একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৭)

সেজেগুজে আমরা একেবারে তৈরি হয়েই ছিলুম। ভাদুড়িমশাইও এলেন ঠিক সওয়া সাতটাতেই। ধাক্কা-দেওয়া জরিপাড় ধুতি আর গরদের পাঞ্জাবিতে ভদ্রলোককে দেখলুম দিব্যি মানিয়েছে। পাত্রপক্ষের শাঁসালো কর্তা বলেই মনে হচ্ছিল। দেরি না-করে বেরিয়ে পড়া গেল।

 

আজ ১০ মার্চ, শুক্রবার। ছুটির দিন নয় ঠিকই, তবু এই সাত-সকালে ট্রাফিকের ভিড় তো একটু হাল্কা থাকবে, অথচ গাড়িঘোড়া আর লোকজনের ভিড় যে একটুও কম, এমন মনে হল না। মৌলালির মোড় পেরিয়ে ডাইনে টার্ন নিয়ে সুরেন বাঁড়ুজ্যে রোডে ঢুকতে ঢুকতেই সাড়ে সাতটা। সেখানে গাড়িটা একটু থামিয়ে রাস্তার ধারের একটা পাবলিক টেলিফোন থেকে ভাদুড়িমশাই কাকে জানি একটা ফোন করলেন। তারপর ফিরে এসে বললেন, “কোথায় যাচ্ছি আন্দাজ করতে পারেন?”

 

বললুম, “কী করে আন্দাজ করব, আমি তো গনতকার নই।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমি বলব?”

 

“বলুন।”

 

“বীরেশ্বর সেনের বাড়িতে।”

 

“শাবাশ!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক বলেছেন। কিন্তু এটা বুঝলেন কী করে?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “এ তো খুবই সিম্পল ব্যাপার। ওঁকে আপনার বাড়িতে আটটার সময় আসতে বলে নিজে যখন তার আগেই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছেন, তখনই ধরতে পেরিচি যে, এমন একটা সময়ে ওঁর বাড়িতে আপনি যেতে চান, যখন কিনা উনি বাইরে থাকবেন। কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো? ফোনটা কাকে করলেন?”

 

আমি বললুম, “নিশ্চয় বীরেশ্বর সেনের বাড়িতে। ফোন করে জেনে নিলেন যে, সত্যিই উনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছেন কি না।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “রাইট। আপনার বুদ্ধিও খুলে গেছে দেখছি।”

 

“ফোনটা তো আমার বাড়ি থেকেও করতে পারতেন।”

 

“তা পারতুম, কিন্তু সেটা একটু রিস্কি হয়ে যেত।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “সওয়া সাতটায় ফোন করলে হয়তো দেখা যেত যে, উনি তখনও বাড়িতেই আছেন। ফোনটাও নিজেই ধরতেন হয়তো। সে-ক্ষেত্রে আমার গলাটা চিনে ফেলা ওঁর পক্ষে শক্ত হত না। আমি অবশ্য নিজের পরিচয় দিয়ে সঙ্গে-সঙ্গেই বলতুম যে, আর দেরি করছেন কেন, এবারে বেরিয়ে পড়ুন মশাই, কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্ট যখন পাক্কা, তখন আবার ফোন করে ওঁকে তাড়া দিতে গেলুম কেন, এই প্রশ্নটা ওঁর মনে দেখা দিতই।”

 

“ফোনটা তো মালতীকে দিয়েও করানো যেত। তা হলে আর এ-সব প্রশ্ন উঠত না।”

 

“তাও উঠত। ঠিক বেরোবার মুখে অচেনা এক ভদ্রমহিলা ওঁকে ফোন করলেন কেন, এই নিয়ে একটা সন্দেহ কি ওঁর মনে দেখা দিত না?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “ও-সব তক্কো ছেড়ে আসল কতায় আসুন দিকি। বীরেশ্বর সেন কি বাড়িতেই আচে, না বেরিয়ে পড়েচে?”

 

“ফোন ধরেছিলেন এক ভদ্রমহিলা। তিনি বললেন, সেনমশাই একটু আগেই বেরিয়েছেন, তবে কোথায় গেছেন, কখন ফিরবেন তা তিনি জানেন না। বলতে যাচ্ছিলুম যে, তাঁর সঙ্গে আমার একটা দরকার আছে, সেইজন্যে একবার দেখা না-করলেই নয়, কিন্তু সেটা বলবার কোনও সুযোগই পাওয়া গেল না, তার আগেই দুম করে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।”

 

“কী মনে হল? সেনমশাইয়ের বউ?”

 

“তা কী করে বলব।” ভাদুড়িমশাই চৌরঙ্গি রোডে পড়ে বাঁয়ে টার্ন নিয়ে গিয়ার পালটে স্পিড বাড়িয়ে হাসলেন। “তবে বউ হোক আর যে-ই হোক, বেশ রাগী। …কী হল সদানন্দবাবু, রাগী শুনে ভয় পেয়ে গেলেন নাকি?”

 

সদানন্দবাবু একেবারে নিবে গিয়েছিলেন। বললেন, “তা একটু পেয়েচি। মানে…ইয়ে….ওঁর সঙ্গেই তো কতা বলতে হবে, অথচ রাগী মহিলাদের যে…ইয়ে…কী করে হ্যান্ডল করতে হয়, তা-ই তো জানা নেই।”

 

বললুম, “মিসেস বসু কখনও রাগমাগ করেন না? তখন কী করেন আপনি?”

 

“কিছুই করি না।” সদানন্দবাবু বললেন, “খানিকক্ষণ চুপচাপ গালমন্দ শুনি, তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। …এটা আমি আমার পিশ্বশুরের কাছে শিকিচি।”

 

“কী রকম?”

 

“আমার পিসশাশুড়ি…মানে ওই যাঁকে মাঝরাত্তিরে একবার চোর ভেবে জাপটে ধরেছিলুম, তিনি তো একজন খাণ্ডার মহিলা, একবার রেগে গেলে আর রক্ষে নেই, সে একেবারে খুনোখুনি কাণ্ড! তারপর আবার তেমনি গলা! তো সেই গলা একবার চড়তে শুরু করলেই হল, পিশ্বশুর অমনি গায়ে একটা পাঞ্জাবি চাপিয়ে সুড়ুত করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেন। তারপর ঘণ্টা তিনেক বাদে বাড়িতে ফিরে আমার পিসতুতো শালিকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করতেন, কী রে বিন্দু, তোর মায়ের রাগ পড়েচে?…বুঝুন ব্যাপার!”

 

বীরেশ্বর সেন প্রথম দিনেই জানিয়েছিলেন যে, তিনি আর শোভন চৌধুরি একই হাইরাইজ বিল্ডিংয়ে থাকেন। ঠিকানা ভাদুড়িমশাইয়ের জানা, বাড়ি চিনতেও যে অসুবিধা হল না, তার কারণ এ রাস্তায় উঁচু বাড়ি বলতে এখনও কুল্যে একটাই, আটটাতেই আমরা সেখানে পৌঁছে গেলুম। বাড়িটা থেকে একটু দূরে রাস্তার ধারে গাড়ি পার্ক করে ভাদুড়িমশাই বললেন, “সো ফার সো গুড।, এখন কাজের কথাটা বলি, বেশ মন দিয়ে শুনুন। আমরা এখানে আসছি একটা যাত্রা-কোম্পানির কর্তা হিসেবে। কথা যা বলার, বেশিরভাগ আমিই বলব। তবে আপনারাও একেবারে চুপ করে থাকবেন না, তাল বুঝে হুঁ-হাঁ দিয়ে যাবেন। ঘাবড়াবার কিছু নেই।”

 

বীরেশ্বর সেন যে তিনতলায় থাকেন, এটাও তাঁরই কাছে সেই প্রথম দিনেই শুনেছি। বাড়ির একতলায়, লিফটের পাশে লেটার-বক্সের সারি। তাতে চোখ বুলিয়ে জানা গেল, ফ্ল্যাটের নম্বর থ্রি-এ। অটোমেটিক লিফটে তিনতলায় উঠে থ্রি-এ’র ডোর বেল বাজাতে ভিতর থেকে কেউ বিরক্ত গলায় বললেন, ‘কে?’ চটির শব্দ শুনে এটাও বোঝা গেল যে, দরজার দিকে কেউ এগিয়ে এসেছেন। তবে সঙ্গে-সঙ্গেই যে দরজা খুলল, তা নয়। মনে হল আই-হোলে চোখ রেখে তিনি দেখে নিচ্ছেন আমাদের। দরজা খুলল তার আধ মিনিট বাদে। তাও পুরোটা খুলল না। সেটি চেনটা খোলা হয়নি বলে দরজার একটা পাল্লা একটু পিছিয়ে গিয়ে ইঞ্চি ছয়েক ফাঁক হল মাত্র।

 

ফাঁকের ওদিকে যাঁকে দেখা গেল, সেই মহিলাটির বয়স মনে হল বছর চল্লিশেক। তবে মুখে-চোখে সন্দেহ, অসন্তোষ ও অতৃপ্তির স্পষ্ট একটা ছাপ পড়েছে বলে আরও বেশি দেখায়। হাতে চিরুনি দেখে আন্দাজ করলুম, চুল আঁচড়াতে-আঁচড়াতে উঠে এসেছেন। ভুরু নেই, ঠোঁট শুকনো, সিঁথি সাদা, চুলে সামান্য পাক ধরেছে। সেফটি-চেন না খুলেই বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে চাই?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মহামায়া অপেরার নাম শুনেছেন?”

 

“না তো।”

 

“শোনবার কথাও নয়। নতুন দল করেছি কিনা, তবে হ্যাঁ, টাকার অভাব নেই। এই ইনি…” ডান হাতের তর্জনী তুলে সদানন্দবাবুকে দেখিয়ে দিয়ে, “ইনি হচ্ছেন বাঁশবেড়ের নেত্যগোপাল নন্দী। একটা সিনেমা হল, তিনটে ভিডিয়ো পার্লার, পেল্লায় একটা ইটভাটা আর দু-দুটো কোল্ড স্টোরেজের মালিক। তা ছাড়া ট্রাকও আছে পাঁচখানা। তো ইনিই টাকা ঢালছেন। লোয়ার চিৎপুর রোডে টেরিটি বাজারের কাছে আপিসও খুলেছি। টেলিফোন অবিশ্যি পাইনি, তবে পেয়ে যাব, ঠিক-ঠিক জায়গায় টাকা ধরিয়ে দিয়েছি তো, হপ্তাখানেকের মধ্যেই পেয়ে যাব।”

 

ভদ্রমহিলা যে কৌতূহল বোধ করতে শুরু করেছেন, সেটা তাঁর চোখ দেখেই বোঝা যায়। সেটি চেনটা খুলে দিয়ে, বাইরে এসে বললেন, “আপনারা কাকে চান, তা তো কই বললেন না।”

 

সদানন্দবাবুর কাণ্ডকারখানা দেখে বোধহয় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাকে মাঝে-মাঝেই চমকে যেতে হবে। তবে আজ যা করলেন, তার আর কোনও জবাব নেই। ভদ্রলোক যে অ্যাকটিংটা এত ভাল করেন, তা অবশ্য জানা ছিল। ভাদুড়িমশাই কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাঁকে থামিয়ে দিয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “ওহে নবকেষ্টো, ঝুটমুট লুকোছাপা করে দরকার কী, যা বলতে এয়েচ, সেটা বলেই ফ্যালো না!”

 

ভাদুড়িমশাই চমকে গিয়েছিলেন নিশ্চিত, কিন্তু চালাক লোক তো, তাই সেটা বুঝতে দিলেন না। বললেন, “বলছি বলছি। ঠিক জায়গায় এসে পড়েছি যখন, সবই বলব। আমাদের ওপেনিং পালা এই নন্দীমশাই-ই লিখে দিয়েছেন। নামও দিয়েছেন জব্বর— ‘ঘোমটা গেল খসে’। জমজমাট ব্যাপার, ওপরতলার লোকগুলোর মুখোশ একেবারে টেনে খসিয়ে দিয়েছেন। পাবলিক যে এটা গপ্ করে খেয়ে নেবে, এ আমি হলপ করে বলতে পারি।” আমার দিকে তাকিয়ে, “কী হে পশুপতি, পালাখানা তো তুমিও পড়েছ, তা আমি কি বাড়িয়ে বলছি নাকি?”

 

সদানন্দবাবু আপ্যায়িতের হাসি হাসছেন। ঢোক গিলে বললুম, “একটুও না, একটুও না।”

 

ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “শুনলেনই তো। তা মুশকিলটা কী হয়েছে জানেন?”

 

“কী হয়েছে?”

 

“মহড়া চলছে, কিন্তু…”

 

“কিন্তু কী?”

 

“কী বলব, ম্যাডাম,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিকমতো একজন হিরোইনই খুঁজে পাচ্ছি না। ….মানে একেবারেই যে পাইনি, তা নয়, পেয়েছি, কিন্তু তাদের কাউকে দিয়েই কাজ চলছে না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “খেলে যা! ওহে নবকেষ্টো, শুধু কাজ চলচে না বললেই কি হয়, কেন চলচে না, সেটা বলো।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেই কথাই তো বলছি। কুন্দর কথাই ধরুন। কী জানেন ম্যাডাম, আমাদের কুন্দ…মানে আমি ছোট-কুন্দর কথা বলছি…ছোট-কুন্দ যে সুন্দরী নয়, এমন কথা বললে ধৰ্ম্মে সইবে না, আর তা আমি বলবই বা কেন…কিন্তু ধোপে টিকছে না। উচ্চারণ বিচ্ছিরি, ফিলিং নেই, গলা থ্রো করতে পারে না, আরে দূর দূর, শুধু চেহারার চটক দিয়ে কি কাজ চলে? তাই ভাবছিলুম যে…

 

দরজার ফাঁক দিয়ে ভদ্রমহিলা যখন বলেছিলেন ‘কাকে চাই’, তখন তাঁর গলায় যে বিরক্তি ফুটেছিল, দেখলুম যে, ইতিমধ্যে সেটা উবে গেছে। রীতিমতো সলজ্জ ভঙ্গিতে বললেন, “এ কী, আপনারা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন কেন, ভিতরে আসুন।”

 

ভিতরে ঢুকে আরাম করে বসা গেল। ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ, যা বলছিলুম…”

 

কিন্তু এবারেও তিনি কথাটা শেষ করতে পারলেন না। ভদ্রমহিলা বললেন, “আমাকে জাস্ট তিনটে মিনিট সময় দিন। একটা কাজ করতে-করতে চলে এসেছিলুম। সেটা শেষ করে এসে আপনাদের কথা শুনব।”

 

বলে তিনি আর-একটা ঘরের মধ্যে ঢুকে গেলেন।

 

ফিরে এলেন মিনিট পাঁচেক বাদে। কাজটা যে এই পাঁচ মিনিট ধরে কী করছিলেন, সেটাও তখন মালুম হল।

 

ভদ্রমহিলার ভোল একদম পালটে গেছে। এতক্ষণ তাঁর চোখের উপরে ভুরু ছিল না। এখন সেখানে ফিরে এসেছে নিপুণ হাতে আঁকা দুটি ভুরু। কাজল না থাকায় চোখ দুটিকে দেখাচ্ছিল আলুনি আলুভাতের মতো! এখন সেখানে কাজল টানা। ঠোঁট দুটিও এখন আর ফ্যাকাশে নয়, তাতে কালচে-লাল রঙের লিপস্টিক বুলোনো হয়েছে। মাথার সামনের দিকে যে কয়েকগাছি পাকা চুল ইতিপূর্বে চোখে পড়েছিল, তাও দেখলুম ভ্যানিশ। ভদ্রমহিলা যে এককালে বেশ সুন্দরী ছিলেন, সেটা বোঝা যায়। তখন নিশ্চয় এত মেহনত করে সুন্দরী সাজার দরকার হত না।

 

আমাদের তিনজনের মধ্যে নেত্যগোপাল নন্দী অর্থাৎ সদানন্দবাবুই যে সবচেয়ে শাঁসালো ব্যক্তি, এবং মহামায়া অপেরার পিছনে তাবৎ টাকা যে তিনিই ঢালছেন, সম্ভবত সেটা জেনে যাওয়ার ফলেই ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকে একেবারে তাঁর পাশ ঘেঁষে বসে পড়লেন, তারপর নবকেষ্ট অর্থাৎ ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে নকল ভুরু বাঁকিয়ে বললেন, “কী বলছিলেন যেন?”

 

মাথার উপরে ফুলস্পিডে ফ্যান চলছে। ভদ্রমহিলার শিফনের শাড়ির আঁচল তার ফলে বারবার উড়ে গিয়ে পড়ছে সদানন্দবাবুর গায়ে। কিন্তু সদানন্দবাবু যে তাতে খুব-একটা অস্বস্তি বোধ করছেন, অন্তত তাঁর মুখ দেখে তা মনে হয় না। অস্বস্তি তাঁর হবেই বা কেন। তিনি এখন জেঙ্কিন্‌স অ্যান্ড জেঙ্কিসের শিপিং ডিপার্টমেন্টের রিটায়ার্ড বড়বাবু সদানন্দ বসু নন, একটা সিনেমা হল, তিনটে ভিডিয়ো পার্লার, একটা ইটভাটা, দুটো কোল্ড স্টোরেজ আর পাঁচখানা ট্রাকের মালিক নেত্যগোপাল নন্দী। সুতরাং নন্দীমশাইয়ের পক্ষে তাঁর অধস্তনদের সঙ্গে যে-ভাবে কথা বলা স্বাভাবিক, সেইভাবেই বললেন, “আঃ, নবকেষ্টো, তোমাকে নিয়ে আর পারা গেল না! যা বলার পষ্টাপষ্টি এঁয়াকে বলে দাও।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরা ম্যাডাম আপনার হাজব্যান্ড বীরেশ্বরবাবুর সঙ্গে একটু কথা কইতে চাই।”

 

“কী ব্যাপার?”

 

“না মানে তেমন কিছু না,” কাঁচুমাচু হয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা পারমিশান নেবার ছিল। অবিশ্যি তার জন্য টাকা যা লাগে, নন্দীমশাই তা দিয়ে দেবেন।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “তা দোব বই কী। আমার কতা হচ্চে ফ্যালো কড়ি মাকো তেল। যত টাকা লাগে দোব। পারমিশান নিতে এয়েচি, আর টাকা দোব না? তাও কখনও হয়?”

 

ভদ্রমহিলা বললেন, “কীসের পারমিশান?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “পারমিশানটা ম্যাডাম আপনারই জন্যে।”

 

ভদ্রমহিলার ভুরু আধ-ইঞ্চি উপরে উঠে গেল। বললেন, “ঠিক বুঝতে পারছি না।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “বুজিয়ে বলো নবকেষ্টো, বুজিয়ে বলো।”

 

“আজ্ঞে বুঝিয়েই তো বলছি।” সদানন্দবাবুর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার হাজব্যান্ড তো ‘বিলিতি বউ’ বলে একটা নতুন পালা নামাচ্ছেন, তাই না?”

 

“তা নামাচ্ছেন।”

 

“তার হিরোইনের পার্ট পেয়েছে কাঞ্চনমালা। যাত্রাজগতের নতুন উর্বশী বলে শুনলুম তার ঢাকও পেটানো হচ্ছে খুব। তা আমরা বলছিলুম যে…ও কী, আপনি রেগে গেলেন নাকি?”

 

ভদ্রমহিলার চোখ দুটো যে দপ্ করে জ্বলে উঠেছে, সেটা আমিও লক্ষ করেছিলুম। মনে হচ্ছিল, ওই চোখ থেকে এবার আগুন ছিটকে বেরোবে। সেই অবস্থাতেই দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, “উর্বশী না ছাই!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একেবারে খাঁটি কথাটাই বলেছেন। উর্বশী না ছাই! আরে বাবা, আমাদের ‘ঘোমটা গেল খসে’ পালাটার জন্যে যেমন ছোট-কুন্দ, তেমন ওই কাঞ্চনকেও তো আমরা দু’চার বার ট্রায়াল দিয়ে দেখেছিলুম। কিন্তু তাতে হল কী? ও কি অ্যাক্টিংয়ের কিছু বোঝে?”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “কি না, কি না।”

 

“তা সে যাকগে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমাদের পছন্দ হয়নি বলেই যে বীরেশ্বরবাবুর পছন্দ হবে না, এমন তো কোনও কথা নেই। তবে কিনা আমাদের কথাটা হল, ঠিক আছে, বীরেশ্বরবাবু যখন নতুন হিরোইন পেয়েই গেছেন, তখন তাকেই নামান, কিন্তু পুরনো হিরোইনকে…মানে আপনাকে তা হলে আটকে রাখবেন কেন? তাঁকে বরং আমাদের পালায় নামতে দিন। …কী, আমরা কি কোনও অন্যায্য কথা বলছি?”

 

ভদ্রমহিলা এ-কথার কোনও জবাব না দিয়ে বললেন, “আপনারা কি আমাকে হিরোইনের পার্টটা দিতে চাইছেন?”

 

“যাচ্চলে, এতক্ষণ ধরে আমরা এই কথাটাই তো বলতে চাইছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এই যে নন্দীমশাইকে দেখছেন, ব্যাবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন বলে যে উনি অ্যাক্টিংয়ের ব্যাপারটা বোঝেন না, তা ভাবলে কিন্তু মস্ত ভুল করবেন। ওটাও উনি দারুণ বোঝেন। এককালে নিজেও অ্যাক্টিং করতেন কিনা, ও ব্যাপারে তাই ওঁকে ফাঁকি দেবার জো নেই। কী একটা পালায় যেন আপনার অ্যাক্টিং দেখেছিলেন, ব্যাস, সেই থেকে বলে আসছেন যে, ও-সব কুন্দ-কাঞ্চনকে দিয়ে চলবে না, হিরোইনের ক্যারেকটারটা তো ওঁর কথা মাথায় রেখেই করেছি, তাই ওঁকেই এখানে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো।”

 

“আপনারা আমাকে কত দেবেন?”

 

সদানন্দবাবু মনে হল এই প্রশ্নটার জন্য একেবারে তৈরি হয়েই ছিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে বললেন, “পার নাইট টু থাউজ্যান্ড।”

 

ভদ্রমহিলা এর আদ্ধেক টাকাতেই বোধহয় রাজি হয়ে যেতেন, কিন্তু নেত্যগোপাল নন্দীর যে তাঁকেই চাই, সম্ভবত এটা বুঝে গিয়েছিলেন বলেই সদানন্দবাবুর আরও একটু গা ঘেঁষে বসে বললেন, “তা তো বুঝলুম, কিন্তু …”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার হাজব্যান্ডের পারমিশান চাই, এই তো?”

 

একেবারে ছিলে-ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে উঠে ভদ্রমহিলা বললেন, “তখন থেকে এত হাজব্যান্ড-হাজব্যান্ড করছেন কেন বলুন দিকি? কে আমার হাজব্যান্ড?”

 

“কেন, বীরেশ্বর সেন।”

 

“ও কেন আমার হাজব্যান্ড হতে যাবে। ফ্ল্যাট আমার, নিজের টাকায় কিনেছি! তবে একা তো আর থাকা যায় না, হাট-বাজার কে করে দেবে! তাই একা একটা ঘরে ওকে থাকতে দিয়েছি, ব্যস!”

 

“কিন্তু ওর সঙ্গে একটা চুক্তি তো আপনার আছে! আমাদের কোম্পানিতে এলে তার খেলাপ হবে না?”

 

“কোনও চুক্তি নেই।” ভদ্রমহিলা ধপ করে ফের সদানন্দবাবুর গা ঘেঁষে বসে পড়লেন। “চুক্তি থাকলেই কি আমি তার পরোয়া করতুম নাকি?”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে তো মিটেই গেল। তবে কিনা এই নিয়ে না উনি আবার কোনও হাঙ্গামা করেন।”

 

“হাঙ্গামা করলে এই ফ্ল্যাট থেকে ওকে ঘাড়ে ধরে বার করে দেব।” ভদ্রমহিলা বললেন, “থাকবে আমার বাড়িতে, আর কলকাতার বাইরে গিয়ে কাঞ্চনকে নিয়ে ফূর্তি করার জন্যে ওকে দেবে হিরোইনের পার্ট! চালাকি বার করে দিচ্ছি!”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “বাঁচা গেল! বড্ডই দুর্ভাবনায় ছিলুম হে নবকেষ্টো! বড্ডই দুর্ভাবনায় ছিলুম!”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর তো আপনার কোনও দুর্ভাবনা রইল না নন্দীমশাই। ওঁকে যখন পাচ্ছি, তখন পালা একেবারে রমরম করে চলবে।”

 

ভদ্রমহিলা বললেন, “শুধু একটা কথা।”

 

“বলুন।”

 

“আপনারা বিজ্ঞাপন দেবেন তো, তাতে আমার নামটা যেন একটু বড় টাইপে ছাপা হয়।”

 

“সে তো আমরা ভেবেই রেখেছি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ল্যাঙ্গুয়েজটাও শুনে রাখুন। ‘ঘোমটা গেল খসে’ পালায় যাত্রা-সম্রাজ্ঞী বিদিশা দেবীর নবতম অবদান। এটা শুধু খবরের কাগজের বিজ্ঞাপনে নয়, হোর্ডিংয়েও যাবে।”

 

“আর-একটা কথা। ওটা যদি আড়াই হাজার করে দেন।”

 

সদানন্দবাবু আজ দাতা কর্ণ। হেসে বললেন, “তা-ই দোব। পার নাইট আড়াই হাজার। সেই সঙ্গে কলকাতায় শো হলে আলাদা মেক-আপ রুম আর মফস্বলে গেলে আলাদা শোবার ঘর। শুধু আপনার ফাই-ফরমাশ খাটবার জন্যে আলাদা ঝিও রেখে দোব একটা। …কী বলো হে পশুপতি?”

 

আমি এতক্ষণ হাঁ করে সব শুনছিলুম, আর মাঝেমধ্যেই তাকাচ্ছিলুম ঘড়ির দিকে। সওয়া ন’টা বাজে। আর দেরি করা ঠিক নয়। বীরেশ্বর সেন হঠাৎ ফিরে এলেই তো গেছি। হঠাৎ ‘পশুপতি’ নামটা শুনে চমকে গিয়ে বললুম, “তা তো বটেই, তা তো বটেই।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আজ তা হলে ওঠা যাক। দু’-এক দিনের মধ্যেই আমরা অ্যাডভান্সের টাকা দিয়ে যাচ্ছি।”

 

ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলুম আমরা। রাস্তায় এসে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি আজ সকলের উপরে টেক্কা দিয়েছেন, সদানন্দবাবু। এত ভাল অ্যাক্টিং! এ তো ভাবাই যায় না।”

 

“বাঃ, এতে এত অবাক হচ্চেন কেন?” অমায়িক হেসে সদানন্দবাবু বললেন, “আমাদের আপিস-ক্লাবের থিয়েটারে আমি রেগুলারলি অ্যাক্টিং করতুম যে! ‘চন্দ্রগুপ্ত’ পালায় কাত্যায়ন হয়েছিলুম আর ‘প্রফুল্ল’তে যোগেশ! সে তো আগেও আপনাদের বলিচি।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক, ঠিক। … তা আজ বিকেলে একবার কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে আসতে পারবেন!”

 

“তা পারব। কিন্তু একটা কতা বলুন তো। এই যে আজ এখেনে এলেন, এটা কি কোনও খবরের ওপরে বেস করে?”

 

“আসবার ডিসিশানটা নিয়েছিলুম আন্দাজে। তবে কাল আপনারা চলে আসার পরে রাত্তিরে দুটো ফোন পাই। তাতে বুঝলুম, যে-সব আন্দাজ করেছি, তার একটাও ভুল নয়। বিকেলে চলে আসুন, তখন সব বলব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *