একটি হত্যার অন্তরালে (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

(১৬)

ভেবেছিলুম, ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্‌সের তো টাইম-শিডিউলের কোনও মা-বাপ নেই, প্লেন হয়তো আজ আরও লেট করবে। কিন্তু না, কম্পিটিশানের মুখে পড়েছে বলেই বোধহয় টেক-অফ টাইম আজ আর পিছোল না। ঠিক সওয়া তিনটেতেই টার্মিনালের অ্যাপ্রন-এরিয়া ছেড়ে আমাদের প্লেন রানওয়ের উপরে পৌঁছে ধীরেসুস্থে খানিকটা এগিয়ে, একেবারে ঘুরে দাঁড়িয়ে, একটু থেমে থেকে শুরু করল তার দৌড়, তারপর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আকাশে উঠে পড়ল। ডোমেসটিক ফ্লাইটে ধূমপান এখন সর্বৈব নিষিদ্ধ। নিষেধ-বার্তার আলোটা তবু নিয়ম-মাফিক এতক্ষণ জ্বলছিল, সেটা নিভে যাওয়ার পরেও কেউ তাই সিগারেট ধরালেন না। এয়ারহোস্টেসরা তার আগেই দেখিয়ে দিয়েছেন যে, সিট-বেল্ট আর লাইফ-জ্যাকেট কীভাবে বাঁধতে ও ব্যবহার করতে হয়, আর প্লেনের মধ্যে নিশ্বাস-প্রশ্বাসের অসুবিধে ঘটার মতো অবস্থার সৃষ্টি হলে মাথার উপরকার লকারের তলা থেকে অক্সিজেন-মাস্ক কীভাবে আপনা থেকেই ঝুলে পড়ে।

 

সদানন্দবাবু এতক্ষণ প্রাথমিক এইসব ক্রিয়াকলাপ খুব মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করে যাচ্ছিলেন। তারপরে আর ভিতরে কিছু দেখবার নেই বুঝে তিনি আবার জানলায় মুখ রেখে নীচের পৃথিবীর জমিজায়গা ও আকাশের শোভা দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।

 

ভাদুড়িমশাইও এতক্ষণ কোনও কথা বলেননি। এবারে অনুচ্চ গলায়, অনেকটা যেন নিজেকে শুনিয়ে বললেন, “বড্ড ভাবিয়ে তুলল দেখছি।”

 

কথাটা আমার কানে গিয়েছিল। তাই বললুম, “কী হল?”

 

ইকনমি ক্লাসের আসনে বসা যায় ঠিকই, কিন্তু নড়াচড়া বিশেষ করা যায় না। তবু তারই মধ্যে একটু ঘুরে বসে ভাদুড়িমশাই বললেন, “জানকী ঘোষ সম্পর্কে কাগজে যে খবর বেরিয়েছিল, ভদ্রলোকের বয়েস সম্পর্কে তাতে কী বলা হয়েছিল, মনে আছে?”

 

“ভালই মনে আছে।”

 

“কত?”

 

“পঁয়তাল্লিশ।”

 

“রাইট। সেই জন্যেই একটু চিন্তায় পড়ে গেছি।”

 

“কেন?”

 

“সেদিনকার সবগুলো কাগজই মিলিয়ে দেখেছি। ইংরেজি, বাংলা – সব। তা দেখলুম যে, সব্বাই ওই পঁয়তাল্লিশই লিখেছে।”

 

“তা তো লিখতেই পারে। সব্বাই যখন পঁয়তাল্লিশ লিখেছে, তখন ধরে নিন যে, ওটাই জানকী ঘোষের কারেক্ট এজ।”

 

“তা নিচ্ছি, কিন্তু সেটাই তো ভাবনার কথা।”

 

বললুম, “যাচ্চলে, এ নিয়ে এত ভাববার কী আছে?”

 

ভাদুড়িমশাই আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর সামান্য হেসে বললেন, “আপনি বলছেন এ নিয়ে ভাববার কিছু নেই? আশ্চর্য!”

 

কিছুই বুঝতে পারলুম না। কিন্তু ভাদুড়িমশাইও সেই যে চুপ করে গেলেন, সারাটা পথ আর একটাও কথা বললেন না। মুখ খুললেন একেবারে দমদম এয়ারপোর্টে নেমে। টার্মিনাল বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে এসে ট্যাক্সির মধ্যে বসে বললেন, “একটা প্রস্তাব ছিল।”

 

বললুম, “বলুন।”

 

“যদি ইচ্ছে হয়, তো কাঁকুড়গাছিতে আমাকে নামিয়ে দিয়ে এই ট্যাক্সিটা নিয়েই আপনারা সরাসরি শেয়ালদায় আপনাদের বাড়িতে চলে যেতে পারেন। কিন্তু আমি বলি কী, ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিয়ে মালতীদের বাড়িতে বসে এক কাপ চা খেয়ে যান। একটু বিশ্রামও হবে।”

 

বললুম, “ফিরতে দেরি হলে বাসন্তী বড় চিন্তা করবে যে।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমার ওয়াইফও খুব চিন্তায় পড়ে যাবেন।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটা আমার উপর ছেড়ে দিন, আমি ফোন করে বাসন্তীকে জানিয়ে দেবখন যে, চিন্তার কিছু নেই। আসলে তিনটে দিন তো আমরা কলকাতায় ছিলুম না। তাই ভাবছিলুম যে, এর মধ্যে যদি নতুন কোনও ডেভেলাপমেন্ট হয়ে থাকে তো আপনাদের সেটা জেনে যাওয়া ভাল।”

 

“কী রকমের ডেভেলাপমেন্ট হওয়া সম্ভব?”

 

“সে আমি কী করে বলব।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তবে হ্যাঁ, মিসেস ঘোষ তো ইতিমধ্যে আমাদের কাছ থেকে কোনও সাড়াশব্দ পাননি, তাই অধৈর্য হয়ে তিনি হয়তো ফোন-টোন করে থাকতে পারেন। দেখা যাক।”

 

অনুমানটা যে ভুল, সেটা কাঁকুড়গাছির ফ্ল্যাটে ঢুকে বোঝা গেল। কৌশিক বলল, “মিসেস ফুলকুমারী ঘোষ এর মধ্যে একদিনও ফোন করেননি। তবে ও-লোকটা তো নিত্যি জ্বালাচ্ছে।”

 

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ও-লোকটা মানে?”

 

“মানে তোমাদের ওই বীরচন্দ্র সেন।”

 

“বীরচন্দ্র নয়, বীরেশ্বর সেন। সে কী করেছে?”

 

“তোমরা তো গত সোমবার দুপুরে সিকিম রওনা হলে। সেইদিনই রাত্তিরে ফোন করে তোমাকে চাইল।”

 

“তুই তাকে কী বললি?…মানে সিকিম গেছি, সেটা বলিসনি তো?”

 

“তা-ই কখনও বলি?” কৌশিক হাসল, “বললুম যে, তুমি একটা জরুরি কাজে জামশেদপুরে গেছ; কবে ফিরবে ঠিক নেই।”

 

“তারপর?”

 

“তারপর মঙ্গলবারও ফোন করেছিল। আবার কালকেও করেছিল। থ্রাইস। সকালে, দুপুরে আর রাত্তিরে।”

 

“আজ এর মধ্যে ক’বার করেছে?”

 

“একবার। সকালে।”

 

“কিছু বলল?”

 

“বলল যে, তোমার সঙ্গে নাকি দেখা না-করলেই নয়।”

 

“কেন দেখা করতে চায়, জিজ্ঞেস করেছিলি?”

 

“তা করেছিলুম বই কী। তাতে বলল যে, কে নাকি ওকে ফোন করে রোজ হুমকি দিচ্ছে।”

 

“তা হলে নিশ্চয় আজ আবার ফোন করবে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “বড্ড ক্লান্ত লাগছে, তোর মা’কে তিন কাপ চা দিতে বল।”

 

কৌশিককে আর চায়ের কথা বলবার জন্যে ভিতরে যেতে হল না। তার আগেই ট্রের উপরে চায়ের সরঞ্জাম সাজিয়ে মালতী এসে ড্রয়িংরুমে ঢুকল। তারপর সেন্টার টেবিলে ট্রেটা নামিয়ে পট থেকে পেয়ালায় চা ঢালতে ঢালতে বলল, “কাজের মেয়েটা এ-বেলায় আসেনি, দাদা, এই যা দিলুম, ব্যস, এরপরে আর চা দিতে পারব না।”

 

“সে দেখা যাবেখন,” বলে ভাদুড়িমশাই তাঁর পেয়ালায় দুধচিনি মিশিয়ে সবে পেয়ালা তুলে চুমুক দিতে যাচ্ছেন, এমন সময় ফোন বেজে উঠল।

 

কর্ডলেসটা তুলে বোতাম টিপে কৌশিক বলল, “হ্যালো…হ্যাঁ, এসেছেন…একটু ধরুন।” তারপর রিসিভারের মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল, “মামাবাবু, সেই লোক, তোমাকে চাইছে।”

 

সেটটা হাতে নিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি চারু ভাদুড়ি। …হ্যাঁ, জামশেদপুরে যেতে হয়েছিল। তা ব্যাপার কী?”

 

অতঃপর যে একতরফা কথা আমাদের কানে এল, সেটা এইরকম :

 

“ভয় দেখাচ্ছে?…ঠিক কী বলছে বলুন তো?…অ্যা, অ্যাসিড ছুড়ে মুখ পুড়িয়ে দেবে?…লাশ ফেলে দেবার কথাও বলেছে?…এ তো দেখছি ভয়ঙ্কর ব্যাপার! পুলিশকে জানিয়েছেন তো?…সে কী, রোবার রাত্তির থেকে এইভাবে ভয় দেখাচ্ছে, তবু জানাননি?…কাজটা ভাল করেননি, মিঃ সেন…আহা সে-কথা হচ্ছে না, আমি তো আছিই, কিন্তু পুলিশকেও জানিয়ে রাখার দরকার ছিল…কী বললেন? কথা শুনে মনে হয় যে বাঙালি নয়?…আরে, আপনি তো দেখছি অদ্ভুত লোক! হিন্দিতে কথা বলছিল বলেই আপনি ধরে নিলেন যে, সে অবাঙালি?… দিন কয়েকের জন্যে আপনাকে বাইরে যেতে হচ্ছে?…বেশ তো, ফিরে এসে দেখা করুন। …দেরি করা ঠিক হবে না?…তার আগেই দেখা করতে চান?…তা তো বটেই। ঠিক আছে, তা হলে বরং কাল সকালেই চলে আসুন। …সকাল আটটায় এলে ভাল হয়, তার কারণ ন’টায় আমাকে একটু বেরোতে হবে। …হ্যাঁ, ওই কথাই রইল, নমস্কার।”

 

ভাদুড়িমশাই কর্ডলেসটাকে অফ্ করে দিয়ে কৌশিকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “বীরেশ্বর সেন কাল সকাল আটটায় আমার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন। তুই তাঁকে কথাবার্তা বলে আটটা থেকে অন্তত ন’টা পর্যন্ত আটকে রাখবি। বলবি যে, মামাবাবু একটু বেরিয়েছেন, এক্ষুনি এসে পড়বেন।”

 

“আর তুমি? তুমি বাড়িতে থাকবে না?”

 

কী করে থাকব? আমি তো সাতটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ছি। দশটার আগে ফিরব না। …হ্যাঁরে কৌশিক, তুই তো আমারই মতো লম্বা আর আমারই মতো রোগা। তোর ধুতি-পাঞ্জাবি আছে?”

 

“তা এক সেট আছে। চুনোট করা জরিপাড় ধুতি আর গরদের পাঞ্জাবি।”

 

“চমৎকার!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কাল সকালে ও দুটো আমাকে তিন ঘণ্টার জন্যে ধার দিস। ওই পরেই বেরোব।”

 

আমি বললুম, “ব্যাপার কী বলুন তো?”

 

কথাটার জবাব না-দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাদেরও ধুতি-পাঞ্জাবি আছে তো? মানে নেমন্তন্ন-বাড়িতে যাবার মতো ধুতি-পাঞ্জাবি?”

 

আমি বললুম, “তাঁতের ধুতি আছে, সিল্কের পাঞ্জাবি নেই। আদ্দির পাঞ্জাবিতে চলবে?”

 

“তা চলবে, তবে গিলে-হাতা হলে ভাল হয়।”

 

সদানন্দবাবু বললেন, “আমার মশাই আদ্দি আর তসর, দুই-ই আচে। এখনও কাজেকম্মে শ্বশুরবাড়ি যেতে হয় তো, তখন মশাই তসর চড়িয়ে না-গেলে প্রেস্টিজ থাকে না।”

 

“ঠিক আছে। দু’জনেই বেশ সেজেগুজে, পাঞ্জাবিতে দু’চার ফোঁটা এসেন্স ঢেলে তৈরি হয়ে থাকবেন। সাড়ে সাতটার আগেই আমি আপনাদের তুলে নিচ্ছি। দশটার মধ্যেই আবার যার-যার বাড়িতে ফিরে আসবেন।”

 

কৌশিক এতক্ষণ একেবারে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এবারে বলল, “কী ব্যাপার বলো তো? এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছ তোমরা?”

 

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “তোর জন্যে মেয়ে দেখতে যাচ্ছি। এই বোশেখেই তোর বিয়ে দেব।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *