আজব বলের রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

শেয়ার করুনঃ

 

পাঁচ

 

এবার যুদ্ধটা দেখার মতো হত। কিন্তু সম্রাট চাংকো বেরিয়ে গেলেন। আমরাও বেরোলুম। উনি ব্যস্তভাবে হাতের একটা খুদে যন্ত্রের মাথায় বল কুড়িয়ে আটকে ট্রিগারে চাপ দিতে থাকলেন এবং বলগুলো উধাও হয়ে গেল। বুঝলুম, গোরিলাবাহিনীকে বল জোগাচ্ছেন। তা না হলে ওরা এই গ্রহে ফিরে বিপদে পড়বে। একটার-পর-একটা বল ছুঁড়ছিলেন সম্রাট চাংকো। সেই সময় ভবেশবাবু ফিসফিস করে বললেন, “জয়ন্তবাবু! এমন সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। চলুন, পালিয়ে যাই!” ।

 

কথাটা মনে ধরল। ভোঁদাকে ইশারা করলুম। সে গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

 

তখন ভবেশবাবু তার কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে থাকলেন। সম্রাট চাংকো ক্রমশ বল ছুঁড়তে-ছুঁড়তে এগিয়ে চলেছেন। আমাদের লক্ষ করার সময় নেই ওঁর।

 

আজব পুরী থেকে বেরিয়ে পড়তে অসুবিধে হল না। কারণ সব প্রহরী গোরিলা-মানুষ তাদের সম্রাটের কাছে গিয়ে জুটেছে এবং হাম্বা হাম্বো করে সম্ভবত তার জয়ধ্বনি দিচ্ছে। তা ছাড়া তারা তাদের বাহিনীর বিপদ টের পেয়েও থাকবে।

 

সোজা গিয়ে পৌঁছলুম। স্পেসশিপের কাছে। আশ্বস্ত হয়ে দেখলুম, কোনো গোরিলা-মানুষ ওটার কোনো ক্ষতি করেনি। আসলে জায়গাটা ওদের বসতি এলাকা থেকে দূরে।

 

স্পেসশিপে মামা-ভাগনেকে ঢুকতে বললুম। দু’জনে মুখ-তাকালাকি করে অবশেষে ঢুকলেন। তারপর ভোঁদা বলল, “দাদা! এটা কী প্লেন? এমন প্লেন তো কখনও দেখিনি।”

 

বললুম, “এটা স্পেসশিপ। প্লিজ, চুপচাপ বসে থাকুন। সিটবেল্ট শক্ত করে বেঁধে নিন। আর বলগুলো বাইরে ফেলে দিন।”

 

স্পেসশিপটা চালানোর অভিজ্ঞতা খানিকটা হয়েছে। বলগুলো থাকলে আগের অবস্থা হত। তাই বলগুলো অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফেলতে হল। মামা-ভাগনে এতে আপত্তি করলেন না। ওঁরা পালাতে পারলে বাঁচেন বলেই মনে হচ্ছিল। ভোঁদা-পালোয়ান কিছুক্ষণ আগেই এই গ্রহে থাকতে জেদ ধরেছিল। এখন সে খ্যাখ্যা করে হেসে বলল, “বাপস! এখানে মানুষ থাকে? ওদিকে আমার ক্লাবের অ্যানুয়াল ফাংশন পয়লা বোশেখ। কত্ত কাজ বাকি আছে।”

 

বোম টিপে স্পেসশিপে স্টার্ট দিলুম। এবার লক্ষ করলুম, প্রত্যেকটা বোতামে নির্দেশ লেখা। আছে। কাজেই আর আমাকে পায় কে? স্পেসশিপ নিমেষে আকাশে উঠে গেল।

 

কিন্তু কুমড়ো-মানুষদের সেই কিটো গ্রহে যাব কী করে? খুঁজতে-খুঁজতে একটা বোতামে লেখা দেখলুম, “এনকোয়ারি।” সেটা টিপতেই ছোট্ট ভিশনস্ক্রিনে সবুজ হরফে ফুটে উঠল, “সামনে টাইপমেশিন। যেখানে যেতে চাও, সেই হরফগুলো টেপো। সাবধান! ভুল হরফে আঙুল পড়ে না। যেন।”

 

টাইপমেশিনে কে. আই. টি. ও হরফগুলো টিপে দিলুম।

 

মিনিটখানেক পরে ভিশনস্ক্রিনে ফুটে উঠল, ‘এসে গেছে। নামতে হলে ডাউন লেখা বোতাম টেপো।

 

ব্যস! চিরবিকেলের দেশের বালিয়াড়িতে স্পেসশিপ নামল। ভোঁদা জানলা দিয়ে দেখে বলল, “এ কোথায় এলুম দাদা? রাজস্থানের মরুভূমি নাকি?”

 

বললুম, “না জগদীশবাবু! নামুন। কুমড়ো-মানুষদের দেশে এসে গেছি। এখন আমার সঙ্গীদের খোঁজে বেরোতে হবে।”

 

ভোঁদা নেমে গেল, আমিও নামলুম। ভবেশবাবু বললেন, “আমার মাথা ভোঁ-ভোঁ করছে। আপনারা যা হয় করুন মশাই! আমি এখন ঘুমোব।”

 

এটা আগের জায়গা নয়। কুমড়ো-মানুষদের সেই বসতিটা থেকে কতদূর পৌঁছেছি কে জানে? বললুম, “আসুন জগদীশবাবু! এবার কিন্তু রীতিমতো একটা অভিযান হবে। সম্রাট চাংকোর ল্যাবে

 

যে বসতিতে লড়াই দেখেছেন, সেটা খুঁজে বের করা দরকার।”

 

ভোঁদা চিন্তিতমুখে বলল, “চারদিকেই তো মরুভূমি!”

 

“চলুন। দেখা যাক। একটা বালির পাহাড় কোথায় আছে, আগে সেটাই খুঁজতে হবে।”

 

কিছুদূর চলার পর ভোঁদা বলল, “এক কাজ করা যাক দাদা! এখানে বালির ঢিবি করে চিহ্ন দিয়ে রাখি। তারপর আপনি যান ওই দিকে, আমি যাই এই দিকে। এক ঘণ্টার মধ্যে খুঁজে না পেলে ফিরে আসব এখানে। কেমন?”

 

“মন্দ বলেননি! ঠিক আছে। আপনি বাঁ দিকে যান, আমি ডান দিকে। পরের বার আমি সামনে, আপনি পেছনে। তবু যদি খুঁজে না পাই আমরা, তা হলে আবার উড়ে অন্য একখানে গিয়ে নামব।”

 

ভোঁদার ওজন ভারী। তাই তার চলার গতি কম। কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ করে মনে হল, ভুল জায়গায় নেমেছি। সেই ঝা-ঝ বাজনাটা তো শোনা যাচ্ছে না।

 

চলেছি তো চলেছি। দেখতে দেখতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট কেটে গেল। বালির নিচু টিলা আছে অনেক। কিন্তু সেইরকম কোনো উঁচু টিলা দেখতে পাচ্ছি না। দূরে এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে খুঁজছি, হঠাৎ সামনে একটা বালির ঢিবি নড়তে শুরু করল। তারপর বেরিয়ে পড়ল দুটো জ্বলজ্বলে নীল চোখ এবং তারপর একটা প্রকাণ্ড কঁকড়া–অবিকল কুমডোর গড়ন। কিটো গ্রহের সব প্রাণীই দেখছি একই গড়নের।

 

ভীষণ চেহারার বিশাল কাকড়াটা আমার দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। পিছু হটতে থাকলুম। কেন যে বুদ্ধি করে হাতে কিছু নিইনি! সেই ক্রু-ড্রাইভার দুটো কুমড়ো-মানুষদের বসতিতে পড়ে আছে কোথাও। প্রাণীটা আমাকে আক্রমণ করতেই আসছে। মরিয়া হয়ে দু’হাতে দু’মুঠো বালি তুলে ওটার চোখে ছুঁড়ে মারলুম। তাতে কিছু হল না।

 

কুমড়ো-কাঁকড়াটা আমাকে খপ করে ধরে তুলে নিজের পিঠে বসিয়ে নিল এবং নড়বড় করে চলতে শুরু করল। হাতির পিঠে চলার মতো অবস্থা। তার ওপর কাঁকড়াটা নাচতে-নাচতে চলেছে। ফলে আমিও প্রায় নাচছি। একটু পরে মনে হল, প্রাণীটা হিংস্র নয়। কুমড়ো-মানুষদের মতোই আমুদে দেন। দুটো দাঁড়া দিয়ে আমার কোমর আঁকড়ে রেখেছে। তাই পড়ে যাচ্ছি না। কিন্তু নাচতে হচ্ছেই।

 

তারপর তার গতি বাড়ল। যেন দ্রুতগামী ট্রাক।

 

সামনে অনেক বালির ঢিবি দেখা যাচ্ছিল। সেগুলো নড়তে নড়তে বেরিয়ে পড়ল আরও একদঙ্গল কুমড়ো-কাঁকড়া। সবাই ঘিরে ধরল। তারপর চারদিক থেকে দাঁড়া বের করে আমাকে টানাটানি শুরু করল তারা। আমার বাহক কিছুতেই আমাকে হাতছাড়া করবে না। এদিকে টানাটানির চোটে আমি অস্থির। এবার একটু করে খোঁচাও লাগছে। পোশাক ফর্দাফাই হয়ে যাচ্ছে।

 

শেষ পর্যন্ত কী ঘটত বলা যায় না, হঠাৎ আকাশে শনশন শব্দ শোনা গেল। তাকিয়ে দেখি, একটা ঈগল-মানুষ নেমে আসছে।

 

অমনি কুমড়ো-কাকড়াগুলো ঝটপট বালিতে গা-ঢাকা দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। এই সুযোগে আমি লাফ দিয়ে নীচে নামলুম। ঈগল-মানুষটা একটা কুমড়ো-কাকড়াকে ধরে টানাটানি করছিল। সে বেচারা গা-ঢাকা দেবার সুযোগ পায়নি।

 

দেখে মায়া হল। প্রাণীগুলো পৃথিবীর একজন মানুষ নিয়ে একটু আমোদ করতে চেয়েছিল শুধু। শয়তান ঈগল-মানুষটাকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায়? পালোয়ান থাকলে দেখার মতো একটা লড়াই বাধত সন্দেহ নেই।

 

আবার দু’খাবলা হাতে বালি তুলে নিলুম। এটাই এখন আমার অস্ত্র। ঈগল-মানুষটার চোখ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারলুম।

 

এতে কাজ হল। কাঁকড়াগুলো বালির প্রাণী। ঈগল-মানুষটা তা নয়। কাজেই বিকট ক্র্যাঁ-ক্র্যাঁ চিৎকার করে ডানা ঝাঁপটাতে-ঝাঁপটাতে উড়ে পালাল। নির্ঘাত অন্ধ হয়ে গেছে শয়তানটা!

 

সে পালিয়ে যাওয়ার পর কঁকড়াগুলো বেরোল। এবার তারা আমার প্রতি কৃতজ্ঞ। চারদিক ঘিরে অদ্ভুত শব্দ করতে থাকল তারা। আঃ! ভাষা জিনিসটার মাহাত্ম্য আবার হাড়ে হাড়ে বুঝলুম। একটু পরে ইশারায় ওদের বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করলুম, আমার মতো প্রাণী দেখেছে কি না। যদি দেখে থাকে, আমাকে যেন সোজা পৌঁছে দেয়।

 

অনেক অঙ্গভঙ্গি করার পর সেই প্রকাণ্ড কুমড়ো-কাকড়াটা এগিয়ে এসে খপ করে আমাকে ধরে পিঠে বসিয়ে নিল। তারপর দ্রুত ছুটে চলল। এবার যত যাচ্ছি, বালির ভেতর ঝাঁ-ঝাঁ বাজনা শোনা যাচ্ছে। তা হলে সঠিক দিকেই যাচ্ছি আমরা। কিছুক্ষণ পরে আনন্দে দেখলুম, সেই বালির লম্বাটে পাহাড়টা সামনে দেখা যাচ্ছে। এবার কাঁকড়া-ভদ্রলোক সাবধানে এগোচ্ছিলেন। বুঝলুম, কাঁকড়া হওয়ার বিপদ এখানে পৃথিবীর চেয়ে কম নয়। কাকড়া কার না প্রিয় খাদ্য? চাপা স্বরে ওঁর পিঠে হাত বুলিয়ে সাহস দিচ্ছিলুম।

 

পাহাড়ের মাথার কাছাকাছি আমাকে নামিয়ে দিয়ে তিনি জোরে ছুটে পালিয়ে গেলেন। হাত নেড়ে তাঁর উদ্দেশে বললুম, “বিদায় বন্ধু! আবার দেখা হবে। আপনাদের সঙ্গে দেখা না করে এই গ্রহ ছেড়ে যাব না।”

 

নীচে সেই কুমড়ো-মানুষদের বসতি। কিন্তু খাঁ-খাঁ নিঝুম কেন? সাবধানে নেমে গেলুম সবুজ উপত্যকায়। তারপর দেখলুম, তিনটে গোরিলা-মানুষের মড়া ঝরনার জলে পাথরে আটকে আছে। দারুণ যুদ্ধ হয়ে গেছে তা হলে! আরও খানিকটা এগিয়ে দেখি, ঢিবিঘরের ভেতর থেকে প্যাটপ্যাট করে অনেকগুলো কুমড়ো-মানুষ আমাকে উঁকি মেরে দেখছে। হাত নাড়তে-নাড়তে এগিয়ে গেলুম। কিন্তু তারা দরজা বন্ধ করে দিল।

 

মনমরা হয়ে ঝরনার ধারে গেলুম। এবার কয়েকটা কুমড়ো-মানুষের থ্যাতলানো মড়া দেখে শিউরে উঠলুম। তা হলে আমার সঙ্গীদের ওরা বন্দী করে নিয়ে যেতে পেরেছে! স্পেসশিপের কাছে পৌঁছনো দরকার। আবার সম্রাট চাংকোর পুরীতে ফিরে যেতে হবে সেই আজব বলের গ্রহে। ওঁদের উদ্ধার করতেই হবে।

 

আনমনে বালির পাহাড়টার দিকে চলেছি, হঠাৎ কী এক গন্ধ ভেসে এল। গন্ধটা খুব চেনা। নাক উঁচু করে শুঁকতে শুঁকতে টের পেলুম, চুরুটের গন্ধ। কিটো গ্রহের কুমড়ো-মানুষেরা কি চুরুট খায়? তা ছাড়া চুরুট তো নেহাত পৃথিবীর জিনিস!

 

এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে খুঁজতে থাকলুম, কে চুরুট খাচ্ছে। তারপর ডান দিকে ঝরনাধারার বাঁকে একটা ঝোঁপের মাথায় চকমকে কিছু দেখা গেল। জিনিসটা নড়ছে।

 

তারপর চিনতে পারলুম, ওটা একটা টাক এবং পার্থিব মাথারই টাক। অমনি চেঁচিয়ে উঠলুম, “কর্নেল! কর্নেল!”

 

বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ ঘুরে দাঁড়ালেন। মুখটা গম্ভীর। দৌড়ে কাছে গিয়ে বললুম, “আপনাকে সম্রাট চাংকোর গোরিলা-বাহিনী ধরে নিয়ে যায়নি?”

 

“তা হলে খুশি হতে?” কর্নেল একটু হাসলেন, “খুশি অবশ্য আমিও হতুম। কিন্তু কে জানে কেন, ওরা আমার চাইতে আমার টুপিটাকেই বন্দী করতে ব্যস্ত হল। যাকগে, প্রচুর পাখি দেখা হল ততক্ষণ। প্রজাপতি দেখলুম না, শুধু পাখি। আশ্চর্য ডার্লিং, সব পাখিই কুমড়ো-মানুষগুলোর মত দেখতে। পা নেই, ঠোঁট নেই। তবে শুধু দুটো ডানা আছে।”

 

“এখানে দেখলুম এতবড় একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে। আপনি তখন কী করছিলেন?”

 

কর্নেল শ্বাস ছেড়ে বললেন, “সে বড় অদ্ভুত যুদ্ধ, জয়ন্ত! আমার মতো একজন প্রাক্তন যোদ্ধা অমন বিচ্ছিরি যুদ্ধ কখনও দেখেনি। বিনা অস্ত্রে যুদ্ধ বড্ড আদিম ধরনের ব্যাপার। আঁচড়ানো, কামড়ানো, কাতুকুতু…ছা-ছ্যা!” বলে পোড়া চুরুটটা ঝরনার জলে ফেলে দিলেন, “তোমার খবর বলো!”

 

আগাগোড়া সমস্ত ঘটনার বিবরণ দিলুম। শোনার পর কর্নেল বললেন, “চাংকোর কথা চন্দ্রকান্তবাবু বলছিলেন। তিনিও নাকি এক বিজ্ঞানী। তবে পৃথিবীতে ওঁর নামে হুলিয়া বের করেছে

 

পুলিশ! ফিরলেই অ্যারেস্ট হয়ে জেল খাটতে হবে। তাই গ্রহান্তরে পালিয়ে এসেছেন।”

 

ব্যস্ত হয়ে বললুম, “চলুন! স্পেসশিপের সাহায্যে চন্দ্রকান্তবাবুদের উদ্ধার করতে হবে।”

 

প্রকৃতিবিদ যেন অনিচ্ছা-অনিচ্ছা করে পা বাড়িয়ে বললেন, “কিটো গ্রহ ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। কী সুন্দর সব বৃক্ষলতা, কত আশ্চর্য রং-বেরঙের আজব পাখি! শুধু ষষ্ঠীর কথা ভেবেই মন কেমন করছে। চলো!”

 

হাঁটতে-হাঁটতে বললুম, “আশ্চর্য মানুষ আপনি! আজব বলের রহস্য ফাঁস করতে অভিযানে বেরোলেন, আর সেসব ছেড়ে এখন কিটো মুল্লুকের প্রকৃতির জন্য হা-হুঁতাশ করছেন!”

 

“না, মানে, এখানকার লোকগুলো বড় সজ্জন। কর্নেল গম্ভীর মুখে মন্তব্য করলেন।

 

বালির পাহাড়টা ডিঙিয়ে কিছু দূর গেছি, সেই কঁকড়া-ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মনে হল, উনি আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। হাত নাড়তেই এগিয়ে এসে আমাকে পিঠে চাপালেন। কর্নেলের সাদা দাড়ি একবার ছুঁয়ে শিশি শব্দ করলেন। বোধ হয়, শিশি মানে খি-খি হাসি!

 

দু’জনকে পিঠে বয়ে তরতর করে দৌড়লেন দৌড়বীর। স্পেসশিপের কাছে পৌঁছে দেখি, ভেতরে ভবেশবাবু ঘুমোচ্ছেন। ওঁর ভাগনের পাত্তা নেই। কঁকড়া-ভদ্রলোক চলে গেলেন। বললেন, “ভবেশবাবুকে জাগিও না। ঘুমনো মানুষকে জাগাতে নেই। তা ছাড়া জেগে উঠলেই নিরুদ্দিষ্ট ভাগনের জন্য হইচই বাধাবেন। চলো, আমরা সম্রাট চাংকোর গ্রহে পাড়ি জমাই। ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করা দরকার।”

 

“কিন্তু জগদীশবাবু কোনো বিপদে পড়েননি তো?” চিন্তিত হয়ে বললুম, “বালির ঢিবির কাছে ওঁর অপেক্ষা করার কথা। দেখলুম না তো!”

 

কর্নেল বাইনোকুলারে চারদিক দেখতে দেখতে বললেন, “বোধ হয় পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভেঁদা-পালোয়ান। তবে ভয় নেই, ডার্লিং! কিটো গ্রহ খুব নিরাপদ জায়গা।”

 

স্পেসশিপে ঢুকে স্টার্ট দিলুম। কঁকুনির চোটে ঘুম ভেঙে গেল ভবেশবাবুর। রাঙা চোখে তাকিয়ে বললেন, “ইয়ার্কি হচ্ছে ভোঁদা? আমার ঘুম ভাঙিয়েছিসতোকে এক পয়সার প্রপার্টি দেব না আর।”

 

কর্নেল পেছনে ঘুরে বললেন, “ভবেশবাবু! আমার মনে হচ্ছে, আপনার ঘুমটা এখনও ভাঙেনি।”

 

“আঁ!” বলে ভবেশবাবু চোখ কচলাতে থাকলেন। তারপর চারপাশ দেখে নিয়ে ফিক করে হাসলেন, “অ। তা হতচ্ছাড়া ভোঁদাটা কোথায়? কারও সঙ্গে কুস্তি লড়ছে নাকি?”

 

“তা বলা যায় না।” কর্নেল বললেন, “তবে ভাববেন না। ওকে কেউ এঁটে উঠতে পারবে না।”

 

“কিন্তু আমরা যাচ্ছিটা কোথায় বলুন তো?”

 

“সেই আজব বলের দেশে।”

 

ভবেশবাবু খুশি হলেন, “সম্রাট চাংকো লোকটা বাজে। ওর পাল্লায় পড়া ঠিক হবে না। তবে আমি স্যার এবার অন্তত একডজন বল কুড়োব। নিয়ে গিয়ে বেচতে পারলে প্রচুর লাভ হবে। সম্রাট চাংকোর কাছে শুনেছি, একটা বল থেকে পুরো একটা জাহাজের খোল বানানো যায়। শুধু একটাই সমস্যা, বলগুলোর ভেতর ভূতের বাস। তাই অমন সুড়ুত করে পালিয়ে যায়। ভূতের রোজা ডেকে ভূতটাকে তাড়াব। চাংকোবাবুর দেশে গিয়েই থাকবে ওরা।”

 

বললুম, “ভবেশবাবু! চাংকোবাবু বলবেন না। বললেই বিপদে পড়বেন।”

 

ভবেশবাবু গম্ভীর হলেন, “না, না। এখানে আপনাদের সামনে বলছি। ওঁর রাজ্যে গিয়ে বলব না।”

 

স্পেসশিপটা বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত এমনভাবে তৈরি করেছেন, আমার মতো আনাড়িরও চালাতে আর অসুবিধে হচ্ছিল না। সব নির্দেশ দেওয়া আছে। ক্রমশ সেগুলো বুঝতে পেরে গেছি। কর্নেল আমার তারিফ করছিলেন বারবার। গোরিলা-মানুষদের দেশ, অর্থাৎ সম্রাট চাংকোর গ্রহে পৌঁছনোর জন্য বুদ্ধি খাঁটিয়ে টাইপরাইটারে যে ইংরেজি হরফগুলো টিপলুম, তার মানে দাঁড়ায়, ‘যেখান থেকে কিছুক্ষণ আগে এসেছি, সেইখানে যেতে হবে।

 

ভিশনস্ক্রিনে ফুটে উঠল, ওকে।

 

সেই নীলাভ রোদের গ্রহে স্পেসশিপ নামল। প্রথমে দরজা খুলে আমি হেঁটমুণ্ডে নেমে একটা বল কুড়িয়ে পকেটে ভরে দুই ঠ্যাঙে সোজা হলুম। তারপর দুটো বল কুড়িয়ে কর্নেল এবং ভবেশবাবুকে দিলুম। ওঁরা বল পকেটস্থ করে নেমে এলেন। সমতল উপত্যকাতেই নেমেছি, যেখানে আগের বার নেমেছিলুম। এমন অদ্ভুত আলোয় বেশি দূর দৃষ্টি চলে । সম্রাট চাংকোর পুরী কুয়াশার মতো আবছায়ায় লুকিয়ে আছে কোথায়।

 

কর্নেল বাইনোকুলার চোখে তুলে বললেন, “সামনে সোজা এগিয়ে গেলে সম্রাট চাংকোর বাড়ি। চত্বরে কী একটা হচ্ছে। রেস নাকি? গজকুমার সিংহের কীর্তি! গোরিলা-মানুষদের রেসে নামিয়েছেন। কিটো গ্রহেও কুমড়ো-মানুষদের নিয়ে রেস লড়িয়েছিলেন।”

 

বললুম, “এবার কিন্তু আমি লুকিয়ে যাব, কর্নেল! সম্রাটবাহাদুর আমার ওপর রেগে আছেন। আপনি আগে চলে যান বরং। আপনাকে পেলে খুশিই হবেন উনি।”

 

কর্নেল হনহন করে হেঁটে উধাও হয়ে গেলেন। ভবেশবাবু ব্যস্তভাবে বল কুড়িয়ে পকেট বোঝাই করতে থাকলেন। বললুম, “নিয়ে যাবেন কেমন করে? স্পেসশিপে নেওয়া যাবে না যে!”

 

ভবেশবাবু বললেন, “দেখা যাক, কী হয়। তবে মশাই, আমি ওখানে যাচ্ছি না। বল কুড়নো শেষ। এবার আমি গাড়ির ভেতর গিয়ে ঘুমাব। কী খাওয়াল অমৃত বলে, খালি ঘুম পাচ্ছে।”

 

তিনি স্পেসশিপে ঢুকে পড়লেন। আমি সাবধানে চলতে থাকলুম। কিছু দূর চলার পর সেই নদীটা দেখতে পেলুম। নদীর বাঁকের কাছে আবছায়ার ভেতর সম্রাট চাংকোর বাড়ি দেখা গেল। একটা চাপা হট্টগোলও কানে এল। কী করা উচিত ভাবছি, সেই-সময় মাথার ওপর শনশন শব্দ। তাকিয়ে আঁতকে উঠলাম। একটা ঈগল-মানুষ নেমে আসছে আমার দিকে।

 

একলাফে একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়লুম। তারপর দেখলুম, ঈগল-মানুষটার পিঠে কেউ বসে আছে এবং তার মাথার ঝুঁটি ধরে মোচড় দিচ্ছে। ঈগল-মানুষটা ক্রা-ক্রা বিকট চেঁচিয়ে শনশন শব্দে নীচে নামল। তারপর তার পিঠ থেকে নামল ভোঁদা-পালোয়ান।

 

নেমেই সে ঈগল-মানুষটার সঙ্গে যেন কানামাছি খেলতে শুরু করল। ঈগল-মানুষটা ঠোঁট হাঁ করে যেদিকে ঘুরছে, পালোয়ান একলাফে তার উলটো দিকে চলে যাচ্ছে। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, “জগদীশবাবু! জগদীশবাবু!”

 

পালোয়ান আমাকে দেখেই খ্যাখ্যা করে হেসে বলল, “পাখিটা কানা দাদা! তাই ওর পিঠে চাপতে অসুবিধে হয়নি।” বলে সে লেজটা ধরে ফেলল এবং পালোয়ানের কাণ্ড, বাই-বাই করে চক্কর খাইয়ে নদীর জলে ছুঁড়ে ফেলল। ঝপাস শব্দে ঈগল-মানুষটা জলে পড়ে স্রোতের বেগে ভেসে গেল। ডানা ভিজে গেলে আর ওড়ার ক্ষমতা নেই। তা হলে কিটো গ্রহে এই ঈগল-মানুষটাকেই অন্ধ করে দিয়েছিলুম!

 

ভোঁদা-পালোয়ান খুব হেসে বলল, “খুব জব্দ। তা দাদা, মামাবাবুর খবর কী?”

 

“স্পেসশিপের ভেতর ঘুমোচ্ছেন।”

 

ভোঁদা বলল, “ঘুমোক। লোহালক্কড়ের ভেতর বসে মামাবাবুর ঘুমনো অভ্যেস। আর এ তো গাড়ির ভেতর নরম গদি!”

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *