চার
ঋজুদা পথে বেরিয়েই গম্ভীর, অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
একটা লাঠি নিয়েছে হাতে। সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছে–তবে সেই খুঁড়িয়ে চলাটাই হচ্ছে স্বাভাবিক।
ওলড রাস্তা রোডের দিকে কিছুটা গিয়েই ঋজুদা রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়ল ডানদিকে। সেখানে কোনো শুঁড়ি পথ-টথও ছিলো না। আমি ভাবলাম, নিশ্চয়ই কোনো দুষ্প্রাপ্য পাখি বা প্রজাপতি দেখেছে। কিন্তু কালিতিতির ছাড়া অন্য কোনো পাখিই ডাকছে না। এ অঞ্চলে তিতির, কালিতিতির, আসকল, বটের বুনোমুরগী, ময়ুর ইত্যাদি একেবারে ভর্তি। ফেদার-শুটিং-এর এমন স্বর্গ বড় একটা দেখা যায় না। ঋজুদাই বলছিল। শিকার বন্ধ হয়ে যাওয়াতে গেমস্ আগের থেকে বেড়েওছে অনেক।
রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের গভীরে এসে একটা ছোট্ট টিলামত দেখে ঋজুদা তার ছায়ায় বসল, লাঠিটা পাশে রেখে। তারপর যত্ন করে পাইপ ভরতে লাগল।
কি যেন ভাবছিল ঋজুদা।
পাইপটা ভরা হয়ে গেলে, ভাল করে পাইপটা ধরিয়ে কোলকাতার স্টেটবাসের একজস্ট পাইপ থেকে যেমন ধুঁয়ো বেয়োয় তেমন ধুঁয়ো ছাড়ল। ধুঁয়োতে জায়গাটা ঢেকে গেল। তবে, পাইপের ধুঁয়োর গন্ধ ভাল এবং রঙ নীলচে-সাদা। আমাদের পায়ের কাছেই, মাটিতে কতগুলো পোকা গর্ত থেকে ঢুকছিলো বেরোচ্ছিল। ঋজুদার পাশে বসে আমি তাদের দেখছিলাম। পোকাগুলো ভারী সুন্দর দেখতে। সামনেটা লাল; পেছনটা কালো। কুঁচ ফলের মত।
ঋজুদা নিজের মনেই বলল, ঢেঁকিকে স্বর্গে গিয়ে ধান ভানতে হয় বুঝলি।
কি রকম? ঋজুদার কথাতে রহস্যর গন্ধ পেলাম আমি।
ঋজুদা বলল, রুরুদদরবাবু, এখানকার রাবড়ি এখানেই হজম করে যেতে হবে। চেঞ্জে এলাম বটে, কিন্তু শরীর ভাল হবে বলে মনে হচ্ছে না।
আমি আবার উৎসুক হয়ে বললাম, কেন একথা বলছ?
ঋজুদা বলল, মনে হচ্ছে না, ব্যসস…তার আবার কেন কিসের?
কিছুক্ষণ পাইপ খেয়ে বলল, তোর ঘরটাতে যে জানালাগুলো আছে তা দিয়ে মালোয়াঁমহলের পিছন দিকটা দেখা যায় না রে?
-হ্যাঁ।
–আমরা যদি এখন পশ্চিমে যাই, তাহলে ত’ বাড়ির পিছনে যাওয়া হবে? কি?
ঋজুদা বলল।
তারপরই বলল, কম্পাস্ এনেছিস?
আমি বললাম বা রে! তুমি বললে এখানে শুধুই খাবে, ঘুমোবে আর কোলকাতার মাখন-বাবু চেঞ্জারদের মত ক্যাম্বিসের জুতো পায়ে বেড়াবে। আর এখন…।
ঠিক আছে। ঋজুদা বলল, কথা বলবি না। চুপচাপ চল। এ জঙ্গলেই হয়ত অ্যালবিনো বাঘটা আছে। বিরাট বাঘ। বাঘ ত’ আর চীফ মিনিস্টারের গাড়ির মত লাল-বাতি জ্বেলে পী-পাঁ-পাঁ-পী করে জানান দিয়ে আসবে না। কোয়াইটলী এসে, ফাস্টলী, বাট নীটলী কিছু করেই চলে যাবে।
কিছুদূর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চরাই-উৎরাই, আলো-ছায়ার মধ্যে দিয়ে গিয়ে আমরা দূরে গভীর জঙ্গলের মধ্যে স্কোয়াশ-খেলার কোর্টের মত উঁচু একটা পোড়ো-বাড়ি দেখতে পেলাম। বাড়িটা পাথরের, একদিকটা ধসে গেছে। অশ্বত্থ গাছ গজিয়ে উঠেছে এখানে ওখানে। বাড়িটার চারপাশে জংলী নিমের ঘন জঙ্গল। কিছু এলোমেলো। ইউক্যালিপ্টাস্।
ঋজুদা বলল, রুদ্র। এবারে মালোয়াঁমহল দেখতে পাচ্ছিস? পিছন ফিরে?
হুঁ। আমি বললাম।
–তোর ঘরের জানালা বা পেছনদিকের অন্য কোনো ঘরের জানালায় দাঁড়িয়ে দেখলে এই নাচ ঘর দেখা যাবে?
যাবে! তোমার ঘর থেকে নয়, আমার ঘর থেকে।
দেখা যাবে ত সকালে উঠে তোর চোখে পড়েনি কেন?
বোধহয় নিমগাছগুলোর জন্যে। তাছাড়া, বাড়িভর্তি যত জানোয়ারের যত রকম ট্রোকি-তাই দেখার সময় হল না, বাড়ির বাইরে তাকাবার সময় কোথায়?
জঙ্গলের ভিতরে সরে আয় এবারে। ফাঁকা জায়গাতে থাকিস না। ঋজুদা বলল।
কেন!
আমাদের কেউ লক্ষ করতে পারে হয়ত।
এ কিরকম জায়গায় বেড়াতে এলে?
আমি বললাম, ভাল হচ্ছে না কিন্তু ঋজুদা। বলতেই দেখতে পেলাম, একজন মেয়ে আর একজন পুরুষমানুষ পাকদণ্ডী দিয়ে আসছে আমাদের দিকেই।
ঋজুদাকে ইশারাতে দেখাতেই, ঋজুদা ফিফিস্ করে বলল, রুদ্র সামনের ঝর্নাটায় লুকিয়ে পড়।
বলতে না বলতেই, আমরা দুজন তাড়াতাড়ি ঝর্নাটাতে নেমে বালির মধ্যে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম, পাথরে পিঠ রেখে।
পুরুষ আর মেয়েটি কথা বলতে বলতে এদিকে আসছিল। কিন্তু তখনও বেশ দূরে ছিল।
হঠাৎ ঋজুদা বলল, গলা ছেড়ে একটা গান ধরত রুদ্র।
গান? আমি চমকে উঠলাম।
হ্যাঁ, গান।
ধমকে বললে, কেউ গাইতে পারে না। তবুও ফিসফিস করে বললাম, রবীন্দ্রসঙ্গীত?
না। হিন্দী সিনেমার গান। এরা কি শান্তিনিকেতনে পড়েছে যে, রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে দৌড়ে আসবে?
তারপর বলল, হিন্দী গান! সিনেমার গান!
আমি আশ্চর্য হয়ে ঋজুদার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
গান না-শুরু করায় ঋজুদা আমার মুখের উপর নীরব বিরক্তির নায়েগ্রা ফলস ঢেলে দিয়েই হঠাৎ ভূমিকম্পর মত, গলা ছেড়ে গান ধরল :
রে মাম্মা, রে মাম্মা রে-এ-এ-এ-এ
রে মাম্মা, রে মাম্মা রের-এ-এ-এ-এ,
হাম্ ত’ গ্যায়ে বাজার সে লানেকা লাট্টু
লাট্টু ফাট্টু কুছ না মিলে, পিছে পড়ে টাট্টু।
রে মাম্মা রে মাম্মা রের-এ-এ-এ-এ…
রে মাম্মা রে মা রের-এ-এ-এ-এ…।
ঋজুদা মুখ হাঁ করে গান গাইছিল, আমিও হাঁ করে ঋজুদার দিকে চেয়ে ছিলাম। ঋজুদা কিন্তু চেয়ে ছিল ঝর্নার অন্য পারে। যেদিকে যে-কোনো মুহূর্তে ঋজুদার গানে মুগ্ধ হওয়া কোনো মানুষের মুখ দেখতে পাবে বলে আশা করছিল বোধহয় নিজে।
হঠাৎ গান থামিয়ে ফিসফিস করে বলল, যখন লোকদুটো আসবে, ওদের সঙ্গে আমি কথা বলব। তুই ততক্ষণে উঠে ওদের কাছে গিয়ে, যেন এমনিই উঠে চলে যাচ্ছিস, এমন ভাবে ওদের ভাল করে দেখবি কাছ থেকে ভাল করে। ডিটেইলস-এ দেখবি।
এইটুকু বলেই, ঋজুদা আবার গান ধরল, রে মাম্মা রে মাম্মা…..।
অসহ্য। আমার পেটের রাবড়ি এমন গান শুনে এমনিতেই হজম হয়ে গেলো।
গান গেয়ে গেয়ে ঋজুদার গলা এবং তা শুনে আমার মাথা ধরে গেল কিন্তু কোনো লোকই ঋজুদার সংগীত প্রতিভাতে মুগ্ধ হয়ে এদিকে এলো না।
মিনিট দশেক পর ঋজুদা আবার পাইপ ধরালো। পাইপ ধরিয়েই বলল, পাইপের এ্যামফোরা তামাকের গন্ধই সব মাটি করে দিল, বুঝলি। বলে, একমুঠো বালি নিয়ে কিছুটা তুলে ছেড়ে দিয়ে দেখলো হাওয়া কোনদিকে। তারপর বালি কোনদিকে উড়ছে দেখে নিয়ে বলল, দেখলি। লুকিয়ে পড়া না-পড়াতে কোনোই তফাৎ হলো না। পাইপের গন্ধ, ওরা আগেই পেয়েছিল। তাই গান গেয়ে আমাদের ইনোসেন্স প্রমাণ করবার দরকার ছিলো না।
ঋজুদার এই যুক্তি আমার মাথায় ঢুকলো না। তাদের সঙ্গে কথাই যদি বলতে চায় তাহলে লুকিয়ে বা পড়লে কেন? আর লুকোলই যদি তাহলে গানই বা গাইতে গেল কেন? আর গান বলে গান? গানের বাবা।
বললাম, লোকগুলো কারা?
ঋজুদা বলল, সেই ত হচ্ছে কতা।
বললাম, তাহলে চলো আমরা তাড়াতাড়ি মালোয়াঁমহলে ফিরে যাই। বিষেণদেওবাবু আর ভানুপ্রতাপকে বলি যে, ওদের খুব বিপদ। নাচঘরে সাপ নেই, এক জোড়া মানুষ আছে।
ঋজুদা হেসে ফেলল। বলল, তুই এতদিন আমার জঙ্গলের চামচে ছিলি। এটা কিন্তু জঙ্গলের ব্যাপারই নয়। গোয়েন্দাগিরিতে তুইও যেমন কাঁচা, আমিও। শরীর ঠিক করতে এসে আমাদের এর মধ্যে জড়ানো কি ঠিক হবে নিজেদের? না, কালকের দিনটা দেখেই কোলকাতা ফিরে যাব? বল রুদ্র। হাজারীবাগে, গোপালের বাড়িতেও গিয়ে থাকতে পারি। চমৎকার ছবির মত বাড়ি-বরহি রোডে। এই অঞ্চলে থাকার জায়গার অভাব আমার নেই। বল কি করব?
আমি বললাম, সবই বজরঙ্গবলীর ইচ্ছা। আমি আর কি বলব?
ঋজুদা বলল, তোর কাছে খুচরো আছে?
বললাম, পঞ্চাশ নয়া আছে একটা।
টস্ কর।
আমি অনেক উঁচুতে টস্ করে দিলাম কয়েনটাকে। ঋজুদা বলল, হেড হলে চলে যাব, টেল হলে থাকব। বলতে-বলতেই, পঞ্চাশ নয়াটা বালিতে পড়ল, নরম একটা থপাস শব্দ করে।
আমরা ঝুঁকে পড়ে দেখলাম, টেল।
আমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ঋজুদাকে চিন্তিত দেখাল।
আমি আবার বললাম, সবই বজরঙ্গবলীর ইচ্ছা।
ঋজুদা আমার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল কথা না বলে।
আমরা যখন মালোয়াঁমহলে পৌঁছলাম, তখন ভানুপ্রতাপের সঙ্গে বসবার ঘরেই দেখা হল। আমাকে বললেন, কোথায় গেছিলে? আমরা গাড়ি করেই না-হয় যেতাম কোথাও।
আমি বললাম, আমরা ত এখানে খেতে, হাঁটতে আর ঘুমোতেই এসেছি।
ভানুপ্ৰতাপ বললেন, কোনদিকে গেছিলে তোমরা? কতদূর?
আমি উত্তর দেবার আগেই ঋজুদা হালকা গলায় বলল, কাছাকাছি গিয়ে একটা সুন্দর ছায়া-ঘেরা নালা দেখে আমরা বালিতে লম্বা হয়ে শুয়ে গলা সাধছিলাম। আধ-শোয়া অবস্থায় ছায়ায় বসে, জমিয়ে পাইপও খেলাম আমি। বড় সুন্দর পরিবেশ তোমাদের মলিমালোয়াঁ।
কথার উত্তর না দিয়ে ভানুপ্রতাপ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঋজুদার মুখের দিকে চেয়ে বললেন, আপনারা কি মহলের পিছনে নাচঘরের দিকে গেছিলেন? ওদিকে যাবেন না কখনও।
আমি বললাম, কেন বলুন ত’?
ভানুপ্রতাপ রুক্ষ গলায় বললেন, মানা করছি, যাবেন না। মেহমানরা কথা না শুনলে ত’ মুশকিল।
বলেই ডাকলেন, ছোটু।
ছোটু এসে হাজির হল যেন মাটি খুঁড়ে।
ভানুপ্রতাপ বললেন, তুমি এখন থেকে সব সময় এদের সঙ্গে থাকবে। এ জায়গা ওঁদের চেনা নয়। বিপদ-আপদ হতে পারে। কখনও তুমি ওঁদের একা ছাড়বে না।
ভানুপ্রতাপের স্বভাবটা বড় রুক্ষ। মামার ঠিক উল্টো। ঋজুদা ওর কথার ধরনে রেগে উঠল। মুখটা থমথম করতে লাগল। আমিই রেগে গেলাম, আর ঋজুদা! আফ্রিকার ওয়াণ্ডারাবোদের দেশ থেকে ঘুরে এলাম, আর মুলিমালোয়াঁতে আমাকে ভয় দেখাচ্ছে এ! আমি কি দুধের শিশু?
ঋজুদা কথা ঘুরিয়ে ভানুপ্রতাপকে শুধোল, মামাবাবু কোথায়?
বেরিয়েছেন। খানার সময়ে ঠিক ফিরে আসবেন। আপনারা কিছু খাবেন? নিম্বুপানি, জিরাপানি বা লসিস-টসিস? আমপোড়া শরবত খাবেন?
ঋজুদা বলল, আমি কিছু খাবো না, রুদ্রকে কিছু খাওয়াও। আমি একটু ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করছি।
ঠিক আছে। বলেই, ভানুপ্রতাপ দু হাতে তালি বাজালেন।
একজন বেয়ারা দৌড়ে এল। ভানুপ্রতাপ বললেন, লসিস! সাবকা লিয়ে।
বেয়ারা চলে যেতেই টানাপাখার নীচে বসে ভানুপ্রতাপ বললেন, জেনারেটরের অর্ডার দিয়েছিলাম আমি। তাহলে আলো পাখা এয়ার কন্ডিশনার ফ্রিজ সবই রাখা যেত এখানে, মামা আমার বড় কৃপণ। বলল, টানাপাখা বিনি পয়সায় টানে প্রজারা। জেনারেটরের পয়সা বরবাদী হবে। তাছাড়া তুই আর কতদিন থাকিস এখানে।
তারপর বললেন, জেনারেটরে অবশ্য ভটর ভটর আওয়াজও হয়। বিহারে ডিজেলেরও ক্রাইসী।
যাকগে, মামা যা ভাল বোঝেন করবেন।
যারা পাখা টানে, তারা মায়না পায় না? আমি শুধোলাম।
মায়না দিলে ত’ পাবে। খেতে পায় শুধু। অড়হড়ের ডাল আর রোটি। প্রজারা এখনও হল স্লেভ-এর মত। মামার এখনও তাই ধারণা। আমি লুকিয়ে চুরিয়ে যা পারি দিই। প্রত্যেক ঘরের জন্যে চারজন লোক। বারো ঘন্টা করে ডিউটি। আমরা ঘুমুবো, ওরা পাখা টানবে বাইরে গরমে বসে। ইনহিউম্যান। অথচ মামা যা কিছু করেন আমারই জন্যে। আমারই জন্যে সব সঞ্চয়।
আমি বললাম, আপনার মায়ের কি অসুখ হয়েছিল?
জানি না। ডাক্তার ডাকার সময় পেলেন কোথায় মামা? হার্টফেল। আমি ভোরবেলা যখন ঘুম থেকে উঠলাম, তখন মা একটা ফোটো হয়ে গেছেন। কি সব জরুরী কাগজপত্র– সই-সাবুদ করতে উজজানপুর থেকে মামার জরুরী চিঠি পেয়ে এখানে আসতে হল মাকে।
আপনার বাবার কোনো ভাইটাই নেই?
কেউই নেই। বাবা, ঠাকুর্দার একমাত্র ছেলে ছিলেন। আমিও বাবার একমাত্র ছেলে। মামা আর মা ছিলেন দাদুর দুই সন্তান। এখন শুধু মামা।
বাবা মারা গেলেন কোথায়?
–এই মুলিমালোয়াঁতেই। কাল আমরা যে রাস্তায় গাড়ি নিয়ে গীমারিয়া গেলাম–ঐ রাস্তাতেই ঘোড়ায় চড়ে যাবার সময় ঘোড়া থেকে হঠাৎ পড়ে মারা যান বাবা। বাবার খুব ঘোড়ার শখ ছিল। কোলকাতার টার্ফ ক্লাবের মেম্বার ছিলেন। ব্যাঙ্গালোরেরও। রেসিং সীজনে কোলকাতা আর ব্যাঙ্গালোরেই থাকতেন।
এমন সময়ে দরজার আড়ালে যেন কার ছায়া সরে গেল। আমার সন্দেহ হওয়াতে গলায় ইচ্ছে করে কাশি তুলে আসছি বলে দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম তাড়াতাড়ি। দরজার কাছে পৌঁছতেই দেখি, ছোট্টু, ভানুপ্রতাপের খাস বেয়ারা আমাকে দেখেই সরে গেল। আমার কিন্তু মনে হয়েছিল, ব্রিজনন্দনকেই দেখতে পাবো। লোকটাকে আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি। প্রথম দর্শনেই।
ফিরে এসে বললাম, ঐ ব্রিজনন্দন লোকটা কে? আপনাদের বাবার জমিদারীর পুরনো লোক?
ভানুপ্রতাপ বললেন, আরে না না। সেখানেও ত’ সব চোরের আড্ডা। মামাবাবুর জানা, বিশ্বস্ত লোক। মাইকা মাইনের সর্দার ছিল। ওর বাড়ী মীর্জাপুরে–উত্তরপ্রদেশের মীর্জাপুরে। ব্রিজনন্দনকে বাবার মৃত্যুর পর থেকেই মামা উজজানপুরে পাঠিয়েছিলেন। লোকটা খুব কাজের লোক। ঐ ত’ সব দেখাশুনো করে আমাদের জমিদারীর।
তারপর পকেট থেকে ট্যাবলেট বের করে আরেক ঢোঁকের সঙ্গে একটা ট্যাবলেট খেল। খেয়ে বলল, তবে…..
আমি বললাম, তবে কি?
ভানুপ্রতাপ এদিক ওদিক চেয়ে বললেন, ঐ ব্রিজনন্দন লোকটা খুব অপয়া।
কেন? আমি উৎসুক হয়ে শুধোলাম।
অপয়া এইজন্যে বলছি যে, ও এখানে এলেই কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। বাবার এবং মায়ের মৃত্যুরও একদিন আগে, ও এখানে এসে হাজির হয়েছিল। আরেকবার এসেছিল, মা বেঁচে থাকতে। সেবার ও আসার পরের দিন মামাবাবুর এমন অসুখ হল–ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরীয়া–যে মামাবাবুকে বাঁচিয়ে তোলাই মুশকিল ছিল। কানেও প্রায় কালা হয়ে গেছিলেন। সেইজন্যেই বলি যে, লোকটা মান হুস।
মান হুস্ মানে কি? আমি বোকার মত জিজ্ঞেস করলাম।
সরী। বললেন ভানুপ্রতাপ। আই মীন আনলাকি। যেমন শিকারে বেরিয়ে পথে যদি প্রথমেই লুমরী দেখে এখানের শিকারীরা, তাহলে ধরেই নেন যে, সেদিন অযাত্রা।
লুমরী কি?
সরী! লুমরী মানে খ্যাঁকশিয়াল; ফক্স।
ওঃ! আমি বললাম।
ভানুপ্রতাপ বললেন, তোমরা মেহমান। কালকে অ্যালবিনো বাঘটা তোমারই মারো, এই মামার ইচ্ছা; আমারও ইচ্ছা। হাজারীবাগের শিকারীরা খবর পেলে ভীড় লাগিয়ে দেবে। তবে এই এলাকাতে কায়দা-করা শক্ত। রাতে জীপ নিয়ে এসে স্পট লাইটে মেরে নিয়ে যান ত’ অন্য কথা। দিনের বেলা এই এলাকাতে যেই-ই ঢুকুন না কেন, কারোই সাহস হবে না একটাও গুলি ছুঁড়তে। আমাদের লোকেরা তাহলে গুলিতে তাঁদের ভেজে দেবে।
হাজারীবাগে বুঝি ভাল ভাল শিকারী আছেন? আমি শুধালাম।
বাঃ নেই। বিজয় সেন ছিলেন সবচেয়ে নামকরা। তারপরের আমলে টুটু ইমাম্। টুটিলাওয়ার জমিদার ইজাহারুল হক। গোপাল সেন, বদিবাবু টুটু–ইমামের ছেলে বুলু ইমাম। শিকারীর অভাব কি? অ্যালবিনোটা তোমরা চুপচাপ মেরে নিয়ে চলে যাও ত। সব শিকারীরাই হচ্ছে মেয়েদের মতন জেলাস। শিকারী হিসেবে আমি-তুমিও তাই, স্বীকার করি আর নাই করি। অবশ্য তোমাদের দিয়ে মারাবেন বলেই হয়ত মামা আর কাউকে জানাননি। আমার সম্বন্ধে অবশ্য মামাবাবুর কোনো জেলাসী নেই। আমার কারণে আমার ভালোর জন্যে, মামাবাবু নিজের খুনও দিতে পারেন। কিন্তু মামাবাবুর অনেক শত্রু হয়ে গেছে। ওর জন্যে বড়ই চিন্তা হয় আজকাল। বন-জঙ্গলের জায়গা। কখন কে যে মেরে দেয় ওঁকে, তার ঠিক কি? বলি, সব সময় বডিগার্ড নিয়ে যাওয়া-আসা করতে, তা কখনও কি শোনেন কথা? বলেন, আমার বজরঙ্গবলী আছেন।
বোধহয় আমাদের দেরী দেখেই ঋজুদা উপর থেকে নেমে এল। পায়জামা-পাঞ্জাবী পরে। এই পোশাকেই খাওয়া-দাওয়া সেরে আজ দিবানিদ্রা দেবে বলে মনে হল।
ঋজুদা নামতে-না-নামতেই বাইরের পোর্টিকোতেও গাড়ি ঢোকার আওয়াজ হলো। একটা কালো রঙের বুইক। ডিজেল এঞ্জিন বসিয়ে নেওয়া হয়েছে। ধ্বক ধ্বক ধ্বক ধ্বক আওয়াজ করছিল ডিজেলের এঞ্জিন।
হাসতে হাসতে ঢুকলেন বিষেণদেওবাবু। বললেন, কি? বেড়ানো হল? রুরুদদরবাবু?
আমি মাথা নোওয়ালাম। টস্-এ যখন টেলই উঠেছে তখন আমা-হেন বোকার কথাবার্তা কম বলাই ভালো।
ঋজুদা বললেন, গেছিলেন কোথায়?
এই একটু হাজারীবাগে।
হাজারীবাগ? কেন?
আরে কালকে ত’ অ্যালবিনো টাইগার মারা পড়বে। এদিকে কাউকে না পারছি বলতে, না-পারছি চাপতে। তাইই সকলকে এমনিই নেমন্তন্ন করে এলাম শনিবার রাতে খাওয়ার জন্যে।
সকলকে মানে?
বদিবাবুকে, পোপালবাবুকে, পদ্মার রাজা, গোন্দার রাজা, হাজারীবাগের ডি. সি. এস-পি কনসার্ভেটর সাহেব, ডি, এফ-ও সাহেব, সক্কলকে। আপনার নাম করে। সকলেই আপনার সঙ্গে আলাপ করতে চান। সেই উপলক্ষে আসবেন। খেয়েও যাবেন।
বদিবাবুকে চেনেন ত? সেই যে কাতরাসের কলিয়ারীর মালিক। ইটখোরি পিতিজ-এ জঙ্গলে ত ওর রীতিমত বাড়িঘরই ছিল এক সময়। ও জঙ্গলেও একটা অ্যালবিনো জুটেছিল একবার, বহু বছর আগে। সেই বাঘ মারার জন্যে জবরদস্তু শৌখীন বদিবাবু কমপক্ষে তখনকার বাজারেও কিছু-না-কিছু এক লাখ টাকা খরচ করেছিলেন। হাঁ আপনারা বাঙালীরাপয়সা হলে, খরচা ভি করেন বোটে। দিল আছে বোটে।
ভানুপ্রতাপ টিপ্পনী কাটলেন। বললেন, মামা তাহলে আমি ত’ বাঙালীই হচ্ছি। ওর কথাতে সকলেই হেসে ফেললাম আমরা।
ঋজুদা পাইপটা ধরিয়ে অনেকখানি ধুঁয়ো ছাড়ল। তারপর বলল, শনিবার রাতে খেতে বললেন সকলকে। বাঘ কি আর পোষা জানোয়ার যে মারা পড়বেই? তাছাড়া…..
বাঘের সঙ্গে কি সম্পর্ক! অ্যালবিনো ত একটা অ্যালিবাই। আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্যেই ডাকলাম সকলকে। আলাপ করতে আসবেন এত মাইল জঙ্গলের রাস্তায়, ত’ খেয়েও যাবেন। এই আর কি? আপনার মত নামী লোক আমার মেহেমান হয়েছেন আর আপনার সঙ্গে সকলকে মিলিয়ে দেবো না?
বলেই, বললেন, আপনার তামাকের গন্ধটা বেশ ভাল ত? কি তামাক এটা?
এ্যমফোরা।
দিশী।
ঋজুদা বললে, আমি দিশী জিনিসই পছন্দ করি, তবে এটা আমাকে দিয়েছে একজন। এটা ডাচ তামাক।
ঋজুদা কথা ঘুরিয়ে বলল, কাল ছুলোয়া আরম্ভ করবেন কখন?
এক্কেবারে ভোরে। আমরা বেরোব বাড়ি থেকে পাঁচটাতে। তিনশ বীটার ছুলোয়া করবে। ভানুরই সব বন্দোবস্ত। আমাদের চারটে মাচা-স্টপারদের মাচা আজ সবই বাঁধা হয়ে গেছে। আপনারা কি পা মুড়ে বসবেন মাচাতে? না ফোন্ডিং-চেয়ার নেবো? মাচার উপরে ডানলোপিলো পাতা থাকবে যদিও।
ঋজুদা বলল, অ্যালবিনো বাঘটা বেরোলেই হল, তাকে আপনি কাঁটার উপরেই বসতে দিন আর উল্টো করে চৌপাই বেঁধে তার উপরেই বসান। তাতে কিছুই এসে যায় না।
একজন বেয়ারা এসে জিজ্ঞেস করল, খাবার লাগাবে কী না।
বিষেণদেওবাবু ঋজুদার দিকে তাকালেন।
ঋজুদা দেওয়ালের বিরাট সুইস কুক্কু-ক্লকের দিকে চেয়ে বলল, পৌনে দুটো। হ্যাঁ। খাওয়া যেতে পারে।
বিষেণদেওবাবু বললেন, পাঁচ মিনিটে জামাকাপড় ছেড়ে আসছি আমি। তারপর বেয়ারাদের ইশারাতে বলে দিলেন খানা লাগাতে।
ঋজুদা ভানুপ্রতাপের মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।
ভানুপ্রতাপ অস্বস্তিভরা কণ্ঠে বলল, আমায় কিছু বলবেন?
না। ঋজুদা অন্যমনস্ক গলায় বলল।
ও-ও-ও…। বলল ভানুপ্রতাপ।
বিষেণদেওবাবু জামাকাপড় ছেড়ে এসে বললেন, চলো রুরুদদরবাবু। খাসীর প্রতি একটু সম্মান দেখানো যাক।
কি বলব, ভেবে না পেয়ে বোকার মত বলে ফেললাম, চলুন।
ঋজুদা বলল, বলিস কি রে রুদ্র? কাক ত কাকের মাংস খায় না বলেই জানতাম এতদিন।
হো হো করে সকলে হেসে উঠল। আমার দু কান গরম হয়ে লাল হয়ে উঠল।
ঋজুদাটা বড় অকৃতজ্ঞ। প্রাণে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে আনলাম কিলালার হাত থেকে। আর এই কী-না কৃতজ্ঞতাবোধ!
একেবারে যা-তা!
বিষেণদেওবাবু বললেন, এখন আর কী রহিমী, আর কী খাওয়া-দাওয়া। উও জমানা চলা গ্যয়ে, যব খলীল খাঁ ফাকতা উড়হাতে থে!চ
