আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৪)

সদানন্দবাবু বললেন, “আশ্চজ্জি কাণ্ড। কাল তো শুধু লক্ষ্মীপুজো নয়, রোববারও ছিল। তা একে রোববার, তায় লক্ষ্মীপুজোর দিন, তাও আপনার বস আপনাকে তাঁর বাড়িতে ডেকে পাটালেন? তাও কিনা ওই সক্কালবেলায়? এ তো মশাই ভাবাই যায় না।…আপনাদের ইউনিয়ন নেই?”

 

সুরেশচন্দ্র বললেন, “আছে। কিন্তু ইউনিয়নের কথা উঠছে কেন?”

 

“উটবে না?অত্যাচারের প্রোটেস্ট হবে না? আপনাদের এই নন্দী তো দেকচি ঘোর ত্যাঁদড় লোক মশাই! নইলে ছুটির দিনেও এইভাবে নাকে দড়ি দিয়ে খাটিয়ে মারে? আরে ছিছি।”

 

“না না, আপনি যা ভাবছেন, তা নয়।” সুরেশচন্দ্র বললেন, “নন্দীসায়েব খুবই ভাল লোক। কক্ষনো রাগমাগ করেন না, ডিপার্টমেন্টের সক্কলের সঙ্গে হেসে কথা বলেন, সক্কলের খোঁজখবর নেন, কাজকর্মে কারও কোনও অসুবিধে হলে সেটা মিটিয়েও দেন খুব তাড়াতাড়ি। না না, নন্দীসায়েব একজন সত্যিকারের ভাল মানুষ। তা এই রকমের মানুষ যদি মাঝেমধ্যে তাঁর বাড়িতে ডেকে পাঠান, তো তাই নিয়ে আমি ইউনিয়নের কাছে দরবার করতে যাব কেন? আর তা ছাড়া তিনি তো তাঁর পার্সোনাল কাজ করিয়ে নেবার জন্যে ডাকছেন না, আপিসের কাজেই তো ডাকছেন।”

 

এর পরে আর কথা না-বাড়িয়ে সদানন্দবাবুর চুপ করে যাওয়াই উচিত ছিল। কিন্তু তিনি যে কী ধাঁচের লোক, তা আগেই বলেছি। তিনি ভাঙেন তবু মচকান না। চুপ করে থাকা তাঁর ধাতে নেই। তাই সুরেশচন্দ্রের কাছ থেকে কোনও সমর্থন না পেয়ে প্রথমটায় একটু দমে গেলেও তিনি ফের ফুঁসে উঠলেন। বললেন, “হলই বা আপিসের কাজ। তার জন্যে তো দশটা-পাঁচটা আপিস আওয়ার্সই রয়েচে, কাজ যা করবার তা তারই মধ্যে সারতে হবে, তার জন্যে ছুটির দিনে বাড়িতে ডেকে পাটানো কেন?”“

 

সুরেশচন্দ্র আবারও তাঁর ক্ষীণ কন্ঠে বললেন, “না না, আপিসের একটা জরুরি কাজ, আড়াই লাখ টাকার পেমেন্ট, সেটা ফেলে রাখা ঠিক হত না।”

 

সদানন্দবাবু বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন, “জরুরি কাজ তো কী হয়েচে? দেখুন মশাই, আপিসের কাজ করে আমিও তো চুল পাকিয়েচি, সেও দস্তুরমতো সায়েবি আপিস, জেঙ্কিস অ্যান্ড জেঙ্কিনস, আপনাদের এই বুকানন কোম্পানি যত বড় কোম্পানিই হোক, সেও কিচু ফ্যলনা কোম্পানি নয়, কিন্তু কই, আমাদের সায়েবরা তো কক্ষনো কাউকে এইভাবে আপিসের কাজে বাড়িতে ডেকে পাটাতেন না। আমাদের বড় সায়েব টম জেঙ্কিস কী বলতেন জানেন?”

 

সুরেশচন্দ্র মিনমিন করে বললেন, “কী বলতেন?”

 

“বলতেন যে, আপিসের কাজ যারা আপিসে বসে শেষ করতে পারে না, তারা অ্যাজ ওয়ার্কারস একদম রদ্দি…ওয়ার্থলেস…ভদ্দরলোকের পাতে দেবার জুগ্যি নয়। একবার তো…’

 

ভাদুড়িমশাই অনেকক্ষণ একটাও কথা বলেননি। হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটার দিকে চোখ রেখে চুপ করে তিনি বসে ছিলেন। কিন্তু কোনও কিছুই সম্ভবত তিনি দেখছিলেন না। এবারে একেবারে হঠাৎ ‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, আগের কথাটা আগে হোক’ বলে সদানন্দবাবুকে থামিয়ে দিয়ে সুরেশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “কী একটা পেমেন্টের কথা আপনি বলছিলেন না?”

 

“হ্যাঁ,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “লেবার-কনট্রাকটরের একটা আড়াই লাখ টাকার পেমেন্ট।”

 

“এটা কীসের বাবদে পাওনা হয়েছিল? ওয়েজেস?”

 

“না, স্যার। ওয়েজেস নয়। রাজমিস্ত্রি, জোগাড়ে আর অন্য সব কুলিমজুরদের ডেলি ওয়েজেস হিসেবে ঠিকেদাররা যা দেয়, আমাদের কাছে তার থেকে অনেক বেশি টাকার বিল ওরা সাবমিট করে ঠিকই, তবে আমরা তা মিটিয়েও দিই, বড়-একটা অবজেকশন কখনও তুলি না…কিন্তু এটা সেই বিল নয়, এটা একটা খর্চার বিল।”

 

“কী রকম?”

 

“কনট্রাকটর বলছে যে, লেবারারদের থাকার ব্যবস্থা করতে জুলাই মাসের গোড়ায় তাকে টেম্পোরারি অনেকগুলি তাঁবু বানাতে হয়েছিল। তো সেই তাঁবুর জন্যে তাকে যে-সব শালখুঁটি আর তেরপল কিনতে হয়েছিল, তাতেই নাকি ওই আড়াই লাখ টাকা খর্চা হয়ে যায়।”

 

“বিলটা আটকে ছিল কেন?”

 

“আটকে থাকার একটা কারণ এই যে, টাকাটা দিতে আমরা আদৌ বাধ্য নই।”

 

“তার মানে?”

 

“মানে খুবই সহজ স্যার। ঠিকেদারের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি হয়, তাতে এমন কোনও শর্ত ছিল না যে, লেবারারদের থাকার ব্যবস্থাও আমাদেরই করে দিতে হবে।”

 

“ওটা তা হলে কে করবে?”

 

“ঠিকেদারই করবে।” সুরেশচন্দ্র বললেন, “ইন ফ্যাক্ট, মিস্ত্রি-মজুরদের যে চলতি রেট, তার থেকে আমরা অনেক বেশিই দিয়ে থাকি- পার হেড পার ডে দশ টাকা বেশি। এই বেশি টাকাটা এইজন্যেই দেওয়া হয় যে, ঠিকেদারের যদি কোনও বাড়তি খর্চা হয় তো এতেই সেটা পুষিয়ে যাবে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তাঁবুর বিলটা এইজন্যেই আটকে ছিল?”

 

“না, স্যার, আটকে দেবার পক্ষে ওটাই যথেষ্ট কারণ, তবে শুধু ওইজন্যেই যে আটকে ছিল, তা নয়। আবার কারণ যতই থাক, ওটা আটকে রাখায় অন্য দিক দিয়ে যে কিছু অসুবিধে হচ্ছিল, তাও ঠিক। ফলে আমরা একটু ভয়ও পেয়ে গিয়েছিলুম।”

 

“কীসের ভয়?”

 

“লেবার ট্রাবলের। কোম্পানির কর্তাদের ভয় হয়েছিল যে, বিল আটকে রাখলে ঠিকেদার তার লোকজনদের খেপিয়ে তুলতে পারে, আর তার ফলে কনস্ট্রাকশনের কাজ আবার বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কোম্পানি সেটা চাইছিল না। চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার এই নিয়ে চিফ এগজিকিউটিভ অফিসারের সঙ্গে কথা বলেন। ঠিক হয় যে, যেমন করেই হোক, কাজটা এখন তাড়াতাড়ি শেষ করা চাই। তার জন্য যদি দরকার হয় তো ঠিকেদারের এই আড়াই লাখ টাকার বিলও আমাদের পেমেন্ট করতে হবে।”

 

“নোয়িং ফুল ওয়েল যে, এই টাকাটা সে দাবি করতে পারে না?”

 

“হ্যাঁ, স্যার।”

 

“কেন?”

 

সুরেশচন্দ্র সামান্য ইতস্তত করলেন। মনে হল, যে কোনও কারণেই হোক, তিনি একটু অস্বস্তি বোধ করছেন। সেটা কাটিয়ে উঠতেও অবশ্য দেরি হল না। দু-এক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন তিনি। তারপর মুখ তুলে বললেন, “বিলটা আমিই আটকে রেখেছিলুম স্যার।”

 

“সেটা আমি অনুমান করেছিলুম।” ভাদুড়িমশাই মৃদু হেসে বললেন, “কিন্তু আপনারই বা আটকে রাখবার কারণ কী? বিশেষ করে কোম্পানির যাঁরা টপ অফিসার, তাঁরাই যখন ঝামেলা এড়াবার জন্যে বিলটা মিটিয়ে দিতে চাইছিলেন?”

 

সুরেশচন্দ্র মুখ নিচু করে বসে রইলেন। কিছু বললেন না।

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা জিজ্ঞেস করতে আমার খুবই সংকোচ হচ্ছে, কিন্তু জিজ্ঞেস না-করেও উপায় নেই। পার্সেন্টেজ নিয়ে কি কোনও অসুবিধে হচ্ছিল?”

 

“কীসের পার্সেন্টেজ?” সুরেশচন্দ্র বললেন, “ঠিক বুঝতে পারছি না স্যার।”

 

“বুঝতে না পারার তো কিছু নেই। ঘুষ না-দিলে যে কোনও বিল পাশ হয় না, এ তো সবাই জানে। কোথাও টোটাল অ্যামাউন্টের এক পার্সেন্ট ঘুষ দিতে হয়, কোথাও দু’ পার্সেন্ট। আপনার রেট কত? আড়াই লাখের টু পার্সেন্টে কিন্তু অঙ্কটা নেহাত খারাপ দাঁড়ায় না। পাঁচ হাজার। ঠিকেদার কি ওটা দিতে চাইছিল না?…না না, আপনার অস্বস্তির কিছু নেই, এ তো কমন প্র্যাকটিস, আজকাল কি আর এ-সব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়…আর তা ছাড়া কথাটা আমি কাউকে বলতেও যাচ্ছি না,…কিন্তু বিলটা কেন আপনি আটকে রেখেছিলেন, অন্তত আমার তো সেটা জানা দরকার।”

 

সুরেশচন্দ্র একেবারে হঠাৎই মুখ তুললেন। তাঁর মুখচোখের চেহারা দেখে মনে হল, ভাদুড়িমশাইয়ের কথার মধ্যে যে একটা বিচ্ছিরি ইঙ্গিত রয়েছে, তা তিনি ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। বললেন, “আপনি…আপনি কি মনে করেন যে…”

 

“আপনি ঘুষ নিয়ে বিল পাশ করেন কি না?” ভাদুড়িমশাই ফের একটা সিগারেট ধরালেন, তারপর ধীরেসুস্থে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “সেটা কি খুবই অসম্ভব একটা ব্যাপার? অনেকেই তো নেয়।”

 

“তা নিতে পারে, কিন্তু আমি নিই না। আমি জীবনে কখনও ঘুষ নিইনি। …তা ছাড়া, একটা কথা আপনি ভেবে দেখছেন না কেন?”

 

‘কী ভেবে দেখব?”

 

“আমি পাশ না-করলেই যে বিলটা আটকে থাকবে, পেমেন্ট করা যাবে না, তাও তো নয়। আমার ওপরওয়ালারা যখন চান, তখন ওঁদেরই কেউ ওটা ‘চেকড অ্যান্ড পাসড ফর পেমেন্ট’ বলে সই করে তো ঠিকেদারকে ওই টাকাটা পাইয়ে দিতে পারেন। তা তাঁরা করছেন না কেন?”

 

“আপনার কী মনে হয়?”

 

“যা মনে হওয়ার, তা-ই মনে হয়।” সুরেশচন্দ্র বিষণ্ণ হাসলেন। “আসলে ওটা এমন বিল যে, ওঁরা নিজেরা কেউ ওটা পাশ করবার ঝুঁকি নেবেন না।”

 

“তার মানে?”

 

“বলছি, স্যার।…এক গেলাস জল পাওয়া যাবে?”

 

সদানন্দবাবু ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকাতে তিনি বললেন, “বেয়ারাকে ডাকবেন না, ঘরেও তো জলের জাগ রয়েছে।”

 

আমিই উঠে গিয়ে ঘর থেকে এক গেলাশ জল গড়িয়ে এনে সুরেশচন্দ্রের হাতে তুলে দিলুম। সুরেশচন্দ্র খুব তৃপ্তি করে জল খেলেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করি?”

 

“করুন।”

 

“কাল সকাল থেকে এখন পর্যন্ত কি জল ছাড়া আর কিছু আপনার পেটে পড়েছে?”

 

সুরেশচন্দ্র আবার সেই ম্লান হাসলেন। বললেন, “দুটো দিন তো বলতে গেলে থানাতেই কাটল। তবে একেবারে যে কিছু খাইনি, তা নয়। মস্ত বড় শোকের মধ্যেও দেখলুম খিদে ঠিকই পায়। এ এক আশ্চর্য ব্যাপার!”

 

“কী খেলেন?”

 

“ঘরে এক টিন মিল্ক পাউডার রয়েছে। কাল রাত্তিরে তার থেকে খানিকটা দুধ নিয়ে জল গরম করে নিয়ে তাতে মিশিয়ে খেয়েছি। ঘরে একটা কেরাসিন স্টোভ রয়েছে। তাই জল গরম করতে কোনও অসুবিধে হয়নি। আজ দুপুরে কিছু ফলমূল খেলুম। সেও ঘরেই ছিল।”

 

“বাড়ির অন্য সব ফ্ল্যাটেও তো লোকজন রয়েছে। আপনি কী খাচ্ছেন না খাচ্ছেন তা নিয়ে তারা কেউ খোঁজখবর করেনি?”

 

“কেউ না।” এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে সুরেশচন্দ্র বললেন, “কেনই বা খোঁজখবর করবে? বারবার পুলিশ আসছে, মাঝে-মাঝেই থানায় নিয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরিয়েও দিয়ে যাচ্ছে পুলিশের গাড়িতে করে, এ-সব দেখে সবাই ভয় পেয়ে যাবে না? আর তা ছাড়া যতক্ষণ আমি বাড়িতে থাকি, একজন পাহারাদারও যে ততক্ষণই আমাদের বাড়ির উপরে নজর রাখে, এটাও তাদের নজর এড়ায়নি। আসলে শুধু পুলিশ কেন, তারাও ধরে নিয়েছে যে, আমিই খুনি। এরই মধ্যে আপনি নিজেও তো সেটা আঁচ করেছেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা করেছি।” তারপর প্রসঙ্গ পালটে বললেন, “বিল পাশ করা নিয়ে কথা হচ্ছিল। ওটা পাশ করার মধ্যে ঝুঁকি কীসের?”

 

“অডিট করার সময় ওটা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে, সেটাই তো মস্ত ঝুঁকি।”

 

“প্রশ্ন উঠবে কেন?”

 

“শুধু বিল সাবমিট করলেই তো চলে না, স্যার,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “তার সঙ্গে সাপোর্টিং কাগজপত্তর…মানে ক্যাশমেমো, চালান, রিসিট এইসব দাখিল করতে হয়। মূল কাগজপত্তর যারা নিজের কাছে, রাখে, তারা একটা জেরক্স দেয়। তাতে বোঝা যায় যে, বিলটা জেনুইন।”

 

“বিলের সঙ্গে সে-সব ছিল না?”

 

“ছিল স্যার, কিন্তু যা ছিল, তার একটাও আমার জেনুইন বলে মনে হয়নি। অডিটও সেগুলোকে জেনুইন বলে মেনে নেবে না। ছাপানো লেটারহেড নয়, ছাপানো ক্যাশমেমো নয়, ছাপানো চালান নয়, রাবার স্ট্যাম্প নেই, স্রেফ সাদা কাগজে সই করা কি টিপছাপ-মারা কয়েকটা চিরকুট। তার উপরে কি বিল পাশ করা যায় স্যার? তাও দু-পাঁচ শো নয়, আড়াই লাখ টাকার বিল? না, স্যার, তা যায় না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই ব্যাপার?”

 

সুরেশচন্দ্র বললেন, “হ্যাঁ, স্যার। তা ছাড়া…”

 

কথাটা সুরেশচন্দ্র শেষ করলেন না, হঠাৎই চুপ করে গেলেন।

 

ভাদুড়িমশাই চোখ সরালেন না, যে-ভাবে সুরেশচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, একেবারে সেইভাবেই অপলক তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, “চুপ করে গেলেন কেন? তা ছাড়া কী?”

 

সুরেশচন্দ্র তবু ইতস্তত করতে লাগলেন। তাঁর মুখ দেখে মনে হল, যা তিনি বলতে চান, তা বলা উচিত হবে কি না, সেটা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ভয়ের কী আচে? আপনি যদি কিছু দোষ না-করে থাকেন, তা হলে মিচিমিচি ভয় পাচ্ছেন কেন?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাকে ভয় পাচ্ছেন? মিঃ নন্দীকে?”

 

“না না,” সুরেশচন্দ্র বললেন, “নন্দীসায়েবকে কেন ভয় পাব? আগেই তো বলেছি যে, উনি খুবই ভাল লোক। তা ছাড়া যেমন সৎ তেমনি এফিশিয়েন্ট। বিলটা পাশ করতে কোথায় কোথায় আটকাচ্ছে, তা আমি ওঁকে বুঝিয়ে বলেছি। উনিও খুব মন দিয়ে সব শুনেছেন।”

 

“শুনে কী বললেন?”

 

“বললেন যে, আমি ঠিকই করেছি। আমিও তা-ই শুনে নিশ্চিন্ত হয়ে ওঁর বাংলো থেকে বেরিয়ে বাড়ি চলে যাই।”

 

“ভাল কথা।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এখন বলুন তো, ‘তা ছাড়া’ বলে ওই যে একটা কথা বলতে গিয়েও আপনি বললেন না, চুপ করে গেলেন, সেটা কী?”

 

সুরেশচন্দ্রের সেই ইতস্তত ভাবটা ইতিমধ্যে কেটে গিয়েছিল। ভাদুড়িমশাইকে হাসতে দেখে তাঁর ভয়ও হয়তো কেটে গিয়ে থাকবে। তাই এবারে আর তিনি চুপ করে না-থেকে বললেন, “সেটা খুবই মারাত্মক কথা, স্যার।”

 

“খুলে বলতে কোনও অসুবিধে আছে?”

 

“আছে স্যার, তবু বলছি।” সুরেশচন্দ্র বললেন, “তাঁবু বানাবার নাম করে লেবার কনট্রাকটর যা করেছে, সে একেবার পুকুর চুরির ব্যাপার।”

 

“কী রকম?”

 

“বলছি স্যার। কনট্রাকটরের মজুররা আমাদের এই টাউনশিপ থেকে মাইল তিনেক দূরে থাকে। সেখানে একটা জঙ্গলের খানিকটা অংশ হাসিল করে টেম্পোরারিলি ওদের থাকতে দেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগই তেলেঙ্গি মজুর, অন্ধ্রের লোক। যা-ই হোক, ওই জঙ্গলের দিক থেকেই সকালবেলায় ওরা কাজ করতে আসে, তারপর সন্ধে নাগাদ আবার সেখানে ফিরে যায়। জায়গাটা ভাল নয়, সাপখোপের ভয় আছে, তাই আমাদের টাউনশিপের লোকজনেরা বড় একটা কেউ ওদিকে যায় না, স্যার।”

 

ভাদুড়িমশাই সামান্য হাসলেন। তারপর, হাসিটাকে চোখের মধ্যে ধরে রেখে বললেন, “কিন্তু আপনি মাঝেমধ্যে যান, কেমন?

 

সুরেশচন্দ্র বললেন, “আগে আমিও যেতুম না, স্যার। তবে জগিং করতে শুরু করার পর থেকে দিন কয়েক ওদিকে গিয়েছি। না-গেলে তো ব্যাপারটা আমি ধরতেই পারতুম না।”

 

“কী দেখলেন ওখানে?”

 

“দেখলুম যে, তেরপল খাটিয়ে অমন কোনও তাঁবুই ওদিকে বানানো হয়নি। স্রেফ কিছু শুকনো শালপাতার ছাউনি ছাড়া আর কিছুই ওখানে নেই। তাও সেগুলো কনট্রাকটর বানিয়ে দেয়নি। জঙ্গল হাসিল করার সময় যে-সব গাছ কাটা পড়েছিল, তারই ডালপালা আর পাতা দিয়ে মজুররা নিজেরাই সে-সব বানিয়ে নিয়েছে। কথাটা ওরাই আমাকে বলল।”

 

“অর্থাৎ একেবারে হাওয়ার উপরে খর্চা দেখিয়ে বিল দিয়েছে।”

 

“হ্যাঁ, স্যার। এখন আপনিই বলুন যে, ওই ভুয়ো বিল আমি কীভাবে পাশ করব? করা যায়?”

 

“না, যায় না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “পেমেন্ট আটকে দিয়ে আপনি ঠিকই করেছেন। কিন্তু তার জন্যে আপনি এত ভয়ে-ভয়ে আছেন কেন? মিঃ নন্দী তো যা বুঝতে পারলুম আপনার অসুবিধেটা ঠিকই ধরতে পেরেছেন। তা হলে?”

 

“ভয় তো ওঁকে নয়, স্যার, ভয় আসলে…”

 

সুরেশচন্দ্রের মুখ থেকে কথাটা লুফে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভয় আসলে লেবার-কনট্রাকটরকে, কেমন? কিন্তু একটা কথা আমাকে বুঝিয়ে বলুন তো। কলকাতায় আপনি যা বলেছিলেন, তাতে তো মনে হয়, আপনাদের লেবারাররা ঠিকে-মজুর হলেও তাদের বেশ শক্তপোক্ত একটা ইউনিয়ন রয়েছে। তার দাপটে কিছুদিন আগে এখানকার কনস্ট্রাকশনের কাজ নাকি বন্ধ হবারও উপক্রম হয়েছিল। তা মজুরদের শেলটারের ব্যবস্থা না-করেই যে লেবার-কনট্রাকটর সেই বাবদে কোম্পানির কাছ থেকে একটা মোটা অ্যামাউন্ট বাগিয়ে নিচ্ছে, ইউনিয়নের লিডাররা কি তা জানে না?”

 

“তা কেন জানবে না, স্যার, ভালই জানে।”

 

“জানে তো তারা এই নিয়ে হাঙ্গামা করছে না কেন? ওটা তো তাদেরই করার কথা।”

 

“তা তারা করবে বলে মনে হয় না, স্যার।”

 

“কেন?”

 

সুরেশচন্দ্র বিষণ্ণ হাসলেন। “সবই তো বোঝেন, স্যার। আজকালকার লিডার…মানে আমি সকলের কথা বলছি না…তবে চোখের সামনে সবই তো দেখছি…এদের অনেকেই আসলে ওয়ার্কারদের কথা ততটা ভাবে না, যতটা কিনা নিজেদের কথা ভাবে। আতর সিংও ভালই জানে যে, এরা যে যার আখের গুছিয়ে নিতে ইউনিয়নের পাণ্ডাগিরি করে বেড়াচ্ছে।”

 

“আতর সিং কে? আপনাদের লেবার কনট্রাকটর?”

 

“হ্যাঁ, সার।”

 

“গোলমেলে লোক?”

 

“ভীষণ।” সুরেশচন্দ্র বললেন, “খুনের মামলার আসামি। কিন্তু জানে যে, আইন ওকে ছুঁতে পারবে না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *