আজব বলের রহস্য (কিশোর কর্নেল) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
চার
পালোয়ানের অবস্থা করুণই বটে! পরনে সেই হাফপেন্টুল আর স্পোর্টিং গেঞ্জি। কিন্তু এ কী দশা তার!
একটা বিশাল হলঘরের ভেতর তাকে ছাদে টিকটিকির মতো সেঁটে থাকতে দেখলুম। ডাকলুম, “জগদীশবাবু! জগদীশবাবু!”
পালোয়ান সিলিং থেকে আমাকে দেখতে পেয়ে কাতর মুখে বলল, “দাদা, আমি নামতে পারছি না। যতবার নামবার চেষ্টা করছি, সিলিংয়ে আরও সেঁটে যাচ্ছি।”
“মাধ্যাকর্ষণের অভাব, জগদীশবাবু!” একটু হেসে বললুম, “আপনার উচিত ছিল এখানকার একটা বল কুড়িয়ে পকেটে রাখা। তা হলে ওজন বেড়ে যেত, দিব্যি চলাফেরা করতে পারতেন।”
“রেখেছিলুম তো! ওই লোকটা কেড়ে নিল।”
সম্রাট চাংকো খাপ্পা হয়ে বললেন, “লোকটা! তুমি আমাকে লোকটা বলছ? আমি সম্রাট চাংকো। আমার সঙ্গে ফাজলামি? যাও তোমাকে বল দিতুম, আর দিচ্ছি না।”
বললুম, “সম্রাটবাহাদুর, আপনার আর এক অতিথি কোথায়?”
সম্রাট চাংকো চোখ পাকিয়ে বললেন, “অতিথি? সে তো আমার বন্দী। তাকে প্রথম ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে নোংরা জায়গা থেকে ধরে এনেছি।”
“কেন সম্রাটবাহাদুর?”
“আমার বন্ধুর নাতি তাকে একটা বল বেচতে চেয়েছিল। সে তাচ্ছিল্য করে কেনেনি। ছাদে দাঁড়িয়ে দূরবীনযন্ত্রে আমি সব দেখেছি। ওকে পরীক্ষার জন্য বলটা ওর বাড়িতে পর্যন্ত পাঠিয়েছিলুম। সেই বলকে সম্মানে পুজো না করে সে এই হোঁতকা পালোয়ানের মাথায় চাপিয়ে এক দাড়িওলা বুডোর বাড়ি নিয়ে গেল। ওঃ! অসহ্য, বড় অসহ্য অপমান!” এই বলে সম্রাট চাংকো দাঁত কিড়মিড় করতে থাকলেন।
জিজ্ঞেস করলুম, “আপনার বন্ধুর নাম?”
“ঐরাবত সিং। প্রথম ব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে নোংরা গ্রহে তার জন্ম।”
“পৃথিবী সত্যিই বড় নোংরা গ্রহ, সম্রাটবাহাদুর!”
সম্রাট চাংকো আমার কাঁধে হাত রেখে চুপিচুপি বললেন, “কাউকে বোলো না! আমার জন্মও সেখানে। রাগ করে পালিয়ে এসেছি। ছ্যা-ছ্যা! দিনরাত্তির ঝগড়াঝাটি, খুনোখুনি, দলাদলি। সামান্য স্বার্থের জন্য লড়াই। ঘেন্না ধরে গিয়েছিল হে! বিশেষ করে আমার বন্ধু ঐরাবত সিং-ওই যে কী বলে তোমাদের পৃথিবীতে, হুঁ, ভোটের লড়াইয়ে নেমেছিল। হেরে গেল। তোমাদের ভালো করার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু কেন হারল জানো কি? তাকে কারচুপি করে হারিয়ে দিল। রাগে-দুঃখে বেচারা হার্টফেল করে মারা গেল। খবরটা পেলুম দেরিতে। তখন আমি কুমড়ো-মানুষদের গ্রহ সবে জয় করেছি।”
শোনামাত্র বলে ফেললুম, “কুমড়ো-মানুষদের গ্রহেই আমার তিন সঙ্গী এখন বন্দী। দয়া করে ওদের উদ্ধার করুন, ইওর এক্সেলেন্সি! তাদের মধ্যে আপনার বন্ধুর নাতিও আছেন।”
সম্রাট চাংকো হা-হা করে হেসে বললেন, “সবই জানি হে ছোকরা! আমার দূরবীনযন্ত্রে সবই দেখেছি। একটু অপেক্ষা করো। আমার বাহিনী পাঠিয়েছি সেখানে। তাদের নিয়ে আসবে।”
এমন সময় একজন বিকট চেহারার গোরিলা-মানুষের কাঁধে চেপে ভবেশবাবুর আবির্ভাব ঘটল। কাঁধ থেকে নেমে ভবেশবাবু আমাকে দেখতে পেলেন। অবাক হয়ে বললেন, “মশাইকে চেনা-চেনা ঠেকছে?”
পরিচয় দিয়ে বললুম, “আপনার ভাগনেকে একটু বুঝিয়ে বলুন, যেন সম্রাটবাহাদুরকে সম্মান দেখান। তা না হলে ওঁকে টিকটিকি হয়েই কাটাতে হবে।”
গোরিলা-মানুষটি ততক্ষণে লাফ দিয়ে দিয়ে পালোয়ানকে কাতুকুতু দিতে শুরু করেছে। কাতুকুতুর চোটে পালোয়ান হেসে অস্থির এবং সিলিং-এ বুক ঠেকিয়ে এদিক-ওদিক করে বেড়াচ্ছে। সম্রাট চাংকোও খুব হাসছেন। ভবেশবাবু দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বললেন, “উপযুক্ত শাস্তি! পালোয়ানি দেখাবে বেপাড়ায়? নাও, বোঝে ঠ্যালা। আমি তোমাকে বাঁচাব না। তুমি হেসে মরো আর যাই করো। হতভাগা বুন্ধু!”
বললুম, “সম্রাটবাহাদুর! যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে। এবার ওঁকে রেহাই দিন।”
“তুমি বলছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ। কথা দিচ্ছি, ও যাতে আর বেয়াদপি না করে আমি দেখব।”
সম্রাট চাংকো গোরিলা-মানুষটিকে অদ্ভুত ভাষায় বললেন, “হাম্বো জাম্বো কাম্বো।” তারপর আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা বল বের করলেন। গোরিলা-মানুষটি চলে গেল। তখন সম্রাট চাংকো পালোয়ানকে বললেন, “ওহে পালোয়ান! বল ছুঁড়ে দিচ্ছি। লুফে নিতে হবে। দেখি, তোমার হাতের তাক। না লুফতে পারলে আটকে থাকবে কিন্তু!”
পালোয়নের দিকে ফের দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে তার মামা বললেন, “তোকে বলতুম ক্রিকেট খেলাটা শিখে নে! শিখলে কাজে লাগত।”
চারবারের বার বলটা ক্যাচ ধরল পালোয়ান এবং ধুপ করে নামতে পারল। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম অভ্যাসে, “আউট! আউট! আউট!”
সম্রাট চাংকো চোখ কটমট করে বললেন, “আর যাই বলল হে ছোকরা, তোমাদের ওই নোংরা জায়গার ভুতুড়ে খেলার টার্মগুলো আওড়াবে না। কান পচে যায়।”
পালোয়ান মুচকি হেসে বলল, “দাদা! সত্যিই আউট করে দিয়েছি বলুন! কেমন একখানা ক্যাচ ধরেছি।”
“আবার? আবার?” সম্রাট চাংকো হুঙ্কার দিলেন, “বল কেড়ে নেব বলে দিচ্ছি।”
“ভোঁদা-পালোয়ান ভড়কে গিয়ে জিভ কাটল, “সরি স্যার!”
“স্যার নয়, ইওর এক্সেলেন্সি বলো!”
ভোঁদা মুখ-তাকাতাকি করছে এবং তার মামা চোখ-ইশারা করছেন। আমিও করছি। সম্রাট চাংকো ক্রুদ্ধ হয়ে চোখ পিটপিট করছেন। অগত্যা ভোঁদা বলল, “সরি, ইওর এক্সেলেন্সি!”
সম্রাট চাংকো খুশি হয়ে বললেন, “এসো।”
ঘরের পর ঘর, সবই কালো, তারপর ঘর। অনেক গোলকধাঁধা পেরিয়ে একটা ঘরে পৌঁছলুম আমরা। এতক্ষণে বুঝলুম, সম্রাট চাংকো একজন বিজ্ঞানী। চন্দ্রকান্তবাবুর চেয়ে উঁচুদরের বিজ্ঞানী নিঃসন্দেহে। বিশাল ল্যাব। কতরকম যন্ত্র। জার। কত বিচিত্র সব কমপিউটার। এককোণে সোফায় আমাদের বসতে বললেন সম্রাট চাংকো। বসার পর তারিফ করে বললুম, “আমাদের বিজ্ঞানী চন্দ্ৰকান্তেরও একটা ল্যাব আছে। তবে এর কাছে নস্যি!”
সম্রাট চাংকো বাঁকা হেসে বললেন, “চন্দ্রকান্ত বিজ্ঞানের বোঝে কী? ও তো একটা বুন্ধু।”
“তাঁকে আপনি চেনেন সম্রাটবাহাদুর?”
“আলবাত চিনি। আমার সঙ্গে তাইপেতে আলাপ হয়েছিল একটা সেমিনারে। যাই হোক, এবার ওদের ধরে আনার ব্যবস্থা করি।” বলে সম্রাট চাংকো একটা যন্ত্রের সামনে বসলেন, “শুধু একটাই সমস্যা। কুমড়ো-মানুষগুলো বেয়াড়া। খুব আমুদে স্বভাবের কিনা! তাই আমাদের জিনিস পেলে ছাড়তে চায় না। দেখা যাক। নইলে আমার গোরিলা-সেনা পাঠাতে হবে। ওদের ওরা খুব ভয় পায়।”
বিশাল ভিশনস্ক্রিনে এবার ফুটে উঠল সেই কিটো গ্রহের মনোরম সবুজ উপত্যকা আর রং-বেরঙের কুমড়ো-মানুষ। আমার বৃদ্ধ বন্ধু চোখে বাইনোকুলার রেখে যথারীতি এদিকে-ওদিকে, সম্ভবত পাখি খুঁজছেন অথবা প্রজাপতি। কিটো গ্রহে পাখি-প্রজাপতি দেখেনি। তবে কর্নেলের চোখ। কিছু বলা যায় না!
গজকুমারবাবুকে দেখলুম রেসের আয়োজন করেছেন। কুমড়ো-মানুষেরা দৌড়চ্ছে। উনি হাততালি দিচ্ছেন। হালদারমশাই একটা ডিমাললা বাড়ির আনাচে-কানাচে ঘুরঘুর করছেন। গগায়েন্দার স্বভাব। আর বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত নোটবইতে কীসব টুকছেন। কুমড়ো-মানুষেরা রেসের জায়গায় ভিড় করেছে।
সম্রাট চাংকো বললেন, “ওদের এক্সরের ল্যাসেতে বন্দী করে আনা যায়। যেভাবে আমার বন্ধুর নাতি আর এই মামা-ভাগনেকে ধরে এনেছি। কিন্তু চন্দ্রকান্ত মহা ধূর্ত। ওর পকেটে একটা রে-ডিটেক্টর আছে। টের পেয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেই সমস্যা। কুমড়ো-মানুষদের ঘরগুলো এমন ধাতুতে তৈরি, কোনো অদৃশ্য রশ্মিই ঢুকতে পারবে না। হুঁ, গোরিলা-বাহিনীই পাঠানো যাক।” বলে হাঁক দিলেন, “টাম্বো মাম্বো জাম্বো!”
অমনি ভিশনস্ক্রিনের দৃশ্য মুছে একদঙ্গল গোরিলা-মানুষের ছবি ফুটে উঠল। তারপর দেখলুম। সেই দানোর মতো গোরিলা-মানুষ, যে ভোঁদা-পালোয়ানকে কাতুকুতু দিচ্ছিল, গোরিলা-মানুষদের চুলের ডগা থেকে আজব বলগুলো খুলে নিল।
সঙ্গে-সঙ্গে তারা বাই-বাই শূন্যে ভেসে উঠল এবং দেখতে দেখতে উধাও হয়েও গেল। সম্রাট চাংকো বসে রইলেন। এই সুযোগে ফিসফিস করে ভবেশবাবুকে বললুম, “আপনি ওই গোরিলা-মানুষটার কাঁধে চেপেছিলেন কেন?”
ভবেশবাবু তেতোমুখে অমনি চাপা স্বরে বললেন, “ইচ্ছে করে কি চেপেছি মশাই? ব্যাটাচ্ছেলে আমাকে কী পেয়েছে কে জানে। যখন-তখন এসে কাঁধে চাপিয়ে নিয়ে বেড়ায়। আর নামবার চেষ্টা করলেই কাতুকুতু।”
সম্রাট চাংকো ঘুরে বললেন, “কীসের ষড়যন্ত্র হচ্ছে যেন? সাবধান!”
ঝটপট বললুম, “না, ইওর এক্সেলেন্সি! আমরা আপনার ক্ষমতার প্রশংসা করছি।”
“এ কী ক্ষমতা দেখছ হে ছোকরা! আসল ক্ষমতা দেখবে, চাঁদুটাকে আসতে দাও আগে।”
“চাঁদু, মানে চন্দ্রকান্তবাবুর কথা বলছেন কি?”
সম্রাট চাংকো অট্টহাসি হেসে বললেন, “আবার কার?” বলে তিনি খুটখুট করে বিজ্ঞানী চন্দ্রান্তের মতোই কমপিউটারের বোতাম টিপতে থাকলেন। একটু পরে ভিশনস্ক্রিনে একটা অদ্ভুত দৃশ্য ফুটে উঠল। প্রথমে মনে হল একটা বাজপাখি উড়ে আসছে। কিন্তু ক্রমে সেটা বড় হতে থাকল। তখন দেখলুম বাজপাখি গড়নের একটা বিকট মানুষ, দু’টি প্রকাণ্ড ডানা।
সম্রাট চাংকো উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। বললেন, “সর্বনাশ! আবার ঈগল-মানুষটা হানা দিতে আসছে দেখছি! জানি না, আমার কোন প্রজাকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবে। সমস্যা হল, ওকে কোনো অস্ত্রেই কাবু করা যায় না।” বলে একটা ছোট্ট স্পিকার হাঁকলেন, “আম্বো ডাম্বো হ্রাম্বো! আম্বো ডাম্বো হ্রাম্বো!”
তারপর আসন ছেড়ে উঠে সবেগে বেরিয়ে গেলেন।
আমরা ওঁকে অনুসরণ করলুম। একটু পরে খোলা চত্বরে দেখলুম সম্রাট চাংকো একটা লম্বাটে পিস্তল তাক করে আছেন। নীলচে রোদ্দুরে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, ঈগল-মানুষটা আকাশে চক্কর দিচ্ছে। গোরিলা-মানুষদের অবস্থা দেখে মায়া হল। তারা তাড়াহুড়ো করে যে-যেখানে পারছে, লুকিয়ে পড়ছে। আড়াল থেকে বড়-বড় পাথরও ছুঁড়ছে কেউ-কেউ। মাধ্যাকর্ষণ কম। তাই প্রকাণ্ড পাথরগুলো আকাশে ছুটে যাচ্ছে। আশ্চর্য, ঈগল-মানুষটা পায়ের নখ দিয়ে পাথর ধরে ফেলে পালটা ছুঁড়ে দিচ্ছে। কিন্তু সেগুলো তুলোর মতো উড়তে উড়তে বহু দূরে গিয়ে আস্তে-আস্তে নেমে যাচ্ছে। সম্রাট চাংকোর পিস্তল থেকে নীল-লাল-হলুদ আলোর গুলি শাঁই-শাই করে বেরিয়ে ঈগল-মানুষটাকে আঘাত করছে। কিন্তু তার কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। ধোঁয়া হয়ে চাপচাপ উড়ে যাচ্ছে। আকাশ যেন ক্রমে সাদা মেঘে-মেঘে ঢেকে গেল। তার ভেতর একটা অতিকায় ঈগলের ওড়াওড়ি।
ভেঁদা-পালোয়ান হঠাৎ খেপে গেল। আঁক শব্দে পেশী ফুলিয়ে বলল, “তবে রে বদমাশ!” তারপর সে ঊরুতে থাপ্পড় মেরে ঈগল-মানুষটাকে কুস্তিতে চ্যালেঞ্জ করতে লাগল, “চলা আও! কাম অন!” ।
ভবেশবাবু ধমক দিলেন, “আঁই বাঁদর! মারা পড়বি যে! সাঙ্ঘাতিক নখ দেখতে পাচ্ছিস না?”
ভোঁদা-পালোয়ান গর্জে বলল, “নখ ভেঙে ছাতু করে দেব। কাম ইন ঈগলকা বাচ্চা!”
আমি বললুম, “জগদীশবাবু! জগদীশবাবু! আগে গোটাকতক বল কুড়িয়ে নিন। তা হলে ঈগল-মানুষটাকে নামিয়ে এনে লড়তে পারবেন। সম্রাটবাহাদুর! আপনার ল্যাসো কোথায়?”
সম্রাট চাংকো বলে উঠলেন, “খাসা বুদ্ধি! তুমি বকশিশ পাবে হে ছোকরা! আমার মাথা খুলে গেছে। হায়, হায়! কেন যে এটা অ্যাদ্দিন মাথায় ঢোকেনি?” বলে তিনি আলখাল্লা থেকে সেই ল্যাসোটা বের করলেন। ঝটপট কয়েকটা বল কুড়িয়ে পালোয়নের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, “আমি ওকে আটকাচ্ছি। তুমি রেডি হও, পালোয়ান!”
তিনবারের বার ল্যাসোটা ঈগল-মানুষের এক পায়ে আটকে গেল। আমি আর ভবেশবাবু ল্যাম্বোর গোড়ায় হাত লাগালুম। তিনজনে টানতে থাকলুম হেঁইয়ো-হেঁইয়ো করে। ঈগল-মানুষটার জোরে এঁটে ওঠা কঠিন। পালোয়ান এবার বলের ওজনে খুব ওজনদার মানুষ। সে-ও হাত লাগাল। এতক্ষণ ঈগল-মানুষ জব্দ হল। নীচে নামানো গেল তাকে। তারপর পালোয়ান একটা বল ছুড়ল তার দিকে। ঠকাস করে লাগল ডানায়। আমরা তিনজনে ততক্ষণে পাথুরে মাটিতে উপুড় হয়েছি।
পালোয়ান ফের বল ছুঁড়তে যাচ্ছিল, নিষেধ করে বললুম, “না, না। ওজন কমে যাবে আপনার। এবার কুস্তি শুরু করুন। কিন্তু সাবধান! ঠুকরে না দেয়!”
পালোয়ান বলল, “ওজন বেড়েই তো প্রবলেম দাদা! লাফাতে পারছি না যে! ওজন কমাই আগে। তারপর এক লাফে…।” বলে বাড়তি বলগুলো ফেলে দিতে গিয়ে হঠাৎ সে থামল। বলল, “নাহ দাদা! বলসুষ্ঠু ওর পিঠে চাপব। তা হলে কাবু হবে। আপনারা টেনে আটকে রাখুন।”
ঈগল-মানুষটার ডানার ঝাঁপটানিতে ঝড় বইছিল। পালোয়ান চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে একাকে লাফ দিয়ে তার পিঠে চেপে গলাটা দুহাতে জড়িয়ে ধরল। ঈগল-মানুষটা তীক্ষ্ণ ঠোঁট ঘুরিয়ে বিকট ক্রা-ক্রা গর্জন করতে করতে নেতিয়ে পড়ল। পালোয়ান একগাল হেসে বলল, “রামটিপুনির চোটে ব্যাটাচ্ছেলের দম বেরিয়ে গেছে।”
সে ঈগল-মানুষটার পিঠে দাঁড়িয়ে আছে দেখে ভবেশবাবু বললেন, “নেমে আয় ভোঁদা! আর বীরত্ব দেখাতে হবে না।”
পালোয়ান একলাফে নামল। তারপর বাড়তি বলগুলো ঈগল-মানুষের প্রকাণ্ড ঠোঁটের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বলল, “বডি উড়ে যাবে না! এ কী জায়গা বাবা! বলগুলো না থাকলে উড়ে যায় মানুষ।”
ঈগল-মানুষ পড়ে রইল। সম্রাট চাংকো পালোয়ানের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “তোমার ওপর খুব খুশি হয়েছি যে, ছোকরা! এসো, তোমাকে এক গ্লাস অমৃত খাইয়ে দিই। চিরজীবী হবে। তবে বলে রাখা উচিত, এই গ্রহ ছেড়ে তোমাদের ওই নোংরা গ্রহে গেলে কিন্তু অমৃত-শরবত কোনো কাজ দেবে না। ভেবে দ্যাখো, কী করবে।”
ভবেশবাবু ভাগনেকে চোখের ইশারায় খেতে নিষেধ করলেন। কিন্তু পালোয়ান বলল, “মামাবাবু! আমি আর পৃথিবীতে ফিরব না। এখানেই কুস্তির আখড়া খুলব। গোরিলা-মানুষদের বডি বিল্ডআপ শেখাব। ওদের অমন তাগড়াই বডি। কিন্তু কোনো কাজে লাগাতে জানে না। খেলা বলতে খালি বল ছোঁড়া। ধুস! ও তো পুঁচকে ছেলেমেয়েদের খেলা।”
ল্যাবে ফিরে সম্রাট চাংকো এক গ্লাস অমৃত দিলেন ভোঁদাকে। সে মামাবাবুর ফের নিষেধ সত্ত্বেও টো-টো করে খেয়ে বলল, “ওঁদেরও দিন দাদু! একলা খাওয়া কি…”
সম্রাট চাংকো ফুঁসে উঠলেন, “দাদু? দাদু মানে? সম্রাট চাংকোকে তুমি দাদু বলছ?” রফা করে দিয়ে বললুম, “দাদু, মন্দ না ইওর এক্সেলেন্সি! তবে সম্রাটদাদু বলাই উচিত।”
“ওকে! সম্রাটদাদু বলো।”
ভোঁদা বলল, “সম্রাটদাদু! মামাবাবু আর এই রিপোর্টারবাবুকে এক গ্লাস করে অমৃত দিন।”
সম্রাট চাংকো চমকে উঠে আমার দিকে তাকালেন, “তুমি রিপোর্টার নাকি হে ছোকরা? সর্বনাশ! আগে জানলে তো সাবধান হয়ে যেতুম। হুঁ, সবাইকে পৃথিবীতে ফেরার অনুমতি দেব। তোমাকে নয়।”
“কেন সম্রাটবাহাদুর?”
“ওরে বাবা! ফিরে গিয়ে তুমি কাগজে আমার কথা লিখবে আর আঁকে-ঝকে এখানে রিপোর্টার এসে জুটবে। আমাকে জেরবার করবে। আমি ওতে নেই। রিপোর্টাররা বড্ড ডিসটার্ব করে?”
“না, সম্রাটবাহাদুর! আজকাল রিপোর্টারদেরই যেচে-পড়ে সবাই খবর দেয়। পাবলিসিটি চায় কাগজে। সে-যুগ আর পৃথিবীতে নেই।”
“আমি পাবলিসিটি চাইনে।” গম্ভীর মুখে এ-কথা বলে এক গ্লাস অমৃত বের করলেন সম্রাট চাংকো, “নাও, খেয়ে ফেলো। পৃথিবীতে তোমাকে ফিরতে যখন দিচ্ছি না, তখন তুমি এটা খাও। এই মামা-ভদ্রলোকের লোহালক্কড়ের ব্যাবসা আছে। এখানে খামোকা পড়ে থাকলে ব্যাবসার লোকসান হবে। শুধু ওঁকে ফিরে যেতে দেব।”
অমৃতটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও খেয়ে দেখলুম, স্বাদটা মন্দ না। কতকটা বেলের শরবতের মতো স্বাদ। ভবেশবাবু করুণ মুখে বললেন, “অগত্যা এক গ্লাস জল পেলে হত। তেষ্টা পেয়েছে, এ-বয়সে এতক্ষণ দড়ি ধরে টানাটানি করে বড্ড টায়ার্ড হয়ে গেছি সম্রাটবাহাদুর!”
সম্রাট চাংকো ফিক করে হাসলেন, “ঠিক আছে। আপনাকে জলের বদলে অমৃতই দিচ্ছি। তবে ওই নোংরা গ্রহে ফিরলে অমৃতের গুণ টিকবে না। সাবধান মশাই! পৃথিবীতে ফিরে যেন নিজেকে অমর ভাববেন না।”
ভবেশবাবু সোফায় বসে তারিয়ে-তারিয়ে অমৃত খেতে থাকলেন। মুখে অমায়িক ভাব ফুটে উঠল। চাপা স্বরে বললেন, “লোহালক্কড়ের ব্যাবসাটা এখানে করতে পারলে মন্দ হত না। কিন্তু চলবে কি? ওই গোরিলা-মানুষগুলো কেনাকাটা-বিক্রিবাটা বোঝে বলে মনে হয় না। খালি হাম্বা-হাম্বা করে বেড়ায় গোরুর মতো!”
পালোয়ান-ভাগনে শুধরে দিল, “না মামাবাবু! হাম্বো হাম্বা!”
“ওই হল আর কি! তবে ভোঁদা, তুই কি সত্যি এখানে থাকবি ভেবেছিস?”
“হুঁউ।”
ভবেশবাবু বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বললেন, “তোর নামে সম্পত্তি উইল করে দিতুম। আর নবডঙ্কাটিও পাবি না কিন্তু! ভেবে দেখ।”
ভোঁদা পালটা বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, “নবডঙ্কাটি! আমি লোহালক্কড়ের মধ্যে থেকে আপনার মতো মরচে ধরে যাব নাকি?”
মামা-ভাগনের মধ্যে ঝগড়া বাধার উপক্রম হয়েছিল, সেই সময় ভিশনস্ক্রিনে একটা দৃশ্য ফুটে ওঠায় তা থেমে গেল। গোরিলা-মানুষদের সঙ্গে ধুন্ধুর যুদ্ধ বেধেছে। কুমড়ো-মানুষরাও দমাদ্দম গোরিলা-মানুষদের ওপর পড়ছে। আর গোয়েন্দা-হালদারমশাই ফঁক বুঝে গোরিলা-মানুষদের টিকি থেকে লোহার বল খুলে ফেলছেন। অমনি তারা ভড়কে গিয়ে দূরে পালিয়ে যাচ্ছে। সম্রাট চাংকো হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, “তবে রে ব্যাটা টিকটিকি!”
