অ্যালবিনো (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ
পাঁচ
খাওয়া-দাওয়ার পর ঋজুদা আমার ঘরে এল।
আমি বললাম, ঐ কথাটার মানে কি ঋজুদা?
কোন্ কথাটা?
ঐ যে, উও জমানা চলা গ্যয়ে, যব খলীল খাঁ ফাক্তা উড়হাতে থে!
ঋজুদা হেসে উঠল।
বলল, বুঝলি না। এর মানে হচ্ছে, খলীল খাঁয়েরা যখন পায়রা ওড়াতেন তখনকার দিন আজ আর নেই।
খলীল খাঁ কে?
আরে মুশকিল! এ ত’ একটা চতি কথা। বিহারে এরা বলে, কাহাবৎ।
আমরা যেমন বলি : লাগে টাকা, দেবে গৌরী সেন। খলীল খাঁও ঐ রকমই, গৌরী সেনের মত। আসলে আগেকার দিনে ত’ অনেকেরই বড়লোকী ছিল ফালানা-ঢামকানা, নাচনা-গানা, বহতই খেল-তামাশা। সেই কথাই বলছিলেন বিষেণদেওবাবু।
তারপর বিষেণদেওবাবুর দেওয়া বড় এলাচ চিবোতে চিবোতে ঋজুদা বলল, তুই যে গ্রীনার বন্দুকটা বাছলি, মাচায় বসে অত লম্বা ব্যারেল ঘোরাতে ফেরাতে অসুবিধা হবে না তোর?
বললাম, তোমার অ্যালবিনো একবার চেহারাখানা দেখাকই না। তারপর তোমার নাম করে ঠুকে দেব নৈবেদ্য। ঠিক পটকে দেবো। দেখো।
ঋজুদা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল গম্ভীর হয়ে। বলল, বাঘ বাঘই। একমাত্র বোকারাই বাঘ নিয়ে ছেলেখেলা করে। তারপর জানালা দিয়ে বাড়ির পিছনের নাচঘরের দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে পাইপটা ধরিয়ে নিয়ে।
কী যেন ভাবছিল ঋজুদা। কোথায় যেন চলে গেছিল। অনেক দূরে। আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনেকক্ষণ পর, ঘরের মধ্যে ফিরে এসে ঘোর কাটিয়ে বলল, রুদ্র, তুই এবারে কি কি জিনিস এনেছিস তোর সঙ্গে?
আমি অবাক হলাম। বললাম, এই জামা-কাপড় টুকিটাকি!
না! কি কি জিনিস এনেছিস সব আমাকে বল এক এক করে। দরকার আছে।
আমি আরও অবাক হলাম।
ভেবে ভেবে বলতে লামলাম, জিনের ট্রাউজার দুটো, জাঙ্গিয়া, মো……।
জামা-কাপড় জুতোটুতো ছাড়া কি এনেছিস?
পায়জামার দড়িতে গিঁট পড়ে গেছিল, তাড়াতাড়িতে খুলছিল না, আসবার সময় তাই মাকে না বলেই মায়ের কাঁচিটা নিয়ে চলে এসেছি। সেলাই কলের ড্রয়ারে থাকে। ফিরে গেলে হবে আমার উপর এক চোট।
গুড। ঋজুদা বলল। ভেরী গুড।
আমার উপরে মা যদি এক চোট নেন তাতে ঋজুদার গুড ভেরী গুড বলার কি আছে বুঝতে পারলাম না।
ঋজুদা আবার ক্রমশ দুর্বোধ্য হতে শুরু করেছে। এর পর একেবারে চাইনীজ ডিকশনারী হয়ে যাবে বুঝতেই পারছি।
বলল, কি হল? থামলি কেন? বলে যা আর কি কি এনেছিস!
আর, আর, আর…আমি ভাবতে লাগলাম…তারপর হঠাৎ মনে হতেই বললাম, আমার ক্যামেরাটা। বড় মামা, পরীক্ষা ভাল করে পাশ করাতে প্রেজেন্ট করেছিল-মোটে এক রীল ছবি তুলেছিলাম কোলকাতায়। তাইই নিয়ে এসেছি হাত পাকাবার জন্যে এখানে।
ফাইন। ঋজুদা বলল। ফিল্ম ভরে এনেছিস ত’?
হ্যাঁ! ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট ভরা আছে। কালার্ড ফিল্মও এনেছি।
কত স্পীডের?
টু হান্ড্রেড এ এস এ।
ফাইন। কালার্ড ফিল্মটা কাজে লাগবে বাঘের ছবি তুলতে। বন্দুক নিয়ে তুই বাঘের সামনে দাঁড়াস নীল জিন্স আর লাল গেঞ্জী পরে–আমি তোর ছবি তুলে দেব।
চোখের সামনে যেন কল্পনায় দেখতে পেলাম, বিরাট সাদা বাঘটা পড়ে আছে আমার পায়ের সামনে। আর আমি বন্দুক হাতে মৃদু মৃদু হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবনা, ভাবনাই। ভাবনা ত’ আর দেখানো যায় না।
পরক্ষণেই ঋজুদা বলল, আর কি এনেছিস মনে করে বল? টর্চ, ছুরি, ভোজালি?…
আমি বললাম, নাঃ। তারপরেই মনে হল টেপ রেকর্ডারের কথাটা। বণি এম, আব্বা-গ্রুপ, বী-জীস এবং দ্যা পোলিস-এর ক্যাসেট আর পাঁচমিশেলী বাংলা গানের দুটি ক্যাসেট নিয়ে এসেছিলাম। দিশী টেপরেকর্ডার কিন্তু।
দিশী জিনিস কি খারাপ? ফোরেন জিনিসের প্রতি আমার দুর্বলতা নেই কোনো। দু-একটা জিনিস ছাড়া, যেমন বন্দুক ইত্যাদি, পাইপের টোব্যাকো…
ঋজুদা যেন বিশেষ উৎফুল্ল হল। বলল, ফারস্ট ক্লাস।
শুনবে নাকি গান? আমি বললাম।
ঋজুদা বলল, একদম না। তোর এ সব বিজাতীয় চিৎকার?
আর শোন, বলেই গলা নামিয়ে বলল, বিষেণদেওবাবু গোলমাল পছন্দ করেন না। এখানে টেপ বাজাস না একবারও। বরং কালকে বীটিং-এর পুরো আওয়াজটা টেপ করে নিবি। দারুণ হবে। বীটারদের চিৎকার, স্টপারদের আওয়াজ, তারপর বীটিং-এ তাড়া-খাওয়া পাখি আর জানোয়ারদের চলাচলের এবং গলার আওয়াজ। তোর বন্ধুরা দারুণ ইমপ্রেসড হয়ে যাবে। কত্বদিন থেকে শখ আমাদের দেশের জঙ্গলকে সেন্ট্রাল-সেম করে একটা ভালো ছবি করব। কিন্তু কে দেবে টাকা?
বলেই বলল, মাঝে, মেট্রোতে, নুন-শোতে কস্তুরী বলে একটা ছবি এসেছিল। দেখেছিলি?
বড়দের বই? আমি বললাম।
ঋজুদা রেগে গিয়ে বলল, তুই এখন যথেষ্টই বড় হয়েছিস। আর ন্যাকামি করিস না। তোর মা যদি এখনও তোকে ছোট্ট ছেলেটি ভাবে ত’ আমি এবার গিয়ে কথা বলব সীরিয়াসলী। তুই এই ছবিটা দেখবি কখনও সুযোগ পেলে।
কোন্ ছবিটা? নামই ত’ বললে না।
ওঃ। কস্তুরী। বিমল দত্তর ছবি। তাঁরই লেখা স্ক্রিপ্ট, তাঁরই ডিরেকশান। অসাধারণ ছবি। মধ্যপ্রদেশের বস্তারের পটভূমিতে একটি কাল্পনিক পাখিকে নিয়ে গল্প। এরকম লেখা আগে যে কেন কেউ লিখতে পারেননি; ভাবি তাই।
ছবিটি বোধহয় ঋজুদাকে ভীষণই নাড়া দিয়েছে। ছবিটির কথা মনে পড়ায় অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকল ঋজুদা।
তারপর হঠাৎ বলল, তোর কাঁচিটায় কেমন ধার?
কেন? নখ কাটবে? ও যে বিরাট কাঁচি। বললাম না, মার সেলাই-কলের ড্রয়ারে থাকে।
নখ কেন? কারো নাকও ত’ কাটতে পারি। তোর নাকও কাটা যায়। কাঁচিটা বের কর ত’ দেখি।
কাঁচিটা বের করে বললাম, দাঁড়াও। আগে যে জন্যে এটাকে আনা সেই কাজটা সেরে ফেলি–পায়জামার দড়িটা……
হঠাৎ দরজার কাছে কার যেন গলার শব্দ শোনা গেল।
ঋজুদা তাড়াতাড়ি কাঁচিটা বালিশের তলায় লুকিয়ে ফেলল।
আমি অবাক হলাম ঋজুদাকে লক্ষ করে।
দরজার পাশ থেকে গলা খাঁকারি দিল কোনো লোক। জানান দিল যে, সে এসেছে।
ঋজুদা বলল, কওন?
ব্রিজনন্দন হুজৌর।
ব্রিজনন্দন? আমার ভুরু কুঁচকে উঠল।
ঋজুদা কোমরে বাঁধা পিস্তলের হোলস্টারের বোতামটা পাঞ্জাবীর তলায় হাত চালিয়ে খুলে দিল। তারপর হাত সরিয়ে এনে আমার বিছানাতে যেমন বসে ছিল, তেমনই বসে বুকের কাছে একটা তাকিয়া টেনে নিয়ে বলল, আইয়ে, পাধারিয়ে। অন্দর আইয়ে।
ব্রিজনন্দন ভিতরে এল। বাইরে তার নাগরা খুলে রেখে।
ঋজুদা বলল, কা সমাচার? কুছ বোলনা চাহতা হ্যায় আপ।
জী হাঁ। খ্যয়ের…বলে একবার কাশল।
এমন সময় নীচের হলঘর থেকে ভানুপ্রতাপের চিৎকার ভেসে এল। ব্রিজনন্দন–ব্রি-জ-ন-ন্দ-ন কা আভভি বোলাও। গায়া কাঁহা উল্লু?
ব্রিজনন্দন তাড়াতাড়ি দৌড়ে বেরিয়ে নাগরা পায়ে গলিয়ে নীচে নেমে গেল। যাওয়ার আগে বলে গেল, ম্যায় ফির আউঙ্গা।
ঋজুদা চলে-যাওয়া ব্রিজনন্দনের দিকে চেয়ে থেকে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ।
তারপর নিজের মনেই বলল, পইলে দর্শনধারী, পিছলে গুণবিচারী।
মানে? আমি শুধোলাম।
মানে, প্রথমে মানুষের চেহারাটা অন্য মানুষের চোখে পড়ে। গুণাগুণের বিচার আসে অনেক পরে।
হঠাৎ। এ-কথা?
এমনিই, মনে হল!
তারপর বলল, ভানুপ্রতাপ ছেলেটাকে ওর মামা একেবারে বকিয়ে দিয়েছে। কি অসভ্যর মত ওর তিন গুণ-বয়সী লোকটাকে উল্লু-ভাল্লু করে ডাকছে শুনলি? চেঞ্জে এসে যে উল্লু-ভাল্লু-অ্যালবিনোর রাজত্বে পড়ব তা কি করে জানব আগে?
আমি বললাম, ঋজুদা, কাঁচিটা!
ওঃ। বলেই কাঁচিটা বের করে আমার বাঁ-পা-টা গোড়ালীর কাছে ধরে সাধের জিনের ট্রাউজারটার গোড়ালীর কাছ থেকে খচ্ খচ্ করে ইঞ্চি দুয়েক কেটে দিল।
আমি, এ কি! এ কি! করে উঠতেই ঋজুদা বলল, এইটেই স্টাইল। আজকাল আস্ত জিনস্ কেউ পরে না।
আমার চোখে প্রায় জল এসে গেল।
বললাম, নয়না মাসী দিয়েছিল আমাকে।
তবে ত’ নিঃসন্দেহে বস্তাপচা থার্ডরেট জিনিস দিয়েছে। নয়নামাসী ত’ বড়লোক। বলিস আরেকটা কিনে দেবে।
তারপরই বলল, কাঁচিটা দিয়ে তোর মা কি কাটে রে? ত্রিপল-টিপল কাটে নাকি? এত মোটা জিন্ ক্যাঁচ্ ক্যাঁচ্ করে কেটে গেল। তাঁবু সেলাই করছেন নাকি তোর মা আজকাল সেলাই-কলে?
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছিল। আমি চুপ করেই রইলাম। ঋজুদা বলল, তোর পায়জামা ইমিডিয়েটলী মেরামত করে নিয়ে কাঁচিটা দিয়ে দে। ওটাকে আমি কনফিসকেট করলাম। এরকম কাঁচি সঙ্গে নিয়ে যারা ঘোরে তারা আনডাউটেডলী গাঁট-কাটা।
আমি পায়জামার গিঁট কেটে কাঁচিটাকে ফেরত দিলাম ঋজুদাকে। সঙ্গে সঙ্গে হালকা-সবুজ খদ্দরের পাঞ্জাবীর বিরাট পকেটে সেটাকে ঢুকিয়ে দিল। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েই বলল, রুদ্র, ঠিক চারটেতে তৈরী হয়ে থাকবি। আমরা একটু বেরুব।
কোথায়?
গাড়িতে জল-মবিল, ব্যাটারীর জল সব চেক করে রেখেছিস? স্টার্ট করেছিলি সকালে?
হ্যাঁ, আমি বললাম।
বলেই, বললাম, কোথায়?
যাব কোথাও একটা। ক্যামেরাটা সঙ্গে নিবি।
বলে, আমাকে পুরো সাসপেন্সে রেখে ধীরে সুস্থে চটি ফটর ফটর পাইপ ভুসভুস আর পায়জামা পাঞ্জাবীতে খসখস্ শব্দ তুলে ঋজুদা আমার ঘর ছেড়ে চলে গেল।
আমি কোলবালিশের উপর মাথা রেখে শুলাম, একটু ঘুমোব না প্রতিজ্ঞা করে।
একটু পরেই আমার অজানিতে চোখ বন্ধ হয়ে এলো। চোখের সামনের অন্ধকারের মধ্যে একবার করে একটা মস্ত সাদা দাড়ি গোঁফওয়ালা খাসী এসে দাঁড়িয়ে শিং নাড়তে লাগল আর তার বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে তৈরী মুখরোচক খাবারগুলোর নাম মনে করাতে লাগল। কৌরি, চাঁব, পায়া, কবুরা, কলিজা, সিনা এবং মগজ। পরশুরামের লম্বকর্ণর সাদা সংস্করণ আমার চোখের সামনে এত জোরে মাথা ঝাঁকাতে লাগল যে মনে হল তার শিং দুটো আমার মগজ ফুটো করে দেবে।
ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিলাম, তারপর খাসীটা বলছে যে আমার মগজ খায়, সে আমার মগজ পায়। যে আমার মগজ খায়, সে আমার মগজ পায়। ঘুমের মধ্যেই প্রবল আপত্তি করতে লাগলাম তার খাসী-সুলভ এই কথায়, এমন সময় আমার কানে টান পড়ল। কানটাও কি লম্বকর্ণর হয়ে গেল।
তাকিয়ে দেখি, ঋজুদা!
বলল, ইডিয়ট। ক’টা বেজেছে?
লাফিয়ে উঠে দেখি চারটে বেজেছে ঠিক ঘড়িতে।
ঋজুদা বলল, গাড়ির চাবি।
সমস্ত মালোয়াঁমহলে ঘুম নেমেছে। রাজারাজড়ার ব্যাপার। দিবানিদ্রা ছেয়ে ফেলেছে পুরো বাড়িটা। এমনকি বিরাট বসবার ঘরের দেওয়ালে কোনায়-কোনায় যে অসংখ্য বাঘ ভাল্লুক শম্বর নীলগাই বাইসন স্টাক করা রয়েছে তারাও মনে হলো ঘুমোচ্ছে।
আমি স্টিয়ারিং-এ বসলাম। ঋজুদা বলল, গীমারীয়ার রাস্তা।
গাড়িটা যখন গেট পেরিয়ে বাইরে এল তখন প্রকাণ্ড ফটকের সামনে দাঁড়ানো দুজন বন্দুকধারী দারোয়ান ছাড়া আর কেউই জানলো না যে, আমরা বেরিয়ে এলাম।
দুপুরেও এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। গীমারীয়ার রাস্তাতে মাইল তিনেক যেতেই ঋজুদা বলল, সামনে এক ফার্লং গিয়েই বাঁদিকে একটা ফরেস্ট রোড পাবি। তাতে ঢুকে যাবি। মাইল খানেক গিয়ে একটা পাহাড়ী নদী পাবি। তার উপর কজওয়ে আছে একটা। কজওয়ের পাশে গাড়ি থামিয়ে কাচ তুলে গাড়ি লক করে দিবি।
দেখতে দেখতে জায়গাটাতে পৌঁছে গেলাম। হাবভাব দেখে মনে হল এই জঙ্গল ঋজুদার নখদর্পণে। গাড়ি থেকে নেমে, পায়জামা পাঞ্জাবী পরে হাওয়াই চটি পরে ফটর ফটর খসর খসর করতে করতে ঋজুদা নদীর বুক ধরে জঙ্গলের ভিতরের দিকে এগোতে লাগল। নদীর বালিতে চোখ রেখে।
আমি বললাম, কি ব্যাপার?
ঋজুদা বলল, এদিকে আর নদী নেই। এই নদীতে বাঘের পায়ের দাগ নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। কারণ এ নদী না পেরিয়ে বাঘের উপায় নেই। আর এই নদী-বরাবরই মাচা বাঁধা হয়েছে কালকের শিকারের। মাচাগুলো দেখা যাবে।
আমি বললাম, ঋজুদা। খালি হাতে! প্রত্যেকদিন সন্ধের সময় বাঘটা ডাকাডাকি করে।
ঋজুদা বলল, সঙ্গে থ্রি-সেভেনটিন পিস্তল আছে। এত ডাকাডাকি করার পরও যদি সাড়া না দিস তাহলে কোলকাতার লোকদের অভদ্র ভাববে না?
তারপর একটু গিয়ে বলল, তোর বুঝি ভয় করছে নিরস্ত্র বলে? তাহলে এটা রাখ।
বলেই, পকেট থেকে কাঁচিটা বের করে আমাকে দিল।
আমি বললাম, ভাল হচ্ছে না কিন্তু। সবসময় এরকম ভালো লাগে না। অতবড় বাঘ।
ঋজুদা বলল, বাঘ বড় হলেই যে ভয়টাও তার সাইজের হতে হবে এমন ত’ জানা ছিল না। ভাল চেলাই জুটেছে আমার।
আমি চুপ করে রইলাম।
বালির উপরে চোখ রেখে একটু গিয়েই ঋজুদা থেমে গেল। বলল, দ্যাখ শম্বর। অনেকগুলো শম্বরের খুরের দাগ দেখলাম বালিতে। বাঁ দিকের জঙ্গল থেকে হনুমান ডাকছিল হুপহাপ করে। ডানদিকের জঙ্গল থেকে ময়ূর। আর একটু এগোতেই ডানদিক থেকে একটা বার্কি-ডিয়ার ব্বাক্ ব্বাক্ করে ডেকে উঠে সমস্ত জঙ্গলকে চমকে দিল।
আমি ঋজুদার পাঞ্জাবীর কোনা ধরে টেনে বললাম, নিশ্চয়ই বাঘ দেখেছে।
ঋজুদা পাঞ্জাবীটা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, পাঞ্জাবী নিয়ে ফাজলামি করিস না। মোটে দুটো পাঞ্জাবী এনেছি।
আরো একটু গিয়ে একটা বুড়ো হায়নার থাবার দাগ দেখা গেল। তারপর মাচাগুলো চোখে পড়ল একের পর এক। একটা থেকে আরেকটা দেখা যায় না। নদীটা বাঁক নিয়ে এখানে অর্ধচন্দ্রাকারে বয়ে গেছে। শাল, পিয়াশাল, অর্জুন, গামহার, ক্ষয়ের, শিশু এসব জঙ্গলই বেশী। শিমুল আর হরজাই গাছও আছে কিছু। সবচেয়ে বেশী শাল। আর সেগুন একেবারে নেই বললেই চলে।
প্রথম মাচাটার কাছে এসেই ঋজুদা থমকে দাঁড়াল। বলল, এ্যাই দ্যাখ।
বালিতে তাকিয়ে দেখলাম, উরে ব্বাবাঃ! বিরাট বড় একটা বাঘের পায়ের থাবার দাগ! নদীটার এপাশ থেকে ওপাশে গেছে। আবার ওপার থেকে এপাশে গেছে।
ঋজুদা হাঁটু গেড়ে বসে ভাল করে দাগগুলো দেখতে লাগল মাথা নীচু করে। আমি কাঁচি হাতে দাঁড়িয়ে, বাঘ এলে, কাঁচি দিয়ে বাঘের গোঁফ কাটব না লেজ কাটব তাই ভাবতে লাগলাম। প্রত্যেকটা মাচার সামনেই বাঘ নদী পারাপার করেছে। দুপুরের বৃষ্টিতে দাগগুলো ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে। ভেঙে গেছে, বালি সরে যাওয়াতে। ঋজুদা বলল, কতগুলো ছবি তুলে নে এই দাগের। বিভিন্ন দাগের।
শেষ মাচা অবধি গিয়ে আবার আমরা ফিরলাম।
শেষ মাচার সামনে এসে ঋজুদা আবারও নীচু হয়ে বসল।
আমাকে বলল, কি দেখছিস? দেখতে পাচ্ছিস কিছু?
আমার আর দেখার ইচ্ছা ছিলো না। পায়ে হেঁটে খালি-হাতে এত বড় বাঘের শ্রীচরণের ছাপ দেখার ইচ্ছেও নেই আমার।
আসলে যারা বনে-জঙ্গলে রাইফেল বন্দুক নিয়ে ঘুরে অভ্যস্ত, তারা খালি হাতে বড়ই অসহায় বোধ করেন। কতখানি অসহায় যে বোধ করেন, তা যাঁরা জানেন, তাঁরাই জানেন।
ঋজুদাকে বললাম, দেখার কি আছে? বাঘ।
ঋজুদা উঠে দাঁড়িয়ে পাইপটা ধরালো। বলল, বাঘ ত’ ঠিকই আছে। বাঘ ত’ বটেই। কিন্তু আর কিছু?
আমি ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম, বাঘের পায়ের দাগের আশেপাশে মানুষের জুতোর ছাপ। কোনো শিকারী বা ফরেস্টগার্ডের হবে।
বললাম, দেখলাম।
জুতোটা, কি জুতো বলতে পারিস?
বোধহয় বাটা কোম্পানীর এ্যাম্বাসাডর।
ইডিয়ট। তাছাড়া এ্যাম্বাসাডর জুতো পরে কেউ জঙ্গলে আসে না। আসা উচিত নয় অন্তত।
–কি তবে?
–এ জুতো ডাক ব্যাক-কোম্পানী তৈরী করে। জলে-কাদায় হাঁটবার জন্যে। ছবি তোল।
জুতোর দাগের? বোকা বনে শুধোলাম আমি।
তাই-ই ত’ বলছি। ঋজুদা বলল।
তারপর বলল, শোন, আরও একটা কাজ করবি। বীটিং শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুই তোর টেপ-রেকর্ডারটা চালিয়ে দিবি। একদিক শেষ হলে, রিওয়াইন্ড করে দিবি।
আমি বললাম, বাঃ, আমার সাধের গানগুলো।
ডেপোমি করিস না। ওগুলো ইরেজড হয়ে গেলে যাবে। কোলকাতায় গিয়ে আবার টেপ করে নিস। যা বললাম, তা করতে ভুল না হয় যেন।
গাড়িতে ফিরে এসে গাড়ি খুলে গাড়ি ঘুরিয়ে নিলাম আমরা। বেশ কিছুদূর আসার পর ঋজুদা গাড়িটা রাখতে বলল, তারপর আমাকেও নামতে বলে, জুতো খুলতে বলে নিজেও চটি খুললো। দুটো শালের চারা উপড়ে নিয়ে আমাকে একটা দিয়ে নিজেও একটা নিল। তারপর নিজের হাতের শালের চারাটাকে ঝাঁটার মত করে ব্যবহার করে গাড়ির চাকার দাগ মুছতে মুছতে নদীর দিকে যেতে লাগল। আমি একদিকের চাকার দাগ মুছছিলাম আর ঋজুদা অন্যদিকের। অতখানি রাস্তা ঝাঁট দিতে দিতে কোমর ধরে গেল। এদিকে অন্ধকার হয়ে আসছিল। গাছের ছায়ারা দীর্ঘতর হচ্ছিল। বনের গভীর থেকে তিতির আর ছাতারের দল একই সঙ্গে চেঁচিয়ে মাথা গরম করে দিচ্ছিল আমাদের।
নদী অবধি গাড়ির চাকার দাগ মুছে ফেলে রাস্তা ছেড়ে রাস্তার পাশে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কেটে-রাখা অগভীর নালা ধরে আমরা ফিরে এলাম ঋজুদার কথামত।
এই নালার মধ্যে প্রথম গরমে দু পাশের পাতা পোড়ায় ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেরা। আর বর্ষায় জল নিকাশ হয় এই নালা দিয়ে।
গাড়ির কাছে যখন পৌঁছে গেছি, ঋজুদা তখন বলল, গাড়িটাকে এখানে একবার ঘোরা।
কেন?
যা বলছি কর না। ধমক দিল ঋজুদা বিরক্তির সঙ্গে। তুই বড় বেশী বুঝছিস আজকাল।
গাড়িটাকে আবারও উল্টোদিকে ঘুরিয়ে পরে আবার যেদিকে মুখ ছিল সেদিকে করলাম। এবার ঋজুদা বলল, সাবধানে চাকার দাগ এমন করে মুছে দে শালের চারা দিয়ে, যাতে মনে হয় যে, আমরা শুধু এই পর্যন্তই এসে বসে, তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে চলে গেছি।
যেমন বলল ঋজুদা, তেমনই করলাম।
হঠাৎ ঋজুদা বলল, তোর কাছে ফেলে দিয়ে যাবার মত কিছু আছে?
মানে?
এই রুমাল-টুমাল। চকোলেট আনিসনি সঙ্গে।
এই গোলমেলে কথাবার্তায় আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। সবেধন মাত্র রুমালটি বের করলাম। ঋজুদা ছুঁড়ে ফেলে দিল সেন্ট-মাখানো রুমালটাকে রাস্তার পাশের মস্ত একটা শিমুল গাছের গোড়াতে। তারপর আমাকে বলল, চল, ওখানে গিয়ে বসি। ঐ গাছের গোড়ায়। আচ্ছা কি চমৎকার শিমুলটা দেখেছিস। কিরকম ঋজু, সটান চেহারা। আমার ঠাকুর্দা নাকি আমাদের দেশের বাড়ির বাগানের একটা শিমুলগাছের দিকে চেয়েই আমার নাম দিয়েছিলেন ঋজু।
আমি বললাম, শুধু শিমুলই ঋজু হতে যাবে কোন্ দুঃখে, ডবা বাঁশও ঋজু। ন্যাড়া তালগাছও ঋজু।
ঋজুদা চুপ করে রইল। হয়ত বুঝল, আমাকে ঘাঁটানো ঠিক হবে না আর।
গাছের গোড়ায় বসে বার দুয়েক ঋজুদা তার পাইপের পোড়া টোব্যাকো খুঁচিয়ে ফেলল, ঐ দারুণ গাছেরই গোড়াতে। তারপর কি মনে করে নিজের পুরনো হয়ে-যাওয়া হাওয়াই চপ্পলের স্ট্রাপটাকে নিজেই ছেঁড়ার চেষ্টা করতে লাগল।
আমি পকেট থেকে তাড়াতাড়ি কাঁচিটা বের করলাম, ঋজুদার কষ্ট হচ্ছে দেখে।
ঋজুদা বলল, থিংক রুরুদদরবাবু। থিংক আ হোয়াইল। বজরঙ্গবলী মাথা একটা সকলকেই দেন, কিন্তু সেই মাথাটা কাজে লাগায় খুবই কম লোক। ভাবতে চেষ্টা কর–কার্য হলেই কারণ থাকে, একটা কিংবা অনেকগুলো।
তখন আমার মনে হল, তাই ত’! কাঁচি দিয়ে কাটলে যে কেউ একটু নজর করে দেখলেই বুঝবে যে, কাঁচি দিয়ে ইচ্ছে করে এটাকে কাটা হয়েছে। হঠাৎ ছিঁড়ে যায়নি।
টানাটানি করতে করতে চটিটা সত্যিই ছিঁড়ে গেল। ঋজুদা তখন দু পাটি চটিই ঐ গাছতলাতে ফেলে রেখে খালিপায়ে এসে গাড়িতে উঠল। আমি জুতো পরে নিলাম। তারপর গাড়ি স্টার্ট করে ফেরার পথ ধরলাম।
ঋজুদা বলল, আরেকটা কথা রুদ্র। এই ফিল্মটা এক্ষুনি খুলে নিজের পকেটে রাখবি। সবগুলো এক্সপোজার দেওয়া না হলেও। আর কাল বীটিং শেষ হওয়া মাত্রই যে ক্যাসেটটাতে বীটিং-এর আওয়াজ রেকর্ড করাবি সেটাও খুলে পকেটে ভরে, অন্য কোনো ক্যাসেট–যাতে গান আছে, তা ভরে রাখবি তোর রেকর্ডারে।
কেন।
আবার কেন?
বললাম, আচ্ছা!
ঋজুদা বলল, তাড়াতাড়ি চল্। চা না খেয়ে মাথা ধরে গেছে।
মালোয়াঁমহলে পৌঁছতেই রীতিমত জেরার সামনে পড়তে হল আমাদের দুজনকে। খালি পায়ে ঋজুদাকে নামতে দেখেই বিষেণদেওবাবু আর ভানুপ্রতাপ হৈ-হৈ করে উঠল।
ঋজুদা বলল, আর বলবেন না, আপনার রুরুদদরবাবুকে নিয়ে পাগল হয়ে গেলাম। ও আবার কবিতা লেখে। নির্জনে জঙ্গলের প্রাণের শব্দ শুনবে বলে একটা ফরেস্ট রোডে ঢুকে গাড়ি নিয়ে এতক্ষণ বসে ছিলাম। কবিত্ব শেষ হলে বলল, কার বডি বেশী ফিট দেখা যাক। বলেই, লাফিয়ে শিমুলের ডাল ধরার কমপিটিশান লাগাল আমার সঙ্গে। ও আর আমি! ঐ করতে গিয়েই এই অবস্থা! হাওয়াই-চপ্পলের এত ধকল কি সয়? খামোকা কোমরে এমন টানও লাগল যে, কাল ভোরে উঠতে পারলে হয় বিছানা ছেড়ে।
বিষেণদেওবাবু বললেন, নিমের তেল দিয়ে আপনাকে একেবারে এমন মালিশ করাব আমার নাপিত মহাবীরকে দিয়ে যে, কাল সকালে দেখবেন ওয়েলার ঘোড়ার মত দৌড়চ্ছেন আপনি।
ঋজুদা হাসল। বলল, তার আগে শীগগিরী চা। আর চটি।
বিষেণদেওবাবু একজন বেয়ারাকে দিয়ে ঋজুদাকে তাঁর কামরায় পাঠালেন চটি পছন্দ করে নিয়ে আসতে।
কিছুক্ষণ পর ঋজুদা খুব খুশী খুশী মুখে ফিরে এল একজোড়া কোলাপুরী চটি পায়ে গলিয়ে। কিন্তু গোড়ালীটা মাটিতেই রইল। বিষেণদেওবাবুর পা ঋজুদার চেয়ে ছোট।
বিষেণদেওবাবু তাকিয়ে রইলেন লজ্জিত হয়ে।
ঋজুদা বলল, চটি জোড়া আপনার দারুণ। শুধু একটু ছোট হয়েছে।
বলেই বলল, আপনার পায়ের সাইজ কত?
সাত। বিষেণদেওবাবু বললেন।
আর তোমার ভানু? ভানুপ্রতাপের দিকে চেয়ে বলল ঋজুদা।
আমারও সাত।
ঋজুদা বলল, আমার আট।
বিষেণদেওবাবু বললেন, এক সাইজ হয়েই ত’ মুশকিল হয়েছে। কোনো জুতোই কি আর আমার নিজের আছে? যে জুতো কিনি, তাই-ই নিয়ে নেয় ভানু। মহা বিপদেই পড়েছি!
ভানুপ্রতাপ দুষ্টুমির হাসি হাসল।
ঋজুদা বলল, কথায় বলে, মামা-ভাগ্নে যেখানে, আপদ নেই সেখানে।
এটা যা বলেছেন। লাখ কথার এক কথা। মামা-ভাগ্নে দুজনেই সমস্বরে বলে উঠল।
এরপর চা এল। সঙ্গে বোঁদে আর মাঠরী। গোরখপুরী চা। নানারকম মশলা-টশলা দিয়ে।
ঋজুদা বলল, ফারস্ট ক্লাস চা! তারপর তিন-চার কাপ চা খেল ঋজুদা এবং আমাকে অবাক করে প্রায় দুশো গ্রাম মত মাঠরীও মেরে দিল।
আমি বললাম, অত খেও না ঋজুদা, পেট আপসেট করবে।
বিষেণদেওবাবু বললেন, কিচ্ছু হবে না, একেবারে বাড়িতে তৈরি খাঁটি ঘি দিয়ে বানানো।
আমি বললাম, সেইখানেই ত’ বিপদ। খাঁটি জিনিস খাওয়া আমাদের যে অভ্যেসই নেই।
বিষেণদেওবাবু আর ভানুতাপ হেসে উঠলেন।
ঋজুদা আমার দিকে একঝলক এ্যাপ্রিসিয়েশানের হাসি হেসে, আমার যে বুদ্ধি শনৈঃ শনৈঃ খুলছে এমন একটা নীরব ইঙ্গিতও করে বলল, আরে, হলে হবে। এমন ভাল মাঠরী সেই কবে খেয়েছিলাম ছোটবেলায়, গিরিডিতে!
চা-টা খাওয়া হলে ঘর ভর্তি ট্রোফিগুলোর দিকে তাকিয়ে ঋজুদা বলল, আপনাদের পরিবারের এই এক একটা ট্রোফি ত’ এক-এক ইতিহাস। কি বলেন বিষেণদেওবাবু?
তা ত’ বটেই। কী সব দিনই ছিল। বিহারের গভর্নর শিকারে আসতেন আমার বাবার আমলে এই জঙ্গলে। আমাদের এই গরীবখানাতে ডিনার দেওয়া হত তাঁর অনারে। কত জায়গার রাজা-রাজড়ারা আসতেন।
বসবার ঘরের দেওয়ালে, মেঝেতে, ঘরের বিভিন্ন কোনাতে বিভিন্ন সাইজের বিভিন্ন ভঙ্গিমাতে স্টাফ করা বাঘ ও অন্যান্য জন্তু-জানোয়ারের চামড়া, শিং, মাথা, পা ইত্যাদি ছিল। পশ্চিমের দেওয়ালের গা-থেকে ঝোলানো একটা প্রকাণ্ড বড় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মাথা শুদ্ধু চামড়া দেখিয়ে ঋজুদা বলল, এই বাঘটা কোথায় মেরেছিলেন, এত বড় বাঘ বড় একটা দেখা যায় না।
বিষেণদেওবাবুর চোখে স্মৃতি ঝলসে উঠল। বললেন, এই বাঘ মেরেছিলাম পালামৌর রাংকার জঙ্গলে। সবে গরম পড়েছে। দুপুরবেলা বীটিং হচ্ছে। মাটিতে বসে আছি একটা ফোউদা ঝোপের পাশে, মুরগী মারব বলে। আমার হাতে শট গান। তাতে ডানদিকের ব্যারেলে এল-জি আর বাঁদিকের ব্যারেলে চার নম্বর ভরা আছে। বলা নেই, কওয়া নেই, এক ঝাঁক মুরগী তাড়িয়ে নিয়ে, প্রায় বীটিং শেষ হওয়ার সময়ে তিনি বেরোলেন। সে এক অভিজ্ঞতা। এখনও মনে হলে হাতের পাতা ঘেমে ওঠে উত্তেজনায়।
কত বড় ছিল বাঘটা? মানে, মাপের কথা বলছি। ঋজুদা শুধোল।
দশ ফিট ছ ইঞ্চি। ওভার দ্যা কাৰ্ভস্। বিষেণদেওবাবু বললেন।
তারপর বললেন, ঠিক এই মাপেরই একটি ট্রোফি আছে এ তল্লাটে হাজারীবাগে। তখন হাজারীবাগের এস পি ছিলেন সত্যচরণ চ্যাটার্জি সাহেব। ভারী ভাল লোক। তাঁরই ছেলে মেরেছিল বাঘটাকে সিতাগড়া পাহাড়ের নীচে, টুটিলাওয়ার জমিদার ইজাহারুল্ হক-এর সাহায্যে। এখনও চামড়াটা আছে চ্যাটার্জি সাহেবের ক্যানারী হিল রোডের বাড়ির বসবার ঘরে।
ঋজুদা হঠাৎ ঐ চামড়াটার দিকে এগিয়ে গেল। পাইপের ধুঁয়ো ছেড়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল, একটু ভাল করে দেখি। এতবড় বাঘ আমিও ত’ কখনও মারিওনি, দেখিওনি।
ভানুপ্রতাপ এবং বিষেণদেওবাবু দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলেন, হাত দেবেন না, ভীষণ ধুলো ত’ ধুলো লেগে যাবে। পোকাও হয়েছে।
বিষেণদেওবাবু বললেন, তাছাড়া চুহার উপদ্রবে এখানে ট্রোফি রাখাই মুশকিল। বাঘের কান খেয়ে দিচ্ছে, ভালুকের থাবা, চিংকারা হরিণের নাক, মহা মুশকিলেই পড়েছি। ইয়াব্বড়-বড়। দেখলে ভয়ই করে।
ঋজুদা ফিরে এল বাঘের চামড়াটার কাছ থেকে। ফিরে এসে, আমাকে বলল, যা-যা, দেখে আয় রুদ্র কাছ থেকে। দেখার মত জিনিস বটে।
আমিও দেখে ফিরে আসার পর ঋজুদা জিজ্ঞেস করল, এত ভাল ট্যানিং এবং স্টাফিং ত’ আজেবাজে কোম্পানীর দ্বারা হবে না। আমি ত’ এইজন্যেই, শিকার যখন করতাম, তখন আমার সব ট্রোফি পাঠাতাম ম্যাড্রাস এর ভ্যান-ই্নজেন এন্ড ভ্যান-ইনজেনে।
ভানুপ্রতাপ দুটো বড়ি গিললেন জল দিয়ে। আমরা সকলেই ওঁর দিকে তাকালাম। উনি নির্বিকার। বিষেণদেওবাবু ওঁর দিকে তাকিয়ে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
বললেন, কি যে করছিস তুই! আত্মহত্যা সবচেয়ে বড় পাপ! তোর জন্যেই মরতে হবে আমার। আর কোনোই উপায় নেই দেখছি।
ভানুপ্রতাপ বললেন, আমি ত’ মরতেই চাই। আমার বাঁচতে ভালো লাগে না। তোমাকে ত’ বলেছি। আমার ব্যাপারে তুমি মাথা গলিও না। যথেষ্ট বড় হয়েছি আমি। এসব আর ভালো লাগে না দশজনের সামনে। আমি কি মাইনর? না তোমার ওয়ার্ড?
বিষেণদেওবাবু আমাদের সামনে একটু অপমানিত ও লজ্জিত বোধ করলেও, তা গায়ে না-মেখে বললেন, যা খুশী তুই কর, তবে যাই-ই বলি, তোর ভালোর জন্যেই বলি।
ঋজুদা ফেলে-আসা কথায় ফিরে গিয়ে কথার খেই ধরিয়ে বলল, আপনিও কি আপনার সব ট্রোফিই ভ্যান্-ইনজেনে পাঠান?
না, না। আমরা আমার বাবার আমল থেকেই পাঠাই কোলকাতায়। এক আর্মেনীয়ান সাহেবের কোম্পানী ছিল। সাহেব মরে গেছেন বহুদিন। ছেলেরাই বোধহয় মালিক এখন! কি যেন নাম ছিল সাহেবের? ও হ্যাঁ! মনে পড়েছে, ফ্রেভিয়ান। আর তাঁর ম্যানেজার ছিলেন হালদারবাবু। এখনও নিশ্চয়ই আছেন। বহুদিন ত’ আর শিকার-টিকার করা হয় না। অনেক বছর দেখাশুনা নেই ওঁদের সঙ্গে।
ঋজুদা বলল, বাঃ, ওঁরা ত’ দারুণ কাজ করেন দেখছি। আগে জানলে…
দারুণ! বললেন বিষেণদেওবাবু।
ভানুপ্রতাপ একটা হাই তুলে বললেন, অ্যালবিনোর কথা বল তার চেয়ে। যত্ব সব মরা-বাঘ নিয়ে পড়েছো তোমরা।
আমি বললাম, আপনি দেখেছেন অ্যালবিনো বাঘটাকে?
হুঁ। দু দিন।
মারলেন না কেন?
বাঘ দেখলেই মারতে হবে নাকি? মামারই মারামারি বেশী পছন্দ। অবশ্য ঋজুবাবুকে মলোয়াঁমহলের ভেট এই বাঘ। বাঘ মারতে কি আছে? ও ত বাঁচ্চোকা খেল। আমার প্রথম বাঘ আমি কত বছর বয়সে মারি জানো?
কত? আমি চোখ বড় করে বললাম।
দশ বছর বয়সে। আমার মায়ের পাশে বসে, মায়েরই মাচা থেকে।
তা বটে। বিষেণদেওবাবু বললেন, আমার বোন শুভাও বাঘ মেরেছিল ঠিক দশ বছর বয়সেই, আমারই পাশে বসে।
ঋজুদা বলল, ঐভাবে সব বাঘ মারলেন বলেই ত’ আজ এই অবস্থা। এ অঞ্চলে কটা বাঘই বা আছে এখন?
বিষেণদেওবাবু ঋজুদার কথাতে আহত হলেন।
বললেন, আরে, বাঘ না মারলে আমাদের সময়ে ছেলেমেয়ের বিয়ে পর্যন্ত হতো না। জমিদারীর গেঁহু-বাজরার মত বাঘও আমাদের সম্পত্তি ছিল। নিজেদের জমিদারীর বাঘ মেরেছি তার আবার জবাবদিহি করব কার কাছে?
ঋজুদা বলল, রাগ করলেন নাকি?
বিষেণদেওবাবু জোর করে মুখে হাসি ফুটিয়ে বললেন, রাগ করার কি আছে?
কথা মোরাবার জন্যে আমি ভানুপ্রতাপকে বললাম, কেমন দেখতে অ্যালবিনো বাঘটা?
মনে হল, ভানুপ্রতাপও ঋজুদার উপর চটেছিল। আমার কথার জবাব না দিয়ে বলল, তাহলে দেখছি ঋজুবাবুর জন্য রেখে-না-দিয়ে এতদিনে মেরে দিলেই পারতাম অ্যালবিনোটা!
ঋজুদাও রেগেছে মনে হল। বলল, বাঘ মারা এখন বে-আইনের কাজ। আমার বাঘ মারবার শখ নেই। বীটে যদি অন্য কোন জানোয়ার বেরোয়, মানে শুয়োর কি ভাল্লুক, তবেই আমি মারব। শুয়োর ভাল্লুকের পারমিট ত’ দিচ্ছে কিছু কিছু আজকাল। বাঘ মারতে হয় ত রুদ্রই মারুক। সুন্দরবনেই ও কেবল মেরেছে একটা। অবশ্য ম্যান ইটার বাঘ। ও মারলেই আমার মারা হবে। আমি শুধু তোমাদের সঙ্গে থাকব। আবহাওয়া বেশ জটিল হয়ে উঠছিল।
আমি আবার ভানুপ্রতাপকে বললাম, অ্যালবিনো কেমন দেখতে তা ত’ বললেন না?
ভানুপ্রতাপ বললেন, ছাই-ছাই গায়ের রঙ-কটা চোখ। পেল্লায় বাঘ।
ঋজুদা একটু আগের উত্তজনা সামলে নিয়ে, অ্যালবিনো দিনের গল্প শুরু করল বিষেণদেওবাবুর সঙ্গে।
বলল, বিষেণদেওবাবু, সেই পূর্ণিমার রাতে খলকতুম্বী মাইনের পাশে যে বড় শিঙাল শম্বরটা মেরেছিলেন আপনি, মনে আছে? অতবড় শম্বর আমি জীবনে দেখিনি। নর্থ আমেরিকান মুজ-এর মত দেখতে।
বিষেণদেওবাবু বললেন, আপনি ভুলে গেছেন সব। তখন মাইকা মাইনসের লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার ছিলেন মিস্টার বিজাপুকার। মারাঠী ভদ্রলোক। মনে পড়েছে? শটগানের দু ব্যারেলেই বল ব্যবহার করতেন উনি। রাইফেল দেখতে পারতেন না দু চক্ষে। ঐ বিজাপুকার সাহেবই মেরেছিলেন শম্বরটা। মেরে, জোর করে ট্রোফিটা আমাকে প্রেজেন্ট করেছিলেন।
তাই নাকি? ঋজুদা বলল, আমার ধারণা ছিল আপনিই যেন মেরেছিলেন।
বিষেণদেওবাবু বললেন, না, না। হি ওজ আ ওয়ান্ডারফুল শট।
গল্পে গল্পে রাত অনেক হল। বেয়ারা এসে জিজ্ঞেস করল খাওয়ার লাগাবে কি-না।
বিষেণদেওবাবু ঋজুদার দিকে চেয়ে বললেন, ইজাজৎ দিজিয়ে।
ঋজুদা হাসলেন। বললেন, চলুন যাওয়া যাক।
বাখরখানি রোটি, কালিতিতিরের কাবাব, পাকা পণ্ডিত রুইয়ের রেজালা, শম্বরের মাংসর আচার আর বেনারসের রাবড়ি দিয়ে নমঃ নমঃ করে আমরা ডিনার সারলাম।
বিষেণদেওবাবু বললেন, রাতে আর বিশেষ কিছু করতে পারা গেলো না। কাল ত’ সকলকেই ভোরে উঠতে হবে। সেইজন্যেই রাতের খাওয়াটা ইচ্ছে করেই নাকি অত্যন্ত হালকা করেছেন আজ। কালকের ভোজ হবে জবরদস্ত।
ভানুপ্রতাপ বলল, মামা ঈত্বরই–গ্বীল-এর ডিকান্টারটা বাইরে বের করে রেখো।
আমি বললাম, ঈত্বরই গ্বীল? সেটা আবার কি আত্বর?
ঋজুদা হাসল। ভানুপ্রতাপও হাসলেন আমার কথাতে। তারপর ভানুপ্রতাপ বললেন মৃত্তিকা-গন্ধী-ঈত্বর। ঐ ঈত্বর গায়ে লাগিয়ে, বাঘ-শিকারে যাই আমরা। মানুষের গা-দিয়ে মাটির গন্ধ বেরোয় হাওয়া যেদিকেই থাকুক না কেন বাঘ শিকারীদের গায়ের গন্ধ পায় না।
থ’ হয়ে গেলাম শুনে। রাজা-রাজড়াদের ব্যাপারই আলাদা।
খাওয়া দাওয়ার পর আমরা উপরে এলাম। ঋজুদা ঘরে ঢুকেই বলল, কাঁচিটা ফেরত দিলি না আমাকে?
আমি সত্যি-সত্যিই গাঁট-কাটার মত মুখ করে কাঁচিটা ফেরত দিলাম ঋজুদাকে।
ঋজুদা বলল, রুরুদদরবাবু, কেস খুব গোলমালের ঠেকছে। তোর জন্যেই গোয়েন্দাগিরিতে ফেঁসে গেলাম। আর তোর জন্যেই ঈজ্জত ঢিলে হবে। সব কাজ কি সবাইকে দিয়ে হয়?
আমি বললাম, যত দোষ, নন্দের ঘোষ।
এই কথাটা ঋজুদারই এক পাঞ্জাবী বন্ধুর কাছ থেকে শেখা। একটু একটু বাংলা শিখেই ভদ্রলোক কথায় কথায় এইটে বলেন। নন্দ ঘোষ না বলে, বলেন, নন্দের ঘোষ।
ঋজুদা বললে, বসবার ঘরের স্টাফ করা বড় বাঘটাকে তুই ভাল করে দেখেছিলি?
কোন্ বাঘ? দেওয়ালে যেটা টাঙানো আছে?
হ্যাঁ। ঋজুদা আমার চোখের দিকে চেয়ে বলল।
দেখেছিলাম।
অস্বাভাবিক কিছু নজরে পড়ল?
না ত’?
আরও খাসীর মগজ খা! বলল, ঋজুদা।
তারপর বলল, শুনলি ত’ এখানে ভীষণ চুহা। সব ট্রোফির নাক, কান, লেজ খেয়ে যাচ্ছে। রাতে সাবধানে শুয়ে থাকিস। ঘুমের মধ্যে কার কি খেয়ে যায়, কে বলতে পারে?
তারপর হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বলল, কাল কিছু একটা ঘটবে, বুঝলি। তবে, কি যে ঘটবে, আর কে যে ঘটাবে কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমি বললাম, যা কিছু ঘটুক। অ্যালবিনো বাঘটা মারা পড়ুক আর নাইই পড়ুক, একবার দেখতে পেলেই আমি খুশী। ক’জনের ভাগ্যে এমন সৌভাগ্য হয়। বলো?
ঋজুদার পাইপটা নিভে গেছিল, দেশলাই জ্বেলে ধরাতে ধরাতে বলল, দেখতে পেলে ত’ আমিও খুশী হতাম। কিন্তু বোধহয় আমাদের দেখা হবে না তার সঙ্গে।
অতগুলো পায়ের দাগ–রেগুলার যাওয়া-আসা করছে আর দেখাই হবে না বলছ তুমি?
আমি মনমরা হয়ে বললাম।
ঋজুদা নিজের মনেই বলল, কথায় বলে, সাপের লেখা; বাঘের দেখা। অ্যালবিনো আমাদের ইচ্ছেপূরণ করবে বলে ত’ মনে হয় না আমার। তবে, দ্যাখ, এখন তোর কপাল।
তারপর বলল, নে, এবার শুয়ে পড়। কোনো দরকার হলে আমাকে ডাকিস। চললাম আমি।…
এমন সময় দরজার কাছে দুপুরবেলার মতই গলা খাঁকারী দেবার শব্দ পাওয়া গেল।
ঋজুদা বলল, আইয়ে ব্রিজনন্দনজী, পাধারিয়ে।
ব্রিজনন্দন নাগরা খুলে ভিতরে এসেই বলল, এই বাড়িতে ভূত আছে, চারপাশে, নাচঘরে, সব জায়গাতে ভূত আছে। আপনারা রাতে একদম ঘরের বাইরে বেরোবেন না।
ভূত? আমি অবাক হয়ে ঋজুদার দিকে তাকালাম।
ঋজুদা ব্রিজনন্দনের দিকে। তারপর ঋজুদা বলল, কে পাঠিয়েছে আপনাকে আমাদের কাছে?
বিষেণদেওবাবু এবং ভানুপ্রতাপ দুজনেই। আসলে, কথাটা বলবেন কী না তাই শোচতে শোচতেই ওঁদের সারাদিন গেছে।
ঋজুদা আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়েই ব্রিজনন্দনকে বলল, কিরকম ভূত? ভূত না পেত্নী? কোন চেহারায় দেখা দেয় তারা?
ব্রিজনন্দন দু কানের কাছে দু হাত তুলে ভিক্ষা-চাওয়ার মত হাতের পাতা দুদিকে মেলে ধরে বলল, রাতের বেলা ওরকম ঠাট্টা-তামাশা করবেন না হুজৌর। কখন কি হয়, বলা কি যায়?
তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ভানুপ্রতাপের বাবা ঘোড়া থেকে পড়ে এখানেই মারা গেছিলেন। তাঁকে মাঝে মাঝেই ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়াতে দেখা যায় গভীর রাতে। এই মহলের চারপাশে। নাচঘর থেকে বাঈজীর গানও ভেসে আসে কখনও সখনও। বিষেণদেওবাবুর বাবা গয়ার এক বাঈজীকে খুন করেছিলেন ঐ নাচঘরে। সেই গায় গান।
বিষেণদেওবাবু এত সাহসী শিকারী হয়েও ভূত মানেন?
শিকারের সাহস আলাদা, আর ভূত-প্রেতের ব্যাপার আলাদা। বিষেণদেওবাবু কত দেব-দেবীর কাছে পুজো চড়িয়েছেন–মহলের সব নোকর-বেয়ারারা জানে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি।
ঋজুদা বলল, এইসব ভূত-পেত্নীরা কবে থেকে উপদ্রব শুরু করেছে?
ব্রিজনন্দন বলল, মাসখানেক হলো বলেই ত’ শুনেছি। আমি ত’ এখানে থাকি না। আমার সবই শোনা কথা।
ঐ নাচঘরে কেউ যায়নি দিনের বেলাও?
কে যাবে ওখান? সাপেদের আড্ডা সেখানে। ধারেকাছে কেউ ঘেঁষতেই পারে না।
কেউ চেষ্টা করেছিল?
হ্যাঁ। বিষেণদেওবাবু তাঁর দুজন শিকারীকে পাঠিয়েছিলেন। বন্দুক দিয়ে একদিন। একজনকে সাপে কামড়ে নীল করে দিয়েছিল। ভূতে অন্যজনের গলা কামড়ে মাংস খেয়ে গেছিল।
কত্বদিন আগে?
তা দিন পনেরো হল।
তারপর কেউ যায়নি আর?
কে যাবে? কার এত হিম্মত?
ভানুপ্রতাপ?
ভানুপ্রতাপের হিম্মত আছে। ও যেতে চায় বলে, আমার বাবার ভূত আমি বুঝব! কিন্তু বিষেণদেওবাবুই যেতে দেন না। ওর হাতে-পায়ে ধরে আটকান প্রত্যেকবার। ভানু ছাড়া যে ওর আর কেউই নেই। ঐ শিকারী দুজনের কপালে যা যা ঘটেছিল তা জেনেশুনেও তারপর ভানুপ্রতাপকে কি করে পাঠান উনি!
ঋজুদা বলল, বহত্ মেহেরবানী। আমাদেরও প্রাণের ভয় আছে। তাছাড়া বেড়াতে এসে এসব ঝামেলাতে জড়াতে চাই না আমি। আমরা কালই শিকারের পর এখান থেকে চলেই যাব ভাবছি। এ ত দেখছি খতরনাগ ব্যাপার-স্যাপার।
বহত্। ঘাড় নীচু করে বলল ব্রিজনন্দন।
ঋজুদা হঠাৎ বলল, আপনার কোমরে গোঁজা ওটা কি? পিস্তল না রিভলবার?
ব্রিজনন্দন চমকে উঠে বাঁদিকের কোমরে হাত দিল।
আমার চোখে পড়েনি। কিছু বোঝাও যাচ্ছে না কেরোসিনের ঝাড়ের বাতিতে। গোলাপী টেরিলিনের পাঞ্জাবীর নীচে ধুতির সঙ্গে যে কিছু বাঁধা থাকতে পারে তা আমার একবারও মনে হয়নি।
ব্রিজনন্দন মুখ নীচু করে বলল, রিভলবার। জমিদারী দেখাশোনার কাজ করি। গায়ের জোরও কম খাটাতে হয় না। আমাদের দেঁহাতে এখনও জোর যার, মুলক তার। অনেক শত্রু আমার উজজানপুরে–তাই সবসময় সঙ্গে রাখি।
ঋজুদা বলল, ও।
তারপর বলল, তা এখানে ত’ শত্রু নেই। আছে নাকি?
–না, এখানে নেই। তবুও সবসময় গোঁজাই থাকে। আসলে, আদতও বৈঠ গ্যয়া। তারপরই বলল, হুজৌর। আপনারও ত’ কোনো শত্রু নেই এখানে–কিন্তু আপনিও ত’ সবসময় কোমরে পিস্তল বেঁধে রেখেছেন। কেন?
ঋজুদা হাসল। বলল, অভ্যেস, ঐ আপনারই মত। আদত্ বৈঠ গ্যয়া।
ঋজুদা আবার বলল, বহত মেহেরবাণী। আমরা দরজা ভাল করে বন্ধ করে শোব। আর খুলব সেই সকালে-বেয়ারা চা নিয়ে এলে।
তারপর কি ভেবে ঋজুদা বলল, যা ভয় ধরিয়ে দিলেন আপনি–আমরা দুজনে আজ এই এক ঘরেই শোব। আপনি যদি আমার শামানগুলো কাউকে দিয়ে এ ঘরে আনিয়ে দেন।
ব্রিজনন্দন হাতের সোনার ঘড়িতে তাকিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠল। বলল, ওয়াক্ত জাদা নেহী হ্যায়।
বলেই, বলল, আমি তুরন্ত বন্দোবস্ত করছি। বলেই, তাড়াতাড়ি বাইরে বেরিয়ে নীচে চলে গেল।
ঋজুদা কথা না বলে ইজীচেয়ারটাতে বসে পাইপ খেতে লাগল। একটু পরই দুজন বেয়ারা ঋজুদার মালপত্র ধরাধরি করে আমার ঘরে নিয়ে এল। ব্রিজনন্দন বারবার ঘড়ি দেখছিল। সব মাল এসে যেতেই ওরা তাড়াতাড়ি চলে গেল নীচে।
ওরা নীচে চলে যেতেই হঠাৎ যেন সমস্ত মালোয়াঁ-মহলে গা-ছমছম অন্ধকার নেমে এল। নীচের দেউড়ির পেটা ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজল। বাইরে যে কত জ্যোৎস্না তা সারা বাড়ির আলো এক এক করে নিভে যাওয়াতে প্রথম উপলব্ধি করলাম আমরা। ঋজুদা উঠে ঘরের বাতিগুলো নিভিয়ে দিল। তারপর ইজীচেয়ারটাকে তুলে যাতে শব্দ না হয় তেমন করে জানালার সামনে এনে পাতল। আমিও চেয়ারটাকে ঐভাবে নিয়ে এলাম।
অন্ধকার ঘরে ঋজুদার পাইপের লাল আগুনটা একবার জোর হচ্ছিল আর একবার নিভু নিভু হচ্ছিল–পাইপে টান দেওয়ার সঙ্গে সমতা রেখে। বাইরে ফুটফুটে জ্যোৎস্না। সাদা মারবেলের চওড়া বারান্দাতে থামের ছায়াগুলো এসে পড়েছিল লম্বা হয়ে। এখন পুরো পরিবেশটাই ভুতুড়ে ভুতুড়ে লাগছে।
পাইপটা হাতে নিয়ে ঋজুদা বলল, এখানের ভূত পেত্নীরা ত’ খুব ইন্টারেস্টিং। ব্রিজনন্দন যেভাবে ঘড়ি দেখছিল, তাতে মনে হল যে, তারা ঘড়ি দেখেই ঘোড়া চড়ে; ঘড়ি ধরে গান গায়।
আমার মুখ দিয়ে কথা সরছিল না। বেড়াতে এসে কী ঝুটঝামেলাতে পড়লাম রে বাবা!
ঋজুদা বলল, রুরুদদরবাবুর ব্যাপার আলাদা। একে অ্যালবিনো; তায় ভূত-পেত্নী। ফিরে গেলে ক্লাসের ছেলেগুলোর অবস্থা কাহিল হবে তোর গুল শুনতে শুনতে। ওরা যতই শুনবে, ততই অবিশ্বাস করবে। আর ওরা যত অবিশ্বাস করবে তুই ততই ওদের বিশ্বাস করাতে চেষ্টা করবি। পুওর রুরুদদরবাবু! ওয়ান্ডারাবোদের হাত থেকে বেঁচে এসে শেষে কী না হাজারীবাগী ভূতের হাতে থাপ্পড় খেয়ে মরবি?
আঃ চুপ করো না। আমি বললাম, উত্তেজিত গলায়।
ঋজুদা বলল, খিলটা ভালো করে লাগিয়ে দিয়ে তুই খাটে শুয়ে পড় গিয়ে কোলবালিশ টেনে। দেখা বা শোনার মত কিছু থাকলে তোকে তুলে দেবো। আমি আজ এইখানেই রাত কাটাব। ইজিচেয়ারটা ভারী কমফর্টেবল। পা-ও তুলে দেওয়া যায় দুই হাতলের নীচের বাড়তি হাতলে।
তারপর বলল, যাঃ। শুয়ে পড়।
আমি গিয়ে শুয়ে পড়লাম। বড় বড় পাল্লাওয়ালা শিকবিহীন খোলা জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে আকাশের এক কোণে মেঘ জমেছে আস্তে আস্তে। কিন্তু দুদিন পর পর বৃষ্টি হওয়াতে চারদিকের জঙ্গল পাহাড় ঝকঝক্ করছে জ্যোৎস্নাতে। ঝির ঝির করে হাওয়া দিয়েছে। বনে-বনে, পাতায় পাতায় ঝরঝরানি আওয়াজ তুলে। চাঁদের আলোয়, মাখামাখি হয়ে সেই হাওয়া ভেজা বনের মিশ্র গন্ধ বয়ে নিয়ে আসছে ঘরে। ব্রেইনফিভার পাখি ডাকছে থেকে থেকে। নাচঘরের কাছে ডিড-ইউ-ডু-ইট ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে কাকে যেন কি শুধোচ্ছে। ভারী শান্ত সুন্দর স্নিগ্ধ প্রকৃতি এখানে। জানালার সামনে বসা পাইপমুখে ঋজুদার শিলুট বাইরের জ্যোৎস্না-মাখা আকাশের পটভূমিতে অনড় হয়ে রয়েছে।
অনেক কিছু ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমি জানি না। ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখতে লাগলাম। দূরে কে যেন ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে বনের মধ্যের পাথুরে পথ দিয়ে। টগবগ টগবগ টগবগ-টগবগ ছন্দোবদ্ধ আওয়াজ যেন মাথার মধ্যে জোর হচ্ছে। আচমকা আমার ঘুম ভেঙে যেতেই দেখি দরজাটা খোলা, হাঁ-করে। ঘরের মেঝেতে চকচক করছে চাঁদের আলো, আর বাইরে স্বপ্নের মধ্যে শোনা সেই শব্দ। ধড়মড় করে আমি উঠে বসলাম খাটে। তারপর ঋজুদাকে দেখতে না পেয়ে, খাট থেকে নেমে বারান্দায় এলাম। দেখি ঋজুদা বারান্দার রেলিঙে দু হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। আর ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় একটা সাদা ঘোড়ায় চড়ে দূরে একটা অস্পষ্ট কালো মূর্তি দ্রুত চলে যাচ্ছে।
ঋজুদা খুব মনোযোগের সঙ্গে তাকিয়ে আছে সেই সাদা রাতে সাদা ঘোড়ায় দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া অস্পষ্ট কালো-সওয়ারের দিকে।
যতক্ষণ শব্দটা শোনা গেল ততক্ষণ আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘরে যখন এসে ঢুকেছি ঠিক তখনই তানপুরা আর সারেঙ্গীর আওয়াজ ভেসে এল নাচঘরের দিক থেকে। আর ঠিক তারপরেই ভেসে এল দারুণ মিষ্টি গলার আলাপ।
কয়েক সেকেন্ড কান খাড়া করে শুনেই ঋজুদা সুস্থ গলার বলল, আহা! কোন্ পেত্নী এমন গান গায় রে। জানতে পেলে, এই পেত্নীকেই বিয়ে করে ফেলতাম।
আমি কি যেন বলতে যাচ্ছিলাম। ঋজুদা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, কথা বলিস না। আলাপটা শোন ভাল করে। আহা রে! যেন গহরজান বাঈজী গাইছে!
এমন রাত, এমন সুরেলা গান, এমন সারেঙ্গীর ছড়ের করুণ কান্না যে, আমার মত বেসুরো লোকের বুকের ভিতরটাও মুচড়ে মুচড়ে উঠতে লাগল। পেত্নীর কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আমি ইজীচেয়ারে বসা ঋজুদার কাঁধ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ঐদিকে চেয়ে রইলাম।
সমস্ত মালোয়াঁ-মহল নিথর নীরব। ঐ দূরাগত গান জঙ্গল আর জ্যোৎস্না সাঁতরে এসে কোনো গভীর নদীর পরিষ্কার খরস্রোতা জলের মত এই প্রাসাদের আনাচ-কানাচ, জাফরি-ঘুলঘুলি সব কানায় কানায় ভরে দিচ্ছে। অথচ এই মালোয়াঁ-মহলে একজনও প্রাণী জেগে আছে বলে মনে হচ্ছে না। জেগে থাকলেও কি তারা কেউই ভয়ে শব্দ করছে না? কে জানে?
গান ত’ নয়, যেন করুণ মিনতি, যেন উথলে-ওঠা কান্না কারো।
ঋজুদা গম্ভীর গলায় বলল, কি রাগ বল ত’?
আমি বললাম, বেহাগ।
ঋজুদা মাথা নাড়ল দু’পাশে।
তাহলে? চন্দ্রকোষ?
আঃ। বিরক্ত হয়ে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল ঋজুদা। তারপর বলল, মালকোষ। তোর মায়ের গলায় আনন্দধারা বহিছে ভুবনে গানটা শুনিসনি? এই রাগের উপরই ত’ ঐ গানটি বাঁধা। রবীন্দ্রনাথের ঐ একটিমাত্র গানই আছে মালকোষ রাগাশ্রিত। সরী। না আরও একটি গান আছে। চিরকুমার সভার গান। স্বর্গে তোমায় নিয়ে যাবে উড়িয়ে।
গানের রাগের কথা ভুলে গেলাম আমি। কিন্তু আমার রাগ আর ভয় দুইই একসঙ্গে এল। এই ভৌতিক রহস্যময় গানের মধ্যে, আমার মায়ের গানকে টেনে আনার কি মানে হয়?
গান চলতেই লাগল। ঋজুদা তন্ময় হয়ে বসে রইল। বলল, এখানে আসা আমার সার্থক। বুঝলি রুদ্র। বহুদিন এমন গান শুনিনি। আর এমন চমৎকার পরিবেশ। আহাঃ।
আমি গিয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুম এসে গেছে আবার, প্রায় ঠিক সেই সময় ঘোড়ার খুরের শব্দ আবার ফিরে এল। কে এই ভৌতিক ঘোড়সওয়ার? কোথায় এবং কেন এর রাতের সহল তা কে জানে? শব্দটা জোর হতে হতে যে পথে এসেছিল সেই পথেই মিলিয়ে গেল। নাচঘরের কাছে গিয়েই হঠাৎ যেন থেমে গেল।
গান কিছু তখনও চলছিল। আলাপ শেষ হয়ে বিস্তারও শেষ হয়ে তখন তান তার। গন্তব্যের দিকে বয়ে চলেছিল দূর জঙ্গলের বহতা ঝর্নার জলের কুলকুলানি জলতরঙ্গর মত; রাতের হাওয়ায় বনের বুকের মধ্যে থেকে ওঠা মৃদু মর্মরধ্বনির সঙ্গে।
