(১৯)
আজ ১১ মার্চ, শনিবার। ঘুম থেকে দেরিতে উঠেছি। ফলে একটু তাড়াহুড়োর মধ্যে পড়তে হল। স্নান করে, ব্রেকফাস্ট খেয়ে বসবার ঘরে ঢুকে দেখি, সদানন্দবাবু বসে আছেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে পৌঁছলুম সওয়া ন’টায়।
ড্রইংরুমে ঢুকে দেখি, অরুণ সান্যাল ক্রসওয়ার্ডের সমাধান করছেন। ভাদুড়িমশাই পড়ছেন ব্রিজ-নোস। বললুম, “কৌশিককে যে দেখছি না?”
কাগজ থেকে মুখ না তুলেই অরুণ সান্যাল বললেন, “বাজারে গেছে। এখুনি এসে পড়বে।”
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই কৌশিক এসে ঘরে ঢুকল। তারপর ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিয়ে ভাদুড়িমশাইকে বলল, “এঁরা তো এসে গেছেন মামাবাবু। তা হলে শুরু করা যাক।”
হাতের কাগজখানা ভাঁজ করে, একপাশে সরিয়ে রেখে ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুরু তো করলেই হয়। কিন্তু কাল রাত্তিরে শোভন কী খবর দিয়েছে সেটা আগে এঁদের বল্।”
শুনে, হোহো করে হাসতে লাগল কৌশিক। তারপর হাসি থামিয়ে বলল, “তোমরা কাল সকালবেলায় যা কাণ্ড করে এসেছ, তাতে তো এইরকমই হবার কথা! উঃ, লোকটা এখন বোধহয় রাস্তায়-রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে!”
কিছুই বুঝতে পারলুম না। বললুম, “কোন্ লোকটা? শোভন চৌধুরি কী বলেছেন?”
“বলেছেন যে, তোমাদের ওই বেলা দেবী ওরফে বেহুলা দেবী ওরফে বিদিশা দেবী যে পাড়ার ছেলেদের জুটিয়ে এনে এমন কাণ্ড করতে পারেন, তা নাকি তিনি ভাবতেও পারেননি।”
সদানন্দবাবু বিভ্রান্তভাবে বললেন, “বিদিশা দেবী আবার কী কাণ্ড করলেন?”
ভাদুড়িমশাইও হাসছিলেন। হাসতে হাসতেই কপট ধমক দিয়ে বললেন, “আঃ, কী হচ্ছে কৌশিক? বড্ড বাজে বকিস! অত ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলছিস কেন? যা বলার স্পষ্ট বল্ না।”
কৌশিক বলল, “বলছি, বলছি। কিরণমামা, তোমরা তো কাল সকালবেলায় বিদিশা দেবীর মাথাটা একেবারে বিগড়ে দিয়ে বেরিয়ে এলে। তারপরে কী হল জানো?”
“কী হল?”
“তোমরা চলে আসার পরে-পরেই তিনি তাঁর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে পাড়ার জনাকয় ছেলেকে ডেকে আনেন। তাদের জানিয়ে দেন যে, তাঁর ফ্ল্যাটে তিনি দয়া করে একটা লোককে থাকতে দিয়েছেন, কিন্তু সে তাঁকে বড্ড জ্বালাচ্ছে, লোকটাকে তাই না-তাড়ালেই নয়। শুনে তো ছেলেগুলো মহা খাপ্পা। পাশের পাড়ায় যে যাত্রা হয়েছিল, বিদিশা দেবীকে তাতে তারা হিরোইনের রোলে অ্যাক্টিং করতে দেখেছে কিনা, সেই থেকে তারা তাঁর মস্ত ফ্যান। সব শুনে বলল, ‘কিচ্ছু ভাববেন না বউদি, ব্যাটাকে আজই আমরা মেডিসিন দিয়ে দিচ্ছি।’ তারপরে যা হবার তা-ই হল।”
“বুজিচি।” সদানন্দবাবু বললেন, “বীরেশ্বর সেনকে আচ্ছামতন টাইট দিয়ে দিল।”
কৌশিক বলল, “ঠিক বুঝেছেন বোস-জেঠু। এখান থেকে বিদায় নিয়ে বেলা বারোটায় সে যখন ফ্ল্যাটবাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছে, পাড়ার ছেলেরা তাকে উত্তমধ্যম দিয়ে খেদিয়ে দেয়। এও বলে দেয় যে, ফের যদি সে ও-পাড়ায় ঢোকে তো তার ঠ্যাং ভেঙে দেবে।”
বললুম, “তা বীরেশ্বর সেন এ নিয়ে থানা-পুলিশ করেনি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “করেছে বই কী। লোকাল থানায় গিয়ে ডায়েরি করিয়েছে। শোভন অন্তত সেই কথাই বলল।”
“আপনি শোভনবাবুকে কী বললেন!”
“বললুম, শোভন, এটা ওদের ঘরোয়া ব্যাপার, পুলিশ যদি এই নিয়ে খুব বেশি নাড়াঘাঁটা করে, তো একজন অ্যাকট্রেসের নামে একটা স্ক্যান্ডাল ছড়িয়ে পড়তে দেরি হবে না। আর তা যদি হয়, তো ভদ্রমহিলার কেরিয়ারেরও বারোটা বেজে গেল। সেটা কি উচিত হবে?…তা শোভন তো বুদ্ধিমান ছেলে, হিন্টটা বুঝে নিয়ে বলল, নাড়াঘাঁটা করতে ওদের বয়ে গেছে; এমনিতেই তো ল অ্যান্ড অর্ডার মেনটেন করতে ওরা হিমশিম খাচ্ছে, তার উপরে আবার এ-সব উটকো ঝামেলা নিয়ে মাথা ঘামাবে, পুলিশের এত সময় কোথায়?”
সদানন্দবাবু বললেন, “তার মানে লোকাল থানা স্রেফ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? তাদের তরফে এই মারপিটের ব্যাপারটা নিয়ে কোনও এনকোয়ারি হবে না?”
ভাদুড়িমশাই রহস্যময় হেসে বললেন, “এ-ব্যাপারে যা বলার সে তো শোভনই বলে দিয়েছে! পুলিশের অত সময় কোথায়!”
ফোন বেজে উঠল। কর্ডলেসটার সুইচ অন করে ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যালো… নমস্কার… না, সকালে যেতে পারলুম না, একটা কাজ পড়ে গেল…হ্যাঁ, আপনি যে দায়িত্ব দিয়েছেন, তারই কাজ…না, কোনও জবাবদিহি করতে আমি রাজি নই…তা কেন পারব না…এই ধরুন বিকেল ছ’টা নাগাদ… ফাইন, তা হলে ওই কথাই রইল…নমস্কার।”
কর্ডলেস অফ্ করে দিয়ে সেটটা ভাদুড়িমশাই সেন্টার টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। অরুণ সান্যাল বললেন, “মিসেস ঘোষ?”
“তা ছাড়া আর কে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভেবেছিলেন সকালেই যাব। যাইনি বলে ক্ষুণ্ণ হয়েছেন। সেটা বললেনও। তা আমি বললুম, আপনার কাজই তো করছি। কিন্তু তাতেও যে ভদ্রমহিলা…”
কথা শেষ হবার আগেই ডোর বেল বাজল। কৌশিক উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিয়ে কাকে যেন বলল, “একটু অপেক্ষা করুন, আমি দেখে আসছি।” পরক্ষণেই ড্রয়িংরুমে ফিরে এসে বলল, “বীরেশ্বর সেন। ভিতরে আসতে বলব?”
ভাদুড়িমশাইয়ের ভুরু কুঁচকে গেল। বললেন, “কেন দেখা করতে চাইছেন, কিছু বললেন?”
“না। শুধু বললেন যে, দেখা না-করলেই নয়, জরুরি দরকার।”
“ঠিক আছে, নিয়ে আয়।”
ঘর থেকে ফের বেরিয়ে গিয়ে কৌশিক যাঁকে সঙ্গে করে ফিরে এল, তিনিই যে বীরেশ্বর সেন, এটা বিশ্বাস করা বেশ কঠিন হচ্ছিল। জিন্স, জার্কিন, পুরু সোলের স্পোর্টিং জুতো, চন্দ্রশেখরের মতো সযত্নে-রাখা দাড়ি আর কাঁধের ঝোলা, প্রথম যখন দেখি, তখন সব মিলিয়ে বেশ স্মার্ট মনে হয়েছিল মানুষটিকে। আজও তাঁর সেই একই পোশাক, কিন্তু সেই স্মার্টনেসের কিছুই আর আজ অবশিষ্ট নেই। বাঁ হাতে যে সানগ্লাস ঝুলিয়ে সেদিন ঘরে ঢুকেছিলেন, সেটিও আজ দেখা গেল না। চুল উশকোখুশকো, ডান গালে কালশিটে পড়েছে, জার্কিনের কাঁধের কাছটায় ছেঁড়া, চোখ দেখে মনে হয় রাত্তিরে ঘুম হয়নি।
ড্রয়িংরুমে ঢুকে বীরেশ্বর সেন একটা সোফার উপরে ধপ করে বসে পড়লেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি খুব দুঃখিত মিঃ সেন, কাল সকালে বাড়িতে থাকতে পারিনি, একটা জরুরি কাজে বেরিয়ে যেতে হয়েছিল। …তা ব্যাপার কী, আপনাকে দেখে তো খুব স্বাভাবিক অবস্থায় আছেন বলে মনে হচ্ছে না?”
“কী করে মনে হবে!” বীরেশ্বর সেন ডুকরে উঠে বললেন, “আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে!”
“তার মানে?”
“আমি আমার নিজের বাড়িতেই ঢুকতে পারছি না।”
“একটু বুঝিয়ে বলবেন?”
“বলছি। কিন্তু এক গ্লাস জল খাওয়াবেন?
কৌশিক উঠে গিয়ে একটা জলের জাগ আর একটা গেলাশ নিয়ে এল।
জাগ থেকে ঢেলে এক গেলাশ নয়, ঢকঢক করে পুরো দুগৈলাশ জল খেলেন বীরেশ্বর সেন। তারপর হাতের চেটো দিয়ে ঠোঁট মুছে বললেন, “কাল সকালে আপনাদের এখান থেকে উঠে একজনের কাছে যাই। সেখানকার কাজ সেরে বাড়িতে যেতে-যেতে তা প্রায় বারোটা বেজে যায়। কিন্তু আমার ফ্ল্যাটে আমি ঢুকতে পারিনি। বাড়ির গেট পেরোবার আগেই বলা নেই কওয়া নেই গুণ্ডামতন গোটাকায় ছেলে আমার পথ আটকে দিয়ে চড়চাপড় মারতে শুরু করে। তারই মধ্যে একজন হঠাৎ পিছন থেকে ধাক্কা মেরে আমাকে রাস্তার উপরে ফেলে দেয়। সানগ্লাসটা ছিটকে পড়ে গিয়েছিল। দেখলুম, একজন সেটাকে জুতোর তলায় পিষে দিচ্ছে!”
জাগ থেকে আবার এক গ্লাস জল গড়িয়ে নিলেন বীরেশ্বর সেন। এবারে অবশ্য সবটা জল খেলেন না। খানিকটা খেয়ে তারপর হাতে খানিকটা জল ঢেলে নিয়ে ঘাড়ের ওপর থাড়ে নিলেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারপর?”
“রাস্তায় পড়ে যাবার পরেই আমার মনে হল যে, নেহাত চড়চাপড় মেরেই এরা থামবে না, আসলে এরা আমাকে খুন করতে এসেছে। কথাটা মনে হবার সঙ্গে-সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে আমি দৌড় লাগাই। দৌড়তে-দৌড়তে বড়-রাস্তায় পৌঁছই। বড়-রাস্তা থেকে বাসে উঠে ধর্মতলায় আসি। সেখানে ফের বাস পালটে চিৎপুরে আমার আপিসে চলে যাই।”
যেন কিছুই জানেন না, চোখেমুখে এই রকমের একটা ভঙ্গি ফুটিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী কাণ্ড, শহরটা তো জঙ্গল হয়ে উঠল দেখছি….তা পুলিশকে সব জানিয়েছেন তো?”
“তক্ষুনি-তক্ষুনি জানানো হয়নি। মানে থানায় যাব, এমন সাহসই ছিল না। বুঝতেই তে। মহেন যে, তখন আমি পালাতে পারলে বাঁচি। যতক্ষণ না বাসে উঠেছি, ততক্ষণ তো ভয়ে একেবারে সিঁটিয়ে ছিলুম।”
“কিন্তু লোকাল থানায় গিয়ে একটা ডায়েরি তো করানো উচিত।”
“সেটা বিকেলের দিকে করিয়েছি। একা আসতে ভরসা হচ্ছিল না, তাই জনাকয় বন্ধুকে সঙ্গে করে এনেছিলুম।”
“থানায় ও.সি.র সঙ্গে দেখা হয়েছিল?”
“তা হয়েছিল। প্রথমটায় তিনি বেশ ভরসাও দিয়েছিলেন। বলেছিলেন যে, লোকজনের খুব শর্টেজ, তাই তক্ষুনি কোনও স্পট-এনকোয়ারির ব্যবস্থা করতে পারছেন না, ওটা রাত্তিরের দিকে করবেন। আর হ্যাঁ, সঙ্গে দু’জন সেপাই দিয়ে আমাকে ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে দেবারও ব্যবস্থা করবেন তখন। কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
“রাত্তিরের দিকে যখন আবার থানায় গেলুম, তখন দেখলুম ও.সি.র চেহারা একেবারে পাল্টে গেছে। প্রথমে তো দেখাই করতে চান না, শেষকালে দেখা যদি হল, আমি কোনও কথা বলবার আগেই এমন খেঁকিয়ে উঠলেন যে, সে আর কহতব্য নয়।”
“কী বললেন?”
“বললেন যে, দোষ নিশ্চয় আমারই, তা নইলে আর পাড়ার ছেলেরা আমার ওপর অত খাপ্পা হয়ে উঠল কেন? এ-সব পারিবারিক ব্যাপারে পুলিশের কিছু করার নেই।”
“তার মানে এই নিয়ে কোনও এনকোয়ারি হবে না?”
হতাশ ভঙ্গিতে বীরেশ্বর সেন বললেন, “হবে বলে তো মনে হল না, অথচ বিকেলে যখন থানায় যাই, ভদ্রলোকের কথাবার্তা তখন বেশ এনকারেজিং মনে হয়েছিল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আশ্চর্য!” তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “আর-কিছু না হোক, আপনি যাতে নিরাপদে আপনার ফ্ল্যাটে ঢুকতে পারেন, অন্তত তার একটা ব্যবস্থা করে দিক।” বীরেশ্বর সেন প্রায় কেঁদে ফেলে বললেন, “ওরা কিচ্ছু করবে না মিঃ ভাদুড়ি। কিন্তু আপনি…আপনি ওটা করতে পারেন।”
“আমি কী করে করব?”
“আপনি তো শোভন চৌধুরিকে চেনেন। উনি যেমন পুলিশের একজন বড়কর্তা, তেমনি আবার আমাদের বিল্ডিংয়েই তো থাকেন। তা ওঁকে দিয়ে যদি লোকাল থানার ও.সি.কে একবার বলানো যায়, তা হলে নিশ্চয় আমার ফ্ল্যাটে ঢোকার একটা ব্যবস্থা হতে পারে।”
“তা হয়তো পারে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু, যে-কোনও কারণেই হোক, পাড়ার ছেলেরা যখন আপনার উপরে চটে আছে, তখন যত তাড়াতাড়ি পারেন, ওদের সঙ্গে একটা মিটমাট করে নিন। নইলে তো ফ্ল্যাটে ঢুকলেও ওখানে আপনি শান্তিতে থাকতে পারবেন না।”
“থাকতে আমি চাইও না।” বীরেশ্বর সেন বললেন, “জানকী ঘোষকে যারা খুন করেছে, আসলে তো তারা আমাকেই খুন করতে চেয়েছিল। এখন ভুল বুঝতে পেরে আমাকে তারা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কাল সকালে তো আমি আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলুম। শুনলুম সেই সময়ে নাকি বুড়োমতন তিনজন লোক এসেছিল আমার ফ্ল্যাটে। আসলে নিশ্চয় বুড়ো নয়, মেক-আপের কারসাজি। তা আমার ওয়াইফের সঙ্গে কী-সব কথাও হয়েছে তাদের। এ-সব কী করে জানলুম জানেন?”
“কী করে জানলেন?”
“যে মেয়েটা সকালে আমাদের বাড়িতে কাজ করে, মানে ওই আর কী, বাসন মাজে, ঘর ঝাঁট দেয়, তার কাছ থেকে জানলুম। সে আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির কাছেই একটা বস্তিতে থাকে তো, রাত্তিরে থানা থেকে সেখানে গিয়েছিলুম। তা সে যা বলল, তাতে তো আমার ওয়াইফের উপরেও সন্দেহ হচ্ছে। মেয়েটা সেই সময়ে আমাদের ফ্ল্যাটেই ছিল; বলল যে, লোক তিনটের সঙ্গে আমার বউয়ের যে টাকাকড়ি নিয়ে কথা হচ্ছিল, তা সে হলপ করে বলতে পারে।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওরেব্বাবা, তা হলে তো ওখানে এখন আপনার যাওয়াই উচিত হবে না।”
“তা বললে কী করে হবে!” ও ফ্ল্যাটে থাকি আর না-ই থাকি, অন্তত একবার তো ওখানে আমার যাওয়াই চাই।”
“কেন?”
আবার ডুকরে উঠলেন বীরেশ্বর সেন। বললেন, “আমার জামাকাপড়, চেকবই, কাগজপত্তর—সবই ওই ফ্ল্যাটের মধ্যে রয়েছে যে! সেগুলো বার করে আনতে হবে না?…ও মশাই, শোভনবাবু তো আপনাকে খুব মান্যি করেন, দয়া করে তাঁকে বলে একটা ব্যবস্থা করে দিন। নইলে আমি মারা পড়ব!”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু থানা থেকে লোক না-দিলে তো একা আপনি ফ্ল্যাটে ঢুকে সে-সব পার করে আনতে পারবেন না।”
“সেই কথাই তো বলছি। একা ওখানে কোন্ ভরসায় যাব? লোক দিক। যাতে দেয়, তার জন্যেই তো শোভনবাবুর হেল্প নেবার দরকার হচ্ছে। আপনি বললেই শোভনবাবু নিশ্চয় লোক দেবার জন্যে থানার ও.সি.কে বলে দেবেন।”
মিনিট খানেক একেবারে চুপ করে বসে রইলেন ভাদুড়িমশাই। দৃষ্টি সামনের দেওয়ালের দিকে। ভুরু কোঁচকানো। দেখে মনে হয়, কিছু একটা ভেবে নিচ্ছেন। তারপর, চোখ ফিরিয়ে, বীরেশ্বর সেনের দিকে তাকিয়ে, মৃদু হেসে বললেন, “ঠিক আছে, আপনার অসুবিধের কথাটা শোভনকে আমি বলে দেবখন। থানা থেকে কখন লোক দিলে আপনার সুবিধে হয়? আজ বিকেলের কথা বলব?”
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বীরেশ্বর সেন বললেন, “ওরে বাবা, এগারোটা বাজে!” তারপর ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে, “খুব উপকার করলেন…খুউব! কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব, জানি না। খুব কৃতজ্ঞ রইলুম। তবে কিনা…মানে বলছিলুম যে, আজকের বদলে এটা কাল বিকেলে করলে হয় না?”
“আজ কোনও অসুবিধে আছে?”
“অসুবিধে মানে একটু বাদেই আমাকে একটা ফ্লাইট ধরতে হবে। দুপুর একটায় ফ্লাইট, আর তো দেরিও করতে পারছি না। …তবে হ্যাঁ, কাল বিকেলের ফ্লাইটেই ফিরে আসব। সন্ধে সাতটার মধ্যেই থানায় পৌঁছে যাচ্ছি, তখন যদি ওঁরা লোক দিয়ে আমার ফ্ল্যাটে ঢুকবার ব্যবস্থা করে দেন, তো বড্ড ভাল হয়।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বেশ তো, কাল সন্ধে সাতটার কথাই তা হলে বলে রাখব।”
সঙ্গে-সঙ্গে সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন বীরেশ্বর সেন। তারপর মাথাটাকে একেবারে পেটের কাছে নামিয়ে এনে জোড়হস্তে ভাদুড়িমশাইকে নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজা পেরোবার আগে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাদের দিকেও তাকালেন একবার। ডান হাতখানা কপালে ঠেকিয়ে বললেন, থ্যাংক ইউ।
ভদ্রলোক যে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “রডার ভূমিকায় অভিনয় করার সময় ভূমেন রায় ঠিক এইভাবে এজিট নিত। লোকটা এ-সব ঘাঁতঘোঁত বেশ জানে দেকচি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা কেন জানবে না? যাত্রাদলের কর্তা তো। একটার ফ্লাইটে কোথায় যাচ্ছে, সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আপনি?”
“বিলক্ষণ।” সদানন্দবাবু বললেন, “শিলিগুড়িতে। কাল সেখানে ওর ‘বিলিতি বউ’-এর প্রথম রজনী।”
“কিন্তু তার ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা ঠিকমতো হয়েছে কি না, সেইটে দেখেই কাল ওকে ফিরে আসতে হচ্ছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “থানার থেকে লোক নিয়ে কাল সন্ধেয় ফ্ল্যাটে ঢুকে ওকে জিনিসপত্র বার করে আনতে হবে তো, তাই ওপেনিং নাইটে কাঞ্চনমালার অভিনয় কীরকম উতরোয়, তা আর ওর দেখা হচ্ছে না।”
সদানন্দবাবুকে হঠাৎই বড় চিন্তিত দেখাল। বললেন, “আচ্ছা, আমরাই যে কাল সকালে ওর ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলুম, বীরেশ্বর সেটা বুঝতে পারবে না তো?”
কৌশিক বলল, “ভাবতেই পারবে না। ওর বিশ্বাস, বুড়োর মেক-আপ নিয়ে ছোকরাবয়সী তিন বদমাস ওর ফ্ল্যাটে ঢুকেছিল।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওরে কৌশিক, ও-সব কথা ছেড়ে দিয়ে শোভনকে একবার ফোন কর তো।”
শোভন চৌধুরিকে প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই পাওয়া গেল। কৌশিকের হাত থেকে কর্ডলেস সেটটা নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহে শোভন, বীরেশ্বর সেন যে থানায় ডায়েরি করেছেন, তার ও.সি.কে একটা অনুরোধ করতে পারবে?… বাঃ, তবে তো কথাই নেই। ওঁকে বলে দাও যে, কাল সন্ধে সাতটা নাগাদ বীরেশ্বর সেন ওঁর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। ভদ্রলোককে তাঁর ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে দিতে হবে। …না না, ফ্ল্যাটে উনি থাকতে যাচ্ছেন না, ওঁর জিনিসপত্রগুলো বার করে আনবেন, বাস্। একা যেতে ভরসা পাচ্ছেন না, তাই থানা থেকে দুটো লোক দিয়ে দিতে হবে। …তা হলে ওই কথাই রইল। ধন্যবাদ।”
ভাদুড়িমশাই কর্ডলেস সেটটা নামিয়ে রাখলেন। তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজ বিকেলে মিসেস ঘোষের ওখানে যাচ্ছি, মনে আছে তো?”
বললুম, “কখন যেন ওখানে পৌঁছবার কথা?”
“ছটায়। আপনারা তৈরি হয়ে থাকবেন। সওয়া পাঁচটায় আমি আপনাদের তুলে নেব।”
