অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার
দুই
জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে নেমে অন্য যাত্রীদের পিছন পিছন হেঁটে এসে ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়াল অর্জুন। বেশ বড় লাইন। এই সময় অন্য দেশ থেকে যেসব প্লেন এসেছে তাদের যাত্রীরাও লাইনে রয়েছে। প্রায় একঘণ্টা দাঁড়াবার পর সে অফিসারের সামনে পৌঁছে পাসপোর্ট বাড়িয়ে দিল। ভদ্রলোক তার পাতা উলটে ভিসা দেখে একটা যন্ত্রের নীচে রেখে পরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, দ্বিতীয়বার কেন আসা হচ্ছে?
অর্জুন এবার মেজরের চিঠি এগিয়ে দিল, এই ভদ্রলোক খুব অসুস্থ, আমাকে দেখতে চেয়েছেন। আমার টিকিট, ভিসার খরচ উনিই দিয়েছেন।
আপনার পেশা কী?
আমি সত্য-সন্ধান করি।
কোন সত্যের সন্ধান এখানে করবেন?
আমার কাজের জায়গা ভারতবর্ষ। এখানে আমি একজন অসুস্থ মানুষকে দেখতে এসেছি। আপনাদের কলকাতার কনসুলেট এসব কথা জানে।
সত্যি কথা বলার জন্যে ধন্যবাদ। দয়া করে তেমন কোনও পরিস্থিতি হলে নিজে কিছু করবেন না। পুলিশকে খবরটা দিলেই আপনার কর্তব্য শেষ। ছাপ মেরে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিয়ে অফিসার বললেন, আপনার দিনগুলো ভাল কাটুক।
ঘুরন্ত বেল্ট থেকে সুটকেসটা খুঁজতে গলদঘর্ম হল অর্জুন। কয়েকশো সুটকেস পরপর সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে। প্রত্যেকটাকেই তার নিজের বলে মনে হচ্ছিল। দু’বার হাত বাড়িয়েও গুটিয়ে নিয়েছে সে। তৃতীয়বার ঘোরার পর সে লক্ষ স্থির রাখতে পারল। চাকা লাগানো বলে ট্রলির দরকার হল না। কাস্টমের গ্রিন চ্যানেলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে বাইরে বেরিয়ে আসতেই দেখল, প্রচুর মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন পরিচিত যাত্রীর জন্যে। কারও কারও হাতে নাম লেখা প্ল্যাকার্ড। মেজরের পক্ষে নিশ্চয়ই এয়ারপোর্টে তাকে নিতে আসা সম্ভব নয়। ম্যানহাটনে যে ফ্ল্যাটে মেজর থাকতেন সেই জায়গাটা অর্জুনের চেনা। কিন্তু এই সুটকেস নিয়ে যেতে হলে ট্যাক্সি করতে হবে। হয়তো তার পকেটের অর্ধেক ডলার বেরিয়ে যাবে ভাড়া দিতে। কিন্তু মেজর নাকি সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে এসেছেন কুইন্সে। জায়গাটা নাকি এয়ারপোর্ট থেকে বেশি দূরে নয়। ট্যাক্সির ভাড়া নিশ্চয়ই ম্যানহাটনের চেয়ে কম হবে।
আর ইউ অর্জুন?
প্রশ্নটা শুনে তাকাল সে। একটি অল্পবয়সি কালো ছেলে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটির মুখে বেশ মিষ্টি সারল্য রয়েছে। অর্জুন মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়াল ছেলেটি, মাই নেম ইজ মার্টিন। মিস্টার মেজর আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।
হাতে হাত মিলিয়ে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, আপনি আমাকে চিনলেন কী করে?
পকেট থেকে একটা ফোটো বের করল মার্টিন, মিস্টার মেজর এটা আমাকে দিয়েছিলেন। বলেছেন, আপনার মুখ বোধহয় পালটায়নি। এটা তো বেশ কয়েক বছর আগের ফোটো। আপনি যখন এখানে এসেছিলেন। মিস্টার মেজর ভুল বলেননি।
কোনও কোনও মানুষকে প্রথমবার দেখলেই ভাল লেগে যায়। মার্টিনকেও ভারী পছন্দ হল অর্জুনের। মার্টিন বলল, আপনার সুটকেসটা তেমন ভারী নয়, তলায় চাকাও আছে। আপনি যদি খুব টায়ার্ড না হন তা হলে আমরা বাসেই যেতে পারি। ট্যাক্সির ভাড়া বেঁচে যাবে।
বাস কোথায় পাওয়া যাবে?
সুটকেসের স্ট্র্যাপটা অর্জুনের হাত থেকে নিয়ে মার্টিন ওটাকে টেনে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। তখনই একটা বাস সেখানে পৌঁছোতে মার্টিন তাকে ইশারা করে সুটকেস সমেত উপরে উঠে গেল। অর্জুন দেখল, মার্টিন ড্রাইভারকে ভাড়া দিচ্ছে। টিকিট নিয়ে বাসের ভিতরে ঢুকে মার্টিন হাসল। একদম ফাঁকা বাস। মনে হচ্ছে এই বাসটার মালিক আমরা।
পাশে বসে অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কত ভাড়া দিলেন?
যা-ই দিয়ে থাকি, আমার পকেট থেকে দিইনি। মিস্টার মেজর আমাকে আপনার ট্যাক্সি ভাড়াও দিয়েছিলেন। ওঁকে অনেক ডলার ফেরত দিতে পারব।
বাস চলতে শুরু করেছে। অর্জুন জানলার বাইরে তাকাল। প্রথমবারের আসার স্মৃতি এখন মেলাতে পারছে না। এয়ারপোর্ট সাধারণত শহরের বাইরে হয়। অতএব শূন্য মাঠ, চমৎকার রাস্তা ছাড়া দেখার কিছু নেই। আকাশের দিকে তাকাল অর্জুন। জলপাইগুড়ির আকাশের সঙ্গে কোনও পার্থক্য নেই। হঠাৎ মাথায় ভাবনাটা এল। কোথায় ভারতবর্ষ আর কোথায় আমেরিকা। মাঝখানে কয়েকটি সমুদ্র। সূর্য থেকে ছিটকে আসা এই গ্রহ শীতল হয়ে যাওয়ার পর সহস্র বছর লেগেছিল অ্যামিবা থেকে মানুষে পৌঁছোতে। প্রায় কাছাকাছি সময়ে ভারতবর্ষের বনমানুষদের বংশধর যেমন মানুষ হয়েছে তেমনই এই আমেরিকায়ও একই প্রক্রিয়া কাজ করেছে। অথচ আমেরিকা আবিষ্কার করার আগে বাকি পৃথিবীর মানুষ এখানকার কথা জানতই না। আর এখন অতলান্তিক পেরিয়ে চলে আসতে আট ঘণ্টা খরচ হয়। প্রশ্ন হল, বনমানুষ থেকে মানুষ হয়ে ভৌগোলিক পরিমণ্ডল অনুযায়ী চেহারা, আচরণ এবং পরবর্তীকালে নিজস্ব ভাষা তৈরি হলেও এই আলাদা আলাদা দ্বিপদ জীবনের মধ্যে অনেক ব্যাপারে মিল থেকে গেল কী করে?
বাস থেকে নেমে অর্জুনের চোখ জুড়িয়ে গেল। ছবির মতো বাড়ি, রাস্তা। ম্যানহাটনের মতো আকাশছোঁয়া বাড়ি এখানে নেই। চওড়া পরিষ্কার রাস্তায় গাড়ি চলছে খুব কম। মিনিট পাঁচেক হেঁটে একটা তিনতলা বাড়ির সামনে পৌঁছে মার্টিন বলল, এই বাড়িটা মিস্টার মেজরের।
অর্জুন দেখল সুন্দর বাড়ির সামনে ফুটপাতে একটা লম্বা ইউক্যালিপটাস গাছ দাঁড়িয়ে আছে। মার্টিন ডোরবেল বাজাল। কয়েক সেকেন্ড পর স্পিকারে। গলা ভেসে এল, ইয়েস!
মার্টিন বলল, মিস্টার মেজর, উই আর হিয়ার।
বলমাত্র দরজায় শব্দ হল। মার্টিন হাতল ঘোরাতেই সেটা খুলে গেল। অর্জুনের মনে হল এই ব্যাপারটা দেশে চালু করলে খুব ভাল হয়। তা হলে দরজা খোলার জন্যে বারবার উপর-নীচ করতে হয় না।
সুটকেসটা মার্টিনই টেনে তুলল। দোতলার দরজা খুলে দাঁড়িয়ে ছিলেন মেজর। দু’হাত বাড়িয়ে তিনি অর্জুনকে তার বুকে টেনে নিলেন। অর্জুন বুঝতে পারল মেজর আরও মোটা হয়েছেন।
আলিঙ্গনের পর অর্জুনের দু’কাধ ধরে মেজর বললেন, আমি খুব খুশি আমার অনুরোধ রেখেছ বলে। এখন বলো, কেমন আছ?
আমি ভাল আছি। আপনার শরীর কেমন?
সব ছেড়ে বসে আছি, কোনও পিছুটান নেই, যেই ডাক আসবে চলে যাব।
কোথায়?
মেজর হাত তুলে উপরের দিকটা দেখালেন।
অর্জুন হাসল, আপনি কী করে জানলেন উপরেই যাবেন। ওটা নীচে বা পাশেও হতে পারে। অথবা কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, মৃত্যুর পর মানুষের সব অস্তিত্ব মিলিয়ে যায় বাতাসে।
ভাল বলেছ। কিন্তু আর নয়। চলো, তোমাকে তোমার ঘর দেখিয়ে দিই। স্নান করে পেট ভরে খেয়ে নিয়ে একটা লম্বা ঘুম দাও। অনেকটা পথ এসেছ, জেট ল্যাগ হয়ে গেলে কষ্ট পাবে। মেজর ওর হাত ধরে ওপাশের যে ঘরে নিয়ে গেলেন সেটি চমৎকার সাজানো। মেজর বললেন, দ্যাখো, পছন্দ হয়েছে?
চমৎকার। এই বাড়িটা কবে কিনেছেন?
বছরখানেক হল। ম্যানহাটনের আকাশছোঁয়া বাড়ির ফ্ল্যাটে থেকে হাঁপিয়ে উঠছিলাম। মাটিতে হাটাহাটি করা ওখানে সম্ভব নয়। ম্যানহাটনে জীবন চব্বিশ ঘণ্টা এত জোরে ছোটে যে, তার সঙ্গে তাল রাখার বয়স আমার চলে গিয়েছে। তাই চলে এলাম এখানে। ওই দ্যাখো, ওটা একটা চাপাগাছ। আমাদের দেশের চাপা নয়, চাপার মতো দেখতে বলে আমি নাম দিয়েছি চাপাগাছ। তার পাশে দেবদারু। এই দুটো গাছে থাকতে খুব ভালবাসে কাঠবিড়ালিরা। এর মধ্যেই ওরা আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছে। রোজ ভোরে আর বিকেলবেলায় ওদের চিনেবাদাম খাওয়াতে হয়। আর এই পাড়াটা দ্যাখো। একদম ছবির মতো, কোনও বাড়িই চারতলা নয়। মেজরকে খুব তৃপ্ত দেখাচ্ছিল।
এই সময় মার্টিন কাছে এল। হেসে বলল, আপনি বলছিলেন অর্জুন খুব টায়ার্ড?
ও হো! নিশ্চয়ই। যাও অর্জুন, চেঞ্জ করে একটা শাওয়ার নিয়ে নাও। তারপর কিছু খেয়ে লম্বা ঘুম দাও। পরে গল্প করব। অর্জুনের পিঠ চাপড়ালেন মেজর।
স্নান সেরে পোশাক বদলাতে বদলাতে অর্জুনের মনে হল, মেজরের স্বভাবের অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আগের মতো কথায় কথায় রেগে যাওয়া, সেই ডোন্ট কেয়ার ভাবটা একদম নেই। পাকা দাড়ি, টাক পড়ে যাওয়া মাথায় এখন ওঁকে বেশ স্নেহশীল দাদু ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যায় না।
