আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
(২)
কৌশিক বলল, “তোর আবার কী হয়েছিল রে? তুইও কি কোনও সাধুর পাল্লায় পড়েছিলি নাকি?”
“সাধু না অসাধু, তা জানি না।” অমিতাভ বলল, “তবে লোকটার যে একটা-কিছু ক্ষমতা আছে, সেটা মানতেই হবে।”
শুনে, কৌশিক একেবারে হো-হো করে হেসে উঠল। তারপর হাসতে-হাসতে বলল, “তার মানে তোরও হয়ে গেছে। তা অঘোর মন্ডলের বউয়ের তো রুপোর খাড়ু গচ্চা গিয়েছিল। তোর কী গেল রিস্টওয়াচ না সোনার বোতাম?”
অমিতাভ বলল, “সবটা আগে শুনবি তো! ঠাট্টা যদি করতে হয় তো পরে করিস, এখুনি হাসতে শুরু করলি কেন?”
সদানন্দবাবু একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলেন, এবারে অমিতাভও যে কোনও তাজ্জব ঘটনার কথা শোনাতে যাচ্ছে এটা বুঝতে পেরে বুকে একটু বল পেয়ে বললেন, “ঠাট্টা কোরো না, ঠাট্টা কোরো না…এতে এত হাসবারই বা কী আচে? মহাকবি মিলটন তো সেই কবেই বলেচেন, দেয়ার আর মোর থিংস…”
কৌশিক আবার হো-হো করে হেসে উঠে বলল, “ওটা মিলটনের নয় বোসজেঠু, শেক্সপিয়রের কথা।”
ভাদুড়িমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, “থাম্ তো কৌশিক, তুই দেখছি কিছুই আমাদের শুনতে দিবি না। নাও অমিতাভ, কী হয়েছিল বলো।”
মামাবাবুর ধমক খেয়ে কৌশিক তখনকার মতো চুপ করে গেল বটে, কিন্তু তার মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারছিলুম যে, দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে প্রাণপণে সে তাঁর হাসির দমক সামলে যাচ্ছে।
হাসি সে আমারও পাচ্ছিল না, তা নয়, তবে পাছে সেটা ছেলেমানুষির পর্যায়ে পড়ে, এই ভয়ে কাশির বেগ সামলাবার ভান করে দু’তিনবার গলা খাকরেই আমি থেমে গেলুম, তারপর রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে-মুছতে সন্তর্পণে অমিতাভর দিকে তাকিয়ে বুঝবার চেষ্টা করলুম যে, ব্যাপারটা সে ধরতে পেরেছে কি না।
অমিতাভ অবশ্য সেদিকে কোনও ভ্রূক্ষেপই করল না। বলল, “ব্যাপারটার শুরু এখানে নয়, ইস্ট আফ্রিকার কিনিয়ায়। আপনারা তো জানেন যে, রাঁচিতে আসার আগে আমি কিনিয়ায় ছিলুম।”
অরুণ সান্যাল বললেন, “বিলক্ষণ। তা সেখানে তো তোমার বছর তিনেক থাকবার কথা ছিল, তাই না? কৌশিকের কাছে যেন সেইরকম শুনেছিলুম।”
“ঠিকই শুনেছিলেন। কিন্তু থাকা হল না মেসোমশাই, তার অনেক আগেই আমি ফিরে এলুম।”
“কেন? ওখানকার কাজ শেষ হয়ে গেসল?”
“না মেসোমশাই, কাজ শেষ হয়নি।” সামনের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন বিষণ্ণ গলায় অমিতাভ বলল “গ্লোব্যাল টেন্ডারে যে প্রোজেক্টের ভার পেয়ে আমাদের কোম্পানি থেকে তিনজন ইঞ্জিনিয়ারকে কিনিয়ায় পাঠানো হয়েছিল, তার কাজ এখনও চলছে, শেষ হতে হতে পুরো তিন বছরই লাগবে। লেবার-ফোর্স তো ওখান থেকেই রিক্রুট করতে হয়, তাতে ঝঞ্ঝাটও মাঝে-মাঝে কম ঘটে না, তাই হয়তো কিছু বেশি সময়ও লাগতে পারে।”
“তা হলে ফিরে এলে যে?”
“ঠিক আমিই যে ফিরেছি, তা নয়।” অমিতাভ বলল, “একটা প্রোমোশান দিয়ে রাঁচির আপিসে আমাকে ফিরিয়ে আনা হল। আপনারা কি সমীর বোসকে চেনেন?”
“না।”
“নামজাদা ইঞ্জিনিয়ার। অফিসার হিসেবে যেমন এফিশিয়েন্ট, তেমনি পপুলার অ্যাজ আ টিম-লিডার। শিবপুরে আমার তিন বছরের সিনিয়র ছিলেন, তখন থেকেই ওঁকে চিনি। আমাকে খুব স্নেহ করতেন, ইন ফ্যাক্ট উনি না-থাকলে তো আমার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াই হত না, র্যাগিংয়ের ঠেলাতেই পালিয়ে আসতে হত।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইল অমিতাভ। তারপর সেই একইভাবে দেওয়ালের দিকে চোখ রেখে একই রকমের নিষ্প্রাণ গলায় বলল, “বাই দ্য ওয়ে, রাঁচিতে এই সমীরদাই হচ্ছেন আমার ডিপার্টমেন্টাল বস। প্রোমোশান দিয়ে রাঁচির আপিসে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কিনিয়ায় আমাকে যে অফিশল অর্ডার পাঠানো হয়, তার সঙ্গে ছিল সমীরদার একটা চিঠি। তাতে তিনি লিখেছেন যে, এখানে একটা বড় কাজের টেন্ডার অ্যাকসেপটেড হয়েছে, ‘কিন্তু তোকে না-পেলে চলবে না, তাই ফিরে আয়। কিনিয়ার কাজ নিয়ে ভাবিস না, এখান থেকে একজনকে রিলিভিং হ্যান্ড হিসেবে পাঠানো হচ্ছে, তাকে তোর কাজকর্ম বুঝিয়ে দিয়ে আর্লিয়েস্ট ফ্লাইট ধরে ফিরে আসবি।’ তো এই হচ্ছে ব্যাপার। আফ্রিকায় মাত্র একটা বছর থেকেই আমাকে ফিরে আসতে হল।”
অরুণ স্যন্যাল বললেন, “তোমাকে এত বেজার দেখাচ্ছে কেন বলো তো? দেশে ফিরে কি তোমার ভাল লাগছে না?”
“ঠিক তা নয়, মেসোমশাই।”
“তা হলে?”
অমিতাভ বলল, “নর্মালি আমার খুশি হওয়াই উচিত। কিন্তু হতে পারছি না।”
ভাদুড়িমাশাই বললেন, “কেন? এতে তো তোমার ভালই হল। প্রোমোশানও পেলে, আবার দেশেও ফিরতে পারলে। নাকি কিনিয়া দেশটা এতই ভাল লেগে গিয়েছিল যে, পুরো তিন বছরই ওখানে থাকবার ইচ্ছে ছিল তোমার?”
“মোটেই না।” অমিতাভ বলল, “দেশটা সুন্দর ঠিকই, কিন্তু একে তো আমার কলিগ দুজনের মধ্যে একজনও বাঙালি নয়, একজন তামিলনাড়ুর লোক আর একজন কেরলের, ফলে বাংলা ভাষার সঙ্গে একেবারে বিচ্ছেদ ঘটবার জো হয়েছিল…”
অরুণ সান্যাল বাধা দিয়ে বললেন, “কেন, ওখানে বাঙালি নেই?”
“তা কেন থাকবে না,” অমিতাভ বলল, “নিশ্চয় আছে। অন্তত নাইরোবিতে যে বেশ কয়েকঘর বাঙালি আছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা তো নাইরোবিতে থাকতুম না, আমরা থাকতুম মোম্বাসার ওদিকে। সেখানেও যে বাঙালি নেই, তা বলছি না, থাকতেই পারে, তবে আমার সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়নি। আমাদের আপিসে যে-সব ইন্ডিয়ান আসত কি রাস্তাঘাটে দোকানপাটে যাদের দেখতুম, তাদের চোদ্দো আনাই গুজরাটি কি পাঞ্জাবি কি মাদ্রাজি। ফলে যা হয় আর কি, বাংলায় কথা বলার কোনও সুযোগই পেতুম না। কী বলব, দিনের মধ্যে অন্তত কিছুক্ষণ যে নিজের ভাষায় কথা বলাটা এত জরুরি ব্যাপার, এটা এর আগে কখনও বুঝিনি। আমি একেবারে হাঁফিয়ে উঠেছিলুম।”
সদানন্দবাবু বললেন, “সে আর বিচিত্র কী। উইদাউট বংলা কি কারও…আই মিন আমাদের বাঙালিদের চলে?”
অরুণ সান্যাল বললেন, “এ আপনি কী বলছেন বোসদা? চালিয়ে নিতে হয়। এককালে তো বিস্তর ঘোরাঘুরি করেছি। তখন কী করতুম জানেন?
সদানন্দবাবু বললেন, “কী করতেন? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গে নিজে কতা কইতেন?”
“না না, ঠাট্টা নয়,” অরুণ সান্যাল বললেন, “এমন কোনও দেশে কি আর আমাদের মেডিক্যাল কনফারেন্স কখনও হত না, যেখানে বাঙালি বিশেষ নেই? সে ক্ষেত্রে স্রেফ এক-এক দিনের সেশনের শেষে হোটেলে ফিরে ক্যাসেট প্লেয়ার চালিয়ে দিয়ে রবীন্দ্রসংগীত শুনতুম।”
সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “আরে, ও তো শুদু শোনা হল। বলাও তো চাই। নিজের ভাষায় কতা না বলে কি দিনের পর দিন চলে নাকি?”
অমিতাভ বলল, “সত্যিই চলে না। তা ছাড়া অসুবিধেও ছিল। একে তো নিজে রান্না করতে পারি না বলে দুপুরবেলায় আমাদের ক্যান্টিনে আর রাত্তিরে কোনও হোটেলে গিয়ে যত রাজ্যের রাবিশ খেয়ে পেট ভরাতে হত, তার উপরে আবার ওখানকার ক্লাইমেটও ঠিক স্যুট করছিল না। কী বলব, ছ’টা মাস কাটতে না কাটতেই আমার মনে হতে শুরু হয়েছিল যে, ঢের হয়েছে, আর নয়, এখন ফিরতে পারলে বাঁচি। …না মেসোমশাই, আপনি যা ভাবছেন, তা নয়, ও-দেশে থাকতে আমার একটুও ভাল লাগছিল না, ফিরে এসে মনে হচ্ছে যেন নির্বাসন থেকে ফিরেছি। তবে কিনা, যে-ভাবে ফিরলুম, তাই নিয়ে যে আমার মনের মধ্যে একটা খিঁচ ধরে রয়েছে, তাও মিথ্যে নয়।”
“কেন?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তোমার আগে কি এইভাবে তোমাদের আপিস থেকে কাউকে কখনও ফিরিয়ে আনা হয়নি?”
“তা কেন হবে না,” অমিতাভ বলল, “আমাদের আপিসে এটা কোনও নতুন ব্যাপার নয়। এর আগেও অনেকের ক্ষেত্রে এটা হয়েছে। এই সেদিনই যোগেশ শ্রীবাস্তবকে নাইজিরিয়া থেকে আর অসীম চাকলাদারকে মিডল ইস্ট থেকে ফিরিয়ে আনা হল। সেও একটা প্রোমোশান দিয়েই। না না, এর মধ্যে ইরেগুলার কিছু নেই। এমন মাঝে-মাঝেই হয়ে থাকে।”
“তা হলে আর খিঁচ ধরবার কারণ কী। তোমার তো খুশি হওয়াই উচিত।”
“খুশি হতে পারছি না, মামাবাবু। চেষ্টা করছি, কিন্তু পারছি না।”
“কেন?” ভাদুড়িমশাইয়ের চোখ দুটো হঠাৎ সরু হয়ে এল। ভুরু কুঁচকে অমিতাভর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কেন পারছ না?”
অমিতাভ যে একটা অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে, কিছুতেই ঠিক স্বচ্ছন্দ হতে পারছে না, সেটা এই ফ্ল্যাটে ঢোকা অবধি আঁচ করতে পেরেছিলুম। ভাদুড়িমশাইয়ের কথার জবাবে একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, “এইজন্যে পারছি না যে, গোটা ব্যাপারটাই আমার কাছে একটা ধাঁধার মতো লাগছে। ঠিক সময়ে আপিসে যাচ্ছি, হাতের কাজকর্ম ঠিকঠাক করে যাচ্ছি, সমীরদা খুশি, তাড়াতাড়ি দেশে ফিরেছি বলে আমার মা, ভাই, দাদা, বউদি, সব্বাই খুশি, কিন্তু আমি কিছুতেই খুশি হতে পারছি না।”
“কেন? দেয়ার মাস্ট বি সাম রিজন।”
“কারণ আছে, মামাবাবু। খুশি হতে পারছি না, তার কারণ, এটা আমি বুঝে গেছি যে, এর পিছনে আর-একজনের ইচ্ছে কাজ করছে। এই যে আমার প্রোমোশান হল, এটা তো আমার ডিউ ছিল না, তবু আউট অভ টার্ন এটা হল। এই যে আমি দেশে ফিরলুম, এটাও তো এক্ষুনি হবার কথা ছিল না, তবু আমি ফিরে এলুম। এটা হল কী করে? মামাবাবু, এর পিছনে না আছে আমার কোনও ভুমিকা, না আমার আপিসের।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, তোমার যে ভুমিকা নেই, সেটা না হয় মেনে নিলুম, কিন্তু তোমার আপিসেরও এতে ভূমিকা নেই, এটা কী করে মানব? আপিস তোমাকে প্রোমোশান দিতে চেয়েছিল, তাই দিয়েছে। ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল, তাই এনেছে। আপিস না-চাইলে এটা হতে পারে? হওয়া সম্ভব?”
“হওয়া সম্ভব, মামাবাবু।” অমিতাভ বলল, “কালীচরণ যদি চায়, তা হলেই সম্ভব হতে পারে। আসলে কালীচরণ চেয়েছিল বলেই এ-সব হয়েছে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “হোঅট?”
অরুণ সান্যাল ভুরু কুঁচকে বললেন, “কালীচরণ? হু ইজ দিস কালীচরণ?”
সাইড টেবিলে যে কাচের জাগ রয়েছে, তার থেকে গেলাশে জল গড়িয়ে নিয়ে ঢকঢক করে পুরো একগ্লাস জল খেয়ে ফেলল অমিতাভ। তারপর, কপালে যে ফোঁটা-ফোঁটা ঘাম জমেছে, শার্টের হাতায় সেটা মুছে নিয়ে বলল, “একজন পামিস্ট। ফরচুন টেলার। হাত দেখে ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেয়। আফ্রিকা থেকে চলে আসার মাত্র দিন দশেক আগে তাকে দেখেছিলুম।”
“হাত দেখা! ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া!” চাপা গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “হোঅট রট! তুমি একজন ইঞ্জিনিয়ার হয়েও ও-সব বুজরুকিতে বিশ্বাস করো?”
“করতুম না, মামাবাবু।” অমিতাভ অস্ফুট গলায় বলল, “ইন ফ্যাক্ট, তার সঙ্গে যখন দেখা হয়, তখনও এই ব্যাপারটা নিয়ে আমি ঠাট্টা-তামাশাই করছিলুম। কিন্তু তার জন্যে যা শিক্ষা দেবার, কালীচরণ সেটা আমায় দিয়ে গেছে।…ও হ্যাঁ, তার জন্যে আমার হাত দেখার দরকারও তার হয়নি।”
সদানন্দবাবু অনেকক্ষণ মুখ খোলেননি। পা দুটোকে সোফার উপরে তুলে জোড়াসন হয়ে বসে তন্ময় হয়ে সব শুনে যাচ্ছিলেন। এবারে বললেন, “এইজন্যেই তো তখন বলেছিলুম যে, চোকের সামনে যা আমরা দেকি, তা-ই সব নয়, তার বাইরেও কিচু আচে। আমাদের তারকেশ্বরের…’
কথাটা শেষ করতে পারলেন না। ভাদুড়িমশাই তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখাটা যে আফ্রিকায় হয়েছিল, তা তো বুঝলুম, কিন্তু ঠিক কোথায় হয়েছিল, তা তো বললে না?”
“মোম্বাসার একটা হোটেলে।” অমিতাভ বলল, “কোনও যে উপলক্ষ ছিল, তাও কিন্তু নয়।”
“হঠাৎই দেখা হয়ে গেল?”
“না, ঠিক তাও নয়।” অমিতাভ একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আসলে হোটেলটার একটা রেস্তোরাঁয় বসে আমরা কফি খাচ্ছিলুম। এই সময়ে অদ্ভুত একটা লোকের উপরে আমাদের চোখ পড়ে। লোকটা যেমন কালো, তেমনি ঢ্যাঙা আর তেমনি রোগা। কিন্তু তার চেয়েও অদ্ভুত তার চোখ দুটো। অমন জ্বলজ্বলে চোখ অন্তত আমি আর কখনও দেখিনি। হঠাৎ দেখলে মনে হয় যেন চোখের কোটরের মধ্যে জ্বলন্ত দু টুকরো কয়লা বসিয়ে রাখা হয়েছে।”
“তারপর?”
“আমরা যেখানে বসে ছিলুম, তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে আর-একটা টেবিল ঘিরে বসে ছিল দুজন সায়েব আর একজন মেমসাহেব। আর ফোর্থ চেয়ারটায় বসে, টেবিলের উপরে একটু ঝুঁকে পড়ে মিশকালো লোকটা তাদের হাত দেখছিল। লোকটার পরনে একটা সাদা আলখাল্লার মতো ঢিলে পোশাক আর মাথায় একটা রংচঙে টুপি। মনে হল, ওখানকারই কোনও ট্রাইবাল লোক, বিদেশি টুরিস্টদের ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেবার ভাঁওতা দিয়ে কিছু বাগিয়ে নিচ্ছে। লোকটা অনর্গল বেশ উঁচু গলায় কথা বলে যাচ্ছিল। ঠিক কী ভাষায় যে কথা বলছিল, তা বুঝলুম না, তবে সেটা জার্মন, ডাচ, ফ্লেমিশ, স্প্যানিশ, পোর্তুগিজ কি ফরাসি নয়। এদিকে, সাউথ ইন্ডিয়ান যে-দুই কলিগের সঙ্গে বসে আমি কফি খাচ্ছিলুম, তাদের দুজনেরই পামিস্ট্রিতে খুব বিশ্বাস। তাদেরও এই লোকটিকে দিয়ে হাত দেখাবার ইচ্ছে। ইংরেজিতে ফিসফিস করে আমাকে তা তারা বললও। কিন্তু আমি তো তখন এ-সব বিশ্বাস করতুম না, তাই আমিও তাদের একই রকমের নিচু গলায় চাপা ধমক দিয়ে বোঝাচ্ছিলুম যে, এ একেবারে ধাপ্পাবাজির ব্যাপার, লোকটা জোচ্চোর, সায়েবদের টুপি পরিয়ে কিছু ধসিয়ে দিচ্ছে তো দিক না, কিন্তু তোমরা কেন ওর ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছ? কীরকম বুকনি ঝাড়ছে দেখছ তো, ওর খপ্পরে পড়েছ তো আর দেখতে হবে না, একেবারে লেংটি পরিয়ে ছেড়ে দেবে।
অরুণ সান্যাল বললেন, “তারপর?”
জাগ থেকে জল খেল অমিতাভ। তারপর সামনের দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে যেন নিজেকে শুনিয়ে বলল, “ঠিক তখুনি একটা ব্যাপার ঘটল, যা ঘটতে পারে বলে আমি ভাবিনি।”
“কী ঘটল?”
অমিতাভ বলল, “লোকটা তো আমাদের থেকে বেশ কিছুটা দূরে বসে ছিল। ডিসট্যান্সটা তা অন্তত কুড়ি-পঁচিশ ফুট তো হবেই। আর আমিও এত নিচু গলায় কথা বলছিলুম যে, সেখান থেকে আমার কথাগুলো কিছুতেই ওর কানে যাওয়া সম্ভব নয়। অথচ আমার কলিগদের সঙ্গে কথা বলতে-বলতেই আমি লক্ষ করলুম যে, লোকটা হঠাৎ তার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে। ভেবেছিলুম, কাজ চুকে গেছে, লোকটা এবারে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু না, সে বেরিয়ে গেল না। ফ্লোরের উপর দিয়ে মাঝখানকার অন্য সব টেবিলের পাশ কাটিয়ে একেবারে আমাদের টেবিলের সামনে এসে সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বলল, “হাত দেখায় তোমার বিশ্বাস না-ই থাকতে পারে, অনেকরই নেই, কিন্তু যাদের বিশ্বাস আছে, তাদের তুমি বাধা দিচ্ছ কেন?”
কৌশিক আর হাসছিল না। শুকনো গলায় বলল, “উত্তরে তো তোরও কিছু বলা উচিত ছিল। বলেছিলি?”
“না।” অমিতাভ বলল, “গোটা ব্যাপারটা এত হঠাৎ করে ঘটে গেল যে, আমি একেবারে হকচকিয়ে গিয়েছিলুম। কিচ্ছু বলতে পারিনি।”
“লোকটা তোকে আর-কিছু বলেছিল?”
“বলেছিল। যা বলেছিল, আর তারপর থেকে যা-যা ঘটে চলেছে, সেটাই আমাকে বড় ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। দু’-তিন সেকেন্ড একেবারে স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর চাপা
গলায় সে বলল যে, আমি তার ক্ষতি করেছি বটে, কিন্তু সে আমার কোনও ক্ষতি করবে না। কিন্তু তাই
বলে যে মোম্বাসায় আমাকে থাকতে দেবে তাও নয়। দশদিনের মধ্যেই সে আমাকে ওখান থেকে ফেরত পাঠিয়ে দেবে। …কী বলব কৌশিক, তখনও আমি কিছু বলতে পারলুম না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলুম যে, বড়-বড় পা ফেলে রেস্তোরাঁ থেকে লোকটা বেরিয়ে যাচ্ছে।”
“তারপর?”
“তারপরেই আমার হুঁশ ফিরল। যে টেবিলে লোকটা বসে ছিল, সেখানে গিয়ে সেই বিদেশি লোকগুলোকে জিজ্ঞেস করলুম যে, এক্ষুনি যে বেরিয়ে গেল, তাকে তারা চেনে কি না। তারা একটা ডাচ টেলিভিশন কোম্পানির লোক, বলল যে, একটা টেলি-ফিল্ম করবার জন্যে প্রথমে তারা নাইরোবিতে গিয়েছিল, দিন দুয়েক সেখানে কাটিয়ে চলে গিয়েছিল মাসাইমারা আম্বোসেলি আর সামবুরুতে। সেখানে ছবি-টবি তুলে তারপর আজই মোম্বাসায় এসে পৌঁছেছে। না, লোকটাকে তারা চেনে না, হোটেলের কফি শপেই আলাপ, পামিস্ট বলে নিজের পরিচয় দিয়েছিল বলেই তাকে তারা হাত দেখাচ্ছিল। বেয়ারা আর ওয়েটারকে জিজ্ঞেস করেও সুবিধে হল না। না, কেউই তাকে চেনে না। একমাত্র রিসেপশান কাউন্টারের একটি মেয়ে দেখলুম নামটা জানে। বলল, ‘উনি তো কালীচরণ।’ জিজ্ঞেস করলুম, ‘উনি কোথায় থাকেন জানো?” তাতে মেয়েটি বলল যে, কালীচরণের কোনও স্থায়ী ঠিকানা নেই, আজ যদি এখানে থাকেন তো কাল ওখানে। লোকের হাত দেখতে ভালবাসেন, তবে তার জন্যে পয়সা নেন না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “পরে আর তার দেখা পাওনি?”
“কী করে পাব?” অমিতাভ বলল, “পরদিনই আমার ফ্ল্যাটে ফিরে আপিসের চিঠি পাই। উইথ সমীরদা’জ পার্সোন্যাল লেটার। তার তিনদিন পরে রিলিভিং হ্যান্ড এসে পৌঁছয়, আর তাকে আমার কাজ বুঝিয়ে দিয়ে, দায়িত্ব হ্যান্ড ওভার করে সাতদিনের দিন আমি নাইরোবিতে এসে ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ধরি।”
“অর্থাৎ লোকটা যা বলেছিল, তা-ই ঘটিয়ে ছাড়ল?” সদানন্দবাবু বললেন, “ওরে বাবা রে বাবা, এ তো দেকচি সাংঘাতিক ব্যাপার!”
অমিতাভ ম্লান হেসে বলল, “একেই আপনি সাংঘাতিক ব্যাপার বলছেন? বাট ইট্স নাথিং কমপেয়ার্ড টু হোঅট হ্যাজ হ্যাপেনড রিসেন্টলি। মনে হচ্ছে একটা চক্করের মধ্যে পড়ে গেছি। এই কালীচরণ লোকটা আমাকে নিয়ে এখনও আরও বেশ কিছুদিন খেলবে, এক্ষুনি ছাড়বে না।”
