(২০)
সদানন্দবাবু শান্তিপ্রিয় মানুষ। বিশেষ করে দাম্পত্য সম্প্রীতি যে কোথাও কোনও প্রকারে ক্ষুণ্ণ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, এটা দেখলেই তিনি বেজায় ঘাবড়ে যান। ফলে, ঘোষ-দম্পতির ড্রয়িংরুমে প্রথম দিকে মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও, শেষের দিকে যখন কথাবার্তাগুলি মারাত্মক এক-একটা বাঁক নিচ্ছিল, তখন তিনি একেবারে সিঁটিয়ে গিয়েছিলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ভদ্রলোক যে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন, তাও স্পষ্ট বোঝা গেল। বাংলোর বারান্দার সামনেকার ফাঁকা জমিটুকু পেরিয়ে এসেই, ডান হাতের তর্জনীটাকে বড়শির মতো বাঁকিয়ে কপালের ঘাম মুছে নিয়ে তিনি অস্ফুট গলায় বললেন, “বাস, এ তো ডেঞ্জারাস উয়োম্যান। এই রকমের বউ নিয়ে ঘর করতে হলে তো মারা পড়তুম মশাই!”
বললুম, “চেহারাটা কিন্তু মন্দ নয়। এখন বয়েস হয়েছে, কিন্তু এককালে বোধ হয় সুন্দরীই ছিলেন।”
রাস্তায় পৌঁছে গিয়েছিলুম বলে আর নিচু গলায় কথা বলবার দরকার হচ্ছিল না। সদানন্দবাবুরও সাহস ইতিমধ্যে কিঞ্চিৎ বেড়ে গিয়ে থাকবে। আমার কথা শুনে ফুঁসে উঠে তিনি বললেন, “সুন্দরী না হাতি। গোকুল ঘোষ যখন ওঁকে দাবড়ে চুপ করিয়ে দিলেন, মিসেস ঘোষের মুখখানা তখন দেকেছিলেন?”
“না তো, খেয়াল করিনি।”
“তা-ই বলুন। দেকলে আপনার রক্ত হিম হয়ে যেত, মশাই। চোয়াল শক্ত হয়ে গেচে, দাঁতে দাঁতে ঘষটানি হচ্চে, দুটো চোক দিয়ে যেন আগুনের হলকা ছুটে বেরুচ্চে…কী বলব মশাই, আমার তো মনে হচ্ছিল এইবারে না একটা ভল্ট খেয়ে গোকুল ঘোষের ঘাড়ের ওপর নাপিয়ে পড়ে ওর টুটি ছিঁড়ে নেয়।”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সত্যিই যদি ছিঁড়ে নেন, তো কী হবে বলুন তো?”
সদানন্দবাবু কথাটাকে কোনও আমলই দিলেন না। বললেন, “কী আবার হবে। পুলিশ এখন একটা খুনের মামলা সাজাচ্ছে, তখন আর-একটা খুনের মামলা সাজাবে।”
“কিন্তু সেই সেকেন্ড খুনের মামলায় সরকারি পক্ষ যে আপনাকেই তাদের প্রধান সাক্ষী হিসেবে আদালতে তলব করবে, সেটা খেয়াল করে দেখেছেন?”
এ রকম একটা সম্ভাবনার কথা সদানন্দবাবুর অতি বড় দুঃস্বপ্নেও কখনও ঠাঁই পায়নি। তিনি আঁতকে উঠে বললেন, “সে কী মশাই, আমি আবার কী করলুম? আমাকে কেন সাক্ষী দিতে হবে?”
“দিতে হবে না? মিসেস ঘোষের মুখের ভঙ্গি আর চোখের চাউনিতে একটা ইনটেন্ট টু মার্ডার মানে খুনের সংকল্প আপনি দেখতে পাননি?”
“এটা আবার কখন বললুম?”
“দু’ মিনিট আগেই বলেছেন। আপনি বলেছেন যে, মিসেস ঘোষের মুখচোখ দেখে আপনার মনে হচ্ছিল যেন একটা ভল্ট খেয়ে তিনি তাঁর স্বামীর ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে ভদ্রলোকের টুটি ছিঁড়ে নেবেন।”
সদানন্দবাবু কাতর কন্ঠে বললেন, “সে তো আপনাদের কাচে বলিচি।”
“সেটা বলা নয়?”
“আহা তা বলচি না…কিন্তু আপনারা তো আমার ফ্রেন্ড, ওয়েলউইশার।…মানে আপনাদের কাছে যদি কিছু বলেই থাকি, তো পুলিশকে সেটা আপনারা জানিয়ে দেবেন কেন?”
“ঠিক আছে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি যখন এত করে বলছেন, তখন না হয় জানাব না। কিন্তু জানালে কী হবে, সেটা বুঝেছেন তো? গোকুল ঘোষ যদি সত্যিই একদিন তাঁর বাড়ির মধ্যে খুন হয়ে যান, আর খুনি হিসেবে সন্দেহ করে পুলিশ যদি মিসেস ঘোষকে পাকড়াও করে, তো সাক্ষী হিসেবে পুলিশ আপনাকে আদালতে টেনে নিয়ে যাবেই।”
যেমন নেড়িকুত্তা, তেমনি পুলিশ সম্পর্কেও সদানন্দবাবুর প্রচণ্ড ভয়। মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে নেড়িকুত্তার কামড় খেয়ে তাঁকে একবার লম্বা-ছুঁচের যে ইঞ্জেকশন নিতে হয়েছিল, তার যন্ত্রণা তিনি এখনও ভোলেননি। আর বেশ কয়েক বছর আগে নাহক একটা খুনের মামলায় জড়িয়ে গিয়ে তাঁকে এক বদরাগী দারোগার থাপ্পড় খেতে হয়। দারোগাবাবুটি অবশ্য পরে তার জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু সদানন্দবাবুর তাতে মানরক্ষা হলেও ভয় কেটেছে বলে মনে হয় না। ভাদুড়িমশাই যে তাঁকে নিয়ে মজা করছেন, তাও তিনি বোঝেননি। এখন, পুলিশ যে তাঁকে খুনের মামলার সাক্ষী হিসেবে আদালতে দাঁড় করাতে পারে, স্রেফ এই সম্ভাবনার কথা শুনেই তাঁর মুখ থেকে একটা অস্ফুট আর্তনাদ বেরিয়ে এল : ওরে বাবা, তবেই তো গেচি।
আমি আর হাসি চাপতে পারলুম না। বললুম, “ছাড়ুন তো। কোথায় খুন তার ঠিক নেই, এদিকে আপনি ভয়ে মরছেন। ও-সব ছেড়ে এখন বলুন দিকি, সুলেখা ঘোষকে আপনি মুরার পার্ট নিতে বলেছিলেন কেন?”
“বলব না? দারুণ মানিয়ে যেত।”
“কী করে মানাত?”
“বাঃ, তাও বলে দিতে হবে? মিসেস ঘোষের মুখের কাটিং, ফিগার সবই যে নিখুঁত, সেটা মানচি, কিন্তু গায়ের রং যে কালো, সেটা তো ঠিক?”
“তাই কী হয়েছে?”
“যাচ্চলে, মুরা আদিবাসী উয়োম্যান নয়? ডি. এল. রায় তো সেইরকমই লিকেচেন। তা হলে মুরার গায়ের রং তো কালোই হবে, তাই না?”
“পরশু রাত্তিরের পার্টিতে মিসেস ঘোষকে আপনি এই কথা বলেছিলেন?”
“বলেছিলুম বই কী। বললুম, ম্যাডাম, মুরাও কালো, আপনিও কালো, তা ছাড়া মুরার বয়েস তা ধরুন বছর-পঞ্চাশেক হবে, আর আপনার বয়েসও বোধহয় তার চাইতে কিচু কম হবে না, তাই মুরার পার্টে আপনাকে দিব্যি মানিয়ে যেত।”
সুলেখা ঘোষ যে সদানন্দবাবুর উপরে কেন এত খাপ্পা হয়ে আছেন, এর পরে আর সেটা বুঝে নিতে কোনও অসুবিধে হল না। বললুম, “পরশু রাত্তিরের পার্টিতে আপনি ক’পাত্র চড়িয়েছিলেন?”
“তার মানে?”
“প্রথমে তো আমাদের সঙ্গে লক্ষ্মী ছেলের মতো কোক খেলেন। কিন্তু তারপর? আর কিছু খাননি?”
“আর কী খাব?”
“চালাকি হচ্ছে? স্রেফ কোক খেয়েই আপনি ‘ওই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে’ গানটা গাইতে চাইছিলেন আর তা-ই আমাকে মেনে নিতে হবে?”
সদানন্দবাবু ঢোক গিলে বললেন, “না মানে…ওই আর কি…এমন চাপাচাপি করতে লাগল …”
“কে চাপাচাপি করতে লাগল?”
“মিঃ মালহোত্রা। বললেন যে, কী আজেবাজে জিনিস খাচ্চেন, আমারটা একবার টেস্ট করে দেকুন, দিল বিলকুল তর হয়ে যাবে।”
“আর আপনিও অমনি সটাসট চার-পাঁচ পেগ জিন সাঁটিয়ে দিলেন?”
“না না না,” সদানন্দবাবু একেবারে ডুকরে উঠে বললেন, “দুটোর বেশি খাইনি।”
বললুম, “ভবিষ্যতে একটাও খাবেন না। সুলেখা ঘোষ আপনার উপরে ফায়ার হয়ে আছেন।” এতক্ষণ সদানন্দবাবুর মুখে হাসি ফুটল। বললেন, “মুরার পার্টে ওঁকে দারুণ মানাত বলেছি বলে তো? ওটা কিন্তু ও-সব না-খেয়েও ওঁকে বলতুম মশাই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর ও-সব কথা নয়, আমরা প্রায় এসে গেছি
জায়গাটা এখনও ভাল করে চিনে উঠতে পারিনি, দু’দিকে তাকিয়ে তাই কিছু বুঝে উঠতে পারলুম না। বললুম, “কোথায়?”
সদানন্দবাবু ইতিমধ্যে আবার তাঁর ব্যক্তিত্ব ফিরে পেয়েছিলেন। বললেন, “বাঃ, খানিক আগে তো এই রাস্তা ধরেই এলেন, তাও বুঝতে পারচেন না?…অবিশ্যি হাঁটতে-হাঁটতে অত যদি অ্যাডভাইস দেন আর গপ্পো করেন তো রাস্তাঘাট ঠিকমতো চিনবেনই বা কী করে?”
এইবারে যেন একটু চেনা-চেনা লাগতে লাগল। বললুম, “এ তো মনে হচ্ছে সুরেশ দাশ যেখানে থাকেন, সেইদিকেই ফিরে যাচ্ছি। সামনে রাস্তার ধারে ওইগুলোই সেই ফ্ল্যাটবাড়ি না?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, চিনেছেন তা হলে!”
বললুম, “তার মানে কি এখন আমরা তারাপদ দত্তর সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছি?”
“সেই রকমই তো ইচ্ছে।” ভাদুড়িমশাই হাতঘড়ি দেখে বললেন, “ভদ্রলোক এগারোটা নাগাদ হেলথ সেন্টারে যান, আর এখন প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। এর পরে যদি দেখা করতে যাই তো বেশিক্ষণ কথা বলা যাবে না।”
সুরেশ দাশ আর তারাপদ দত্ত একই ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকেন। কথা বলতে-বলতে আমরা বাড়িটার সামনে পৌঁছে গিয়েছিলুম। এনট্রান্সের সামনে নতুন যে পাহারাদারটিকে খানিক আগেই দেখে গিয়েছি, এখন তাকে দেখতে পেলুম না। ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি মৃদু হেসে বললেন, “সুরেশের চুল তো হলদে নয়, তাই পাহারাদারটিকে এখান থেকে তুলে নিয়ে বোধ হয় মিসেস মালহোত্রার বাড়ির সামনে বসিয়ে দিয়েছে।”
সুরেশ দাশের ঠিক উপরের ফ্ল্যাট অর্থাৎ তিনতলার পুবমুখো ফ্ল্যাটটিই যে তারাপদ দত্তের, সেটা আমাদের জানাই ছিল। কিন্তু তিনতলা পর্যন্ত আর ওঠা হল না, দোতলার ল্যান্ডিং পর্যন্ত উঠে উপরে যাবার সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে-না-বাড়াতে সুরেশচন্দ্রের ফ্ল্যাটের সদর-দরজা খুলে এক ভদ্রমহিলা আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে সরাসরি ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিছু মনে করবেন না, আপনিই কি মিঃ ভাদুড়ি?”
ভদ্রমহিলার বয়স মনে হল চল্লিশের নীচেই হবে। চেহারা রোগাপাতলা, রং ময়লা, চুল রুক্ষ, পরনে বুটিদার সাদা খোলের আটপৌরে শাড়ি, হাতে সরু দু’গাছি বালা, সিঁথিতে সিঁদুর নেই। এটাও লক্ষ করলুম যে, এঁর মুখে যথেষ্টই বুদ্ধির ছাপ রয়েছে আর চোখ দুটি অসম্ভব রকমের ধারালো।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ, আমিই চারু ভাদুড়ি।”
“সুরেশের কাছে আপনার কথা শুনেছি।”
“সুরেশবাবু কোথায়?”
“বাজারে পাঠিয়েছি। কিছুতেই যেতে চাইছিল না। অথচ ঘরে দেখছি কয়েক কৌটো চাল ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। শেষপর্যন্ত জোর করে বাজারে পাঠাতে হল। বললুম, আলু পটল বেগুন—যা পাও নিয়ে এসো। নইলে আমার বোনটা তো গেছেই, এবারে না-খেয়ে তুমিও মারা পড়বে।”
“আপনি কি মিসেস দাশের দিদি?”
“হ্যাঁ, আমার নাম মীরা বসু।”
“আগেই সেটা আন্দাজ করেছিলুম।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি কখন খবর পেলেন?”
“কাল বিকেলে।”
“কিন্তু খবর তো কাল দুপুরেই পৌঁছে যাবার কথা। পুলিশ অন্তত সেইরকমই বলেছিল।”
“পুলিশের দোষ নেই,” মীরা বসু বললেন, “দুপুরে আমিই বাড়িতে ছিলুম না।”
“কোথায় গিয়েছিলেন?”
“আপিসে। পুজোর পর কালই প্রথম আপিস খুলল। বিকেলে বাড়িতে ফিরে শুনি পুলিশ থেকে আমার খোঁজ করতে এসেছিল, আমাকে না-পেয়ে ফিরে গেছে।”
“বাড়িতে আপনি ছাড়া আর কে থাকেন?”
“একা আমিই থাকি।…কিন্তু আপনারা দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, ভিতরে আসুন।”
ভিতরে ঢুকে একটু অবাকই হতে হল। সুরেশচন্দ্র সামান্য কেরানি মাত্র, তাঁর বাড়িতে আসবাবপত্রের বিশেষ বাহুল্য কিংবা আড়ম্বর থাকার কথা হয়, নেইও, অন্তত বসবার জায়গাটুকুতে একদিকে খানকয় প্লাস্টিকের চেয়ার, তার সামনে ছোট একটি সেন্টার টেবিল ও অন্য দিকে খুবই অপরিসর একটি তক্তপোশ ছাড়া কিছুই আমার চোখে পড়ল না। কিন্তু এই সামান্য কটি আসবাবই পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো। চেয়ারগুলোর বসবার জায়গায় একটি করে পাতলা গোল গদি পাতা, হেলান দেবার অংশটিও ধবধবে সাদা কাপড়ের ঢাকনা দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে। জাজিমে ঢাকা তক্তপোশটিরও দেওয়ালের দিকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে গোল কয়েকটি বালিশ, যাতে হেলান দিয়ে বসতে কারও অসুবিধে না হয়। দেওয়ালে একটিই মাত্র ছবি ঝুলছে— যামিনী রায়ের আঁকা ছবির প্রিন্ট। সুরেশচন্দ্রকে ইতিমধ্যে আমি যেটুকু চিনেছি, তাতে তাঁর রুচির সঙ্গে এই ছবিখানাকে আমি ঠিক মেলাতে পারছিলুম না।
আমরা চেয়ারে বসলুম, মীরা দেবী তক্তপোশে। ভাদুড়িমশাই হাতঘড়ি দেখে বললেন, “আমাদের হাতে তো বিশেষ সময় নেই, আর-একজনের সঙ্গে দেখা করতে হবে। তবে, আপনার সঙ্গে তার আগেই যখন দেখা হয়ে গেল, তখন চটপট কয়েকটা কথা জেনে নিই, কেমন?… কিন্তু তারই বা সময় পাচ্ছি কোথায়, আপনার বোনের ডেডবডি তো আজ সকালেই রিলিজ করবার কথা, তাই না?”
“না, সকালেই রিলিজ করবার কথা ছিল বটে, কিন্তু কী একটা পরীক্ষা নাকি বাকি আছে, তাই সন্ধের আগে রিলিজ করবে না।” মীরা দেবী একটুক্ষণ চুপ করে থেকে যোগ করলেন, “পুলিশ থেকে সুরেশকে অন্তত এই কথাই জানানো হয়েছে।”
“ঠিক আছে, এখন তো তা হলে দু-একটা কথা বলাই যায়।…তো যে-কথা হচ্ছিল, বাড়িতে তো আপনি একা থাকেন, তা হলে পুলিশ যে আপনার খোঁজ করতে এসেছিল, আপিস থেকে বাড়িতে ফিরে এটা আপনি কার কাছে শুনলেন?”
“পাশের বাড়ির একটি বউয়ের কাছে। পুলিশ তাকে বলে গিয়েছিল, বাড়িতে ফিরে যেন একবার থানায় গিয়ে বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করি। তক্ষুনি থানায় চলে যাই। সেখানে দারোগাবাবুর কাছে রেখার খবর শুনি। শুনে আমার অবস্থা কী হয়, সে আপনি বুঝতেই পারছেন। কিন্তু তখন তো আমার চুপ করে বসে থাকার কি কান্নাকাটি করবার সময় নয়, বাড়িতে ফিরেই সুটকেস গুছিয়ে ঘরদোর তালাবন্ধ করে হাওড়া ইস্টিশানে ছুটি।”
“তার মানে রাত্তিরের ট্রেন ধরেছেন। এ-ট্রেনে বড় একটা কেউ আসে না। নাকি মাঝেমধ্যেই ডাকাতি হয়।”
“কিন্তু আমি তো দেখলুম বেজায় ভিড়, উঠতেই পারা যাচ্ছিল না। শেষপর্যন্ত একটা কুলিকে দশটা টাকা দিয়ে একটু বসবার মতো জায়গা পেয়ে যাই। তা নইলে তো আজ সকালে এসে পৌঁছতেই পারতুম না।”
সদানন্দবাবু উশখুশ করতে শুরু করেছেন, এটা আমার নজর এড়ায়নি। সম্ভবত কিছু বলতে চাইছিলেন। কিন্তু বলা উচিত হবে কি না, সেটা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। শেষপর্যন্ত হয়তো কিছু বলতেনও। কিন্তু ইতিমধ্যে ফের ভাদুযিশাই কথা বলতে শুরু করায় তিনি আর মুখ খুললেন না, চুপ করে গেলেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কলকাতায় আপনাদের বাড়ি তো শশিভূষণ দে স্ট্রিটে, তাই না?
“হ্যাঁ।” মীরা বসু বললেন, “নিজেদের বাড়ি অবশ্য নয়, তবে অনেক কাল ধরে ভাড়া আছি।”
“আপনি ওই বাড়িতেই থাকেন?”
“তা ছাড়া আর কোথায় থাকব, আমি তো বিয়েই করিনি।”
“কিন্তু ওই বাড়িতে আপনাকে একা থাকতে হয় কেন? শুনেছি, আপনাদের বাবা নেই, কিন্তু বিধবা মা তো আছেন। তিনি ওখানে থাকেন না?”
“থাকতেন। কিন্তু মাসদুয়েক হল তিনি কলকাতায় নেই।”
“তা হলে এখন তিনি কোথায় আছেন?”
“কাশীতে, আমার এক পিসির কাছে।” একটুক্ষণ থেমে থেকে মীরা বললেন, “আসলে পিসিও ওখানে একা থাকে তো, তাই অনেক দিন ধরেই বলছিল যে, মা’কে যেন অন্তত মাসখানেকের জন্যে ওখানে পাঠিয়ে দিই। মা’রও দেখলুম খুব যাবার ইচ্ছে। তাই পাঠিয়ে দিতে হল। নয়তো একা-একা মা’কে আমরা কোথাও যেতে দিই না।”
“কিন্তু আপনি যা বলছেন তাতে তো মনে হয় এক মাস বাদেই তাঁর ফেরার কথা ছিল।”
“ছিল, কিন্তু এক মাসের জায়গায় দু’মাস হয়ে গেল, তাও ফেরেননি।”
“কেন?” ভাদুড়িমশাই জিজ্ঞেস করলেন, “শরীর খারাপ?”
“না, না” মীরা বসু বললেন, “সে-সব কিছু নয়। মা ভালই আছেন। ফি হপ্তায় তাঁর কাছ থেকে পোস্টকার্ডও একখানা পাই। ওটা লিখতে কখনও ভোলেন না।”
“তা হলে ফিরছেন না কেন?”
“এই বয়েসে যা হয় আর কী,” মীরা বসু বিষণ্ণ হাসলেন, “জায়গাটা ভাল লেগে গেছে। পিসির সঙ্গে মন্দিরে-মন্দিরে ঘুরছেনও খুব। গত হপ্তায় যে চিঠি পেয়েছি, তাতে লিখেছেন আরও মাসখানেক ওখানে থাকতে চান।”
“আপনার বোনের খবরটা তা হলে তাঁকে দেবেন কী করে?”
“দেবার দরকার কী। বুড়ো মানুষ, কলকাতায় তো সারাটা দিন বাড়ির মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতেন, ননদের কাছে গিয়ে ভালই আছেন, এখন যদি এই খবরটা দিই তো ভেঙে পড়বেন, একটা অসুখ-বিসুখ বাধিয়ে বসতে পারেন, সমস্যা তাতে বাড়বে বই কমবে না।…আপনি কী বলেন?”
“আমি তার কী বলব, আপনি বুদ্ধিমতী মেয়ে, আই থিঙ্ক ইউ হ্যাভ টেকন দ্য রাইট ডিসিশান।’ কথা শেষ করে ভাদুড়িমশাই উঠে পড়লেন। বললেন, “আমাকে একবার তিনতলায় যেতে হবে। এর পরে গেলে হয়তো তারাপদ দত্তের দেখাই পাব না। ওঁর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার।”
“কিন্তু আমারও যে কয়েকটা কথা আপনাকে জানাবার ছিল। আপনি শুনলুম এখানকার গেস্ট হাউসে আছেন। সন্ধের দিকে একটু সময় দিতে পারবেন?”
“তা পারব, কিন্তু সন্ধেয় তো ডেডবডি এসে যাবে, তখন আপনি যাবেন কী করে?”
“আমি তো শ্মশানে যাচ্ছি না। সুরেশকে শ্মশানে রওনা করিয়ে দিয়েই গেস্ট হাউসে চলে যাব।”
“ঠিক আছে, তা হলে চলে আসুন, আমি অপেক্ষা করব।”
ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম করছি, এমন সময়ে মীরা বসুর দিকে তাকিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “কিচু যদি মনে না করেন তো একটা কতা বলব, ম্যাডাম?”
“বলুন।”
যে-কথাটা বলবার জন্য সদানন্দবাবু ইতিমধ্যে একটু উশখুশ করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু কিছুতেই বলে উঠতে পারছিলেন না, এতক্ষণে সেটা তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। “আচ্ছা কাল রাত্তিরে হাওড়া ইস্টিশানে যে কুলিটা আপনাকে ভিড়ের গাড়িতে জায়গা করে দিয়েছিল, তার নাম কি কালীচরণ?”
এমন প্রশ্নের জন্যে মীরা বসু যে আদৌ তৈরি ছিলেন না, সে তার মুখ দেখেই বোঝা গেল। বিভ্রান্ত চোখে কয়েক সেকেন্ড তিনি সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “তা তো বলতে পারব না।”
