তিন
অর্জুনের ঘুম ভাঙল বিকেল চারটে নাগাদ। মুখ ধুয়ে পোশাক পালটে সে ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই দৃশ্যটা দেখতে পেল। মূল দরজার বাইরে মোড়া পেতে বসে আছেন মেজর। দুটো হাত সামনে বাড়ানো। তাতে প্রচুর চিনেবাদাম। আর, অর্জুন গুনল, ন’টা কাঠবিড়ালি তার কাধ থেকে হাতে নেমে এগিয়ে গিয়ে এক-একটা বাদাম তুলে নিয়ে লাফিয়ে নেমে খাচ্ছে। ওদের খাওয়ার ধরনটা চমৎকার। দুটো পায়ের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে উপরের দুটো পা। হাতের মতো ব্যবহার করে বাদাম খাচ্ছে। অজুর্ন নীচে নেমে আসতেই সব ক’টা কাঠবিড়ালি দুদ্দাড় করে সামনের গাছ দুটোয় উঠে গেল। অর্জুন বলল, সরি!
তোমাকে কখনও দ্যাখেনি তো! দেখলেই হবে না, তোমার গায়ের গন্ধ যতক্ষণ ওদের পছন্দ না হবে ততক্ষণ তোমাকে ওরা বন্ধু বলে ভাববে না। মার্টিনকে তো রোজ দেখছে, কিন্তু ওই কারণে ওকে পছন্দ করে না। হাসলেন মেজর।
মার্টিন কোথায়?
ও কাজে গিয়েছে। তোমাকে আনতে হবে বলে ও ডিউটি বিকেলের শিটে করে নিয়েছিল। কেন? চা খাবে? চলো, করে দিচ্ছি।
না না, আপনি বসুন। আমি চা করছি।
তুমি করবে? লাস্ট কবে চা বানিয়েছ?
এটা তো সুক্তো রান্না নয়! আমি করছি, খেয়ে বলবেন।
অর্জুন উপরে উঠে গেল। কিচেনে ঢুকে সে বেশ ঘাবড়ে গেল। গ্যাস আছে, পাশে জলের ব্যবস্থা। ওপাশে সিঙ্ক। কিন্তু উপরে দুটো তাকে অন্তত গোটা তিরিশেক কৌটো পরপর সাজানো আছে। প্রথমটা খুলতেই পাঁচফোড়ন দেখা গেল। কোনওটায় চা আছে, কোনওটায় চিনি। তা বের করতে হলে তো সব ক’টাই খুলে দেখতে হবে। দ্বিতীয় তাকে হাত না দিয়ে গ্যাসের সামনের কৌটো খুলতেই টি-ব্যাগ পেয়ে গেল অর্জুন। পাশেরটায় চিনি। তার পরেরটায় লবণ। জিভে স্বাদ নিয়ে ও দুটোকে আলাদা করতে হল।
অর্জুন ব্যালকনিতে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি চায়ে চিনি খান?
কথা না বলে মাথা নেড়ে ‘না’ বললেন মেজর। কারণ, এখন তাঁর শরীর জুড়ে কাঠবিড়ালিরা খেলা করছে। অর্জুনের মনে হল, কাঠবিড়ালিরা মেজরকে একটা ছোট্ট গাছ বলে ভেবে নিয়েছে। ম্যানহাটনের আকাশচুম্বী বাড়ির ফ্ল্যাট ছেড়ে এখানে চলে এসে মেজর বেশ ভাল আছেন।
চায়ের ডাক পেয়ে মেজর উপরে চলে এলেন। চুমুক দিয়ে বললেন, বাঃ!
গুছিয়ে বসে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, এবার বলুন, জরুরি তলব কেন?
কৈফিয়ত চাইছ নাকি? মেজরের চোখ ছোট হল।
না না। স্রেফ কৌতূহল।
তোমাকে অনেক দিন দেখিনি। মন টানছিল। আরে বয়স হয়েছে তো! তাই তোমাকে দেখতে ইচ্ছে হল। ও হ্যাঁ, আগামীকাল আমি শ্রাদ্ধ করব।
শ্রাদ্ধ? কার?
মেজর হাসলেন, আত্মীয়স্বজন যখন নেই, তখন নিজের শ্রাদ্ধ নিজেকেই করতে হবে। প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর পরে এই দাড়ির মায়া কাটাতে হবে।
তার মানে আপনি কাল দাড়ি কামাবেন, ন্যাড়া হবেন? হকচকিয়ে গেল অর্জুন। দাড়ি ছাড়া মেজরকে ভাবাই যায় না। না জানলে দেখে চিনতে পারবে না।
মেজর হাসলেন, আমি চলে গেলে আমার শ্রাদ্ধ করার জন্যে কেউ থাকবে না। হিন্দু বাবা-মায়ের সন্তান যখন, তখন কাজটা নিজেই করে যাই। কেন করছি জানো? একটু-একটু করে মায়া কাটাতে চাই। আয়নায় দাড়ি গোঁফহীন মুখ দেখে ভাবব, এটা আমি নই। ব্যস, মায়া কমে যাবে।
অর্জুন বলল, কিছু মনে করবেন না, এটা একদম ছেলেমানুষি।
ঠিক তখনই ডোরবেল বাজল। মেজর উঠে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে খুশি-গলায় বললেন, হাই জিম! চাবিটা নাও।
দড়িতে বাঁধা চাবি উপর থেকে নীচে ফেলে দিলেন মেজর। নীচের দরজাটা খুলে গেল। দড়ি উপরে তুলে রেখে অর্জুনের সামনে চলে এলেন, তোমার সঙ্গে খুব ইন্টারেস্টিং একজন মানুষের আলাপ করিয়ে দিচ্ছি! ওর নাম জিম ব্রাউন।
ততক্ষণে জিম উপরে উঠে এসেছেন। অর্জুন দেখল ভদ্রলোককে। মেজরের সমবয়সি।
অর্জুনের দিকে তাকিয়ে জিম জিজ্ঞেস করলেন, এর কথা তুমি বলেছিলে?
মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে মেজর তাকে ইঙ্গিতে বসতে বললেন। জিমকে খুব হতাশ দেখাল। ধপ করে সোফায় বসে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন তিনি। তারপর বললেন, লুক মেজর, তুমি ব্যাপারটাকে যে এত হালকাভাবে দেখবে তা আমি ভাবিনি।
কী থেকে এখন ওটা ভাবছ জিম?
তুমি এতদিন আমাকে ভরসা দিচ্ছিলে ইন্ডিয়া থেকে তোমার কাছে এমন একজন আসছেন যিনি আমার সমস্যার সমাধান করে দেবেনই। একজন ইন্ডিয়ান টুথ-ইনভেস্টিগেটর কী করে আমেরিকায় এসে প্রবলেম সলভ করবেন তা নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল। তবু ভেবেছিলাম, মানুষটি নিশ্চয়ই অনেক অভিজ্ঞ। লাইক জেমস বন্ড। বন্ড নিজে ব্রিটিশ হলেও হংকং-এ গিয়ে প্রবলেম সল্ভ করেছিলেন। জিম হাত নাড়লেন, কিন্তু এ তো কমবয়সি ছেলে! মাস্ট ইন মিডটোয়েন্টিস। এ কী করবে?
জিম, তুমি আলেকজান্ডারের নাম শুনেছ?
তুমি ওকে চিনলে কী করে? আমার সহকর্মী ছিল কিন্তু!
আমি গ্রিক সেনাপতি আলেকজান্ডারের কথা বলছি। ও হো, তোমাদের এখানে তো ইতিহাস ভাল করে পড়ায় না। গ্রিস থেকে সেনাবাহিনী নিয়ে ভারতবর্ষে গিয়ে অনেকটা জায়গা জয় করেছিলেন সেই ভদ্রলোক। আর তাঁর বয়স তিরিশও হয়নি। এত তাড়াতাড়ি মানুষের উপর বিশ্বাস হারিয়ো না জিম। অবশ্য তুমি যদি না চাও তা হলে অর্জুনকে আমি অনুরোধ করব না। শান্ত গলায় বললেন মেজর।
চশমা খুললেন জিম, ওয়েল, আমি জিম, জিম ব্রাউন। অর্জুনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন ভদ্রলোক।
করমর্দন করে অর্জুন বলল, আমি অর্জুন।
অ-র-জুন!
হেসে ফেলল অর্জুন, বেশ কাছাকাছি।
এই ভদ্রলোক কী তোমাকে আমার সমস্যার কথা বলেছেন? হাত তুলে মেজরকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন জিম।
অর্জুন কিছু বলার আগেই মেজর মুখ খুললেন, না বলিনি। তোমার সমস্যার কথা তুমি যেভাবে বলবে আমি তা পারব না।
থ্যাঙ্ক ইউ। অনেক দিন পরে তুমি বিচক্ষণতা দেখালে। কিন্তু অ-র-জুন, তুমি এই নিউ ইয়র্ক শহরটাকে ভাল করে জানো কি?।
একবার এসেছিলাম। কয়েকটা দ্রষ্টব্য জায়গার কথা মনে আছে। অর্জুন বলল।
তা হলে? তোমার পক্ষে এখানে কী করে কাজ করা সম্ভব? জিম মাথা নাড়লেন।
আপনি একটু আগে জেমস বন্ডের কথা বললেন। সমস্যার সমাধান করতে হংকং-এ পা দেওয়ার আগে ওঁর কাছে একটা ছাপানো ম্যাপ ছাড়া কোনও ধারণা ছিল না। আমি তো ম্যানহাটন শহরটা মোটামুটি চিনি। অর্জুন হাসল।
হুম। জিম মেজরের দিকে তাকালেন, এটা ঠিক, বয়স কম বলে বুদ্ধি কম হবে এমন কোনও নিয়ম নেই।
বেটার লেট দ্যান নেভার। বুঝতে পারার জন্যে ধন্যবাদ। মেজর উঠে দাঁড়ালেন, এখন নিশ্চয়ই চা খেতে তোমার আপত্তি হবে না?
বিন্দুমাত্র না। কিন্তু আমার একটা প্রস্তাব আছে। জিম বললেন।
মেজর ঘুরে দাঁড়ালেন। জিম বললেন, চলো, আমরা তিনজন একটা চমৎকার রেস্তরাঁয় বসে ডিনার করে ফেলি।
প্রস্তাবটা যখন তুমি দিচ্ছ তখন বলব, নট এ ব্যাড আইডিয়া। মেজর হাসলেন, চলো হে অর্জুন।
