একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(২০)

কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাট থেকে বাড়িতে ফিরতে-ফিরতে বারোটা। আজ আপিসে যাব না, হাতে তেমন-কিছু জরুরি কাজও নেই। দুপুরে তাই একটু ঘুমিয়ে নেওয়া গেল। ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সাড়ে চারটে। তাও ভাঙত না, যদি না বাসন্তী এসে ধাক্কা মেরে তুলে দিত। বলল, “কত আর ঘুমুবে! ওদিকে সদানন্দবাবু যে বৈঠকখানা ঘরে সেই চারটে থেকেই বসে আছেন! তাড়াতাড়ি উঠে চোখমুখ ধুয়ে চা খেয়ে নাও!”

 

“সদানন্দবাবুকে চা দিয়েছ?”

 

“উনি বাড়ি থেকেই চা খেয়ে বেরিয়েছেন। এখন আর খাবেন না।” বাসন্তী বলল, “উনি তো আর তোমার মতো নন যে, ঘন্টায় ঘন্টায় চা গিলবেন!”

 

কথা না বাড়িয়ে মুখ-হাত ধুয়ে, চা খেয়ে, জামাকাপড় পালটে, বসবার ঘরে চলে এলুম। সকালবেলার কাগজগুলোই সদানন্দবাবু ফের উলটে-পালটে দেখে নিচ্ছিলেন, আমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে সেগুলো ভাঁজ করে যথাস্থানে রেখে দিয়ে বললেন, “বুজলেন কিনা, এখন হয়েচে আঠারো দুগুণে ছত্রিশ মাসে বছর। দেশটা একেবারে উচ্ছন্নে গেল!”

 

আমি বললুম, “অ্যাঁ?”

 

“তা হলে শুনুন।” সদানন্দবাবু বললেন, “সেদিন একজনের আপিসে যাবার দরকার হয়েছিল। তা এগারোটার সময়ে সেখেনে গিয়ে দেকি…কী দেকলুম ভাবতে পারেন?”

 

“কী দেখলেন?”

 

“দেকলুম যে, অত বেলাতেও চেয়ার-টেবিল সব খাঁ-খাঁ করচে, কেউ আপিসে আসেনি। বেয়ারাটাও নবাবপুত্তুর, সে-ব্যাটা টুলে বসে ঘুমুচ্ছিল। তা ঘুম থেকে ঠেলেঠুলে তুলে দিয়ে যেই না তাকে জিজ্ঞস করেচি যে, বাবুরা কখন আপিসে আসবেন, অমনি সে একেবারে খ্যাঁক করে উঠল ভাবতে পারেন?”

 

বলতে যাচ্ছিলুম যে, তা কেন পারব না, কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দিলে খ্যাঁক করে ওঠাই তো স্বাভাবিক, লোকটি যে আপনাকে কামড়ে দেয়নি এই যথেষ্ট! কিন্তু তা আর বলা হল না, তার আগেই হর্ন বেজে উঠল। আমরাও আর দেরি না-করে নীচে নেমে ভাদুড়িমশাইয়ের গাড়িতে উঠে পড়লুম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম ঠিক সওয়া পাঁচটাই বাজে। ভদ্রলোক একেবারে কাঁটায়-কাঁটায় এসে গিয়েছেন।

 

পপলার অ্যাভিনিউয়েও পৌঁছলুম ঠিক ছ’টাতেই। আমরা যে ছ’টায় আসব, মিসেস ঘোষ সে-কথা দরোয়ানকে অগ্রিম জানিয়ে রেখেছিলেন নিশ্চয়, কেননা দরোয়ান একেবারে সঙ্গে-সঙ্গে গেট খুলে দিয়ে আমাদের ভিতরে নিয়ে গিয়ে সেই ড্রয়িংরুমে বসিয়ে দিল।

 

ফুলকুমারী ঘোষ যে তক্ষুনি নীচে নামলেন, তা অবশ্য নয়। তিনি এসে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন তা প্রায় মিনিট দশ-পনেরো বাদে। ভাদুড়িমশাই বলেছিলেন, আমরা সিকিমে গিয়েছিলুম বলে ভদ্রমহিলা নাকি একটু উত্তেজিত হয়েছেন। তাঁর মুখেচোখে অবশ্য তেমন কোনও উত্তেজনার ছাপ দেখতে পেলুম না। ঘরে ঢুকে সামান্য হেসে আমাদের নমস্কার করে বললেন, “কিছু মনে করবেন না, একটু বসিয়ে রাখতে হল। আসলে বিকেলবেলাতেও আমাদের ঠাকুরঘরের কিছু কাজ থাকে, সে-সব শেষ না করে নীচে নামি না তো, তাই একটু দেরি হয়ে গেছে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তেমন কিছু দেরি তো হয়নি। না না, ও নিয়ে ভাববেন না। কিন্তু আমরা যে সিকিমে গিয়েছিলুম, এই খবরটা আপনি পেলেন কোথায়?”

 

হঠাৎই কি পালটে গেল ফুলকুমারীর মুখ? তাঁর চোখ দুটি কি হঠাৎই একবার জ্বলে উঠল? কিংবা, কে জানে, এটা আমার দেখার ভুলও হতে পারে। কেননা, তাঁর গলার স্বর দেখলুম একটুও পাল্টায়নি। ঠিক আগের মতোই সামান্য হেসে খুবই শান্ত গলায় তিনি বললেন, “খবর কোথায় পেলুম, তা কি আর বলব না? নিশ্চয় বলব। বিশ্বাস করে যখন একটা কাজের ভার আপনাকে দিয়েছি, তখন তো বলতেই হবে। কিন্তু আপনারও তো সব কথা আমাকে খুলে বলা উচিত। আপনারা ওখানে গিয়েছিলেন কেন?”

 

উত্তর না-দিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “আপনি আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেটা আমি ফিরিয়ে দিচ্ছি। আপনার কাজ আমি করব না।”

 

মিসেস ঘোষ বললেন, “কিন্তু এই কাজের পিছনে তো এরই মধ্যে বেশ কিছু খর্চা হয়ে গেছে আপনার। তিনজনে মিলে বাই এয়ার সিকিমে গেলেন এলেন, তা ছাড়া গাড়ি আর হোটেলের খর্চাও তো কম হয়নি। তা এখন মাঝপথে যদি কাজ ছেড়ে দেন তো সে-টাকা আমি দেব কেন?”

 

“টাকা তো আমি চাইনি।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কাজ শেষ না-করে আমি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে এক পয়সাও নিই না।”

 

একেবারে স্থির চোখে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন মিসেস ঘোষ। তারপর বললেন, “দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তো কথা হয় না। আপনি বসুন। বসে আমাকে বুঝিয়ে বলুন যে, কাজটা কেন ছেড়ে দিচ্ছেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বসলেন। বললেন, “আমাকে দিয়ে কাজ করানোর কিছু শর্ত থাকে। প্রথম শর্ত, আমি যে-ভাবে ভাল বুঝব, সেইভাবে কাজ করব। তা নিয়ে আমাকে কোনও প্রশ্ন করা চলবে না। কেন এটা করলুম, কেন ওটা করলুম, ইচ্ছে হলে ক্লায়েন্টকে তা আমি বলব, ইচ্ছে না-হলে বলব না। কিন্তু ক্লায়েন্ট যেন ধরে না নেন যে, টাকা দিচ্ছেন বলেই তিনি আমার মাথা কিনে নিয়েছেন আর প্রতিটি কাজের জন্যে তাঁর কাছে আমি জবাবদিহি করতে বাধ্য। না, আমি বাধ্য নই। ফোনে সে-কথা আমি আপনাকে জানিয়েছিও। কিন্তু এই শর্তটা আপনি মানেননি।”

 

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বার করলেন। কিন্তু সিগারেটটা তক্ষুনি ধরালেন না।

 

মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনি স্বচ্ছন্দে সিগারেট খেতে পারেন। আমার অসুবিধে হবে না।”

 

সিগারেট ধরিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে, এতই যখন আপনি জানতে চাইছেন, তখন আপনাকে সবই জানাব। তবে তার আগে আপনাকে বলতে হবে যে, আমাদের সিকিম যাওয়ার খবরটা আপনাকে কে দিল।”

 

ফুলকুমারী ঘোষ বললেন, “গঙ্গাধর চামলিন দিয়েছেন। তা ছাড়া তেজবাহাদুরও ফোন করেছিল। সে যা বলল, তাতে মনে হচ্ছে যে, গত বুধবার আপনারাই তার কাছে গিয়েছিলেন। তেজ আমার দিদির ছেলে। দিদি তো বিয়ে করেনি, বাচ্চা-বয়সে ওকে অ্যাডপ্‌ট করেছিল।”

 

“জানি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটা আমরা মিঃ চামলিনের কাছেই শুনেছি। তো ঠিক আছে, এবারে আপনিও শুনুন যে, হঠাৎ আমাদের সিকিমে যাবার দরকার হয়েছিল কেন। স্রেফ এইজন্যে যেতে হয়েছিল যে, ক্লায়েন্ট যখন কিছু-কিছু সত্য কথা চেপে যান আর কিছু-কিছু মিথ্যে কথা বলেন, তখন অন্যভাবে আমাকে খবর জোগাড় করতে হয়।”

 

ভাদুড়িমশাইয়ের কথার মধ্যে যে ইঙ্গিতটা প্রচ্ছন্ন রয়েছে, সেটা ধরতে পারা তো শক্ত নয়, তাই ভেবেছিলুম যে, মিসেস ঘোষ একেবারে দপ করে জ্বলে উঠবেন। চাই কী, দরোয়ান ডেকে বাড়ি থেকে আমাদের বারও করে দিতে পারেন। কিন্তু না, একেবারেই রেগে গেলেন না তিনি। শান্তভাবেই বললেন, “কোন্ সত্যটা আমি চেপে গিয়েছি?”

 

“মিঃ রঘুবীর ঘোষকে বিয়ে করার আগে যে মিঃ বেঞ্জামিন স্টুয়ার্টের সঙ্গে আপনার বিয়ে হয়েছিল, সেটা আপনি চেপে গেছেন।”

 

“ওটা আপনাকে জানাবার দরকার আছে বলে মনে হয়নি, তাই জানাইনি।”

 

“ক্লায়েন্টের উচিত সমস্ত কথা খুলে বলা। তার মধ্যে কোটা আমার কাজে লাগবে আর কোন্‌টা লাগবে না, সে তো আমি বুঝব। এই যেমন এ-বিয়ের আগে আপনি কোথায় ছিলেন, এটাই আপনার প্রথম বিয়ে কি না, আর হ্যাঁ, মিঃ রঘুবীর ঘোষকেই বা কবে আপনি বিয়ে করলেন, সে-সবই আমার জানার দরকার ছিল।”

 

“তদন্তের সুবিধের জন্যে?”

 

“ঠিক তা-ই।”

 

“তা হলে আমার পাস্ট লাইফ সম্পর্কে আপনি জিজ্ঞেস করলেন না কেন? জিজ্ঞেস করলেই আমি জানাতুম।”

 

“সত্যি কি জানাতেন?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি যেদিন বাড়িতে ডেকে এনে আমাকে তদন্তের ভার দেন, সেদিনই কী জানি কেন আমার সন্দেহ হয়েছিল যে, সব কথা আপনি খুলে বলছেন না, বলবেনও না। পরে দেখলুম, ঠিকই সন্দেহ করেছি। ইন ফ্যাক্ট সেদিন আপনি কিছু মিথ্যে কথাও বলেছিলেন।”

 

“যেমন?”

 

“যেমন আপনি বলেছিলেন যে, জানকী আপনার একমাত্র সন্তান। কিন্তু সেটা তো ডবল-মিথ্যে কথা। প্রথমত, মিঃ স্টুয়ার্টের সঙ্গে আপনার বিয়ের ফলে একটি পুত্রসন্তান হয়েছিল। পঙ্গুমাস চাইল্ড। …না না, ওভাবে চমকে উঠবেন না, লন্ডনের বার্থ রেজিস্ট্রেশন অফিস থেকে এই খবর আমি আনিয়েছি। …দ্বিতীয়ত, জানকী ঘোষ আদৌ আপনার সন্তান নন। অন্তত আপনি যে তাঁর গর্ভধারিণী নন, সেটা তো ঠিক?”

 

মিসেস ঘোষ বললেন, “আপনি কী বলছেন, কিছুই আমি বুঝতে পারছি না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না বুঝবার তো কিছু নেই। এ তো অঙ্কের ব্যাপার। খুবই সহজ অঙ্ক। রঘুবীর ঘোষের সঙ্গে আপনার বিয়ে হয়েছিল ১৯৫৩ সালের অগস্ট মাসে। আর এদিকে এই ১৯৯৫ সালে জানকী ঘোষের বয়স দেখছি পঁয়তাল্লিশ বছর। এটা কী করে হয়? অঙ্ক তো মিলছে না।”

 

“কাগজে ওর বয়সটা ভুল বেরিয়েছে। একচল্লিশের বেশি বয়স ওর হয়নি।”

 

“না, মিসেস ঘোষ, একচল্লিশ নয়, পঁয়তাল্লিশ। পুলিশ থেকে ওঁর এজ ভেরিফাই করা হয়েছে। আপিসের খাতায় বলুন আর রেনবো ক্লাবের রেজিস্টারেই বলুন, সর্বত্র ওঁর বয়স দেখছি পঁয়তাল্লিশ। আসলে উনি রঘুবীর ঘোষের একমাত্র সন্তান ঠিকই, তবে আপনি ওঁর মা নন। উনি রঘুবীর ঘোষের প্রথম পক্ষের সন্তান। সেই স্ত্রীর মৃত্যুর পরে শিশুপুত্রটিকে সম্ভবত তার মামাবাড়িতে রেখে রঘুবীর ঘোষ বিলেতে গিয়েছিলেন। সেখানে আপনার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। …এ-ব্যাপারে আপনি কিছু বলবেন?”

 

মুখের একটি রেখাও পরিবর্তিত হল না, চোখও সেই আগের মতোই স্থির, শান্ত। ভিতরে-ভিতরে যতই তোলপাড় ঘটুক, বাইরে থেকে কিছু বুঝবার উপায় নেই। ফুলকুমারী ঘোষ বললেন, “আমি আর কী বলব, সবই তো আপনি জানেন দেখছি।”

 

“তা জানি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে সবই একটু দৌড়ঝাঁপ করে জানতে হল। যেমন ধরুন, দাশুর মা যে মারা যাননি, এ-বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে প্রথমে ফিল্মে নেমেছিলেন, পরে এখন যাত্ৰা করে বেড়াচ্ছেন, তাও জানি। অথচ আপনি কী বলেছিলেন? না দাশুর বয়েস যখন মাত্র আড়াই বছর, তখন ওর মা মারা যান। আসলে প্রথম থেকেই আপনি যত রাজ্যের ভুলভাল খবর আমাকে খাইয়েছেন। …কিছু বলার আছে?

 

“কিছুই বলার নেই।” ফুলকুমারী বললেন, “আপনার সম্পর্কে যা শুনেছি, তাতেই আমার বোঝা উচিত ছিল যে, সবই আপনি জানতে পারবেন। আপনি ঠিকই বলেছেন, কোনও কথা গোপন না-করলেই আমি ভাল করতুম। তবে কিনা, কেন যে আমি সব কথা আপনাকে জানাইনি, এমনকি কিছু মিথ্যে কথাও বলেছি, তাও তো আপনার বোঝা উচিত।”

 

“বুঝিনি, তা নয়। আমার ধারণা, সব কথা প্রকাশ হয়ে গেলে এদের…মানে এই ঘোষ-পরিবারের মানসম্মান যে বাঁচবে না, এই ভয়টাই আপনাকে সব কথা খুলে বলতে দেয়নি। কিন্তু সেক্ষেত্রে এই খুনের কিনারা করতে আমাকে আপনি ডাকলেন কেন?”

 

ফুলকুমারী ম্লান হাসলেন। বললেন, “ডেকেছি, তার কারণ, জানকীকে আমি নিজের সন্তানের চাইতেও বেশি ভালবেসেছিলুম। নিজের সন্তানকে একটা অর্ফানেজে পাঠিয়ে দিয়ে জানকীকেই বুকে তুলে নিয়েছিলুম আমি। কে ওকে মেরেছে আমি জানি না। কিন্তু আমি চেয়েছিলুম, এখনও চাইছি যে, তার শাস্তি হোক। ভীষণ শাস্তি হোক। এটা যদি না-ই চাইব, তো পুলিশের তদন্তের উপরে নির্ভর করেই আমি বসে থাকতুম, চারু ভাদুড়িকে ডেকে পাঠাতুম না।”

 

“সেটা আপনি ভালই করেছেন। কিন্তু…” একটু যেন চিন্তিত গলায় ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি একটা অন্য কথা ভাবছি।”

 

“কী ভাবছেন?”

 

“পুলিশের কথা ভাবছি। তদন্ত তো একা আমি করছি না, ওরাও করছে।”

 

“তা করুক না।”

 

“পুলিশকে একেবারে বোকা ভাববেন না, মিসেস ঘোষ। এটা ঠিকই যে, সব সময়েই ওদের চেয়ে আমি অন্তত এক কদম এগিয়ে থাকি। কিন্তু তাই বলে যে আমি যতটুকু যা জানতে পেরেছি, ওরা তা কখনওই জানতে পারবে না, তা নয়। যখন জানতে পারবে, তখন কিন্তু ওদের সন্দেহটা আপনার দিকেই ঘুরে যেতে পারে।”

 

“এ-কথা কেন বলছেন?”

 

এইজন্যে বলছি যে, আপনার দিদি যাকে দত্তক নিয়েছেন, সেই তেজবাহাদুর যে আসলে আপনারই প্রথম পক্ষের ছেলে, এটা তো ঠিক?”

 

মুখ তুলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকালেন ফুলকুমারী। স্থির চোখে তাকিয়েই রইলেন কয়েক সেকেন্ড। তারপর মুখ নামিয়ে বললেন, “ঠিক। কিন্তু তাতে কী হল?”

 

“একটা মুশকিল হল। পুলিশ যখন এটা জানতে পারবে, তখন ধরেই নেবে যে, রঘুবীর ঘোষের সম্পত্তি যাতে আপনার মুঠোয় চলে আসে, আর আপনার মৃত্যুর পরে সেটা যাতে আপনার নিজের ছেলের…আই মিন তেজবাহাদুরের হাতে যায়, তারই জন্যে তার পথের কাঁটাকে আপনি সরিয়ে দিয়েছেন। …না না, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। নিজের ছেলের চেয়ে সতীনের মা-মরা ছেলেকে যে আপনি অনেক বেশি ভালবাসতেন, আমি সেটা অবিশ্বাস করছি না, কিন্তু পুলিশকে এটা বিশ্বাস করানো একটু শক্ত হবে।”

 

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “তা ছাড়া আপনার পুত্রবধূ বেলা দেবীর কথাটাও ভাবুন। তাঁর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক মোটেই ভাল ছিল না। কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন। তাঁর সঙ্গে আমি কথাও বলেছি। মনে হল, তিনি কাগজ-টাগজ বিশেষ পড়েন না। পড়লে নিশ্চয় জানতে পারতেন যে, তাঁর স্বামী বেঁচে নেই। কিন্তু জেনে তো যাবেনই। তখন যদি তিনি পুলিশকে গিয়ে বলেন যে, তাঁর স্বামীর মৃত্যুর জন্যে আপনিই দায়ী, তো তাতে আমি অন্তত অবাক হব না। খুনের মামলায় তিনিই তখন সরকার পক্ষের প্রধান সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবেন।”

 

আমি এতক্ষণ কোনও কথা বলিনি। এবারে বললুম, “একটা কথা বোধহয় আপনি খেয়াল করেননি ভাদুড়িমশাই। জানকীবাবু মারা গেছেন বলেই যে সম্পত্তির মালিকানা একা মিসেস ঘোষের হাতে এসে যাচ্ছে, তা কিন্তু নয়। প্রথমত, তাঁর স্ত্রী বেঁচে আছেন। দ্বিতীয়ত, তাঁর ছেলেও রয়েছে একটি। তারাও কিন্তু এই সম্পত্তির সমান অংশীদার।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সম্পত্তির ব্যাপারে জানকীবাবুর স্ত্রী বেলা দেবীকে আমি হিসেবের মধ্যেই রাখছি না। দাশুর আড়াই বছর বয়েসেই তিনি যদি এ-বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে থাকেন, তো বুঝতে হবে, অন্তত ষোলো-সতেরো বছর তিনি স্বামীর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখেননি। ডেজার্শনের মেয়াদ এত লম্বা হলে কি স্বামীর সম্পত্তি ক্লেম করা যায়?”

 

“ও-সব কথা উঠছেই না।” ফুলকুমারী বললেন, “বেলা এ-বাড়ি ছেড়ে যাবার পাঁচ বছর পরেই জানকী ডিভোর্সের মামলা এনেছিল। বেলা কনটেস্ট করেনি। জানকী তাই একতরফা ডিক্রি পেয়ে যায়।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তবে তো মিটেই গেল।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “না, একেবারে যে মিটল, তা নয়। দাশুর কথাটা ভাবুন। তাকে নিয়ে ঝামেলা হতে পারে। সম্পত্তির লোভে লোক লাগিয়ে মিসেস ঘোষ তাঁর সতীনের ছেলেকে খুন করিয়েছেন, একবার এই সন্দেহটা পুলিশের হলেই হল। তখন তো তারা বলতেই পারে যে, দাশুর পক্ষে এ-বাড়িতে থাকা নিরাপদ নয়। ফুলকুমারী দেবীর কাছ থেকে দাশুকে তারা সরিয়ে নিতে পারে।”

 

একেবারে হঠাৎই ভেঙে পড়লেন ফুলকুমারী দেবী। এতক্ষণ যাঁকে খুব শক্ত ধাতের ধীরস্থির মানুষ বলে মনে হচ্ছিল, দু’হাতে মুখ ঢেকে তিনি আর্তস্বরে বলে উঠলেন, “না, না, তা হতে দেবেন না। কিছুতেই হতে দেবেন না! আমার ছেলে চলে গেছে! এখন দাশুকেও যদি আমার কাছে থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়, তো আমি কী নিয়ে বাঁচব? কার জন্যে বাঁচব?”

 

মিসেস ঘোষকে কোনও সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন না ভাদুড়িমশাই। বললেন, “পুলিশ গত কয়েকদিন ধরে মোটামুটি সিধে পথেই এগোচ্ছিল। শোভনের কাছে কাল শুনলুম যে, লেক–এলাকার তিনজন দাগি ক্রিমিন্যালকে অ্যারেস্ট করে থানায় এনে বেধড়ক ঠেঙানোও হয়েছিল। কিন্তু তাদের দু’জনের অ্যালিবাই পাকা, ঘটনার দিন ওই সময়ে তারা ওই এলাকায় ছিলই না।”

 

জিজ্ঞেস করলুম, “আর তৃতীয়জন?”

 

“সে ছুরিছোরা চালায়, জীবনে কখনও গুলি চালায়নি। চালাতে নাকি জানেও না। এদিকে জানকীবাবুকে মারা হয়েছে গুলি চালিয়ে। ময়না-তদন্তে সেই বুলেটটাও পাওয়া গেছে, যেটা তাঁর শরীরের মধ্যে ঢুকেছিল।”

 

“পুলিশ তা হলে এখন কী করবে?…মানে শোভনবাবুর কথা থেকে কিছু বোঝা গেল?”

 

“কিচ্ছু না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে আন্দাজ তো একটা করাই যায়।”

 

“আপনি কিছু আন্দাজ করেছেন?”

 

“তা করেছি বই কী। হয় তারা আরও কিছু ধরপাকড় করবে, আর নয়তো উল্টোপাল্টা ধরপাকড় করে যে লাভ নেই, এটা বুঝে লাইন পালটে অন্য পথে এগোবে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “অন্য পথে মানে কোন্ পথে?”

 

“সেটা বোঝা তো শক্ত নয়।” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমার কথাই ধরুন। আমি তো অন্ধকারে ঢিল ছুড়েছিলুম। স্রেফ এই অ্যাসাম্পশনের উপরে সিকিমে চলে গিয়েছিলুম যে, ওখানে গিয়ে মিসেস ঘোষের ব্যাকগ্রাউন্ডের একটা ছবি অন্তত পাওয়া যাবে। তাতে আমার কাজের কিছু সুবিধে হবে। তা ঢিলটা ঠিক লেগেও গেল। ওখানে না-গেলে কি তেজবাহাদুরের সঙ্গে দেখা হত? রঘুবীর ঘোষের সঙ্গে ফুলকুমারী দেবীর কবে বিয়ে হয়েছিল, সেটা জানা যেত? যেত না। আর সেটা না-জানলে কি বুঝতে পারতুম যে, জানকীবাবু আসলে রঘুবীর ঘোষের প্রথম পক্ষের ছেলে?”

 

আমি বললুম, “আপনি কি মনে করেন যে, পুলিশও এসব জেনে যাবে?”

 

“যেতেই পারে। আবার বলছি, পুলিশকে বোকা ভাববেন না। যে-সব কথা আমরা দু’দিন আগে জেনেছি, ওরা সে-সব দু’দিন পরে জানবে। কিন্তু জানবে ঠিকই। আর জানলেই ওরা সন্দেহ করতে শুরু করবে, জানকী ঘোষের হত্যার পিছনে ফুলকুমারী দেবীর হাত থাকা কিছু বিচিত্র নয়, তিনিই হয়তো লোক লাগিয়ে তাঁর সতীনের ছেলেকে খুন করিয়েছেন। কিন্তু পুলিশের মনে তেমন কোনও সন্দেহ দেখা দেবার আগেই আমাকে আবার দু’কদম এগিয়ে যেতে হবে।”

 

“তার মানে?”

 

“মানে খুবই সহজ। খুনিকে ধরতে হবে।”

 

দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে আছেন ফুলকুমারী দেবী। তাঁর দিকে তাকিয়ে মনে হল, যে-সব কথা হচ্ছে, তার কিছুই তিনি শুনতে পাচ্ছেন না। সদানন্দবাবু বললেন, “কে খুনি, সেটা আন্দাজ করতে পেরেচেন?”

 

“শুধু আন্দাজ করলে কি চলে? প্রমাণ চাই। প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কি কারও দিকে আঙুল তোলা যায়?…চলুন, আর দেরি করা ঠিক হবে না, ওঠা যাক।”

 

আমরা উঠে পড়লুম। দরজা পর্যন্ত এগিয়ে হঠাৎই ঘুরে দাঁড়ালেন ভাদুড়িমশাই। মিসেস ঘোষের কাছে ফিরে এসে বললেন, “ভয় পাবেন না, ভেঙে পড়বেন না। দাশুকে যাতে আপনার কাছ থেকে কেউ সরিয়ে দিতে না পারে, তার চেষ্টা আমি করব। …আর হ্যাঁ, একটা কথা আবারও বলে যাই। এই খুনের তদন্ত করার জন্যে যে আমাকেই আপনি ডেকেছেন, এটা খুব বুদ্ধির কাজ হয়েছিল।”

 

বাগান পেরিয়ে আমরা রাস্তায় চলে এলুম। গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল তো রবিবার। ছুটির দিন। কাল আর আপনাদের কাঁকুড়গাছিতে আসতে হবে না। ছুটির দুপুরটা যেভাবে খুশি কাটান। শুধু সন্ধে সাতটায় একবার থানায় হাজিরা দিতে হবে। চলে আসবেন কিন্তু।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *