আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৭)

আজ ১০ অক্টোবর, মঙ্গলবার। কুকুরের ডাকে কাল রাত বারোটার আগে দু’ চোখের পাতা এক করতে পারিনি। পাড়ার নেড়িকুত্তাগুলো হঠাৎই এমন চিল্লাচিল্লি জুড়ে দিয়েছিল যে, সে আর কহতব্য নয়। ভেবেছিলুম ঘুম আর হবেই না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ঘুম এসে যায়। তার খানিক আগে পাশের ঘরে ভাদুড়িমশাইয়ের গলা পেয়েছিলুম। এত রাতে তিনি কার সঙ্গে কথা বলছেন, ঘুম-চোখে তখন সেটা আন্দাজ করতে পারিনি। এখন মনে হচ্ছে, সম্ভবত তিনি ফোনে কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন। রাত্তিরে ঘুমোতে দেরি হলেও আজ অবশ্য আমার পক্ষে খুব সকাল-সকালই উঠে পড়েছি। হাতঘড়িতে দেখলুম ছ’টা বাজে। পাশের বিছানায় সদানন্দবাবুকে দেখা গেল না। নিশ্চয়ই মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়ে পড়েছেন।

 

সদানন্দবাবু ফিরলেন সওয়া ছ’টায়। এসেই বললেন, “ঝোলা-ন্যাজের কুকুরগুলো..মানে ওই যেগুলোর ন্যাজ বিড়ের মতন পাকিয়ে না-গিয়ে একটা স্ট্রেট লাইনের মতন ভার্টিক্যালি মাটির দিকে ঝুলে পড়ে, সেগুলো যে খ্যাপা-কুকুর সেটা জানেন তো?”

 

বললুম, “তাই নাকি?”

 

“হ্যাঁ। তা ওই রকমের একটা ম্যাড ডগ আজ আমাকে তাড়া করেছিল।”

 

“বলেন কী!” উদ্বিগ্ন গলায় বললুম, “কামড়ে-টামড়ে দেয়নি তো?”

 

“কামড়াবার দরকার হয় না, সেরেফ একটু আঁচড়ে দিলেই হল। নির্ঘাত জলাতঙ্ক। কিন্তু না,” সদানন্দবাবু তাঁর হাতের লাঠিখানা উঁচিয়ে ধরে বললেন, “পারেনি। এটাকে বনবন করে ঘোরাতেই ব্যাটা তার ঝোলা-ন্যাজটাকে পেছনের দুই পায়ের মধ্যে ঢুকিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেল।… কিন্তু এ কী, আপনি এখনও শুয়ে রয়েচেন যে? ভাদুড়িমশাইয়ের জগিং হয়ে গেল, আমিও তা ধরুন মাইল তিনেক মর্নিং ওয়াক করে এলুম, আর আপনি কিনা এখনও বিছনা ছেড়ে ওটেননি? আরে ছিছি!”

 

বললুম, “চা না-পেলে উঠব কী করে?”

 

“আজ আর বেড-টি পাচ্ছেন না।”

 

“কেন?”

 

“সাড়ে ছ’টার মধ্যেই ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরিয়ে পড়ব।”

 

“এত তাড়াতাড়ি?”

 

“বাঃ, মনোরঞ্জনবাবু যে আটটার মধ্যেই সাইটে চলে যান, সেটা ভুলে গেলেন? তার আগে…এই ধরুন সাতটা নাগাদ তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে ধরতে হবে।”

 

বললুম, “সুরেশবাবুর পাশের ফ্ল্যাটে যিনি থাকেন, তাঁর কথা বলছেন তো?”

 

“তা ছাড়া আর কার কতা বলব?”

 

“ভদ্রলোকের নাম কিন্তু মনোরঞ্জন নয়, সুরঞ্জন।”

 

“ওই একই কতা হল।” সদানন্দবাবু বললেন, “নিন, আর কতা না-বাড়িয়ে এবারে উটে পড়ুন দিকি।”

 

উঠতেই হল। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে ডাইনিং হলেও নামতে হল সেই সাড়ে ছ’টার মধ্যেই। ব্রেকফাস্ট রেডি। ফলে টোস্ট, ডিমসেদ্ধ আর চা খেয়ে আমাদের পৌনে সাতটার মধ্যে গেস্ট হাউস ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে কোনও অসুবিধে হল না।

 

যে ফ্ল্যাটবাড়িতে সুরেশবাবুরা থাকেন, জগিং করে ফেরার পথেই সেটা ভাদুড়িমশাই আজ চিনে এসেছিলেন। গেস্ট হাউস থেকে হাঁটাপথে সেখানে পৌঁছতে মোটামুটি মিনিট বিশেক লাগে। একটা নয়, রাস্তার ধারে পাশাপাশি এখানে গোটাকয়েক ফ্ল্যাটবাড়ি বানানো হয়েছে। তার মধ্যে কোনটার দোতলায় সুরেশচন্দ্র থাকেন, ভাদুড়িমশাই সেটা আগেভাগে চিনে না এলেও কোনও অসুবিধে হত না, এনট্রান্সের একপাশে একটা টুলের উপরে যে একজন কনস্টেবল বসে আছে, এটা দেখেই বাড়িটাকে চিনে নেওয়া যেত। এ যে কাল রাত্তিরের সেই একই পাহারাদার, তাও চিনতে পারলুম। রাত্তিরে ঘুমোতে পারেনি বলে টুলে বসে লোকটা ঝিমোচ্ছিল। বেচারার ডিউটি আওয়ার্স এখনও শেষ হয়নি।

 

দোতলায় উঠে একটুক্ষণের জন্যে দাঁড়িয়ে রইলেন ভাদুড়িমশাই। এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে কিছু ভেবে নিলেন। তারপর বললেন, “সুরেশচন্দ্র থাকেন ডাইনের অর্থাৎ রাস্তার দিকের ফ্ল্যাটে। নইলে আমি যে জগিং করছি, কাল সকালে এটা তাঁর বারান্দা থেকে তিনি দেখতে পেতেন না। বাঁ দিকের ফ্ল্যাটটা তা হলে সুরঞ্জনবাবুদের। চলুন, কড়া নাড়া যাক।’

 

কড়া নাড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই বছর চল্লিশ বয়সের ঘোর কৃষ্ণবর্ণ যে মানুষটি ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন, তাঁর হাইট অন্তত ছ’ফুট। শরীরের গড়ন বেশ মজবুত। মাথার চুল একেবারে চামড়া ঘেঁষে ছাঁটা। মোটা ভুরুর নীচে মার্বেল-গুলির মতো ছোট-ছোট দুটো চোখ। চোখের চাউনি যে খুব প্রসন্ন, এমন মনে হল না। লোকটির ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত। বুকভর্তি কাঁচাপাকা লোমের জঙ্গল। নিম্নাঙ্গে একটা চেক-কাটা লুঙ্গি। তবে মাদ্রাজি কফির দোকানের ছোকরা বয়দের মতন সেটিকেও দু’ ভাঁজ করে পরেছেন বলে হাঁটুর নীচের অংশ তাতে ঢাকা পড়েনি। এক নজর দেখে আন্দাজ করলুম যে, গায়ে তেল মেখে ইনি স্নানের উদ্যোগ করছিলেন। আন্দাজটা যে ভুল নয়, সেটা একটু বাদেই বোঝা গেল।

 

ভদ্রলোক আমাদের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললেন, “কাকে চাই?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি নিশ্চয় সুরঞ্জনবাবু?”

 

“হ্যাঁ, আমার নাম সুরঞ্জন বসাক। কিন্তু আপনাদের তো চিনতে পারলাম না।”

 

“আমরা কলকাতা থেকে এসেছি। আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল।”

 

“কিন্তু আমার তো এখন সময় হবে না। আমি চান করতে যাচ্ছি। চান করেই বেরিয়ে পড়তে হবে। এখন কী করে কথা বলব?”

 

“কোথায় যাবেন?”

 

“সাইটে। আটটার মধ্যে সেখানে পৌঁছতে হবে, নইলে কাজ শুরু হবে না।”

 

“কাজটা খুব জরুরি?”

 

সুরঞ্জন বসাক প্রশ্নটার কোনও উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “ভূমিকম্প হয়নি, আগুন লাগেনি, তবু একটা নতুন বাড়ি হঠাৎ ধসে পড়ল—এমন কথা আপনারা কেউ কখনও শোনেননি?”

 

“শুধু শুনব কেন,” সদানন্দবাবু বললেন, “চোখের সামনেই তো দেকচি। এই সেদিনই তো কলকাতায় একটা বাড়ি হঠাৎ হুড়মুড় করে ধসে পড়ল। বাড়িটা নাকি সদ্য তৈরি হয়েছিল।”

 

“কেন ধসে পড়ল, কোনও আইডিয়া আছে?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “পড়বেই তো। যত্ত সব ফাঁকিবাজির কারবার। আর গরমেন্টও হয়েছে তেমনি!”

 

ভাদুড়িমশাই মৃদু-মৃদু হাসছিলেন। কিন্তু সুরঞ্জন বসাক সেটা লক্ষ করলেন না। সরাসরি সদানন্দবাবুর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত গলায় বললেন, “ও তো ভাসা-ভাসা কথা হল। লোহার মধ্যে কোনটা মরা আর কোনটা জ্যান্ত, সেটা বোঝেন?”

 

সদানন্দবাবু ঢোক গিলে বললেন, “না।”

 

“ঠিক আছে। রড-বাইন্ডিং কাকে বলে জানেন?”

 

সদানন্দবাবু পুনশ্চ ঢোক গিললেন। “না।”

 

“মর্টার…মানে ওই যাকে আপনারা মশলা বলেন, ঢালাই, গাঁথনি আর প্লাস্টারের সময় তাতে সিমেন্টের রেশিয়ো যে আলাদা-আলাদা হয়ে যায়, সেটা জানেন তো? নাকি তাও জানেন না?”

 

সদানন্দবাবু একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। স্রেফ একটা আলগা মন্তব্য করার ফলে যে তাঁকে এইরকম জেরার মুখে পড়তে হবে, তা নিশ্চয় তিনি ভাবতেও পারেননি। ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে করুণ গলায় বললেন, “ও মশাই, আপনি কিচু বলুন না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাজটা ঢালাইয়ের?”

 

“হ্যাঁ, ছাত ঢালাই।” সুরঞ্জন বসাক বিরক্ত গলায় বললেন, “মূল কারখানার একটা অ্যানেক্সের ছাত। কাল সারা দিন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে রড-বাইন্ডিংয়ের কাজ করিয়ে এসেছি। এখন গিয়ে দেখতে হবে কনট্রাকটর তার থেকে কিছু রড ইতিমধ্যে সরিয়ে ফেলল কি না। যদি দেখি যে, না সরানো হয়নি, তো ঢালাইয়ের অর্ডার দেব। কিন্তু তাতেই কি রেহাই আছে? স্টোন চিপস আর বালির সঙ্গে সিমেন্টের ভাগটা ফোর ইজ টু ওয়ান হচ্ছে কি না, সারাক্ষণ সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ফ্রম স্টার্ট টু ফিনিশ।” ভাদুড়িমশাই সমস্ত কথা খুব মন দিয়ে শুনলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন, “কিন্তু আপনি গিয়ে অর্ডার না দিলে তো ঢালাইয়ের কাজ শুরু হচ্ছে না।”

 

“তা তো হচ্ছেই না।”

 

“বেশ, তা হলে আধ ঘন্টা বাদে…মানে আটটার বদলে সাড়ে আটটায় সেটা আজ শুরু হোক। তার মধ্যেই আপনার সঙ্গে আমাদের কথা আমরা চুকিয়ে ফেলতে পারব।”

 

“কিন্তু তা কী করে হয়?” সুরঞ্জন বসাক অধৈর্য ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বললেন, “আটটাতেই তো কাজ শুরু হবার কথা।”

 

“সেটা আজ আধ ঘন্টা বাদে শুরু করতে হবে।” পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বার করে সুরঞ্জন বসাকের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “অর্ডারটা পড়ে দেখুন।”

 

কাগজখানার উপরে চোখ বুলিয়ে সুরঞ্জন বসাক বললেন, “আপনারা পুলিশের লোক?”

 

“না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে আপনাদের এস.ডি.পি.ও. শেখর ঘোষাল আমাদের ভালই চেনেন।”

 

শুনে, সুরঞ্জন বসাক এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর কাষ্ঠ হেসে বললেন, “ঠিক আছে। পুলিশসায়েব যখন চান, তখন আর উপায় কী। তা কী বলবেন, বলুন।”

 

“কয়েকটা কথা আপনাকে জিজ্ঞেস করব।”

 

“বেশ তো, করুন।”

 

“সুরেশবাবু তো একেবারে আক্ষরিক অর্থেই আপনার নেক্সট-ডোর নেবার, তা ওঁর সঙ্গে আপনার কদ্দিনের পরিচয়?”

 

“যদ্দিন এই ফ্ল্যাটবাড়িতে আছি, তদ্দিনের।”

 

“এখানে কবে থেকে আছেন?”

 

সুরঞ্জন বসাকের ভুরু সামান্য কুঁচকে গেল। মনে-মনে সম্ভবত সময়ের একটা হিসেব করে নিলেন। তারপর বললেন, “মাস দশেক হল।”

 

“এই কোয়ার্টার্সে ঢুকবার আগেও কি আপনি এখানকার…আই মিন বুকানন ইন্ডিয়ার চাকরি করতেন?”

 

“না।”

 

“তার মানে বুকানন ইন্ডিয়ার কাজেও আপনি ওই মাস দশেক আগেই ঢুকেছেন, কেমন?”

 

“হ্যাঁ।”

 

“এর আগে কোথায় কাজ করতেন?”

 

“আসানসোলের একটা কন্সট্রাকশন ফার্মে। সেখানে আমি অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজার ছিলাম। গত ডিসেম্বরে এখানে চলে আসি।”

 

“এখানে কী পোস্টে আছেন?”

 

“পোস্ট ওই অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারভাইজারেরই। তবে কোম্পানিটা অনেক বড় তো, মাইনেও তাই আগের তুলনায় কিছু বেশি পাচ্ছি। তা ছাড়া অন্য কিছু সুবিধেও আছে।”

 

“যেমন?”

 

“যেমন ফ্রি কোয়ার্টার। যেমন ওভারটাইম। যেমন বিনি পয়সায় ডাক্তার দেখাতে পারছি, ওষুধপত্তরও পাচ্ছি বিনি পয়সায়। আগে যেখানে কাজ করতাম, সেখানে এ-সব সুবিধে ছিল না।”

 

“সুরেশবাবুর সঙ্গে তা হলে ওই ডিসেম্বর থেকেই পরিচয়?”

 

“হ্যাঁ, তার আগে ওঁকে আমি চিনতাম না।”

 

“সুরেশবাবু মানুষটি কেমন?”

 

“স্বার্থপর, সেলফিশ।”

 

“এ-কথা কেন বলছেন?”

 

“কেন বলব না? আগেভাগেই পুব-দক্ষিণ খোলা ফ্ল্যাটটা বাগিয়ে নিয়েছে।”

 

এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বলেন, “পরশু সকালে যা ঘটে গেল, সেই কথায় আসা যাক। ওঁর স্ত্রী যে মারা গেছেন, এটা বুঝবামাত্র সুরেশবাবু চিৎকার করে উঠেছিলেন, তাই না?”

 

“বুঝে চিৎকার করেছিলেন, নাকি বুঝবার আগেই চিৎকার করেছিলেন, তা কী করে বলব? তবে হ্যাঁ, চিৎকার শুনেই আমি ছুটে গিয়েছিলাম।”

 

“গিয়েই কি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মিসেস দাশ বেঁচে নেই?”

 

“তৎক্ষণাৎ সেটা বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম অজ্ঞান হয়ে গেছেন, একটু বাদেই নিশ্চয় জ্ঞান ফিরে আসবে। এরই মধ্যে সুরেশবাবু তিনতলায় উঠে গিয়ে ডাক্তার দত্তকে খবর দেন। ডাক্তার দত্তও প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই দোতলায় নেমে আসেন। মিসেস দাশকে পরীক্ষা করে তিনিই প্রথম স্পষ্ট করে জানিয়ে দেন যে, কী হয়েছে।”

 

“তার পরেও আপনি কিছুক্ষণের জন্যে সুরেশবাবুদের ফ্ল্যাটে ছিলেন নিশ্চয়?”

 

“না, মিসেস দাশ যে বেঁচে নেই, ডাক্তার দত্ত এটা জানিয়ে দেবার পরেই আমি আমাদের ফ্ল্যাটে চলে আসি।”

 

“আপনার স্ত্রীও আপনার সঙ্গেই ওখান থেকে চলে আসেন?”

 

“আমার স্ত্রী?” সুরঞ্জন বসাক বললেন, “তাঁর কথা কোত্থেকে আসছে? তিনি তো ওখানে যানইনি।…যাবেনই বা কী করে? আমার একটি মেয়ে আছে, রিকেটি, হাঁটতে পারে না, সারা দিন বিছানায় শুইয়ে রাখতে হয়, খুব কাঁদে, তাকে ছেড়ে ওঁর কোথাও যাবার উপায় নেই, সারাক্ষণ ভয়ে-ভয়ে থাকেন যে, মেয়ে না হঠাৎ তক্তপোশ থেকে পড়ে যায়।”

 

“কত বড় মেয়ে?”

 

“চার বছর হল, কিন্তু শরীরের বাড়বৃদ্ধি নেই, দেখলে দু’বছরের বাচ্চা বলে মনে হয়।”

 

“ভেরি স্যাড!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডাক্তার দেখিয়েছেন নিশ্চয়?”

 

“আসানসোলে থাকতে ডাক্তার হিরণ্ময় বিশ্বাসকে দেখিয়েছিলাম। ওখানকার কোলফিল্ড এরিয়ায় ডাক্তার বিশ্বাসের খুব নামডাক। পরে তো এখানে চলে এলাম। এখানে এসে ডাক্তার দত্তকে কয়েকবার দেখাই। উনি কিছু ওষুধও লিখে দেন। তাতে কোনও কাজ না হওয়ায় মাস দুয়েক আগে রবিবারের সঙ্গে তিন দিনের ক্যাজুয়াল লিভ জুড়ে দিয়ে মেয়েকে সরাসরি কলকাতায় নিয়ে যাই। সেখানে একজন নামজাদা চাইল্ড-স্পেশ্যালিস্টকে দেখাতে তিনি মেয়েকে এ-যাবৎ যা-যা ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে, তার প্রেসক্রিপশন দেখতে চান।”

 

“দেখিয়েছিলেন?”

 

“সব দেখিয়েছিলাম। আসানসোলের ডাক্তার বিশ্বাস আর এখানকার ডাক্তার দত্ত যখন যা-যা ওষুধ দিয়েছেন, তার প্রতিটি প্রেসক্রিপশন দেখিয়েছি। সব দেখে তিনি নতুন করে প্রেসক্রিপশন লিখে দেন। সেইসঙ্গে একটা অদ্ভুত কথা বলেন।”

 

“কী বলেন?”

 

“বলেন যে, হাতুড়ের পাল্লায় পড়ে মেডিক্যাল প্রফেশনটা এবার উচ্ছন্নে যাবে।”

 

“হাতুড়ে বলতে উনি কাকে বুঝিয়েছিলেন? ডাক্তার বিশ্বাস, নাকি ডাক্তার দত্তকে? নাকি দু’জনকেই?”

 

“তা তো জানি না।” সুরঞ্জন বসাক বললেন, “তবে হ্যাঁ, কলকাতার ডাক্তারবাবুর ওষুধ খেয়ে মেয়ে আগের চেয়ে ভাল আছে, দেয়াল ধরে-ধরে একটু-একটু হাঁটতেও পারছে। সারাক্ষণই অবশ্য নজর রাখতে হয়।”

 

“তা তো রাখতেই হবে, তা ছাড়া আর উপায় কী। তবে উপকার যখন পাচ্ছেন, তখন এই চাইল্ড-স্পেশ্যালিস্টের কাছে মেয়েকে আবার নিয়ে যাবেন নিশ্চয়?”

 

“তা তো বটেই। তিনি নিজেই সেইরকম বলে দিয়েছেন। বলেছেন, আপাতত তিন মাস এই ওষুধ চলবে, তারপর মেয়েকে আর-একবার দেখে তিনি বলবেন যে, ওষুধ পালটাবার দরকার আছে কি না।…তা দু’মাস তো কেটেই গেল, তাই ভাবছি যে, সামনের মাসেই মেয়েকে নিয়ে আর-একবার কলকাতায় যাব।”

 

“নিশ্চয় যাবেন।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এবারে আর দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

 

“করুন। কিন্তু দয়া করে আর খুব বেশিক্ষণ আমাকে আটকে রাখবেন না। অলরেডি আপনাকে আমি অনেকটা সময় দিয়েছি।”

 

ভাদুড়িমশাই হাতঘড়ি দেখে বললেন, “বিশ মিনিট দিয়েছেন। আরও মিনিট দশেক আমি পেতে পারি। তবে দরকার হবে না, পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই আপনাকে আমি ছেড়ে দেব। তা হলে প্রশ্ন করি, কেমন?”

 

“করুন।”

 

“সুরেশবাবু সে ইদানীং ভোরে উঠে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে জগিং করতে শুরু করেছিলেন, এটা আপনি জানেন?”

 

“জানি।”

 

“জগিং করে বাড়িতে ফিরতেন কখন?”

 

“তা তো বলতে পারব না। তবে এটা বলতে পারি যে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন সাড়ে পাঁচটা থেকে ছ’টার মধ্যে।”

 

“কখন ফিরতেন বলতে পারবেন না কেন?”

 

“এইজন্য পারব না যে, আটটায় সাইটে পৌঁছবার জন্য সাড়ে সাতটার মধ্যে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। অন্তত তার মধ্যে আমি সুরেশবাবুকে বাড়ি ফিরতে দেখিনি।”

 

“কিন্তু পরশু সকালে দেখেছিলেন নিশ্চয়?”

 

“তা দেখেছিলাম। তার কারণ পরশুদিন লক্ষ্মীপুজোর ছুটি ছিল বলে আমি সাইটে যাইনি!”

 

“পরশু সকালে উনি কখন ফিরেছিলেন, তা হলে তো সেটা আপনার জানার কথা। কখন?” এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন সুরঞ্জন বসাক। তারপর বললেন, “আটটা নাগাদ। দু’-চার মিনিট কম কিংবা বেশি হতে পারে।”

 

“আর মাত্র একটা প্রশ্ন করব। কলকাতার যে চাইল্ড-স্পেশ্যালিস্টের কাছে আপনার মেয়েকে আপনি নিয়ে গেসলেন, তাঁর নামটা কী? এটা কেন জানতে চাইছি, তাও বলি। আসলে আমার এক বন্ধুর নাতিরও একই অসুখ। বিস্তর ডাক্তার দেখিয়েছে, কিন্তু কোনও উপকার পায়নি। ভাবছি আপনাদের এই ডাক্তারকে দিয়ে একবার দেখাতে বলব।”

 

“এ আর বেশি কথা কী, একটু দাঁড়ান, এক্ষুনি আমি নাম-ঠিকানা লিখে আনছি।”

 

সুরঞ্জন বসাক ফ্ল্যাটের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

 

বেরিয়ে এলেন এক মিনিট বাদে। ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “ডাক্তারের নাম, চেম্বারের ঠিকানা, সব এখানে রইল।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *