তিন
কাল রাতে আমরা এখানে এসে পৌঁছেছি। আজকাল জি টি. রোডে গাড়ি চালানো মহা ঝকমারি। বিশেষ করে বরাকর অবধি। বরাকরের ব্রিজের উপর এমন ট্রাফিক জ্যাম্ যে মাইথন হয়ে ঘুরে আসতে হল। তাছাড়াও পথে থামতে থামতে এলাম। গোবিন্দপুরের মোড়ের খান সাহেবের চটিতে লাঞ্চ। বাগোদরে জি. টি. রোড ছেড়ে এসে টাটীঝারিয়ার পণ্ডিতজীর দোকানে কালোজাম আর নিমকি দিয়ে চা। তারপর হাজারীবাগ শহর ছাড়িয়ে গীমারীয়ার পথে এগিয়ে এসে যখন অনেক রাতে এই বিরাট, গা-ছমছম পুরনো দুর্গর মত বাড়িটাতে পৌঁছলাম–গভীর জঙ্গলের মধ্যে, মেঘে-ঢাকা আকাশের থমথমে অন্ধকারে, তখন বিশ্বাস করতে রীতিমত কষ্টই হল যে, আজই সকালে কোলকাতা থেকে বেরিয়েছিলাম আমরা।
ঘুম থেকে উঠে চা খেয়ে বাড়িটার চার পাশে ঘুরে ঘুরে দেখছি। জায়গাটার নাম মুলিমালোয়াঁ। লুলিটাওয়া আর গীমারিয়ার মাঝামাঝি। এই পুরনো দুর্গর মত বাড়িটার নাম মালোয়াঁ-মহল মুলিমালোয়াঁর রাজার বাড়ি। বাড়িটাতে পুরনো দিনের বড় বড় গোল খিলান, শিকবিহীন বিরাট বিরাট জানালা, প্রকাণ্ড চওড়া সাদা মার্বেলের বারান্দা। আর ঘরগুলো ত’ ফুটবল খেলার মাঠ। ল্যাজারার্স কোম্পানীর বানানো মেহগিনী কাঠের পেল্লায় খাট। তার গায়ে কত সব কারুকার্য। অন্য ফার্নিচারও সব দেখার মত। চোখ জুড়িয়ে যায়।
কিন্তু সারা বাড়িতেই কেমন যেন একটা অগোছালো, অভিশপ্ত ভাব। সব থেকেও যেন কিছুই নেই। বাড়িতে কোনো মেয়ে নেই, তাই-ই বোধহয় এ রকম অলক্ষ্মী-অলক্ষ্মী ভাব। একজন কেউ থাকলেও সব কিছু গোছগাছ করে রাখতেন হয়ত!
খাটের মাথার উপরে ফিনফিনে নেটের গোল মশারী। কিন্তু যা আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছিল, তা হচ্ছে কোলবালিশ। মখমলের ঢাকনা-পরানো। পাশে রাখলে পাশে শোওয়া লোককে দেখাই যায় না।
আমাদের দুজনের জন্যে দুটো আলাদা ঘর বরাদ্দ হয়েছে। সেজের বাতি। টানা পাখা। মনে হচ্ছে, যেন হঠাৎ ভুল করে কোনো রূপকথার রাজত্বেই চলে এসেছি।
বিষেণদেওবাবুর মত লোক হয় না। যেমন রাজার মত চেহারা। মস্ত বড় কাঁচা-পাকা গোঁফ। ছফিট লম্বা–শক্ত সমর্থ। আর তেমনি অতিথিবৎসল।
পরিবেশ ভারী চমৎকার বাড়িটায়। কিছুদূর এগিয়ে গেলেই ওল্ড-রাতরা রোড। লাল মাটির রাস্তা। দু পাশ ঘন বনে ঢাকা। বাড়ির সামনে দিয়েই গীমারিয়া হয়ে লাল মাটির রাস্তাটা সোজা চলে গেছে ভালুয়া মোড়। ভালুয়া মোড় থেকে বাঁয়ে গেলে পালামৌর চান্দোয়া-টোড়ি আর ডাইনে গেলেই রাতরা।
ঝাড় লণ্ঠনের নীচে–রুপোর বাসনে– বিরাট বিরাট মাদুরের তৈরি টানাপাখার ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়ায়, মেঝেতে, রাজস্থানী কাজ-করা আসনে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে যে রাজকীয় ডিনার খেয়েছিলাম কাল রাতে, আগে তেমন কখনই খাইনি। বিষেণদেওবাবু খুব যত্ন করে আমাদের খাওয়ালেন। ভানুপ্রতাপ ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। বিষেণদেওবাবু বললেন, ভানুটা এখনও এক্কেবারে ছেলেমানুষ। দিনভর রোদে রোদে কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়। আপনাদেরও গাড়িতে আসার কথা; কখন আসবেন ঠিক কি? তাই আমিই বললাম, শুয়ে পড়তে। আমার জঙ্গলে এত শিকার। শিকারও খেলে না ও। বিষেণদেওবাবুর গলায় দুঃখের ছোঁয়া লাগল।
–শিকার? আমি চোখ বড় বড় করে বলেছিলাম।
জী-হাঁ! বিষেণদেওবাবু বলেছিলেন।
ঋজুদা আমার দিকে ফিরে বলেছিল, জী একদ্দম না! শিকারের নামগন্ধও নয়।
বিষেণদেওবাবু বললেন, ঈ কোঈ বাত হুয়া! আমার জমিদারীতে আপনি এলেন, একদিনও শিকার খেলবেন না? ভানু ত’ আপনারা আসবেন শুনে খুব খুশী। ইন্তেজাম করে রাখা হয়েছে।
ঋজুদা ওঁকে নিরস্ত করে বললেন, খেলব না বলেই ইচ্ছে করেই আমরা বন্দুক-রাইফেল পর্যন্ত আনিনি।
উনি বললেন, বন্দুক রাইফেল কা কোঈ কমী ব্যায় হামারা মুলিমালোয়াঁমে? কাল সকালে আমাদের বন্দুক-রাইফেলের কালেকশান দেখাব আপনাদের। যা আছে, তা দিয়ে একটা যুদ্ধ লড়া যায়।
ঋজুদা আবারও বলেছিলো, আপনার আর্মারী দেখতে দোষ নেই। নিশ্চয়ই দেখব। কিন্তু ঐ খালি দেখাই। শিকারের কথা একেবারেই নয়। তাছাড়া সত্যি কথা বলতে কি, শিকার ছেড়েও দিয়েছি আমি বহুদিন।
উনি বললেন, এটা ত আমারই রাজত্ব। এখানের রাজা আমি। এখানে অন্য কারোই আইন-কানুন চলে না। ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের আমলেও চলেনি, এ গভর্নমেন্টের আমলেও চলবে না। আমাদের আইন এখনও আমরাই বানাই। আমরাই ভাঙি।
ঋজুদা আর কিছু বলেনি। ওয়ার্লড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের হোমরা-চোমরারা ঋজুদাকে চিফ গেম-ওয়ার্ডেন বানানোর জন্যে ওয়েস্ট বেঙ্গল গভর্নমেন্টের চিফ কনসার্ভেটরকে লিখেছেন। ঋজুদার বিপদটা আমি বিলক্ষণ বুঝতে পারছি। কিন্তু বিপদ ঋজুদার। আমার ত’ নয়। আমি মনে মনে নেচে উঠেছিলাম। একদিন শিকার করলে এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? তাছাড়া, বিষেণদেওবাবু আর ভানুপ্রতাপ নিশ্চয়ই পট-হান্টিং করেন। স্রেফ, নিজেদের খাওয়ার জন্যেই সামান্য কিছু…..।
বিষেণদেওবাবু হাসিহাসি মুখ করে ঋজুদার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, আপনাকে এমন একটা খবর দেবো এখন যে, শুনে আপনার তাক লেগে যাবে। শুনলেই রাইফেল তুলে নেবেন হাতে।
–কি খবর? ঋজুদা এমন ভাবে বলল যেন উত্তেজনাকর কিছু শুনতেই চায় না।
বিষেণদেওবাবুর হাসিটা প্রথমে দু চোখের মণিতে ঝিলিক মারল, তারপর তাঁর তেল চুকচুক ফর্সা গালে পিছলে গেল, এবং তারপরই তাঁর সারা শরীরে ঝাঁকুনী তুলল।
হাসি থামলে, বিষেণদেওবাবু বললেন, অ্যালবিনো!
অ্যালবিনো? টাইগার। বলেন কি?
জী হাঁ। হাসতে হাসতে বিষেণদেওবাবু বললেন। তারপর বললেন, মামুলী কোনো শিকারের দাওয়াত দিচ্ছি না আপনাকে। আ চান্স ইন আ লাইফ-টাইম। সারা পৃথিবীতে অ্যালবিনো ট্রোফি কতজনের আছে ঋজুবাবু? আপনিই বলুন।
অ্যালবিনোর কথা শুনে লজেন্স খেতে মানা বাচ্চা ছেলেকে লজেন্স দিলে তার মুখের ভাব যে রকম হয়, ঋজুদার মুখের ভাবও তেমন হল। মজা লাগল দেখে।
জব্বর তীর ছুঁড়লেন একখানা বিষেণদেওবাবু এবং ঋজুদা সেই তীরে বিদ্ধ হলো।
প্রথমত, অ্যালবিনো ব্যাপারটা আমি বুঝলাম না। দ্বিতীয়ত, বিষেণদেওবাবু আফ্রিকা-ফেরত, ওয়াণ্ডারাবো এক্সপার্ট আমা-হেন একজন তালেবর ব্যক্তিকে মোটে মানুষ বলেই গণ্য করছেন না দেখে লোকটার উপর ভীষণ বিরক্ত হলাম আমি। বিরক্ত হলাম বলেই অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রইলাম।
শুতে যাওয়ার আগে ঋজুদা বলছিল, মালোয়াঁ-মহলের বাসিন্দা রাজা বিষেণদেও সিং ও তার ভাগ্নে ভানুপ্রতাপ। মাত্র এই দুজন। লোক দুজন হলে কি হয়? চাকর, বেয়ারা, দারোয়ান, খিদমদমার একেবারে গিসগিস করছে। জমিদারী চলে গেলেও এঁদের সচ্ছলতার কোনোই হেরফের হয়নি। কারণ জমিদারী থাকতে থাকতেই এঁরা কোডারমা ঝুমরীতিলাইয়া অঞ্চলে বেশ কিছু মাইকা মাইনস্ কিনে ফেলেছিলেন। বিষেণদেওবাবু আর তার ভগ্নীপতি মানে ভানুপ্রতাপের বাবা মিলে। খনিগুলো বিশ্বাসী ম্যানেজারেরা দেখাশুনা করেন। গত কয়েক বছরে মাইকা এক্সপোর্ট করে এঁরা কোটিপতি হয়ে গেছেন। মাসে এক দুবার গিয়ে অভ্র খনিগুলো দেখাশোনা করে আসেন বিষেণদেও। ভানুপ্রতাপ লানডান পড়তে গেছিল। কিন্তু পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে গত চার মাসের উপর এখানেই মামার কাছে এসে আছে। ভানুপ্রতাপও উত্তর প্রদেশের খুব অবস্থাপন্ন পরিবারের লোক।
কী একটা পাখি ডাকছে বাঁ দিকের জঙ্গল থেকে। কী পাখি তা দেখার জন্যে পথ ছেড়ে আস্তে আস্তে ঢুকে গেলাম জঙ্গলে। আহা! দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। কী সুন্দর যে পাখিটা! এই পাখি আমি কখনও দেখিনি আগে। বাড়ি ফিরে সালিম আলীর বই দেখতে হবে। গাঢ় লালের মধ্যে ফিকে হলদ। গলার স্বর সাঁওতাল ছেলের বাঁশীর মত মিষ্টি।
কাল মাঝরাতে এখানে বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশে এখনও মেঘ। গরম একেবারেই নেই। বেশ একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব। ঋজুদা ঠিকই বলেছলি। ঝির ঝির করে হাওয়া দিচ্ছে। বাঁশ পাতায়, শালের বনে, লিটপিটিয়া, রাহেলাওলা, জীরহুল আর ফুলদাওয়াইর ঝাড়ে-ঝাড়ে যে এই বিবশ বিবাগী হাওয়া ফিসফিস করে কত কী কথাই বলে যাচ্ছে।
দূরাগত একটা গাড়ির এঞ্জিনের শব্দ কানে এলো। ঋজুদা কি আমাকে ফেলে কোথাও চলল একা একা? ভারী খারাপ ত’। কিন্তু ভাল করে শুনেই বুঝলাম, এঞ্জিনের আওয়াজটা ফিয়াট গাড়ির নয়। তবে এ্যাম্বাসাডর বা জীপেরও নয়। যতক্ষণে জঙ্গলের ভিতর থেকে আমি আবার লাল মাটির চওড়া পথটাতে এসে পৌঁছেছি, ততক্ষণে গাড়িটাও এসে পৌঁছে গেল কাছাকাছি।
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম এই গভীর জঙ্গলে একটা আকাশী-নীলরঙা বিদেশী টুওরার গাড়ি দেখে। গাড়িটা একেবারে আমার কাছে এসেই থেমে গেল, লাল ধুলোর হালকা মেঘে জায়গাটা ঢেকে দিয়ে। গাড়ির স্টিয়ারিং হেড়ে দরজা খুলে একজন ইয়াংম্যান লাফিয়ে নামলেন। বয়স এই কুড়িবাইশ হবে। লম্বা, ফর্সা, কাটাকাটা চোখ মুখ নাক। সরু একজোড়া প্রজাপতি-গোঁফ। খুব সুন্দর চেহারা, কিন্তু চোখের নীচে কালি, বড় ক্লান্তি সারা মুখে।
গাড়ি থেকে নেমেই, আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, হাই!
আমিও বললাম, হাই। ইয়াংম্যান নিজের পরিচয় দিলেন।
বললেন, আমারই নাম ভানুপ্রতাপ সিং। সরি, কাল ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মামাবাবুর কাছ থেকে আপনারা আসবেন এ খবর শুনেছি অনেকদিন হল। এত্বদিনে এলেন।
তারপর আমার উত্তরের অপেক্ষা না করেই বললেন, আমি একটু যাচ্ছি গীমারীয়াতে। উঠে পড়ন ভাইসাব। ঘুরে আসি। কখনও দ্যাখেননি ত গীমারীয়া?
ভানুপ্রতাপের অমায়িক সরল ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আমার নিজের এরকম একটা গাড়ি থাকলে আমার মত যার-তার সঙ্গে কথাই বলতাম না আমি।
উনি আবার বললেন, কি হল? যাবেন না?
বললাম, না, যাব। কিন্তু ঋজুদা?
আরে উনি এখন মামাবাবুর সঙ্গে গল্পে মশগুল। চলুন না, যাব, আর আসব।
গাড়িতে ঢুকতেই একটা গন্ধ নাকে এল।
আমাকে নাক টানতে দেখেই উনি বললেন, ঈত্বর। খসস ঈত্বর স্প্রে করাই আমি আমার গাড়িতে। গরমে খসস আর শীতে অম্বর।
আতরের গন্ধ ছাপিয়ে একটা বোঁটকা গন্ধ নাকে আসতে লাগল আমার। গন্ধটা যে ঠিক কিসের বুঝতে পারলাম না। কিন্তু আতরের গন্ধও সেই গন্ধটাকে চাপা দিতে পারেনি পুরোপুরি।
সামনের সীটে ওঁর পাশেই উঠে বসলাম। গাড়ি স্টার্ট করার আগে, রুপোর ফ্লাস্ক থেকে জল ঢেলে উনি পকেট থেকে দুটো বড়ি ফেললেন মুখে।
জিজ্ঞেস করলাম, শরীর খারাপ?
–না ত’!
তবে?
–ও আমি খাই। এমনিই খাই।
তারপর আমার দিকে ফিরে হেসে বললেন, নেশা।
নেশা? তাহলে গাড়ি চালাবেন কি করে?
ভানুপ্রতাপ হাসলেন। বললেন, না খেলেই বরং চালাতে পারি না। আদত্ বৈঠ গ্যয়া।
একটু থেমে বললেন, আমার মামাবাবুই নেশাটা ধরিয়েছেন বলতে গেলে।
সে কি? আমি অবাক হয়ে বললাম।
ভানুপ্রতাপ বললেন, আমার বাবা এবং মায়ের মৃত্যুটা এতই হঠাৎ হল যে, সেই ধাক্কাটা সামলেই উঠতে পারছি না, পারিনি এখনও। হয়ত পারবো না কখনও। আগে ত’ রাতে একেবারেই ঘুম হতো না। মামাবাবু বলতেন, রাতে ঘুম না হলে মানুষ বাঁচে কখনও? রাতের ঘুমের জন্যে ওষুধ খাওয়াটা দোষের নয়। সেই যে শুরু হল, এখন মুঠো মুঠো খাই। হরওয়াক্ত। ঘুমুবার জন্যে নয়–খেতে ভালো লাগে বলে। না-খেলেই বরং ঘুম পায়। গা ম্যাজম্যাজ করে।
মনে হল ঋজুদার কাছে যেন শুনেছিলাম যে ভানুপ্রতাপ লানডান থেকেই এই নেশা সঙ্গে করে এনেছেন। কিন্তু ভানুপ্রতাপ নিজে অন্য কথা বলছেন!
দেখে বললাম, অবাক কাণ্ড! মামাবাবুর ত’ এর জন্যে আপনার উপর রাগই করা উচিত!
না, না! এমন মামা হয় না। তাছাড়া, উনি ছাড়া এখন ত’ আমার কেউই নেই। উনিই হয়ত রাগ করতে চাইলেও আমার উপর রাগ করতে পারেন না। আমার বাবাকে হারিয়েছিলাম তিনমাস আগে। মা-ও গেছেন দুমাস হলো। এখন উনিই আমার মা বাবা সব। কী যে হয়ে গেল।
বেচ্চারা! আমি ভাবলাম।
গাড়ি চলছিল।
গাড়ি চলছিল গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। সামনে দিয়ে একদল ময়ূর রাস্তা পার হলো। তারপর পার হলো বাঁদরের একটি পুরো পরিবার। বোধহয় তিনপুরুষ।
আমি ভানুপ্রতাপের দিকে তাকালাম। একটা জিন-এর শর্ট আর গায়ে টেনিস খেলার হলুদ-রঙা ফ্রে-পেরী গেঞ্জী। পায়ে হালকা রাবার সোলের চটি। মাঝে মাঝেই রুপোর ফ্লাস্ক বাঁ হাতে তুলে ধরে জল খাচ্ছেন ডান হাত গাড়ির স্টিয়ারিং-এ রেখে। জলের সঙ্গে কিছু মেশানো আছে কি-না কে জানে?
বললাম, আপনার মামাবাবু আর ঋজুদা কি এত গল্প করছেন?
ছুলোয়া শিকার হবে। বোধহয় তারই ইন্তেজাম হচ্ছে।
সত্যি? এখানের জঙ্গলের কি কি জানোয়ার আছে? শুধোলাম আমি!
বড় জানোয়ার এখন আর তেমন নেই বললেই চলে। তবে, লেপার্ড আর ভাল্লুক অনেক আছে। চিতল আছে। শম্বর আছে। শুয়োর, শজারু, খরগোস, নেকড়ে এইই সব। একসময় এদিকে হাতী, বড় বাঘ, বাইসন, নীলগাই এসব খুবই ছিল। একেবারেই দেখা যায় না আজকাল।
আমি বললাম, বিষেণদেওবাবু নিশ্চয়ই অনেক বাঘ মেরেছেন? আর আপনি?
বড় বাঘ ত’ মামাই মেরেছেন ছত্রিশটা। আর আমি পাঁচটা। তবে, আমাদের জঙ্গলে অ্যালবিনো টাইগার এসেছে একটা। এ একটা খবরের মত খবর।
মনে মনে ভাবছিলাম, খুবই খারাপ আপনারা মামা ভাগ্নে দুজনে মিলেই ত’ বাঘের বংশ নাশ করে ফেলেছেন, অন্যদের আর কি দরকার ছিল! কথা ঘুরিয়ে বললাম, আপনার ত’ ওষুধ খাবার নেশা। বিষেণদেওবাবুর নেশা কি?
-মামাবাবুর?
বলেই, ভানুপ্রতাপ একটুক্ষণ ভাবলেন।
তারপর বললেন, কোনো নেশাই নেই। মামাবাবু ভগবান। তবে একটা নেশা আছে, যদি সেটাকে নেশা বলা যায়; সেটা টাকার নেশা। এর চেয়ে বড় নেশা আর কিছু নেই।
গীমারীয়া পৌঁছে, বি-ডি-ও-র অফিসে গিয়ে ঢুকলেন ভানুপ্রতাপ! আমাকে বসতে বললেন গাড়িতেই। অমন ঝকঝকে গাড়ি দেখে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা ছেঁকে ধরল গাড়িটাকে। এমন গাড়ি কোলকাতাতেই দেখতে পাই না আমরা ত’ এরা আর কোত্থেকে দেখবে?
একটু পর ফিরে এলেন ভানুপ্রতাপ। তারপর গাড়ি ঘুরিয়ে নিলেন মুলিমালোয়াঁর দিকে।
আমি বললাম, আপনারা ঋজুদাকে চিনলেন কি করে?
ভানুপ্রতাপ বললেন, সে মামার সঙ্গে ভাব। আমি এই প্রথম দেখলাম ওকে। কোডারমাতে মাইকা কোম্পানীর মাইকা মাইন্স আছে। রামকুমার আগরওয়ালার আমল থেকে মামাবাবুর সঙ্গে আপনার ঋজুদার আলাপ। শুনেছি, তখন রজৌলির ঘাটে আর শিঙ্গারে খুব শিকার খেলতেন দুজন একসঙ্গে। সে আজ থেকে তিরিশ বছর আগের কথা। আমরা জন্মাইওনি।
তাই বুঝি? আমি বললাম।
বাড়ির বিরাট গেটের মধ্যে গাড়ি ঢুকতেই ফটাফট সেলাম বাজতে লাগল চারপাশ থেকে। গেটের মধ্যে ঢুকেই গাড়িটা গোঁ গোঁ শব্দ করে থেমে গেল। আমরা দুজনে মুখ-চাওয়া-চাওয়ি করলাম। ভানুপ্রতাপ নেমে বনেট খুললেন। আমি গিয়ে এটা ওটা ধরে টানাটানি করতেই উনি বললেন, ছোড়ো ইয়ার। যিসকা বান্দরী, ওহি নাচায়।
আমি লজ্জা পেলাম। যিস্কা বান্দরী ওহি নাচায় মানে, যার বাঁদর সেই-ই শুধু তাকে নাচাতে পারে। ভানুপ্রতাপের গাড়ি, আমার কথা শুনবে কেন?
একটু পরই উনি স্টিয়ারিং-এ এসে আবার বসতেই গাড়ি কৈ কৈ করে কথা বলে উঠল। ভানুপ্রতাপ আমার দিকে চেয়ে হাসলেন একটু।
পোর্টিকোতে গাড়ি রাখতেই উর্দি-পরা ড্রাইভার এসে গাড়ি গ্যারাজে নিয়ে গেল। সামনে দাঁড়ানো বেয়ারাকে ভানুপ্রতাপ শুধোলেন, মামাবাবু কাঁহা?
সে বলল, মালখানায়।
ভানুপ্রতাপ আমাকে নিয়ে একতলার পিছন দিকের একটি বিরাট ঘরে গিয়ে পৌঁছলেন। পুরু কার্পেটে-মোড়া ঘর। মেঝেতে কার্পেটের উপর বসে চারজন লোক, পলিথিনের শিট বিছিয়ে বন্দুক-রাইফেলে তেল লাগাচ্ছে, ব্যারেল পরিষ্কার করছে। ঘরটা ঋজুদার পাইপের এ্যস্ফোরা তামাকের ধোঁয়ার গন্ধে ভুরভুর করছে।
আমরা ঢুকতেই বিষেণদেওবাবু বললেন, ভানু, তোর রাইফেল-বন্দুক বেছে রাখ দশেরা শিকারের জন্যে। তোর ইন্তেজাম, তুইই বেপাত্তা।
তারপর বললেন, ঋজুবাবুকে কেন দাওয়াত দিয়ে আনিয়েছি আমরা সে কথা ভাল করে জানিয়ে দে।
ভানুপ্রতাপ কাচের আলমারী খুলে সারসার রাইফেল-বন্দুকের দিকে চোখ রেখে অন্যমনস্ক গলায় বললেন, তুমি বলোনি?
বলিনি যে তা নয়, মুলিমালোয়াঁর জঙ্গলে একটা অ্যালবিনো বাঘ এসেছে শুধু এইটুকুই বলেছি।
ঋজুদা বলল, সত্যি আশ্চর্য বিষেণদেওবাবু। সেদিন গ্রান্ড হোটেলে আপনার সঙ্গে হঠাৎ যখন দেখা হয়ে গেল তখন ত’ আমাকে কিছুই বলেননি। শুধু বলেছিলেন, মুলিমালোয়াঁতে এসে কদিন থাকলে চুপচাপ, শরীর একদম সেরে যাবে। পায়ের চোটের কথাও ভুলে যাবেন।
বিষেণদেও সিং হাসলেন।
বললেন, তখন কি আমি নিজেও জানতাম অ্যালবিনোর কথা?
বিষেণদেওবাবুকে বললাম, অ্যালবিনো বাঘ কিরকম দেখতে হয়?
উনি বললেন, অ্যালবিনো শব্দটি এসেছে লাতিন অ্যালবাস শব্দ থেকে। অ্যালবাস বা অ্যালবিনো মানে হচ্ছে সাদা। হলুদ, লাল, বাদামী অথবা কালো রঙের অনুপস্থিতিতে কোনো কোনো জানোয়ারের রঙ সাদা হয়ে যায়। এ সব জানোয়ারের পক্ষে তাদের স্বাভাবিক পটভূমিতে বেঁচে থাকা কঠিন হয় কারণ তাদের ক্যামোফ্লেজ করার ক্ষমতা থাকে না। অন্যান্য রঙের অনুপস্থিতির কারণ অনেক, সে সম্বন্ধে জ্ঞানের তোমার আপাতত প্রয়োজন নেই। অ্যালবিনিজম্ একটি রোগ। মানুষের মধ্যেও যেমন শ্বেতী একটি রোগ, জানোয়ারদের মধ্যেও তাই। তবে মানুষের অ্যালবিনিজ হয় মেলানিন্-এর অনুপস্থিতিতে। ঘোড়া, কাক, এবং আরো নানা জানোয়ার এবং পাখিকে অ্যালবিনো হতে দেখা যায়। অ্যালবিনো বাঘের প্রজন্ম নানা চিড়িয়াখানাতে এবং ব্যক্তিবিশেষের তত্ত্বাবধানেও গড়ে উঠছে আজকাল। তবে, জংলী বাঘের মধ্যে অ্যালবিনো এখনও অতি দুর্লভ। এবং যুগযুগান্ত থেকে শিকারীদের কাছে অ্যালবিনো বাঘের আকর্ষণ যে অত্যন্ত তীব্র একথা শিকারিমাত্রই জানেন। তবে, মুলিমালোঁয়ার অ্যালবিনো এখন কার গুলি খেয়ে মরবে, তা একমাত্র বজরঙ্গবলীই বলতে পারেন।
ছোটু! ভানুপ্রতাপ ডাকলেন।
ছোটু বলে একটি পনেরো-ষোলো বছরের সাদা পোশাক পরা খুব স্মার্ট সুশ্রী বেয়ারা ঘরে এলো। মনে হল, এই ভানুপ্রতাপের খাস্ বেয়ারা।
ভানুপ্রতাপ যেন গররাজী হয়ে বললেন, টুয়েলভ বোর ওভার-আন্ডারটা বের কর।
কোনটা হুজৌর? ব্যারেটাটা?
হ্যা। ব্যারেটাটা।
বিষেণদেওবাবু বললেন, আমি ভাবছি প্যারাডক্সটা নেব। বলে, নিজেই আলমারী থেকে বের করলেন, টেনে। তার আগে কখনও প্যারাডক্স দেখিনি আমি। হাতে নিয়ে একটু নেড়ে-চেড়ে দেখলাম। জীবন সার্থক হল। প্যারাডক্স হচ্ছে এক মজার বন্দুক-কাম রাইফেল। দেখতে, শটগানের মত কিন্তু দু ব্যারেলেরই শেষের কিছুটা জায়গাতে গ্রুভ কাটা থাকে। বুলেট ফায়ার করলে, তার রেঞ্জ বেড়ে যায়, ভেলোসিটি বেড়ে যায় তাই অনেক দূর অবধি গুলি পৌঁছয়। প্যারাডক্সের গুলিও আলাদা। দারুণ জিনিস।
ঋজুদা বলল, রুদ্র, তুই কি নিবি?
আমি যেন খুবই নিরুৎসাহ হয়েছি এমন মুখ করে বললাম, আমাকে একটা শটগানই দাও।
কত বোরের? টুয়েলভ বোর?
হ্যাঁ।
কি বন্দুক নিবি বল? দ্যা এখানে পৃথিবীর সব বাঘা-বাঘা বন্দুকের গাদা। চার্চিল, জেমস্ পার্ডি, গ্রীনার; যা চাস্। ইটস্ ফর ইওর আস্কিং।
আমি বললাম, বত্রিশ-ইঞ্চি ব্যারেলের কিছু আছে?
আছে। বিষেণদেওবাবু বললেন।
তারপর বললেন, তুমি তাহলে গ্রীনারই নাও।
ভানুপ্রতাপ হঠাৎ বললেন, মামাবাবু বাঘটা তুমি নিজে দেখেছো?
নিজে দেখিনি। তবে, বাঘটা পুরুষ। মনে হয়, সাড়ে-ন’ফিট পৌনে-দশ ফিট মত হবে।
ওভার দ্যা কার্ভস না বিটুইন পেগস? আমি বললাম, ওঁদের মুখের কথা কেড়ে। পাণ্ডিত্য দেখাতে গিয়ে। ঋজুদা আর বিষেণদেওবাবু ত’ হাসলেনই এমনকি ভানুপ্রতাপও হেসে উঠলেন আমার কথা শুনে।
ঋজুদা বলল, বাঘ মারা পড়লে তখনই মেপে দেখা যাবে। বিষেণদেওবাবু ত’ আর বাঘকে দাঁড় করিয়ে টেপ দিয়ে মাপেননি। পাগ-মার্কস দেখে একটা আন্দাজ করেছেন। সেটা সবসময় এ্যাকুরেট হতে নাও পারে।
আসলে, শিকারীরা বাঘ দু’রকম করে মাপেন; মারার পর। বাঘকে লম্বা করে শুইয়ে তার মাথার কাছে একটা খোঁটা আর লেজের ডগাতে আরেকটা খোঁটা পুঁতে তার দৈর্ঘ্যের মাপকে বলে, বিটুইন দ্যা পেগস্। আর নাকের ডগা থেকে শুরু করে বাঘের গায়ের উপর দিয়ে মাপবার ফিতেকে গায়ের সঙ্গে লাগিয়ে লেজের ডগা অবধি নিয়ে এলে তাতে যে মাপ হয়; তাকে বলে ওভার দ্যা কাৰ্ভস্। স্বাভাবিক কারণে একই বাঘের দৈর্ঘ্য ওভার দ্যা কার্ভস্ মাপলে বিটুইন দ্যা পেগ-এর মাপের চেয়ে একটু বেশীই হয়।
বোকার মত কথা বলার আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠে আমি ঋজুদাকে বললাম, তুমি কি নেবে? রাইফেল না বন্দুক? তুমি নিশ্চয়ই রাইফেলই নেবে?
ঋজুদা বলল, নাঃ। ভাবছি, বন্দুকই নেবো ফর আ চেঞ্জ। বুঝলি।
তারপর বিষেণদেওবাবুকে বলল, সবচেয়ে ছোট ব্যারেলের শটগান কি আছে আপনার কাছে? টুয়েলভ বোরের?
বিষেণদেওবাবু বললেন, স্কিট গান আছে। একেবারে চব্বিশ-ইঞ্চি ব্যারেলের। ইটালিয়ান, ব্যারেটা। ডাবল ব্যারেল।
ঋজুদা বলল, তাহলে আমি ঐটাই নেবো। মাচায় বসে ছোট্ট ব্যারেলের বন্দুক ম্যানুভার করাই সোজা।
মনে মনে ভাবছিলাম, কোলকাতার বাইরে বেরোলেই ঋজুদার কোমরে সবসময় যে পয়েন্ট-থ্রি-সেভেনটিন্ এ্যামেরিকান কোলট পিস্তলটা বেলটের সঙ্গে বাঁধা থাকে, কাছ থেকে তারই এক ঘা কানে-মাথায় ঠুকে দিতে পারলে বাঘ বাবাজীর আর দেখতে হবে না। বাবা গো বলে ঐখানেই পটকে যাবে। তবে, আমি এমনি বাঘের কথা বলতে পারি। এমন সাহেব বাঘ ত’ কখনও দেখিনি।
বিষেণদেওবাবু বললেন, চলুন চলুন নাস্তা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো বোধহয় এতক্ষণে। চল্ ভানু!
আমরা সকলে খাওয়ার ঘরে এলাম। মহারাজ গরম গরম খাঁটি ঘিয়ে ভাজা পরোটা ভেজে দিতে লাগল। সঙ্গে আলুভাজা, শজারুর চচ্চড়ি, তিতিরের বটিকাবাব, বটেরের রোস্ট আর কমপক্ষে দশ রকমের আচার। চারজন খেতে বসেছি, চারজন লোক সার্ভ করছে। সে এক এলাহী কাণ্ড!
ঐসব শেষ করার পর, এলো বেনারসী প্যাঁড়া আর বেনারসী রাবড়ি।
ঋজুদা বিষেণদেওবাবুকে বললেন, মশায়, আপনার মতলব ত’ কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাকে আর রুদ্রকে কালকেই শুইয়ে ফেলে ওভার দ্যা কাৰ্ভস্ মাপবেন নাকি? এমন করে খেয়ে মরার চেয়ে ত’ গুলী খেয়ে মরাও ঢের ভালো ছিল, যদিও গুল্লী মোটেই সুখাদ্যর মধ্যে গণ্য নয়।
বিষেণদেওবাবুকে তাঁর ভীষণ ফর্সা মুখ আর সাদা-পাকা গোঁফে যেন অ্যালবিনো বাঘের মতই দেখাচ্ছিল। হেসে উঠলেন বাঘের মতই।
তারপর বললেন, কি যে বলেন ঋজুবাবু! এলেন এই প্রথমবার আমার গরীবখানায়–অথচ এত বছরের জান-পহচান, সামান্য খাতির যত্নও একটু….
আসলে ঋজুদা আমার চেয়েও বেশী পেটুক আর ভোজনরসিক। কিন্তু ভাবটা এমন দেখায়, যেন আলু পোস্ত আর কড়াই ডাল হলেই ত চলে যেত, এত আর কেন?
ভানুপ্রতাপ খুবই কম খায়। একটু পরোটা আর কালিতিতিরের কাবাব নিয়ে দু আঙুলে নাড়াচাড়া করছিলেন উনি।
একটা ব্যাপার লক্ষ করছিলাম। উনি সব সময়ই কেমন অন্যমনস্ক। সব সময়ই ওষুধ খেলে, না হওয়াটাই আশ্চর্য অবশ্য।
তা বেনারসী প্যাঁড়া আর রাবড়ি পেলেন কোথায়? ঋজুদা শুধোল।
বিষেণদেওবাবু হেসেই বললেন, ভানুর একজন লোক এসেছে আজই বেনারস থেকে। ঠিক বেনারস নয়, বেনারসের কাছেই, ভানুর জমিদারী থেকে।
ভানুপ্রতাপ কথাটা শুনেই চমকে উঠল হঠাৎ। এদিক ওদিক তাকাতে লাগল। বলল, কে এসেছে? মামা? কে এসেছে?
বিষেণদেওবাবু ভানুপ্রতাপের দিকে একঝলক চাইলেন।
তারপর বললেন, তোদের ব্রিজনন্দন এসেছে রে আজ সকালে।
ভানুপ্রতাপ মুখ তুলে বলল, ব্রিজনন্দন? কেন? হঠাৎ?
এই রাবড়ি-টাবড়ি নিয়ে এল। আর তোদের জমিদারীর হিসেবনিকেশ।
ভানুপ্রতাপ মামাবাবুর মুখের দিকে চেয়ে কি বলতে গেলেন। কিন্তু কিছু বলার আগেই বিষেণদেওবাবু হাঁক পাড়লেন, কোঈ হ্যায়?
জী হুজৌর।
বলে, একজন বেয়ারা বাইরে থেকে দৌড়ে এল।
বিষেণদেওবাবু বললেন, ব্রিজনন্দনকো বোলাও।
ভানুপ্রতাপ হঠাৎ উঠে পড়ে, আমাদের সকলের কাছে অনুমতি নিয়ে চলে গেলেন।
একটু পর যে-লোকটি ঘরে এসে ঢুকল তাকে দেখেই আমার ভয় লেগে গেল। আফ্রিকার সেরেঙ্গেটির নাইরোবী সর্দারকে রাতের বেলা দেখেও আমার এত ভয় লাগেনি। লোকটা লম্বা নয়, বরং বেঁটেই। কিন্তু অসুরের মত চেহারা–দেখলেই মনে হয়, নিয়মিত কুন্তী-টুস্তী লড়ে। গলায় সোনার চেনের সঙ্গে বাঁধা একটা সোনার তাবিজ। তিন-চারটে দাঁত সোনা দিয়ে বাঁধানো। মাথার সামনে চুল কম, কিন্তু কদমছাঁট। পরনে মিলের মিহি পা-দেখা-যাওয়া ধুতি আর গোলাপি রঙের টেরিলীনের পাঞ্জাবী। পাঞ্জাবীর হাতা গোটানো। বাঁ-হাতে একটা সোনার রোলেক্স ঘড়ি। আসবার সময় সে জুতো খুলে ঘরে ঢুকলো বটে কিন্তু দরজার বাইরে রাখা তার লোহার নাল-লাগানো নাগরাখানির দিকে চেয়ে দেখলাম, জুতো জোড়াও দেখবারই মত।
বিষেণদেওবাবু বললেন, আমার বোন শুভাবাঈ ত’ উত্তর প্রদেশের উজজানপুরের জমিদার সুরিন্দর নারায়ণ এর স্ত্রী ছিলেন। উজানপুর বেনারসের কাছেই। তা ভগ্নীপতি, সুরিন্দার নারায়ণ মারা গেলেন ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে হঠাৎই। বোনটাও সেদিন চলে গেল আমার প্রায় হাতেরই মধ্যে এই বাড়িতেই–একটু চিকিৎসার সুযোগ দিল না। দু মাসের তফাতে দুজনে শ্মশান করে দিয়ে গেল হে। এখন আমার আঁখোকা-রোশনী এই ভানুই আছে একমাত্র। নিজে ত’ বিয়েথাও করলাম না, করার সময়ও পেলাম না। পরের সম্পত্তি সামলাতে সামলাতেই জীবন গেল। সুরিন্দারের মৃত্যুর পর শুভা একটু-আধটু দেখতে শুরু করেছিল ওর জমিদারীর কাজ। ভানু ত’ চিরদিনই মনমৌজী ছেলে। ওকে দিয়ে……।
ওখানে খুব ভাল আখ হয়। এ ওদের সুগার মিলের সঙ্গে বছরের পর বছর কন্ট্রাক্ট করা থাকে। বাঁধা লাভ। সুরিন্দার চলে যাওয়ার পর এই ব্রিজনন্দনই ওদিকটা সামলায়। যা হয়, তাতে ভানুর আর কিছুই না থাকলেও বাকি জীবন এমন গরীবের মতই কোনোক্রমে চলে যেত। কিন্তু আমার মাইকার বিজনেসের টুয়েন্টি-ফাইভ পার্সেন্ট শেয়ারও ত’ ভানুরই এখন। আমি আর আমার ভগ্নীপতি সুরিন্দার দুজনে মিলেই মাইকা মাইনস্ সব নিয়েছিলাম। এই জঙ্গলের জমিদারীর আয় আর কতটুকু? তাও ত’ জমিদারী থাকলে, তবু কথা ছিল। বাকি জীবন এই ভানুরই জন্যে আমার এই খিদমদগারী করে যেতে হবে। ভানুটা একেবারেই ছেলেমানুষ। সম্পত্তি, ব্যবসা, এসব বোঝার চেষ্টাও নেই; এলেমও নেই। সকলকে দিয়ে সবকিছু হয়ও না। বুঝলেন ঋজুবাবু। ভানুকে বললাম, বিলেতে না গিয়ে এখানে ব্যবসা দ্যাখ। কে কার কথা শোনে? বলল, ফীজিক্স পড়বে। ফীজিক্সের যুগ নাকি এখন। খ্যয়ের! হবে হয়ত। আমি ত’ গর্তের চুহা! দুনিয়ার কোন খবরই বা রাখি।
তারপর রাবড়ি মাখিয়ে একটু পরোটা মুখে নিয়ে বিষেণদেওবাবু বললেন, কি জানি রে বাবা! কিসের যুগ তা জানি না আমার এই মুলিমালোঁয়াতে ইতিহাস থেমে রয়েছে। এখানে আমার বাপ-দাদার যুগই চলছে, চলবে।
ভানুপ্রতাপ ফিরে এসেছিলেন। দুটো বড়ি খেলেন দুধ দিয়ে তারপর মামার দিকে লজ্জা-লজ্জা মুখ করে তাকিয়ে রইলেন। কি যেন বলতেও গেলেন মামাকে, আমাদের দিকে একবার হঠাৎ তাকিয়ে।
কিন্তু কিছুই না বলে, থেমে গেলেন। মুখ নামিয়ে নিলেন।
বললেন, সত্যিই আমার এসব আসে না মামা। তুমি ত’ জানোই এসব টাকা-পয়সা ব্যবসা-ট্যাবসা আমার একেবারেই আসে না। তুমিই সব নিয়ে নাও। আমাকে শুধু হাতখরচা দিও, যখন যতটুকু যা লাগে, তাতেই আমি খুশী।
বিষেণদেওবাবু ইঙ্গিতে ব্রিজনন্দনকে চলে যেতে বললেন।
তারপরই বললেন, ন্যান্সির চিঠি পেয়েছিস্?
ভানুপ্রতাপ বিব্রত হলেন একটু। বললেন, অনেকদিন পাইনি।
বিষেণদেও সিং গর্ব গর্ব মুখ করে বললেন, ভানুর আমার অনেকই গার্লফ্রেন্ড। মেমসাহেবদের চিঠির ঠেলায় গীমারীয়ার পোস্টমাস্টার পাগল। এ হতভাগা জায়গাতে বিলেতের টিকিট লাগানো চিঠি কি এসেছে কখনও এর আগে? ভানুর দৌলতেই আসে। প্রথম এবং শেষ।
ঋজুদা বলল, কি রে রুদ্র? তোর গার্ল ফ্রেন্ডদেরও চিঠি-টিঠি দিতে বলে এসেছিস না কি?
আমি বললাম, ধ্যাৎ! কি যে বল না? আমার কোনো গার্ল ফ্রেন্ড নেই।
খুবই খারাপ কথা! শুনে দুঃখিত হলাম। ঋজুদা বলল। অস্বাস্থ্যকর কথাও বটে বাগানে ফুল নেই, পুকুরে জল নেই, তোর মত ন্যাশানাল স্কলারশিপ পাওয়া, আফ্রিকাতে এ্যাডভেঞ্চার করা হীরোরও গার্ল ফ্রেন্ড নেই।
বলেই বলল, কি হল কি দেশের মেয়েগুলোর বলুন ত দেখি বিষেণদেওবাবু?
বিষেণদেওবাবু সাদা-পাকা গোঁফের ফাঁকে আবার হেসে উঠলেন।
বললেন, রুরুদদরবাবু, তাতে দুঃখের কিছুই নেই। তুমি ত ছেলেমানুষ এখনও। এই আমারও জেনো গার্ল ফ্রেন্ড কিন্তু একজনও নেই। প্রায় চার-চারটে রুরুদদরবাবুর বয়স আমার। তবুও। হাউ স্যাড।
ওঁরা সকলেই হো হো করে হেসে উঠলেন। কিন্তু ভানুপ্রতাপ হাসলেন না।
আমিও না।
কারণ, বিষেণদেওবাবু প্রথম থেকেই আমাকে রুদ্র না বলে রুরুদদর বলে ডাকছেন।
ভানুপ্রতাপ বললেন, এক্সকিউজ মী! খেয়ে আমি আর বসতে পারি না। ঘণ্টাখানেক শুতে হবে।
ঋজুদা অবাক হয়ে চলে-যাওয়া ভানুপ্রতাপের দিকে চেয়ে বলল, ব্রেকফাস্টের পরেও? বলেন কি?
বিষেণদেওবাবু ভানুপ্রতাপ চলে-যাওয়া অবধি অপেক্ষা করে থেকে উনি চলে যেতেই স্নেহমাখা গলায় বললেন, আজকালকার ছেলে। ছেড়ে দিন ওদের কথা।
বলেই, আমার দিকে চোখ পড়তে বললেন, রুরুদদরবাবু অবশ্য একটু অন্যরকম। ব্যাপারটা কি জানেন ঋজুবাবু? আমার ত আর কেউই নেই। ছেলেটার মুখের দিকে তাকালেই শুভার মুখটা মনে পড়ে যায়। বুকের মধ্যে যেন আমার কিরকম, কিরকম করে। ঐ ত’ এই সমস্ত সাম্রাজ্যের মালিক। আমি ত’ ওর খিদমদগার মাত্র।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, আমাদের পরিবারের সকলেই দারুণ মুডি। আমিই হয়ত একমাত্র ব্যতিক্রম। ওর মায়ের দিকটাই বেশী পেয়েছে ও, বাবার দিকের চেয়ে। কথায় বলে, নরাণাং মাতুলক্রমঃ। ও এই রকমই। যা খুশী করুক। আমার চোখের সামনে থাকলেই আমি খুশী। আর কিছু চাই না। অনেকদিন বজরঙ্গবলী ওকে বাঁচিয়ে রাখুন আর কিছু চাই না।
খাওয়ার ঘরের জানালা দিয়ে বাগানে এবং বাগান ছাড়িয়ে বাইরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন বিষেণদেওবাবু।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ঋজুবাবু, এ সংসারে কিছু কিছু মানুষের ঘাড় চওড়া করে পাঠান বজরঙ্গবলী। পরের বোঝা, দায়-দায়িত্ব সব তাদেরই বইতে হয়। নাইলে, তাদের মুক্তি নেই। তাই ঝামেলা বা দায়িত্ব এড়াতে চাইলেও এড়াতে পারা সম্ভব হয়। না। জানি না, ভানু বিয়ে-টিয়ে করলে আমার কি অবস্থা হবে। আজকাল মায়ের পেটের ছোট ছোট ভাইয়েরা পর্যন্ত বেইমানী করে, বেইজ্জত করে মানুষকে, আর এ ত বোনেরই ছেলে। সবই বজরঙ্গবলীর ইচ্ছা।
বলেই, মহলের হাতার মধ্যে একটা খুব উঁচু ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ডের মাথায় এলোমেলো দামাল হাওয়ায় পতপত করে উড়তে-থাকা বীর হনুমানজীর নক্সা-তোলা একটা গাঢ় লাল নিশানের দিকে তাকালেন।
ওঁর চোখ অনুসরণ করে আমিও নিশানটার দিকে তাকিয়েছিলাম। একেই এ অঞ্চলে সকলে হনুমানঝাণ্ডা বলে। ঋজুদা বলছিল, এত বড় রাজপ্রাসাদের কম্পাউন্ডে এমন ঝাণ্ডা বড় একটা দেখেনি নাকি। এগুলো বিহারের প্রত্যেক বস্তীতেই দেখতে পাওয়া যায়।
মনে মনে নিশানটার দিকে তাকিয়ে বললাম, জয় বজরঙ্গবলীকা জয়। অ্যালবিনো যেন আমার হয়। আমার নতুন ক্লাসে প্রতিভূ বলে একটি নতুন ছেলে এসেছে, সে হায়ার সেকেন্ডারীতে টেন্থ হয়েছিল। আমার পজিশান এসেছে টুয়েন্টিফার্স্ট। খুব ডাঁট ছেলেটার। অ্যালবিনোটা মেরে ফেলি। তারপর কোলকাতা ফিরে ওকে বোঝাব যে ভালো ছেলে হতে হলে স্কোয়ার হতে হয়। সবদিকে যে ভাল, যার অনেক কিছুতে ইন্টারেস্ট আছে, সেইই আসলে ভাল। বইয়ের পোকা হয়ে শুধু পরীক্ষাতে ভালো ফল করা মানেই ভালো নয়।
তার পরমুহূর্তেই মনে হল। থাকগে। প্রতিভূকে ক্ষমাই করে দিই। বেচারা। ও কি করে জানবে, জঙ্গলের জগতের কথা, এই সব বন্দুক, রাইফেলের পিস্তল-রিভলবারের এ্যাডভেঞ্চারের এত সব কথা; অ্যালবিনো বাঘের কথা। ওর জগৎ ত’ ছোট্ট জগৎ। ক্ষমাই করে দিলাম, তাই-ই ওকে। ও কি পায়নি, পেলো না, ও তা জানেই না।
ভাগ্যিস আমার ঋজুদা ছিল।
ঋজুদা বলল, এবার রুদ্রবাবু? কি প্রোগ্রাম?
আমি বললাম, আমি এত রাবড়ি খেয়েছি যে আমার ঘুম পাচ্ছে।
ঋজুদা বলল, মার খাবি। চল্ হাঁটতে যাবি আমার সঙ্গে।
এই রোদে? বলেন কি? বিষেণদেওবাবু রুপোর দাঁত-খোঁচানী দিয়ে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন।
ঋজুদা বলল, জঙ্গলে বেড়ানোর কোনো সময় অসময় নেই। জঙ্গল, বছরের বা দিনের সবসময়ই ভাল।
বিষেণদেওবাবু বললেন, যেখানেই যান, মালোয়াঁমহলে পিছনের জঙ্গলে যাবেন না। ঐদিকে একটা পোড়োবাড়ি মত আছে। বহু বছর ওদিকে আমরা কেউই পা দিইনি। আগে আমার ঠাকুরদার নাচঘর ছিল। আয়না-ফায়না কবে ভেঙে গেছে। ইটও হয়ত খসে পড়েছে। এখন সাপেদের আড্ডা। বহুত খতরনাগ জায়গা। ওদিকে না যাওয়াই ভাল।
তারপর আমার দিকে ফিরে বললেন, কি রুরুদদরবাবু, শঙ্খচূড় সাপ জানেন ত? এক মাইল অবধি দৌড়ে গিয়ে মাথায় ছোবল মারে।
আমি বিষেণদেওবাবুর দিকে ঠাণ্ডা ক্ষমার চোখে তাকিয়ে রইলাম। মুখে কিছুই বললাম না। আফ্রিকার গাব্বুন-ভাইপার এর হাত থেকে বেঁচে ফিরে এলাম, শেষে কী-না দিশী সাপ আমার মত স্বদেশ-প্রেমিককে কামড়াবে?
ঋজুদা বলল, চল্ রুদ্র ঘুরে আসি।
বিষেণদেওবাবু বললেন, দুপুরের খানা ঠিক একটাতে। তার আগে ঘুরেফিরে চলে আসবেন। অবশ্য, আপনারা না এলে বসব না আমরা কেউই।
ঋজুদা হাসলো। বলল, নাস্তাই হজম হোক আগে। লাঞ্চের সময় কিন্তু বেশী কিছু করবেন না।
বিষেণদেওবাবু, রুপোর খোঁচানী দিয়ে এবার কান খোঁচাতে খোঁচাতে বললেন, না না, খুবই সিম্পল মেনু আজ দুপুরে। শুধু খাসীরই প্রিপারেশান।
ঋজুদা যেতে গিয়েও, থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল, কি রকম?
–এই চৌরী, পায়া, লাব্বা, চাঁব, বটি-কাবাব, গুলহার কাবাব। সঙ্গে তক্কর আর বিরিয়ানী। কাশ্মীরের পহালগাঁও থেকে জাফরান আনানো আছে, শ্রীলঙ্কা থেকে গোলমরিচ আর পাটনা থেকে লাজোয়াব বাবুর্চী।
ঋজুদা বলল, শুনে জিভে জল আসছে আমার। কিন্তু এতগুলো পদের মধ্যে মধ্যে কিছু হজমী টজমী রাখেননি? নইলে খাসী যে পেটে গিয়ে লাথি ছুঁড়বে!
জী হাঁ। তাও রেখেছি। বললেন, বিষেণদেওবাবু। নিম্বু পানি আর হামর্দদ দাওয়া কোম্পানীর পাচনল ট্যাবলেট। ঐসব চলবে, আফটার ইচ্ কোর্স।
তারপর বললেন, আপলোগ ইতমিনানসে ঘুমঘামকে আইয়ে। খানা এ্যাইসা বন্ রহা হ্যায় কি মেরী মেহেমানোঁকো মজা আ জায়গা।
ঋজুদা বলল, আপনার মত রহিস্ আদমী মেলা ভার।
বিষেণদেওবাবু হাত জোড় করে বললেন, আমি কেউ নই। সবই বজরঙ্গবলীর দয়া। তিনিই সব। আমি তাঁর খিদমদগার মাত্র।
