নয়
আমি যখন গিয়ে ঢুকলাম ধুলো-মাখা গাড়ি নিয়ে তখন বেলা প্রায় চারটে বাজে। ঋজুদারা সবাই চীনের বসবার হল ঘরে বসে গল্প করছিল।
সকলে হৈ হৈ করে উঠলেন। কি ব্যাপার? এরই মধ্যে? গিয়েই ফিরে এলে কি রকম?
মা অনেক ভালো আছে। বাবা টেলীগ্রাম পাঠাতে বলেছিল আমার পিসতুতো ভাই ভটকাইকে। বলেই, ঋজুদার দিকে তাকালাম, তারপর বললাম, বুঝতেই পাচ্ছো, কিরকম গেঁতো, ইরেসপনসিবল ভটকাইটা! যেদিন টেলিগ্রাম পাঠাতে বলেছিল, তার দুদিন পরে পাঠিয়েছিলো। ততদিনে মা ভালই হয়ে গেছে বলতে গেলে। মধ্যে দিয়ে আমার এই হয়রানী!
মায়ের কি হয়েছিল? বিষেণদেওবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
এ্যাই সেরেছে! তা ত’ জানি না। ঠিকও করিনি কিছু কী বলব না বলব। মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল ঐ, ঐ, আমারও যা হয়েছিল প্রায় কলেরারই মতন।
বিষেণদেওবাবু একটু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে, তারপর বললেন, তাহলে দ্যাখো রুরুদদরবাবু, কেমন ওষুধ দিয়েছিলাম তোমাকে। চার গোলিতেই ফিট।
আমি মনে মনে বললাম, আপনাকেও আমি এক গুলিতেই ফিট করে দেবো। দাঁড়ান না।
ঋজুদা বললো, মা কি বললেন রে?
আমার মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, অ্যালবিনো মারা চাই-ই-চাই।
ঋজুদা বলল, তাহলে ত ছুলোয়াটা কালই শেষ করে ফেলা যায়। কি বলো ভানুপ্রতাপ? রুদ্র যখন মায়ের আশীর্বাদ টাশীর্বাদ নিয়ে সাত-তাড়াতাড়ি ফিরে এলো।
ভানুপ্রতাপ যেন ঘোরের মধ্যেই ছিল।
বলল, যা করার তা দেরী করার কি মানে হয়? করে ফেলাই ভাল।
বলেই, বলল, তাহলে কি ঠিক করলে? কালই হবে? মামা?
কালই হোক। তুই গিয়ে বস্তীতে ওদের একটু খবর-টবর দিয়ে রাখ ভোর পাঁচটাতে ছুলোয়ার জন্যে সকলে যেন তৈরী হয়। বিষেণদেওবাবু বললেন।
আর কাউকে কি নেমন্তন্ন করবে? ভানুপ্রতাপ বললেন।
ঋজুবাবু আমাদের মেহমান আর রুরুদদরবাবু হচ্ছে গিয়ে আবার ঋজুবাবুর মেহমান। আমরাই জোর পার্টি লাগাব এখানে। কচি-শুয়োরের বার-বী-কিউ হবে মহলের কম্পাউন্ডে। বিষেণদেওবাবু আবার বললেন।
–শুয়োর খান নাকি আপনারা? আমি বললাম। আমি ভেবেছিলাম……
বল কি রুরুদদরবাবু। বন্য বরাহ! শ্রীরামচন্দ্রেরও অখাদ্য ছিলো না। খেলে, জন্ম সার্থক।
ভানুপ্রতাপ উঠে গেলেন, আমাদের সকলের মাঝ থেকে।
বললেন, যাই একটু ঘুরে আসি।
কোথায়?–ঋজুদা বলল।
এই লুলিটাওয়া থেকে। বোরড হয়ে যাচ্ছি দিনকে দিন, প্রতিমুহূর্ত।
বলেই, দুটো বড়ি মুখে পরলেন।
বিষেণদেওবাবু বললেন, সাবধানে গাড়ি চালাবি।
তারপর বললেন, আমিও একটু যাব, কাজ আছে। আপনারা আরাম করুন। রুরুদদরবাবু চান-টান করো। খাওয়া-দাওয়া করো।
তারপরই বললেন, আজ কি খাবে?
–যা খুশি।
–পেট একদম ঠিক ত’?
–একদম ঠিক।
–একদম ঠিক? তাহলে কেমন ঠিক, তা পরীক্ষা করার জন্যে একটা স্পেশ্যাল রান্না খাওয়াব।
কি রান্না?
সর্ষে-মুরগী।
সর্ষে-মুরগী?
হ্যাঁ। তোমরা বাঙালীরা জোর সর্ষেবাটা কাঁচালংকা দিয়ে ইলিশ মাছ, অথবা অন্য মাছ, যেমন আড় বা বোয়াল বা কই মাছ খাও, তেমন করেই আমরা সর্ষে-মুরগী খাই।
ঋজুদা বলল, আমি কিন্তু খেয়েছি।
কোথায়? বিষেণদেওবাবু শুধোলেন।
ঋজুদা আমার দিকে চেয়ে বলল, সত্যি রে! রিণা, মানে অপর্ণা সেনের বাড়িতে। নিজে-হাতে রেঁধেছিল। ফারস্ট ক্লাস
তারপর বলল, ওর হাতের রান্না চমৎকার। ভাল রান্না করতে পারা যে মেয়েদের কত বড় গুণ!
আমি বললাম, যাই-ই বলো তুমি, কমলুদির মত কেউই রাঁধতে পারে না। যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনি রাঁধে।
–কে কমলুদি? ঋজুদা হেসে জিজ্ঞেস করল।
তারপর বলল, সুন্দর দেখতে হলেই ভাল রাঁধবে?
আমি বললাম, আরে কমলুদি। লীলা দীদার মেয়ে; মনীষীদার স্ত্রী।
ঋজুদা পাইপের ধুঁয়ো ছেড়ে অন্যমনস্ক গলায় বলল, ওঃ, তাই-ই বুঝি। তা না-খাওয়ালে আর কি করে জানবো বল। মনীষী আর কমলুকে বলিস এই খাদ্য-রসিককে নেমন্তন্ন করতে একদিন।
নিশ্চয়ই বলব। কমলুদি ত’ রান্নার বইও লেখে, লীলা দীদার সঙ্গে–তাতে কি সব ভাল ভাল রান্না যে আছে না…?
বিষেণবাবু বললেন, এ রকমই হয়। কলেরা কি ডিসেন্ট্রী থেকে ভাল হয়ে উঠলে মানুষ খুব পেটুক হয়ে যায়। জিভে জল আসছে, না রুরুদদরবাবু?
বলেই, উঠে চলে গেলেন।
এ্যাইসা রাগ হলো আমার!
ভানুপ্রতাপ আগেই গেছিলেন। দুজনেই ডিনার টাইমের আগেই আসবেন বলে গেছেন।
ঋজুদা বলল, দেখলি ত’ বিষেণদেওবাবু তোকে পেটুক বললেন। পেটুক আর খাদ্য-রসিকের মধ্যে তফাতটা আর ক’জন বোঝে বল্? পেটুক হলো, আ বিলিভার ইন্ কোয়ানটিটি। আর রসিক হচ্ছে, আ বিলিভার ইন কোয়ালিটি।
আমি বললাম, জেঠুমণি কি যেন একটা কথা বলতেন ঋজুদা?
বলতেন দ্যা ওনলি ওয়ে টু দ্যা হার্ট ইজ থ্রু দ্যা স্টম্যাক্। অর্থাৎ কারো হৃদয় জয় করতে চাইলে তাকে ভাল করে খাওয়াও। হৃদয়ে পৌঁছনোর সবচেয়ে শর্টকাট রাস্তা হচ্ছে পেটের ভিতর দিয়ে।
আমি বললাম, বিষেণবাবুরা বোধহয়–ঐভাবেই আমাদের হৃদয় জয় করবেন ঠিক করেছেন।
ঋজুদা আমার কথার উত্তর না-দিয়ে হঠাৎ হাততালি দিল। একজন বেয়ারা এল।
ব্রিজনন্দনজী কাঁহা? ঋজুদা শুধোল।
উনি ত’ বিকেলের বাসেই হাজারীবাগ চলে গেছেন। সেখান থেকে সারিয়া গিয়ে বেনারসের ট্রেন ধরবেন।
–আজই চলে গেছেন? ঋজুদার গলায় উদ্বেগের সুর লাগল।
–এই ত’! খোকাবাবুকো গাড়ী ঘুষা, ঔর উনোনে ভি নিকলা, একদম্ সাথহি সাথ। কাহে? আপলোঁগ দেখা নেহি?
নেহি ত’! ঋজুদা বলল।
বেয়ারা চলে গেলেই ঋজুদা বলল, রুদ্র, তোর ঘরে চল্ তাড়াতাড়ি–খবর বল্ সব।
ঘরে ঢুকেই ঋজুদাকে সব খবর বলতে যাচ্ছিলাম।
ঋজুদা বলল, এখানে নয়; বাথরুমে চল। বাথরুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে বাথটাবের জল জোরে খুলে দিয়ে সব শুনল।
তারপর বাথরুম থেকে বেরিয়ে, ঘরের দরজা বন্ধ করতে বলল আমাকে।
বলেই কাঁচিটা বের করে যে লাল-রঙা ভিজে-কম্বলে-মোড়া মোরাদাবাদী কুঁজো থেকে জল ঢেলে দিয়েছিলেন বিষেণদেওবাবু, সেই বিরাট কুঁজোর উপরের লাল-দামী কম্বল কাঁচি দিয়ে গোল করে কেটে ফেলল। কেটে ফেলার পরই কুঁজোটার মধ্যে একটা জোড়া দেখা গেল। জোড়-এর প্যাঁচ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুলতেই কুঁজোটা দুভাগ হয়ে গেল। দেখা গেল, জল আছে নীচের ভাগে। আর নীচের ভাগের সঙ্গে একটা নল এসে পড়েছে উপরের ভাগের মুখে; যাতে কুঁজো কাৎ করলেই জল পড়ে। কিন্তু ঐ নলের চারপাশে গোল করে সাজানো তিনটে টেপ-রেকর্ডার। এমন ছোট ছোট ব্যাটারীচালিত ইলেকট্রনিক ডিভাইসেস রয়েছে তাতে যে, একটার ক্যাসেট রেকর্ডিং শেষ হলেই অন্যটার রেকর্ডিং শুরু হবে। কুঁজোর উপরের ভাগটাতে ঝাঁঝরির মত অসংখ্যা ফুটো করা।
ঋজুদা বলল, তোর কাছে কি কি ক্যাসেট আছে?
বলেইছি ত’! দ্যা পোলিস্, বী-জীস, আর কিছু বনি-এম্ আর আব্বা গ্রুপের পুরনো গান। জ্যাক লেনও আছে।
হুঁ। আমার কাছে আছে গিরিজা দেবী, রামকুমার চট্টোপাধ্যায় আর মালতী ঘোষাল।
তারপরই বলল, এক কাজ কর। তুই টর্চটা ধর, আমি ক্যাসেটগুলো পাল্টে দিচ্ছি। ব্যাটাদের রুচি ভাল করে দিয়ে যাব আমরা।
আমি বললাম, এ তোমার কেমন নেমন্তন্ন আসা হে, তোমার ঘর বাগিং করে রেখেছে?
ঋজুদা ক্যাসেট চেঞ্জ করতে করতে বলল, কার্য হলেই কারণ থাকে, একটা কিংবা অনেকগুলো
আমাদের কাজ শেষ হয়ে গেছে, এখন লাল ভেজা কম্বলটা সেলাই করি কি করে?
ঋজুদা বলল, এ্যারালডাইট নয়, অন্য একটা সল্যসানের টিউব আছে, নীল-রঙা। বের কর আমার ব্যাগ থেকে। একদম কথা বলবি না এখন থেকে আর। বললেই তোর ঠোঁট দুটোই সীল করে দেবো।
কাটা-কম্বল সেলাই প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, এমন সময় বারান্দায় যেন কার পায়ের শব্দ শোনা গেল।
শব্দ শোনামাত্রই আমরা দুজন বডি থ্রো দিয়ে বিছানায়।
—কওন? ঋজুদা বলল।
ম্যায় বেয়ারা হুজৌর।
গলার স্বরটা অচেনা লাগল।
ক্যা বাত হ্যায়? ঋজুদা বলল।
রাজাসাব আপলোগোঁকা লিয়ে একঠো খাত্ ভেজিন।
খাত্? বলে, ঋজুদা দরজা খুলতেই, বিকটদর্শন লোকটাকে দেখা গেল। সঙ্গে আরো দুজন গুণ্ডা মত লোক।
বাধা দেবার আগেই ওরা দুজনে মিলে ঋজুদাকে মুখ-ঠেসে জড়িয়ে ধরল। একজন তাড়াতাড়ি মোটা দড়ি বের করে বেঁধেও ফেলল। পিছমোড়া করে।
তারপর তিনজনই দমাদ্দম্ কিল-চড়-লাথি মারতে লাগল–ঋজুদার বুকে-পেটে-মুখে। বলল, নমকহারাম!
ঋজুদা মুখটা ভেটকিমাছের মত করে বলল, উঃ লাগছে।
লাগবে।
ওদের মধ্যে একজন বলল। লাগাবার জন্যেই ত’ এই হরকৎ।
ঋজুদা আবার বলল, লাগছে-এ।
ওরা একসঙ্গে বলল, লাগাতার।
অনেকটা কোলকাতার পথের মিছিলের চলছে চলবের মত শোনাল ব্যাপারটা।
ওরা বলল, যারা নমক খেয়ে গুণ না গায়, উল্টে নমকহারামী করে তাদের এই-ই শিক্ষা। এটা মুলিমালোয়াঁ। আপনাদের কোলকাত্তা নয়। এখানে আপনাদের পুঁতে দিলেও কেউই জানতে পারবে না, কোথায় হারিয়ে গেলেন আপনারা। অনেক লোক এর আগে হারিয়ে গেছে এখানে থেকে।
আমার ভয় করছিল। কিন্তু খুবই আশ্চর্যের কথা, বারবার দেখেছি, ভয় যখন পাওয়ার ঠিক তখন না পেয়ে, আমার একটু পরে পায়।
আমি লোকগুলো আর ঋজুদার দিকে চোখ রেখে খুবই ভয়-পাওয়া মুখ করে খোলা দরজার দিকে যেতে লাগলাম।
গিরধারী না কে, সে বলল, এ বাঁচ্চো চুপ-চাপ অন্দরমে রহো, নেহি ত’ আভি ধড়কা দেগা।
বলেই কোমর থেকে তুলে একটা একহাত লম্বা ঝকঝকে ছুরি দেখালো।
তিনটে লোকই তখন আমার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়েছিল। দেখলাম, ঋজুদা পিছমোড়া অবস্থাতেই, আস্তে আস্তে নীচের কার্পেটে পড়ে-থাকা কাঁচিটার দিকে এগোচ্ছে। আমার ভয় হল, ঋজুদার কোমর থেকে যদি পিস্তলটা ওরা খুলে নিয়ে নেয়, তাহলে?
হঠাৎ এ-বি বাবুর দেওয়া নতুন পিস্তলের কথা মনে হল আমার। এক মুহূর্তের মধ্যে পিস্তলটা কোমর থেকে তুলে নিয়েই দু হাত লাগিয়ে কক্ করলাম। ম্যাগাজিন ভরাই ছিল। পিস্তলটা কক করার শব্দ হতেই ওরা ভয়ের চোখে আমার দিকে তাকাল।
আমি ওদের বুকের দিকে পিস্তলের নল ধরে বললাম, হাত উপার, একদ্দম উপার! তিনো আদমী!
ওরা সকলেই হতভম্ব হয়ে গেছিল। আমাকে নিতান্তই নিরামিষ ছেলেমানুষ বলে ঠাউরেছিল ওরা।
আগুনের ভাঁটার মত চোখে দেখছিল সকলেই আমার দিকে।
হঠাৎ ঋজুদা একলাফে আমার দিকে চলে এসেই আমার পিছনে দাঁড়াল।
আমাকে বলল, ওদের বাথরুমে পুরে দিয়ে বাইরে থেকে হুড়কো লাগিয়ে আমার হাতের দড়িটা খুলে দে রুদ্র। শিগগিরি!
আমি ঋজুদার দিকে চেয়ে দেখলাম, মুখের কষ বেয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। দরজার কাছে গিয়ে ওদের তিনজনকে ভেড়ার পালের মত তাড়িয়ে নিয়ে বাথরুমের মধ্যে ঢোকালাম আমি। ঢুকিয়েই হুড়কো টেনে দিলাম।
হাতের বাঁধন কাটা হতেই, ঋজুদা নিজের পিস্তলটা বের করে নিয়ে বাথরুমের দরজা খুলল। একটা লোক বাথরুমের খোলা জানালা দিয়ে বাইরে লাফাবার উপক্রম করছিল, ঋজুদা তার কাছা ধরে টান দিতেই তার ধুতি খুলে গেল। কেলেঙ্কারী অবস্থা!
ঋজুদা বলল, তোমরা কার লোক? এখুনি বলো। নইলে গুলিতে খুপরি উড়ে যাবে। আলু-কাটা ছুরি নিয়ে এসেছ, আমার চেলার সঙ্গে টক্কর দিতে। বল, তোমরা কার লোক?
আমাদের যে কটা রুমাল ছিল সবকটাকে ভালো করে প্রত্যেকের মুখ-হাঁ করিয়ে গোল করে পাকিয়ে টাগরা অবধি ঢুকিয়ে দেওয়া হল। তারপর প্রত্যেককে কচ্ছপের মত উপুড় করে দুহাত-দু’পা কোলকাতা থেকে নিয়ে আসা নাইলনের দড়ি দিয়ে টাইট করে বেঁধে, দুজনকে বাথরুমের জলভর্তি বাথটাবে আর একজনকে কমোডের মধ্যে মুখ করে ফেলে দিলাম আমরা। বাথরুমের দরজা জানালা বন্ধ করে বাথরুমের দরজায় বাইরে থেকে আমাদের নিজেদের তালা লাগিয়ে ঋজুদা বলল, চল্ এবার। অনেক কাজ আছে।
তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরুবার আগে আমাদের যে-দুটো চামড়ার ব্যাগ সবসময় কাঁধে থাকে, বিশেষ বিশেষ সময়ে, সেই ব্যাগ দুটো তুলে নিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের আনা তালা দিয়ে ঘরের বাইরে থেকে তালা ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
নীচে নেমেই, ঋজুদা সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন করল, গাড়ি কোথায়?
বললাম, গ্যারাজে। তারপর বললাম, তোমার রক্ত পড়া থেমে গেছে?
ঋজুদা বলল, এখন অবান্তর কথা বলার সময় নেই। তাড়াতাড়ি কর।
গ্যারাজের দিকে যেতে যেতে বলল, তেল কত আছে?
আমি বললাম, হাফ-ট্যাঙ্ক।
ঋজুদার ফিয়াটের পাশেই ভানুপ্রতাপবাবুর সাদা-রঙা পেট্রল-মার্সিডিসটা দাঁড়িয়েছিল। তাড়াতাড়ি সাইনিং-এর পাইপ বের করে ঐ গাড়ি থেকে আমাদের গাড়ির ট্যাঙ্ক ফুল করে নিলাম। গ্যারাজে একটা কালো, ধূলি-ধূসরিত এ্যাম্বাসাডর গাড়ি দেখলাম। ঋজুদা বলল, নম্বরটা লিখে নিতে। এটা এ বাড়ির গাড়ি নয়। আজই এসেছে। কোথা থেকে এল?
তারপর বলল, ডিকি থেকে টোয়িং-রোপ, বাক্স সব পিছনের সীটে এনে রাখ। তাড়াতাড়ি। সময় নেই। ট্রান্সমিটারটা?
বললাম, সব আছে।
গাড়ি স্টার্ট করেই, আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
বিরাট গেটের দু দিকে যে দুজন দারোয়ান থাকে, তারা বেরিয়ে এল। ওদের দুজনের হাতেই বন্দুক।
ওরা বলল, রাজাসাহেব আর ভানুপ্রতাপজী আপনাদের রাতের বেলা মহল থেকে বেরোতে একেবারেই মানা করে গেছেন।
ঋজুদা হাসল। বলল, আমরা জঙ্গলেরই চিড়ীয়া।
হেসেই, পাইপের তামাক বের করল পাউচ থেকে। বের করে বলল, বিলাইতী খৈনী, ইধার আও।
নেহী হুজৌর।
আরে, লাও। ডাকে পিষকে, ঠোঁটোয়াকা নীচে জারাসে দা দেও; ঔর স্ৰিফ দিখো কিতনা মজা আতা হ্যায়।
বলেই, বলল, রাজাসাব আর ভানুপ্রতাপজীই আমাদের বলে গেছেন ওঁরা যেখানে গেছেন সেখানেই যেতে। কোনদিকে গেল ওঁদের গাড়ি?
লোকদুটো সরল। বলল, রাজাসাহেব গেলেন গীমারিয়ার দিকে আর ভানুপ্রতাপজী লুলিটাওয়ার দিকে।
বহুত মেহেরবানী।
বলেই, ঋজুদা গাড়িটাকে এক দমকে বাইরে আনল।
ফুট-ফুট করছে জ্যোৎস্না নির্মেঘ আকাশে। ছাউ-রঙা ফিয়াট গাড়িটা চাঁদের আলোর সঙ্গে একেবারে মিশে গেছে। ঋজুদা গাড়ির হেডলাইট, এমনকি সাইড লাইটও না জ্বেলে খুব আস্তে আস্তে লুলিটাওয়ার দিকে চলেছে। ছোট ছোট চড়াই উতরাইয়ে রাস্তা। উতরাইয়ে এঞ্জিন বন্ধ করে নামছে–আর চড়াই আসার আগেই গাড়ি গীয়ারে রেখে হঠাৎ চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট করছে যাতে কম শব্দ হয়।
সেদিন টুটিলাওয়ার হাজীসাহেবের কাছ থেকে শরবত খেয়ে আসার পথে আমরা যে পথে ডানদিকে ঢুকেছিলাম, সেই পথের মোড়ে দাঁড়িয়ে ঋজুদা বলল, রুদ্র, দেখ ত’, কোনো গাড়ির চাকার দাগ আছে কি না এ পথে ঢোকার–টাটকা।
আমি নেমে পড়ে, পিছন ফিরে বসে, যাতে টর্চের আলো বেশীদূর না যায়, এমনভাবে দেখে নিয়ে বললাম, হ্যাঁ আছে। জীপের চাকার দাগ!
ঋজুদা বলল, হুমম।
আমি বললাম, কিন্তু কেন? সাপটা?
হঠাৎ ঋজুদা নিজের মনেই বলল, নাঃ এখানে সময় লাগবে আমাদের অনেক। চল আগে, অ্যালবিনোটাকে দেখে আসি।
বলে, ঐ ভাবেই গাড়ি ঘুরিয়ে, বাতি নিবিয়ে চলতে লাগল। মালোয়াঁ-মহলের আগের চড়াইটাতে জোরে উঠেই এঞ্জিন বন্ধ করে এমনভাবে চুপচাপ, নিঃশব্দে গাড়িটাকে মালোয়াঁ-মহলের গেটের পাশ দিয়ে গীমারিয়ার দিকে নিয়ে গেল যে, এ্যাস্ফোরা তামাকের খৈনীর নেশাতে বুঁদ দারোয়ানদের তা নজরে এলো না।
মালোয়াঁ-মহল থেকে বেশ কিছুটা এসে আমরা সেদিন বিকেলে যেখানে বাঘের পায়ের ছাপ দেখেছিলাম পিসকি নদীর উপর, সেই পথের মোড়টা ছাড়িয়ে গিয়ে ঋজুদা বড় রাস্তাতেই গাড়িটা রাখল।
তারপরই ঋজুদা, জঙ্গলে ঢুকে পড়ল আমাকে নিয়ে। যত কম শব্দ করে গাড়ি লক্ করা সম্ভব তাই-ই করলাম।
টর্চ আছে, কিন্তু জ্বালাচ্ছি না। পিস্তলের হোলস্টার খোলা। যে-কোনো মুহূর্তে হাতে নিতে পারি। ঋজুদা যে কী পাগলের মত করছে, কেন করছে, কিছুই বলছে না। ঠিক এমন সময় অ্যালবিনোটা ডাকল নদীর দিক থেকে। আজকে শেষ বিকেলে ডেকেছিলো কি-না মনে নেই। আমরা শুনিনি। আজ এত দেরি করে?
জঙ্গলের মধ্যে চাঁদনী রাতে, যারা অভ্যস্ত তাদের পক্ষে হাঁটা কিছুই নয়। অন্ধকারেও নয়। শহরের লোকেরা পায়ের পাতা আগে ফেলে তারপর পথের উপর পা পাতেন। কিন্তু জঙ্গলে গোড়ালি আগে পেতে তারপর পাতা পাতলে সুবিধা হয়। এই কারণেই সমস্ত আদিবাসী ও জঙ্গলের মধ্যে যে সব মানুষ থাকে তাদের গোড়ালির কাছটা অসম্ভব সাদা দেখায়। খালি পায়ে হাঁটে এবং ঐভাবে হাঁটে বলেই ওরকম হয়। কিন্তু দৌড়বার সময় তা বলে ওরা কেউই ফ্ল্যাট-ফুটেড নয়। চমৎকার দৌড়য়, মনে হয় উড়েই যাচ্ছে যেন।
ঋজুদা অ্যালবিনোর ডাকই অনুসরণ করে পাগলের মত চলেছে খানায় পড়ে, কাঁটায় ছড়ে। আমরা বেশ কিছুদূর গেছি। আন্দাজে বুঝতে পারছি যে, ঋজুদা নদীটার দিকেই যাওয়ার চেষ্টা করছে জঙ্গলের ভিতরে ভিতরে।
আবার বাঘের ডাক শুনলাম আমরা। এবার বেশ কাছ থেকে। অ্যালবিনোটা। আমি চমকে উঠলাম। একটু ভয়ও পেলাম। পয়েন্ট টু-টু পিস্তল হাতে রাতের বনে, পায়ে হেঁটে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মুখোমুখি হওয়াটা আমার কাছে সুখের ব্যাপার নয়। ঋজুদার কাছে হলেও হতে পারে।
বাঘটা আবারও ডাকল। বারবার ডেকেই চলল। বাঘটা এদিকে ওদিকে ঘুরে ঘুরে ডাকতে লাগল। খুবই কাছ থেকে। এখানে আসার পর প্রায় সন্ধেতেই ডাক শুনেছি এর। কিন্তু এমন ভাবে, এত কাছের থেকে নয়।
আমার ভয় বাড়তে লাগল।
ঋজুদা ফিস্ ফিস্ করে বলতে লাগল, ভেরী ইন্টারেস্টিং!
আমি তাতে আরও ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম, বাঘে আমাকে খেয়ে নিলে ঋজুদা বাঘকেই হয়ত বলবে, হাউ নাইস অফ উ্য। ভেরী ইন্টারেস্টিং।
ঋজুদা এবার হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল–কিছুদূরেই নদীর সাদা বালির বুক দেখা যাচ্ছিল–তারই মধ্যে একজন লোক ঘুরে বেড়াচ্ছিল মনে হল। চাঁদনী রাতে সাদা বালির চরে, তার মূর্তিকে ভুতুড়ে বলে মনে হচ্ছিল। আর বাঘটা ডেকেই যাচ্ছিল। লোকটার একেবারে কাছ থেকেই।
ঋজুদা তাড়াতাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে পিছিয়ে এল। অনেকখানি। প্রায় দু ফার্লং।
তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করে বলল, রুদ্র, ভালো করে শোন।
বেচারা ঋজুদা! আফ্রিকাতে ভুষুন্ডার গুলি-খাওয়া পাটা এখনও ঠিক হয়নি। কিরকম হাঁপাচ্ছে। পায়ে ব্যথাও নিশ্চয়ই করছে।
ঋজুদা বলল, তুই এইখানে একটা গাছে উঠে বসে থাক্। ঐ লোকটা, যে রাস্তা দিয়ে এসেছে, সেই রাস্তা দিয়েই ফিরে যাবে। লোকটা তোর কাছ দিয়েই যাবে ডানদিকে, ঐ ত’ পথটা দেখা যাচ্ছে। লোকটার কিরকম পোশাক? কেমন হাঁটার ধরন! সব লক্ষ্য করবি। লোকটাকে এই চাঁদের আলোতেও হয়ত চিনতে পারবি তুই। হয়ত কেন? আমার মনে হয়, নিশ্চয়ই পারবি। তারপর লোকটা চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর, তুই আস্তে আস্তে হেঁটে ঐ রাস্তা ধরেই বড় রাস্তার মোড়ের দিকে আসবি–যেখানে গাড়ি ঢুকিয়ে ছিলাম আমরা। আমি গাড়ি নিয়ে গীমারিয়ার দিকে গিয়ে লুকিয়ে থাকব। লোকটা চলে যাওয়ার পর তুই হেঁটে আসবি গাড়ির কাছে। বুঝেছিস?
আমি বললাম, হুঁ।
তারপর বলল, ও, তোকে ত’ আসল কথাটাই বলা হয়নি। লোকটা দূরে চলে গেলেই–তুই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে নদীতে যাবি। লোকটা যেখানে ঘোরাঘুরি করছিল ঠিক সেইখানেই ভাল করে খুঁজবি।
–কি? অ্যালবিনো? বলতে পারলাম না আর, যে, টু-টু পিস্তল নিয়ে?
আমার গলায় থুথু আটকে গেল।
ইডিয়ট। ঋজুদা চাপা গলায় বলল।
তারপর বলল, অ্যালবিনো নয়, একটা টেপ-রেকর্ডার পাবি। হয়ত কোনো ঝোপের আড়ালে, কী পাতার মধ্যে, কী কোনো শুকনো নালার মধ্যে লুকিয়ে রাখবে ও–যেখানে সকলের অলক্ষ্যে দিনের বেলাতেও গিয়ে রেকর্ডারের প্লেয়ারের সুইচ টিপে দেওয়া যায়। ওটাকে খুঁজে বের করতেই হবে।
–যদি পাই? ত’ নিয়ে আসব?
–না। রেকর্ডারটা আনবি না। ক্যাসেটাই শুধু চেঞ্জ করে দিবি। ঐ ক্যাসেটা বের করে–তোর কাছে যদি কোনো ক্যাসেট থাকে–দ্যাখ তোর ব্যাগে–তাহলে চেঞ্জ করবি। নইলে, রেকর্ডারটাকে ঐ ভাবেই ফেলে রেখে ওর ভেতরের ক্যাসেটা নিয়ে আসবি। ক্যাসেটা আমার চাইই।
বলেই, বলল, আর সময় নেই। গুড লাক্। বর্ষাকাল, সাপ-কোপের ঘাড়ে পা দিস না। সাবধানে।
বলেই, ঋজুদা জঙ্গলের নীচের আলো-ছায়ার বুটি-কাটা গালচের মধ্যে হারিয়ে গেল।
আমি এবার একটা গাছ খুঁজলাম–যাতে পাতা বেশী, পিঁপড়ে কম, সাপের ফোকর নেই। কিন্তু তেমন গাছ ত’ মেলা মুশকিল। অন্ধকারে বুঝতেও পারলাম না কি গাছ। চড়ার পর মনে হল, শিশু। গোলগোল পাতা। বসে, একেবারেই আরাম নেই; বড়ই শক্ত কাঠ।
একটা ব্রেইন-ফিভার পাখি ডাকছে আমার দিক থেকে। নদীর উল্টোদিক থেকে তার সাথী সাড়া দিচ্ছে। একটা একলা টিটি পাখি পিসকি নদীর শুকনো সাদা বালিতে ছায়ার মত নড়ে বেড়ানো লোকটার মাথার উপরে ঘুরে-ঘুরে লম্বা লম্বা ঠ্যাং দুটো দুলিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। ভালই হয়েছে। পাখিটা ঐ লোকটার সঙ্গ ছাড়বে না। ঠিক তার মাথার উপর উড়তে উড়তে আসবেই। তার চলাচল বোঝার কোনো অসুবিধেই হবে না আমার।
একটা ঢাব পাখি হঠাৎ ডাকতে লাগল রাস্তার ওপার থেকে। ঢাব-ঢাব-ঢাব-ঢাব করে ডেকেই চলবে। বাঘটা এখন আর ডাকছে না। অত কাছ থেকে প্রায় নিরস্ত্র অবস্থায় বাঘের ডাক শুনতে ইচ্ছেও নেই। রবার্ট কেনেডির মাথা আর বাঘের মাথা ত’ এক জিনিস নয়–এ-বি বাবু যাইই বলুন না কেন! একটা খাপু পাখি ডাকছে আরও দূর থেকে খাপু-খাপু-খাপু-খাপু-খাপু। সারারাত চাঁদ-ওড়া বনে ও ডেকে যাবে এমনি করেই। মাঝে মাঝে ময়ুর ডাকবে ক্বেঁয়া ক্বেঁয়া ক্বেঁয়া করে বুকের মধ্যে চমক তুলে।
প্রায় মিনিট পনেরো পরে টিটি পাখিটা পাইলটিং করে লোকটাকে নিয়ে আসতে লাগল–তার মাথার উপর ঘুরে ঘুরে উড়ে। লোকটা কাছে আসছে; এসে গেল। তার নাগরা জুতোর লোহার নাল পথের কাঁকড়ের উপর খচর মচর আওয়াজ করছে।
-কে? ব্রিজনন্দন?
হ্যাঁ। তাইই ত’! অবাক হয়ে আমি চেয়ে রইলাম। সেই ধুতি, গোলাপি টেরিলিনের পাঞ্জাবী–এখন সাদা দেখাচ্ছে চাঁদের আলোতে। ব্রিজনন্দনের পাঞ্জাবীর তলায় পিস্তল আছে–আমি জানি। থাকুক। আমারও আছে এখন।
ও চলে গেলে, আমি গাছ থেকে নেমে নদীর দিকে এগিয়ে গেলাম আস্তে আস্তে। নদীতে নেমে পড়লাম। একদল চিতল হরিণ নদীতে জল খেতে আসছিল, আমাকে দেখতে পেয়েই, চাঁদের আলোয়, বনের ছায়ার দুধলি অন্ধকারে তারা এমন বড় বড় লাফে দৌড়ে পালাল, যেন মনে হল উড়েই যাচ্ছে–আফ্রিকান গ্যাজেলদের মত। টাঁউ-টাঁউ-টাঁউ করে পুরুষ হরিণগুলো বনের সব প্রাণীদের আমার আসার কথা জানা দিয়ে সাবধান করে দিয়ে ডেকে উঠল, রাতের ঝিমঝিমে নিস্তব্ধতা ছিঁড়েখুড়ে।
ভাল করে খুঁজতে লাগলাম ঘুরে ঘুরে নদীটার সমান্তরালে একটা খোয়াই চলে গেছে। তার মধ্যে বড় বড় ঘাস–চওড়া-চওড়া তাদের ফলা। পাতার কোণে খুব ধার–ওর মধ্যে নেমে দেখতে গিয়ে আমার হাতই কেটে যেতে লাগল। কিন্তু একটু পরেই পাওয়া গেল টেপ-রেকর্ডারটা। চট করে ক্যাসেটটা খুলে নিয়ে আমি আমার ব্যাগ থেকে বের করা ক্যাসেটটা পুরে দিলাম। এর মধ্যে কোন গান আছে কে জানে–টর্চ না জ্বালালে জানবারও উপায় নেই। টর্চ জ্বালবার অর্ডারও নেই।
কাজ শেষ করে জঙ্গলে কিছুটা ফিরে এসে আমি এবার পথে উঠলাম।
হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ করে বিকট বুক কাঁপানো আওয়াজ তুলে একটা হায়না হেসে উঠল নদীর ওপার থেকে। কাকে ঠাট্টা করছে ও, ওই-ই জানে। হয়ত নিজেকেই। কিন্তু রাতের জঙ্গলে হায়নার ডাক গায়ের লোম খাড়া করে দেয়। আমাদের দেশের হায়নারা আফ্রিকান হায়নার চেয়ে অনেক বড় হয়–অনেক সময়, যে এই ডাক চেনে না, সে রাতের জঙ্গলে দূর থেকে কোনো ভৌতিক শব্দ বলে ভুলও করতে পারে। হায়নার ডাক শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে আমার।
আমি বড় রাস্তাতে এসে উঠতেই ঋজুদার গাড়িটা ভুতুড়ে গাড়ির মত গড়িয়ে এল আমার কাছে। এঞ্জিন বন্ধ করে।
ঋজুদা বলল, কিরে? চিনতে পারলি?
আমি ফিসফিস করে বললাম, ব্রিজনন্দন!
ঋজুদা বলল, অনুমান তাই-ই করেছিলাম। কিন্তু ও এই পথেই গেছে, চল্ আমরা বরং ওল্ড রাতরা রোড হয়ে মালোয়াঁ-মহলকে বাইপাস করে বেরিয়ে যাই। শোন, পিস্তলে যখন গুলি ছুঁড়বি, হাতটাকে কাঁধের কাছ থেকে শক্ত করবি। আঙুলগুলো আর হাতের পাতাটা আলগা করে ধরে থাকবে পিস্তলকে। সমান প্রেসারে ট্রিগার টানবি। আর সবসময় টার্গেটের সিক্স-ও-ক্লকে এইম করবি। কারণ, পিস্তল-এর মাজল-এর গুলি বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে ওঠার টেনডেন্সী থাকে। পরে, অনেক ছুঁড়তে ছুঁড়তে এইম করারও আর দরকার হবে না। তুলবি আর মারবি।
ওয়েস্টার্ন ছবির হিরোদের মত? আমি বললাম।
হ্যাঁ। ওরা ত’ ছবিরই হীরো। এখন তুই এই হাজারীবাগী জঙ্গলের জেনুইন হীরো। খুবই এ্যালার্ট থাকবি। কোনো কিছু গণ্ডগোল দেখলেই গুলি চালাতে এক সেকেন্ড দেরি করবি না–আমার পারমিশান্ নেওয়ারও দরকার নেই। তবে…….
বলে, নিজের পিস্তলটা বের করে, ব্যাগ খুলে কি একটা লোহার নলের মত জিনিস ঋজুদা তার নিজের পিস্তলের নলের মুখে পরিয়ে নিল।
বললাম, এটা কি?
সাইলেন্সর।
গুলি করলেও, শুধু ব্লপ্ করে একটা চাপা আওয়াজ হবে। দশ গজ দূরের লোকও শুনতে পাবে না যে, থ্রি-সেভেনটি-এর গুলি কারো মগজ বা বুক ফাঁক করে দিল। এর জন্যে স্পেশ্যাল লাইসেন্স লাগে। আমাকে দিয়েছেন ওয়েস্ট-বেঙ্গল গভর্নমেন্টের হোম-ডিপার্টমেন্ট–ভেরী কাইন্ড অফ দেম।
ঋজুদা বলল, ট্রান্সমিটারটা বের কর শীগগিরী।
তাড়াতাড়ি বের করলাম সেটাকে টেনে। একটা ছ’ ভোল্টের ব্যাটারীর মত জিনিস। তবে ওজন অনেক কম।
এরীয়ালটা তুলে দিয়ে ঋজুদা বলল, পাসওয়ার্ড কি দিয়েছেন?
আমি বললাম, এ্যাই রে। দাঁড়াও মনে করি। হ্যাঁ। গুললি-ওলি।
ট্রান্সমিটারে নানারকম শব্দ হতে লাগল।
ওপাশ থেকে ভেসে এল গুললি-ওলি। রজার।
ঋজুদা বলল, কাম টু ডান্সিং হল এ্যাট টুয়েন্টিওয়ান আওয়ার শার্প। সারাউন্ড ইট কমপ্লিটুলী উইথ ফোর্স। এপ্রিহেন্ড স্ট্রং রেজিস্ট্যান্স। এনিমী ওয়েল-আর্মড। ওভার।
ওপাশ থেকে ভেসে এল, গুললি-ওলি–রজার ওভার।
ঋজুদা বলল গুলি-ওলি। আই রীপিট। বলে আবার মেসেজটা রীপিট্ করল ঋজুদা।
ওপাশ থেকে বলল, রজার। উই আর রেডী। এন্ড মুভিং আউট। ওভার।
থ্যাংস। ওভার।
চল্। বলল, ঋজুদা। তারপর গাড়ি স্টার্ট করল।
বলল, ক’টা বাজল রে রুদ্র?
আমি ঘড়ির রেডিয়ামে তাকিয়ে বললাম, সাতটা দশ।
ঋজুদা বলল, ফাইন্। উই উইল জাস্ট বী আ লিটল এ্যাহেড অফ রাঁদেভু টাইম।
তারপর বলল, ট্রান্সমিটারটা এই পথের মোড়েই জঙ্গলের মধ্যে এমনভাবে লুকিয়ে রাখ যাতে কাল সকালে খুঁজে পেতে অসুবিধা না হয়।
আমি বললাম, কেন? গাড়িতেই থাকুক না।
ঋজুদা বলল, যা বলছি, তাইই কর।
গাড়ি থেকে নেমে একটা কেলাউন্দা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রাখলাম ওটাকে।
ওল্ড রাতরা রোড হয়ে আমরা সেই সাপের আক্রমণের রাস্তায় গিয়ে পৌঁছলাম। রাস্তাটা ছায়াচ্ছন্নতার জন্যে দিনের বেলাতেই এত অন্ধকার যে, রাতের বেলা আলো না জ্বেলে চলাই মুশকিল।
ঋজুদা বলল, এখন শুধুই সাইড-লাইট জ্বালাচ্ছি। তুই কোনো গাড়ির চাকার দাগ দেখতে পাস কি-না দ্যাখ ত’ ভালো করে। যতদূর চাকার দাগ পাওয়া যাবে–আমরা সেফলি গাড়ি নিয়ে ততদূর যেতে পারব।
আমি জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখতে দেখতে বললাম, পাচ্ছি না। পেলেই তোমাকে বলব। এত অন্ধকার যে সাইড-লাইটে কিছু দেখাই যাচ্ছে না।
খুব আস্তে আস্তে গাড়িটা চলছে–আমরা প্রায় মাইল তিনেক এসে গেছি; এমন সময় ঋজুদা গাড়িটা থামিয়ে দিল। এঞ্জিনও বন্ধ করে দিল।
বলল, দেখেছিস কী ধুরন্ধর এরা!
বলেই বলল, গাড়িতে যা জিনিস-পত্র আছে, তার যা-কিছু পারিস সবই ব্যাগে পুরে নে। আর গদাধরের বাক্সতেও যা দরকারী জিনিস আছে, তাও নিয়ে নে নিজেদের ব্যাগে।
যতখানি আঁটল দুজনের ব্যাগে পুরলাম। তারপর বললাম, এবার কি?
ঋজুদা বলল, সামনে, রাস্তায় শুকনো পাতার উপরে কিছু কাঁচা পাতা দেখতে পাচ্ছিস? কিছু বিসাদৃশ্য?
হ্যাঁ।
ঐখানে একটা গর্ত করে রেখেছে ওরা। ঐ দ্যাখ। গাড়ির চাকার দাগ বরাবর নিশ্চয়ই কোনো কাঠ-টাট পেতে নিজেদের গাড়ি পার করেছে। আমরা ঐ অবধি গেলেই গাড়ি গর্তে পড়ে যেত, আর আটকে যেতাম আমরা। মারাও যেতে পারতাম। গর্তটা কত গভীর, তা কে জানে?
কি করবে? আমি নার্ভাস গলায় বললাম।
ঋজুদা বলল, গাড়ি থেকে নেমে গর্তের বাঁদিকের জঙ্গলে ঢুকে জঙ্গলে জঙ্গলে তুই নাচঘরের দিকে এগিয়ে যেতে থাক্, যত তাড়াতাড়ি পারিস, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কক-করা পিস্তল হাতে নিয়ে। যত জোরে পারিস এগিয়ে যাবি–যতখানি পারিস ডিসট্যান্স কভার কর।
আর তুমি?
আমিও আসছি। ওরা আমাদের এক্সপেক্ট করছে তৈরী হয়ে। আমরা যে এসেছি, তা ওদের জানান দিতে হবে না?
বলেই, ঋজুদা ব্যাগ থেকে কতগুলো মোটা রাবার ব্যান্ড বের করল। আমাকে বলল, তাড়াতাড়ি একটা ফ্ল্যাট পাথর কুড়িয়ে দে ত’ আমাকে, রুদ্র।
পথের পাশ থেকে একটা তিন-চার ইঞ্চি চওড়া-চ্যাপ্টা ভারী পাথর দিলাম ঋজুদাকে। ঋজুদা সেই পাথরটাকে গাড়ির এ্যাকসিলারেটরের উপর শুইয়ে রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাঁধল–এঞ্জিন বন্ধ করে নিয়ে। তারপর গাড়িটাকে পাতা-চাপা-গর্তের একেবারে সামনে নিয়ে গেল–ঠেলে। নিজে ব্যাগ-ট্যাগ সমেত নেমে, দরজা খুলে রেখেই আবার সীটে বসে ফার্স্ট গীয়ারে দিল গাড়িটাকে। দিয়েই,–হেডলাইট জ্বেলে দিল–তারপর লাফিয়ে নেমে পড়ে, বাইরে থেকে হাত বাড়িয়ে এঞ্জিনের সুইচ টিপে দিল।
এ্যাকসিলারেটরে পাথরের ওজন ছিলই। এঞ্জিনটা গোঁ গোঁ করে প্রচণ্ড আওয়াজ করে উঠে একলাফে গিয়ে পাতার ঢাকনা ফুড়ে গর্তে পড়ল আর্তনাদ করে। হেডলাইটের একটা আলো সোজা সামনের রাস্তাটাকে আলোকিত করে রাখল। আর অন্য আলোটা আকাশের দিকে মুখ করে জ্বলতে লাগল।
ঋজুদা বলল, ফারস্ট ক্লাস। পুলিশ ফোর্সের আর খুঁজতে হবে না জায়গাটা। এঞ্জিনটা গোঁ-গোঁ করেই যেতে লাগল, গর্তে-পড়া জংলী শুয়োরের মত।
বাঁ দিকের অন্ধকারে খুব তাড়াতাড়ি আমি অনেকখানি এগিয়ে গেছিলাম। পথের সমান্তরালে। হঠাৎ দেখি, রাস্তা দিয়ে তিনজন লোক হাতে বন্দুক নিয়ে আলো-আঁধারীতে দৌড়ে যাচ্ছে গাড়ির দিকে। তাদের পোশাক ও মাথার ঝাঁকড়া চুল দেখে মনে হল যে, স্থানীয় লোক নয় এরা। কিন্তু তাদের পিছনে আরও একজন লোক দৌড়ে গেল। তাকে ভাল দেখা গেল না।
আমি দাঁড়িয়ে পড়ে পিছন ফিরে ওদের দেখছিলাম, এমন সময় রাস্তার ডানদিক থেকে একটা লক্ষ্মী-পেঁচা ডাকল। আবারও ডাকল।
বুঝলাম, ঋজুদা উল্টোদিকে পৌঁছে গেছে। ঋজুদা পেঁচার ডাক ডাকতে ডাকতে নাচঘরের দিকে যেতে লাগল জোরে দৌড়ে। আমিও দৌড়তে লাগলাম। নাচঘরের কাছে আসতেই দেখলাম মরচে-পড়া প্রকাণ্ড দুটো লোহার দরজা। বিরাট বিরাট কড়া-লাগানো। ভেজানো রয়েছে। ভিতর থেকে অল্প আলো আসছে বাইরে। ঋজুদা প্রথমে ঢুকল। পরে আমি।
রীতিমত বড় ঘরটা। এল শেপ-এর ঘরে হ্যাজাক জ্বলছিল একটা। দেওয়ালের আয়নাগুলো খয়েরী, কালো দাগে ভরা। অনেকই ভেঙে গেলেও সব তখনও ভাঙেনি। না-ভাঙা আয়নাগুলোতে আমাদেরই দুই মূর্তিমানের পিস্তল-হাতে ছায়া দেখে আমরা নিজেরাই চমকে উঠলাম। এক কোনায় একটা সাদা ঘোড়া বাঁধা রয়েছে। সামনে ঘাস, বিচালী। তার মুখ আষ্টেপৃষ্ঠে দড়ি দিয়ে বাঁধা। যাতে ডাকতে না পারে। নানারকম পাঁচমিশেলী গন্ধ বেরোচ্ছে জায়গাটা থেকে।
হঠাৎ বোঁটকা গন্ধ পেলাম নাকে। এখানে আসার পরদিন ভানুপ্রতাপের গাড়ি থেকে যেমন গন্ধ পেয়েছিলাম। একটু এগিয়ে গিয়েই দেখি, প্রকাণ্ড লোহার খাঁচার মধ্যে, একটা বিরাট হায়না দাঁত বের করে রাগে আমার দিকে দেখছে। তার গায়ের লোম অনেক জায়গায় ঝরে গেছে। ঘেয়ো কুকুরের মত।
উত্তেজিত হয়ে ডাকলাম, ঋজুদা। দ্যাখো, হায়না।
ঋজুদা অন্যমনস্ক গলায় বলল, জানি।
ঋজুদা আমার ঐ দারুণ আবিষ্কারে উত্তেজিত ত’ হলোই না, মুখও ফেরালো না।
দুঃখিত হলাম খুব।
ঋজুদা এদিকে ওদিকে যেন কী খুঁজছিল। হঠাৎ একটা জায়গায় গিয়ে থেমে গেল। একটা সুড়ঙ্গ।
নাচঘরের অন্য দিক থেকে নানারকম হিসহিস্ আওয়াজ আসছিল। ঐ দিকে গিয়ে টর্চ ফেলতেই দেখি, একটা গভীর গর্তের মধ্যে কম করে তিরিশ-চল্লিশটা নানা জাতের সাপ কিলবিল করছে। গর্তের পাশগুলো মসৃণ পিতলের। তাতে কোনো তেল ঢেলে আরও মসৃণ করা হয়েছে। তাই গর্তের গা বেয়ে উঠে আসা সাপেদের পক্ষে সম্ভব নয়। আর তারই পাশে একটা লোহার-জাল-লাগানো খাঁচায় প্রকাণ্ড একটা সাপ হিস হিস করে এমনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে যে, মনে হচ্ছে খাঁচাটাকে শুদ্ধ নিয়ে সে আমাদের দিকে ছুটে আসবে। একটুখন দেখেই, সে-মক্কেলকে দেখে চিনতে একটুও দেরী হলো না আমার।
ঋজুদা বলল, চল রুদ্র। আর দেরী করার সময় নেই। বলেই, টর্চের বোতাম টিপে সুড়ঙ্গের মধ্যে নেমে পড়ল। আমরা যখন সুড়ঙ্গে নামছি তখন অনেক দূর থেকে বন্দুক ও রাইফেলের আওয়াজ ভেসে এল গুম গুম করে।
সুড়ঙ্গটা প্রথমে তিন-চার ধাপ নেমেছে। নেমে অনেকটানি সোজা চলে গেছে। খুবই লম্বা ও বড় সুড়ঙ্গ। ঋজুদার মত লম্বা লোকেরও মাথা নোয়াতে হচ্ছে না। এবং আমরা পাশাপাশিই যেতে পারছি দুজনে। বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর দেখলাম, সিঁড়ি উঠে গেছে উপরে। ভিজে, ভিজে, স্যাঁতসেঁতে, ক্ষয়ে-যাওয়া সিঁড়ি।
যত তাড়াতাড়ি পারি আমরা উঠে গিয়েই সুড়ঙ্গের মুখে একটা লোহার ভারী দরজার সামনে পৌঁছলাম। তা অন্য দিক থেকে বন্ধ।
ফিসফিস করে আমি বললাম, কি হবে, ঋজুদা? যদি ওরা সাপ আর হায়নাটাকে ছেড়ে দেয় সুড়ঙ্গের মধ্যে? যদি আগুন লাগিয়ে দেয়? যদি ঐ সাপটাকে……
কথা বলিস না। ঋজুদা ফিস্ ফিস্ করে বলল।
তারপর বলল, তুই পেছন দিকটা দ্যাখ। পিস্তল হাতে রাখ। একেবারে রেডী। ভগবান এলেও মেরে দিবি; দুবার না ভেবে।
ঋজুদা ব্যাগ থেকে কি একটা গোল কিন্তু লম্বাটে লোহার জিনিস তাড়াতাড়ি বের করল। করেই পাইপের লাইটার জ্বেলে তাতে আগুন জ্বালল। ছোট্ট একধরনের গ্যাস-সীলিন্ডার। আমাকেই কিনে আনতে বলেছিল কলকাতা থেকে। কিন্তু অত ছোট সীলিন্ডার দিয়ে কি হবে কিছুই বুঝতে পারিনি তখন আমি। বরং ভেবেছিলাম, কারো অসুখ হলে অক্সিজেন দেবে বুঝি।
ঋজুদা ফিস্ ফিস্ করে বলল, এদিক থেকে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে দরজা ভাঙবার। এই বুদ্ধিটা যে কেন মাথায় ঢোকেনি ওদের।
লোহা কাটতে লাগল ঋজুদা নিঃশব্দে। নিঃশব্দে ঠিক নয়, ফিস্ ফিস্ শব্দ হতে লাগল, অতি সামান্য। লোহা গলে পড়তে লাগল।
মিনিট দু-তিনের মধ্যেই উল্টোদিকের তালার কড়া গলে গেল।
দরজাটাতে ধাক্কা দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই, আমরা বিষেণদেওবাবুর, প্রায় ময়দানের মত বড় শোবার ঘরে ঢুকে পড়লাম, কাপড়-চোপড়ের একটা আলনা উল্টে ফেলে। সেটা দিয়েই সুড়ঙ্গের দরজাটা আড়াল করা ছিল।
হায় বজরঙ্গবলী!
বলেই, ইজচেয়ারে শুয়ে, গড়গড়ার নলে টান দিতে-থাকা বিষেণদেওবাবু এক লাফে তা থেকে উঠতে গিয়েই গড়গড়ার নলে পা জড়িয়ে গড়গড়া-টড়গড়া নিয়ে উল্টে পড়ে গেলেন।
প্রকাণ্ড ঘরটার অন্য কোণে উনি ট্রানজিস্টর শুনছিলেন, সেটাকে প্রায় কানের কাছে রেখে। তাই, আমাদের কোনো আওয়াজই শুনতে পাননি।
আমাদের দুজনের হাতেই খোলা পিস্তল দেখে বিষেণদেওবাবু কাঁদো কাঁদো হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে বললেন, ঋজুবাবু! এই কি মেহমানের কাজ? ছিঃ ছিঃ। হায় বজরঙ্গবলী! আমার যা আছে সব নিয়ে যান, আলমারীর চাবি দিচ্ছি, সোনা জহরৎ, টাকা-পয়সা সব কিছু আমাকে শুধু জানে মারবেন না। আমি চলে গেলে ছেলেটা একেবারে ভেসে যাবে ঋজুবাবু। আমাকে দয়া করুন। ভানুর, আমি ছাড়া কেউই নেই।
ঋজুদা সুড়ঙ্গের দরজাটা বন্ধ করে তার সামনে একটা টেবল দিয়ে ঠেকা দিল।
তারপর তাড়াতাড়ি বিষেণদেওবাবুকে বলল, সময় নেই, সময় নষ্ট করবার। কোনো বাজে কথা শোনারই সময় নেই এখন আমাদের। আপনি শীগগির সামনের এই ওয়াড্রোবটার মধ্যে ঢুকে পড়ন। দরজাটা নিজেই ধরে রাখবেন ভিতর থেকে, একটু ফাঁক করে। ফাঁক দিয়ে নিঃশ্বাস নেবেন।
হায় বজরঙ্গবলী। হায় বজরঙ্গবলী। কী বিপদ! কী বিপদ! ভানু কোথায়? ভানু?
ঋজুদা বিষেণদেওবাবুর উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে বলল, রুদ্র, তুই সুড়ঙ্গের দরজার বাঁ পাশে গিয়ে ঐ টেবলটার উপরে উঠে দাঁড়া। পিস্তল রেডী রাখিস। দেখিস, ঐ ওয়াড্রোবের দিকেই আবার যেন গুলি চালাস না। খু-উ-ব সাবধান।
বলেই, এই পায়ে লাথি দিয়ে টেবলটাকে সরিয়ে দিল সুড়ঙ্গের মুখ থেকে। সুড়ঙ্গের দরজাটা হাঁ করে খুলে রইল।
মিনিট তিনেক চুপচাপ। মৃত্যুর মত নিস্তব্ধ। শুধু এ বিপদের মধ্যেই গড়গড়ার নলটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে ঋজুদা ভুড় ভুড় করে টানছিল। পাইপটা গাড়িতেই রেখে এসেছিল, গাড়ি ছেড়ে আসবার সময়। পাছে, পাইপের তামাকের গন্ধ বিট্রে করে আমাদের।
ঐ সাংঘাতিক সিচুয়েশানেও ফিফিস্ করে ঋজুদা আমাকে বলল, গয়ার অম্বুরী তামাক-ফারস্ট ক্লাস। বুঝলি রুদ্র!
বিষেণদেওবাবু সেই কথা শুনে অবাক হয়ে ওয়াড্রোবের দরজা খুলে ধরে বললেন, অজীব আদমী হ্যায় আপ।
ঋজুদা প্রায় ধমকে বলল, দরজা বন্ধ করে মুখ ভিতরে করুন শিগগিরি।
ঠিক সেই সময়ই সুড়ঙ্গের নীচ থেকে কী একটা নরম কিন্তু দ্রুতগামী আওয়াজ ভেসে এল।
তারপরই মনে হল, একটা ঝড় আসছে। পাতাল কুঁড়ে।
গড়গড়ার নল আর পিস্তলটা সাইড-টেবলের উপর রেখে, বিষেণদেওবাবুর দরজার পেতলের ভারী খিলটা হাতে তুলে নিল ঋজুদা। তুলে নিয়েই দু হাতে ধরে মাথার উপরে তুলল।
বিষেণদেওবাবুর ওয়াড্রোবের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার আরও এক মেহমান আসছে।
আমার খুব ভয় করতে লাগল। ঋজুদা ভুল করছে। এ সাপ, সাপ নয়; অভিশাপ!
মুহূর্তের মধ্যে সাপটা এসে গেল। সে যেই সুড়ঙ্গের দরজা দিয়ে মুখ বের করে সিঁড়ি থেকে মাথা তুলে মেঝেতে মাথা রাখল–অমনি ঝন্ঝন্ করে পিতলের খিলটা পড়ল তার মাথায়।
কিন্তু অত বড় সাপের মাথায় মাল্টিস্টোরিড বাড়ির পাইলিং করার লোহার চৌকো হাতুড়ী পড়লেও বোধহয় কিছুই হতো না। আঘাত পেল ঠিকই কিন্তু খিলটাই লাফিয়ে উঠলো; যেন রাবারের উপর পড়েছে গিয়ে। খিলটা লাফিয়ে উঠেই ঋজুদার হাত থেকে ছিটকে গিয়ে মেঝের একেবারে মাঝখানে চলে গেল ঝনঝন করে। সাপটা এবার ফণা তুললো। কী ফণা!–ফণা তুলে, একবার ডানদিকে আর একবার বাঁদিকে দেখলো। ঋজুদাকে দেখামাত্রই সে প্রায় ছ’ ফিট লম্বা হয়ে দাঁড়ালো পুরো ফণা ছড়িয়ে, জলপাই-সবুজ রঙ তার পিঠের, পেটের দিকে কালো-সাদা ডোরা, প্রকাণ্ড বড় হাঁ, একজোড়া বীভৎস দাঁত ও একটা এক হাত লম্বা চেরা-জিভ দিয়ে সে যেন পৃথিবী ধ্বংস করবে বলেই মনে হল।
আমি আমার অজান্তেই টেবলের উপর দাঁড়িয়ে ফণাটার গোড়াতেই লক্ষ্য করে মনে মনে জয় বজরঙ্গবলী বলে পিস্তলের ট্রিগার টানলাম। ঘরের মধ্যে শর্ট ব্যারেলের পিস্তলের আওয়াজ গমগম করে উঠল। গুলিটা সাপটার মাথা এ ফোঁড় ওফোঁড় করে বিষেণদেওবাবুর রাইটিং টেবলের উপরে রাখা একটা সুন্দর ঝাড়বাতিকে ঝন্ঝন্ করে ভেঙে দিল। গুলি খেয়েই সাপটা সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করার মত মাটিতে লুটিয়ে পড়ল একবার। কিন্তু মুহূর্তের জন্যে লুটিয়ে পড়েই যেই আবার উঠতে যাবে, ভারী মেহগনী কাঠের গোল টেবলটাকে মুহূর্তের মধ্যে দু হাতে তুলে নিয়ে ঋজুদা তার গায়ের উপরে দড়াম করে ফেলে দিল। এজ, লাক উড হ্যাভ ইট; পড়ল ত’ পড়, একেবারে কোমরেরই উপর। মাথায় গুলি খেয়ে কোমরটাতেও চোট খাওয়াতে এত বড় কালনাগ ঘরের মধ্যে যে কী তাণ্ডব শুরু করল সে কী বলব! তার চোখের আগুন, দাঁতের বাহার, জিভের লকলক –ও বাবা গোঃ!
বিষেণদেওবাবু ওয়াড্রোবের দরজা একটু ফাঁক করে, হায়! হায়! করেই আবার দরজাটা বন্ধ করে দিলেন।
ওয়াড্রোবের ফাঁক থেকে মাঝে মাঝেই শুধু বিষেণদেওবাবুর হায় বজরঙ্গবলী, জায় বজরঙ্গলী, হায় বজরঙ্গবলী, জায় বজরঙ্গবলী শোনা যাচ্ছিল কান্না-মেশানো দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে।
ঋজুদা বলল, তুই এবার আমার জায়গায় এসে দাঁড়া রুদ্র। আমি এ ব্যাটাকে ঠাণ্ডা করি।
আমি ঋজুদার জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতেই ঋজুদা পেতলের খিলটাকে আবার তুলে নিয়ে পর পর সাপটার মাথায় গোটা দশ-বারো মোক্ষম বাড়ি মারাতে সাপটা অবশেষে ফণাটা নামিয়ে মেঝেতে শুলো। ওর দীর্ঘ, তীব্র ঝাঁঝালো পথ এবারে শেষ হয়ে এসেছে। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেও যে সে মরবে এমন কোনো লক্ষণ দেখা গেলো না। কেবলই উল্টে-পাল্টে হিসহাস্ করতে লাগল। আমি যে টেবলটাতে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম, সেটাকেও উল্টে দিলাম সাপটার উপরে।
এমন সময় আমার নাকে একটা বোঁটকা গন্ধ এবং ঋজুদা, আফ্রিকাতে ভুষুণ্ডার গুলি খাওয়ার পর ঋজুদাকে খুঁজতে গিয়ে পাথরের উপর যেমন নূপুরের শব্দের মত শব্দ এসেছিলো কানে, ঠিক তেমনই শব্দ পেলাম।
রেডি হয়েই রইলাম। গন্ধটা জোর হতে লাগল, পায়ের নখের শব্দটাও; হঠাৎ একেবারে কাছে এসে গেল।
যেই লোম-ওঠা হতকুচ্ছিৎ হায়নাটা মাথা বের করবে ঘরের ভিতরে, আমি তার ঠিক বাঁ কানের ফুটোর মধ্যে দিয়ে একটা গুলি চালান করে দিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দেব মনস্থ করে পিস্তল তুলেই রেখেছিলাম। কিন্তু সে মাথাটা ঘরে ঢোকাবার সঙ্গে সঙ্গেই ব্লপ করে একটি চাপা নরম আওয়াজ হল। কি হল, বোঝবার আগেই, লোম-ওঠা, ঘেয়ো হায়নাটা জিভ বের করে মেঝেতে চার-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। যেন ঘুমোবে। যেন অনেকদিন থেকে অনেক ঘুম জমা হয়েছিল ওর মধ্যে।
এর পর আর কিছুই ঘটলো না। আমি ভেবেছিলাম, সেই ঝাঁকড়া-চুলের জংলী লোকগুলোও বুঝি আসবে। তারা কারা কে জানে? আর তাদের পিছনের লোকটি? সে কে?
যেন, আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই ঋজুদা বলল, পুলিশ আসবে এখুনি।
বিষেণদেওবাবু খুব ভয় পেয়ে মুখ কালো করে বললেন, পুলিশ। পুলিশ কেন? আমি ত’ কিছুই বুঝতে পারছি না। কোনও মানুষ ভি খুন হলো না কি? আমি ত’ নির্দোষ। আর আমার ভানু ত’ ফুলের মত; শিশু।
ঋজুদা বলল, মামা-ভাগ্নের ব্যাপার। সেসব আপনারাই জানেন।
বিষেণদেওবাবু আবার বললেন, ভানু? ভানু কোথায়? সত্যি কথা বলুন ঋজুবাবু, আমার ভানুর কোনো বিপদ ঘটেনি ত’?
ঋজুদা কি বলতে যাবে বিষেণদেওবাবুকে, ঠিক এমনি সময়ে সুড়ঙ্গ দিয়ে পুলিশের একজন বড় অফিসার আর তাঁর সঙ্গে দু’জন দারোগা ও চারজন কনস্টেবল খোলা রিভলবার, রাইফেল আর টর্চ হাতে বিষেণদেওবাবুর ঘরে ঢুকেই ঐ বিরাট নড়াচড়া করা সাপ আর মরা হায়নাটা দেখে চমকে উঠলেন। তারপরই আমাদের দুজনের দিকে রাইফেল, রিভলবার তুললেন।
ঋজুদা বলল, গুললি-অলি। সঙ্গে সঙ্গে আমিও বললাম, গুললি-অলি।
বিষেণদেওবাবু ওয়াড্রোব থেকে বাইরে বেরোতেই পুলিশ সাহেব দ্বিতীয়বার চমকালেন।
ঋজুদা বলল, পুলিশ সাহেবকে–আপনি ত’ চেনেনই রাজা বিষেণদেও সিংকে। আর আমিই হচ্ছি ঋজু বোস। আর এই আমার এ্যাসিস্ট্যান্ট, রুদ্র।
