(১৮)
চাইল্ড স্পেশ্যালিস্টের নাম-ঠিকানা লেখা চিরকুটখানা ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েই সুরঞ্জন বসাক রাইট অ্যাবাউট টার্ন করে ফের ফ্ল্যাটের মধ্যে ঢুকে গিয়ে দরজাটাকে দড়াম করে আমাদের মুখের উপরে বন্ধ করে দিলেন। বুঝলুম আমাদের সঙ্গে কথাবার্তায় আটকে গিয়ে তাঁর যেটুকু সময় নষ্ট হয়েছে, এবারে তার যতটা সম্ভব মেক আপ করে নিয়ে তিনি সাইটের দিকে ছুট লাগাবেন।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম সাতটা পঁয়ত্রিশ।
দরজা বন্ধ করার পদ্ধতি দেখে সদানন্দবাবু কিঞ্চিৎ ঘাবড়ে গিয়ে থাকবেন, এবারে পকেট থেকে রুমাল বার করে ঘাড় আর কপাল মুছে নিয়ে অস্ফুট গলায় বললেন, “অতি অসভ্য লোক। কোথায় ভেতরে নিয়ে গিয়ে বসাবে, তা নয়, স্রেফ বাইরে দাঁড় করিয়ে রেকে কতা কইতে লাগল। ভাবা যায় না!”
বললুম, “একটু চোয়াড়ে টাইপের।”
“তার ওপরে চ্যায়রাখানা দেকলেন? বাপ্স, রেতের বেলায় যদি এই রকমের একখানা চ্যায়রা হঠাৎ সামনে এসে উদয় হয়, তো নির্ঘাত আমি ঘাবড়ে যাব মশাই। হয়তো হার্টফেলও করতে পারি।”
“দিনের বেলাতেও তো বেশ ঘাবড়ে গেসলেন বলে মনে হল।”
“তা একটু গেসলুম ঠিকই,” সদানন্দবাবু অপ্রস্তুত হাসলেন। তারপর হঠাৎ তাঁর গলায় খানিকটা সম্ভ্রমের ছোঁয়া লাগিয়ে বললেন, “তবে হ্যাঁ, খারাপটা যখন বললুম, তখন ভাল দিকটার কতাও বলতে হবে।”
“ভাল দিকটা কী?”
“সে তো দেকলেনই, খুব ডিউটি-মাইন্ডেড। উনি এখেনে আটকে গেচেন বলে সাইটের কাজকম্মোও যে আটকে রয়েচে, এইটে ভেবে খুব ছটফট করছিলেন।”
ভাদুড়িমশাই তাঁর হাতের চিরকুটখানার উপরে চোখ রেখে ভুরু কুঁচকে কিছু ভাবছিলেন। কাগজের টুকরোটাকে এবারে পকেটে পুরে বললেন, “তা হলে কি এই বারান্দাতেই আমরা দাঁড়িয়ে থাকব, নাকি আর কোথাও আমাদের যেতে হবে?”
বললুম, “তারাপদ দত্ত তো তিনতলাতেই থাকেন। তাঁর সঙ্গেও কথা বলবেন বলেছিলেন। তা এখনই সেটা চুকিয়ে ফেললে হয়।”
“তারাপদ দত্ত সকাল এগারোটার আগে হেলথ সেন্টারে যান না।”
“এটা কী করে জানলেন?”
“কাল রাত্তিরে ডক্টর গোকুল ঘোষকে ফোন করেছিলুম, তিনিই বললেন।…তো যে কথা হচ্ছিল। হেলথ সেন্টার এখান থেকে পাঁচ মিনিটের পথ। তার মানে পৌনে এগারোটা পর্যন্ত তারাপদ দত্ত সম্ভবত বাড়িতেই থাকবেন। আর এখন তো মাত্র পৌনে আটটা বাজে। হাতে যথেষ্ট সময় রয়েছে। চলুন, এর মধ্যে আর-একজনের সঙ্গে দেখা করে আসা যাক।”
“আর-একজন মানে কি মিসেস মালহোত্রা?”
“কী ব্যাপার,” ভাদুড়িমশাই সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, এক মুহূর্ত থেমে থেকে মৃদু হেসে বললেন, “আর সবাইকে ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ মিসেস মালহোত্রার কথাটা আপনার মনে এল কেন? এনি স্পেশ্যাল রিজন?”
সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে-নামতে বললুম, “তার কারণ আছে বইকী। মিসেস দাশের হাতের মুঠোয় কয়েক গাছি চুল পাওয়া গেছে বলছিলেন না? …মানে কাল রাত্তিরে শেখর ঘোষাল তো এই কথাটাই ফোন করে আপনাকে জানিয়েছেন?”
“হ্যাঁ, তা জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে হলটা কী?”
উত্তরটা তক্ষুনি তক্ষুনি দেওয়া গেল না। কারণ, ইতিমধ্যে আমরা নীচে পৌঁছে গিয়েছিলুম। সেইসঙ্গে, ফ্ল্যাটবাড়ির সদর দরজা দিয়ে বাইরের ফাঁকা জমিতে বেরিয়ে আসতে-আসতে এটাও দেখতে পেয়েছিলুম যে, আগের পাহারাদারটির জায়গায় নতুন আর-একজন লোক ইতিমধ্যে মোতায়ান হয়েছে। আগেরটির তুলনায় এর বয়েস অনেক বেশি। অন্তত পাকা গোঁফ দেখে সেইরকমই মনে হল। তবে আমরা বাইরে বেরুতে যে-রকম সন্দিগ্ধ চোখে আপাদমস্তক আমাদের জরিপ করে নিল, তাতে, বয়স যা-ই হোক, এর দৃষ্টিশক্তি যে কিছুমাত্র কম, এমন মনে হল না।
ফাঁকা জমিটুকু পেরিয়ে, রাস্তায় নেমে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “আপনি জিজ্ঞেস করছিলেন যে, তাতে হলটা কী? কেন, আপনি নিজে সেটা বোঝেননি?”
সদানন্দবাবু বললেন, “আমি কিন্তু বুজিচি।”
আমি বললুম, “যে-কোনও লোকই বুঝবে। এ তো জলের মতো সোজা ব্যাপার।”
সদানন্দবাবু বললেন, “জাস্ট লাইক ওয়াটার।”
ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে বললেন, “কাণ্ড দেখুন। আপনিও বুঝেছেন, সদানন্দবাবুও বুঝেছেন, অথচ আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। তো ঠিক আছে, বুঝতে যখন পারছিই না, তখন আপনারা একটু দয়া করে বুঝিয়ে বললেই তো হয়।”
বললুম, “বোঝাবার তো কিছু নেই। মিসেস দাশের মুঠোর মধ্যে যে চুল পাওয়া গেছে, সেটা কার চুল বলে আপনার মনে হয়?”
“সম্ভবত মিসেস দাশকে যে খুন করতে এসেছিল, তার।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ধস্তাধস্তির সময় মিসেস দাশ নিশ্চয় তার চুল আঁকড়ে ধরেছিলেন, তখনই কয়েক গাছি চুল তাঁর মুঠোর মধ্যে আটকে যায়। এটা না বোঝায় তো কারণ নেই।”
“ঠিক আছে, এবারে তার পরের কথাটা ভাবুন। মুঠোর মধ্যে যে চুল পাওয়া গেছে, তার রং তো হলদেটে, তাই না?”
“শেখর ঘোষাল তো সেইরকমই বললেন। গোল্ডেন ব্রাউন।”
“ওই হল।” আমি বললুম, “তার মানেই হলদেটে।”
“বেশ, হলদেটেই নাহয় বলা গেল। শেখর ঘোষালও ‘হলদেটে’ কথাটা ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু তাতেই বা হলটা কী?”
“এর পরেও বলছেন হলটা কী?” অধৈর্য হয়ে বললুম, “আশ্চর্য। মিসেস মালহোত্রার চুলের রং কী, সেটা কি তা হলে আপনার নজর এড়িয়ে গেছে?”
“তা কেন যাবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনারা অবিশ্যি দু’বার তাঁকে দেখবার সুযোগ পেয়েছেন, পরশু রাত্তিরে একবার, আর কাল সকালে একবার। আমি সে-ক্ষেত্রে মাত্র একবারই তাঁকে দেখেছি…ওই মানে পরশু রাত্তিরে মিঃ কালীচরণ সেনের ডিনার পার্টিতে। তবে হ্যাঁ, তখনই দেখে নিয়েছি যে, আশা মালহোত্রার চুলও হলদেটেই বটে।”
সদানন্দব ব্লু কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, “ধন্যি লোক মশাই আপনি।”
“কেন, আমি আবার কী করলুম?”
“বাঃ, মিসেস দাশের হাতের মুঠোয় হলদে রঙের চুল পাওয়া গেচে, আর আপনি নিজেই বলচেন যে, সেই চুল কালপ্রিটের হওয়াই সম্ভব। বলেননি?”
“সে তো এখনও বলছি।”
“এদিকে আবার মিসেস আশা মালহোত্রার চুলের রং যে হলদে, তাও আপনার মনে আচে!”
“আছেই তো।”
“যাচ্চলে!” সদানন্দবাবু বললেন, “তাও হাত গুটিয়ে বসে আচেন আপনি?”
“তা ছাড়া আর কী করব?”
“তাও বলে দিতে হবে? আরে মশাই, পুলিশকে বলে ওকে অ্যারেস্ট করাবার ব্যবস্থা করবেন তো।”
“ওকে মানে কাকে?”
ভাদুড়িমশাই যে ইচ্ছে করেই না-বোঝার ভান করছেন, সম্ভবত সেটা ধরতে পেরেই সদানন্দবাবুর এবারে ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। উত্তেজিত গলায় বললেন, “আশা মালহোত্রাকে। সে-ই যে খুনি, তাতে তো আর সন্দেহ নেই। সুরেশ যখন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেসল, তখনই ফাঁক বুঝে সে ওই ফ্ল্যাটে ঢুকে মিসেস দাশকে অ্যাটাক করে। তখন ধস্তাধস্তি হয়, আর ধস্তাধস্তির সময় আশা মালহোত্রার দু’চার গাছি চুল ছিঁড়ে গিয়ে মিসেস দাশের মুঠোর মধ্যে থেকে যায়। পুলিশকে এই কতাটা বুজিয়ে বলুন যে, দে শুড অ্যরেস্ট আশা মালহোত্রা ইমিডিয়েটলি।”
উত্তেজিত আমিও একটু হয়েছিলুম। বললুম, “সদানন্দবাবু ঠিক কথাই বলছেন। দেরি করলে পাখি নিশ্চয় চুপ করে বসে থাকবে না। মিসেস দাশের হাতের মুঠোয় হলদে রঙের চুল পাওয়ার কথাটা জানতে পারলেই আশা মালহোত্রা পালিয়ে যাবে। পুলিশকে আপনি জানিয়ে দিন যে, তার আগেই মিসেস মালহোত্রাকে অ্যারেস্ট করা দরকার। অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল।”
ভাদুড়িমশাই একটুও উত্তেজিত হলেন না। সামান্য হেসে বললেন, “ পুলিশকে জানাবার তো কিছু নেই, তারা তো আশা মালহোত্রাকে অ্যারেস্ট করতেই চায়। কাল রাত্তিরেই হয়তো অ্যারেস্ট করত।”
“তা হলে করেনি কেন?”
“আমি নিষেধ করে দিলুম।”
শুনে আমি হতভম্ব। কী যে বলব, কিছুই বুঝতে পারলুম না। সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলুম, তিনিও হাঁ হয়ে গেছেন। তবে, আমার আগে তিনিই সামলে নিলেন নিজেকে। বললেন, “আপনি?”
“হ্যাঁ, আমি।” হাসিটাকে মুখ থেকে চোখে চালান করে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আশা মালহোত্রার চুলের রং যে হলদে, শেখর ঘোষাল তা জানে না ভাবছেন কেন? ভালই জানে। কাল রাত্তিরে যখন আমাকে ফোন করে, তখন মিসেস দাশের মুঠোর মধ্যে হলদে রঙের কয়েক গাছি চুল পাওয়ার কথা জানিয়েই তাই শেখর বলেছিল যে, মিসেস মালহোত্রাকে অ্যারেস্ট করবার জন্যে পলাশডাঙার থানা অফিসারকে এক্ষুনি মেসেজ পাঠানো হবে।”
“তাতে আপনি কী বললেন?” প্রশ্নটা আমার।
“আমি বললুম, মেসেজটা যখন পাঠানো হয়নি, তখন আর ওটা পাঠাবেন না। শুনে, শেখর ঘোষাল যা বলল, কিরণবাবু, একটু আগে আপনিও ঠিক তা-ই বলেছেন।”
“অ্যাঁ?”
“হ্যাঁ। শেখর ঘোষাল বলল, অ্যারেস্ট না করলে পাখি নিশ্চয় পালিয়ে যাবে।…তা হলে দেখছেন তো, কিরণবাবু, একজন পুলিশ অফিসারের সঙ্গে আপনার কথার কত মিল। ইউ শুড ফিল প্রাউড, কী বলেন?”
কথাটা যে ব্যঙ্গ করে বলা, সেটা বুঝে বললুম, “ঠাট্টা রাখুন, পাখি তো পালাতেই পারে।”
ভাদুড়িমশাইয়ের চোখ এখনও কৌতুকে ঝিকমিক করছে। বললেন, “কাল বিকেলেই তো এদের ফাংশান, তা-ই না?”
“হ্যাঁ, কালই তো এগারোই অক্টোবর।”
“তা হলে নিশ্চিত থাকুন, কাল বিকেলের আগে কেউ এই টাউনশিপ ছেড়ে পালাবে না।”
“বাট হাউ ক্যান ইউ বি সো শিওর?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আরে মশাই, আপনি আর সদানন্দবাবু তো শুধু মিসেস মালহোত্রার কথাই সারাক্ষণ ভেবে যাচ্ছেন। আর আমি ভাবছি, যেমন মিসেস মালহোত্রা, তেমনি আরও অনেকের কথা।…তবে হ্যাঁ, তাদের মধ্যে কয়েক জনের কথা যে একটু বেশি-বেশি ভাবছি, তাও ঠিক। শেখরকে কাল রাতে তাদের নামগুলো আমি জানিয়ে দিয়েছি। সেইসঙ্গে তাকে কী করতে বলেছি জানেন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “কী করতে বলেছেন?”
“বলেছি, সুরেশকে যেমন অ্যারেস্ট না করে চোখে-চোখে রাখা হয়েছে, তেমনি এদেরও কাউকেই এখন অ্যারেস্ট করবার দরকার নেই। কিন্তু নজরদারিতে তাই বলে ঢিলে দেওয়া চলবে না। আর হ্যাঁ, এটাও দেখতে হবে যে, এদের একজনও যেন এই এলাকা ছেড়ে কোথাও সরে পড়তে না পারে। নাইদার বাই ট্রেন, নর বাই রোড।”
বললুম, “শেখর ঘোষাল তাতে রাজি হলেন?”
“হচ্ছিল না। ওর যুক্তি, ইট’স আ ফ্রি ডিমোক্রেটিক কানট্রি, নজরদারির একটা ব্যবস্থা করা যায় ঠিকই, কিন্তু স্রেফ সন্দেহের উপরে ভিত্তি করে কাউকে ওইভাবে কোথাও আটকে রাখা যায় না।”
“ভদ্রলোক তো ঠিকই বলেছেন, “ আমি বললুম, “ওইভাবে জোর করে কাউকে আটকে দিলে তাই নিয়ে মানহানির মোকদ্দমা হতে পারে, কাগজে লেখালিখি হতে পারে, চাই কী অ্যাসেমব্লিতে হয়তো দুম করে একটা প্রশ্নও কেউ তুলে ফেলতে পারে। সে তো কেলেঙ্কারির একশেষ।”
সদানন্দবাবু বললেন, “হরি, হরি! তখন ম্যাও ধরবে কে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাদের দুজনের সঙ্গেই এখানকার এস.ডি.পি.ও. শেখর ঘোষালের বেশ মিল আছে দেখছি। শেখরও ঠিক এই ভয়ই পাচ্ছিল।”
“তা হলে তাকে রাজি করালেন কী করে?”
“সেটা কি খুব শক্ত কাজ নাকি?” ভাদুড়িমশাই রহস্যময় হাসলেন। “বললুম যে, শেখর, বিনা কারণে জোর করে যে কাউকে কোথাও আটকে রাখা যায় না, সে তো খুবই ঠিক কথা, কিন্তু একটা অ্যাকসিডেন্টের ব্যবস্থা তো করাই যায়।”
“তার মানে?”
“মানে আর কিছুই নয়, কলকাতা থেকে যাতে করে আমরা এখানে এসেছি, এখান থেকে বিকেলের সেই আপ ট্রেন ছাড়ে…মানে ছাড়বার কথা পাঁচটা পঁয়তিরিশে, আর হাওড়ামুখো ডাউন ট্রেন ছাড়ে বিকেল তিনটে চল্লিশে। তা এই টাউনশিপ থেকে যে রাস্তাটা আধমাইলটাক এগিয়ে স্টেশনে যাবার রাস্তায় গিয়ে মিশেছে, আজ বিকেল তিনটে নাগাদ যদি দুটো পুলিশভ্যান ব্রেকডাউন হয়ে তার উপর পড়ে থাকে তো ক্ষতি কী। তবে হ্যাঁ, কাল এদের ফাংশন শেষ হওয়া পর্যন্ত ও-দুটো ভ্যানকে ওখান থেকে সরানো চলবে না।”
ভাদুড়িমশাইয়ের প্ল্যানটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। বললুম, “তার মানে আজ বিকেল তিনটে থেকে কাল রাত্তিরে ফাংশান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই টাউনশিপের কাউকেই আপনি আপ কিংবা ডাউন ট্রেনে উঠতে দিচ্ছেন না, কেমন?”
“শুধু ট্রেনে ওঠা কেন, বাই রোডও কাউকে এখান থেকে সরে পড়তে দিচ্ছি না।”
সদানন্দবাবু বললেন, “তার জন্য রাস্তার ওপরে দু’-দুটো ভ্যান ব্রেকডাউন হয়ে পড়ে থাকবে? এটা একটু আনন্যাচারাল ব্যাপার হয়ে যাবে না?”
“কিচ্ছু আনন্যাচারাল ব্যাপার হবে না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কেন, জি টি রোডের ওপরে লরি ব্রেকডাউন হয়ে সক্কলের পথ আটকে গেছে, এটা কখনও দেখেননি নাকি?”
“কিন্তু এ ভো লরি নয়, পুলিশ ভ্যান।” আমি বললুম, “তার উপরে আবার দেড়দিন রাস্তা আটকে পড়ে থাকবে। পুলিশকে লোকে যাচ্ছেতাই করে গালাগাল করবে যে!”
“তা করবে,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তাই নিয়ে নিশ্চয় কাগজে লেখালিখিও হবে না, অ্যাসেমব্লিতে কেউ প্রশ্নও তুলবে না। বড়জোর ‘নিজস্ব সংবাদদাতা’র দু’ লাইনের একটা খবর হয়তো আজ থেকে তিন দিন বাদে কোনও কাগজের মফস্সলের পাতায় বেরোতেও পারে, তাও যদি অন্য খবরের সেদিন খুব অনটন হয়।…কী কিরণবাবু, আপনি তো কাগজের লোক…ভুল বললুম?”
প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বললুম, “শেখর ঘোষাল তা হলে রাজি হয়ে গেলেন, কেমন?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তাও একটু গাঁইগুই করছিল। বলছিল যে, তার কনসেন্সে বাধছে। ফলে আমাকে অন্য লাইন ধরতে হল। বলতে হল যে, শেখর, তোমার ওপরওয়ালার সঙ্গে আমার সম্পর্ক যে কত ভাল, সে তো তুমি জানো। তা কলকাতায় ফিরেই তো এই কেসটার একটা রিপোর্ট লিখে তাঁর কাছে আমি পাঠিয়ে দেব, তখন আই শ্যাল পুট ইন আ গুড ওয়ার্ড ফর ইউ। …বাস, কাজ যা হবার, তাতেই হয়ে গেল।”
“অর্থাৎ শেখর ঘোষালের কনসেন্সের বাধা আর রইল না, কেমন?”
“না, রইল না। শেখর কী বলল জানেন? বলল, নিশ্চিন্ত থাকুন। এতো সামান্য ব্যাপার, তিনটের আগেই দুটো ভ্যান ওখানে ব্রেকডাউন করিয়ে দিচ্ছি।…মশাই, কনসেন্স অর্থাৎ বিবেক নামক বস্তুটির মতিগতি বোঝা কি চাট্টিখানি কথা? সে যে কখন কেন মাথা চাড়া দেবে, আবার কখন কেন মাথা হেঁট করে কেটে পড়বে, তার কি কোনও ঠিক আছে?”
ভাদুড়িমশাই হাসতে লাগলেন।
আমি কিন্তু হাসতে পারছিলুম না। বললুম, “কলকাতায় তো আমরা ফাংশানের পরের দিন অর্থাৎ পরশুই ফিরে যাচ্ছি, তাই না?”
“তা তো ফিরছিই।”
“ফিরেই তা হলে রিপোর্ট লিখছেন কী করে? আগে তো কেসটার একটা ফয়সালা হওয়া চাই।”
“কালকের মধ্যেই সেটা হয়ে যাবে।”
“খুনি কে, সেটা তা হলে আন্দাজ করতে পেরেছেন?”
“শুধু আন্দাজের উপরে কি কাজ হয়? প্রমাণ চাই।”
“চুলের রংটাও কি যথেষ্ট প্রমাণ নয়?”
“প্রমাণ তো অবশ্যই। কিন্তু যার চুলের রং হলদে, মিসেস দাশকে সে খুন করল কেন, সেটাও তো ভেবে দেখতে হবে। মোটিভের প্রশ্নটাকে কি এড়িয়ে যাওয়া যায়?”
“মোটিভ একটা-না-একটা পাওয়া যাবেই। সেটা আপনি খুঁজে বার করুন। তবে, মিসেস আশা মালহোত্রাই যে খুনি, সেটা তা হলে মেনে নিচ্ছেন, কেমন?”
ভাদুড়িমশাইয়ের উত্তরটা আর শোনা হল না। হঠাৎই সামনের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “আরে, ডঃ গোকুল ঘোষ না? ওঁর সঙ্গেই তো দেখা করতে যাচ্ছিলুম।…ভদ্রলোককে ডাকুন তো!” ডাকতে হল না। হাতে ওয়াকিং স্টিক, পরনে ট্রাউজার্সের সঙ্গে লাল নীল আর সবুজের ছোপ লাগানো রংচঙে হাওয়াইয়ান শার্ট, মুখে পাইপ গোকুল ঘোষ আমাদের দিকেই আসছিলেন। কাছাকাছি এসে বললেন, “গুড মর্নিং এভরিবডি। তা এদিকে কোথায়? একটু বেড়াতে বেরিয়েছেন বুঝি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার কাছেই যাচ্ছিলুম।”
“কেন? কারও শরীর-টরির খারাপ হয়নি তো?”
“না না, সে সব কিছু নয়, অন্য দু-একটা কথা ছিল।”
“বেশ তো,” গোকুল ঘোষ বললেন, “এ তো আমার সৌভাগ্য। আসুন, আসুন, আমার গরিবখানায় বসেই কথা বলা যাক। সুলেখা বাড়িতেই রয়েছে। সেও খুব খুশি হবে।”
