অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার
আট
হাসপাতালের পার্কিং-এ গাড়ি পার্ক করে মার্টিন বলল, আমি এখানেই থাকি। ভিতরে গিয়ে তো কিছুই করার নেই। এখানে দেখতে দেখতে সময় কেটে যাবে।
অতএব একাই রিসেপশনে গিয়ে মিসেস ব্রাউনের খোঁজ নিল অর্জুন। সুন্দরী বললেন, আপনার নাম আর আই ডি দেখান। মাত্র তিনজন গেস্টকে ওঁর কাছে যেতে অ্যালাউ করা হচ্ছে।
অর্জুন তার পাসপোর্ট বের করে এগিয়ে দিল। সুন্দরী সেটা দেখেকম্পিউটারের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে বললেন, লিটে তিনতলায় চলে যান।
তিনতলায় লিট থেকে বের হতেই এক সিকিউরিটি গার্ড এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, অ-র-জু-ন?
অর্জুন মাথা নাড়তে লোকটি দু’হাত দিয়ে ওর পোশাক, শরীর সার্চ করল। কিছু না পেয়ে বলল, আমার সঙ্গে আসুন।
একটা কেবিনে প্রৌঢ়া শুয়ে আছেন। তার কাঁধে-হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। সিকিউরিটির লোকটি বলল, আপনার গেস্ট। অ-র-জুন।
ও। আপনার কথা জিম বলছিল! ভদ্রমহিলা ধীরে ধীরে কথা বলছেন। বোঝা গেল তিনি এখনও অসুস্থ।
মিস্টার ব্রাউন আসেননি?
মাথা নাড়লেন মহিলা, আমার শাশুড়ি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
উনি কি আপনাকে বলেছেন যে, আমি আপনার ছেলেকে দেখেছি?
হ্যাঁ। কী বলে ধন্যবাদ জানাব আপনাকে? আপনি ওকে যেমন করে হোক আমার কাছে নিয়ে আসুন। কাতর চোখে তাকালেন ভদ্রমহিলা।
চেষ্টা করব, কথা দিচ্ছি। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনি সব কথা পুলিশকে বলেছেন? পুলিশ নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসাবাদ করেছে?
হ্যাঁ। বলেছি। জিম বোধহয় আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।
যে ছেলেটি আপনাকে ছুরি মেরেছিল তাকে মনে আছে?
মাথায় খাড়া হয়ে থাকা রঙিন চুল। হাত কাটা জ্যাকেট। হাতে সাপের উল্কি আঁকা। বেশি বয়স নয়। চোখ বন্ধ করলেন মহিলা।
সঙ্গে সঙ্গে ডি সিলভার সঙ্গে দেখা করতে আসা বেনের মুখ মনে পড়ে গেল অর্জুনের। মিসেস ব্রাউনের বর্ণনার সঙ্গে বেনের যথেষ্ট মিল।
দূরে দাঁড়ানো সিকিউরিটির লোক এগিয়ে এসে বলল, এবার ওঁকে বিশ্রাম নিতে দিন, প্লিজ।
লিফটে উঠল অর্জুন। সেটা দোতলায় এসে থেমে গেল। দরজা খুলল। দু’জন মানুষ লিফটে ঢুকলেন। অর্জুন অন্যমনস্ক ছিল। হঠাৎ চিৎকার শুনতে পেল, আপনি?
লিফ্ট ততক্ষণে একতলায় নেমে এসেছে। সে অবাক হয়ে তাকিয়েই হেসে ফেলল, আরে! আপনি!
আপনি এখানে কী করছেন? লিজা ক্লিন্টন অর্জুনের হাত ধরে বেরিয়ে এল, এভাবে আবার দেখা হবে ভাবতে পারিনি।
আমি আমার এক পরিচিত ভদ্রমহিলাকে দেখতে এসেছিলাম। আপনি?
আপনাকে যে বৃদ্ধার কথা বলেছিলাম তাঁকে দেখতে এসেছিলাম। আপনি শুনলে খুশি হবেন, উনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। লিজা বলল।
বাঃ। বেশ ভাল খবর। অর্জুন বলল, আপনার সঙ্গে কথা হয়েছে?
হ্যাঁ। আমি ওঁকে সব কথা বলেছি।
শুনে ওঁর কী প্রতিক্রিয়া হল?
আমাকে খুব বকলেন। বললেন, কাজটা খুব অন্যায় হয়েছে। ওঁর ভাইপো যদি বুদ্ধিমান হত তা হলে উনি খুন হয়ে যেতেন। তা নয় বলে এখন শুধু তার পা ভেঙেছে। আমি বললাম, উনি পুলিশকে ডেকে সব কথা জানিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু বৃদ্ধা রাজি হলেন না। বললেন, যেহেতু আমি তাকে নিজে থেকে সব জানিয়েছি তাই তিনি ক্ষমা করে দিচ্ছেন। লিজা হাসলেন, এখন
অনেক হালকা লাগছে।
ওঁর ভাইপো, যিনি আপনাকে বিয়ে করতে চান, তাঁর খবর কী?
তার সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই। লিজা কাঁধ নাচালেন।
কথা বলতে বলতে ওঁরা হাসপাতালের বাইরে চলে এসেছিলেন। লিজা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় উঠেছেন?
কুইন্সের ইউনিয়ন টার্নপাইকে।
আত্মীয়ের বাড়িতে?
না। তার চেয়েও বেশি, একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোকের বাড়িতে।
লিজা অবাক হয়ে তাকালেন, কোনও ফোন নাম্বার?
এই রে। ওটা তো জানতে চাইনি। হাতব্যাগ খুলে একটা চিরকুটে নিজের নাম্বার লিখে এগিয়ে ধরলেন লিজা, এটা রাখুন। আশা করি আমাকে ফোন করবেন। আপনি এখন কোথায় যাচ্ছেন?
লং আইল্যান্ডে। কোনও কাজ করার না থাকলে যেতে পারেন।
একটু ভাবলেন লিজা। তারপর বললেন, বেশ। কিন্তু আপনার সঙ্গে গাড়ি আছে?
হ্যাঁ।
তা হলে আমাকে ফেরার সময় একটা টিউব স্টেশনে নামিয়ে দেবেন যেখান থেকে আমি ব্রুকলিনে যেতে পারি। আমি ওখানেই থাকি।
লং আইল্যান্ড থেকে ব্রুকলিন কতটা দূর?
টিউবে বেশি সময় লাগে না।
মার্টিনের সঙ্গে লিজার আলাপ করিয়ে দিয়ে অর্জুন বলল, সে মিস্টার ব্রাউনের বাড়িতে যেতে চায়। সে কি বাড়িটা চেনে?
মার্টিন বলল, সে এর আগে মিস্টার মেজরকে নিয়ে দু’বার ওই বাড়িতে গিয়েছে।
গাড়ি চালাতে চালাতে মার্টিন বলল, অ-র-জুন, ওই ছেলেটি আজও এসেছিল। তবে একা নয়, সঙ্গে একটা কালো ছেলে ছিল।
কোন ছেলেটি?
যে কাল সিকিউরিটির তাড়া খেয়ে বাইকে চড়ে পালিয়েছিল।
ওরা কি ভিতরে ঢুকেছিল?
ছেলেটি ঢোকেনি। ও যাকে এনেছিল সে ঢুকেছিল। কিন্তু মিনিট চারেকের মধ্যে বেরিয়ে এসে ছেলেটির সঙ্গে চলে গেল।
তুমি সিকিউরিটিকে জানালে না কেন?
কালকের সিকিউরিটির লোকরা আজ ডিউটিতে ছিল না। আমি তাদের বলতে গেলে ওরা কিছুই বুঝত না। গাড়ি চালাতে চালাতে মার্টিন বলল।
লিজা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে?
আমরা যে ভদ্রলোকের বাড়িতে যাচ্ছি তার স্ত্রীকে একটি ছেলে ছুরিতে আহত করেছিল। সেই ছেলেটিকে গত দু’দিন হাসপাতালে আসতে দেখা যাচ্ছে। অর্জুন বলল।
সর্বনাশ! আপনারা পুলিশকে জানাচ্ছেন না কেন?
হ্যাঁ। এটা জানানো দরকার।
ছেলেটি কি ভদ্রমহিলার চেনা?
না। ও এসেছিল ব্রঙ্কস থেকে।
মাই গড। চোখ বন্ধ করলেন লিজা।
কী হল? অর্জুন তাকাল।
ওখানকার ছেলেরা ডেঞ্জারাস হয়। পুলিশ ওদের নিয়ে নাজেহাল!
.
জিম ব্রাউন লিজাকে দেখে অবাক হলেন। অর্জুন লিজার পরিচয় দিল, আমার সঙ্গে প্লেনে আলাপ। আজ আবার দেখা হয়ে গেল হাসপাতালে। মিসেস ব্রাউন বললেন, আপনি আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন?
হ্যাঁ। আমি একটু আগে তোমাকে ফোন করেছিলাম। মেজর বললেন, তুমি হাসপাতালে গিয়েছ। অ-র-জুন, আমার মা খুব অসুস্থ। উনি নাতিকে দেখতে চান। নাতির কথা ভেবে ভেবেই ওঁর শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বলে মিস্টার ব্রাউন একটা টেবিলের ড্রয়ার খুলে খাম বের করলেন। সেটা অর্জুনের দিকে এগিয়ে ধরলেন, নাও।
কী?
তোমাকে বলেছিলাম, আজ অগ্রিমবাবদ এটা দেব।
মাথা নাড়ল অর্জুন, মিস্টার ব্রাউন। ওটা আপাতত রেখে দিন। আমি এই শহরে নতুন। আমার কোনও ক্ষমতাও এখানে নেই। এদেশে এসেছি টুরিস্ট হিসেবে। তাই আমার প্রফেশনাল কাজ এদেশে করে আমি পারিশ্রমিক নিতে পারি না।
কিন্তু!
এদেশের ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্ট থেকে আমাকে সতর্ক করে বলা হয়েছে যেন কোনও সমস্যা হলে পুলিশকে জানাই, নিজে কিছু না করি। অর্জুন হাসল, আজ আপনার স্ত্রীর সঙ্গে সিকিউরিটি অফিসারের জন্যে বেশি কথা বলতে পারিনি। আততায়ী ছুরি মারার আগে ওঁকে নিশ্চয়ই কিছু বলেছিল?
খামটা আবার ড্রয়ারে রেখে দিয়ে মিস্টার ব্রাউন বললেন, হ্যাঁ। ও আমার ছেলের নাম করে পাঁচ হাজার ডলার চেয়েছিল। না দিলে নাকি আমার ছেলে খুব বিপদে পড়বে। আমার স্ত্রী তার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চেয়েছিল। তখন তর্ক শুরু হয়। সেই সময় ছেলেটি ছুরি মারে। মাথা ঠান্ডা রেখে আমার স্ত্রী আহত অবস্থাতেই মেঝেয় পড়ে গিয়ে এমন ভান করে, যাতে ছেলেটি ভেবে নেয় যে, ও মারা গিয়েছে। ভয় পেয়ে সে পালায়।
লিজা এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল। এবার বলল, ওই ছেলেটির ব্যাপারে কিছু করা উচিত।
অর্জুন তখন ব্রঙ্কসের ছেলেটির পরপর দু’দিন হাসপাতালে আসার কথা মিস্টার ব্রাউনকে জানিয়ে বলল, আপনি পুলিশকে জানান, যাতে মিসেস ব্রাউনের আর কোনও বিপদ না হয়।
মিস্টার ব্রাউন তড়িঘড়ি টেলিফোনে পুলিশকে ব্যাপারটা জানালেন। পুলিশ তাকে আশ্বস্ত করল, তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ফোন রেখে মিস্টার ব্রাউন বললেন, এই ছেলেটি আমাদের ক পরিস্থিতিতে নিয়ে গেল! অথচ আমি জানিই না এই বাড়িতে সে নিয়মিত আসত। রাতে আমি যখন ঘুমিয়ে থাকতাম তখন আমার স্ত্রী তাকে দরজা খুলে দিত। আমার মাও তাঁর নাতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। তার জন্যেই আমার স্ত্রী ছেলেটিকে বাড়িতে ঢুকতে দিত। অথচ এসবের বিন্দুবিসর্গ আমি জানতাম না।
ওঁরা, মানে আপনার স্ত্রী এবং মা ওকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনেননি কেন?
নিশ্চয়ই চেষ্টা করেছেন কিন্তু সফল হননি। সব প্রাণী কি পোষ মানে? মিস্টার ব্রাউন বললেন, কিন্তু পুলিশ যেই জেনেছে যে, আমার ছেলে আততায়ী নয়, অমনই তার সম্পর্কে ওদের আর কৌতূহল নেই। ওরা খুঁজে বের করবে কে আততায়ী?
আততায়ী যে ব্রঙ্কসের ছেলে তা কি ওরা জানে?
না। আমি বলতে পারিনি তুমি ওকে ব্রঙ্কসে দেখেছ। তা হলে পুলিশ জানতে চাইবে তুমি কে এবং কেন ব্রঙ্কসে গিয়েছিলে? তোমাকে নিয়ে পুলিশ টানাহ্যাঁচড়া করত। সেটা শুরু হলে তোমার কাছ থেকে আমি কোনও সাহায্য পেতাম না। আততায়ীর চেহারার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, মোটরবাইক ব্যবহার করে সে। এবার পুলিশ তাকে খুঁজে বের করুক। মিস্টার ব্রাউন বললেন।
মাথা নাড়ল অর্জুন, আপনার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারি?
ওঁর শরীর খুব খারাপ। কথা বলতে পারবেন বলে মনে হয় না।
তবু!
এসো।
মার্টিন বাড়ির ভিতর ঢোকেনি। বাইরে গাড়িতে রয়েছে। অর্জুন এবং লিজা মিস্টার ব্রাউনকে অনুসরণ করলেন। দোতলায় উঠে অর্জুনের জানা ঘরটিতে ঢুকলেন মিস্টার ব্রাউন। ভিতরে ঢুকে ওঁরা দেখলেন, বৃদ্ধা চিত হয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর গলা পর্যন্ত একটা চাদরে ঢাকা।
মম। ফিসফিস করে ডাকলেন মিস্টার ব্রাউন।
একটু ফুঁপিয়ে উঠলেন বৃদ্ধা। মিস্টার ব্রাউন বললেন, আমরা খুব চেষ্টা করছি। ও ভাল আছে। অর্জুন ওকে দেখেছে। অর্জুনকে ইশারা করলেন মিস্টার ব্রাউন।
অর্জুন বলল, আপনি বিশ্বাস করুন, আপনার নাতিকে কাল দেখেছি। বৃদ্ধা নড়লেন না। তিনি দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে রইলেন। জিম ব্রাউন তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মম, হি ইজ হেলপিং আস। তুমি কিছু বলো।
বৃদ্ধা ফুঁপিয়ে উঠলেন, ব্রিং হিম ব্যাক। প্লিজ!
.
নীচে নেমে এসে অর্জুন মিস্টার ব্রাউনকে বলল, ব্রঙ্কসের পুলিশকে বলুন ছেলেটি ওখানেই আছে। ওকে ‘বেন’ বলে সবাই ডাকে।
কী করে বলব? বললেই তো জানতে চাইবে খবরটার সোর্স কী?
অর্জুন হাসল, বলবেন, একটা উড়ো ফোন এসেছিল। সেই ফোনে আপনি জেনেছেন।
জিম ব্রাউন মাথা নাড়লেন, কিন্তু তুমি কি কোনও প্ল্যান করেছ?
ভাবছি। দেখুন, গতকাল ওখানে গিয়ে বুঝতে পেরেছি, আমার মতো বাইরের লোককে কেউ ঢুকতেই দেবে না। আমার কথা ওরা ভাল বোঝে না, ওদের কথা আমি আন্দাজে বুঝি। উচ্চারণই দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। দেখি, আর একটু ভাবি। অর্জুন বলল।
.
ব্রুকলিনের চার্চ ম্যাকডোনাল্ডের সামনে মার্টিন লিজার কথামতো গাড়ি থামাল। লিজা বললেন, আমি কি আপনাকে আমার অ্যাপার্টমেন্টে আসতে বলতে পারি?
নিশ্চয়ই। কিন্তু হাতে বেশি সময় নেই। এখান থেকে কুইন্স নিশ্চয়ই বেশ দূর।
অর্জুন বলতেই মার্টিন মাথা নাড়ল, এক ঘণ্টার বেশি লাগবে।
লিজা বললেন, আপনার ফোন নাম্বারটা জানা থাকলে ভাল হত।
অর্জুন মার্টিনের দিকে তাকালে সে মেজরের নাম্বারটা বলে দিল। সেলফোনে নোট করে নিলেন লিজা।
