অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার
বারো
নিউ ইয়র্কের পাতালরেলের প্রতিটি কামরায় বেশ বড় আকারের ম্যাপ টাঙানো থাকে। প্রতিটি কামরার ভিতরে লাউডস্পিকার থাকায় কোন স্টেশন আসছে তা স্পষ্ট শোনা যায়। স্টেশনের নাম শুনে ম্যাপ দেখলেই বোঝা যায়, যেখানে নামতে হবে সেই স্টেশন কত দূরে। ট্রেনে উঠে অর্জুন ম্যাপ খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছিল। অনেকটা সময়। নিশ্চিন্তে বসে থাকা যায়। আজ সেই গানের দল কামরায় নেই। অর্জুনের পাশে বসে একটি কালো ছেলে বই পড়ছে। ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে গল্পে ডুবে গিয়েছে সে। ট্রেন ছুটছে। উপরের পৃথিবীতে কত কী হয়তো ঘটে যাচ্ছে এই মুহূর্তে, পাতালে বসে তার বিন্দুবিসর্গ টের পাওয়া যাচ্ছে না।
কীভাবে টম ব্রাউনের সঙ্গে দেখা করবে, কী কথা বলে তাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবে সে? অর্জুন মাথা নাড়ল। এসব নিয়ে আগে থেকে ভেবে কোনও লাভ নেই। কোনও পরিকল্পনাই কাজে লাগবে না। কারণ, সে ওখানে দ্বিতীয়বার যাচ্ছে।
.
স্টেশন থেকে বেরিয়ে গত দিনের চেনা পথ ধরে সে হাঁটতে লাগল। চারটে ছেলে মোটরবাইকে চেপে চিৎকার করতে করতে চলে গেল। তাদের ওইভাবে চলে যেতে দেখেও অন্য পথচারীদের ভাবভঙ্গির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হল না।
ডি সিলভার কাছে আজ স্বচ্ছন্দে পৌঁছে গেল অর্জুন। লোকটি চোখ ছোট করতেই অর্জুন বলল, আমি জো-এর কুরিয়ারে কাজ করছি।
এবার হাসি ফুটল মুখে। ডি সিলভা জিজ্ঞেস করল, আজও কি কার্ভালোর জন্যে এসেছেন? ওর উচিত হচ্ছে না জো-এর কুরিয়ার ব্যবহার করা।
অর্জুন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে দেখে ডি সিলভা তাকে বসতে বলে জিজ্ঞেস করল, আপনার দেশ যেন কোথায়? কী যেন বলেছিলেন, ইন্ডিয়া?
হ্যাঁ ইন্ডিয়া।
দেশটা কোথায়? আফ্রিকায়?
না। এশিয়ায়।
ছেলেবেলায় ভাবতাম সারা পৃথিবীটা ঘুরে দেখব। তা আর হল না। তা আপনাকে এমন নাম কে দিল? অ-র! হা হা হা।
অর্জুন হাসল, কথা বলল না।
আসুন, বাইরে যাই। দেখি কাউকে পাই কিনা! ডি সিলভা বাইরে পা বাড়ালে অর্জুন তাকে অনুসরণ করল।
বাইরে বেরিয়ে অর্জুন অবাক। একটু আগে জমজমাট দেখেছিল রাস্তাটা। এখন একদম ফঁকা। কোনও লোক নেই ফুটপাতে। তখনই তিনটে পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়াল সামনে। ড্রাইভিং সিটে বসে একজন অফিসার চেঁচিয়ে বললেন, এটা হচ্ছে কী? তোমার ছেলেরা আমাদের কি একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না।
আমার তো কোনও ছেলে নেই অফিসার? ডি সিলভা হাসল।
আঃ। রসিকতা ছাড়ো। হু ইজ বেন?
বেন? তোমার এলাকায় থাকে। কয়েকদিন আগে সে লং আইল্যান্ডে গিয়ে একজন মহিলাকে ছুরি মেরেছিল ডলারের জন্যে। তুমি জানো না?
ঈশ্বরের দিব্যি, আমি জানি না।
আমরা প্রথমে শুনেছিলাম, মহিলার ছেলের কাণ্ড ওটা। দু’-দু’বার খুব অল্পের জন্যে ওকে ধরতে পারিনি। এখন খবর এসেছে ছেলে নয়। ওই বেনের কাণ্ড এটা। তোমরা এখানে যা করছ তা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। কিন্তু এখান থেকে লং আইল্যান্ড অনেক দূর, তাই না?
নিশ্চয়ই।
ছেলেটিকে আমাদের হাতে তুলে দাও।
আমি দেখছি। তবে ও বোধহয় এখানে নেই।
ডি সিলভা, ইউ নো মি, আমার সঙ্গে চালাকির চেষ্টা কোরো না।
কোনও প্রশ্নই ওঠে না অফিসার। ডি সিলভা বলামাত্র পুলিশের গাড়িগুলো একটু এগিয়ে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আই ডোন্ট লাইক ট্রাবল। কিন্তু এই ছেলেগুলো সেটাই ইনভাইট করছে। অ-র, ইউ কাম উইথ মি, কাজ শেষ করে তাড়াতাড়ি এখান থেকে বেরিয়ে যান। ডি সিলভা আবার ভিতরে ঢুকে পড়ল। যে ঘরে বেন জো-কে নিয়ে গিয়েছিল সেই ঘরে এসে একটা দরজা খুলল ডি সিলভা। দরজার বাইরে একটা চাতাল। সেখানে নানান রকমের বাতিল বাক্স তূপ করে রাখা আছে। বাক্স সরিয়ে ম্যানহোলের ঢাকনা খুলল ডি সিলভা, আমার পিছন পিছন চলে আসুন।
কুয়োর মতো একটা সুড়ঙ্গ। তার একটা দিকে আংটা লাগানো। ডি সিলভার মতো সেখানে পা রেখে রেখে নীচে নামতেই চোখের সামনে জমাট অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখতে পেল না অর্জুন। ডি সিলভার গলা কানে এল, আমার হাত ধরুন।
হাতড়ে হাতড়ে হাতের নাগাল পেল অর্জুন। অন্ধকারে একটা স্যাঁতসেঁতে প্যাসেজ দিয়ে ডি সিলভার হাত ধরে হাঁটতে হল কিছুক্ষণ। ধীরে ধীরে অন্ধকার পাতলা হয়ে এল। ওরা বেরিয়ে এল ছাইছাই রঙা আলোমাখা একটা রাস্তায়। মাথার অনেক উপরে ছাদ। পায়ের তলায় সিমেন্টের বদলে শুধুই মাটি। এই সুড়ঙ্গ ঠিক পাতালরেল যাওয়ার মতো চওড়া।
খানিকটা হাঁটার পর চিৎকার শোনা গেল। বাঁক ঘুরতেই অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল অর্জুন। সুড়ঙ্গের দু’পাশে যেন সংসার পেতে বসে আছে লোকজন। খাঁটিয়া থেকে আরম্ভ করে রান্নার গ্যাস, কী নেই! বীভৎস চেহারার পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাও আছে। তাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে, সভ্যতার ধার ধারে না। চিৎকার করছে যে ছেলেটি তার হাতে একটা রিভলভার। তাকে ঘিরে যারা দাঁড়িয়ে তারা যেন বেশ মজা পেয়েছে। অর্জুন লক্ষ করল, পুরুষদের বেশিরভাগই দাড়িওয়ালা। ডি সিলভাকে দেখে ছেলেটি চিৎকার করতে করতে অদ্ভুত উচ্চারণে কিছু বলতে যেতেই সপাটে চড় খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল। ওর হাত থেকে রিভলভার কেড়ে নিয়ে ডি সিলভা বলল, এখানে যে অশান্তি করবে তার জিভ উপড়ে ফেলা হবে।
ছেলেটি কেঁদে ফেলল, আমার আড়াইশো ডলার চুরি হয়ে গিয়েছে।
ঠিক করে রাখিসনি কেন?
আমি ঘুমোচ্ছিলাম। এরা সবাই দেখেছে, কিন্তু কেউ বলছে না।
ছেলেটি কথাগুলো বলামাত্র লোকগুলো যেন কিছুই শোনেনি এমন ভঙ্গি করে যে-যার জায়গায় চলে গেল। রিভলভার থেকে গুলি বের করে পকেটে রেখে যন্ত্রটা ফেরত দিয়ে ডি সিলভা জিজ্ঞেস করল, কাকে সন্দেহ করছিস?
ছেলেটি কঁধ নাচাল।
অর্জুন বুঝতে পারছিল মাটির নীচে এই সুড়ঙ্গে ডি সিলভার কথার উপর কেউ কথা বলে না। অর্থাৎ উপরের তিনটি ব্লকের মধ্যে ওর কর্তৃত্ব। অন্য ব্লকগুলোয় নিশ্চয়ই ওর মতো অনেক ডন আছে। দেখলে মনে হবে, রাস্তার দু’পাশের ফুটপাতে ভিখিরিরা বাসা বেঁধেছে। কিন্তু সেখানে এত দামি টিভি চলছে যা অর্জুন কখনও দ্যাখেনি। খানিকটা যাওয়ার পর একটা লোক এগিয়ে এল, কী ব্যাপার? তুমি হঠাৎ?
বাধ্য হয়ে আসতে হল। বেন কোথায়? ডি সিলভা জিজ্ঞেস করল।
কোথাও লুকিয়ে আছে। টম ওকে খুন করবে বলে খুঁজে বেড়াচ্ছে। বেচারা বেন পুলিশের ভয়ে উপরেও যেতে পারছে না।
ডি সিলভা ওদের পরিচয় করিয়ে দিল, তোমার প্যাকেট এসেছে। ও জো-এর কর্মচারী। নিয়ে যাও।
সই করে প্যাকেট নিল কার্ভালো। এক টানে মুখ ছিঁড়ে ভিতর থেকে পলিথিনে মোড়া আর-একটা প্যাকেট বের করে পকেটে ঢোকাল।
আমার মনে হয় জো-এর কুরিয়ার এবার ছেড়ে দাও। পুলিশ নিশ্চয়ই নজর রাখছে। নেক্সট টাইম জো ধরা পড়ে যেতে পারে। ডি সিলভা বলল।
হ্যাঁ। আমিও ভাবছিলাম ওকে কিছুদিন ব্যবহার করব না।
টম কোথায়?
বাড়াবাড়ি করছে। আটকে রেখেছি।
চলো, দেখি।
নিঃশব্দে অর্জুন ওদের অনুসরণ করল। সুড়ঙ্গ থেকে আর-একটা সুড়ঙ্গ। তার দরজা বন্ধ। কার্ভালো সেটা খুলতেই টম ব্রাউন দৌড়ে এসে চিৎকার করল, আমাকে আটকে রেখেছ কেন? বেনকে আমি খুন করবই।
শান্ত গলায় ডি সিলভা জিজ্ঞেস করল, কেন?
ও আমার সঙ্গে বন্ধু হিসেবে মিশে সব কথা জেনেছিল। আমি বিশ্বাস করে সব বলেছিলাম। ও বলেছিল, আমার বাবাকে একটু শাসিয়ে দেবে। বাবাকে আমি পছন্দ করি না। কিন্তু ও আমার মায়ের কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে ছুরি মেরেছে। আই লাভ মাই মাদার। শুধু তাই নয়, হাসপাতালে ও জনকে নিয়ে গিয়েছিল জবানবন্দি দেওয়ার আগে কী করে মাকে খুন করা যায় তার প্ল্যান করতে। টম চিৎকার করে বলল।
ডি সিলভা কাভালোকে বলল, তোমার সঙ্গে একটু আলাদা কথা বলব।
নিশ্চয়ই, চলো।
অ-র, আপনি একটু এখানে অপেক্ষা করুন।
ডি সিলভাকে নিয়ে কার্ভালো চোখের আড়ালে চলে যাওয়ামাত্র অর্জুন বলল, হাই টম!
হু আর ইউ!
আমি তোমার ভাল চাই। তোমার ঠাকুরমা খুব অসুস্থ।
আমার ঠাকুরমাকে তুমি চিনলে কী করে?
প্রশ্ন কোরো না। তোমাকে দেখতে না পেলে তিনি মারা যাবেন। প্লিজ, তুমি গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করে এসো। অর্জুন বলল।
অসম্ভব। উপরে উঠলেই পুলিশ আমাকে ধরবে।
না। তোমার মা পুলিশকে বলেছেন বেন তাঁকে খুন করতে গিয়েছিল।
তুমি ঠিক বলছ? চোখ ছোট করল টম।
মিথ্যে বলছি না। তুমি বেনকে খুন করলে পুলিশ তোমাকে ছেড়ে দেবে না। কাজটা পুলিশকেই করতে দাও।
কিন্তু আমার বাবা?
মিস্টার ব্রাউন এখন খুব দুঃখিত। তিনিও চান তুমি ফিরে যাও।
কিন্তু এসব তুমি জানলে কী করে?
আমি মিস্টার মেজরের বাড়িতে আছি। তিনি তোমার বাবার বন্ধু।
মিস্টার মেজর? দ্যাট ফ্যাটি ইন্ডিয়ান উইথ অ্যালকোহল?
হ্যাঁ। তবে তিনি এখন ওসব ছেড়ে দিয়েছেন। আর হ্যাঁ, এসব কথা যেন কাউকে বোলো না। তা হলে আমি বিপদে পড়ব।
কার্ভালো এবং ডি সিলভা ফিরে আসছে দেখে অর্জুন মুখ বন্ধ করল। ডি সিলভা বলল, লুক টম, বেন অন্যায় করেছে। তার শাস্তি পুলিশ বা তুমি দিতে পারো না। ওটা আমরাই দেব। কথাটা ভুলে গেলে বিপদে পড়বে। তোমাকে ওখানে আটক থাকতে হবে না। ওয়েল অ-র, লেটস গো ব্যাক।
যে পথ দিয়ে ওরা সুড়ঙ্গে ঢুকেছিল সেই পথ দিয়ে উপরে উঠে এল। ডি সিলভা বলল, জো-কে বলবেন যদি এখানকার কারও নামে কোনও পার্সেল আসে তা হলে আমাকে ফোন করতে। আপনাদের আর এখানে আসা ঠিক হবে না।
