অর্জুন এবার নিউইয়র্কে – সমরেশ মজুমদার
দশ
বিকেলবেলা ডাইনিংরুমে ঢুকে অবাক হয়ে গেল অর্জুন। কাঠবিড়ালিটা উঠে দাঁড়িয়েছে। শুধু তাই নয়, একটু একটু হাঁটার চেষ্টা করছে। অর্জুন কাছে যেতে সে ঘুরে দৌড়োবার চেষ্টা করতেই পড়ে গেল চিত হয়ে। অর্জুন ওকে তুলে নিল হাতে। তারপর চারপাশে তাকিয়ে একটা পিচবোর্ডের বাক্সে কাঠবিড়ালিকে ছেড়ে দিল। এর মধ্যে ঘুরুক ও।
মেজর বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। মার্টিন তার কাজে বেরিয়ে গিয়েছে। দরজার চাবি নিয়ে ওটাকে বন্ধ করে রাস্তায় নামল অর্জুন। কালকের রাস্তায় হেঁটে কফির দোকানে পৌঁছে সে দেখল, কয়েকটি অচেনা মুখ রয়েছে। অতএব জো-এর অফিসে এল অর্জুন। কম্পিউটারের সামনে বসে একমনে কাজ করছে জো। অর্জুন গিয়ে দাঁড়াতে জো মুখ ফেরাল, হাই!
হাই বলতে গিয়েও হ্যালো, বলল অর্জুন।
জাস্ট এ মিনিট, কাজ করতে করতে জো বলল।
মিনিট চারেক পর জো উঠে এল, লে গো ফর কফি।
দোকান খোলা রেখেই জো বেরিয়ে এল।
কফি খেতে খেতে জো জিজ্ঞেস করল, কাল কীরকম অভিজ্ঞতা হল?
দারুণ। সুযোগ পেলে আবার যেতে চাই। অর্জুন বলল।
আপনার মতলবটা কী বলুন তো?
মতলব?
ওসব জায়গায় যেতে বললে লোকের বুক হিম হয়ে যায়, আর আপনি আবার যেতে চাইছেন! ব্যাপারটা কী খুলে বলুন!
অর্জুন হাত তুলল, কাল এখানে কফি খেতে আসার আগে আমি কি আপনাকে চিনতাম? না। আপনি কী ব্যাবসা করেন তা কি জানতাম? না। আপনাকে যে ব্রঙ্কসে পার্সেল ডেলিভারি দিতে যেতে হবে সেটাও জানা ছিল? না। আমার যদি ওখানে যাওয়ার পিছনে কোনও মতলব থাকত তা হলে আমি কেন এখানে আসব? অন্য কোনওভাবে চেষ্টা করতাম। তাই না?
মাথা নাড়ল জো, তা অবশ্যই ঠিক। কিন্তু যেখানে গেলে প্রাণ হাতে নিয়ে চলতে হয় সেখানে আপনি যেতে চাইছেন কেন?
একজন অসুস্থ বৃদ্ধা এবং তার প্রৌঢ়া পুত্রবধূ যিনি সম্প্রতি ছুরিতে আহত হয়েছেন, তাদের অনুরোধ রাখতে আমার যাওয়া উচিত।
জো মাথা নাড়ল, আমি কিছুই বুঝলাম না।
ওই দু’জনের নাতি এবং ছেলে ব্রঙ্কসে আছে। তাকে অনুরোধ করতে হবে যাতে সে বাড়িতে ফিরে যায়। অর্জুন বলল।
আপনি একটি উন্মাদ। জো চেঁচিয়ে উঠল।
কী জন্যে মনে হচ্ছে?
ওখানে যারা স্বেচ্ছায় যায়, ওই জীবনে যারা অভ্যস্ত হয়ে থাকে, তারা কখনওই স্বাভাবিক ভদ্রজীবনে ফিরে আসবে না। জীবন নিয়ে জুয়ো খেলে ওরা। ছিনতাই, মস্তানি, খেলার ছলে কাউকে মেরে ফেলতে যে যত পারদর্শী হবে, তার ব্যাঙ্ক তত উপরে উঠবে। ছোট নেতা থেকে বড় নেতা হওয়ার রাস্তায় ওরা চেষ্টা করে আরও নির্মম হতে। এই নেশা থেকে আপনি সরাতে চাইলে আপনাকে ছাই করে দেবে ওরা। জো মাথা নাড়তে লাগল।
অর্জুন চুপ করে থাকল। সেটা দেখে জো জিজ্ঞেস করল, হাউ মাচ দে আর পেয়িং ইউ? কত ডলার দেবে?
যা দিতে চেয়েছিল তা আমি রিফিউজ করেছি। অর্জুন বলল।
তার মানে? আপনি যদিও কাজটা পারবেন না, তবু প্রফেশনাল ফি নেবেন না?
না। আমি এই দেশে এসেছি টুরিস্ট হিসেবে। প্রফেশনাল ফি নিতে পারি না।
অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জো বলল, আপনি তো ইন্ডিয়ার মানুষ?
হ্যাঁ। ইন্ডিয়ার সব মানুষ কি আপনার মতো?
হেসে ফেলল অর্জুন, সেখানে চোর, বদমাশ থেকে মাফিয়া ডন, কোনও কিছুর অভাব নেই। যাক গে, আপনি আমাকে আর-একবার ওখানে যেতে সাহায্য করবেন?
ছেলেটিকে আপনি খুঁজে বের করবেন কী করে?
ডি সিলভা ওকে চেনেন।
মাই গড! আপনি জানলেন কী করে?
আপনারা যখন কার্ভালোর কাছে গিয়েছিলেন তখন সে ডি সিলভার কাছে এসেছিল। যদিও আমার সঙ্গে কথা হয়নি।
আপনি কী করে বুঝলেন সেই ছেলেটি!
জো-কে থামিয়ে দিল অর্জুন, কথাবার্তা শুনে বুঝেছি।
জো কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, আমি একটু ভেবে দেখি। একটা রাস্তা পেলে কাল আপনাকে জানাব। বাড়িটা তো আমি দেখে এসেছি।
