আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(৮)

আমাদের তিনজনকে নিয়ে আজ এখানে শুধু আমন্ত্রিতের সংখ্যাই আট। তার উপরে সেন-দম্পতিও আছেন। উপরন্তু ডাইনিং হলে ঢুকে অল্পবয়সি একটি তরুণীকেও দেখলুম, যাঁর সঙ্গে এখনও আমার পরিচয় হয়নি। মিসেস সেনই পরিচয় করিয়ে দিলেন। “এ হল শান্তা, আমার পিসতুতো বোন, হালে ল পাশ করেছে। ওর বাবা…আই মিন আমার পিসেমশাই তো মস্ত বড় অ্যাডভোকেট। তাঁরই মতো হবে আর কি।…ছুটি কাটাতে আমার কাছে এসেছিল।”

 

এটাও জানা গেল যে, বিজয়া সম্মিলনীর ফাংশান দেখে লক্ষ্মীপুজোর পরদিনই অর্থাৎ আগামী কাল সে কলকাতায় ফিরবে বলে ঠিক ছিল বটে, তবে ফাংশানের তারিখ যেহেতু পিছিয়ে গেছে, তাই বারোই অক্টোবরের আগে আর তার ফেরা হচ্ছে না। মিসেস সেন আর একটা কথাও সেইসঙ্গে যোগ করলেন। “শুধু যে কালো জোব্বা পরে কোর্টে গিয়ে সওয়াল-জবাব করে তা ভাববেন না, শান্তা কিন্তু গানও গায় চমৎকার। বাণী ঠাকুরের কাছে গান শিখেছে।”

 

এত লোককে একই সঙ্গে বসিয়ে খাওয়ানো সম্ভব নয় বলেই বোধ হয় ডাইনিং টেবিলের চারধার থেকে চেয়ারগুলিকে অন্য কোথাও সরিয়ে রেখে টেবিলটাকে দেওয়ালের দিকে ঠেলে দিয়ে বুফের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সদানন্দবাবুর এতে অসুবিধে হতে পারে ভেবে চাপা গলায় তাঁকে বললুম, “যা-যা খাবেন প্লেটে তুলে নিয়ে বরং আমার সঙ্গে ড্রয়িং রুমে চলে আসুন।”

 

“কেন?”

 

“হাতে প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে খেতে অসুবিধে হবে না? ড্রয়িংরুমে গেলে অন্তত বসতে পারবেন।”

 

ভদ্রলোক তাতে ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনার যদি অসুবিদে হয় তো আপনি যান। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না, আমার অব্যেস আচে।”

 

চাপা গলায় বললুম, “আরে মশাই, আমি আপনার ভালর জন্যেই বলছিলুম, তাতে এত চটে যাচ্ছেন কেন?”

 

“চটে যাবার মতো কতা বললে চটে না-গিয়ে কি দু’ হাত তুলে নেত্য করব?” চাপা গলায় যতটা সম্ভব ততটাই গর্জন করে সদানন্দবাবু বললেন, “আমাদের কোম্পানির বড় সায়েব যখন রিটায়ার করেন, তখন তাঁর বাড়ির বাগানে ঠিক এইভাবেই আমাদের হোল স্টাফকে ডিনার খাইয়েছিলেন। আমাকে এ-সব শেকাতে হবে না।”

 

এর পরে আর কী বলা যায়? কথা না বাড়িয়ে, প্লেটে অল্প-কিছু খাবার ও একটা কাঁটা তুলে নিয়ে চুপচাপ এক পাশে সরে দাঁড়ালুম। তারপর সেখান থেকেই দেখতে লাগলুম যে, হাতে প্লেট নিয়ে সবাই ছোট-ছোট দলে ভাগ হয়ে যাচ্ছেন। সদানন্দবাবু কথা বলছেন সুলেখা ঘোষ অর্থাৎ ডাক্তার-গিন্নির সঙ্গে, ভাদুড়িমশাই কথা বলছেন মিসেস আশা মালহোত্রার সঙ্গে, শান্তা কথা বলছে সুবীর নন্দীর সঙ্গে, ডঃ ঘোষ কথা বলছেন মিঃ সেনের সঙ্গে। মিসেস সেনকেও দেখতে পাচ্ছি। নিজের প্লেটে যৎসামান্য খাবার তিনিও নিয়েছেন বটে, কিন্তু খাচ্ছেন না, ভদ্রমহিলা আসলে ঘুরে-ঘুরে সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন যে, কারও কিছু লাগবে কি না।

 

একমাত্র সঞ্জীব মালহোত্রাই কারও সঙ্গে কোনও কথা বলছেন না। খাবারের প্লেটটাকে দেওয়ালের ধারে বুক-সমান উঁচু একটা সাইডবোর্ডের উপরে নামিয়ে রেখে, চুপচাপ তখনও তিনি তাঁর হাতের গেলাশে চুমুক মেরে যাচ্ছেন। এটা তাঁর চার নম্বর গেলাশ। কিংবা পাঁচ-নম্বরও হতে পারে। প্লেট ভর্তি করে খাবার নিয়েছেন ভদ্রলোক, কিন্তু আপাতত মনে হয় খাদ্যের চেয়ে পানীয়ে তাঁর মনোযোগ অনেক বেশি।

 

দেখতে-দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম, ভাবছিলুম যে, আজ সকালেই এখানে একটা খুন হয়ে গেছে, যিনি খুন হয়েছেন তিনি যে এঁদের অচেনা তাও নয়। এঁদেরই সঙ্গে তাঁর একই নাটকে অভিনয় করার কথা ছিল, দিনের পর দিন হয়তো তাঁর সঙ্গে একই ঘরে বসে নাটক নিয়ে কথা বলেছেন এঁরা, রিহার্সালও দিয়েছেন একই সঙ্গে। অথচ, তাঁর মৃত্যুতে এঁরা এতটুকুও বিচলিত নন, কোনও শোকের ছায়াই এঁদের কারও মুখে দেখতে পাচ্ছি না। পটভূমিকা একটা ভয়াবহ মৃত্যুর, তবু তারই মধ্যে দিব্যি জমে গেছে এঁদের ডিনার পার্টি।

 

মিসেস সেনের কথায় আমার চমক ভাঙল। “আরে, আপনি দেখছি কিছুই খাচ্ছেন না, রান্না নিশ্চয়ই খুব খারাপ হয়েছে?”

 

ভদ্রমহিলা যে কখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, বুঝতেই পারিনি। হেসে বললুম, “না না, খারাপ হবে কেন, ও কথা ওঠেই না, একটু আগেই তো আপনার রান্নার দারুণ প্রশংসা শুনলুম।”

 

“মিঃ মালহোত্রার কাছে নিশ্চয়ই?”

 

“কী করে বুঝলেন?

 

“বুঝবার জন্যে কি আর গোয়েন্দা হবার দরকার হয়?” মিসেস সেন ঠোঁট টিপে হাসলেন। “অথচ প্রশংসাটা যার কাছে শুনেছেন, তার অবস্থা দেখুন। চুপচাপ হুইস্কি টেনে যাচ্ছে, খাবারের দিকে নজরই নেই।”

 

হেসে বললুম, “খিদে বাড়িয়ে নিচ্ছেন।”

 

বন্দনা সেন হাসলেন না। গলা নামিয়ে বললেন, “লোকটার জন্যে দুঃখ হয়।”

 

“কেন?”

 

“বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর বউয়ের সঙ্গেই তো আপনি কথা বলছিলেন এতক্ষণ, তাই না?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“তাও কিছু টের পাননি?”

 

আলোচনা যে একটা বিপজ্জক মোড় নিতে চলেছে, এটা বুঝতে পেরে একটু অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেছিলুম। প্রশ্নটাকে এড়িয়ে গিয়ে বললুম, “ও-কথায় পরে আসছি, তার আগে বরং আপনাদের কথা শোনা যাক। ছেলেপুলেরা কোথায়, তাদের দেখছি না তো?”

 

“ছেলেপুলে নয়,” মিসেস সেন হেসে বললেন, “সিঙ্গুলার নাম্বার। একটিমাত্র ছেলে। কিন্তু তাকেই বা দেখবেন কী করে, সে তো বাইরে থাকে।”

 

“বাইরে মানে কোথায়?”

 

“আপনি কখনও ড্যালহৌসিতে গিয়েছেন?”

 

“গত বছর গিয়েছিলুম। তার আগে কখনও যাইনি।”

 

“শান্তনু ওখানকার একটা কনভেন্ট স্কুলে পড়ে।”

 

“পুজোর ছুটিতে আসেনি?”

 

“পুজোর ছুটি তো মাত্র কয়েকটা দিনের, আসতে-যেতে ছুটি ফুরিয়ে যায়। তাও আসতে চেয়েছিল, কিন্তু আমরাই না করে দিলুম। ফোন করে ওদের হাউস-মাস্টারকে বললুম যে, সামনেই যখন ওর স্কুল-লিভিংয়ের পরীক্ষা, আর ছুটির মধ্যেও হস্টেল যখন খোলা থাকছে, তখন এই সময়ে ওর না-আসাই ভাল, একেবারে উইন্টার ভেকেশানে আসবে।…আপনিই বলুন, বারবার যদি আসে, তো পড়াশুনোর ক্ষতি হয় না?”

 

“তা হয় ঠিকই,” কাষ্ঠ হেসে বললুম, “কিন্তু একটিমাত্র ছেলে, তাকে ছেড়ে আপনারা থাকেন কী করে? পারা যায়?”

 

“পারতেই হয়। ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে এটুকু কষ্ট তো করতেই হবে। আপনি কখনও করেননি?”

 

“দরকার হয়নি। ছেলে তো আমারও ওই একটাই। কিন্তু সে পাড়ার ইস্কুলে পড়েছে, তারপর কলেজ আর ইউনিভার্সিটিও করেছে কলকাতাতেই, ফলে…বুঝতেই তো পারছেন….

 

“কলকাতাতেই পড়েছে?” বন্দনা সেন একটুকরো লেটুস পাতাকে তাঁর হাতের কাঁটায় বিধিয়ে নিয়ে মুখের কাছে তুলেছিলেন, কিন্তু কাঁটাটা আর শেষ পর্যন্ত তাঁর মুখের মধ্যে ঢুকল না, যতটা অব্দি উঠেছিল সেইখানেই সেটাকে থামিয়ে রেখে ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, “ওখানে পড়াশুনো হয়? সবাই যে বলে…

 

“সবাই কী বলে?”

 

“বলে যে, ওখানে ইস্কুল-কলেজগুলো সব পলিটিক্সের আখড়া হয়ে উঠেছে, পড়াশুনো নাকি বলতে গেলে হয়ই না।”

 

হেসে বললুম, “সবাই ও-কথা বলে না, আর যারা বলে, তারাও ঠিক-কথা বলে না। তাই বলে আবার ভাববেন না যে, কলকাতার ইস্কুল কলেজে পলিটিক্স নেই। আছে। যেমন হাটে-বাজারে রাস্তাঘাটে, মাঠে-ময়দানে, কলে-কারখানায় আর আপিস-কাচারিতে আছে, তেমন ইস্কুল-কলেজেও আছে। তবে কিন পলিটিক্স আছে বলে যে পড়াশুনো নেই, তা কিন্তু নয়। ওটাও আছে মিসেস সেন।”

 

“কিন্তু কাগজে যে-সব খবর পড়ি, তাতে তো অন্যরকম মনে হয়।”

 

“কী মনে হয়?”

 

“মনে হয় যে, ধর্মঘট আর বন্ধ ওখানে লেগেই আছে। আমার তো কলকাতায় বিশেষ যাওয়া হয় না। কিন্তু যারা যায়, তারাও ফিরে এসে বলে যে, ওখানে শুধুই চলবে না’ ‘চলবে না’। ওর মধ্যে পড়াশুনো হয়?”

 

“ওরই মধ্যে হয়। যাদের হবার তাদের ঠিকই হয়। ওরই মধ্যে থেকে ঝকঝকে সব ডাক্তার আর ইঞ্জিনিয়ার বেরিয়ে আসছে। চোখা চোখা সব অধ্যাপক, সায়েন্টিস্ট, টেকনিশিয়ান, লইয়ার আর প্রোফেশনাল ম্যানেজারও কিছু কম বেরুচ্ছে না। তারা যে সবাই কলকাতাতেই পড়ে থাকছে, তাও কিন্তু নয়। আর হ্যাঁ, প্রোফেশনাল ম্যানেজারদের কথাই যখন উঠল, তখন বলি, একটু খোঁজ করলেই দেখতে পাবেন যে, দিল্লি বোম্বাই মাদ্রাজ কি বাঙ্গালোরে যারা বড়-বড় সব মালটিন্যাশনালের ঘাড়ে কি মাথায় চড়ে বসে আছে, তাদের অনেকেই যে শুধু বাঙালি তা নয়, কলকাতার ছেলে।… বাই দ্য ওয়ে, আপনার স্বামীর ছেলেবেলা কোথায় কেটেছে?”

 

“কলকাতায়।”

 

“কোন ইস্কুলে পড়তেন?”

 

ভাদুড়ি-সমগ্র

 

“শ্যামবাজারের পার্ক ইনস্টিটিউশনে। আমার শ্বশুরবাড়ি তো ফড়েপুকুরে, ওখান থেকে খুব কাছে হত।”

 

“তবেই বুঝুন। একে তিনি কলকাতার ইস্কুলে পড়েছেন, তায় আবার বাংলা মিডিয়াম ইস্কুলে। কিন্তু কই, তার জন্যে তো তাঁর বুকানন ইন্ডিয়ার চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার হতে কোথাও আটকায়নি। দিব্যি তিনি বাড়ির খেয়ে পাড়ার ইস্কুলে পড়ে চড়চড় করে এতটা উঠে এসেছেন, আর আপনাদের ছেলেকে কোথায় পড়তে পাঠানো হয়েছে? না হাজার মাইল দূরের কোন এক কনভেন্ট ইস্কুলে। কোনও মানে হয়?”

 

লেটুস পাতাটা আর মিসেস সেনের খাওয়াই হল না। পাতাসুদ্ধ কাঁটাটাকে প্লেটের উপরে নামিয়ে রেখে ভদ্রমহিলা বললেন, “শান্তনুকে তা হলে কি ডালহৌসিতে না পাঠালেই ভাল হত?”

 

হেসে বললুম, “আরে না না, তা-ই কি আমি বলেছি? পাঠিয়েছেন বেশ করেছেন। তবে কিনা ড্যালহৌসির বদলে কলকাতায় পাঠালেও কোনও ক্ষতি হত না।…কী, কিছু বলছেন না যে?”

 

এবারে মিসেস সেনও হাসলেন। “না, ভাবছিলুম যে, স্কুলের জীবনটা তো ওর বাইরে-বাইরে কাটল। এবারে পাশটা করুক, তারপর কলকাতার কোনও কলেজে ভর্তি করে দেবার কথা ভাবা যাবে। তাতেও অবশ্য ছেলেকে আমার কাছে পাব না, আমরা নিজেরা তো কলকাতার বাইরেই থাকি।”

 

বললুম, “তা থাকুন, কিন্তু আপনার শ্বশুরবাড়ি তো কলকাতায়, সেখানে কেউ-না-কেউ আছেন নিশ্চয়?”

 

“বিশেষ কেউ নেই। মিঃ সেন…আই মিন আমার স্বামী হচ্ছেন তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট। বড় দুই ভাইয়ের কেউই কলকাতায় থাকেন না। বড় ভাই থাকেন বোম্বাইয়ে আর মেজো ভাই মাইসোরে। বড় ভাশুরের অবশ্য রিটায়ার করতে আর মাত্র বছর দুয়েক বাকি, তারপর বোধহয় কলকাতাতেই ফিরে আসবেন। অন্তত বাদবাকি জীবন যে বোম্বাইয়ে থাকবেন না, সেটা জানি।”

 

“তার মানে ফড়েপুকুরের বাড়িতে এখন কেউই থাকেন না?”

 

“বাঃ, আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আছেন না? তাঁরা থাকেন।’

 

“তা-ই? তবে তো কথাই নেই? শান্তনুর স্কুল-জীবন তো বাইরে কাটল, এবার ইস্কুলের পরীক্ষা শেষ হলেই ওকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিন। দিব্যি ওর ঠাকুমা-ঠাকুর্দার কাছে থাকতে পারবে। তারপরে যদি ওর বড়-জ্যাঠামশাইও কলকাতায় চলে আসেন, সে তো আরও ভাল।”

 

কথাটা বোধহয় বন্দনা সেনের খুব একটা পছন্দ হল না। বললেন, “আমার শ্বশুর-শাশুড়ির বয়েস কত জানেন?”

 

“কত?”

 

“শ্বশুরের বয়েস আশি, শাশুড়ির পঁচাত্তর। ওঁরা বুড়োমানুষ, শান্তনুকে ওঁরা সামালাতে পারবেন কেন?”

 

বললুম, “ওইখানেই ভুল করলেন, মিসেস সেন। আসলে ব্যাপারটা কী জানেন? শ্বশুর-শাশুড়ি বুড়ো হয়, কিন্তু ঠাকুর্দা-ঠাকুমা কক্ষনো বুড়ো হয় না। সব সময়েই নাতি-নাতনিদের তারা সমবয়সি। আর এইজন্যেই ঠাকুর্দা-ঠাকুমার কাছে ছেলেপুলেরা যত স্বস্তিতে থাকে, বাপ-মায়ের কাছে তার সিকির সিকি স্বস্তিও তারা পায় না। আমার তো মনে হয়, আপনার ছেলে ওঁদের কাছে দিব্যি থাকবে।”

 

মালহোত্রা-দম্পতির দিক থেকে কথাটাকে অনেক কষ্টে শান্তনুর দিকে ঘুরিয়ে আনা গিয়েছিল, কিন্তু এর পরে আর কথাটা এগোল না, আমার প্লেটের উপরে নজর পড়তে বন্দনা সেন বললেন, “আরে ছিছি, আপনি তো কিছুই খাচ্ছেন না! অন্তত আর-এক চামচ ভাত আর একটু প্রন নিন… না না, আপনাকে কষ্ট করতে হবে না, আমিই এনে দিচ্ছি।” বলে, যেখানে খাবার-দাবারগুলি সাজিয়ে রাখা হয়েছে, আমার প্লেটটা নিয়ে তিনি ডাইনিং হলের একপাশে সেই টেবিলটির দিকে চলে গেলেন।

 

সুলেখা ঘোষ অর্থাৎ ডাক্তার-গিন্নি বোধহয় এই রকমের একটা সুযোগের প্রতীক্ষাতেই ছিলেন, মিসেস সেন আমার পাশ থেকে সরে যেতেই তিনি ওদিক থেকে ছিটকে এদিকে চলে এসে চাপা গলায় বললেন, “আমি এবারে নির্ঘাত পাগল হয়ে যাব।”

 

কথাটা যে-রকম হাসিমুখে বললেন, তাতে বুঝলুম, আর যা-ই হোক, ভদ্রমহিলা এক্ষুনি অন্তত পাগল হয়ে যাবেন না। বললুম, “কেন, কী হল?”

 

“সদানন্দবাবু আমাকে কী বলেছেন জানেন?”

 

“কী বলেছেন?”

 

মিসেস সেন আমার প্লেটটাকে ফের বোঝাই করে এনেছিলেন। হয়তো আরও কিছুক্ষণ কথা বলতেন আমার সঙ্গে, কিন্তু আমি যে ইতিমধ্যে আর-একজনের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেছি, এটা দেখে প্লেটটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ‘ভাল করে খান তো’ বলেই সঞ্জীব মালহোত্রার দিকে চলে গেলেন, আমাদের কাছে আর দাঁড়ালেন না। মিঃ মালহোত্রা তখনও চুপচাপ হুইস্কি সেবন করে যাচ্ছিলেন। গেলাশটা তাঁর হাত থেকে প্রায় কেড়ে নিয়ে মিসেস সেন যে একটা মৃদু ধমক দিয়ে সাইডবোর্ডের উপরে রাখা প্লেটটা তাঁর হাতে তুলে দিচ্ছেন, এটাও লক্ষ করলুম।

 

সুলেখা ঘোষ সেই একই রকমের চাপা গলায়, কিন্তু এবারে একটু শ্লেষের মিশেল দিয়ে, বললেন, “দেখুন, দেখুন। দেখলে নয়ন সার্থক হয়।”

 

কথাবার্তা যে আবারও একটা বিপজ্জনক মোড় নিতে চলেছে, সেটা আন্দাজ করে নিয়ে বললুম, “যাচ্চলে, সদানন্দবাবুর কথাটাই তো শোনা হল না, কী বলেছেন তিনি আপনাকে?”

 

প্রশ্নটা মিসেস ঘোষ বোধহয় শুনতে পাননি; ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “কিছু বুঝতে পারলেন?”

 

“কী বুঝব?”

 

“তার মানে দেখতে পাননি। দারুণ একটা দৃশ্য মিস করলেন কিন্তু।”

 

এক্ষেত্রে যা করা উচিত তা-ই করলুম। অর্থাৎ নিপাট ভালমানুষ সেজে গিয়ে বললুম, “কী দেখব, কী মিস করলুম, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।”

 

সুলেখা ঘোষ বললেন, “শুনলুম এখন দিন-তিনেক আপনারা থাকবেন এখানে। সত্যি?”

 

“আপনাদের ফাংশান না-হওয়া পর্যন্ত তো যেতে পারছি না, অতএব থাকতেই হচ্ছে।”

 

“থাকুন। সেইসঙ্গে চোখ-কান খোলা রাখুন। তা হলেই সব বুঝতে পারবেন।”

 

হেসে বললুম, “ঠিক আছে, চোখ-কান খোলা রাখব। কিন্তু আমার কথার জবাব এখনও পাইনি।”

 

“কী কথা?”

 

“বাঃ, ভুলে গেলেন? সদানন্দবাবু আপনাকে কী বলেছেন বলছিলেন না? কী বলেছেন? “ ভদ্রমহিলার মুখে এতক্ষণে ফের হাসি ফুটল। বললেন, “সত্যি ভুলে গিয়েছিলুম…ওঃ, উনি যা বলেছেন, সে আপনি ভাবতেই পারবেন না।”

 

এ তো মহা মুশকিলে পড়া গেল। ভদ্রমহিলা দেখছি স্পষ্ট করে কিছু বলতেই পারেন না। বললুম, “উনি কী বলেছেন, সেইটে বলে ফেলুন দেখি। ভাবা যায় কি না-যায়, সে আমি বুঝব। কী বলেছেন সদানন্দবাবু?”

 

“উঃ, সে আর বলবেন না। উনি একবার বললেন, আমাকে দেখতে একেবারে ওঁর মাসতুতো ভাইয়ের বউয়ের মতন, আবার তার দু’মিনিট বাদেই বললেন, না না, মাসতুতো ভাইয়ের বউ নয়, অবিকল ওঁর পিসতুতো শালির মতন।”

 

কথাটা শেষ করে সুলেখা ঘোষ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বুঝুন ব্যাপার!”

 

আমি বললুম, “তা এ তো হতেই পারে। আপনি এতে অত অবাক হচ্ছেন কেন? দুটো মানুষের চেহারা কি একইরকম হতে পারে না?

 

সুলেখা ঘোষ হাসছিলেন। হাসি থামিয়ে বললেন, “আরে, সবটা আগে শুনুনই না। একটু আগে উনি আবার কী বলেছেন জানেন?”

 

“কী বলেছেন?”

 

“চন্দ্রগুপ্ত নাটকে আমার কোনও পার্ট নেই, এইটে শুনে বলেছেন, সে কী, মুরার ভূমিকায় আপনাকে নামায়নি? ওতে কিন্তু আপনাকে দারুণ মানিয়ে যেত।”

 

কথাটা শেষ করেই সুলেখা ঘোষ ফের হাসতে শুরু করলেন। তারপর হঠাৎই হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “কিছু মনে করবেন না, একজন ভদ্রমহিলার সঙ্গে যে কী করে কথা বলতে হয়, সেটাই বোধহয় আপনাদের এই বন্ধুটির ঠিক জানা নেই। আমি অবশ্য কথাটা মোটেই গায়ে মাখিনি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *