অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার

শেয়ার করুনঃ

এগার

বাড়িতে এসে অর্জুন দেখল, মেজর খুব যত্ন করে কাঠবিড়ালিটাকে খাওয়াচ্ছেন। সে হেসে বলল, আপনি জীবন থেকে ছুটি নিয়ে বসে আছেন। আর দেখুন, বিড়ালের পঁাত ঘাড়ে বসে যাওয়া সত্ত্বেও ও জীবনে ফেরার জন্যে ব্যস্ত।

 

প্রসঙ্গে না গিয়ে মেজর জিজ্ঞেস করলেন, রাতে কী খাবে?

 

আপনি তো সারাদিন খাননি। আপনার মেনু?

 

আমি সাত্ত্বিক আহার করব। ফ্যানভাত, মাখন, আলুসেদ্ধ।

 

ফাটাফাটি।

 

মানে? মেজর অবাক।

 

ওটাই আমার সবচেয়ে প্রিয় খাবার। অর্জুন নিজের ঘরে চলে গেল।

 

.

 

আজ একটু দেরিতে ঘুম ভাঙল অর্জুনের। তৈরি হয়ে ডাইনিং রুমে এসে দেখল, মেজর কারও সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলছেন। সে কিচেনে ঢুকে চা বানাতে গিয়ে দেখল, গ্যাসে জল ফুটছে। মার্টিন এসে দাঁড়াল দরজায়, লেট মি ডু দ্যাট।

 

এদেশে চা তৈরি করতে কোনও ঝামেলাই নেই। গরম জলে টি-ব্যাগ ফেলে দিয়ে নাড়াচাড়া করলেই লিকার তৈরি হয়ে যাবে। তারপর ইচ্ছেমতো দুধ-চিনি মিশিয়ে দিলেই চা হয়ে গেল। তবু মার্টিনকে দায়িত্ব দিয়ে অর্জুন ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল। প্রথমেই তার মনে হল, সামনের পৃথিবীটা আজ অন্যরকম। একটাও কাঠবিড়ালি চোখে পড়ছে না। তাদের দৌড়োদৌড়ি, চেঁচামেচি আজ নেই। গাছটাও যেন থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কী হল ওদের?

 

ফোন রেখে মেজর পাশে এসে দাঁড়ালেন, জিমের মাকে আজ হাসপাতালে ভরতি করা হবে। বেচারা জিম!

 

মার্টিন এসে দু’জনকে চা দিয়ে গেল।

 

অর্জুন জিজ্ঞেস করল, কাঠবিড়ালিদের কী হয়েছে?

 

সকাল থেকেই দেখছি না। এই জায়গাটা বোধহয় ওদের আর পছন্দসই নয়। মেজর চায়ে চুমুক দিলেন, তোমার প্ল্যান কী?

 

ব্রঙ্কসের রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে হাঁটাচলা করা যায়, কিন্তু কোনও সোর্স ছাড়া মাটির নীচে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। মিস্টার ব্রাউনের ছেলের নাম কী?

 

টম। ভাল নাম আমি জানি না।

 

আমি একটু ঘুরে আসি।

 

কোথায় যাচ্ছ?

 

কাছেই। একটা লোকের কথা আপনাকে বলেছিলাম, জো। ওর দোকানে যাচ্ছি।

 

.

 

জো অর্জুনকে দেখে হাসল, আপনার কপাল ভাল না খারাপ তা জানি না।

 

কেন?

 

সেদিন কার্ভালোর দেওয়া এনভেলাপ টেক্সাসে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। আজ ভোরে সেখান থেকে আর-একটা প্যাকেট এসেছে, যেটা ওকে দিতে হবে।

 

অর্জুন হাসল, বাঃ। ভাল খবর। তা হলে কপাল খারাপ বলছেন কেন?

 

জায়গাটার নাম ব্রঙ্কস। তাই!

 

আপনি কখন যাচ্ছেন?

 

এখন প্রচুর কাজ। দুপুরে যাব। এবং এই শেষবার। কার্ভালোকে বলে দেব, আর আমার পক্ষে ব্রঙ্কসে যাওয়া সম্ভব নয়। জো বলল।

 

একটু ইতস্তত করে অর্জুন বলল, একটা অনুরোধ করতে পারি?

 

জো তাকাল।

 

অর্জুন বলল, ব্রঙ্কসে গিয়ে ডি সিলভার কাছে পৌঁছেলে তো কার্ভালোর হদিশ পাওয়া যাবে। যদি আমি প্যাকেটটা এখন পৌঁছে দিই!

 

আপনি? জো হতভম্ব।

 

আমি পারব।

 

আপনি খুন হয়ে যেতে পারেন! জো মাথা নাড়ল।

 

সেটা আপনি গেলেও হতে পারে।

 

একটু ভাবল জো, প্যাকেটে কী আছে তা আমি জানি না। যদি নিষিদ্ধ কিছু থাকে তা হলে পথে পুলিশ আপনাকে ধরলে বিপদে পড়বেন।

 

নিষিদ্ধ কিছু মানে?

 

ড্রাগ থেকে শুরু করে মাদক। অথবা ডলারও থাকতে পারে।

 

কত বড় প্যাকেট?

 

আড়াইশো গ্রাম ওজন। বেশি বড় নয়।

 

আমি ঝুঁকি নিচ্ছি।

 

জো-কে রাজি করাতে কিছুটা সময় খরচ হল। চৌকো ব্রাউন পেপারের একটা বড় খাম দিল জো। খামের উপর একটা নাম্বার আর জো-এর দোকানের ঠিকানা লেখা। অর্থাৎ যার জন্যে ওটা এসেছে তার কোনও নামধামের বিবরণ খামের উপর নেই। অর্জুন জিজ্ঞেস করল, এটা যে কার্ভালোর তা বুঝলেন কী করে?

 

জো হাসল, ওই নাম্বার কাভালোর।

 

অর্জুন একটু ভাবল। নাম-ঠিকানা নেই এমন একটা প্যাকেট মানে রহস্যজনক ব্যাপার, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু কোনও প্রমাণ যখন নেই তখন শুধু সন্দেহের কারণে টম ব্রাউনের কাছে পৌঁছোবার সুযোগটা হাতছাড়া করা ঠিক হবে না।

 

জো ছাড়ল না। অর্জুনকে যাতায়াতের ভাড়া নিতে বাধ্য করল। সেইসঙ্গে কার্ভালোকে দিয়ে সই করিয়ে আনার রসিদও দিয়ে দিল।

 

বেরোবার সময় অর্জুন হেসে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, আপনি আমাকে বিশ্বাস করে এই দায়িত্ব দিচ্ছেন, আমি তো ব্রঙ্কসে না গিয়ে এটার ভিতরে কোনও দামি জিনিস থাকলে নিয়ে হাওয়া হয়ে যেতে পারি?

 

জো হাসল। দু’বার মাথা নাড়ল। মুখে কিছু বলল না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *