অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার
নয়
দুপুরে খাননি মেজর। কারণ জিজ্ঞেস করতে বললেন, চব্বিশ ঘণ্টায় একবার খেলেই যখন শরীরটা হেঁটে-চলে বেড়াবে, তখন বারংবার তার পেটে সাপ্লাই করার কোনও প্রয়োজন নেই। লোকে রসনার তৃপ্তি, শরীরের আরামের জন্যে দিনে চারবার খায়। আমার তো ওসব দরকার নেই। তবে তোমাদের জন্যে লাঞ্চ রেডি করে রেখেছি। বাসমতী চাল, মুগের ডাল, বেগুনভাজা, মৌরলামাছের ঝাল আর কচি খাসির মাংসের ঝোল। চটপট খেয়ে নাও।
হেসে ফেলল অর্জুন, আপনি এত রান্না করেছেন?
দুর! এ আর কী। ইন দ্য ইয়ার নাইনটিন…, থেমে গেলেন মেজর, না, আমি এখন অন্যলোক। নো স্মৃতিচারণ।
খেতে খেতে অর্জুনের মনে হল, সত্যি মেজর বদলে গিয়েছেন। আগের মতো রাগারাগী, চিৎকার করছেন না। সবচেয়ে যেটা লক্ষণীয়, অর্জুন কোনও অভিযানে যাচ্ছে আর মেজর সেখানে থেকেও সঙ্গী হচ্ছেন না, এটা ভাবাই যায় না। সে দূরে বসে থাকা মেজরের দিকে তাকাল। ওঁকে এখন গৌতম বুদ্ধের কাছাকাছি চেহারার মানুষ বলে মনে হচ্ছে।
.
খাওয়া শেষ করে ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই কাণ্ডটা ঘটল। কোথা থেকে একটা কালো বিড়াল লাফিয়ে পড়ল গাছের নীচে। কাঠবিড়ালিগুলো দুদ্দাড় পালালেও একটা ধরা পড়ে গেল। তার কাঁধের কাছটা দাঁতে নিয়ে বিড়ালটা একটা ড্রামের উপর লাফিয়ে উঠল। অন্য কাঠবিড়ালিরা ততক্ষণে নিরাপদে দাঁড়িয়ে হল্লা শুরু করেছে। তাতে বেশ বিরক্ত হয়ে বিড়ালটা লাফিয়ে ব্যালকনিতে চলে আসতেই অর্জুন পা চালাল। আঘাত এড়াতে বিড়ালটা মুখের খাবার ফেলে দিয়ে উলটো দিকে লাফ দিয়ে উধাও হয়ে গেল।
আহত কাঠবিড়ালিটা নড়ছে, পা ছুড়ছে। ঝুঁকে দেখে অর্জুন বুঝল, এটা নেহাতই ছোট। সে ওটাকে হাতের তালুতে তুলে নিয়ে দেখল, ঘাড়ের উপর রক্তের ঈষৎ ছোপ, দাঁত বসেছিল ওখানে। এ ছাড়া অন্য কোনও আঘাতের চিহ্ন নেই।
কাঠবিড়ালিটাকে নিয়ে সে মেজরের সামনে চলে এসে টেবিলের উপর রাখল। মেজরের কপালে ভাঁজ পড়তেই অর্জুন বলল, একটা কালো বিড়াল ওর কাঁধে দাঁত বসিয়েছে। কী করে এটাকে বাঁচানো যায়?
কালো বিড়াল? ভয়ংকর ধূর্ত ওটা। মেজর উঠে একটা আলমারি খুলে তুলল আর আয়োডিন গোছের তরল পদার্থ নিয়ে এসে যত্ন করে ক্ষতের উপর লাগিয়ে দিলেন, খুব ঘাবড়ে গিয়েছে বলে একে আধমরা দেখাচ্ছে। তবে দাঁত যদি বেশি বসে গিয়ে থাকে, তা হলে বাঁচবে না।
কোনও ডাক্তারকে দেখানো যায় না?
তারা গৃহপালিত জীবজন্তুর চিকিৎসা করে। কাঠবিড়ালিকে কি গৃহপালিত বলা যায়? ছোট্ট প্রাণীটিকে টেবিলের উপর শুইয়ে দিলেন মেজর। সেটা চোখ বন্ধ করে মড়ার মতো পড়ে রইল।
আজকের ঘটনাগুলো মেজরকে জানাল অর্জুন। সব শুনে মেজর বললেন, আমার মনে হয়, তোমার আর না এগোনোই ঠিক হবে। জিমের টাকা না নিয়ে ভাল করেছ। ভাবছি তোমাকে নিয়ে কাল নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে যাব। গাড়িতেই যাব। মার্টিন গাড়ি চালাবে। লোকে বাঘকে ভয়ংকর সুন্দর বলে, নায়াগ্রা দেখলে বুঝবে, প্রকৃতিও কত ভয়ংকর এবং সুন্দর হতে পারে।
অর্জুন বলল, আপনি আমাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, নিউ ইয়র্কের মাটির নীচে একটা জগৎ আছে। তা টিউবট্রেন নয়। লিখেছিলেন, এখানে এলে সেটা দেখতে পাবে। ব্রঙ্কসে গিয়ে বুঝলাম, ওখানকার মাটির নীচে কিছু মানুষ থাকে। অনুমান করছি, তারা কেউ সাধারণ, স্বাভাবিক মানুষ নয়। সেখানে পুলিশও আঁটঘাট না বেঁধে ঢোকে না।
তুমি ঠিক বলছ। আসলে লেখার সময় আমি অত ভেবে লিখিনি। ভেবেছিলাম, এসব লিখলে তোমার মনের কৌতূহল বাড়বে। মেজর বললেন।
ঠিকই। এখন যখন সুযোগ এসেছে তখন আপত্তি করছেন কেন?
পুলিশ যেখানে যেতে চায় না, সেখানে তুমি গিয়ে কী করবে?
দেখাই যাক না।
তা হলে আমাকে তোমার সঙ্গে যেতে হয়। মেজর সোজা হয়ে বসলেন।
অর্জুন হাসল! বাঃ। দারুণ হবে। আবার আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারব!
