আপনি ঘরে চলুন। মেসোমশাই আমাকে আপনার দেখাশোনা করতে বলে গেছেন।

মেসোমশাই কে?

আপনার বাবা। আসুন, আপনার ঘরে আসুন।

এ সময়েই পিছনে পায়ের শব্দে ফিরে দেখলাম, সন্তোষ আমার সুটকেসটা নিয়ে এসেছে। রজনী– মানে তিতির চলে যাচ্ছেন এগিয়ে, আমি সন্তোষের দিকে অবাক চোখে তাকালাম। সন্তোষ বলল, তিতিরদি।

আমি শব্দ করলাম, ওহ!

সন্তোষ আবার বলল, এক বছর হল এসেছেন।

রজনী–মানে তিতিরের স্বর দূরের বারান্দা থেকে আমার কানে এল, আমার পরিচয়টা আমিই দেব আপনাকে, আসুন না।

দেখলাম উনি আমার ঘরের দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে আছেন। আবার বললেন, সন্তোষ, তুমি সুটকেসটা ওঁর ঘরে রেখে, আগে এক কাপ চা দিয়ে যেতে বলল।

সন্তোষ আর কোনও কথা না বলে, সোজা আমার ঘরের দিকে চলে গেল। রজনী–মানে তিতির কেন জানি না, ওকে আমার তিতির বলতেই ইচ্ছা করছে, রজনী নামটা যেন কেমন, আজকাল শোনা যায় না। তিতির আমার ঘরে ঢুকে গিয়েছেন। আমি সন্তোষের পিছনে পিছনে গেলাম। ওপরতলাটা একেবারে চুপচাপ, যাকে বলে নিঝুম। আমি আমার ঘরে ঢুকে, কিটব্যাগটা রেখে, নিজেই অবাক হয়ে গেলাম, প্রায় চিনতেই পারছি না, এত সাজানো গোছানো। খাট, ড্রেসিংটেবল, ওয়ারড্রব, পড়ার টেবল, বইয়ের আলমারি যেমন ছিল তেমনি আছে, কিন্তু সব যেন নতুনের মতো লাগছে। খাটটার জায়গা বদলানোনা হয়েছে। আমার ঘরটা বারান্দার দিকে এগিয়ে এসেছে, সে জন্য আমি বারান্দার ইস্ট সাইডের বাতাসও পাই। আবার যে সব ঘর বারান্দা থেকে পিছনে গিয়েছে, সে ঘরে সকালের রোদে পড়ে, আমার ঘরে বলতে গেলে কখনওই রোদ পড়ে না, বছরের কোন একটা সময়ে যেন, বেলা খানিকটা পড়ে গেলে, রোদ আসে। খাটটা বারান্দার জানালার দিকে টেনে আনা হয়েছে। কিন্তু আমার ঘরের সবই থাকত একটু এলোমেলো। অবিশ্যি অনেক দিন ব্যবহার করা হয়নি, বন্ধই থাকত, তবু কেমন যেন সব ঝকঝক করছে, তা ছাড়া আমার ঘরের দেওয়ালে কখনও কোনও ছবি ছিল না। এখন দেখছি। দু দিকে মুখোমুখি দেওয়ালে দুটো বড় বড় ছবি টাঙানো রয়েছে, মনে হয় তেলরঙের আঁকা। একটু, অদ্ভুত ধরনের, অনেকটা বিরাট কদম ফুলের মতো, কিন্তু কদম না–একমাত্র কালিম্পং-এর একটা ক্যাকটাসের নার্সারিতেই এ রকম ফুল দেখেছিলাম। আর এক দিকে রয়েছে পাহাড়ি ঝরনার স্রোত, সবুজ ঝোঁপঝাড় আর সোজা দেবদারু গাছ। রজনী, তিতির বারান্দার দিকের জানালাটা খুলে দিচ্ছিলেন, ওঁর গলার স্বর শুনতে পেলাম, পেন্টিং দুটো আপনার ভাল লাগছে?

আমি ওঁর দিকে ফিরে বললাম, হ্যাঁ, মানে বেশ সুন্দর। এগুলো কোথা থেকে কেনা হয়েছে?

তিতির বললেন, কেনা হয়নি, মেসোমশাইকে দু জন আর্টিস্ট প্রেজেন্ট করেছিলেন। এক দিন দেখেছিলাম, ওঁর শোবার ঘরে ও দুটো কাগজে মোড়া, খাটের তলায়। গতকাল আপনার ঘরে টাঙিয়ে দিয়েছি।’

খুশি, কিন্তু একটু যেন লজ্জা পেয়ে গেলাম, আমি তিতিরের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম না। উনিই জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলছেন?

বললাম, না, মানে আমার ঘরে এ সব ঠিক মানায় না।

কেন?

কেন? তা কী করে বলব। বললাম, কখনও টাঙানো হয়নি তো, তা-ই।

তিতির বললেন, কখনও হয়নি, এখন হয়েছে। আপনার ভাল লাগছে তো?

খুব–মানে–এনচ্যানটেড।

দ্যাটস মাচ টু মাচ। দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন। অবিশ্যি আপনার ঘরে আপনাকে বসতে বলার কোনও মানে হয় না।

আমার ঘরে সোফা বলতে যা বোঝায়, তা নেই, খান দুয়েক গদি মোড়া চেয়ার, আর একটি স্টিল পাইপের ইজিচেয়ার, যেটাকে ভেঙে ফ্ল্যাট করে নিয়ে শোয়াও যায়। আমি হ্যাঁ’ বলে, একটা চেয়ারে বসেই আবার উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, আপনি বসুন।

আপনি! আপনাকে আগেই বলেছি, আমাকে আপনি করে বলবেন না। তা হলে বসতেই পারব না।

বলে তিতির ঘাড়ে একটা, কী বলে ওটাকে, ঝটকা দিলেন, আর ওঁর হর্সটেলের গোছা, ওঁর গালে ঝাঁপটা দিয়ে গেল। আমি নিজেকে কেমন যেন বি–বিপদগ্রস্ত বোধ করছি। এক জন মহিলাকে না হয় একটি ইয়ং গার্লকে কেন না উনি ফুচকির থেকে মাত্র এক বছরের বড়। এ বয়সের মহিলাদের ইয়ং গার্লই বলা যায়, একেবারে প্রথম দেখাতেই কী করে তুমি বলব। কখনও তো বলিনি। বললাম, কী করে বলব?

তিতির ঘাড় কাত করে, ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, কেন?

বললাম, এক জন সেলফ-ইনট্রোডিউসড নতুন মহিলাকে—

মহিলা?

মমম-মানে তা-ই তো।

মনে হল, তিতিরের মুখটা যেন লাল হয়ে উঠল, আর চোখে, কী বলে ওটাকে, যেন স্পার্ক দিয়ে গেল একটা, এবং ঠোঁট দুটো যেন টিপে ধরলেন। কয়েক সেকেন্ড পরে বললেন, হ্যাঁ, তা-ই, আমি একটি মেয়ে-ই, কিন্তু আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন, আদারওয়াইজ, আপনার সঙ্গে আমি কথাই বলতে পারব না।

আশ্চর্য, আমি তো এ রকম কথা কখনও শুনেছি বলে মনে হয় না, একমাত্র দিল্লির রত্না ঘোষ ছাড়া। তবে রত্না আবার একটু বেশি ইয়ে, ঠিক স্মার্ট বলব না, কী ওটা আমি জানি না, একটু ভয় পেতাম, যদিও ও দেখতে সত্যি খুবই সুন্দর। ওকে আমি তুমি বলতাম, কারণ মমতা কাকিমা আমাকে শাসিয়ে বলে দিয়েছিলেন, আমি যেন কখনও রত্নাকে আপনি করে না বলি। কিন্তু তিতিরকে ওহ, অকোয়ার্ড, আমি বলতে গেলে হা করে তিতিরের মুখের দিকে তাকিয়েই কথাগুলো ভাবছি। তাড়াতাড়ি মুখটা নামিয়ে ভাবতে লাগলাম, কী করা যায়। তিতিরের স্বর শুনতে পেলাম, খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন নাকি? আমি ওঁর মুখের দিকে তাকালাম, উনি আবার বললেন, এক বার বলে ফেলুন, তা হলেই এসে যাবে।

মনে আছে, মমতা কাকিমা বলেছিলেন, য়ু স্টার্ট ওয়ানস, দেন ইট উইল বি ইজি’ বলে একটা চোখ বুজিয়ে ঘাড় নেড়েছিলেন, ওটাকে বোধ হয় উইংকিং বলে, কিন্তু আমি সে ভঙ্গির কোনও মানে বুঝতে পারিনি। বললাম, চেষ্টা করব।

করব না, করুন, তার আগে বসুন।বলে তিতির এক পাশে গিয়ে বাথরুমের দরজাটা খুলল, উঁকি মেরে দেখল, আবার বন্ধ করে দিল। আমি বসলাম, উনি আমার দিকে ফিরে দেখলেন, তারপরে এগিয়ে এসে, কাছের একটা চেয়ারে বসে বললেন, সইয়ের বউয়ের বকুল ফুলের বোনঝি জামাই বলে কোনও কথা কখনও শুনেছেন?

প্রায় একটা কোড ল্যাঙ্গুয়েজ শুনলাম বলে মনে হল, তাই জিজ্ঞেস করলাম, কী বললেন?

বললেন না, বললে।

হ্যাঁ, তাই, মানে ব–ব।

বললে, বলুন, বললে।

বললে।

হ্যাঁ, বলছিলাম, সইয়ের বউয়ের, বকুল ফুলের, বোনঝি জামাই, বুঝলেন? তিতির বেশ কেটে কেটে কথাগুলো বলল। আমার মেরিট খুব খারাপ না, তবু কথাগুলো মাথায় ঢুকল না বলেই, মনে রাখা খুব শক্ত হল। জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে কী?

নাথিং। কিছুই না, কারোর সঙ্গে এ রকম কোনও আত্মীয় সম্পর্ক হতে পারে না, যেমন কি না, আমি আপনাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয় হিসাবে এ বাড়িতে এসেছি, যেটাকে আসলে আত্মীয়তাই বলা চলে না।

আমি শব্দ করলাম, ওহ্।

নিয়ে এসো।’ তিতির বলল দরজার দিকে তাকিয়ে। আমিও তাকিয়ে দেখলাম, হিরা একটা ট্রে নিয়ে ঢুকছে। সেটা এনে টেবলে রাখবার পরে, তিতির জিজ্ঞেস করল, জানকীর সঙ্গে তোমার লাগেনি তো?

হিরা যেন লজ্জা পেয়ে, ঠোঁট টিপে হেসে, মাথা নিচু করে ঘাড় নাড়ল, এবং ও চলে যাবার মুখে, তিতির আবার বলল, কিন্তু তুমি যেন আবার ওদের সামনে বাড়াবাড়ি করে ফেলো না।

হিরা কোনও কথা না বলে, ওর চিবুকটা প্রায় বুকে ঠেকিয়ে বেরিয়ে গেল। হিরাকে তো কোনও দিন এতটা ইয়ে, মানে কেমন যেন লজ্জায় নুয়ে পড়তে দেখিনি। ও ওর সাত বছর বয়স থেকে আমাদের বাড়িতে আছে, ওর মা মরে যাবার পর থেকে। এখন বোধ হয় কুড়ি একুশ হল। তিতির চা করতে আরম্ভ করে দিয়েছে। চা কাপে ঢেলে, দুধ আর কিছু না জিজ্ঞেস করেই দেড় চামচ চিনি মিশিয়ে, চামচ নাড়তে নাড়তে আমার দিকে এগিয়ে দিল। আর একটা কাপ ছিল, তার মধ্যে চা ঢালতে ঢালতে বলল, কিন্তু যত দূরের আত্মীয়তাই হোক, আসলে কিছু না থাকলেও, বরাবরই শুনে এসেছি, মহাদেব মুখোপাধ্যায় আমার মেসোমশাই হন।

আমি প্রায় খুশি হয়ে বললাম, ওহ, তাই নাকি?

তিতির ওর চায়ে দুধ, চিনি মিশিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল, কিন্তু মেসোমশাই আমাকে তো আগে কখনও চোখে দেখেনইনি, তার শালী, মানে আমার মাকেও জীবনে কখনও দেখেননি। বলে চায়ের কাপে চুমুক দিল।

আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, এ আবার হয় নাকি, বাবা তার শালিকে চেনেন না? আমাদের তো দু জন মাসিমা ছিলেন, এক জন মারা গিয়েছেন, তারা আমাদের এ বাড়িতেও এসেছেন। তিতির আবার বলল, খুব অবাক হচ্ছেন? কিন্তু ব্যাপারটা খুবই ন্যাচারাল। আমার মা ছিলেন, আপনার মায়ের দুর সম্পর্কের পিসতুতো বোন, আপন পিসতুত নন। আপনার মা, আমার মাকে জীবনে ছেলেবেলায় এক বার দেখেছেন, তাও তাদের দুজনেরই বিয়ের আগে। তারপরে আর কেউ কারোকে দেখেননি, কোনও যোগাযোগও ছিল না। মেসোমশাই–মানে আপনার বাবা, কোনও দিন আমার বাবা-মায়ের নামও শোনেননি। কিন্তু মহাদেব মুখার্জিকে কে না চেনে বলুন, আর মা বলতেন, উনি আমাদের মেসোমশাই হন।আপনার চা জুড়িয়ে যাচ্ছে।

ওহ!’ শব্দ করে, আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম।

তিতিরও কাপে চুমুক দিল। ওর কথা আমার কেমন একটা অদ্ভুত লাগছিল, ব্যাপারটা এক ধরনের নতুন বিষয় বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে। তিতির বলল, তা-ই, কোথায় আর যাই, মেসোমশাইয়ের কাছেই চলে এলাম, উনিও অবশ্য আমাকে সহজেই গ্রহণ করেছেন।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার বাবা-মা?

তিতির বলল, তারা স্বর্গে চলে গেছেন। বলে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে, আবার বলল, আমার আর কেউ নেই ইহজগতে। ভাইবোন নেই, আত্মীয়স্বজন থাকলেও, তাঁদের আমি চিনি না। বাবা লেখাপড়া কিছু শিখিয়েছিলেন, বিয়েটা দিয়ে যেতে পারেননি, বেঁচে থাকলেও পারতেন কি না, জানি না, কারণ তার আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ ছিল–আপনার চা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।

আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম, কিন্তু আমি আর এখন অবাক না, তিতিরকে আমার পৃথিবীর একটা ইয়ের মতো লাগছে, একটা বিস্ময়ের মতো, যার মধ্যে অনেক কিছু মিশে আছে, যেমন–ভয়, দুর্বিপাক, হেল্পললসনেস, অথচ তিতির কী রকম সহজ, যার আপন বলতে, ওর কথায়, ইহজগতে আর কেউ নেই। কেমন একটা বিস্ময়ের মতো লাগছে না ওকে? ওর মুখে কোনও ছায়া পড়েনি, বলতে বলতে চায়ের কাপে চুমুক দিল, এবং আবার বলল, আমার পরিচয়টা পেলেন?

আমি ঘাড় কাত করে বললাম, অনেকখানি।

তিতির আমার চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, যেন কিছু খুঁজল বলে মনে হল, তারপরে বলল, মেসোমশাই আমাকে বাড়ির সবকিছু দেখাশোনা করতে বলেছেন, হাউস-কিপার বলতে যা বোঝায়, যদিও তার তেমন দরকার নেই, একমাত্র এ বাড়ির কাজের লোকগুলোকে ঠিকমতো একটু সামলে রাখা ছাড়া। কারণ দিন বদলায় তো৷

তিতিরের কথা আমি বুঝতে পারলাম না, তাই ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ও একটু হাসল, কেমন এক রকমের হাসি, যার মধ্যে একটা বিশেষ অর্থ আছে যেন। আবার বলল, মানে আমি বলছি, সবকিছুই বদলে যায় তো? যেমন ধরুন, হিরা এখন বড় হয়েছে। মতিয়ার বয়স তিরিশ, স্বামীর ঘরে যায় না, কোনও কাজও ওর নেই, আর বেশি দিন এভাবে থাকলে, মানুষ বদলে যেতে থাকে, এই সব বলছিলাম। তা ছাড়া, কাল রাত্রে মেসোমশাই আমাকে বলেছেন, আপনার কথা। আপনি আসছেন, আমি যেন আপনার ঠিক মতো দেখাশোনা করি। কোনও কিছু অসুবিধা হলে, আমাকে বলবেন।

আমার ভারী অবাক লাগে বাবার কথা শুনে। আমাকে আবার দেখাশোনা করার কী আছে, আর এ বাড়িতে আমার অসুবিধারই বা কী হতে পারে। তিতির নিজেই আবার বলল, আমি অবিশ্যি আপনাদের। সবাইকে চিনি না, বা দেখিওনি। আপনাকে আজই প্রথম দেখলাম। আপনাদের বড়দাকে দেখেছি, আর অপর্ণার সঙ্গে আলাপ হয়েছে।

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, অপর্ণা কে?

তিতির ওর সেই বড় না, ছোট না, একটা গভীরতা আছে অথচ একটা ঝলক দেওয়া সেই চোখে আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকাল, এবং এই প্রথম ওকে অবাক হতে দেখলাম। বলল, সে কী, আপনি অপর্ণাকে চেনেন না, ফুচকি–আপনার।

ওহ, ফুচকি! ওর ভাল নাম যে অপর্ণা, সেটা খেয়ালই ছিল না। বলতে বলতে খুবই লজ্জা পেয়ে গেলাম।

তিতির বলল, অদ্ভুত লোক তো আপনি। আপনার নিজের ভাল নামটা মনে আছে তো?

আমি হেসেই বললাম, মদন।

তিতির ঠোঁটে ঠোঁট টিপে, মুখটা কেন যেন নামিয়ে নিল, তারপরে আবার মুখ তুলে বলল, আপনার বাবা অবিশ্যি আপনার অন্য নাম বলেন।

গবা!’ আমি বললাম।

তিতির মুখে হাত চাপা দিয়ে হেসে উঠল, আমার দিকে এক বার তাকাল। আমি যেন একটু ইয়ে– মানে, বিব্রত হয়ে পড়লাম, জিজ্ঞেস করলাম, নামটা শুনলে হাসি পায়, না? কিন্তু ছেলেবেলা থেকেই আমাকে এই নামে ডাকা হয়।

তিতির বলল, শুনলে হাসি পায় কি না জানি না, আপনি বললে হাসি পেয়ে যায়। আমার কোন নামটা আপনার মনে থাকবে বলুন তো?

কোন নামটা? তিতিরের ভাল নাম যেন তখন কী বলল—র—রজনী। উঁহু, ওটা যেন ঠিক মনে রাখবার মতো নাম না। বললাম, আ-আপ’

তুমি।’ তিতির বলে উঠল।

বললাম, তুমি যদি কিছু মনে না করে, তা হলে তিতির নামটাই মনে রাখবার মতো।

তিতির মুখ নামিয়ে বলল, আমারও তা-ই মনে হয়। মেসোমশাই আমাকে তিতির পাখি, বা শুধু পাখি বলে ডাকেন, ফুচকি তিতিরদি বলে, বাড়ির সবাই।

এই প্রথম আমার মনে পড়ল, জিজ্ঞেস করলাম, ফুচকি কোথায়, ও কি এ বাড়িতে থাকে না?

তিতির বলল, না, ও স্বামীর কাছেই থাকে। এখন ও কলকাতায় নেই, নর্থ বেঙ্গলে গেছে।

নর্থ বেঙ্গল? কেন?

পার্টির কাজে।

আমার মনে পড়ল, ফুচকি আজকাল পলিটিকস করছে। আগে থেকেই করত। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, ফুচকি কোন পার্টি করে?

তিতির যেন কেমন একটু হয়ে গেল, যাকে বলা যায়, কোনও উৎসাহ নেই। বলল, ফুচকি ওর নিজের মনের মতো পার্টি পলিটিকসই করে। আমি ও সব বুঝি না, পলিটিকসে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই। ফুচকি আর ওর হাজব্যান্ড একই পার্টি করে, ওর হাজব্যান্ড তো এম.পি. আপনি জানেন?

খুব অবাক হয়ে বললাম, তাই নাকি? জানি না তো? কী নাম?

তিতির খিলখিল করে হেসে উঠে, ওর মুখটা প্রায় টেবিলে নামিয়ে নিল, আর আমি ওর ঘাড়টা দেখতে পেলাম, যেখানে কিছু উড়ো উড়ো চুল, চুলের গোড়ায় এলোমেলো হয়ে আছে। ও তো খুব ফরসা না, ঘাড়টা–মানে, কেমন যেন সুন্দর দেখাচ্ছে না? তিতির হাসির মধ্যেই মুখ তুলে বলল, আপনি নিজের ভগ্নিপতির নামটাও জানেন না। সত্যিই, তাই তো দেখছি, আমি আমার ভগ্নিপতির নামটাও জানি না। নিজেকেই আমার কেমন উল্লুক আর ইডিয়ট মনে হতে লাগল, আমি কিছুই বলতে পারলাম না, লজ্জায় পড়ে গিয়ে চুপ করে রইলাম। তিতির নিজেই বলল, ফুচকির বরের নাম রাখাল রায়।

এবং এম.পি., আমি মনে মনে ভাবলাম, কিন্তু কখনও নামটা শুনে থাকলেও, আমার মনে নেই। তিতির বলে উঠল, কী, এখনও মনে করতে পারছেন না বলে মনে হচ্ছে?

বললাম, না মনে করার আর কী আছে, আপনি তো বলেই দিলেন। আসলে ফুচকি যখন বিয়ে করেছে, আমি তখন দিল্লিতে ছিলাম কি না। আমাকে তপনকাকা এক দিন বললেন, ফুচকি বিয়ে করেছে, এক পলিটিকাল পার্টিলিডারকে। হয়তো নাম বলেছিলেন, আমার মনে নেই।

তপনকাকা কে?

দিল্লিতে যাঁর বাড়িতে আমি ছিলাম।

তিতির যেন খানিকটা ইয়ে মানে আনমাইন্ডফুল দৃষ্টিতে আমার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল, অথবা আমি বুঝতে ভুল করছি, ও হয়তো সেই রকম কিছু একটা খুঁজছে আমার চোখের মধ্যে, যদিও জানি না, আমার চোখে খোঁজার কী আছে, আমার অস্বস্তি হচ্ছে। আমি মুখ ফিরিয়ে নেবার আগেই ও জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আপনার বড় ভগ্নিপতির নাম আপনার মনে আছে?

আমি অবাক হয়ে বললাম, হিতুদার নাম? শু্যয়র, হিতুদা বিয়ের অনেক আগে থাকতেই আমাদের বাড়ি আসতেন, আমার পনেরো বছর বয়স থেকে ওঁকে আমাদের বাড়িতে আসতে দেখেছি।

তিতির যেন কেমন একটা ক্রাইসিসে পড়ে গিয়েছে, সেই রকমই ওর মুখের ভাব, এবং ঠিক যেন স্বস্তি বোধ করছে না, বলল, আপনি ফুচকি আর ওর বরের কথা কিছুই জানেন না ভেবে আমার ভারী অবাক লাগছে। আপনি কি নিউজপেপার পড়েন না?

আমি যেন কেমন একটু, ওটাকে বলে, বেয়াকুফ হয়ে গেলাম, এবং প্রায় ক্ষমা চাওয়ার মতো করে, ঘাড় নেড়ে বললাম, না। আগে–পাঁচ-সাত বছর আগে পড়তাম।

আপনি খবরের কাগজ পড়েন না? তিতির এমনভাবে বলল, যেন এ রকম অদ্ভুত কথা আগে কখনও শোনেনি।

বললাম, হয়তো হঠাৎ এক-আধ দিন, চোখের সামনে পড়ে গেল, একটু চোখ বুলিয়ে নিলাম– মানে, কোনও উৎসাহই পাই না।

কীসে আপনার উৎসাহ? তিতির ঘাড় কাত করে জিজ্ঞেস করল, আর ওর হর্সটেল চুলের গোছা হেলে পড়ল কাঁধের কাছে।

আমি একটু না ভেবে পারলাম না, তাই তো, কীসে আমার উৎসাহ। ওহহ, মনে পড়েছে, বললাম, মহাভারত আর

মহাভারত? তিতির বলে উঠল।

হ্যাঁ, মহাভারত, নৃতত্ত্ব আর ওটাকে কী বলে, মম–আই মিন, সাইকোলজি আর।

সাইকোলজি?

হ্যাঁ, আর চেস খেলা আর মিউজিক আর–আর কিছু মনে করতে পারছি না।

তিতিরকে মনে হচ্ছে, ও ফ্ল্যাবারগাস্টেড, যে কারণে, ওর ঠোঁট ফাঁক হয়ে রয়েছে, ওর ঝকঝকে সাদা কয়েকটা দাঁত আমি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু আমি এমন কী বলেছি, যে ও ওরকম করে তাকিয়ে আছে। কোনও বাজে কথা বলে ফেলেছি নাকি? আমি তো সে রকম বলি না। তাই একটু কৌ-কৌতূহল আর ভয় নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী হল বলো তো?

তিতির ঠোঁট বন্ধ করে মাথা নাড়ল, চুলের গোছাও পড়ল, এবং একটু অবাক অবাক স্বরে বলল, না, হয়নি কিছু, আপনাকে আমি অন্য রকম ভেবেছিলাম।

অন্য রকম?

হ্যাঁ। এখন দেখছি, মেসোমশাইয়ের কথাই ঠিক।

কে?

মেসোমশাই, আপনার বাবা।

ওহ, সরি। বাবা কী বলেন?

আপনি যা তা-ই, মনে হয় উনি আপনাকে চেনেন।

তা অবিশ্যি আমি জানি না, তবে বাবাকে আমি ঠিক বুঝি না, ওঁর কথাবার্তাও সবসময় ধরতে পারি না।

অথচ আপনি সাইকোলজিতে ইন্টারেস্টেড।

হ্যাঁ, কিন্তু ইয়ে, মানে–আমি ডিটেকটিভ না, তবে বাবা হিসাবে ওঁকে আমি বুঝি।

তিতির আবার কথা না বলে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, সেই একই, সার্চিং অ্যান্ড আসকিং। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আমাকে কী ভেবেছিলেন?

তিতির বলল, ডেঞ্জারাস।

ডেঞ্জারাস?

হ্যাঁ, একটা ভয়ংকর কিছু।

আমি হ হতবাক। আমি ডেঞ্জারাস, ভয়ংকর, তিতির ভেবেছিল। তিতির যেন কেমন এক রকম করে হেসে, উঠে দাঁড়াল, বলল, ভাববেন না, এখন আর সে রকম কিছু ভাবছি না। আপনাকে দেখেই অবিশ্যি মনে হয়েছিল, আমার ভাবনাটা ভুল হয়েছিল। বলতে বলতে ও ওয়ারড্রবের কাছে গিয়ে, পাল্লা খুলে দেখল, আবার বন্ধ করে বলল, আপনি স্নান-টান করুন, ধোয়া জামাকাপড় এখানেই আছে। খেয়েদেয়ে ঘুমোন, বিকালে আপনার কাছ থেকে দিল্লির গল্প শুনব।

দিল্লির গল্প শুনব কথাটা বলার সময়, আপনা থেকেই যেন তিতিরের ঘাড় একটু বেঁকে গেল, আর চোখের তারায় ওটা কী হল, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না; ইশারা না কি? বলতে বলতে ও মুখ ঘুরিয়ে চায়ের কাপ ট্রেতে তুলে নিল, এবং ট্রে হাতে করে, আমার দিকে ফিরে তাকাল। বলল, আমি খাবারের ব্যবস্থা দেখি গিয়ে। এনি স্পেশাল মেনু?

আমি তিতিরকে দেখছিলাম, ওকে ট্রে হাতে ঠিক মানাচ্ছিল কি না, বুঝতে পারছি না, কিন্তু কেন যেন ভাল লাগছে। বললাম, ডালের সঙ্গে ভাজা বড়ি আর ঝোল ভাত।

তিতির শব্দ করে হেসে উঠল, আর ট্রের কাপ ডিশে ঠুংঠাং শব্দ হল। বলল, আপনাকে এ বাড়ির ছেলে বলে মনে হচ্ছে না। দুপুরে এক বোতল কোল্ড বিয়ারও ড্রিঙ্ক করবেন না?

কোন্ড বিয়ার? আমি তো ড্রিঙ্ক করি না।

একেবারেই না?

তা বলতে পারি না। দিল্লিতে জোরজবরদস্তিমানে এক মহিলা, লায়লী সিং-এর জোরজবরদস্তিতে, দু-এক বার তাও আমার ভাল লাগেনি।

তিতির আবার সেই রকম চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, এবং যাকে বলে অনড়–স্থির। কয়েক সেকেন্ড পরেই, চোখ নামিয়ে যেন ট্রের দিকে দেখল, তারপরে আবার মুখ তুলে বলল, বিকালে।’ বলেই বারান্দার দরজা দিয়ে বেরিয়ে চলে গেল, এবং জানালা দিয়ে ওকে আমি বারান্দা দিয়ে যেতে দেখলাম, তিতিরও এক বার মুখ ফিরিয়ে দেখে গেল। তিতির–আশ্চর্য, এ রকম একটি মেয়ে আমাদের বাড়িতে–পৃথিবীতে যার কেউ নেই, ওর কথায়, ইহজগতে, কিন্তু তিতির আমাকে কোনও দাদারুণ করুণ কাহিনী শোনায়নি, ও চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিয়েছিল, যখন বলল, ওর বাবা মা স্বর্গে চলে গিয়েছেন। আমার বাবাকে ধন্যবাদ। আমি জানি না, তিতির আগে কেমন ছিল, এখন কী রকম, যাকে বলে জীবনযাপন করছে, আমার মনে হল ও যা না, তা-ই হয়ে আছে।

বাথরুমে গিয়ে দেখলাম, বাহ, একটা পাঁচ তারার হোটেল রুমের বাথরুমে এলাম যেন। কী নেই? এমনকী নতুন টুথব্রাশ আর সেফটি রেজার, আফটার শেভিং লোশনও (যা আমি মাখি না।) রয়েছে, যা হোটেলে থাকে না। দাড়ি কামাননি কেন?’ দাড়ি কামাবে, দাড়ি কামাবে আমার মনে পড়ে গেল, আয়নার দিকে তাকিয়ে, এক বার গালে হাত বুলিয়ে আমি ট্রাউজার আর গুরুপাঞ্জাবি খুলে ফেললাম, বাইকটা পায়ের নীচে নামিয়ে দিয়ে, শাওয়ারের মুখটা খুলে দিতেই, মনে পড়ল, দরজাটা বন্ধ করা। হয়নি। তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে, আবার শাওয়ারের নীচে দাঁড়ালাম, ঠাণ্ডা জল মাথা গা বেয়ে পড়তে লাগল–এটা তো ভালই, বাড়িতে এসে আমি এক জন নতুন মানুষকে দেখলাম, কথা হল, একটি ইয়ে-যার নাম তিতির, না হলে তো একলা চুপচাপ…শাওয়ার বন্ধ করে, চুম্বক থেকে মস্ত বড় সাবানটা টেনে নিলাম। কী সাবান জানি না, চেহারা দেখে আর গন্ধে মনে হচ্ছে, যাকে বলে বিলাসী, তা-ই আমি ইউজ করতে অভ্যস্ত না। ফুচকির বরের সুন্দর কথা, বর’–তিতির বলছিল, মমতা কাকিমাও কথায় কথায় ওর বর তার বর বলেন, শুনতে কেমন ভাল লাগে, কী যেন নাম ফুচকির বরের? রাখালদাস বন্দোনা না, রায় বলছিল, রাখালদাস না, রাখাল রায়, এম পি। হিতুদা, বড়দির বর একটা প্রাইভেট কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার। সাবানটা চুম্বকে রেখে, গা হাত পা ঘষে নিয়ে শাওয়ার খুলে দিলাম ফুচকির থেকে এক বছরের বড়, তার মানে কত হল? ছাব্বিশ-তিতির, আহ গাটা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে…এখন মনে হচ্ছে, বাড়িতে ফ্যামিলির আরও কেউ থাকা উচিত ছিল, তিতিরকে দেখে সেটা আরও বেশি মনে হচ্ছে, এবং তিতির তো এখন…শাওয়ার বন্ধ করে, ভোয়ালেটা টেনে নিলাম, মনে পড়ল জামাকাপড় কিছু নিয়ে ঢুকিনি, তোয়ালে পরে বেরোতে হবে। আমি সাঁতার কাটতে শিখিনি, তা হলে বেদিং-এর রিয়াল মজাটা পেতাম।

.

ঘুম হল না, আসলে আমি দিনের বেলা কখনও ঘুমোই না, যদিও লাস্ট নাইট ট্রেনে একেবারেই ঘুমোতে পারিনি বলতে গেলে। ভোরবেলা একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এখন কটা বাজে কে জানে, সারা শরীরে একটা ইয়ে–আলস্য, অথচ আর শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করছে না, মনে হচ্ছে, অনেকক্ষণ শুয়ে আছি, তাই উঠে বসেছি। কোথাও কোনও শব্দ নেই, বাড়ির কাজের লোকেরা এখনও বোধ হয় ঘুমোচ্ছে। আমি বারান্দার দিকের পরদাটা সরিয়ে দিলাম, থাম আর কাঠের আর কাচের জাফরি দেখলে, আগের সেঞ্চুরির বাড়ি বলে মনে হয়, এবং ব্যাপারটা তো প্রায় তাই-ই, এ বাড়ি তো মহেশ্বর মুখোপাধ্যায়, আমার ঠাকুরদা করিয়েছিলেন, পরে অবিশ্যি বাবা অনেক রিমডেল করেছেন। বাড়ির দক্ষিণে এখনও সরু ফালি একটা জায়গা আছে, যেখানে কয়েকটি গাছও আছে, একমাত্র রক্তকরবীর খানিকটা দোতলার বারান্দার মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে। লাল না রক্ত–কেন, তাতে কী এমফ্যাসাইজ করা হচ্ছে, ইট’জ রিয়ালি ভারমিলিয়ান-বলতে হয়, সাক্ষাৎ ভারতীয় লাল।

হিরাকে বারান্দায় দেখতে পেলাম, ও চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে আসছে। কী করে জানল, আমি উঠে পড়েছি। ওবেলার খাবার কথা মনে পড়ে গেল–হিরা ঢুকল ঘরের মধ্যে, বলল, মেজদা চা।’ আমি ফিরলাম, রাখো। হিরা আজকাল খুব মাথা নিচু আর কেমন একটা ভাব করতে শিখেছে, যেন চোখের দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারবে না, এবং চা রেখে, আমি স্পষ্টই দেখলাম, চোখের পাতা না তুলেই, কেমন এক রকম করে আমাকে দেখে, জিজ্ঞেস করল, চা ঢেলে দিয়ে যাব?

বললাম, না।

হিরা মাথা নিচু করে, বারে বারে ইয়ের–মানে বুকের আঁচল টানতে টানতে চলে গেল, কেন? ওর শাড়িটা তো খসে পড়ে যাচ্ছিল না, একটু বেশি বড় হয়েছে ও, তার জন্য এ রকম করার কী আছে। তিতির ওবেলা যেন কী সব বলছিল ওকে, জানকীর বিষয়, আর ওর বাড়াবাড়ির বিষয়। তিতির নিশ্চয় এ বাড়ির বিষয়ে এখন আমার থেকে বেশি জেনে গিয়েছে–অবিশ্যি আমি এ বাড়ির বিষয় কবেই বা আর তেমন জানতাম। হ্যাঁ, ওবেলা তিতির আমাকে ডালের সঙ্গে বড়ি ভাজা আর ঝোল খাইয়েছিল, টেবলের সামনে সব সময় দাঁড়িয়ে ছিল, ছেলেবেলায় মা যেমন থাকতেন–ঠিক মায়ের মতো না, মা তো অনেক কথা বলতেন। আমি কাপে ছাঁকনি পেতে পট থেকে চা ঢালোম। দুধ, চিনি মিশিয়ে চামচ নাড়বার সময়েই, ভারী পায়ের জুতো–ঠকঠক শুনতে পেলাম, আর আমার বুকের মধ্যে কেমন যেন ড্রাম বেজে উঠল, হাতের চামচটা এমন কেঁপে গেল, যে খানিকটা চা চলকে পড়ল, জুতো-ঠকঠক শব্দ আমার ঘরের দরজায় এসে থামলবাবা। ওহ, হি লুকস মোর ইয়ং! আমার হিসাবে বাবার বয়স ফিফটিনাইন, র সিল্কের গলাবন্ধ কোট, সাদা ট্রাউজার পরা, প্রায় ছ ফুট হাইট মহাদেব মুখোপাধ্যায় আমার দরজায় দাঁড়িয়ে, যার মাথার চুল ঘন মোটা এবং এখনও কালোর অংশ বেশি, এবং আমার মতো ঘাড় বেয়ে পড়া বড় না হলেও, বেশ বড়, আর এখন কপালের ওপরে বাতাসের ঝাঁপটায় এলিয়ে পড়েছে, মোটা ভুরুর নীচে চোখ দুটো যেন আগের থেকে বেশি ব্রাইট, নিভাঁজ মুখ, যার রং ঠিক কালো বলা যাবে না, চকচক করছে। তিন বছর আগে জানতাম, একটিও দাঁত পড়েনি, এখনও যে তা অটুট আছে, মুখ দেখলেই বোঝা যায়; একটু মোটা অথচ চোখা নাক, ফ্যাটলেস বোনি ম্যান, লুকিং স্ট্রেট অ্যাট মাই আইজ। আমি উঠে দাঁড়ালাম, বুঝতে পারছি না, বাবার ঠোঁটে হাসি আছে কি না, চোখের দৃষ্টিতে কী এক্সপ্রেশন। আমি তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতেই শুনতে পেলাম, কেমন আছিস গবা?

বলতে বলতেই বাবাও ঘরের মধ্যে ঢুকে এলেন, আমি বলতে গেলাম, ভা–বাবা বলে উঠলেন ভাল। এবং আমার কাঁধে হাত দিলেন, সোজাসুজি আমার চোখের দিকে তাকালেন, তারপরে প্রায় বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললেন, মাই সেডুয়ুণ্ড সান–সেডুয়ুণ্ড বাই উয়োম্যান।

আমি বলে উঠলাম, বাবা

কিছু বলতে হবে না।’ বলেই তিনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে, হঠাৎ দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে, প্রায় শাউটিং যাকে বলে, চিৎকার করে ডাকলেন, পাখি, পাখি। এই যে না আসতে হবে না, আমার জন্য একটু চা পাঠাতে বলো, গবার সঙ্গে বসে খাব।

পাখি! পাখি আবার কে, শুনিনি তো, ওহ, না, তিতির ওবেলা বলেছিল, কিন্তু একমাত্র তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নায়িকার নাম পাখি বলে জানতাম। বাবা যাকে ডাকলেন, অথচ দেখতে পেলাম না, বাবা ঘরের মধ্যে এসে ঢুকলেন, বললেন, নে গবা, তুই চা খা, আমি একটু বসি।

বলে বাবা বসলেন একটা চেয়ারে। আমি টেবলের কাছে গিয়ে বললাম, এ চা-টা তুমি খাও, আমি এখনও টাচ করিনি।’

দরকার নেই, তুই খা। আমি তো এ সময়ে বাড়ি এসেই চা খাই না, কিন্তু আজ একটু খাই, তোর সঙ্গে বসি, বোস।

বাবা ঘাড় ঝাঁকিয়ে আমায় চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। আমি চেয়ারে বসে, চামচটা দিয়ে আবার একটু চা নাড়লাম, বাবা তাকিয়ে আছেন আমার দিকে, ফিল করছি, চায়ের কাপ তুলে ইচ্ছা করেই (কেন?) জিজ্ঞেস করলাম, পাখি বলে কেউ এ বাড়িতে আছে, জানতাম না।

বাবা তার মোটা ভুরু একটু কুঁচকে বললেন, কেন, পাখি তোকে রিসিভ করেনি, মানে, তিতির!

ওহ, তিতির! হ্যাঁ, নিশ্চয়ই করেছে, কিন্তু পাখি একমাত্র তারাশঙ্করের উপন্যাসের নায়িকার নাম বলে জানতাম।

বাবা একটু ঘাড় নাড়িয়ে হাসলেন, দাঁত দেখতে পেলাম, যা ভেবেছিলাম, তা-ই, সব দাঁত আছে, বললেন, মে বি৷ উইথ ডিউ রেসপেক্ট টু হিম, আমিও কারোকে পাখি বলে ডাকতে পারি নিশ্চয়, ইট ইজ’ নোবডিজ মনোপলি।’

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, না না, তা কেন।

কাপে চুমুক দে।’বাবা আমার হাতে ধরা কাপের দিকে চোখ রেখে বললেন।

আমি কাপে চুমুক দিলাম, তেমন ঠাণ্ডা হয়নি। কাপ রেখে বললাম, তোমাকে ভালই দেখছি।

বাবা ঘাড় কঁকিয়ে বললেন, থ্যাংকিউ, বাট আই সি য়ু দি সেম। দু মাস জেল খেটে, কোনও পরিবর্তন হয়নি দেখছি।

আমি আবার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, পরিবর্তন? জেলে থাকাটা একটা গ্রেট টর্চার হয়েছিল।’

তার কোনও সাইন বা রিঅ্যাকশন দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু তার আগে শুনি, হোয়াট টাইপ অব টর্চার? ঘানি ঘোরাতে হত? বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন। বাবার চোখ কখনও সাদা না, লাইট বাদামি, কিন্তু ঝকঝকে।

আমি বললাম, না না, ঘানি ঘোরাতে দেয়নি, কোনও ঘানিও আমি সেখানে দেখিনি, তবে মডার্ন মেশিন ছিল, তেল পেষাই করার। কিন্তু আমি উডেন পেটি তৈরি করার কাজ করতাম, আর কার্ডবোর্ডের বকস’।

বাবা বলে উঠলেন, কুটিরশিল্পের কাজ শিখেছিস বল?

তিতির ঢুকল ট্রে হাতে নিয়ে বাবার পাখি। এখনও চুল উলটে আঁচড়ানো, কিন্তু পিছনে মস্ত একটা খোঁপা, পাড়হীন সবুজ শাড়ি আর জামা, কিন্তু সিল্ক না, সফট কটনের বলে মনে হচ্ছে, চোখে বোধ হয় একটু কাজল এঁকেছে, আর কিছু না। ও ট্রেটা টেবলের ওপর রেখে, বাবার জন্য চা তৈরি করার উদ্যোগ করে বলল, স্নান না করেই।

বাবা মাঝখানেই বলে উঠলেন, এত দিন পরে গবা বাড়িতে এসেছে, ওর সঙ্গে আগে একটু বসি। হ্যাঁ, তারপর?

বাবা আমার দিকে তাকালেন। আমি তিতিরের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বললাম, তা এক রকম কটেজ ইন্ডাস্ট্রি বলতে পারো, আর সে সব কাজ করতে আমার ভালই লাগত।

ভাল লাগত? অবাক না, ক-কৌতূহল বাবার স্বরে।

আমি বললাম, হ্যাঁ, উডেন পেটি বা বোর্ড বকস বানানোর কাজ খারাপ লাগত না।

কিন্তু তুই যে বললি, গ্রেট টর্চার?

হ্যাঁ, গ্রেট টর্চার, সেটা হল জেলের অন্য ব্যাপার। ওয়ার্ডার আর প্রিজনারদের ব্যাপার, জেলের সিসটেমের ব্যাপার। দ্য হোল সিসটেম ইজ হরিবল। ইউ ক্যান সেহোয়াট ইজ দ্যাট? দ্যাট’জ এ–এ (আমি, একসাইটেড ফিল করছি।) ফ্যাক্টরি ফর ক্রাশিং হিউম্যানিটি।

লেকচারিং?’ বাবা ঘাড় কাত করে আমার দিকে তাকালেন, তার ডান ভুরুর ওপরে শক্ত মোটা এবং প্রায় কালো চুলের একটা গোছা।

বাবার কথা শুনে আমি প্রায় থ–থতিয়ে গেলাম, ঘাড় নেড়ে বললাম, না।

তবে আমাকে ও সব শুনিয়ে লাভ কী। বাবা বললেন, আমি ও সব জানি, সিসটেম অব দ্য জেল, তোমার মানবতা ধ্বংসের কারখানা। সকলেই জানে, ওখানে রেকটিফিকেশন–আই মিন শোধনের জন্য কাউকে আটকে রাখা হয় না। যদিও আমরা জানি, জেলখানাকে আমরা কয়েদিদের স্বর্গরাজ্য করে তুলছি।’ বলে বাবা, বাঁ চোখের পাতা বুজিয়ে ভঙ্গি করে হাসলেন, এবং তিতির বাবার সামনে চায়ের কাপ এগিয়ে দেওয়ার সময়, ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, বসো পাখি, কোনও কাজ নেই তো এখন?

না। বলে তিতির আমার দিকে এক বার দেখল, দৃষ্টি দেখে মনে হল, ও যেন আমার কনসেন্ট চাইছে, বসবে কি না, যদিও ও বসল।

আমি চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিলাম, পাঞ্জাবির হাতাটা ঠোঁটে বুলিয়ে নেবার সময়, বাবা সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার পকেট থেকে বের করে, আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, এবং এটা নতুন ব্যাপার কিছু না। আমি বললাম, হয়তো তুমি জানো, কিন্তু ওয়ার্ডার আর কয়েদিরাও সকলের মতো জানত, আমি এক জন–মানে এক জন ইয়ে, বিশিষ্ট ম-মহিলাকে দিনের বেলা রাস্তায় জোর করে ধরে চু–চু—-’

বাবা বলে উঠলেন, চুমো, যা তুই মরে গেলেও পারবি না।’

ঠি–ট–ঠিক।আমি ঘাড় কাত করে বলতে গিয়ে, তিতিরের দিকে চোখ পড়ল, ও আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, তাড়াতাড়ি দৃষ্টি সরিয়ে নিল, ওর মুখ যেন একটু লাল। আমি বললাম, সে কথা বলে, ওয়ার্ডাররা আমাকে, যা সব গালাগাল দিতে।

খিস্তি দেওয়া যাকে বলে। বাবা বললেন।

আমি বললাম, হ্যাঁ, খুব ইয়ে–মানে যাচ্ছেতাই। প্রথম দিকে দু-একবার সত্যি ঘটনাটা তাদের বোঝাতে চেয়েছিলাম, তারা আমার গালে থাপ্পড় মেরে দিত, আর কয়েদিরাও আমার এমন পেছনে লাগত, আর খারাপ খারাপ কথা বলত, হোয়াট য়ু ক্যানট আটার, আর ইভন রাত্রে শোবার সময়ও তারা খারাপ মজা করার জন্য, আমাকে অলমোস্ট ফিজিক্যালি টর্চার করত।

বাবা হাত তুলে বললেন, ও সব শুনে আমার কোনও লাভ নেই, দোজ আর ভেরি কমন অ্যাফেয়ার্স ইন জেল। তুই এ সব থেকে কী শিক্ষা নিয়েছিস বল।

শিক্ষা?’ অবাক হয়ে বলে আমি এক বার তিতিরের মুখের দিকে দেখলাম, ও আমার দিকেই চেয়ে রয়েছে।

বাবা বললেন, হ্যাঁ, শিক্ষা।

আশ্চর্য, এর থেকে কী শিক্ষা নেব, আমি বুঝতে পারছি না। বললাম শি–শি–শিক্ষা মানে, আমি দেখলাম, এটা একটা ম্যাডনেস, এক জন নিরীহ মানুষের ওপর গ্রেট টর্চার, যাকে বলা যায়, খুবই ইয়ে, দু–দুদ–দুঃখজনক।

দুঃখজনক! শোনো আমার মদনমোহনের কথা। বলে, বাবা তিতিরের দিকে তাকিয়ে হাত দিয়ে আমাকে দেখালেন, আর তিতির মুখে আঁচল চেপে, কোনও শব্দ না করে হাসছে, বুঝতে পারছি ওর শরীর কাঁপছে দেখে, মুখ লাল হয়ে উঠেছে।

মদনমোহন আমার ভাল নাম, যা বাবা নরম্যালি বলেন না, কিন্তু বাবা এত ইয়ে, মানে হতাশ হয়ে পড়লেন কেন? তিনি আমার দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ে, একটু যেন একসাইটেড হয়েই বললেন, আরে গাধা, লায়লী সিং তোর সঙ্গে যেভাবে মেলামেশা করত, তাতে, সে তোর কাছে কী চাইত, তা বুঝতিস?

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, না তো।

বাবা চেয়ারে হেলান দিয়ে, হাত নেড়ে, তিতিরের দিকে তাকালেন। তিতিরের হাসিটা একটু থেমেছিল, ও মুখ নিচু করে আবার সাইলেন্টলি হেসে উঠল। বাবা আবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর বোঝা উচিত ছিল, উজবুক। বুঝতে পারলে, ওর চাওয়াটা তুই যদি মিটিয়ে দিতে পারতিস, তা হলে, মাতাল হয়ে ও রকম একটা কাণ্ড করত না।

সে আবার কী। কী চেয়েছিল লায়লী সিং আমার কাছে? তা ছাড়া মাতালরা ভেবে চিন্তা করে কিছু করে নাকি? আমি বাবার আইডিয়াটা ঠিক ধরতে পারছি না। বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, কী চেয়েছিল লায়লী সিং।

বাবা যেন রেগে উঠলেন, পরে চোখের কোণ দিয়ে তিতিরের দিকে তাকালেন, এবং তিতির হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে, প্রায় অস্পষ্টভাবে আমি আসছি মেসোমশাই’ বলেই তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি হা করে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম, তারপরে বাবার দিকে তাকালাম। বাবা আমার দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন যে, কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তার চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে, সিগারেট বের করে আমার দিকে এগিয়ে ধরলেন, আমি চমকে উঠলাম, আমার এ দিকে কোনও মনোযোগ ছিল না, কিন্তু আমি এত পারটারবড, স্মোক করতে ইচ্ছা করল না, বললাম, পরে হবে।’

বাবা সিগারেটটা নিজের ঠোঁটে চেপে ধরে, লাইটার জ্বালিয়ে ধরালেন, একমুখ ধোঁয়া ফুঁ দিয়ে ছেড়ে দিয়ে বললেন, তুই কিছুই বুঝতে পারিসনি?

আমি একটু ভেবে বললাম, তুমি যদি আমাকে ইয়ে—মানে লায়লী সিং এর সাইকোলজির কথা বলো–মানে, হোয়াট ইজ দ্য সাইকোলজি বিহাইন্ড হার–

নো মোর অব দ্যাট, কাম স্ট্রেট।

শি ইজ এ পারভার্ট!

তপনের স্ত্রীও। এনি হাউ, তাতে কী হল বল।

মানে, আমি বলছি, পারভারশন ফর পারভারশন, তা আমার কী করে হবে?

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে, আস্তে আস্তে সিগারেটে টান দিতে লাগলেন। তারপরে জিজ্ঞেস করলেন, তার মানে, য়ু ডিড নট লাইক হার?

আই লাকইড হার। আমি ঘাড় কাত করে বললাম, খুবই হাসিখুশি জোভিয়াল মহিলা, কিন্তু ও কোনও কোনও সময় ইয়ে হয়ে যেত, মানে

হুম। বুঝেছি।’

আমি একটু স্বস্তি বোধ করলাম, বাবাকে আমি বোঝাতে পেরেছি। আবার বললাম, তা ছাড়া আ– আর একটা কথা, ড্রাঙ্কেন অবস্থায়, কে কী করতে পারে, তার কিছু ঠিক থাকে? ওহ, শি বিকামস সো ওয়াইল্ড!

দাঁতালো বুনো শুয়োর। বাবা বললেন, য়ু ডোন্ট নো, হোয়াট দে মে ডু। যাই হোক গবা, জগৎ সংসারটাকে, জগৎ সংসারের মতো করে একটু বোঝবার চেষ্টা কর। তোকে আমি অনেক কিছুই বলেছি, কোনওটাই তোর ঠিক মনের মতো হয়নি, আমি জানি। কিন্তু এ ঘটনা থেকে তোর একটা শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। ব্যাপারটা এমন একটা জায়গায় চলে গেছল, ইট ওয়াজ বিয়ন্ড মাই ক্যালকুলেশন–সে জন্য আমি আমার জানাশোনা কারোকেই দোষ দিতে পারি না। এই সামান্য ব্যাপার নিয়ে কয়েকটা স্টেট তার পেছনে লেগে গেছল, সেটাও একটা কনসপিরেসি। এ সব জেনেশুনে, আর এদেরই মধ্যে তোকে থাকতে হবে, তোকে তোর নিজের ওয়ে আউট খুঁজে নিতে হবে।’..

আমি ভাবলাম, বাবা থামবেন, কিন্তু সিগারেটে টান দিয়ে, আবার বললেন, ফুচকি ওর স্বামীর সঙ্গে ইলেকশন ক্যাম্পেনে বেরিয়েছে, অ্যান্ড আই বিলিভ ইট হান্ড্রেড পারসেন্ট, দে আর গোয়িং টু মেক দ্য মিনিস্ট্রি। তুই যদি চাস, অপজিট পার্টি থেকেও দাঁড়াতে পারিস, আই শ্যাল অ্যারেনজ ফর এ টিকেট। দেন, হোয়েন য়ু গেট ইনসাইড, সি হোয়াট দি ওয়ার্ল্ড ইজ লাইক। (দিস ইজ লাইফ-মিস্টার জে. বিশওয়াসের কথা মনে পড়ে গেল, যদিও বাবা, সে ভাবে কিছু বললেন না।) আমি তো তোকে আগেই বলেছি, ছুরিটা নিয়ে বোর্ডে মেরেই দ্যাখ না, লক্ষ্যভেদ হলেও হয়ে যেতে পারে।

বাবার সেই কথা, যা আমার কাছে একেবারেই অ্যাবসার্ড মনে হয়, কারণ আমি পারব না বলেই বোধ। হয়। বাবা আমাকে কিছু বলতে ইনসিস্ট না করে, আবার বললেন, যা তোক কোনও কিছুতে ঝাঁপিয়ে পড়। দিল্লিতে যে তোর কিছু হবে না, আমি তা জানতাম, কিন্তু মমতার ভীষণ ইচ্ছা ছিল, তোকে নিয়ে যায়, আমি সেটা বুঝি, আই পিটি হার। বলতে বলতে বাবা উঠে দাঁড়ালেন, সিগারেটটা চায়ের কাপে ফেললেন, টেবলে কোনও অ্যাশট্রে ছিল না, তারপরে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, তিতিরের সঙ্গে আলাপ হয়েছে?

আমি দাঁড়িয়ে বললাম, হয়েছে।’

বাবা সিগারেটের প্যাকেটটা নিলেন না, লাইটারটা পকেটে রেখে বললেন, আত্মীয়তার কথা আমি কিছুই জানি না, সে সব জানাবারও কেউ নেই, এক দিন একটা চিঠি দিল ওর অবস্থা জানিয়ে, তারপরে চলে এল। আমিও থেকে যেতে বললাম। লোকে অবিশ্যি অনেক কিছু বলাবলি করছে, আমার পরিচিতরাই, তা বলুকলেট দেম, তোর কেমন লাগল ওকে?

এ রকম একটা জিজ্ঞাসার জন্য রেডি ছিলাম না, তাই একটু অবাক হলাম। বাবা আমার ভাল লাগা বা না-লাগার কথা জিজ্ঞেস করছেন? নরম্যালি এ রকম করেন না। আমি বললাম, ভা–ভাল, মানে বেশ ভাল।

বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়েছিলেন, শব্দ করলেন, হুম!’ চলে যেতে উদ্যত হয়ে বললেন, আমি চান-টান করি গিয়ে, পরে আবার কথা হবে। দ্যাট হোকস জগৎ বিশ্বাস আর তুই একই কুপেতে এসেছিস?

আমি অবাক হয়ে বললাম, হ্যাঁ, তুমি জানলে কী করে?

আমাকে অফিসে টেলিফোন করে বলছিল, রেভ্যুলেশ্নরি, হুঃ!’

আমি বললাম, শিক্ষা মন্ত্রকের মিঃ চ্যাটার্জি।

জানি। বাবা বললেন, ওরা স্বামী-স্ত্রী এসেছে, তোর সঙ্গে দেখা হয়েছে, আমাকে টেলিফোনে বলছিল। শুনলাম, সেই চন্দন সিংও নাকি লায়লীকে নিয়ে এসেছে?

বাবার দেখছি কিছুই জানতে বাকি নেই, বললাম, হ্যাঁ।

বাবার মোটা ভুরু কোঁচকাল, একটু যেন আনমাইন্ডফুল হয়ে গেলেন, শব্দ করলেন, হুম!তারপরে জুতোর ঠকঠক শব্দ তুলে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। বাবা যেন কিছু ভাবলেন, যা বললেন না, এবং একটা কিছু বোধ হয় তার মাথায় এসেছে, ভেবে আমি কেমন অস্বস্তি বোধ করছি। বাবাকে আমি বুঝতে পারি না, একেবারে পারি না, তা না, পুরো মানুষটিকে বুঝে ওঠা কঠিন। তাকে আমি কখনও মাতাল হতে দেখিনি–অথচ অনেক ড্রিঙ্ক করতে দেখেছি। কিন্তু সত্যি বলতে কী, বাবার মাতাল না হওয়াটা কেমন যেন ইয়ে, অস্বস্তিকর, মনে হয়, হওয়া উচিত ছিল। বাবা আসলে ব্যারিস্টার, মাত্র বছর। খানেক নাকি কোর্টে গিয়েছেন, তারপরে আর যাননি। বাবা যে কী করেন, তাও আমি সঠিক কিছুই জানি, বাড়ির কারোর মুখেও সঠিক কিছু শুনিনি, বোধ হয় ব্যবসা-ট্যাবসা করেন, তবে নানান অ্যাসোসিয়েশনের তিনি, যাকে বলে প্রধান, তা-ই। রোটারি থেকে নানান ক্লাবের মেম্বার। সেগুলো পোস্টাল চিঠিপত্র থেকেই অনেক সময় জানা যায়, তবু বলব, দেবাদিদেব মহাদেব মুখোপাধ্যায় চিরদিনই আমার কাছে যেন কেমন রহস্যময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *