অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার

শেয়ার করুনঃ

পাঁচ 

ঘুম ভাঙল সাড়ে সাতটার সময়। তাড়াতাড়ি বাথরুমের কাজ সেরে বাইরে আসতেই অর্জুন দেখতে পেল, টেবিলের উপর একটা কাগজ পেপারওয়েট চাপা রয়েছে। সেটা তুলেই পড়ল, মিস্টার ব্রাউন হাসপাতালে চলে গিয়েছেন। অর্জুন ঘুমোচ্ছিল বলে তিনি আর ডাকেননি। ওঁর সেলফোনের নম্বর লিখে গিয়েছেন।

 

একটু খারাপ লাগল অর্জুনের। আরও ভোরে ওঠা উচিত ছিল তার। তা হলে ভদ্রলোকের সঙ্গে হাসপাতালে যেতে পারত। হাসপাতালটা কোথায় তা অবশ্য ওঁকে ফোন করে জেনে নেওয়া যায়। মাঝরাতে লোকটি চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ সে এই ঘরে বসে ছিল অপেক্ষায়, যদি আবার ফিরে আসে।

 

একটা ব্যাপারে ধন্দ লাগছে তার। পুলিশ অফিসার বলেছেন যে, এই বাড়ি থেকে দ্রুতবেগে একটা মোটরবাইককে বেরিয়ে যেতে দেখে তার সন্দেহ হওয়ায় তিনি খোঁজ করতে ভিতরে ঢুকেছিলেন। অর্থাৎ আততায়ীর মোটরবাইক ছিল। আবার গত রাতে যে এসেছিল সেও মোটরবাইকে ফিরে গিয়েছে। লক্ষণীয় যে, লোকটি মোটরবাইক ভিতরে নিয়ে আসেনি। যে আসছে সে বাড়ির লোকদের জানাতে চায়নি বলে মোটরবাইক বাইরে রেখে এসেছিল। এই দুটো লোককে একই মানুষ বলে ভাবতে অসুবিধে নেই। কিন্তু তা হলে দরজায় নক করে ‘মা’ বলে ডাকবে কেন?

 

দ্বিতীয়ত, প্রথমে চাবি দিয়ে দরজা খুলতে চেষ্টা করেছিল লোকটি। তার মানে এ বাড়ির সদর দরজার চাবি তার কাছে আছে। পেল কী করে? জিম নিশ্চয়ই সেটা দেবেন না। অবশ্য এক ফাঁকে এসে বন্ধ দরজায় চাবির গর্তের ছাঁচ নিয়ে নতুন চাবি তৈরি করে নেওয়া যায়। কিন্তু লোকটি দরজায় নক করেছিল। সাড়া না পেয়ে ‘মা’ বলে ডেকেছিল। অত রাতে দরজায় নক করলে নিশ্চয়ই মিসেস ব্রাউন সাড়া দিয়েছেন এর আগে। ‘মা’ ডাক শুনে নিশ্চয়ই দরজা খুলে দিয়েছেন। সেই কারণেই লোকটি নক করেছিল, ‘মা’ বলে ডেকেছিল।

 

হিসেব মিলছে না। কিচেনে ঢুকল সে। ইলেকট্রিক কেটলিতে চায়ের জল বসিয়ে দিয়ে দুধ-চিনি-চায়ের সন্ধান করতে লাগল। সেগুলো পাওয়ার পর খেয়াল হল জিম ব্রাউনের মায়ের কথা। ভদ্রমহিলা কি এখনও ঘুমোচ্ছেন? নাকি বেরোবার আগে জিম ওঁকে চা খাইয়ে গিয়েছেন! তবু দু’কাপ চা তৈরি করে দুধ-চিনি একটা ট্রে-তে তুলে সে দোতলায় চলে এল। জিমের মায়ের ঘরের দরজা ঈষৎ খোলা। সেখানে দাঁড়িয়ে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, ভিতরে আসতে পারি?

 

ভিতর থেকে জড়ানো শব্দ বাইরে এল। একটু অপেক্ষা করে অর্জুন ভিতরে ঢুকল। জিমের মা বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় রয়েছেন। তার পিঠের নীচে তিনটে বালিশ রাখা। একটা চাদর কোমর পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে।

 

গুড মর্নিং। আমি অর্জুন। পাশের টেবিলে ট্রে রাখল সে।

 

সেদিকে তাকালেন বৃদ্ধা। ধীরে ধীরে তার মুখে হাসি ফুটল।

 

আসুন, আমরা চা পান করি। আপনি চিনি খান?

 

বৃদ্ধা মাথা নেড়ে না বললেন।

 

শুধু লিকার?

 

মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝালেন বৃদ্ধা। তারপর ইশারায় যে বস্তুটিকে দেখালেন তা দেখে অর্জুন চমৎকৃত। বিছানার পাশ থেকে টেনে সামনে নিয়ে আসতেই বৃদ্ধার সামনে একটা বেশ চওড়া প্লাইউডের হাতল এগিয়ে এল। অর্জুন সেই হাতলের উপর বৃদ্ধার চায়ের কাপ রাখল।

 

বৃদ্ধা জড়ানো যে শব্দটা উচ্চারণ করলেন সেটা যে থ্যাঙ্ক ইউ’ তা এবার বুঝতে পারল অর্জুন। একটা চেয়ারে চায়ের কাপ নিয়ে বসে অর্জুন বৃদ্ধাকে ভাল করে দেখল। সমস্ত মুখ জুড়ে বার্ধক্যের ছাপ, হাতদুটো সরু এবং তা থেকে চামড়া ঝুলছে। মাথায় সাদা চুল ছেলেদের মতো ছটা।

 

হঠাৎ অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনি কি জানেন আপনার ছেলের বউ এখন কোথায়?,

 

বৃদ্ধা অবাক হয়ে তাকালেন। তারপর ডান হাত নীচের দিকে নাড়ালেন। কাপটাকে দুহাতে ধরে উপরে তুলে মুখ নামিয়ে আলতো চুমুক দিলেন তিনি।

 

অর্থাৎ এই বাড়ির কোনও খবর ওঁর কাছে পৌঁছোয়নি।

 

আপনার নাতির সঙ্গে দেখা হয়? বেশ জোরে প্রশ্নটা করল অর্জুন।

 

কাপটা নামিয়ে রেখে অদ্ভুত শব্দ উচ্চারণ করতে লাগলেন বৃদ্ধা। শব্দগুলোর মানে বুঝতে পারছিল না অর্জুন। কিন্তু তাতে যে যথেষ্ট অভিমান জড়ানো আছে, তা স্পষ্ট। অর্জুনের মনে হল, এই বৃদ্ধার সঙ্গে ওঁর নাতির যোগাযোগ ছিল। অর্থাৎ জিমকে এড়িয়ে জিমের স্ত্রী এবং মা ছেলেটির জন্যে অপেক্ষা করতেন। জিম যাতে না জানতে পারেন তাই সে আসত মধ্যরাতে। হয়তো দরজায় টোকা দিলে মিসেস ব্রাউন সেটা খুলে দিতেন নিঃশব্দে।

 

আপনার নাতির কাল আসার কথা ছিল? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

 

কিছু বলতে গিয়েও যেন নিজেকে সামলে নিলেন বৃদ্ধা। তারপর চায়ের কাপ তুলে চুমুক দিতে লাগলেন। অর্জুন যে এই ঘরে বসে আছে তা একেবারে উপেক্ষা করলেন।

 

অর্জুন বুঝল ভদ্রমহিলা এখন মুখ খুলবেন না। হয়তো ওঁর মনে পড়েছে নাতির ব্যাপারে মুখ খোলা নিষেধ।

 

বৃদ্ধার চা খাওয়া শেষ হয়ে গেলে কাপ তুলে হাতল সরিয়ে নীচে নেমে এল অর্জুন। তখনই টেলিফোন বেজে উঠল। অর্জুন ট্রে-টা কিচেনে নামিয়ে রেখে রিসিভার তুলল, হ্যালো।

 

অ-র-জুন। দিস ইজ জিম। তুমি কি পাঁচ মিনিটের মধ্যে তৈরি হতে .পারবে?

 

নিশ্চয়ই।

 

মেজর আসছেন। তোমাকে তৈরি থাকতে বলেছেন। উনি তোমাকে তুলে নেবেন। লাইন কেটে দিলেন জিম।

 

পোশাক বদলে দরজার বাইরে এসে সেটা চেপে দিতেই লক আটকে গেল। এখন এই বিরাট বাড়িটায় একজন লোলচর্ম প্রায় বাশক্তিরহিত বৃদ্ধা ছাড়া আর কেউ নেই। আমেরিকানরা এই সব বৃদ্ধবৃদ্ধাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে দেয় বলে শুনেছিল অর্জুন। জিম কেন ব্যতিক্রম হল? কিন্তু বৃদ্ধা সারাদিন ওইভাবে পড়ে থাকেন, ওটাও তো ভাল নয়।

 

লনের উপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল অর্জুন। ঘাসের উপর চাকার দাগ এখনও রয়ে গিয়েছে। এই চাকা অবশ্যই মোটরবাইকের। গাড়ির চাকার চেয়ে অনেক সরু। লন এবং বাঁধানো চাতালের মাঝখানে এক বিঘত পরিমাণ মাটির উপর দাগটা বেশ স্পষ্ট। খাঁজগুলো বোঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রথম রাতে যে লোকটি এসে খুনের চেষ্টা করেছিল এটা তার বাইকের চাকার দাগ। একটু উত্তেজিত হয়ে গেটের বাইরে চলে এল অর্জুন। সেখানকার মাটির উপর বেশ কয়েকটা চাকার দাগ। দুটো দাগ আগের চাকার দাগের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। দ্বিতীয়টির চাকার দাগ একটু আলাদা। খাঁজগুলো একটু বড় বড়। অর্থাৎ দ্বিতীয় মোটরবাইক ভিতরে ঢোকেনি। জিমের ছেলে এটাকে গেটের বাইরে রেখে ভিতরে ঢুকেছিল।

 

এই সময় মেজরের গাড়ি পাশে এসে দাঁড়াল। অর্জুন দেখল, মার্টিন গাড়িটা চালাচ্ছে। পাশে বসে আছেন মেজর। পিছনের দরজা খুলে গাড়িতে উঠে বসতেই মেজর এবং মার্টিন একসঙ্গে বলে উঠলেন, গুড মর্নিং!

 

গুড মর্নিং! অর্জুন হাসল। মেজর বললেন, একটা ভাল খবর আছে। মিসেস ব্রাউনের জ্ঞান ফিরে এসেছে।

 

বাঃ। খুব ভাল কথা। অর্জুন বলল।

 

এখন ওঁর কাছ থেকে স্টেটমেন্ট পেলেই পুলিশ ছেলেটিকে খুঁজবে।

 

কোন ছেলেটিকে?

 

আঃ। যে খুন করতে চেষ্টা করেছিল। ছেলের উপর জিমের সন্দেহ ছিল।

 

কিন্তু মিস্টার ব্রাউনের ছেলে তো তার মাকে খুন করতে আসেনি। অর্জুন খুব শান্ত গলায় বলতে মেজর চমকে তাকালেন, কী বলছ?

 

আমি ভুল বলছি না।

 

তোমার কী থেকে মনে হচ্ছে ঠিক বলছ? একটু আগে জিম ফোনে আফশোস করছিল, ছেলের ব্যাপারে কেন আরও সতর্ক হয়নি!

 

উনি ভুল করছেন। দেখবেন ওঁর স্ত্রীও আমাকে সমর্থন করবেন।

 

দ্যাখো অর্জুন, তুমি অতীতে অনেক সত্যি উদ্ধার করেছ বটে, কিন্তু একটা রাত ওই বাড়িতে কাটিয়েই ঠিকঠাক সত্যি জেনে যাবে এটা একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে না? মেজর মাথা নাড়লেন, শুনেছি, জিমের মা কথা বলতে পারেন না। জিম নিশ্চয়ই তোমাকে এই তথ্য দেয়নি। তা হলে তোমার জানা সোর্স কোথায়?

 

অর্জুন গত রাতের ঘটনা এবং আজ বৃদ্ধার সঙ্গে কথাবার্তা মেজরকে জানিয়ে হাসল, আমার সন্দেহ হয়েছিল কেউ মাকে ছুরি মেরে আবার রাত দুপুরে তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে না। তাই যে খুন করতে চেয়েছিল সে আলাদা লোক। কিন্তু সন্দেহ তো তথ্য নয়। আজ লনের উপর এবং গেটের বাইরের মাটিতে দু’-দুটো মোটরবাইকের চাকার দাগ আমার সন্দেহকে সত্যি করে দিল।

 

আশ্চর্য! পুলিশ তো মোটরবাইকের চাকার কথা নিয়ে মাথা ঘামায়নি।

 

কারণ, ওঁরা জানেন একটাই মোটরবাইক ভিতরে ঢুকেছিল। মাঝরাতের আগন্তুকের খবর ওঁদের কাছে নেই। অর্জুন বলল।

 

তুমি যা বলছ তা যদি সত্যি হয় তা হলে জিমের ছেলেটি বদলেছে বলতে পারছি না। কিন্তু সে চোরের মতো মাঝরাতে বাড়িতে যায় কেন? জিমের ভয়ে?

 

হ্যাঁ। বাবা এবং ছেলের সম্পর্ক ভাল নয়। হয়তো মিস্টার ব্রাউন নির্দেশ দিয়েছেন ছেলেকে বাড়িতে ঢুকতে না দিতে। অর্জুন বলল।

 

তা হলে জিমের বউকে কে খুন করতে এসেছিল?

 

পুলিশ নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে।

 

কেন ছুরি মেরেছিল?

 

এর উত্তর মিসেস ব্রাউন দিতে পারবেন।

 

হাসপাতালের পার্কিংলটে গাড়ি পার্ক করল মার্টিন। করে বলল, আমি এখানেই অপেক্ষা করছি, আপনারা কাজ শেষ করে আসুন।

 

গাড়ি থেকে নামতে নামতে মেজর বললেন, তুমি একা গাড়িতে বসে কী করবে? চলো, আমাদের সঙ্গে ভিতরে চলো।

 

থ্যাঙ্ক ইউ মেজর। কিন্তু কোনও কোনও সময় দূরে থাকলে অনেকটা দেখা যায়।

 

কথা না বাড়িয়ে মেজর হাঁটতে লাগলেন, সঙ্গী হল অর্জুন।

 

.

 

হাসপাতালের রিসেপশনিস্ট জানালেন মিসেস ব্রাউনের জ্ঞান ফিরে এসেছে কিন্তু তাকে কথা বলতে দেওয়া হবে না। বিকেলের দিকে কন্ডিশন নর্মাল হলে উনি কথা বলতে পারবেন। মিস্টার ব্রাউন যেহেতু বয়স্ক মানুষ, তাই তাকে অ্যালাউ করা হয়েছে স্ত্রীর পাশে যেতে। কিন্তু তিনি কোনও কথা জিজ্ঞেস করতে পারবেন না। একটু পরেই মিসেস ব্রাউনকে ও টি-তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অপারেশনের জন্যে। এ ব্যাপারে ভয়ের কিছু নেই।

 

মিস্টার ব্রাউনের জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া কিছু করার নেই। মেজর বললেন, চলো, কফি খেয়ে আসি।

 

যদি সেই সময় মিস্টার ব্রাউন বেরিয়ে যান?

 

ও জানে আমি আসছি, তাই অপেক্ষা করবে।

 

তা হলে চলুন। কিন্তু শুধু কফি নয়, খুব খিদে পেয়েছে। হসপিটাল ক্যান্টিনে ঢুকে অর্জুনের মনে হল, জলপাইগুড়িতে এর কাছাকাছি মানের কোনও খাবার দোকান নেই। ছোট ছোট রঙিন টেবিল চেয়ার, কাউন্টারের ওপাশে সুন্দরী সেলসগার্ল, তাদের পিছনে ইলেকট্রনিক বোর্ডে কী কী খাবার পাওয়া যাবে এবং তাদের দাম লেখা রয়েছে।

 

সেদিকে তাকিয়ে মেজর বললেন, এখনও কুড়ি মিনিট বাকি আছে। এরা একটা স্পেশ্যাল ব্রেকফাস্ট দেয় যার দাম কুড়ি মিনিট পরে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। তুমি ওই টেবিলে গিয়ে বসো, আমি নিয়ে যাচ্ছি।

 

আপনি নেবেন কেন?

 

আঃ। অর্জুন। এটা তোমার ভারতবর্ষ নয়। এখানে পরিশ্রম করলে বৃদ্ধরাও নিজেকে যুবক ভেবে খুশি হয়। যাও! মেজর অর্ডার দিলেন, ওয়ান জাম্বো ব্রেকফাস্ট, টু কাপ্‌স অফ কফি।

 

একটু পরে ট্রে-র উপর কফির মুখ বন্ধ কাগজের গ্লাস আর প্লেট ভরতি যে জাম্বো ব্রেকফাস্ট নিয়ে মেজর এলেন, তা দেখে অর্জুনের চোখ বড় হয়ে গেল, এ কী!

 

সস্তায় পাচ্ছ, খেয়ে নাও।

 

কী এটা?

 

তিনতলা বিগম্যাক।

 

নষ্ট হবে। আপনি একটু নিন, প্লিজ!

 

আমি এখন দিনেরাতে দু’বার খাই। দিনেরবেলায় সেদ্ধ, রাতে যা পাই।

 

অতএব শুরু করল অর্জুন। মনমাতানো স্বাদ। ভিতরে যে সস দেওয়া হয়েছে তার গন্ধও চমৎকার। ক্যান্টিনটায় এখন বেশ লোক হয়েছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ হয়ে গেল। কফির কাপের ঢাকনা খুলে চুমুক দিল অর্জুন।

 

মেজর বললেন, জিমের সঙ্গে দেখা করেই বাড়ি ফিরে যাব।

 

দরকারি কাজ আছে?

 

তোমাকে খাওয়াব বলে একটা আড়াই কেজির ইলিশ কিনেছিলাম। সেটা জমিয়ে রাঁধতে হবে। মেজর হাসলেন।

 

মানে? আপনি তো সেদ্ধ খাবেন!

 

ইয়েস। তা ছাড়া নিজের শ্রাদ্ধ করব আজ।

 

ওরে বাব্বা। তা হলে ইলিশটা মুলতুবি থাক। এখন যা খেলাম তাতে বিকেলের আগে খিদে পাওয়ার কোনও চান্স নেই।

 

বলছ?

 

হ্যাঁ। এই সময় মিস্টার ব্রাউনকে দেখা গেল। মুখ ঘুরিয়ে ওঁদের খুঁজছেন। দেখতে পেয়ে এসে বসলেন তৃতীয় চেয়ারে। উনি মুখ খোলার আগেই মেজর বললেন, দাঁড়াও। ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসি তোমার জন্যে।

 

না। জাস্ট এ কাপ অফ কফি!

 

ছাড়ো তো। কাল থেকে তো না খেয়ে আছ। মেজর, উঠে গেলেন। অর্জুনের ভাল লাগল। মানুষকে খাইয়ে ভদ্রলোক বেশ তৃপ্ত হন।

 

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কেমন দেখলেন?

 

আমাকে চিনতে পেরেছে। মাথা নাড়লেন জিম।

 

ডাক্তার কী বলছেন?

 

একটা মাইনর অপারেশন হবে এখন। তারপরে আর কোনও ভয় নেই। মিস্টার ব্রাউন দু’হাতে কপাল চেপে ধরলেন, একটু পরেই পুলিশ আসবে। আবার জিজ্ঞেস করবে। আমি কী জবাব দেব? উঃ।

 

আপনি যা জানেন তাই বলবেন।

 

আমি যে অনেক কিছু জানি, কিন্তু সেসব কথা পুলিশকে বলতে চাইনি। চাইনি বলেই মেজরের কাছে তোমার কথা শুনে উৎসাহী হয়েছিলাম।

 

অর্জুন হাসল, তা হলে বলছেন আপনার স্ত্রীর আততায়ীকে আপনি জানেন?

 

এই সময় মেজর ট্রে-তে খাবার নিয়ে এলেন। মিস্টার ব্রাউন বললেন, আমি ওর নাম উচ্চারণ করতে চাই না।

 

তুমি যা ভাবছ তা সত্যি নয় জিম। খাও। মেজর বললেন।

 

তার মানে? অবাক হয়ে তাকালেন মিস্টার ব্রাউন।

 

অর্জুন বলল, দাঁড়ান, মিস্টার ব্রাউন! সমস্ত ব্যাপারটা আপনি আপনার স্ত্রীর মুখে শুনতে পারবেন। ততক্ষণ মনটাকে একটু নরম রাখুন। আপনার ছেলে তার মাকে ছুরি মারেনি।

 

তুমি আমাকে স্তোক দিচ্ছ? পুলিশ তাকে দেখেছে আমার বাড়ি থেকে বাইক নিয়ে বেরিয়ে যেতে। প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন মিস্টার ব্রাউন।

 

পুলিশ তোমাকে বলেছে যে, তারা তোমার ছেলেকে দেখেছে?

 

ওই হতভাগাই বাইক চড়ে। আমারই টাকায় কিনেছে। ইদানীং ও আমাকে ফোনে ভয় দেখাত। বিশ হাজার ডলার না দিলে আমার ব্যাবসার গোপন। তথ্য ফাঁস করে দেবে। সেই টাকা চাইতে এসে না পেয়ে ছুরি মেরেছে। এখন আর আমার কোনও সংকোচ নেই। পুলিশকে আমি সব বলব। মিস্টার ব্রাউনের হাত কঁপতে লাগল।

 

মেজর জিজ্ঞেস করলেন, ফোনে যে কথা বলেছে সে যে তোমার ছেলে তা বুঝলে কী করে? অন্য কেউ তো হতে পারে?

 

মেজর! আমি বাপ হয়ে ছেলের গলা চিনব না? তা ছাড়া ওরকম অশ্লীল শব্দ, বস্তি এলাকার মস্তানরা যা বলে তাতে তো ও অভ্যস্ত।

 

মেজর বললেন, তোমাদের তো অনেকদিন দেখা হয়নি। আর কেউ ওর পরিচিত, তোমাকে ফোন করেছিল। তুমি তাকে ছেলে ভেবে নিয়েছ?

 

তোমরা কী বলতে চাইছ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না?

 

আগে খেয়ে নাও, তারপর বোঝার চেষ্টা করবে।

 

মিস্টার ব্রাউন খাবারের ট্রে-র দিকে তাকালেন। তারপর কফির কাপ তুলে নিলেন।

 

একটা চুমুক দিয়ে অর্জুনের দিকে তাকালেন তিনি, পুলিশ যাকে আমার বাড়ি থেকে মোটরবাইকে বেরোতে দেখেছিল সে টম নয়?

 

টম?

 

আমার ছেলে।

 

না। অর্জুন সহজ গলায় বলল।

 

.

 

ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে রিসেপশনে আসতেই সুন্দরী রিসেপশনিস্ট জিজ্ঞেস করলেন, মিস্টার ব্রাউন?

 

ইয়েস। মিস্টার ব্রাউন এগিয়ে গেলেন।

 

আপনাকে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, আপনাদের কোনও পরিচিত ছেলে এখানে এসে অসভ্যতা করে গিয়েছে। আমি পুলিশকে ইনফর্ম করতে যাচ্ছিলাম। সুন্দরী বললেন।

 

আমাদের পরিচিত? কী নাম?

 

নাম বলেনি। কানে দুল, লেদার জ্যাকেট, চুলে রং। স্বাস্থ্য ভাল, হোয়াইট। স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন মিস্টার ব্রাউন, না। এরকম কাউকে আমি চিনি না।

 

আশ্চর্য ব্যাপার! ছেলেটি এসে বলল, কাল রাতে মিসেস ব্রাউন ভরতি হয়েছিলেন, তাকে কি মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে? আমি অবাক হয়ে জানালাম, তিনি মর্গে যাবেন কেন? তার অপারেশন চলছে। ও একটা বিশ্রী গালি দিয়ে চলে গেল।

 

বিশ্বাস করুন, এরকম কেউ আমার পরিচিত নেই।

 

আপনার স্ত্রী বেঁচে আছে শুনে ও যেন দুঃখিত হয়েছিল।

 

আপনি পুলিশকে বললেন না কেন? হয়তো এই ছেলেটিই আততায়ী?

 

আমি সিকিউরিটিকে বলেছিলাম ওকে আটকাতে। কিন্তু ও ততক্ষণে বাইকে চেপে বেরিয়ে গিয়েছে। আপনি অপেক্ষা করুন, পুলিশের সাহায্য আপনার দরকার হবে।

 

মিসেস ব্রাউনের অপারেশন শেষ হওয়ার পর জানা গেল আর উদ্বেগের কারণ নেই। মেজর বিকেলবেলায় আবার আসবেন বলে অর্জুনকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন। তাঁদের দেখে মার্টিন প্রায় দৌড়ে এল, কী হয়েছিল?

 

কী হয়েছিল মানে? জিমের স্ত্রীর অপারেশন হয়েছে। মেজর বললেন।

 

ও নো! ব্রঙ্কসে যে ছেলেদের দেখা যায় তাদের মতো দেখতে একজন হসপিটাল থেকে বেরিয়ে আসতেই সিকিউরিটির দুটো লোক দৌড়ে এল ওকে ধরতে। ছেলেটি বাইকে উঠে যেভাবে বেরিয়ে গেল তা শুধু সিনেমায় দেখা যায়। আমি সিকিউরিটির লোক দুটোকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? ওরা উত্তর দিল না। এই ছেলেগুলো খুব ভয়ংকর। মার্টিন বলল।

 

ওকে আবার দেখলে চিনতে পারবেন? অর্জুন জিজ্ঞেস করল।

 

নিশ্চয়ই। বেশ জোরের সঙ্গে বলল মার্টিন।

 

ব্রঙ্কসের ছেলেদের আপনি চেনেন?

 

না। আমি চিনতে চাই না। ওদের মানুষ বলে মনে করি না আমি।

 

ওরা আপনার মতে কী?

 

নরকের কীট। মার্টিন বলল।

 

মেজর হাসলেন, চলো, বাড়ি যাওয়া যাক। আমার অনেক কাজ বাকি আছে।

 

.

 

বাড়ি ফিরে স্নান সেরে মার্টিনকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে মেজর জিজ্ঞেস করলেন, সত্যি তোমার লাঞ্চ খাওয়ার ইচ্ছে নেই?

 

একদম সত্যি। যা খাইয়েছেন তার ভার এখনও বইছি।

 

বেশ। তবু যদি খিদে পায় ফ্রিজে টুকটাক পেয়ে যাবে। আমি চারটের মধ্যে ফিরে আসব। আর এই নাও নীচের দরজার ডুপ্লিকেট চাবি। বিশ্রাম নিতে না চাইলে আশপাশে ঘুরে এসো। মেজররা চলে গেলেন।

 

মেজর কোথায় যাচ্ছেন তা জিজ্ঞেস করেনি অর্জুন। নিশ্চয়ই কোনও ব্যক্তিগত কাজে যাচ্ছেন। তার মনে পড়ল, মেজর বলেছিলেন, আজ শ্রাদ্ধ করব নিজের, দাড়ি কামাব। নিশ্চয়ই কথাগুলো রসিকতা করে বলেছেন।

 

ব্যালকনিতে গেল অর্জুন। কাঠবিড়ালিরা ফুটপাতে, গাছে নিজেদের খেলা খেলে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে প্রাইভেট কার ছুটে যাচ্ছে সামনের রাস্তা দিয়ে। তারপরেই শব্দহীন হয়ে যাচ্ছে এই পাড়া। আশপাশের বাড়িগুলোর জানলা-দরজা বন্ধ। একজন প্রৌঢ়া মহিলা চেনে বাঁধা কুকুরকে নিয়ে ফুটপাতে হাঁটছেন অলসভাবে।

 

আকাশের দিকে তাকাল অর্জুন। জলপাইগুড়ির আকাশের সঙ্গে নিউ ইয়র্কের আকাশের কোনও পার্থক্য নেই। যত পার্থক্য মাটিতেই। হঠাৎ খেয়াল হল, এখানে আসার পর মাকে পৌঁছোনোর খবরটা দেওয়া হয়নি। মেজরের অনুমতি না নিয়ে ফোন করাটা উচিত কাজ হবে না।

 

আধঘণ্টা শুয়ে-বসে কাটিয়ে অর্জুন ঠিক করল আশপাশের এলাকাটা ঘুরে দেখতে। দরজা টেনে দিতেই বন্ধ হয়ে গেল। চাবি পকেটে নিয়ে সে হাঁটতে লাগল। ছবির মতো বাড়ি। কিন্তু এই দুপুরে সেগুলোকে জনশূন্য বলে মনে হচ্ছে। রাস্তাটা ধীরে ধীরে উপরে উঠছে। বাঁক নিতেই বেশ কিছু দোকান এবং অফিস দেখতে পেল। মানুষজন দরকারে এসেছে এখানে। কেনাকাটা করছে, কাজ সারছে।

 

একটা কফির দোকান চোখে পড়ল। পকেটে ডলারগুলো আছে। এখানে কফির দাম নিশ্চয়ই খুব বেশি হবে না। কফি নিয়ে গোলটেবিলে বসল অর্জুন। এক ডলার নিল। দেশে চল্লিশ টাকা দিয়ে সে নিশ্চয়ই এক কাপ কফি খেত না। না, চল্লিশ টাকাকে এখন থেকে এক টাকা বলে ভাবতে হবে।

 

কফির দোকানে জনাপাঁচেক লোক বসে কফি খাচ্ছে। ঠিক পাশের টেবিলে একটা গোঁফওয়ালা শক্তপোক্ত মানুষ একটি তরুণকে খুব বোঝাচ্ছে, কিন্তু তরুণটি সমানে মাথা নেড়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত গুফো লোকটি বিরক্ত হয়ে ছেলেটিকে হাত নেড়ে কিছু বলতে ছেলেটি যেন পালিয়ে বেঁচে গেল। যেহেতু ওরা ইংরেজিতে কথা বলছিল না, তাই অর্জুন কিছুই বুঝতে পারেনি।

 

গুঁফো লোকটি এবার অর্জুনের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে ইংরেজিতে বলল, বেকার হয়ে থাকবে তবু কাজ করবে না। মাথা গরম হয়ে যায়।

 

অর্জুন মাথা নাড়ল, এরকম ছেলে সব দেশেই আছে।

 

হুম। আমাকে এখন আর-একটা ছেলেকে খুঁজে বের করতে হবে।

 

মনে হচ্ছে আপনার হাতে কাজ আছে? আছে।

 

কিন্তু কাজ করবে এমন লোক কম।

 

কী ধরনের কাজ জানতে পারি?

 

আমার একটা কুরিয়ার সার্ভিস আছে। চিঠি বা প্যাকেট ডেলিভারি দেওয়ার জন্যে তোক চাই। পার অ্যাসাইনমেন্ট পেমেন্ট করি, নো মাইনে।

 

ও।

 

আপনি কি আমেরিকান?

 

না। আমি ইন্ডিয়ান।

 

অনেক ইন্ডিয়ান এখানকার সিটিজেনশিপ নিয়ে আমেরিকান হয়ে গিয়েছে। তা আপনি এদেশে কবে এসেছেন?

 

গত কাল।

 

মাই গড! কতদিন থাকবেন?

 

বড়জোর দিনদশেক।

 

তা হলে আপনি টুরিস্ট?

 

লোকটি মুখ ফিরিয়ে নিল। কফি খেতে খুব ভাল লেগেছিল অর্জুনের। আর-এক কাপ খাওয়ার কথা চিন্তা করল সে। লোকটি টেবিলে আঙুল দিয়ে কিছু আঁকছে। সে জিজ্ঞেস করল, আপনি আর-একটু কফি খাবেন?

 

লোকটা হাসল, হাফ কাপ খেতে পারি।

 

ওরা হাফ কাপ দেবে?

 

লোকটি বলল, আপনি বসুন, আমি নিয়ে আসছি।

 

লোকটি উঠে কাউন্টারে চলে গেল। তারপর দুটো কাপ নিয়ে ফিরে এল, একটা কাপ দু’ভাগ করে নিলাম।

 

আপনি দাম দিলেন কেন? আমিই তো খাওয়াতে চেয়েছিলাম?

 

এই যে চেয়েছিলেন তার দাম কফির দামের চেয়ে অনেক বেশি। নিন। লোকটি অর্জুনের টেবিলে বসল, আমার নাম জোসেফ। সবাই ‘জো’ বলে ডাকে।

 

আমার নাম অর্জুন।

 

একটু খটোমটো। অর ইজ ওকে। এই কফি খেয়ে আমাকে ব্রঙ্কসে যেতে হবে। ছোকরা কিছুতেই যেতে রাজি হল না। নোকটা কফিতে চুমুক দিল।

 

অর্জুন সোজা হল, ব্রঙ্কস! কেন?

 

একটা পার্সেল ডেলিভারি দেওয়ার আছে। আজই দিতে হবে। কুরিয়ার বিজনেসে দেরি করা মানে ক্লায়েন্ট হারানো। যে ছেলেটি রেগুলার কাজ করে সে আজ অসুস্থ হয়ে পড়ায় নতুন ছেলে খুঁজছিলাম। অগত্যা আমাকেই যেতে হবে। গুফো লোকটা, যার নাম জো, কফি শেষ করল।

 

অর্জুন তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, কখন যাবেন?

 

এখনই। পাশেই আমার অফিস। সেখান থেকে পার্সেল নিয়ে টিউব ধরব।

 

কতক্ষণ লাগবে যেতে-আসতে?

 

ঘণ্টাতিনেক।

 

আমি যদি আপনার সঙ্গে যাই তা হলে আপত্তি আছে?

 

আপনি যাবেন? কেন?

 

আমি কখনও ব্রঙ্কস দেখিনি।

 

ওটা মোটেই দেখার জায়গা নয়।

 

তবু, অনেক কথা শুনেছি।

 

গুঁফো জো একটু ভাবল। তারপর বলল, আপনাকে আমি কোনও পারিশ্রমিক দিতে পারব না, টিউবের টিকিটও আপনাকে কাটতে হবে।

 

অর্জুন উঠে দাঁড়াল, ঠিক আছে।

 

জো-এর অফিসটা খুবই ছোট। কোনও কর্মচারী নেই। তালা খুলে পার্সেলটা নিয়ে আবার তালা বন্ধ করে মাথা নাড়ল জো।

 

মিনিট সাতেক হেঁটে টিউবস্টেশনে পৌঁছে গেল ওরা। জো-র কাছে কার্ড ছিল, বোধহয় টিউবে যাতায়াতের মাসিক কার্ড। অর্জুনকে টিকিট কাটতে হল আসা-যাওয়ার। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াতে না-দাঁড়াতেই হুড়মুড়িয়ে ট্রেন এসে গেল। নিউ ইয়র্কের সবক’টা দ্বীপকে মাটির নীচ দিয়ে বেঁধে ফেলেছে পাতাল রেল। মাটির নীচের সেই রেললাইনের ম্যাপ দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়।

 

ট্রেনে উঠে বেশ মজা লাগল। দুটো কালো ছেলে যন্ত্র চালিয়ে গান গাইছে আর নাচছে। গান গাইতে গাইতে যাত্রীদের সামনে টুপি পেতে ধরছে। তাতে খুচরো বা এক দুই ডলার দিচ্ছেন কেউ কেউ। ছেলে দুটোর পোশাক এবং ভঙ্গি দেখলে হিন্দি সিনেমার অভিনেতা বলে মনে হবে। অর্জুনের মজা লাগছিল। পশ্চিমবাংলার গ্রামগঞ্জের বাসে ‘ভোলা মন’ বলে চিৎকার করে যারা একতারা বাজিয়ে গান গায় তাদের সঙ্গে এদের মূলত কোনও পার্থক্য নেই। শুধু এই কালোসাহেব গাইয়ে ভিখিরিদের স্মার্টনেস দেশের ভিক্ষুকরা কোনওদিন রপ্ত করতে পারবে বলে মনে হয় না।

 

পাশাপাশি বসে ছিল জো আর অর্জুন। স্টেশনে ট্রেন থামছে আবার ছুটছে। একসময় গাইয়েরা নেমে গেল। হঠাৎ জো জিজ্ঞেস করল, আপনি দেশে কী করেন?

 

অর্জুন একটু ভাবল। তারপর এমন ভান করল যেন ট্রেনের চাকার শব্দে শুনতে পায়নি। জো এবার একটু গলা তুলে প্রশ্নটা করল। অতএব উত্তরটা দিতেই হল। শুনে চোখ বড় হয়ে গেল জো-এর, মাই গড! আপনি ডিটেকটিভ?

 

অর্জুন হাসল, না। আমি সত্যসন্ধানী। মিথ্যের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা সত্যিটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।

 

এটা আপনার প্রফেশন?

 

মাথা নাড়ল অর্জুন, হ্যাঁ।

 

ডিটেকটিভ হন বা না হন, এইসব মানুষ অকারণে সময় নষ্ট করেন । আপনি ওই কফির দোকানে নিশ্চয়ই কিছুর খোঁজে এসেছিলেন? জো জিজ্ঞেস করল।

 

বিশ্বাস করুন, সময় কাটাতে ওখানে ঢুকেছিলাম। আমার পরিচিত এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের আমন্ত্রণে নিউ ইয়র্কে এসেছি। এখানে আমি শুধু টুরিস্ট। অর্জুন হাসল।

 

কিন্তু আপনার তো বেশি বয়স নয়?

 

বোধহয় সেটাই আমার সুবিধে।

 

ও। কিন্তু আমি ব্রঙ্কস যাচ্ছি শুনে আপনি সঙ্গে যেতে চাইলেন কেন? যদি আমাকে কুইন্সে যেতে হত তা হলেও কি উৎসাহ দেখাতেন?

 

না।

 

তার মানে ব্রঙ্কসের ব্যাপারে আপনার বিশেষ আগ্রহ আছে। কেন?

 

শুনেছি ওখানে কুখ্যাত অপরাধীরা ঘোরাফেরা করে। পুলিশের সঙ্গে প্রায়ই তাদের মারপিট হয়। জায়গাটা দেখার ইচ্ছে হল। অর্জুন বলল।

 

আপনাকে একটা উপদেশ দিচ্ছি। ভুলেও ওখানে গিয়ে নিজের পরিচয় দেবেন না। তা হলে আপনি আর ফিরে আসতে পারবেন না। জো বলল।

 

মনে থাকবে। অর্জুন মাথা নাড়ল।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *