(২)
কৌশিকই দরজা খুলতে গিয়েছিল। মিনিট খানেক বাদে যে ভদ্রলোকটিকে নিয়ে সে ড্রয়িং রুমে ফিরে এল, তাঁর বয়স মনে হল বছর চল্লিশের কম হবে না। পোশাক-আশাক অবশ্য এ-কালের ছেলে-ছোকরাদের মতন। পরনে আজকালকার যা ফ্যাশন সেই রং-জ্বলে-যাওয়া জিন্স আর ওই একই রঙের ব্যাগি জার্কিন, পায়ে পুরু সোলের মোটা ফিতের স্পোর্টিং শু, মুখে আমাদের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখরের মতো সাতদিনের-না-কামানো খোঁচা খোঁচা দাড়ি, যেটাকে ঠিক ওই একই অবস্থায় রাখবার জন্য রোজ এঁকে বোধহয় হাতে কাঁচি নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ কসরত করতে হয়।
ভদ্রলোকের কাঁধ থেকে যে মোটা কাপড়ের বেশ ভারী একটা ব্যাগ ঝুলছে, সেটাও আমাদের নজর এড়াল না। ব্যাগের ভাঁজ দেখে আন্দাজ করলুম যে, ওর মধ্যে চৌকো আকারের বড়সড় কিছু রয়েছে। সেটা একটা ডিকশনারিও হতে পারে, আবার মিষ্টির একটা প্যাকেট হওয়াও কিছু বিচিত্র নয়। পরে দেখলুম দুটো আন্দাজই ভুল। একটা বড়সড় ক্যামেরা।
কৌশিক বলল, “মামাবাবু, ইনি মিস্টার বীরেশ্বর সেন। সাউথ ক্যালকাটায় থাকেন, তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।”
বীরেশ্বর সেন নমস্কার করে বললেন, “শোভনবাবুকে আপনারা চেনেন তো? আই মিন শোভন চৌধুরি অব লালবাজার…”
ভাদুড়িমশাই ঘরের কোনার চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে এসে একটা সোফায় বসে বললেন, “শোভন আমাকে আপনার কথা বলেছে। কাল রাত্তিরেই ফোন করেছিল। তা আপনার সমস্যাটা কী?… কিন্তু এ কী, আপনি দাঁড়িয়ে রইলেন কেন, বসুন, বসুন।”
কাঁধ থেকে ঝোলাটাকে খুব সন্তর্পণে মেঝের উপরে নামিয়ে রেখে বীরেশ্বর সেন তাঁর কাছাকাছি একটা সোফার উপরে বসে পড়লেন। তারপর, হাল্কা নীল কাচের যে সানগ্লাসটিকে এতক্ষণ বাঁ-হাতে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, সামনের সেন্টার-টেবিলে সেটিকে রেখে বললেন, “এমনিতে দেখতে গেলে এটা হয়তো কোনও সমস্যাই নয়। এমনকি, আপনার এও মনে হতে পারে যে, রজ্জুতে আমার সর্পভ্রম হচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট আমার স্ত্রীও তা-ই বলছেন। কিন্তু আমার মনে যে একটা খটকা দেখা দিয়েছে, সেটা কিছুতেই যাচ্ছে না। কাল সকালে তাই শোভনবাবুকে আমার খটকার কথাটা বললুম। একই বাড়িতে থাকি তো, তাই ভাবলুম যে, পুলিশের লোক যখন, তখন বোধহয় জানিয়ে রাখাই ভাল। তা উনি তখন কী একটা কাজে বেরুচ্ছিলেন। আমি গিয়ে আমার খটকার কথাটা জানাতে…
বাধা দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “দাঁড়ান, দাঁড়ান, অত তাড়াতাড়ি এগোলে আমি তাল রাখতে পারব না। আগের কথাটা আগে বুঝতে দিন। শোভন আর আপনি একই বাড়িতে থাকেন?”
“হ্যাঁ।” বীরেশ্বর সেন বললেন, “এই যে-রকমের বাড়িতে আপনারা রয়েছেন, মোটামুটি এই রকমেরই একটা মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং। তার পাঁচতলার একটা ফ্ল্যাটে উনি থাকেন, আর আমি থাকি তিনতলায়। একই বাড়ি, লিফটে মাঝেমধ্যে দেখা হয়ে যায়, দেখা হলে নড করি।”
“তারপর?”
“তারপর যা বলছিলুম। কাল সকালে ওঁর ফ্ল্যাটে যাই। উনি তখন কী একটা কাজে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, আমাকে তাই খুব-একটা সময় দিতে পারেননি। তবু তারই মধ্যে আমার খটকার কথাটা আমি ওঁকে জানাই। তাতে উনি বলেন, ঘটনা যখন একটা ঘটেছে, তখন পুলিশ তা নিয়ে একটা রুটিন-ইনভেস্টিগেশান করবে বই কী, তার কাজ হয়তো ইতিমধ্যে শুরুও হয়ে গিয়েছে, তবে কিনা আমার যেটা সন্দেহ, তা নিয়ে ঠিক এক্ষুনি যে কিছু করা দরকার, তা ওঁর মনে হয় না। যদি দরকার বোঝেন, তো পরে ওঁরা আমাকে ডেকে পাঠাবেন। তাতে আমি বলি যে, বাই দ্যাট টাইম ইট মে বি টু লেট। …আচ্ছা, আমি কি একটা সিগারেট খেতে পারি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিলক্ষণ।”
ভদ্রলোক তাঁর জার্কিনের পকেট থেকে সোনালি রঙের একটা সিগারেট কেস বার করে আনলেন। তারপর কেস থেকে একটা সিগারেট তুলে নিয়ে ঠোটে ঝুলিয়ে লাইটার জ্বেলে অগ্নিসংযোগ করে যে-ভাবে একগাল ধোঁয়া ছাড়লেন, তাতে মনে হল, ধোঁয়াটা না-ছাড়া পর্যন্ত তিনি বেশ কষ্ট পাচ্ছিলেন। সিগারেটে অগ্নিসংযোগের সময় তাঁর হাত যে স্থির ছিল না, একটু-একটু কাঁপছিল, সেটাও আমার নজর এড়ায়নি।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারপর?”
সিগারেটে আবার একটা টান দিলেন বীরেশ্বর সেন। কিন্তু ধোঁয়াটাকে এবারে আর গলগাল করে ছাড়লেন না। সেটাকে খানিকক্ষণের জন্য মুখের মধ্যে আটকে রেখে তারপর আস্তে-আস্তে ছেড়ে দিয়ে বললেন, “শোভনবাবু বুঝতে পারলেন যে, আমার যে একটা খটকা লেগেছে, সেটা নিয়ে আমি খুব অশান্তিতে রয়েছি। তবে কিনা তাঁর বেরিয়ে যাবার তাড়া ছিল, তাই ভাল করে যে আমার সন্দেহের কথাটা বিবেচনা করে দেখবেন, এমন সময় তাঁর তখন ছিল না। সম্ভবত সেই জন্যেই আমাকে বললেন যে, বেশ তো, পুলিশি ইনভেস্টিগেশান শেষ না হওয়া পর্যন্ত যদি আমি ধৈর্য ধরতে না-ই পারি তো কোনও প্রাইভেট গোয়েন্দার সাহায্য নিলেই তো হয়। ইন ফ্যাক্ট, উনিই আপনার নাম সাজেন্ট করে বললেন যে, আপনি এখন কলকাতায় রয়েছেন, আজই যেন আমি এসে আপনার সঙ্গে দেখা করি, মিনহোয়াইল আমার থাটা উনি আপনাকে জানিয়ে রাখবেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “শোভন আমাকে কাল রাত্তিরে ফোন করেছিল। কিন্তু ব্যাপারটা কী, আর তা-ই নিয়ে আপনার খটকাই বা কীসের, তা তো এখনও জানতে পারলুম না।”
“আজ্ঞে সেইটে জানাব বলেই তো এসেছি। কিন্তু…” খুবই কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে আমাদের উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন বীরেশ্বর সেন, তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এঁদের সামনে বলা কি ঠিক হবে?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “স্বচ্ছন্দে বলুন। এঁরা আমারই লোক, কিছুই পাঁচকান হবে না।”
“তবে তো কথাই নেই।” এবারে বীরেশ্বর সেনও হাসলেন। তারপর মাটিতে নামিয়ে রাখা সেই ঝোলা থেকে একখানা খবরের কাগজ বার করে তার ভাঁজ খুলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “দাগ-দেওয়া খবরটা একবার পড়ে দেখুন।”
ভাদুড়িমশাই সেটাকে কৌশিকের হাতে চালান করে দিয়ে বললেন, “পড়ে শোনা।”
হেডলাইনের উপরে চোখ বুলিয়ে কৌশিক বলল, “আরে, এটা তো দেখছি বালিগঞ্জ লেকে গত বেস্পতিবার সকালে যে মার্ডারটা হয়েছে, সেই খবর।”
“তা-ই? পড় তো দেখি।”
“রবীন্দ্রসরোবরে হত্যাকাণ্ড। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ছ’টায় জানকীনাথ ঘোষ (৪৫) নামে এক ভদ্রলোক যখন রবীন্দ্রসরোবরে প্রাতঃভ্রমণ করছিলেন, তখন অতর্কিতে এক আততায়ীর গুলিতে তিনি নিহত হন। ভদ্রলোকের পরনে ছিল বাদামি রঙের ট্রাউজার্স, ফুল হাতা সাদা শার্ট, লাল রঙের হাত-কাটা কার্ডিগান। কলকাতার এক বিখ্যাত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে তিনি বিভাগীয় ম্যানেজারের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশ এখনও কিছু জানতে পারেনি। তবে তাদের ধারণা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষের পরিণামে এই হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকতে পারে। এখনও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।”
সদানন্দবাবু বললেন, “হবে কী করে, যত সব অপদার্থ!”
পুলিশ সম্পর্কে সদানন্দবাবুর রাগের কারণ জানি। যাঁরা শ্যামনিবাস রহস্য’ পড়েছেন, তাঁদেরও না-জানবার কথা নয়। সুতরাং ‘অপদার্থ’ শব্দটা যে পুলিশের সম্পর্কেই ব্যবহার করলেন, সেটা খুব সহজেই বোঝা গেল। কিন্তু কথাটা যে ভাদুড়িমশাই শুনতে পেয়েছেন, এমন মনে হল না। মিনিট খানেক চুপ করে বসে থেকে বীরেশ্বর সেনের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, “তা এই নিয়ে আপনার খটকাটা কীসের?”
বীরেশ্বর সেন বললেন, “সেই কথাটা বলব বলেই তো এসেছি। আমার ধারণা, যে-ই খুন করে থাকুক, সে ভুল-লোককে খুন করেছে। আসলে সে আমাকে খুন করতে চেয়েছিল।”
