আড়ালে আছে কালীচরণ (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
(১)
সদানন্দবাবু বললেন, “দু’পাতা ইংরিজি পড়ে এই যে আজকালকার ছেলেছোকরাগুলো সব ডেয়ো পিঁপড়ের মতো পেছন উঁচিয়ে গ্যাটম্যাট করে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর ভাবচে যে, আমি কী হনু রে, আরে বাবা, ব্যাপারটা কি অতই সোজাসরল নাকি? ভাগ্যদেবী যে তক্কে তক্কে রয়েচেন, এটাই তারা জানে না। তেনার বুটজুতোর তলায় একবার পড়লেই হল, অমনি ও-সব ট্যান্ডাই-ম্যান্ডাই একেবারে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাবে।”
অরুণ স্যান্যাল বললেন, “ভাগ্যদেবী কি আজকাল বুটজুতো পরছেন নাকি?”
“হাসচেন তো?” একটুও দমে না গিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “তা হাসুন! আমিও এককালে বিস্তর হেসিচি। কিন্তু এখন আর হাসি না। অঘোর মন্ডলের ব্যাপারটা আমি নিজের চোকে দেকিচি তো, বাস, তারপর থেকেই আমার হাসি একদম শুকিয়ে গেচে।”
আজ পয়লা অক্টোবর। একে রবিবার, তায় সপ্তমী পূজো। ভাদুড়িমশাই যে ছুটি কাটাতে কালই কলকাতায় এসেছেন, আর লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত এখানেই থাকবেন, এই খবর পেয়ে আমি আর সদানন্দবাবু আর দেরি করিনি, সকাল আটটার মধ্যেই আমাদের শেয়ালদা-পাড়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাঁকুড়গাছির এই মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিংয়ের সাততলার ফ্ল্যাটে এসে জুটেছি। দুপুরের খাওয়া এখানেই সেরে নিয়ে আমরা বিকেল-নাগাদ বাড়ি ফিরব।
গল্প যে-রকম জমেছে, তাতে চট করে যে শেষ হবে, এমন মনে হয় না। সদানন্দবাবুও আজ একেবারে ফুল ফর্মে রয়েছেন। তাঁর এই রকমের চেহারা ইদানীং বেশ কিছুদিন দেখিনি। মনে হচ্ছে, একালের ছেলে-ছোকরাদের তিনি আজ তুলোধোনা করে ছাড়বেন।
ফ্ল্যাটটা ভাদুড়িমশাইয়ের ভগ্নিপতি অরুণ সান্যালের। ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডা দিচ্ছি আমি, ভাদুড়িমশাই, অরুণ সান্যাল, সদানন্দবাবু, অরুণের ছেলে কৌশিক আর অমিতাভ। কৌশিকের মা অর্থাৎ ভাদুড়িমশাইয়ের ছোট বোন মালতী মাঝে-মাঝে আড্ডায় এসে যোগ দিচ্ছে বটে, কিন্তু দু’চার মিনিট পরপরই ফের ভিতরে গিয়ে তাকে রাঁধুনি-মেয়েটির কাজকর্মের উপরে নজর রাখতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা এক রাউন্ড চা ও আলু-পকোড়া শেষ করেছি। আর-এক রাউন্ড চা পেলে ভাল হত। কিন্তু মালতীর মেজাজ দেখে কেউই সে-কথা বলতে বিশেষ ভরসা পাচ্ছি না।
ব্যাঙ্গালোরের সি.বি.আই. অর্থাৎ চারু ভাদুড়ি ইনভেস্টিগেশান্স’-এর পরিচয় যাঁরা রাখেন, প্রাইভেট গোয়েন্দা ভাদুড়িমশাইয়ের কাজকর্মের খবরও তাঁদের না জানবার কথা নয়। আজ যারা এখানে এসে জমায়েত হয়েছি, তাদেরও তাঁরা মোটামুটি চেনেন নিশ্চয়। তবে হ্যাঁ, অমিতাভকে তাঁরা চেনেন না।
প্রথমটায় অবিশ্যি আমিও চিনতে পারিনি। তাতে কৌশিক বলল, “সে কী কিরণমামা, অমুকে চিনতে পারছ না? অমিতাভ ঘোষ, তীর্থপতি ইনস্টিটিউশানে আমার সঙ্গে পড়ত। আমাদের যতীন বাগচি রোডের ফ্ল্যাটে ওকে তো অনেকবার দেখেছ।”
মনে করতে পারলুম না। তখন অরুণ স্যান্যালই বললেন, “আরে, সেই অমু, কাঁকড়াবিছের কামড় খেয়ে চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করে যে একদিন আমাদের সেই ফ্ল্যাটে এসে ঢুকেছিল।… যাচ্চলে, আপনি তো তখন আমাদের ফ্ল্যাটে বসেই গল্প করছিলেন।… কী, মনে পড়ছে?”
শুনে তো আমি অবাক! এই নাকি সেই হাফপ্যান্ট-পরা ছেলেটা? সত্যি, দশ-বারো বছরের মধ্যেই মানুষের চেহারা কত পালটে যায়! শুনলুম হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ঢুকেছিল। সেখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে একটা ডাকসাইটে ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মের চাকরিতে। চাকরির সুত্রেই কী একটা কনস্ট্রাকশনের কাজে মাঝে বছরখানেক আফ্রিকার উগান্ডায় না কিনিয়ায় ছিল। এখন আছে রাঁচিতে। পুজোর ছুটিতে দিন কয়েকের জন্যে কলকাতায় এসেছে। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করে বেড়াচ্ছে। ছুটি ফুরোলে আবার রাঁচিতে নিয়ে যাবে।
যা-ই হোক, সদানন্দবাবুর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। তাঁর কথা শুনে একা অরুণ সান্যাল নন, আমরা সবাই খুব হাসছিলুম। এক অমিতাভ ছাড়া। তার মুখে দেখলুম একটুও হাসি নেই। ভুরু কুঁচকে আছে, চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে, সদানন্দবাবুর কথা শেষ হতেই সে তার সোফা থেকে একটু সামনে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল, “এই যে অঘোর মন্ডলের কথা বললেন, ইনি কে?”
সদানন্দবাবুর অনেক গুণের মধ্যে দোষটা এই যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর কাছ থেকে সরাসরি কোনও জবাব পাওয়া যায় না। এ-ক্ষেত্রেও পাওয়া গেল না। বললেন, “তারকেশ্বরে কখনও গিয়েচ?”
“আজ্ঞে না।”
“বাবার মাতায় জল ঢালতেও যাওনি?”
“বাবা?” ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে জড়িত গলায় অমিতাভ বলল, “বাবা? কার বাবা?”
কপালে হাত ঠেকিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “দু’পাতা ইংরিজি পড়েচ তো, তাই এমন কতা বলতে পারলে। নাইলে কি আর কেউ বাবার পরিচয় জিজ্ঞেস করে? আরে, বাবা ইজ বাবা। তিনি যেমন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক আর গণেশের বাবা, তেমন আমাদের সক্কলের বাবা।…কী, কিছু বুঝলে?”
কৌশিক হেসে বলল, “আপনি কি বাবা তারকনাথের কথা বলছেন বোস-জেঠু?”
“অফ কোর্স।”
“কিন্তু কথা তো হচ্ছিল অঘোর মন্ডলকে নিয়ে। তার মধ্যে আবার বাবা তারকনাথ এসে পড়লেন কেন?”
“আরে, আগে সবটা শোনোই তো। বারবার বাগড়া দিলে কিন্তু আমি কিচু বলব না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর আপনাকে কেউ বাধা দেবে না। আপনি বলুন।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আমরা হলুমগে তারকেশ্বরের ওদিককার লোক। সেখানকার গাঁয়ের বাড়িতে অবিশ্যি আজকাল আর বিশেষ যাওয়া-টাওয়া হয় না…আর যাবই বা কী করে, আমার ওয়াইফের যা গেঁটেবাত, একেবারে ‘নট নড়নচড়ন নট কিচ্ছু’ অবস্থা করে ছেড়েচে। তবে হ্যাঁ, ওদিককার খবর-টবর ঠিকই পাই, ভিটেবাড়িটা আজও বেদখল হয়ে যায়নি, একটা লোকও ঠিক করা আচে, সন্ধে হলে সে বাড়ির সামনে একটা পিদ্দিম জ্বেলে দেয়, তার জন্যে মাসান্তে তাকে মনি অর্ডার করে পাঁচটা টাকা পাটিয়েও দিই। বাস্, মিটে গেল!”
অমিতাভ ফের চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “অঘোর মন্ডল কে?”
“আরে বাবা, তার কথাই তো হচ্চিল,” সদানন্দবাবু বললেন, “তা এঁয়ারা বলতে দিলেন কই, সবাই তো দেকচি হেসেই খুন! অঘোর মন্ডলও এই তারকেশ্বরেরই লোক। চাষি গেরস্ত, অবস্থা নেহাত খারাপও ছিল না, বিঘে কয়েক জমি ছিল, দুধেল দুটো দিশি গোরু ছিল, আম জাম ছাড়া আরও দু’চার রকমের ফলের গাছও ছিল, পুকুর না থাক, বাড়ির পেছনে একটা ডোবা ছিল, তাতে শিঙি মাগুর খসে পুঁটি আর ট্যাংরা যে সর্বদা কিলবিল করত, এ আমি স্বচক্ষে দেকিচি। মানে সংসারটা হেসেখেলে চলে যাচ্ছিল।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন সদানন্দবাবু। তারপর একটা নিশ্বাস ছেড়ে বললেন, “কিন্তু সইল না।”
“কেন, তাঁর কী হয়েছিল?”
“কী আর হবে, হাতে দুটো পয়সা এলে যা হয়। দেমাক হয়েছিল। আমাদের ওদিককার কোন বস্তুটার খুব নাম, সেটা জানো তো?”
“না।”
“কুমড়ো।” সদানন্দবাবু হেসে বললেন, “যেমন সাঁতরাগাছির ওল, তেমনি তারকেশ্বরের কুমড়ো। যেমন সাইজ, তেমনি সোয়াদ। আর তেমনি টাইট মাল। কাটতে গেলে বঁটি বেঁকে যায়। পাকা রাঁধুনির হাতে পড়লে তো কতাই নেই, পাঁচফোড়ন দিয়ে তার এমন জব্বর একখানা ঘ্যাঁট রেঁধে দেবে যে, স্রেফ তা-ই দিয়েই পুরো এক থালা সাবড়ে দেবার পরেও মনে হবে, আহা, আর-এক হাতা ঘ্যাঁট যদি পাই তো আর-এক থালা ভাত সাবড়ে দিতে পারি।”
অমিতাভ অসহিষ্ণু গলায় বলল, “মাই গড! ঘ্যাঁট ছেড়ে কাইন্ডলি এবারে অঘোর মন্ডলের কথায় আসুন তো। তাঁর কী হয়েছিল?”
“ওই যে বললুম, দেমাক হয়েছিল।” সদানন্দবাবু বললেন, “আর সেই দেমাকের মূলে ওই কুমড়ো। অঘোর মন্ডলের জমিতে সেবার কুমড়োর এইসা ফলন হল যে, সে আর কহতব্য নয়। স্রেফ শ্যালদা আর কোলে মার্কেটের পাইকারদের কাছে কুমড়ো বেচেই অঘোর একেবারে লাল হয়ে গেল। হাতে এককাঁড়ি টাকা, সেই টাকা দিয়ে সে এখন কী করে? তার বউ বলল, মেয়ে বড় হয়েচে, তার বে দিতে হবে তো, ও টাকা তুমি পোস্টাপিসে রেকে দাও। পড়শিরা বলল, বড় করে একটা ভোজ লাগাও। অঘোর কিন্তু বউয়ের কতাও শুনলে না, পড়শিদের কতাও শুনলে না। কুমড়ো-বেচা টাকায় সে একজোড়া মোষ কিনে ফেলল। সে একেবারে হাতির মতো মোষ। বালতি-বালতি দুধ দিত।”
“তারপর?”
“তারপর তার বউ তো কেঁদেকেটে একশা। যতই সে কপাল চাপড়ে বলে, এ কী সব্বোনাশ করলে, ততই সে হাঁকার ছেড়ে বলে, চোপরও মাগি, বেশ করিচি, দিশি গোরু ছিরিক-ছিরিক দুধ দেয়, ওতে আমার পেট ভরে না, এবারে শালা পেট ভরে দুধ খাব। তা যে খাচ্চিল না, তাও নয়। হোল ফ্যামিলি খাচ্চিল। দুধ খাচ্চিল, ছানা খাচ্চিল, ক্ষীর খাচ্চিল, পায়েস খাচ্চিল, সে একেবারে মোচ্ছবের ব্যাপার। কিন্তু ভাগ্যে সইবে কেন, শেষখালে ওই মোষই একদিন বিপদ ঘটিয়ে ছাড়লে।”
আমরা হাসছি, কিন্তু অমিতাভর মুখে হাসি নেই। সেই আগের মতোই চাপা গলায় সে জিজ্ঞেস করল, “কী বিপদ?”
ইতিমধ্যে আমাদের দ্বিতীয় রাউন্ড চা এসে গিয়েছিল। সদানন্দবাবু চায়ের সঙ্গে দুধও খান না, চিনিও খান না। পট থেকে পেয়ালায় লিকার ঢেলে নিয়ে আলতো করে চুমুক দিয়ে বললেন, “অঘোর তো নিজেই দুধ দুইত। তা বালতি নিয়ে রোজকার মতো সেদিনও সে দুধ দুইবার জন্যে গোয়ালঘরে গিয়ে ঢুকেচে, তারপর মোষ দুটোর মধ্যে যেটা একটু বড় আর তাগড়া, দুই হাঁটুর মধ্যে বালতিটাকে চেপে রেখে সেটার সামনে উবু হয়ে বসে যেই না তেলের বাটিতে আঙুল ডুবিয়ে নিয়ে তার বাঁটে হাত দিয়েচে, অমনি সেটা তার পেছন-দিককার বাঁ পা তুলে অঘোরের কোমরে এইসা একখানা চাট ঝাড়ল যে, আর দেকতে হল না, ‘বাবা রে’ বলে চিৎকার করে অঘোর একেবারে চিতপটাং!”
কৌশিক বলল, “বলেন কী!”
অমিতাভ বলল, “এর মধ্যে তো সুপারন্যাচারাল কিছু নেই। এ তো হতেই পারে।”
সদানন্দবাবু বললেন, “আগে সবটা ভাল করে শোনো দিকিনি। কমেন্ট যা করবার, সেটা পরে কোরো।”
অরুণ স্যান্যার বললেন, “এই ছেলে-ছোকরাদের জন্যে দেখচি কিছুই শোনা যাবে না। বোসদা, আপনি বলে যা, তো।”
সদানন্দবাবু বললেন, “কোন্ পর্যন্ত বলিচি, সেটাই তো ছাই মনে পড়চে না।”
আমি বললুম, “মোষের লাথি খেয়ে অঘোর চিতপটাং হয়েছে। তারপরে কী হল বলুন।”
“তারপর যা হয় আর কী। চিৎকার শুনে তার বউ দৌড়ে এল, মেয়ে দৌড়ে এল, পড়শিরা দৌড়ে এল। ডাক্তারকে খবর দেওয়া হল। হাতুড়ে ডাক্তার। সে এসে তার পিঠ-বরাবর একখানা চ্যালাকাঠ দিয়ে আড়াআড়ি ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়ে বললে, কোমরের হাড় ভেঙেছে, এখন ছ’মাস একে এই অবস্থায় বিছানায় শুইয়ে রাকতে হবে, একদম নড়াচড়া করা চলবে না।”
কৌশিক হাসি চেপে বলল, “পিঠে চ্যালাকাঠ বাঁধা অবস্থায় ছ’মাস কখনও বিছানায় শুয়ে থাকা যায়? সম্ভব?”
সদানন্দবাবু বললেন, “যাবে না কেন, যায়। তবে সেটা তো কোনও কতা নয়, আসল বিপদ হল অন্যখানে। তা তো এখনও বলিইনি।”
অমিতাভ বলল, “আবার কী বিপদ হল?”
“মোষের চাট খেয়ে অঘোর মন্ডলের মাথার ভেতরে… ওই যাকে তোমরা ব্রেন বলো হে, তার কলকব্জায় কী-সব জট পাকিয়ে গেল, তা বলতে পারব না বাপু, তবে জ্ঞান ফিরবার পর থেকেই সে মানুষের বুলি ভুলে গিয়ে স্রেফ হাম্বা হাম্বা ডাক ছাড়তে লাগল।”
“অ্যাঁ! জলজ্যান্ত একটা মানুষ, সে কিনা হাম্বা হাম্বা করতে লাগল?”
“তবে আর বলচি কী হে!” অমিতাভ ঘোষের দিকে সস্নেহ চোখে তাকিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “ব্যাপার দেকে আমরা থ। তার বউ তো পাড়া মাতায় করে কাঁদতে লাগল। কিন্তু সব্বোনাশ যা হবার, ততক্ষণে তা হয়ে গেচে। অঘোরের বউ যত বলে, আমার অদেষ্টে এই ছিল গো,’ ততই সে বলে, ‘হাম্বা।’ আবার তার মেয়ে যদি বলে, ‘কে আমার বে দেবে গো,’ তাতেও সে বলে, ‘হাম্বা।’ ওই শোয়া অবস্থাতেই নাকি বউকে একদিন ঢুসিয়েও দিয়েছিল। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার।”
ভাদুড়িমশাই অনেকক্ষণ ধরে একটাও কথা বলেননি। চুপচাপ তিনি ইস্টার্ন কুরিয়ারের ম্যাগাজিন সেকশনের পাতা উলটে যাচ্ছিলেন। এবারে তাঁর কথা শুনে বুঝলুম যে, চোখ যে-দিকেই থাক, তাঁর কান দুটো ছিল সদানন্দবাবুর গল্পের দিকেই। হাতের কাগজ নামিয়ে রেখে তিনি বললেন, “তারপর কী হল? অঘোর মন্ডল তার বাদবাকি জীবন জাবনা খেয়ে আর হাম্বা হাম্বা করেই কাটিয়ে দিল নাকি?”
সদানন্দবাবু তাঁর চায়ের পেয়ালায় শেষ চুমুক দিয়ে বললেন, “আরে না মশাই, মুশকিল যেমন আচে, তেমনি তার আসানও আচে বউ কী। তা নইলে তো সাধু-সন্নিসি মন্তর-তন্তর, এ-সবের কোনও মাহাত্ম্যই থাকত না।”
“অর্থাৎ একদিন এক সন্ন্যাসী এসে মন্তর পড়ে তার হাম্বারব থামিয়ে দিলেন, কেমন?”
“অনেকটা তা-ই। তবে সন্নিসি আমাদের গাঁয়ে নিজে আসেননি, অঘোর মন্ডলকেই একটা ভুলিতে চাপিয়ে তাঁর কাচে নিয়ে যেতে হয়েছিল।”
অমিতাভ বলল, “তিনি…আই মিন দ্যাট সন্নিসি-ঠাকুর…কোথায় ছিলেন?”
“মাইল পাঁচেক দূরের আর-এক গাঁয়ের শ্মশানে। হঠাৎ একদিন সেই শ্মশানের বটগাছের তলায় এসে তিনি উদয় হন। বাস্, দেকতে-দেকতে তাঁর মাহাত্ম্যের কতা চাদ্দিকে ছড়িয়ে পড়ল। কেউ বলে তাঁর বয়েস তিন শো আশি বছর, আবার কেউ বলে যে, তিনি সিপাই মিউটিনির সেই নানাসায়েব। তা আমাদের গাঁয়ে বসেই আমরা শুনতে পেলুম যে, ঝোঁটিয়ে তাঁর কাছে রুগি আসচে। পেটের রুগি, পেঁচোয়-পাওয়া রুগি, পালাজ্বরের রুগি, কালাজ্বরের রুগি, অম্বলের রুগি, ভূতে পাওয়া রুগি—রুগির কামাই নেই। কিন্তু রোগটা যার যা-ই হোক, ধুনি থেকে এক চিমটে ছাই তুলে তিনি তার কপালে একটা তেলক পরিয়ে দিচ্চেন, আর রোগটা তাতেই সেরে যাচ্চে। তো তাই শুনে আমাদের অঘোরকেও একদিন ভুলিতে চাপিয়ে তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়া হল।”
“তারপর?”
সদানন্দবাবু বললেন, “তোমরা হচ্চ এ-কালের ছেলে, কত যে অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়েচ, তার ঠিক-ঠিকানা নেই। তার উপরে আবার দু’পাতা ইংরিজি পড়েচ তো, তাই তারপর যা হল, তা তোমরা বিশ্বেস করবে না।”
“কী হল?”
“এক তাজ্জব কান্ড হল। সন্নিসি- ঠাকুরের সামনে ডুলি নামিয়ে রাখতেই অঘোর মন্ডলকে এক-নজর দেখে নিয়ে, ধুনি থেকে চিমটে তুলে চোক পাকিয়ে তিনি বললেন, ‘ওরে, একে ফিরিয়ে নিয়ে যা! এ ব্যাটা ঘোর পাপী, এর জন্যে আমি কিছু করতে পারব না।’ শুনে তো আমরা হতভম্ব।”
“ফিরিয়ে নিয়ে এলেন?”
“তা-ই আনতে হত।” সদানন্দবাবু বললেন, “কিন্তু অঘোরের বউ আনতে দিলে না। বেটি মহা স্যায়না, দু’হাত থেকে রুপোর দু’গাছা মোটা-মোটা খাড়ু খুলে সন্নিসির পায়ের কাচে রেকে বললে, ‘ফিরিয়ে নে যাব কি না, সে আমি বুজব। কিন্তু ঘোর পাপী যখন বলেচ, তখন পাপটা কী, সেটা বলতে হবে। মেয়েছেলে?’
“সন্নিসি তাই শুনে জিভ কেটে বললেন, ‘আরে না না, সে-সব কিছু নয়।’
“তা হলে কি গাঁজা-ভাং-সিদ্দি?”
“রুপোর খাড়ু দু’গাছা নিজের থলের ভেতরে পুরে সন্নিসি বললেন, দূর বেটি, ও তো বাবা মহাদেবও খান, আমিও খাই। ও-সব না-খেলে কি আর অমনি-অমনি দিব্যদৃষ্টি খুলে যায় রে পাগলি? ব্যোম শংকর! ব্যোম ভোলা!”
“তা হলে?”
“সন্নিসি বললেন, ‘তোদের বাড়িতে দুটো দিশি গাইগোরু ছিল?’
“অঘোরের বউ বলল, “তা ছিল বাবা।’
“সে দুটো ছিল সাক্ষাৎ ভগবতী। তার জায়গায় অঘোর ওই যে দুটো রাক্কুসিকে এনে গোয়ালঘরে ঢুকিয়েছে, ওই হয়েছে মহাপাপ। কুমড়ো বেচে ব্যাটার খুব টাকার দেমাক হয়েছিল। ওরে, ওই যে দুটো মোষ কিনেচে অঘোর, ওর একটা হচ্চে পুতনা রাক্কুসি, আর অন্যটা হচ্চে হিড়িম্বা।’”
“অঘোরের বউ গালে হাত দিয়ে বলল, “বলো কী বাবা?”
“সন্নিসি বললেন, ‘যা বলচি, ঠিক বলচি। ভগবতী রুষ্ট হয়েচেন। রাক্কুসি দুটোকে গোয়াল থেকে তাড়িয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আন। নইলে অঘোরের হাড়ও জোড়া লাগবে না আর হাম্বা-ডাকও বন্ধ হবে না।”
অমিতাভ বললে, “তো তা-ই হল?”
সদানন্দবাবু বললেন, “তো তা-ই হল। পরের হাটেই মোষ দুটোকে অঘোরের বউ বেচে দিল, আর দিশি গাই দুটোকে যাদের কাছে বেচে দিয়েছিল, তাদের টাকা সুদসুদ্ধু ফেরত দিয়ে গাইদুটোকে ফিরিয়ে আনলে। ভগবতী বলে কতা। তাও একটা নয়, একজোড়া ভগবতী।”
“তারপর?”
“তারপর যা হল, সে আশ্চব্জি ব্যাপার। কী বলব বাপধন, অঘোরের বউ বাড়ি ফিরে দ্যাকে, বিছানা থেকে উঠোনে নেবে অঘোর দিব্যি পায়চারি করে বেড়াচ্চে। বউকে দেকে একগাল হেসে বলল, ‘হ্যাঁ গো, মেয়েটা বলচে, আমি নাকি অ্যাদ্দিন হাম্বা হাম্বা করতুম! সত্যি?’ বোজো ব্যাপার! তাই বলছিলুম যে, মন্তর-টন্তর নিয়ে ঠাট্টা কোরো না বাবারা, চোকের সামনে যা দেকছ, তার বাইরেও কিচু আচে।”
ভাদুড়িমশাই একটা কড়া রকমের ধমক দিয়ে বললেন, “এ-সব আপনি নিজের চোখে দেখেছেন? ঠিক-ঠিক জবাব দিন। নইলে আমি ছাড়ব না!”
যেন জোঁকের মুখে নুন বড়ল। এক নিমেষে গুটিয়ে গেলেন সদানন্দবাবু। আমতা-আমতা করে বললেন, “না, মানে নিজে দেকিনি। তবে বাবার মুকে শুনিচি।”
শুনে আমরা হো হো করে হেসে উঠলুম। অমিতাভর মুখে তবু হাসি নেই। কিছুক্ষণ সে একেবারে গুম মেরে বসে রইল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “কিন্তু আমি যে ঘটনার কথা বলব, সেটা আমার নিজের জীবনে ঘটেচে। তাও মাত্র দিন-পনেরো আগে।”
